ট্যালেন্ট বা মেধা। এমন এক বস্তু, যা আসলে প্ল্যান আর প্রোগ্রাম করে ইচ্ছামতো বানানো যায় না, কেনা যায় না, সৃষ্টি করা যায় না, রূপান্তর করা যায় না। মেধা আসলে ভেতর হতে, গভীর হতে সহজাতভাবে বা বলা চলে, অনেকটা উপজাত হিসেবে উৎপত্তি হয়। মেধার উন্মেষ হয়। মেধার সন্নিবেশ হয়। ট্যালেন্ট নিজে নিজেই জন্ম নেয়।
মেধা বা ট্যালেন্ট এক সক্ষমতার নাম, যা আসলে অনেকগুলো প্রি-রিকুইজিটের সম্মিলন ও সন্নিবেশ নিশ্চিত হলে, অনেকগুলো প্রক্রিয়া ও উদ্যোগের ফল হিসেবে দীর্ঘমেয়াদে বিকশিত হয়। শেকড় হতে শিখরে। দুনিয়াতে ট্যালেন্ট বলতে কিছু অবশ্যই আছে। আর আছে বলেই, আর্ট একাডেমিতে বছরের পর বছর প্রশিক্ষণ দিয়েও একজন ভ্যান গগ সৃষ্টি করা যায় না। সেজন্যই হারভার্ড আর অক্সফোর্ড হতে প্রতি বছর একজন করে আইনস্টাইন জন্ম নেন না।
ট্যালেন্ট আসলে কী? কেউ বলেন, ট্যালেন্ট বলে কিছু নেই। পরিশ্রম, প্রচেষ্টা আর অধ্যবসায়ই সব। আমরা ট্যালেন্ট ও মগজের মধ্যে কনফিউজ করে ফেলি। আমার ভোঁতা বুদ্ধি বলে, ট্যালেন্ট আর বুদ্ধিমত্তাও এক জিনিস নয়। বুদ্ধিমত্তার কয়েকটি স্তর আছে। মোটা দাগে ও প্রাথমিক বিচারে-
সাদাকে সাদা ও কালোকে কালা-মানে দুধ কা দুধ, পানি কা পানি ধরতে পারা বুদ্ধিমত্তার খুব প্রাথমিক ও নিম্নস্তরের চাওয়া।
এর থেকে আরেকটু ওপরের স্তরের চাওয়া হল, সেন্স অব হিউমার থাকা, মানে হিউমার ধরতে পারার ক্ষমতা।
এরও থেকে উচ্চতর বুদ্ধিমত্তার স্তরের রিকয়ারমেন্ট হল স্যাটায়ার বুঝতে ও ধরতে পারা।
আর তারও থেকে অধিকতর ও ধারালো লেভেলের বুদ্ধিমত্তার লক্ষন ও রিকয়ারড স্কেল হল সারকাজম ধরতে পারা।
কোনো কারনে কি একটি বিশেষ জাতের বুদ্ধিমত্তা ও মেধার ওভারঅল স্তর ক্রমহ্রাসমান পানির স্তরের মতো নেমে গেছে? তা না হলে এঁরা স্যাটায়ার ও সারকাজম ধরতে পারছে না কেন? এঁরা সারকাজমকে সিরিয়াস ধরে নিয়ে মাথা কাটাকাটি করছে। স্যাটায়ারকে ফ্যক্ট ধরে মানুষ খুন করে ফেলছে।
অশিক্ষিত আমার মতে, ট্যালেন্ট অনেকগুলো এ্যাবিলিটির সম্মিলিত রূপ। ’ট্যালেন্ট’ ও ‘কমপিটেন্সি’র একরকম থার্মাল রেডিয়েশন ও ভাইব্রেশন আছে। একজন ট্যালেন্টেড মানুষের চোখ-মুখের দ্যুতি, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, কন্ঠ্যস্বর, পদক্ষেপে তার ইনার জিনিয়াসের ছাপ পড়ে। টিমে ও প্রতিষ্ঠানে প্রচুর ট্যালেন্টেড মানুষের উপস্থিতির একটি ভাইব্রেশন আছে। আপনি একটু খেয়াল করলেই সেই ভাইব্রেশন অনুভব করতে পারবেন। বিস্তারিত না বলে শুধু অল্প কথায় বললে, জেনেটিক উত্তরাধিকার, সৃষ্টিশীলতা, পজিটিভ মানসিকতা, প্রবল ইচ্ছাশক্তি, স্থীর ফোকাস, অদম্য প্রচেষ্টার দৃঢ় মনোবল, জ্ঞান, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, পরিবেশের প্রভাব ও অভিজ্ঞতা-এই সব কিছু মিলে একজন মানুষের ভেতরে যে ব্যতিক্রমী এ্যাবিলিটি তৈরী হয়, সেটাকে আমি ট্যালেন্ট মনে করি।
একটি দেশে মেধা বা ট্যালেন্ট সংস্থান, বিকাশ ও বিস্তারের পন্থা আসলে কী-সেটা তো বড় বড় হাস্তিদের টকশো বয়ানের বিষয়। আমি ক্ষুদ্র মানুষ, আমি শুধু বলতে পারি, ব্যক্তি পর্যায়ে আপনি কী করতে পারেন-জ্ঞানচর্চা করুন-প্রচুর পড়ুন-বলুন-ভাবুন-এক্সপিরিমেন্ট করুন-অভিজ্ঞতা জানুন-মানুষের কথা শুনুন-বেড়ান-দর্শন করুন-অনুভব ও কল্পনা করুন-অংক, দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা চর্চা করুন
আমি জানি না, কতজন একমত হবেন, বা, এই বক্তব্যটি কতটা জেনারেলাইজড মনে হবে। Talent অথবা, Innovation এর যেকোনো একটির বা দুটিরই ওপর সম্ভবত একটি বা একাধিক বিশ্ব রেংকিং হয়, যেখানে সাম্প্রতিক জরিপে বাংলাদেশ অনেক পেছনে আছে বলে দেখানো হয়েছে। ইন জেনারেল বা ওভারঅল মেধার স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে-এমনটাই ওই রেটিংয়ের ভাষ্য।
এই দেশে মেধাশূন্যতার ভয়াবহ অভিঘাত আপনি টের পান কি? আমি তো পাচ্ছি। না পেলে আপনি হয় বোকা, নয় তো অতি সরল বান্দা। হ্যা, অবশ্যই তাহলে আপনি সুখী মানব। তবে, সত্যি করে ভাবুন তো, মেধার উন্মেষ ঘটাবার কয়টা প্রক্রিয়া আমরা সৃষ্টি, বিকাশ ও বিস্তার করেছি? অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হল, আমাদের একাডেমিক শিক্ষা কার্যক্রম (কোর্স, কারিক্যুলাম, সিস্টেম, প্রাকটিস, কালচার, প্রসিডিওর সবকিছু মিলে) বুদ্ধিমত্তা ও মানবিকতাকে প্রমোট করছে না। বরং, আমার মনে হয়, পারিবারিক বিন্যাস, কার্যক্রম, লাইফস্টাইল এবং তার সাথে একাডেমি-আমাদের শিক্ষার্থীদের জাতিগত সমষ্টিক বুদ্ধিমত্তা দিনে দিনে কমিয়ে দিচ্ছে। জাতীয়ভাবে একটি IQ রেটিং করতে পারলে বোঝা যেত তার ভয়াবহতা।
মোদ্দা কথা, যেটি বলতে চাই, তা হল, বুদ্ধিমান হোমোসেপিয়েনদের যেই মাত্রায় IQ, পার্সোনালিটি ও ক্রিয়েটিভিটি থাকার কথা, সেটি কমছে। দিনকে দিন। একাডেমি ও তার কার্যক্রম কোনো উপকার করতে পারছে না। ঠিক কী রকম অবনমন হচ্ছে, তার বিস্তারিত মনে হয়ে বলার দরকার পরে না। একটু কান পাতলেই আর চোখ খোলা রাখলেই অনুভব করতে পারবেন। [লেখার বাকি অংশে আমার নিজের ব্যক্তিগত কয়েকটি জিজ্ঞাসা স্থান পেয়েছে।
শুরুতেই বলে রাখি, আমার ধারনা ১০০ ভাগ সঠিক নাও হতে পারে। আর যেসব উদাহরন টানা হয়েছে, সেগুলো স্রেফ উদাহরন। আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রিজুডিসড নই। লেখাটি প্রকাশের পরে অনেকেই লেখাটির থীম ও বক্তব্য না বুঝে তীব্র ভাষায় মন্তব্য করতে শুরু করেন। তাদের কনফিউশন দূর করার জন্য পরে আমি ১,২ ও ৪ নম্বর পয়েন্টগুলোর আরেকটু ব্যাখ্যা করে দিই। সেই ব্যাখ্যাগুলো পরে মূল লেখাতেই সংযুক্ত হল।]
এক;
আমার এক আঙ্কেল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন একটি কলেজ হতে টেনেটুনে কোনমতে ডিগ্রী ও পরে এমএ পাশ করেন। তাও বোধহয় দু’বারের চেষ্টায় ডিগ্রী।
অতঃপর দীর্ঘকাল রাজধানীতে পশার জমাতে না পেরে গ্রামের এক বেসরকারী কলেজে শিক্ষকতার চাকরী। ঘটনাক্রমে কলেজটি সরকারীকরন হয়। আজ ১২ বছর পরে তিন ওই কলেজের প্রিন্সিপাল আর একজন ফার্স্টক্লাস অফিসার। প্রজাতন্ত্রের সবথেকে প্রেস্টিজিয়াস সোস্যাল স্ট্যাটাসে আছেন। তার সাক্ষর ও সীল দেবার অথরিটি আছে। তিনি পেনশন পাবেন, ঠ্যাং ভেঙে বা কাউকে ল্যাঙ মেরে বসলেও দীর্ঘকাল ছুটিতে থাকবেন, বেতন পাবেন, উৎসবে বোনাস পাবেন। তাকে কেউ চোখ রাঙালে সরকার তার হয়ে মাস্তানী করবেন। তিনি পরের বউ ভাগিয়ে নিলেও তার বিরুদ্ধে মামলা করতে সরকারের অনুমতি লাগবে। সব মিলিয়ে কলেজ হতে দু’বারের চেষ্টায় গ্রাজুয়েট হওয়া এবং ঢাকায় একটি সামান্যতম বেসরকারী চাকরীও বাগাতে না পারার মতো ব্যক্তিটি আজ প্রথম শ্রেণীর নাগরিক। সমাজের হোমরাচোমরা-সেটাও তার প্রতিভার বদৌলতে না, ত্রূটিপূর্ন সরকারী সিস্টেমের ফেরেবে।
আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে প্রথম শ্রেনীর মাস্টার্স করে সততা ও কষ্টসাধ্য প্রয়াসে জীবনে আমি একজন বেসরকারী চাকরিজীবি। বাসের হেলপারও পোঁছে না। রাষ্ট্রের বোধহয় ৪র্থ শ্রেনীর নাগরিক। তো সরকার কর্তৃক এই অন্যায্য পদায়ন ও সরকারীকরন করে তার যোগ্য নাগরিককে অবনমন আর হঠাৎ করে কারো কপালের ফেরে উর্দ্ধগমনের নীতি কেন?
একটি বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে যখন সরকারী করা হবে, তখন তার বিদ্যমান স্টাফরা বিদ্যমান সরকারী শিক্ষকদের মতো সমান যোগ্যতার কিনা-সেটা মূল্যায়নের কোনো পদ্ধতি কি রাখা হয়েছে? নাকি প্রতিষ্ঠান সরকারী মানে বাই ডিফল্ট তার সব সনাতন স্টাফ ও শিক্ষক সরকারী শিক্ষক মানে ফারস্ট ক্লাস? কী মূল্যায়ন ব্যবস্থা থাকল তাহলে শিক্ষার?
ব্যাখ্যা:
আমার জিজ্ঞাস্যটা হল, কেউ একজন সব ঘাটে যোগ্যতায় কুলাতে না পেরে একটি বেসরকারী কলেজে শিক্ষকতা নিলেন। সেখানে তিনি ফিট। ভাল পড়ানও। কিন্তু হঠাৎ করে কলেজটি সরকারী হল। তিনি সেই সরকারীকরনের ফলে তিনি নিজের যোগ্যতায় না, সরকারী সিস্টেমের যাঁতাকলে ফার্স্ট ক্লাস অফিসার হয়ে গেলেন। আমার আপত্তিটা এখানে।
একই কলেজে আরেকজন বিসিএস পাশ করে তার সাথেই লেকচারার। তো তার সহকর্মী যখন বিসিএস না করেই তার সমান হয়ে বসেন, সেটা মেধার অবমূল্যায়ন নয়? দু’বার ফেল করে তারপরও তার প্রথম শ্রেনীর নাগরিক বা সরকারী চাকরী পাওয়ায় আমার কোনো ক্ষেদ নেই। আপনি ভুল বুঝছেন। সত্যিটা হল, তিনি সব ক্ষেত্রে (শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও চাকরীস্থল) তার যোগ্যতায় কোনো জব নিতে না পেরে গ্রামে গিয়ে একটি বেসরকারী কলেজে শিক্ষকতার জব নিলেন। গ্রামের কলেজে আজ হতে ১২ বছর আগে কীভাবে জব হত, তা আশা করি আপনি জানেন। তো তারপর একদিন কলেজ ভাগ্যক্রমে সরকারী হওয়ায় ওই ভদ্রলোক বাই ডিফল্ট সরকারী শিক্ষক হয়ে গেলেন। তারও পরে সরকারী কলেজের নিয়মহীন নিয়মে তিনি ফুল প্রোফেসর হয়ে গেলেন। আমার আপত্তিটা এখানে।
তিনি যদি কলেজ সরকারী হবার পরে আবার বিসিএস দিয়ে নিজের যোগ্যতার প্রমান দিয়ে সরকারী প্রফেসর হতেন, আমার কোনো আপত্তি ছিল না। কিন্তু তিনি সরকারী চাকরীটা পেলেন, প্রফেসর হলেন স্রেফ সরকারী সিস্টেমের গলদে। আমার আপত্তিটা তার প্রফেসর হওয়ায় না, তার বাই লাক, সরকারী প্রফেসর হওয়ায়। দুই; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (স্রেফ উদাহরন) হতে আপনি মাস্টার্স করলেন, মনে করুন ইংরেজি সাহিত্যে। খুব কষ্টসাধ্য ও অধ্যবসায় লাগে ইংরেজিতে ভাল রেজাল্ট করতে।
আরেকজন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কলেজ হতে একই বিষয়ে মাস্টার্স করলেন। আরেকজন নরমাল ডিগ্রী পাশ করলেন ৩ বছরে। (আমার দু’জন পাঠক আমাকে এই অংশে একটি ভুল ধরিয়ে দিয়েছেন। বিসিএস দিতে হলে মিনিমাম অনার্স হতে হয়। ডিগ্রী পাসকোর্সে বিসিএস দেয়া যাবে না।আমি তাদের সংশোধনীর সম্মানে মূল লেখাটি এডিট করিনি। যাহোক আমার মূল বক্তব্য ঠিক রেখে বিএ পাশকে অনার্স দিয়ে রিপ্লেস করছি।) তিনজনই বিসিএস দিলেন। কোয়ালিফাই করলেন। চাকরী পেলেন একই ক্যাডারে। সবাই খুশি। কিন্তু আমি খুশি হতে পারছি না।
দেশের সর্বোচ্চ বিশ্ববিদ্যালয় হতে কষ্টকর ও পরিশ্রমসাধ্য উপায়ে ভাল রেজাল্ট করলাম। আর কোনো অখ্যাত বা গ্রামের কলেজে সহজসাধ্য পথে ৩ বছরের বিএ পাশ করলেন-দু’জনই রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে একই যোগ্যতার মানে ন্যুনতম যোগ্যতার। লিখিত ও ভাইভায় যদি সমানে সমানে পাল্লা না দিতে পারি, তবে আমার ওই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্স্ট ক্লাসের আলাদা কোনো মূল্য নেই, বিএ পাশ ক্যান্ডিডেটের বিপরীতে। নরমাল বিএ পাশেরও যেই দাম, আমার ৫ বছরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সও তা। তিনিও যেই পয়েন্ট, আমিও তা।
বাহ, শিক্ষার কত মূল্য?
ব্যাখ্যা:
আপনি নিশ্চই দেখেছেন, আমি যে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বলেছি আর বলেও দিয়েছি, নামটি স্রেফ উদাহরন হিসেবে ব্যবহৃত। কোনো বিশেষ বিশ্ববিদ্যালয়ই জ্ঞানের সেরা উৎস না, সেই সেরা না। তার ছাত্ররাও বাধ্যতামূলকভাবে দেশসেরা না। দেশের প্রচলিত প্রথা হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, রুয়েট, এনএসইউ’র মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেই গড়পড়তা দেশের সেরা মেধাবীরা ভর্তি হন। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। কিন্তু সেই সামান্য ব্যতিক্রমের ওপর ভরসা করে তো আর রাষ্ট্র চলে না। রাষ্ট্র চলে একটা গড়পড়তা নিয়মে।
দুই নম্বর পয়েন্টে আমি বোঝাতে চাচ্ছি, একজন মানুষ যেকোনো একটি সেরা ও মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় হতে গ্রাজুয়েশন করলেন যেটা বেশ কঠিন, কষ্টসাধ্য আর মেধার কাজ। আরেকজন যেকোনো একটি মানহীন কলেজ (ধরুন গ্রামের, যেখানে সমানে নকল বা বই দেখে পরীক্ষা দিয়ে তিনি খুব নরমাল বিএ পাশ কোর্স করলেন বা ধরুন, নকল না করেই পাশ করলেন। এই দুইজন প্রার্থীর দৃশ্যমান মেধা (যেভাবে জেনারেলি দেশে মেধার ক্রম নির্ধারিত হয় (নজরুল, রবী ঠাকুর বাদে), তাতে প্রথম প্রার্থী দ্বিতীয়জনের চেয়ে অনেক মেধাবী। অথচ বিসিএস ও যেকোনো সরকারী চাকরীতে আবেদনের মেরিট পয়েন্টে/ন্যুনতম যোগ্যতায় দু’জনই সমান। কোনো আলাদা পয়েন্ট প্রথম ব্যক্তি পান না। তার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের যোগ্যতা আর যেকোনো টেনেটুনে পাওয়া পাশ কোর্সের প্রার্থীর যোগ্যতা তো নিশ্চই সমান না। কিন্তু বিসিএস বা যেকোনো সরকারী আবেদনে তারা সমান।
এখন প্রথমজন যদি রিটেন আর ভাইবাতে দ্বিতীয় জনের চেয়ে ভাল বা সমান করতে না পারেন, তবে তিনি ফেল। দ্বিতীয় জন যিনি আজীবন যেকোনো বিচারে প্রথম জনের চেয়ে কম ছিলেন তিনি আর প্রথমজন কোয়ালিফাইং পয়েন্টে ও চুড়ান্ত স্কোরে একাডেমিক রেজাল্টে একই মূল্য পাবেন। প্রথমজন সামান্যতম প্রায়োরিটি বা বেশি পয়েন্ট পান না। তো তার সারাজীবনের অর্জিত শিক্ষার পয়েন্ট, তার প্রতিদ্বন্দ্বী থার্ড গ্রেড পাওয়া প্রার্থীর তুলনায় কী মূল্য পেলো? আমার আপত্তিটা সেখানে।
বলতে পারেন, ভাইবাতে, চয়েজের ক্ষেত্রে এক্সামিনাররা ওই প্রথমজনকে প্রেফার করবে। সেটাও তো একটা অন্যায়। তারা কেন স্রেফ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম দেখে একজনকে প্রেফারেন্স দেবেন।
তিন;
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ও ডাক্তারি পেশার ক্ষেত্রে উপরের পদে প্রমোশন পাবার কিছু সিস্টেম আছে। তার ভিতরে শিক্ষকদের জন্য আছে, লেকচারার দিয়ে শুরু করার পরে তার নির্দিষ্ট সংখ্যক গবেষনা, প্রকাশনা, লেকচার আওয়ার, ভিজিটসহ আরো কিছু নর্মস অর্জন করলে তাকে আস্তে আস্তে এ্যাসিসট্যান্ট, তারপর এ্যাসোসিয়েট ও তারও পরে প্রফেসর প্রমোশন দেয়ার ব্যবস্থা। ডাক্তারদেরও যতটা জানি, এফসিপিএস, এফআরসিএসসহ ওই একই রকম গবেষনা, প্রকাশনা, প্রাকটিস আওয়ার এর মতো বেশকিছু নর্মস অর্জন সাপেক্ষে উপরের সিনিয়র পদে যাবার ব্যবস্থা।
এখন কনসেপচুয়ালী প্রোফেসর, ডাক্তাররা আমাদের খুব সম্মানিত (আমার মতে সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী) পজিশনের পেশাজীবি। তাদের এত এত জটিল ও কঠিন পদ্ধতিতে মূল্যায়িত হয়ে তারপর কোয়ালিফাই করে সিনিয়র হতে হয়। সরকারী প্রশাসনে যারা প্রথম শ্রেনী বা দ্বিতীয় শ্রেনীর জব করেন, তাদের উপরের পদে প্রমোশন পেতে কোনো নর্মস লাগে কি? নাকি স্রেফ বছর পার করতে পারাই একমাত্র যোগ্যতা-আমার জানা নেই। যাহোক, আমার লক্ষ্য শুধু শিক্ষকরা। প্রফেসররা।
সরকারী কলেজের একজন লেকচারার হতে প্রফেসর হতে গেলে তাকে ওই নির্দিষ্ট সংখ্যক গবেষনা, প্রকাশনা, লেকচার আওয়ার, ভিজিটসহ আরো কিছু নর্মস অর্জনের কোনো বাধ্যবাধকতা বা পরীক্ষা দিতে হয় কি? আমার জানামতে না। নির্দিষ্ট বছর চাকরী করলেই হয়। তাহলে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষকরা কঠিন পরীক্ষা দিয়ে প্রফেসর হতে হবে, আর কলেজের শিক্ষকরা বছর পার করতে পারলে প্রফেসর হবেন-মানে আলটিমেট এ্যাচিভমেন্ট সমান হবে, একই স্ট্যাটাসে থাকবেন, এ কেমন বিচার? মেধাকে মূল্যায়নের সিস্টেমই তো আমরা রাখিনি।
চার;
সকলেই আমরা জানি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা প্রায় বিনামূল্যে। মানে প্রায় সিংহভাগটাই সাবসিডাইজড। রাষ্ট্র তার নিজস্ব দায় ও প্রয়োজন (রাষ্ট্র’র জন্য উচ্চমানের নাগরিক ও কর্মী সৃষ্টির লক্ষ্যে) হতে বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবসিডি দিয়ে কয়েকশত সাবজেক্টে শিক্ষার্থীদের গ্রাজুয়েশন ও মাস্টার্স করায়। উদ্দেশ্য বিভিন্ন সাবজেক্টে জ্ঞানী ও যোগ্য ব্যক্তি সৃষ্টি করা। তা হতে পারে সাহিত্য হতে বায়োমেকানিকস। সুতরাং এটাতো কাম্য, রাষ্ট্রের অত্যন্ত মূল্যবান অর্থ যা গরীব জনগনের ট্যাক্সের টাকায় অর্জিত হয়, তা যখন এভাবে অকাতরে আমরা ব্যয় করি, তার উদ্দেশ্য থাকে, রাষ্ট্রের সার্বিক কল্যানে বিভিন্ন সাবজেক্ট ও টপিকে দেশকে এক্সপার্ট উপহার দেয়া। কিন্তু এই খরচ ও শ্রমের বিনিময়ে সৃষ্ট মেধাবীদের একটা বড় অংশ বিসিএস ও অন্যান্য সরকারী চাকরীতে ইন্টারভিউ দেবার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করে যায়। উদ্দেশ্য যেকোনো একটা সরকারী চাকরী বাগানো। তাদের খুব সামান্য সংখ্যকই সেটা পায়।
তো যারা পান, তাদের প্রায় ৯৯%ই তাদের সাবজেক্ট রিলেটেড কোনো জবে ঢোকেন না। দেখা যায়, বায়োমেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, সে চাকরী করতে ঢুকল কাস্টমসে। আবার বিবিএর ছাত্র। সে চাকরীতে ঢুকল পুলিশে। তাহলে এই যে বিগত ৫ বছর রাষ্ট্র তার পেছনে বিবিএ পড়াতে অর্থ লগ্নি করল, তার কী মূল্যায়ন হল? রাষ্ট্র নিজেই কি তার অর্থ জলে ঢালার আর মেধাকে অবমূল্যায়িত করার ব্যবস্থা করেনি?
ব্যাখ্যা:
হুমায়ুন বা নিউটনের বিষয়টা আমি অবশ্যই মানি। যে কেউ যেকোনো স্থানে বড় হতেই পারে। যেমন স্টিভ জবস, বিল গেটস। কিন্তু আমরা সেই দুয়েকটি ব্যাতিক্রমকে কিন্তু ব্যাতিক্রমই বলি। সার্বিকভাবে আমরা কিন্তু প্রচলিত নিয়মের ওপর ভরসা করি। সেটা হল রেটিঙ, গ্রেডিঙ, পরীক্ষা, মার্কস এগুলো। এখন আপনিই বলুন, আমরা স্টিভ জবসের মতো মেধা খুঁজে বের করে দেশ চালাতে পারব? একটা বড় সিস্টেম সেভাবে বাঁচে? নাকি, একটা গড়পড়তা জেনারেল সিস্টেম রাখব, সেই সিস্টেমে যারা মেধাবী হিসেবে বের হবে, তাদের কাজে নেব?
সারাদেশে কয়েকহাজার বিল গেটস নিশ্চই আমাদের আছে। এখন আমরা কি সেই বিল গেটসদের লুক্কায়িত মেধা টেনে বের করে, অনুসন্ধান করে সত্যিকারের মেধার মূল্যায়ন করছি-টাইটেল দিয়ে তাদের জবে নিতে পারব? একটা বিশাল রাষ্ট্রীয় সিস্টেম সেভাবে কাজ করে? কারোরই কোনো কিছুতে শাইন করতে নির্দিষ্ট কোনো সাবজেক্টের বিদ্যা থাকা মাস্ট নয়। হ্যা, রিলিভ্যান্ট বিদ্যা থাকলে তিনি ওই বিষয়ে ভাল করবেন, এটা পৃথিবীর গড়পড়তা বা জেনারেল রীতি। বাকিটা যে উদাহরন আছে, সেটা ব্যাতিক্রম। ব্যাতিক্রমের উপর ভরসা করে রাষ্ট্রীয় সিস্টেম বা প্রথা নির্ধারন সম্ভব না।
তারপরও বলছি, আমি বলছি না, নির্দিষ্ট সাবজেক্টে পড়লে সেই সাবজেক্ট রিলেটেড জবে না ঢুকলে দেশের বিরাট ক্ষতি বা নির্দিষ্ট জবে যেতে নির্দিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনা থাকতেই হয়। আমি যেটা জানতে চাই, তা হল, একটি দেশে ধরেন ১৫ টি সাবজেক্ট বা টপিক নিয়ে গোটা দেশে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রাজুয়েশন ও মাস্টার্স করানো হয়। তার মানে হল, ওই দেশ মনে করছে, ওই ১৫ টি বিষয়ে পড়াশোনা করা মানুষ তার দেশের বিভিন্ন সেক্টরে দরকার। সেই লক্ষ্য নিয়েই সে ওই ১৫ টি বিষয়ে গ্রাজুয়েট সৃষ্টির জন্য বিশাল অঙ্কের টাকা সাবসিডি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় চালায়।
এখন দেশে যদি সিস্টেমই থাকে, ওই পড়াশোনার সুযোগ পাবে যে কেউ, আর সেই সুযোগটা কাজে লাগাবে, স্রেফ “চাকরী পাবার ন্যুনতম যোগ্যতা অর্থাৎ গ্রাজুয়েশনকে সরকারী খরচে (প্রায়) করে ফেলতে, আর কোনোমতে গ্রাজুয়েশন শেষ করে যেকোনো জবে ঢুকে যেতে, তবে রাষ্ট্র কেন ওই শিক্ষার পেছনে বিরাট অঙ্কের টাকা সাবসিডি না করে, গোটা দেশে একটাই সাবজেক্ট রাখে না যার নাম হবে “বিসিএস”।
কেন সে ইতিহাস, সাইকোলজি, পালি, সংস্কৃত, বাংলা, ইসলামিক স্টাডিজ, শান্তি ও সংঘর্ষ-এই অপ্রচলিত ও জব ননরিলেটেড বিষয়গুলো পড়াচ্ছে? আমি মানছি, একজন ফিজিক্সের ছাত্র অবশ্যই সুযোগ পেলে ও চেষ্টা থাকলে ভাল পুলিশ হতেই পারেন, কিন্তু তাকে তাহলে ফিজিক্স পড়ানো কেন? ফিজিক্স রিলেটেড জব যদি রাষ্ট্র তার জন্য নাই পয়দা করতে পারে, তবে তাকে ফিজিক্স পড়ানো কেন? সে বাইরে চলে যাবে আর দেশের জন্য বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয় বা কোনো প্রাইভেট অফিসে চাকরী করে রেমিট্যান্স পাঠাবে-সেজন্য? স্রেফ টাকা আয় করা?
আমি যারা পড়ছেন আর পড়ে অন্য জব নিচ্ছেন, তাদের দোষ দিচ্ছি না। তারা অপারগ। কিন্তু রাষ্ট্র কেন যেই বিষয়ে তার জব নেই, যেই বিষয়কে সে কাজে লাগাতে পারবে না, সেই বিষয়ের গ্রাজুয়েট পয়দা করতে কাড়ি কাড়ি রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় করবে?
আবারও বলছি, আমার ভুলও হতে পারে। বোদ্ধারা সঠিক তথ্য দিতে পারবেন। কেউ কি একটু ব্যাখ্যা করতে পারবেন, আমি ঠিক বলছি কিনা?
আর যদি ভুল বলে থাকি, তবে সঠিক তথ্যটিও দেবেন?
#whatistalent #education #merit #evaluation #degree #government #nationalization #GenerationZ #GenZ #millennialgeneration #generationgap #clashofgeneration #deviationofgeneration #deviationofnation #deviationofcountry #socialdeviation #nationalinteligence