Skip to content

রাতের পথিক: গুলিস্তান হতে গুলশান-সিক্যুয়েল-১ ও ২

  • by

রাতের পথিক: গুলিস্তান হতে গুলশান-সিক্যুয়েল-১

আশা করছি শুনে অবাক হবেন না, যে, আমি এই আধবুড়ো বয়সে, ঢাকায় দুই কুড়ি বছর থাকার পরও গুলশান-১ আর গুলশান-২ কে আলাদা করে ডিটেক্ট করতে পারি না। খানদানি, অভিজাত ও আদি ভদ্দরনোকীয় কর্পোরেট এলাকা হল গুলশান। বাদবাকি আমরা যারাই যে এলাকার লর্ড হই না কেন, ঢাকার যেই ধন্বন্তরি এলাকাতেই বড় সাব বা সাপ হই না কেন, যতই আপনার অফিসের লাল দালান ২০ তলা হোক না কেন, ওগুলো সব ধইনচা। ওনলি গুলশান ইজ রিয়েল কর্পোরেট।

কয়েকদিন আগে গুলশান গিয়েছি। সেটা ১ নম্বর গুলশান, নাকি ২ নম্বর গুলিস্তান, তা জানি না। যাই হোক, গুলশান আর গুলিস্তান-সে এক নম্বরি হোক আর দুই নম্বরি, গুলশান তো। পুলিশ প্লাজার কোণা হতে ওদিকে বনানী মরাখোলার কাছাকাছি এলাকা, আর এদিকে বেরাকের দামী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের চিপা হতে ওদিকে নতুন বাজারের এঁদো গলির শুরু তক গুলিস্তান, থুককু, গুলশান। দেশের সবচেয়ে অভিজাত বস্তিটাও এই এলাকারই এক অভিজাত দ্বীপ লং আইল্যান্ডের ওপর অবস্থিত। সেখানে যেতে হয় মূল গুলশান ভূখন্ড হতে বাংলা ইয়টে করে। যাহোক।

গুলশান গিয়েছি। এক প্রিয় মেনটরের কাছ হতে বুদ্ধি ধার করতে। গুলশানের সীমানায় ঢোকার পরেই বুকে দুরু দুরু। কোন দুনিয়ায় এলাম বস! দালানের তলা গুনতে গিয়ে ঘাড় ব্যথা হয়ে যায়। ব্যাংকের লোনে বানানো প্যান্ট-শার্ট-লিবাস-অন্তর্বাসের ঝাক্কাস শো-রুম দেখলে নিজে। আমার মনে হল, আমি ম্যানহাটান কিংবা ডেট্রয়েট না হোক, লস এঞ্জেলেস মনে হয় এসেইছি। বিশ্বাস করুন, আমার নার্ভাস লাগতে লাগল। বারবার মনে হতে লাগল, ওহে গান্ডূ, তুই এই লং আইল্যান্ডে ঢুকছিস কেন? তোর পাসপোর্ট আছে? ভিসা নিছিস তো? এলাকায় নামলাম। রাস্তায় পা দিতেও ভয় করে। পাছে আমার চটিজুতো হতে গুলশানের ঝা চকচকে রাস্তায় ধুলা লেগে যায় আর তার জন্য জরিমানা গুনতে হয়। তবে এক ফুটপাতে হকারকে ঝুড়িতে করে মাস্ক বিক্রি করতে দেখে জানে পানি এলো, যাক, তাহলে আমি বাংলাদেশেই আছি। ভিসা না থাকায় অন্তত জরিমানা হবে না।

মেনটর বড় ভাই আমাকে নিয়ে একটা স্বর্গসম বাঁধা কপি (পড়ুন কফি) শপে গেলেন। বিশ্বাস করুন, ঢোকার সময় আমি তিনবার ঢোক গিলেছি আর চারবার আমার শার্টের ইন ঠিক করেছি। গলার কাছের শেষ বোতামটাও লাগিয়ে দিয়েছি। কফি শপে বসলাম। কফি শপের নাম নর্থ এন্ড, ওই যাকে আমরা ভূয়া কর্পোরেট পাড়ার লোকেরা উত্তর পাড়া বলি। ‘পাড়া’ অবশ্য একটা নোংরা স্থান বলে বিবেচীত হত আমাদের মফস্বলে। তো সেই উত্তর পাড়া কফি শপের পেছনে আবার একটা বড় পাতিশিয়াল, আই মীন, প্যাটিসেরী [প্যারিসের নকল], সেটার আবার নাম বাংলা করলে হবে বোধহয় গুড়া-গুড়া বা ঘোড়া ও ঘোড়া [ইংরেজিতে অবশ্য লেখা ছিল Horse & Horse]।

তো সেই গুড়া ও গুড়ার সাথের উত্তর পাড়া কফি শপে আধাঘন্টা ছিলাম। মেনটর ভাই আমার দরকারী তথ্য ও জ্ঞান অত্যন্ত বিণয় ও আগ্রহ নিয়ে যৌক্তিকভাবে বোঝালেন। ওর জন্যই তাকে ভালো লাগে। শ্রদ্ধা জাগে। তবে তার চেয়েও বেশি তাকে ভাল লেগেছে, এটা দেখে, যে, তার আত্মা এখনো গুলশানের ঝাকমারিতে বিক্রী হয়ে যায় নি।

পুরোটা সময়ই আমি অনুভব করেছি, আমি এই ঝা চকচকে রঙ্গের জগতে বহিরাগত, অচ্ছুৎ, অস্পৃশ্য। যতই পুরানো শু রং করে আর ফুটপাতের ভ্যান হুসেনের শার্ট পরে মাঞ্জা মেরে গুলিস্তানে, থুককু গুলশানের রিয়েল মাদ্রিদ অথবা রিয়েল কর্পোরেটে এসে একটা কফি শপে ঢুকে থাকি, আমি তো জানি, আমি ভুয়া কর্পোরেট বা ধইঞ্চা। ভিসা ছাড়াই গুলশান ‘ম্যান হাঁটেন’ এ এসে ঢুকেছি। সেখানে আবার কফিও খাচ্ছি। (কফি অবশ্য খাইনি। বড় বড় কফি শপে কফি না খেয়ে টেবিলে সামনে রেখে কথা বলাই কেতা।) বহুক্ষণ পরে একটা সিপ নেবেন আর উদাস নয়নে কাঁচের দেয়ালের বাইরে তাকিয়ে কথা বলবেন-এটাই গুলশানের কর্পোরেটের চল। প্রায় ফিসফিস করে কথা বলেছি, যাতে রিয়েল বেতিস, মানে রিয়েল মাদ্রিদ, থুককু, রিয়েল কর্পোরেটের বাসিন্দারা আমার গেঁয়ো ইংরেজি শুনে হেসে না দেয়। ছোটলোকদের আত্মসম্মানবোধ আবার প্রবল। কাজ শেষ করে উর্দ্ধশ্বাসে বের হয়ে আমার পল্লীর কর্পোরেট পাড়ায় ছুট।

ওহ, যথারীতি বিল দিয়েছেন বড় ভাই মেনটর। উত্তর পাড়া কফি শপের বিল দেবার মতো মানিব্যাগ আমার কই? ধন্যবাদ বড় ভাই। উত্তর পাড়ার কফির বিল আমি দিলে মাসের বাকি দিনগুলো উপোস দিতে হত। পকেটের পয়সা খরচ করে আমাকে আমার উপদেশ ও তথ্য দিয়ে যে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করলেন, তার শোধ কী করে দেব জানি না। আপনার এই ঋন আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না।

এই লেখার মধ্যে যারা ইর্ষা কিংবা ইনফেরিওরিটি ডিসঅর্ডারের গন্ধ খুঁজবেন, তাদের বলি। আমরা যারা গাঁও গেরাম হতে ধুলো মাটি পায়ে নিয়ে, গতরে, জামায় এক রাশ ময়লা ধুলো নিয়ে একদিন গাবতলি বা সদরঘাটে এসে নেমেছিলাম, আর তারপর মাটি কামড়ে পড়ে থেকে, আধপেটা খেয়ে, হলের ডালে ওযু করে করে আজকে যাহোক কিছু একটা হয়েছি, তারা এখনো ওই মফস্বলীয় আঁশটে গন্ধ গা হতে মুছতে পারিনি। আমরা যতই বাবু সাপ হয়ে সভা সমিতি ও প্যাটিসেরী মাতাই না কেন, রিয়েল অ্যারিস্টোক্রেট ও জেনুইন কর্পোরেটদের ভীড়ে আমাদের ঠিকই ভূয়া ভূয়া লাগে। আমরা যে ইনফেরিওর, সেটা চোখে ঠিকই লাগে। কাক কি কখনো পুচ্ছ লাগালে ময়ুর হয়?

তবে সুখের বিষয় হল, উত্তর পাড়া গিয়ে মনটা দমে ছিল। পরের দিন সকালে অফিসে যাবার জন্য রেডি হয়ে বসেছি, নিটোল পান্তা ভাতের গামলাটা হাতে দিল, পান্তার সাথে বহুমূল্য পেঁয়াজের টুকরোটা ডলতে ডলতে টিভিতে খবর দেখতে দেখতে একটা খবরে চোখ আটকে গেল।

খবরে প্রকাশ:-

ওই দিন যখন আমি উত্তর পাড়া কফি শপে বসে ঘামছিলাম, তার ঘন্টা দুয়েক পরেই নাকি পুলিশের ডেঁপো ব্যাদ্দপ একটা দল ঘোড়া ও ঘোড়া তথা আবুলের ভাতের হোটেলে হানা দেয়। তারা সেখান হতে ভাতের গামলা না পেলেও দুইশো বোতল মদিরা, দেড়শোর মতো বোতল বিয়ার আর শিশা আটক করেছে। ঘোড়া ও ঘোড়া হোটেল হতে ঘোড়া আটক হয়নি সেটা অবশ্য অবাক কান্ড। তা, সেই ঘোড়া ও ঘোড়া, আই মীন Horse & Horse রেস্টোর‌্যান্টখানা আবার জনৈক বিদেশীনি বাঙালির। তার বিখ্যাত পিতা আবার দাবী করছেন, তার কণ্যার পার্টনার প্রতারনা করে সেই ঘোড়া ও ঘোড়া হোটেলে জাবের (বিশেষ ধরনের অশ্ব খাদ্য’র নাম জাব) বদলে মদিরা ও বিয়ারের ব্যবসা করেছেন। তার কণ্যা নিস্পাপ। সব দোষ নন্দঘোষের।

ওই খবরখানা দেখে আমি আমার বিপুল ইএসপি ক্ষমতা আরেকবার আবিষ্কার করলাম আর ওই দিন কেন এত ঘামছিলাম, তার কারনটা তখন বুঝলাম। বউকে ভয়ে আর বলি নাই, যে, ওই ঘোড়া ও ঘোড়ার আস্তাবলে ওই দিন ঘন্টাখানিক আগেও আমি বসে বসে কফি দেখছিলাম। বললে পরের সাতদিনের পান্তা আর কপালে জুটবে না।

রাতের পথিক: গুলিস্তান হতে গুলশান-সিক্যুয়েল-২:

দেশ উদ্ধারের জন্য যেসব সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ওয়েবিনার, কনফারেন্স, টক-শো’তে কখনো দেখেছেন, যে সমস্যা নিয়ে বিপুল গবেষনা বা আলোচনা হচ্ছে, তার সাথে জড়িত প্রান্তিক, মাঠের মানুষকে হাজির করে কথা বলাতে?

টিভিতে টকশো হচ্ছে ঢাকার রাস্তায় অটো-রিক্সা নিয়ে। বিশাল বিতর্ক। সেখানে বিশেষ+অজ্ঞ আছেন, নগরবীদ আছেন, যাত্রী আছেন, গাড়ি মালিক আছেন, নাচনেওয়ালিও আছেন একজন। নেই শুধু একজন অটো রিক্সাওয়ালা। তার কথা বলবার সুযোগ নেই।

আন্তর্জাতিক সেমিনার হচ্ছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে। কোটি টাকার ইভেন্ট। লোভনীয় খাওয়াদাওয়া। দেশ বিদেশের সব বিশেষ+অজ্ঞরা সেখানে টেবিল চাপড়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে ঝড় তুলছেন। সেই সেমিনারে ১ জনও রোহিঙ্গা শরনার্থীকে এনে তার কথা শোনার ব্যবস্থা থাকবে না।

যৌনকর্মীদের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য সিম্পোজিয়াম হয়। কোটি টাকা বাজেটের ইভেন্ট, পাঁচ তারকা হোটেলে খানাপিনা। ৯০ পদের বুফে। হোমরাচোমরা বিশেষ+অজ্ঞরা আসেন। এন.জি.ও মালিক আসেন ল্যান্ড ক্রূজারে। নারী অধিকার কর্মী আসেন রেঞ্জরোভারে। রাজনীতিক থাকেন সেখানে। থাকেন না কেবল ৫ জন যৌনকর্মী। থাকলেও আবার আলোচনায় অংশ নেবার, বক্তব্য দেবার সুযোগ নেই তাদের।

এই যে একেকটা ইস্যুতে, টপিকে, ফোকাসে প্রতিদিন দেশটাতে কোটি কোটি টাকার সভা-সমিতি হয়, পাঁচতারকা হোটেলে বুফে হয়, সেখানে ওই সমস্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষরা, প্রান্তিকের প্রান্তজনেরা কখনো অংশ নেবার, কথা বলবার সুযোগ থাকে না। যৌনকর্মী ববিতার ভাগ্যোন্নয়নের বিশাল সুপারিশমালা আর প্রকল্প আয়োজিত হয় ববিতার অগোচরে। ববিতার যৌ…..ঙ্গের স্বাধীনতা নিয়ে বাৎচিত করেন বড় বড় আধিকারীকেরা। ববিতাকে ছাড়াই নির্ধারিত হয়ে যায় শহরের এলিট এরিয়া হতে ব্রোথেল অপসারনের মহান সিদ্ধান্ত। প্রাইভেট চাকরিজীবির মতামত, সরাসরি অংশগ্রহন ছাড়াই নির্ধারিত হয়ে যায় প্রাইভেট জব ওয়েলফেয়ার প্ল্যান।

এ যেন গরুদের ভাগ্যোন্নয়নের কৌশল নির্ধারনী সভায় গরু জবাই করে ভুড়িভোজের মতো।

রুট, গ্রাউন্ড, ফিল্ড, মাস-তথা প্রান্তিক মানুষ বা বাস্তবতাকে গোণায় না ধরে, ইগনোর করে, উহ্য রেখে, পাত্তা না দিয়ে যে কাজ বা কথাই বলুন না কেন, যত উন্নতির প্লান করুন না কেন, যতই ঢাক ঢোল পেটান না কেন-তার ফলাফল খুব একটা আশাপ্রদ না। বুগান্ডেশে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বরাবরই পাদপ্রদীপের আলোর বাইরে। সবচেয়ে হাস্যকর হল, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও ‘জনগন’ এর স্বর্গপ্রাপ্তির সেমিনারে প্রান্তিক জনগনকে কখনো রাখা হয় না। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে নিয়ে বড় বড় সভা হয়, সেমিনার হয়, কোটি টাকা বাজেটের সম্মেলন হয়, যেই সেমিনার বা কর্মশালায় প্রান্তিক বা পিছিয়ে পড়া মানুষদের কথা বলবার কোনো ব্যাপার নেই। 

বাংলাদেশের কর্পোরেট জগতটা নিয়ে ভাল কাজ, ভাল কথা, ভাল উদ্যোগ, ভাল আচার, ভাল সুযোগ, প্রমোশনাল বা ইনসপিরেশনাল উদ্যোগের ফোকাস বা স্পটলাইট কেন যেন সবসময়ই নির্দিষ্ট কিছু সেক্টর বা সেগমেন্টে আটকে থাকে।

যত আলোচনা, যত হুল্লোড়, যত বড় বড় কথা বা হাত তালির প্রায় সবই হাতে গোণা কয়েকটা সেক্টর বা সেগমেন্টকে নিয়ে। এই হুল্লোড়ে দেশের প্রান্তিক বা মাস প্রফেশন ও সেক্টর একদমই স্মরনের বাইরে।

আমি যদি আরেকটু খোলাসা করে বলি, তাহলে যেমন উদাহরন হিসেবে বলতে পারি RMGর কথা। এত বড় একটা সেক্টরের মানুষরা আমাদের কর্পোরেট স্মরনের আওতার বাইরে। দেশ উদ্ধারের যত কর্মযজ্ঞ, সেখানে তাদের কেউ ডাকে না। যাবতীয় কর্পোরেট সুশীলতায় তারা উপেক্ষিত, তাদের নামটাও অনুপস্থিত। উত্তরপাড়ার পশ কর্পোরেটদের নানা আয়োজনে, নানা ঘোষনায়, নানা রকম শাউটআউটে তাদের ছিটেফোঁটাও নেই। 

অ্যাজ ইফ, তারা এক্সিস্টই করে না। অ্যাজ ইফ, তাদের বিপুল অর্থনৈতিক অবদান, তাদের বিপুল কর্মীবাহিনি, তাদের ইর্ষণীয় ক্যারিয়ারিজম, পে-স্কেল-সেগুলোর কোনো কর্পোরেটীয় স্বীকৃতি নেই কর্পোরেটের ব্র্যান্ড প্রমোটারদের কাছে। যেখানে অনেক পছন্দের সেক্টরের ম্যানেজারের চাকরি বদলের পোস্টও নিয়ম করে প্রমোট করা হয়, সেখানে এই Mass সেক্টরের, এই ব্রাত্য সেক্টরের CEO বা CPO’র নতুন জয়েনিং বা নতুন জবের খবর কখনো ওইসব চ্যনেলে বাতাস পায় না। কর্পোরেটের নানা ভাল-মন্দে ওইসব চ্যানেলের অ্যান্টেনা সচল হয়ে ওঠে না।

’CORPORATE’ এই ট্যাগটা যেসব প্রমোটিং প্ল্যাটফরম বা সুশীল সংগঠনের নামের সাথে লেজের মতো আছে, তাদের এই MASS বে ব্রাত্য করে রাখার, এই প্রান্তিককে গোণায় না ধরে সুশীলতা চর্চার রহস্য কী? যেই সেক্টর কমবেশি ৩০-৪০ লক্ষ কর্মীর বাজার, যেই সেক্টর ৪০-৫০ বিলিয়ন ডলার এক্সপোর্ট টার্নওভার নিয়ে চলে, তেমন একটি সেক্টরকে সুশীলতা চর্চার বাইরে রেখে কর্পোরেট মুভমেন্ট কি পঙ্গুতার নামান্তর না? আমি স্রেফ উদাহরন হিসেবে RMG’র কথা বলেছি। বাস্তবে ওরকম আরও আছে।

আমাদের কর্পোরেট ব্র্যান্ডাররা দেশের প্রান্তিক ও ব্রাত্য সেগমেন্টকে তাদের অ্যান্টেনায় ধরতে পারবেন কবে হতে?

শুনেছিলাম, ‍বৃটিষ আমলে নাকি ক্লাব ও অন্যান্য অভিজাত স্থানগুলোর দরোজায় লেখা থাকত, “নো ডগস অ্যান্ড ইন্ডিয়ানস অ্যালাওড হিয়ার।”

আজ হতে বহু বছর আগে। অফিসের একটি কাজে একদিন ঢাকার সবচেয়ে অভিজাত ক্লাবগুলোর একটিতে আমাকে যেতে হয়েছিল। যথারীতি পারটিকুলার নাম বলছি না।

আমার যেহেতু জানা ছিল না, বিধায়, আমি আমার অভ্যাসমতো জিন্স, পোলো শার্ট এবং কেডস পায়ে চলে গিয়েছি। মূল গেইটে গাড়ি থাকায় না আটকালেও রিসেপশনে আমাকে আটকে দিল।

এই গেট-আপে আমাকে ভেতরে যেতে দেয়া যাবে না। এটাই তাদের নিয়ম।

আমি তো পড়লাম মহা-ফাঁপড়ে। যে আমি জিন্স, বুট, টি-শার্ট পরে অফিস করি, সে কিনা আজকে শেখ সাদি সাহেবের মতো পোশাকের জন্য আটকা পড়বে? আর, এই মহাস্থানের এত কাছে দীর্ঘকাল বসবাস করেও এই নিয়ম কেন আমি জানতাম না-সেটাও দুঃখজনক।

পরে অবশ্য আমার নিয়োগকর্তা এসে আমাকে উদ্ধার করেছিলেন। তিনি সেখানকার হোমরাচোমড়া।

এই নিয়ম সম্ভবত বাদবাকি ‘কেলাবেও’ রয়েছে। ঢাকার পাঁচ তারকা হোটেলে আছে কিনা জানি না। তবে, আমি নিশ্চিত, লুঙ্গি ও ফতুয়া পরে ওখানে গেলে আমাকে ঢুকতে দেবে না।

প্রশ্ন হল, অভিজাত ক্লাবগুলোর এই ড্রেসকোডকে আপনি কীভাবে দেখেন?

১. এটা কি ব্যক্তিগত চৌহদ্দিতে একটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্রাইভেসি ও কোড হিসেবে ঠিক আছে বলে ধরে নেয়া হবে?

২. নাকি এটাকে এক ধরনের বর্ণবাদ, ক্লাস কনফ্লিক্ট, শ্রেনীবৈষম্য হিসেবে দেখা যেতে পারে?

সেই সাথে, ঢাকার কিছু কিছু এমপ্লয়ার প্রতিষ্ঠানে ডিফল্ট কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের, এমনকি, কিছু নির্ধারিত ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থীদেরই ডিফল্ট হায়ার করবার সংস্কৃতি নিয়েও বলতে পারেন।

আজ হতে বছর খানিক আগে গুলশান গিয়েছিলাম এক বড় ভাইয়ের কাছ হতে জ্ঞান ধার করতে। বড় ভাইকে Tag করতে পারছি না। তিনি আমাকে ’উত্তরপাড়া হোটেলে’ কফি খাইয়ে জ্ঞান দিয়েছিলেন। সেদিন ওই শিক্ষাসফর হতে ফিরে রাতেই উত্তর পাড়ার জেনুইন কর্পোরেট আর আমাদের ময়ূর পুচ্ছ লাগানো কর্পোরেটর তুলনামূলক চিত্র নিয়ে একটা ’আযগাই’ লেখা লিখি। Real কর্পোরেট পাড়ায় গেলে যে ভয়ানক Inferiority Feeling হয়, তা নিয়ে ভরপুর ওই লেখা। মনে মনে স্বপ্ন তবু, ইশশশশশশ, যদি Real কর্পোরেটে যেতে পারতাম! ইশশশ! উত্তরপাড়া হোটেলে কফি খেয়ে গাল না পুড়লেও মনটা অনেকদিন পুড়েছিল।

অনেক মাস পরে সম্প্রতি এক রাতে আবার গেলাম গুলশান। সময় রাত ৮ টা। গুলশান। কর্পোরেটের ‘উত্তর পাড়া’। ‘পাড়া’ শব্দটি যদিও আমাদের গ্রামদেশে একটি স্ল্যাং।

মূল কাজ শেষ করে নিটোল আর আমার ক্ষুধা লেগে গেল। এর আগে একবার এসে কোনো এক তস্য গলিতে চিপার কোণা দিয়ে একটা ’আবুল ভাতের হোটেল’র মতো ‘চা-গরম কাম ‘পুরি’র দোকান চেখে গিয়েছিলাম। আগেরবার একটু ভয়ে ভয়ে রয়ে সয়ে খেয়েছিলাম, কারন, চাগারামের ওপাড়েই আরেক বড় ভায়ের বিশাল সওদাগরি ব্র্যান্ড কর্পোরেট অফিস। তার সামনে পড়ে গেলে পুরোনো মধ্যবিত্ত প্রেস্টিজটা পাংচার হয়ে যেতে পারে। এবার আর সেই ভয় নেই। বড়দা মতিঝিলের বনেদি কর্পোরেটে মোটা মাইনেতে ‘মাইগ্রেট’ করেছেন।

এবারও খুঁজেপেতে সেই তস্য গলির ‘পুরি’র দোকান বের করলাম। (যেই আমি গুলশান-১ ও গুলশান-২ এখনো আলাদা করতে পারি না) সেই আমি পুরির দোকান খুঁজে বের করতে পারলাম সহজেই। প্রয়োজন হল আবিষ্কারের আম্মাহুজুর। অতঃপর ভুখা দুই নর ও নারী বেশ কয়েকখানা ‘পুরি’ উড়িয়ে দিলাম। কাগজের ঠোঙায় পরিবেশন, করোনাযুক্ত হাতে খেয়ে পুরোনো খবরের কাগজের জড়িমনির খবরযুক্ত টুকরো দিয়ে হাতের তেল মর্দন।

শুনেছিলাম, শরৎ বাবু বলেছিলেন, “ঈশ্বর থাকেন ওই ভদ্রপল্লীতে।” গুলশানের মতো ভদ্রপল্লীতে কীভাবে এক তস্য গলির ভেতরে ‘পুরি’র দোকান খোলা হয়েছে-জানি না। খেতে দারুন। অন্তত গরীবের পেটের জামিনটা হয়ে যায়। মাত্র ২৫-৩০ টাকায় পেট হুশ, দিল খুশ, গেরস্ত বউও টুশ টুশ। ছবিখানা দোকানীর অনুমতি সাপেক্ষে তোলা। পরের দিনের ‘পোট্যাটো চ্যাপ’-মানে আমাদের আলুর বড়ার মালমশলা তৈরী হচ্ছে। কেজিখানেক শুকনো লঙ্কা ভাজা হচ্ছে। বাতাসে তার ঝাঁঝালো সুঘ্রান। তার চিত্রই আমাকে আকৃষ্ট করল।

তাই ক্লিক ক্লিক-রাতের পথিক।

#aristocracy #corporate #genuine #glossy #pride #vanity #glamour #lavish #obscure #lowercast #dhakaatnight #nightriders ##aristocracy #corporate #genuine #glossy #pride #vanity #glamour #lavish #obscure #realcorporate #genuinecorporate #blueblood #corporaterecognition #corporatecult #relevance #marginalpeople #marginalclass

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *