ব্যক্তিগতভাবে আমাদের সবারই নিজস্ব কিছু শক্তির দিক থাকে। একইভাবে সবারই থাকে কিছু ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা। আমার অসংখ্য সীমাবদ্ধতার একটি হল, দুর্বল রিফ্লেক্স। তার জন্যই কিনা জানি না, আমার ফেস রিকগনিশন ক্ষমতা এবং ফেস মেমোরি রিকল করার ক্ষমতা খুবই দুর্বল। সেই সাথে আছে নাম মনে রাখতে না পারা আর কোনো স্থানের ভৌগলিক চিত্র ও রোড ম্যাপ মনে রাখতে না পারার সীমাবদ্ধতা। কী রকম?আমার ফেস রিকগনাইজ করা, ফেস লুক মনে রাখার ক্ষমতা এতটাই কম, যে, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে একই সাথে পড়েছি কিংবা একই হোস্টেলে দীর্ঘদিন থেকেছি, এমনকি কোনো কর্মক্ষেত্রে এক সাথে কাজ করেছি, অথবা কারো সাথে বিভিন্ন সময়ে পরিচয় হয়েছে, কাউকে ফেসবুকে অনেকদিন ধরে যোগাযোগের কারনে চিনেছি-এমন কারো ফেস মনে রাখতে পারি না।
আমি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ক্লাস করতাম কদাচিৎ। এমনও হয়েছে, আমার ব্যাচমেটদের সাথে পথে দেখা হয়েছে, আমি চিনতে পারিনি। হোস্টেলে থাকার সময়ে ক্যাম্পাসে হঠাৎ হঠাৎ গেলে কারো সাথে দেখা হলে দ্বিধায় পড়তাম, তাকে আপনি বলব, নাকি তুমি; কারন তিনি সিনিয়র, জুনিয়র নাকি মেট-মনে নেই। একবার এমনও হয়েছে, আমার রানিং মেট, পথে দেখা, আমি না চিনে আমতা আমতা করছি, আপনি আজ্ঞে করছি, সে আমাকে ধমক দিয়ে বলে, ”ওই মিয়া, আপনি আপনি করছ কেন?” আমি তাকে কী করে বুঝাই, দীর্ঘদিন ধরে দেখা না হলে আমি খুব পরিচীতদের চেহারাও ভুলে যাই।
সবচেয়ে বিপদে পড়ি, যখন কেউ মেকআপ করেন। আমার ভাগ্নি, বিয়ের এক অনুষ্ঠানে মেকআপ করে গিয়েছে, ছবি তুলেছে। আমার স্ত্রী সেই ছবি দেখানোর সময়ে আমি তাকে প্রশ্ন করে বসলাম, এই ছবির মানুষটা কে? শুনে সে হেসে মরে যায়। আমার ধারনা, সন্ধ্যায় বাসায় ফিরবার পরে দরোজা নক করলে যদি গিন্নী সেভাবে মেক আপ করে দরোজা খোলে, আমি দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়তে পারি, ঠিক বাসায় এসেছি কিনা-তা ভেবে। সিনেমা টিভির নায়ক ও নায়িকাদের আলাদা করে চিনতে, যেমন ধরুন, শ্রী সৌমিত্র বন্দোপাধ্যায়ের মতো তারকাদের পুরোনো দিনের তরুণ বেলার মূভি দেখিয়ে আমার স্ত্রী প্রায়ই আমাকে জিজ্ঞেস করেন, বলো তো, এই নায়ক কে? আমি আজতক বলতে পারিনি।তবে, দুঃখের বিষয় হল, চেহারা মনে রাখতে না পারলেও চেহারা চেনার ক্ষমতা আমার অস্বাভাবিকভাবে বেশি। লোকের চোখের ভাষা পড়ার, মনের ভাষা পড়ার, মানব চরিত্র ও সাইকোলজিকে লাইন বাই লাইন পড়ে ফেলার ক্ষমতা আমাকে ঈশ্বর উজাড় করে দিয়েছেন।
যাহোক, ঈশ্বর সব দিকে সবাইকে ঠকান না। নাম মনে রাখার ক্ষমতা আমার এর চেয়েও কম। নিয়মিত চর্চা বা ডাকাডাকির অভ্যাস না থাকলে আমি পরিচীত ও অতি পরিচীত-প্রায় সবার নামই ভুলে যাই। এমনও হয়েছে, কারো সাথে অনেক অনেক দিন পরে দেখা। তিনি আমাকে আগের পরিচয়ের অভ্যাস ধরেই কথা বলছেন। আমি তার নামতো মনে করতেই পারছিই না, তিনি কে-সেটা মনে করতেও খাবি খাচ্ছি। আমার পরিচীত জগতটা খুব ছোট। সেই জগতে যাদের চিনি, তাদের মধ্যে একই বা কাছাকাছি নামে অনেক মানুষ আছেন। ওনাদের ফোন করতে বা কোনো কিছুর জন্য ওনাদের সাথে যোগাযোগ রাখতে গিয়ে প্রায়ই ব্লান্ডার করি।
হয়তো ফোন করব ব্যাংকার কিবরিয়াকে। ফোন করে বসি জমিদার কিবরিয়াকে। কথাবার্তা অনেক দূর এগোনোর পরে জমিদার (জমির ব্যবসা করে-সেই অর্থে) কিবরিয়া বলে, ”ওয়ালিদ, তুমি বোধহয় ব্যাংকার কিবরিয়াকে চাইছিলে।” তখন মনে হয়, ধরনী দ্বিধা হোক, আমি সেখানে মোবাইল সমেত প্রবেশ করি। আমার দরকার লায়ক লায়ক চেহারার এমদাদ শিপলুকে। আমি ফোন করি সীম বিক্রেতা এমদাদ সুমনকে। ফোন করে বলি, এমদাদ, তোমাদের মাস্কগুলো কিনতে চাই। কবে দেবে? এমদাদ আকাশ হতে পড়ে। “ওয়ালিদ, তুমি কি লায়ক চেহারার শিপলু এমদাদকে মীন করছ?” কী মুশকীল।
এই ঝামেলা হতে মুক্তি পেতে ফোনে এখন নাম সেভ করি বিচিত্র সব টাইটেলে। কয়েকটা বলি-
এমদাদ শিপলু-Urmi Shiplu cameraman
এমদাদ সুমন-Banglalink Amdad
এমদাদ সুমন-Bagerhat Emdad
গোলাম কিবরিয়া-Kibria Bank
গোলাম কিবরিয়া-Robi Kibria@Peer shab
রায়হান হোসেন-Sufi Raihan dariwala
রায়হান মিথুল-Mithul@Choshma
রাহুল রায়হান-Huzur Rahul
ওই অনেকটা গালকাটা রমজান আর কানকাটা রমজানের মতো পন্থা আর কি।
এখানে যাদের ছবি দিলাম, এঁরা সবাই আমাদের একটি ব্যাচভিত্তিক ফেসবুক গ্রূপের সদস্য। প্রায়ই আমি এনাদের অনলাইন/অফলাইন কার্যক্রম ট্র্যাক করতে গিয়ে মহা দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ি। আপনাদের ভান্ডারে এমন দ্বৈততা নিয়ে কনফিউশনের হিস্ট্রি থাকলে তাদের জোড়ায় জোড়ায় মেনশন করতে পারেন।
কোনো একটা স্থানে একবার বা দু’বার গেলে সেই রাস্তা চিনে রাখা, কিংবা ওই স্থানটির সার্বিক চিত্র মনে গেঁথে রাখার কাজটি অনেকে ভাল পারেন। আবার কখনো ওই স্থানে যেতে হলে আর বলে দিতে হয় না। দশ বছর পরে গেলেও ঠিক চিনে নিতে পারেন। আমি পারি না।
এই তো, ২০০৯ সালে একটা বাসায় থাকতাম আমরা, গোঁপিবাগে। ২০১৯ সালে সেখানে ১০ বছর পরে যেতে গিয়ে পথ চিনছিলাম না। অথচ আমার স্ত্রী প্রথম চেষ্টাতেই চিনেছে। তবে এবার আসল কথাটা বলি।
আমার এই দুর্বলতা বা সীমাবদ্ধতা খুবই ন্যাচারাল। অনেকেরই এই সীমাবদ্ধতা থাকে। এটা ত্রূটি হলেও দোষ নয়। অন্যায় নয়। কিন্তু, আমাদের চারপাশে প্রচুর মানুষ আছেন, যারা খুব দ্রূত অতীত ভুলে যান, অতীতের সম্পর্ক, দায়, কৃতজ্ঞতা ভুলে যান। অতীতের ঘনিষ্ঠ বা কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ মানুষটির সাথে থাকা সম্পর্ক ও দায় ভুলে যান, চেহারাও ভুলে যান, নিজের অতীতও ভুলে যান। কদাচিত দেখা হলে, যোগাযোগ হলে, টিনের চশমা চোখে দিয়ে প্রশ্ন করেন, “আপনি কে যেন? আপনাকে কোথায় যেন দেখেছি।”
ফোনের লাইনের ওপাড়ের শীতল কন্ঠস্বরেই বোঝা যায়, তিনি চিনতে চাইছেন না, অতীতকে মনে করতে চাইছেন না।
আমার যেমন রিফ্লেক্স কম থাকায় ভুলে যাই। ওনাদের রিফ্লেক্স কম নয়, বরং প্রচন্ড চালাকী, আত্মকেন্দ্রীকতা, স্বার্থবোধ, উচ্চাশা ও রিফ্লেক্স থাকায় তারাও ভুলে যান, তবে সেটা ইচ্ছে করে।
বিজ্ঞজনেরা বলেন, অতীত ভুলে যেতে না পারলে, অতীতের দায় না ভুলতে পারলে জীবনে বড় হওয়া যায় না।
নষ্ট অতীতকে জানাও বিদায়, রেখো না মনে।
আজ দিন কাটুক গানে।
#illusion #mistake #confusion #duplication #overlapping #facememory #facerecognition