Skip to content

অনাসক্তি ও নৈরাশ্যবাদের বিপরীতে একজন জেইন মার্কজেউস্কি

  • by

আপনি যদি বিশাল বপুর লেখা পড়তে একেবারেই অনিচ্ছুক হন, তাহলে শুধু Videoটি দেখতে পারেন। অনেকটা ভাবনার খোরাক পেয়ে যাবেন। আর যদি আপনি জীবন এবং তার অর্থপূর্ণ বিন্যাস ও প্রবাহ নিয়ে কিঞ্চিত হলেও ভাবিত হন, তাহলে সামান্য সময় ব্যয় করে দেখতেই পারেন।আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমি প্রচুর রাত জাগতাম। বহু রাত এমন গেছে, বই পড়তে পড়তে অথবা গান শুনে শুনে রাত পার করেছি। পরের দিন পরীক্ষা আছে কিনা, ক্লাস করব কী করে-সেই চিন্তা মাথায় থাকত না।৪৩ বছর বয়সে এসে একদিন উপলব্ধি করলাম, রাত জাগার ক্ষমতা রহিত হয়ে গেছে। একদিন বেশি রাত করে ঘুমালে তিন দিন তক তার জের টানতে হয়। শরীর যতটা না, মন তার থেকেও খুব দ্রূত বুড়ো হয়ে যাচ্ছে কি? গেলে যাক, বুড়ো হবার বিনিময়ে নতুন নতুন অনেক কিছু তো আবার পাচ্ছি। মানুষ হয়তো সারাটা জীবনই ট্রান্সফরমড হতে থাকে। তবে জীবনের কিছু ভাইটাল বাঁকে সেই ট্রান্সফরমেশন খুব স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। ট্রান্সফরমেশনের সেই বাঁকগুলো হতে পারে বয়স ১৩, বয়স ১৮, বয়স ২৫, বয়স ৪০, বয়স ৬০ আর বয়স ৮০। বিশেষত চল্লিশের আবহ খুব বাঙময়। জীবনটা যেন নতুন করে নিজেকে শেখায়। জীবনকে নতুন করে চেনায়। জীবনের সাথে জড়ানো চারপাশটাকে চেনায়। চেনা জগত ও মানুষদের নিয়ে ভাবনা বদলে যায়। আগের ভালটা মন্দ হয়। মন্দটাকে আপন মনে হয়। আপনজনেরা পর হয়। পর আরো অচেনা হয়। চেনা সত্য অচেনা লাগে। অচেনাকে দেখে রহস্যময় লাগে। তবে, আমার ধারনা, সবচেয়ে বড় ট্রান্সফরমেশনটা হয় ৮০ তে। কিংবা ঠিক মরে যাবার আগ মুহূর্তে। ঠিক সেই অন্তিম সময়টাতে মানুষ এমন কিছু হয়তো জানে, এমন কিছু বুঝতে পারে, জানতে পারে, যা তার আগের পুরো জীবনেও জানত না। হয়তো সেটি সে জানিয়ে যেতে চায় পেছনে ফেলে যাওয়া আশু শোকগ্রস্থ হতে যাওয়া অভিনয়ের জগতকে। কিন্তু পারে না। পারলে কেমন হত? ‘স্ব’ কিংবা ‘আত্ম’ বিষয়টা কেন যেন এই বঙ্গদেশে খুব নেগেটিভ চোখে দেখা হয়।  যেমন ধরুন, স্ব-মেহন, অথবা স্বয়ম্বরা। একটু অন্যরকম করে বললে ’আত্মহত্যা’।

 ওগুলো তো সার্বজনীনভাবে ঘৃনিত। কিন্তু, স্বয়ংসম্পূর্ণ, স্বনির্ভর হলে আবার মানুষ খুশি। যদিও, স্বকীয়তা, স্বশাসন, স্বেচ্ছাচারের কথা বললে একটু ভাবনায় পড়ে যেতে হবে। কারন, আমরা ওই বিষয়ে একটু দোদুল্যমান।

 কথা হল, স্ব-মেহন না হোক, কেউ যদি স্ব-প্রেষণ (পেষণ বলিনি, প্রেষণ) এ অভ্যস্ত হন, মানে যাকে বিলিতি ভাষায় বলে সেলফ-মোটিভেশন, তাকে কী বলা যায়?

 অবাক হবেন না, অনেক মানুষ নিজেই নিজের জন্য স্বপ্রেষণের কারন বা উৎস। জীবন, জগত ও অভিজ্ঞতা কারো কারো জন্য এতটাই ঘটনাবহুল, যে, তার নিজের অতীতটাই তার জন্য একটা অনুপ্রেরণা, উৎসাহ ও প্রেষণার যোগান।

 বিশ্বাস না হলে নিজেকেই জিজ্ঞেস করুন।কিছু শিক্ষা রয়েছে, যা সময় হবার আগে চাইলেও শিখতে পারবেন না। জানাও হবে না। সময় বা বয়স আপনাকে এমন কিছু শেখাবে, যা আপনার হাতে না। বস্তুত চল্লিশ খুব দ্রস্টব্য একটি বয়স। ঠিক ১৩ বছরের মতো। সেই চল্লিশের সময়টা পার হচ্ছি। প্রতিদিনই নতুন নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন জানা, নতুন করে জানা, পুরোনো অনেক কিছুতে পরিবর্তন দেখছি। পুরোনো প্রথিত ও প্রমানিত বিশ্বাস, দৃষ্টিকে বদলে যেতে দেখছি। পুরোনো বাঁধন আলগা হতে দেখছি, পুরোনো সম্পর্ককে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছি। মনে হচ্ছে, চালশেতে এসে জীবনটা প্রতি পলে পলে নতুন রূপ নিচ্ছে। কবে থামবে এই মহাযাত্রা? যতই দিন যায়, যতই বয়স বাড়ে, যতই ক্রমশ অন্তিমের নিকটবর্তী হয় জীবন,ততই পুরোনো বাঁধন আলগা হয়, ততই একটু একটু করে, একজন একজন করে প্রিয়জন প্রিয় তালিকা হতে খসে যায়। ছোট হয়ে আসে তালিকা। জগতের রীতিই হল, আপনি যতই গায়ে, পায়ে, সময়ে, অবয়বে বড় হবেন, ঋদ্ধ হবেন, ততই আপনার বন্ধু সংখ্যা কমবে, বান্ধব হ্রাস পাবে, একাকিত্ব বাড়বে। বিনিময়ে পাবেন একান্ত নিজের কিছু সময়।এক্ষেত্রে আপনার নিজের কোনো choice নেই। পুরোটাই জগতের চিরাচরিত প্রথা। এমনটাই হয়ে এসেছে। চিরাচরিত সেই রীতি যখন নিজ জীবনে এসে কড়া নাড়ে, সময় যখন বারবার মনে করিয়ে দিতে শুরু করে, তুই ফুরিয়ে যাচ্ছিস, তুই বুড়িয়ে গেছিস, তখন হয় একটা তাড়া ভর করে-দ্রূত অনেক কিছু করে যাবার তাড়া। অথবা, ভর করে হতাশা-অনেক কিছুতেই হাত দিতে না পারবার হতাশা। অন্তত চালশেতে এসে জীবন একটা Pause নেয়। দু’দন্ড থমকে দাড়ায়। জীবন নিজেকে নিজে শুধায়, তোমার যা কিছু বলার ছিল, যা কিছু করার ছিল, যা ছিল পাবার বা দেবার-সবটা কি পেয়েছ বুঝে? উত্তরগুলোও খুব প্রাঞ্জল হয় না। একটা ধোঁয়াশা কাজ করে সেখানে। কখনো সে বলে, ”এই বেশ ভাল আছি।”কখনো আবার বলে,”আশা পূর্ণ হল না। আমার মনের বাসনা।”

[লিংক: https://youtu.be/HMxlKd8jIkI?list=PL8Vc_kqzSYJ-Os6GOdni7VoKYNw6wnfud]

অনাসক্তি, নির্লিপ্ততা, নিরুত্তাপ ও উচ্ছাসহীনতার মতো অলঙ্কার একজন মানুষের সুদীর্ঘকালের সাধনার ফসল। নাগা সন্নাসীদের চেয়ে সেই সাধনা কম দুরহ নয়। একবার এই চার নিদানের নিয়ন্ত্রণ যে পায়, তার সেই সাধনা সহসাই ভঙ্গ করে সাধ্যি কার? এই চারের যুগপৎ আশির্বাদ যার করায়ত্ব, দুঃখ তারে ছোঁয় কোন সাহসে?

লেখালিখির জীবনে বহুবার আমি অনাসক্তি আর উপেক্ষা করবার ভাল দিক নিয়ে লিখেছি। জীবনকে চলমান রাখবার টোটকা হিসেবে অনাসক্তি ও উপেক্ষার মহামোদক পানের পরামর্শ দিয়েছি বহুজনকে। কিন্তু, সেই দূরহ যন্ত্রনা, সেই হিসেবের খাতার অন্ধ চাপ হতে কি মুক্তি সত্যিই আছে? নিজেকে নিয়ে ভাবনা, চাওয়া, অর্জন আর ব্যর্থতার হিসেব নিকেশ হতে তাই মুক্তি মেলে না। নিজের অজান্তেই মন তার খাতা খোলে। হিসেবে মেলানোর চেষ্টা করে। বেশিরভাগ সময়ই সে হিসেব মেলে না। চাওয়া ও পাওয়ার। দেয়া ও নেয়ার। তখন জীবন হতাশার গাঢ় অন্ধকারে নিজের আশ্রয় খুঁজে নেয়। বিষন্ন মন বিষন্নতার কালো কালিতে কলঙ্কিত হয়ে ব্যুঁদ থাকে হতাশার গাঢ় নেশায়। না, হতাশা কিন্তু তাই বলে মহাপরাক্রমশালী আলেজজান্ডারের মতো সর্বজয়ী নয়। সে হয়তো হালাকু খানের মতো নিষ্ঠুর হতে পারে। কিন্তু, তাই বলে সে অজেয় নয়। অন্তত Jane Marczewski র সংগ্রাম দেখলে তো তাই মনে হয়।

না, আজকে Jane Marczewski যিনি নিজেকে পরিচয় দিয়ে থাকেন Nightbirde হিসেবে, তার জীবনালেখ্য নিয়ে লিখতে বসিনি। বস্তুত একক ব্যক্তি মানুষ জেইন, বা জেইনের মতো আরো হাজারো জেইনকে নিয়ে লেখার মতো বোদ্ধা আমি নই। শুধু বসেছি, Jane Marczewski র মতো নিতান্তই অর্বাচীন এক বালিকার মধ্যে আশাবাদ ও জীবনবোধের যে তীব্র ঝলকানি দেখে আমি জীবনের একটি নতুন দিক আবিষ্কার করেছিলাম, সেই অভিজ্ঞতাটি ক্ষুদ্র করে লিখতে। জেইন মার্কজেউস্কি ওরফে নাইটবার্ড একজন আমেরিকান বালিকা। বা বলা চলে, Zanesville-Ohio-USA’র সদ্য তরুণী। না, সদ্য তরুণীর চিরচেনা লবঙ্গ লতিকার মতো কেউ, কিংবা লাউডগা সাপের মতো লকলকে কোনো তন্বী তরুণীর ছবি যদি মনে ভাসিয়ে থাকেন, তাহলে ভুল করবেন।

শরীরের তিনটি Vital organ এ ক্যান্সারে আক্রান্ত একজন কৃশকায়, ক্ষীনতণু বালিকা এই Wonder lady । অক্ষিকোটরের গভীরে স্থান নেয়া তার আঁখিযুগল। অথচ কী ভয়ানক তীব্র দ্যুতি, কী ভীষন সে চোখের আগুন, এক চিলতে হাসি তার চোখেমুখে সর্বক্ষণ। Random browsing এর সময়ে তার একটি গানের ভিডিও আমার নজরে পরে। (এই বিষয়ে আমার একটা অন্ধ বিশ্বাস আছে-আমার যা লাগবে, সেটা ভগবান আমার চোখে ফেলবেনই। জেইনের জীবন ও রোগের ইতিহাস নিয়ে বিস্তারিত জানতে হলে ইউটিউবে খুঁজতে পারেন।)It’s okay, it’s okay–জেইন যখন গেয়ে ওঠেন AGT’র বিচারক Howie Mandel, Heidi Klum, Sofía Vergara আর Simon Cowell এর সামনে, আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনি। যেমন কন্ঠ্য, যেমন গায়কী, তেমনি সেই স্বরচিত ও সুরারোপিত গানের ভেতর দিয়ে ঠিকরে বের হওয়া রাশি রাশি জীবনিশক্তি। তারও চেয়ে মন্ত্রমুগ্ধ হই, যখন মাত্র ২% survival possibility থাকার পরও গানের আগে-পরে শুনি জীবন ও জগত নিয়ে তার অসামান্য বয়ানে তারই আশাবাদের তীব্রতম উচ্চারন-Two percent is not zero percent।

যখন গান শেষে তিনি পান Golden buzzer তখনও আমার কানে বারংবার বাজতে থাকে, Two percent is not zero percent  Two percent is not zero percent  Two percent is not zero percent  আমি মুগ্ধতায় ডুবে শুনতে থাকি, ঠিক যেমন মুগ্ধ হয়ে Youtube এ শুনি আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গ ভাষন, মিশেল ওবামার জ্বালাময়ী অথচ মন্ত্রমুগ্ধকর বক্তৃতা, শুনি মান্ডেলার কথা, চার্চিলের সেই বিখ্যাত বক্তৃতা We shall fight in the streets। শিউরে উঠি, শিহরিত হই জেইনের তীব্র জীবনাকাঙ্খা দেখে, তার আশাবাদ দেখে, উজ্জিবিত হই, ঠিক যেমনটা উজ্জিবিত হই আজ এই ৫০ বছর পরেও রেসকোর্সে বঙ্গবন্ধুর সেই অমর ও অবিসংবাদিত কবিতা পাঠের মতো-”এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।”

জেইনের জীবনাকাঙ্খা আর ইতিবাচকতা আমাকে ব্যুঁদ করে, যখন সে বলে, “You can’t wait until life isn’t hard anymore before you decide to be happy.”  সভা-সমিতিতে, বইয়ে, ভাষনে Motivational বক্তৃতা তো আমরা অনেকই শুনি। আমার কাছে মনে হয়েছে, জেইনের এই গান ও তার আগে পরে বিচারকদের সাথে করা তার কথোপকথন যেকোনো জগতখ্যাত Motivational speaker এর থেকে কম কিছু নয়।  নিজেকে ইতিবাচক আশাবাদে উজ্জিবিত করে তুলতে চাইলে, হতাশার গহ্বর হতে নিজে বের করে আনার তাগিদ অনুভব করলে, এই ভিডিওটি সময় করে দেখতে পারেন। [https://youtu.be/CZJvBfoHDk0]

আমি যখনই জীবনিশক্তির প্রয়োজন অনুভব করি, জেইনের এই ভিডিওটি দেখি। এই লেখাটি যখন আমি লিখতে শুরু করি, তখনও এত স্পষ্ট না হলেও, লেখা শেষ করার পরে আমার কাছে স্পষ্ট হল, আসলে অবচেতনে আমার চেনা জগতের এমনই একজন  জেইন এবং ক্যান্সারের সাথে তার সংগ্রামের দুঃসাহসী যুদ্ধের অভিজ্ঞতা শ্রুত হবার ঘটনাটিই পুরো সময় আমার মনে ছিল। আমাদের ৯৬/৯৮ বন্ধু মিজ সুবর্ণা ক্যান্সারের সাথে লড়ছেন। তার তীব্রতম প্রাণশক্তির ছটায় বহুদিন তক আমরা কেউই বুঝতে পারিনি, তিনি এমন একটি প্রাণঘাতি রোগ শরীরে নিয়ে দিব্যি সবাইকে আনন্দ দিয়ে গেছেন। ব্যক্তিগতভাবে ক্যান্সার আমার দগদগে এক ক্ষতের নাম। কাছের দু’জন প্রিয় মানুষকে হারিয়েছি ক্যান্সারে। সেই স্মৃতিও হয়তো আমার অবচেতনকে প্রভাবিত করেছে। মিজ সুবর্ণা এবং তার মতো অসংখ্য মানুষ, যারা ভয়ে দমে যান না, যারা যমদূতের সাথেও মশকরা করবার সাহস ধরেন, হারার আগে হেরে যান না-তাদের জন্য আমার ব্যক্তিগত শুভকামনা। যুদ্ধটা জিততে হবে যে।

#optimism #pessimism #indifference #apathy #cancer #aging #spiritoflife #inspiration #সামাজিককোষ্ঠ্যকাঠিন্য #৯৬/৯৮

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *