Skip to content

সিদ্ধান্ত প্রনয়ন প্রক্রিয়া হিসেবে কমপারেটিভ চয়েসের ব্যবহার

  • by

আপনারা যারা আমার হাবিজাবি লেখার সাথে পরিচিত, তারা হয়তো খেয়াল করে থাকবেন, যে মাঝে মধ্যেই হঠাৎ করে  আমি কিছু  প্রশ্ন অথবা জিজ্ঞাসা পোস্ট করে থাকি যে পোস্টগুলোতে মোটামুটি প্লটগুলো এমন থাকে, যে, ধরুন, দুটো মানুষ বা দুটো বস্তু বা দুটো কনটেক্সটের ভেতরে  কোন মানুষটি বা বস্তুটি  বা কনটেক্সটি বেছে নেয়া উচিত।

এই পোস্টগুলো করবার পেছনে আমার একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকলেও এবং মোটামুটি এই পোস্টগুলোতে পাঠকরা কম-বেশি রেসপন্ড করলেও, মজার বিষয় যেটি ঘটে সেটি হল, কিছু কিছু পাঠক মূল পোস্ট, তার থিম বা ব্যাকগ্রাউন্ড-এসব কিছুর বাইরে গিয়ে বলে বসেন,

”না, আমি হলে এর কোনটাই করতাম না। আমি আসলে করতাম অমুকটা।”

আবার কেউ কেউ বলেন,

”না, আমার দুটোই দরকার। আমি হলে দুটোই করতাম।”

তিনি যেই চয়েজটির কথা বলেন অথবা যে বিকল্পটির কথা বলেন, সেটি যে গুরুত্বহীন তা নয়। তবে আমার পোস্টের মূল যে জিজ্ঞাসা, উত্তরটি ঠিক তা নয়।

মুশকীল হলো, আমি এরকম যে পোস্টগুলো দিয়ে থাকি  সেগুলো আসলে এক ধরনের  কম্পারেটিভ চয়েজ এনালিসিস, যেখানে, একাধিক বিকল্প (সাধারনত দুই বা তিনটি) হতে বিভিন্ন দিক বিচার বিশ্লেষণ করে একটি নির্দিষ্ট দিকে সিদ্ধান্ত নির্দেশ করতে হয়।

যেমন ধরুন, গেল সপ্তায়, পোস্ট করেছিলাম, যে, আপনি মাত্র ১ জনকেই চাকরিটি দিতে পারবেন-এমন একটি সিচুয়েশনে মাত্র ২ জন ক্যানডিডেট হলে,

১। প্রচন্ড নীডি, এবং ডেসপারেটলি চাকরি করতে হয়-এমন একজন ব্যক্তি চাকরিটি পেলে সবদিক হতে কোম্পানীর প্রসপেক্ট বেশী?

২। নাকি চাকরি না করেও well-off এবং চাকরি গেলেও অথৈ জলে পড়বেন না-একজন এমন মানুষকে চাকরিটি দিলে কোম্পানীর সার্বিক বিচারে বেস্ট প্রসপেক্ট?

কমপারেটিভ চয়েজ টেস্টের এরকম প্রশ্নে সবসময়ই পাঠকদের একটি ধন্দে পড়তে হয়। কারন, এই টেস্টগুলো পড়লেই একটি প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খায়, যে, যে দুটো বিকল্প হতে বেছে নিতে বলা হয়, সেই চলক দুটোর সবরকম আসপেক্ট, কনটেক্সট, ব্যাকগ্রাউন্ড, ইনডেক্স, অ্যাসেসমেন্ট প্যারামিটার ও তার মান লেখা থাকে না।

ওপরের কমপ্যারিজনটাই ধরুন। দু’জন ক্যানডিডেটের অন্য সব যোগ্যতা, বাকি সব কনটেক্সট কিছুই নেই, তার মধ্যে হতে বলতে হবে, কাকে নেয়া উচিত। পাঠক মনে করেন, এরকম ব্লাইন্ড গেম খেলা একধরনের ঝুঁকি। ভুল চয়েজের বা অনৈতিক বা অন্যায্য বিষয়কে সমর্থনের ঝুঁকি। কারন, বৃহত্তর আঙ্গিকে সিদ্ধান্ত গ্রহন অসংখ্য বিকল্প ও কনসিডারেশন বিশ্লেষণ করে নিতে হয়। তবে, এখানে মূল ফোকাসটা হল, বাদ বাকি সব দিক ঠিক থাকলে বা একই থাকলে, একজন স্বচ্ছল মানুষ চাকরিতে বেশি ডেভোশন দিতে পারেন, নাকি একজন নীডি মানুষ-সেটার নানা ডাইমেনশনাল বিশ্লেষন নিয়ে পাঠকের বিস্তারিত ভাবনা জানা।

ভেজালই হয়, তাই না?

তবে, একটু তলিয়ে দেখলে, আর কমপারেটিভ চয়েজ এর আদত জানা থাকলে আর ভেজাল হবে না।

এ ধরনের কমপারেটিভ চয়েজ এনালিসিসের ক্ষেত্রে বাই ডিফল্ট ধরে নেয়া হয় (মেনশনড থাকুক বা না থাকুক), যে, যে দুটো চলকের মধ্যে কমপেয়ার করা হচ্ছে, তাদের অনুল্লেখিত বাদ বাকি প্যারামিটার বা কনটেক্সট হুবহু এক। শুধুমাত্র যে দুটো বা তিনটে প্যারামিটার উল্লেখ করে তুলনাটা সাজানো হয়েছে, লেখক বা প্রশ্নকর্তা মূলত ওই দুটো কনটেক্সট বা প্যারামিটারের আপেক্ষিক গুরুত্ব কে কতটা দেন-সেটা জানবার জন্যই প্রশ্নটি তৈরী করেছেন। এবং, এরকম কমপারেটিভ টেস্টগুলো বেশিরভাগই কাল্পনিক, তবে সত্যের আলোকে সাজানো।

ট্যালেন্ট অ্যাকুইজিশনে কমপারেটিভ চয়েজের প্রয়োগ:

মনে করুন, (কাল্পনিক কিন্তু) আপনার হাতে দুটো অপশন বা চয়েজ আছে-

ক. একজন মানুষ বা প্রার্থী, যিনি নিজে খুবই যোগ্য ও ভাল মানুষ। কিন্তু তিনি একটি লাইসেন্সড ব্রোথেলের বার ম্যানেজার।

খ. আরেকজন মানুষ বা প্রার্থী, যিনি নিজে খুবই অযোগ্য ও দুষ্ট মানুষ। কিন্তু, তিনি একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান প্রিচার।

এই দু’জনের মধ্য হতে যদি আপনাকে/আমাকে চুজ করতে দেয়া হয়-

১. কাকে নিজের স্বামী/স্ত্রী হিসেবে বেছে নেবেন?
২. কাকে নিজের অন্তেষ্টিক্রিয়ার পুরুত হিসেবে নির্বাচিত করবেন?
৩. কাকে নিজের সন্তানের বর/কণে হিসেবে বাছাই করবেন?
৪. কিংবা, কাকে নিজের নেতা/প্রতিনিধি হিসেবে ভোট দেবেন?

ব্যক্তিগত ও সামাজিক প্রয়োগে এই সিদ্ধান্তে আসা কঠিন, তবে তবুও আমাদের একটা মিক্সড ট্রেন্ডিং আছে। কিন্তু, সেটাই যদি কর্পোরেটে হেড হান্টিংয়ে এসে পড়ে, তখন?

ভাল মানুষ কিন্তু অপদার্থ মানুষ;

নাকি,

বদ মানুষ কিন্তু কমপিটেন্ট মানুষ?


ওহ, ভাল কথা, জাতীয় ভুট তো আসি আসি করছে। তো, জাতীয় ভুটে যদি দু’জন প্রার্থীর মধ্যে আপনাকে বেছে নিতে হয়, তখন কাকে নেবেন?

একজন শয়তান পার্টির ক্যানডিডেট, কিন্তু, নিজে বেজায় ভাল ও যোগ্য মানুষ।

নাকি,

একজন অল-স্কয়ার ভাল পার্টির ক্যানডিডেট, কিন্তু, নিজে বেজায় বদ ও অকর্মা মানুষ?

একবার, আমি এমনই একটি টেস্ট দিয়েছিলাম। প্রশ্ন ছিল-

মনে করুন, এক ইন্টারভিউতে দুজন প্রার্থীর মধ্যে চুড়ান্ত বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। দু’জনের মধ্যে একজন সৎ কিন্তু অদক্ষ। আরেকজন অসৎ, কিন্তু দক্ষ। আপনি হলে কাকে নিতেন?

ব্যাস, মূল প্রশ্নের উত্তর যেমন কিছু মানুষ দিলেন, তার বাইরে প্রচুর মানুষ মূল ফোকাস (দক্ষতা ভারসাস সততার আপেক্ষিক গুরুত্ব) বাদ দিয়ে, পাশ কাটিয়ে,

-এসব তুলনাই ফালতু,

-সততার বিকল্প কিছুই নাই,

-দক্ষতা সততার বিপরীতে তুলনাই পেতে পারে না,

-প্রার্থী বাছাই কি শুধু এই দুটো দিয়ে হয় নাকি,

-ক্যানডিডেটদের বাকি সব যোগ্যতার সব দিক না বলে দিলে কীভাবে বলব

-আমি তো চাইব দুটোই থাকবে এমন কাউকে।

ইত্যাদি ইত্যাদি মতামত দিয়ে ভরে ফেললেন।

দুই ভূবনের, দুই বাসিন্দা

রফিক।

রোজ সকালে ঠিক সময়মতো অফিসে আসে। ডানে-বামে না তাকিয়ে টেবিলে বসে যায়।মনোযোগ দিয়ে কাজ শুরু করে।

কখনো কারো সাথে বাড়তি কথা বলে না, কাউকে বিরক্তও করে না।

লাঞ্চ ব্রেকে একাই দ্রূত খায়, কেউ পাশে গেলে হালকা হাসে, কথা বেশি নেই। চায়ের চিনি নিয়ে বায়নাক্কা নেই, ঠান্ডা চাও গিলে ফেলে।

মিটিংয়ে কোনো কথা বলে না, বেশি প্রশ্ন করে না। বসও বলে, “ভাল ছেলে, শান্ত ছেলে, ঝামেলা নেই।”

রফিক কারো সাতে পাঁচে নেই। অফিস পলিটিকসে নেই, তাকে নিয়ে কেউ ষড়যন্ত্রও করে না। ইনফ্যক্ট,  তাকে ষড়যন্ত্রের যোগ্যই মনে করে না কেউ। নিরাপদ একজন মানুষ।

তার ভাগ্যও নিস্তরঙ্গ ও নিরুপদ্রপ। সকাল আসে, সন্ধ্যা নামে, রফিক থাকে একই রকম। অফিসে বোমা পড়লেও রফিকের ভাবান্তর নেই, অফিসে বায়োস্কোপ দেখালেও সে ৫ টায় বাসায় রওনা হয়।

একইরকম চুপচাপ, নিরীহ, শান্ত, নির্বিবাদী, কৌতুহলবিহীন, আব্দারহীন, অভিযোগবিহীন। নিপাট গোবেচারা।

অন্যদিকে আছে মুনতাসির।

সে অফিসে ঢোকার সময় দশজনকে গুড মর্নিং বলে। যে পিয়ন সকালে মাথা নিচু করে পানি ঢালছিল,

তার কাঁধে হাত রেখে বলে, “ভাই, কেমন আছেন আজ?”

মুনতাসির কাজের মানুষ, কিন্তু কাজের মধ্যেই হাসির গল্প বলে, একজনের টাই ঠিক করে দেয়, অন্যজনকে বলে, “ভালো লাগছে তোমার প্রেজেন্টেশন।”

মিটিংয়ে প্রচুর কথা বলে, নতুন আইডিয়া আনে, তর্ক করে, প্রশ্ন করে, সমাধানও আনে। কেউ ভুল কিছু বললে ধরিয়ে দেয়, প্রতিবাদ করে কেউ ভুল কিছু করলে।

অফিসে কারো মন খারাপ থাকলে প্রথমে মুনতাসিরই পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।

তার কাজ নিয়ে অনেকে হ্যাপি, কেউ কেউ আবার ঝাড়ি দেয়। ডেডলাইন মানা, সঠিক ডেলিভারি –

এসবেও সে “রোল মডেল।”

মুনতাসির সবার খবর রাখে, সবাইকে খবরে রাখে। সে লবিং, গ্রুপিং–সবকিছুর খবর রাখে। সবাইকে শোনে, বোঝে, তবে নিজে অংশ নেয় না, নিজেকে বাঁচিয়ে চলে।

তার প্রতি ঈর্ষা করার লোকও আছে, ২/১ জন শত্রুও হয়তো আছে, আবার তার গুণমুগ্ধও আছে।

রফিকের কাজ শেষ হলে অফিসও শেষ। মুনতাসিরের কাজ শেষ হলেও, তার জোকস, সাহস, আইডিয়া, অনুপ্রেরণা –সবই থেকে যায় মানুষের ভেতরে। তাকে বলে, “ও আছে বলেই অফিসটা বেঁচে আছে।”

একজন সাইলেন্ট ভালো মানুষ। অন্যজন প্রাণোচ্ছল জনমানুষের মানুষ।

আমাদের কর্পোরেটে কী করে যেন রফিকের মতো তথাকথিত ভালমানুষি– মানে ভেজিটেবল টাইপ চরিত্রটাই ওভার প্রায়োরিটাইজড হয়ে গেছে।

সবার অ্যাডভোকেসি এখন এমন: “সাত চড়ে রা কাড়ে না – এমন মানুষ চাই।”

যোগ্যতা, সামাজিকতা, টিম স্পিরিট, এক্সট্রোভারসন, কালেকটিভ চরিত্র– এসবকে আর কাম্য মনে করা হয় না। কারণ, “ভালো মানুষ” হওয়া নিরাপদ, আর ’প্রত্যাশিত মানুষ’ হওয়া সমাজের কাছে অস্বস্তিকর। মানুষ সাইলেন্ট ভেজিটেরিয়ান সঙ্গী চায়, কর্মী চায়, বকাউল কিন্তু, আনন্দময় সঙ্গী চায় না।

এক ভদ্রলোক একবার এমনই একটি কমপারেটিভ চয়েজ টেস্ট নিয়ে পোস্ট করবার প্রেক্ষিতে তো এসব আলাপকে বাখোয়াজ সার্টিফিকেট দিয়ে বিদায়ও নিয়েছিলেন।

এনাদের জন্য আমার অনেক আগে শোনা একটি গল্প আবার বলতে হল।

দোয়াল্লিন আর জোয়াল্লিনের মারামারি জানেন তো?

এক গ্রামে একবার ফজরের নামাযে ইমাম সাহেব ক্বিরআত পড়ার সময় ফাতিহা সুরার শেষে ওয়ালাদ দ্বোয়াল্লিন (মতান্তরে জ্বোয়াল্লিন) পড়লে মুসল্লীরা দুই ভাগ হয়ে গেল। কেউ বলে উচ্চারন দ্বোয়াল্লিন হবে, কেউ বলে জোয়াল্লিন।

এই নিয়ে প্রায় হাতাহাতি। এক মুরব্বী বলল, ভোট হোক। ভোট নিয়ে দেখা গেল, মুসল্লীর সমর্থন সমান সমান। এবার?

একটু পরে এক লোক দেরীতে ঘুম থেকে উঠে মসজিদের পৌছে দেখে মারামারির উপক্রম। তাকে মুসল্লীরা ধরে বসল। সে দোয়াল্লিনের না জোয়াল্লিনের দলে। সে তো দেখে বিপদ। যার বিপক্ষে যাবে, জান যাবে।

সে তাড়াতাড়ি ভয়ে বলে, ভাই, আমি দোয়াল্লিনও না, জোয়াল্লিনও না। আমি নামাজই পড়ি না।

মানে, এদিকও না, ওদিকও না, পুরো কমপ্যারিজনটাই বাতিল।

না, সিরিয়াস হবেন না। কমপারেটিভ চয়েজ এনালিসিস আসলে ডিসিশন মেকিংয়ের ক্রিটিক্যাল অংশের একটি ট্রায়াল। একাধিক বিকল্প হতে একটিকে বেছে নেবার সময়ে আমাদেরকে কীভাবে ও কোন দিকে প্রায়োরিটির আলোক প্রক্ষেপন করতে হয়, তারই পাঠ এটি। এটি বাখোয়াস আলাপ নয়। এটা মা আগে না বউ-টাইপের বাখোয়াস নয়। ইন ফ্যাক্ট, বিতর্ক কখনো বাখোয়াসই নয়।

এরকম কমপারেটিভ চয়েস এনালিসিসের সাথে খুব কাছাকাছি আরেকটি কনসেপ্ট হল এনালজিক্যাল কমপ্যারিজন।

আমি যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নই, তাই বিষয়টি আমাদের প্রফেশনে কাজ করতে গিয়ে যতটুকু বুঝবার সুযোগ হয়েছে, সেটুুকু বলি।

পল্টু ও বল্টু সামনে পেছনের বেঞ্চে বসে পরীক্ষা দিচ্ছে। পল্টু ইতিহাসের প্রশ্নে লিখল,

”সম্রাট আকবর বিপদে ভাঙিয়া পরিতেন না।” পেছন হতে বল্টু তার খাতা দেখে দেখে লিখছিল। সে লিখল,

”সম্রাট আকবর বিপদে জাঙিয়া পরিতেন না।” এখন, সম্রাট আকবার বিপদে জাঙিয়া পরতেন না, তাই বলে এ যুগে আপনিও যদি বিপদে জাঙিয়া পরতে না চান-তাহলে কি সেটি ভাল কোনো তুলনা হবে? তা ও আবার, স্রেফ বিপদে বিপদে মিল আছে বলেই?

অথবা, ধরুন, আপনি একজন ভিক্ষুক। রাস্তায় দাড়িয়ে পথ চলতি গাড়িগুলোতে আরো অনেকের মতো ভিক্ষা করছিলেন। একজন গাড়ির কাঁচ নামিয়ে একজন মহিলাকে ভিক্ষা দিলেন। এটা দেখে উৎসাহিত হয়ে আপনিও সেখানে পৌছে হাত পাতলেন। তিনি আপনাকে দিলেন না। আপনি তখন অনুযোগ করে বললেন, ওকে দিলেন, আমাকে কেন দেবেন না? ও ভিক্ষুক, আমিও ভিক্ষুক, তাহলে বৈষম্য কেন? পক্ষপাতিত্ব কেন?

দাতা হয়তো সত্যি সত্যি গল্পে আপনাকে কখনো সেই ব্যাখ্যা দেন না। তবে এই রূপক হতেই যদি ব্যাপারটা ভাবি, তাহলে দেখব, আপনি নিজের ভিক্ষা পাবার উপযুক্ততা হিসেবে শুধুমাত্র দাতার একটি আসপেক্টকেই অ্যাবসলুট লজিক হিসেবে দেখেছেন, সেটা হল, “তিনি আরেকজনকে ভিক্ষা দিয়েছেন।”

কিন্তু, আপনি আপনার প্রাপ্যতার যৌক্তিকতা প্রমানের জন্য আরও অনেকগুলো প্যারামিটার বা ইনডেক্সকে একদমই বিবেচনায় নেননি। সেগুলো হতে পারত-

-দু’জনের বয়সের মিল আছে কিনা?

-দু’জনকে দেবার মতো তার সামর্থ আছে কিনা?

-দু’জনকে দেখতে একই রকম অসহায় লাগে কিনা?

-দাতা নারীদের ভিক্ষা দিতে বেশি আগ্রহী কিনা?

-দাতার হাতে সেই সময়ে আর ভাঙতি ছিল কিনা?

-আপনি ওনাকে দিতে দেখে সেটিকে ক্যাশআপ করে আপনাকেও দেবার চাপ তৈরী করে ফেলছেন-তার মনে এমন ভাবনা সৃষ্টি করেছেন কিনা

ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।

অথবা, ধরুন, আপনাকে ভিক্ষুকের রূপক দিলে মন খারাপ করবেন। তাই আমি প্লটটাকে অন্যরকম করে দিই।

আপনার বাবাকে গিয়ে বললেন, “বাবা, আমাকে ৫০০ টাকা দাও। বন্ধুদের নিয়ে আইসক্রীম খাব।”

বাবা আপনাকে দিতে রাজি হলেন না।

আপনি বললেন, ”কেন দেবে না, কালই তো বড় আপুকে স্টাডি ট্যুরে যাবার জন্য ১,০০০ টাকা দিলে। ওকে দিতে পারলে আমাকে কেন দেবে না? আমি কি তোমার মেয়ে না?”

প্রথম দৃষ্টিতে এই তুলনাকে আমাদের খুবই বৈধ মনে হবে। বাবা তার মেয়েদের মধ্যে বৈষম্য করছেন-এমনটাই মনে হবে। কিন্তু, আসলেই কি তাই?

ছোট মেয়ের প্রাপ্যতার দাবীটির পেছনে এখানে মাত্র ১টি এনালজিই কাজ করেছে, সেটি হল-দু’জন একই বাবার সন্তান। তাহলে বড় মেয়ে পেয়ে গেলে ছোট মেয়েও বাই ডিফল্ট প্রাপ্য। এটাই ভুল এনালজি।

কমপেটিটিভ বা কমপারেটিভ চয়েজ এর ক্ষেত্রে একটি চলককে আরেকটির সমান হিসেবে ট্রিট করতে কেবলমাত্র একটি বা দুটি ফ্যাক্টরকে মূল লজিক হিসেবে বেস করা হল রং এনালজি।

যেমন, এই কেসে, দুই মেয়ের প্রাপ্যতার তুলনায় অনেকগুলো ফ্যাক্টর বিবেচ্য-

-দু’জনই একই বাবার সন্তান,

-দু’জনের বয়স,

-দু’জনের খরচের খাতের গুরুত্ব,

-দু’জনের ম্যাচিওরিটির মাত্রা,

-দু’জনের কনভিন্সিং পাওয়ার,

-দু’জনের বাবার সাথে ইনটিমেসি

অনেকগুলো ফ্যাক্টর।

সেগুলোকে ইগনোর করে শুধুমাত্র “আমিও তোমার মেয়ে”-একটি ফ্যাক্টরকে বেস করে একই রকম প্রাপ্যতার দাবী রং এনালজিক্যাল ডিসিশন বা চয়েজ।

আপনি আপনার ব্যক্তিগত বা পেশাগত জীবনে নজর করে দেখুন তো, এরকম রং এনালজি টানার উদাহরন আছে কিনা।

কষ্ট করতে না চাইলে অফিসে আমাদের প্রচলিত গ্রীভ্যান্সগুলোর কথা ভাবুন।

-স্যার, মতিন সাহেবের ৫ হাজার টাকা ইনক্রিমেন্ট হল। একই কাজ আমি করি, আমার কেন ২ হাজার হল?

-স্যার, একই সাথে জবে ঢুকলাম। একই সাথে পি.এইচ.ডি করলাম। মতিন সাহেব আজ প্রফেসর, অথচ, আমি আজও লেকচারার, কেন?

ভেবে দেখুন তো, অনেকগুলো ফ্যাক্টর যেখানে বিবেচ্য হতে হবে, সেখানে মাত্রই একটি জিনিসকে ভর করে একই রেজাল্ট বা ট্রিটমেন্ট চাওয়ার এই ঘটনা ঘটে কিনা?

#comparativechoice #competitivechoice #comparison #relativechoice #analogy

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *