ক.
কিংবদন্তি কোচ অ্যালেক্স ফার্গুসন একবার বলেছিলেন, মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় আবিষ্কার আগুন নয়, চাকা নয়, বিদ্যুৎ নয়, কম্পিউটার নয়। সবচেয়ে বড় আবিষ্কার হলো দুটো শব্দ: ওয়েল ডান!
আপনি আপনার অনুজ সহকর্মীর পিঠ চাপড়ে দিয়ে ‘সাবাশ’ বলে দেখুন, পরের দিন সে দ্বিগুণ উৎসাহে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়বে।আপনার সন্তানকে পিঠ চাপড়ে সাবাশ বলুন, দেখবেন ওর মধ্যে কী উৎসাহ, কী উদ্যম!
ওয়েল ডান বা সাবাশ সেই আশ্চর্য জাদুমন্ত্র।
কিন্তু আমরা প্রশংসা করতে জানি না। আমরা জানি গালি দিতে। আপনি হাজারটা ভালো কাজ করুন। কেউ এসে আপনার পিঠ চাপড়ে দেবে না। কেউ বলবে না, সাবাশ। শুধু একটা ভুল করে দেখুন, নিজ দায়িত্বে, দরকার হলে ইয়োলো ক্যাব ভাড়া করে আপনার বাসায় গিয়ে গালি দিয়ে আসার গুরুত্বপূর্ণ কাজটা অবশ্যই করা হবে। (লেখার এই অংশটুকুর প্রকৃত লেখকের নাম জানি না।)
তোষামোদ নয়, আমার ফোকাস হল প্রশংসা। নিরেট প্রশংসা আমাদের এক ব্যর্থতার নাম। আমরা কেন যেন প্রশংসা করবার ব্যাপারটাকে সবাইই একটু বাঁকা চোখে দেখি। ঠিক যেমন আমরা রিকগনাইজ করা বা স্বীকৃতি দেবার বিষয়টাতেও কৃপণ।
খ.
নামকরণ নিয়ে যদি কোনো নোবেল থাকত, বাংলাদেশের নোবেলপ্রাপ্তি কেউ ঠেকাতে পারত না।
সারাদেশব্যাপী বিভিন্ন স্থান ও স্থাপনার বিচিত্র সব নামের বাহার দেখলে ভিড়মী খেয়ে আপনার এই সত্য মেনে নিতে কোনো অসুবিধা হবে না। আবার, নামকরণ, সরকার বদলালে তা বদলকরণ নিয়ে আমরা যেই নাটকে অভ্যস্ত, তাতে নামের নামাবলিও হয়ে যায়।
নামের উদাহরনে আর গেলাম না। কিছু আছে, চুড়ান্ত অশ্লীল।
মানুষের নামের ক্ষেত্রেও আমরা কম যাই না। আমাদের প্রথাগত বাবা-মায়েরা সন্তানদের নাম রাখার ক্ষেত্রে আরবী ও সংস্কৃত শব্দের ওপর আস্থা রেখে থাকেন। আদর করে সন্তানের নাম রাখে মবরুকা। পাবলিক তাকে ডাকে মকবুল খাঁ।
যাহোক।
বাংলাদেশের সবকিছু একটি করে জাতীয় আছে। জাতীয় মাছ বাইম মাছ (তেলতেলার জন্য), জাতীয় খেলা কুস্তি, জাতীয় ফল জেএসসির ফলাফল, জাতীয় খাসলত পশ্চাৎদেশের মতো দ্বিভাজন, জাতীয় ফুল জনগন নামক Fool, জাতীয় গাছ বাঁশ ইত্যাদি।
হঠাৎ মনে হল, জাতীয় ঋতুতো নেই। যদিও আমার মনে হয়, শীত হল অঘোষিত জাতীয় ঋতু। দেশের যত বড় বড় ঘটনা আছে, সবগুলোর বৃৎপত্তি ঘটে এই শীতে। সরকার পতন হতে পুরুষের ক্ষণপতন-সবই এই শীতে।
ভেবে দেখেুন, এই শীতকে এমনকি আমরা ঈশ্বরকেও বাৎসরিক ভেট দেবার মৌসুম হিসেবে পরিণত করেছি। সারাবছর শুষ্কং কাষ্ঠং শেষে শীত আসলে মৌসুমী ধর্মবিশারদদের ওমর সানী মাহফিলের বান ডাকে। রাতব্যাপী, সপ্তাহব্যাপী চলে এই মৌসুমি বা ওমর সানি বক্তৃতামালা।
বক্তাদের ভাড়ার টাকাটার পরিমান ও অন্যান্য আদর আপ্যায়ন বেশ ইর্ষাযোগ্য। সাতক্ষীরার হেলিকপ্টার না, একেবারে সত্যিকারের জলজ্যান্ত হেলিকপ্টারে উড়িয়ে নিয়ে আসা হয় শীর্ষ বক্তাদের। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, গতকাল সন্ধ্যায় স্থানীয় “রাস্তা দখলকারী হকার্স সমিতি” আয়োজিত এমন এক বিপুল বপুর মাহফিলের পাশ দিয়ে যাবার সময় দেখলাম, এই পিক আওয়ারেও বক্তা হিসেবে মঞ্চে আসীন আছেন মাত্র একজন।
সামনে ৭ জন শ্রোতা। তার একজন আবার ডেকোরেটরের লোক। অদূরেই দেড় কিলোমিটারের ভিতরে আরও ৫ টি মেহফিল চলছে। মানুষ বিভ্রান্ত। কোনটা রেখে কোনটাতে তাশরিফ নেবেন।
না না, আপনি এখুনি ভেঙে পড়বেন না। আমাকে শাপশাপান্ত করতে বসবেন না। কারন চিত্রের বিপরীত দিকও আছে।
কর্পোরেট ও প্রফেশনাল সেক্টরেও মৌসুমি বিতং আছে। শীত আসলেই বাংলাদেশের সব পেশাজীবি সংগঠনের ঘুম ভাঙে। যেই ঘুমের শুরু রোজার মাসে ইফতার পার্টি সারার পরে শুরু হয়। যাহোক। শীত আসলে ঘুম ভাঙে আর শুরু হয় বন ভোজন নাম দিয়ে শহুরে মচ্ছবের ভিতর দিয়ে হাইবারনেশন ভঙ্গের যাত্রা।
তবে সবচেয়ে আকর্ষক ঘটনা হল, মৌসুমী ধর্মপ্রচারের মতো করে কর্পোরেট ও প্রফেশনাল সেক্টরের আমরা শীত আসলে নেমে পড়ি ভাড়ায়, মাগনায়, কিংবা একবেলা একপেটা ভরপুর খানার বিনিময়ে জ্ঞান বিতরনের ওমর সানি যজ্ঞে। শীত মৌসুম জুড়ে আয়োজিত অসংখ্য প্রফেশনাল মাহফিলে ঘন্টাখানিক বা তারও কম সময়ের জন্য হালকার ওপরে পেশাগত জ্ঞান উগরে দিয়ে (যার অর্ধেক সময় যায় মাননীয়দের সম্ভাষনের পিছনে) কিংবা ঘাইকিচিং করে সাংবাৎসরিক পেশাগত বা জেষ্ঠ্যাগত দায় মিটিয়ে ঢেকুর তুলে আবার হাইবারনেশনের প্রস্তুতি নিই।
কাজের বিনিময়ে খাদ্য-এই অভিধাটি অত্যন্ত সূচারুরূপে বাস্তবায়ন হয়েছে আমরা, মানে আমার মতো ভাড়ায় খাটা প্রফেশনাল মেন্টরদের জীবনে। গ্রীষ্মে কিংবা বর্ষায় এই মৌসুমি বা সানি মচ্ছবটা ঠিক জমে না।
কারন, বাংলাদেশের পেশাজীবি হতে চাওয়া বান্দারা মাগনা জ্ঞানও গেলে না। তায় আবার বর্ষায় ভিজে কিংবা রোদে পুড়ে জ্ঞান গিলতে যাওয়ার মতো গরীব দেশ আমরা আর নেই।
শীতকে তাই জাতীয় ঋতু হিসেবে ঘোষনা করা হোক।
গ.
এক লোক সারাক্ষণ শুধু অভিযোগ করত, কেউ তার যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন করে না। একদিন একজন জ্ঞানী লোক বিষয়টি সম্পর্কে জানলেন এবং লোকটির কাছে এলেন। তিনি মাটি থেকে একটি পাথর তুলে একটি পাথরের স্তূপে ফেলে দিলেন।
তারপর সে লোকটিকে বললেন, ‘পাথরের স্তূপ থেকে আমার ফেলে দেয়া পাথরটি খুঁজে বের কর।’
লোকটি পাথর খুঁজে বের করার জন্য অনেক চেষ্টা করল, কিন্তু হাজার হাজার পাথর থেকে ওই নির্দিষ্ট পাথরটি আলাদা করতে পারল না।
এরপর জ্ঞানী লোকটি এক টুকরা স্বর্ণ পাথরের স্তূপে ফেলে দিলেন। তিনি বললেন, ‘এবার স্বর্ণের টুকরাটি খুঁজে বের কর।’ লোকটি অনায়াসে স্বর্ণের টুকরাটি পাথরগুলো থেকে আলাদা করে ফেলল।
এবার জ্ঞানী লোকটি বললেন, ‘দেখ, তুমি যখন স্বর্ণের মতো মূল্যবান হবে, তখন লোকে তোমাকে সহজেই চিনে নেবে এবং তোমার মূল্যায়ন করবে।
বুজুর্গ ভাল মানুষ ছিলেন, তাই এত সহজে তাকে একটা গোঁজামিল বুঝ দিয়ে সেরেছিলেন। আমার ব্যক্তিগত ভাবনাটা অবশ্য এত সরল না। আমার সবসময়ই মনে হয়, যে, আমরা আমাদের পরিণতি বা অবস্থার জন্য নিজেরাও দায়ী। আমাদের জীবন যেমনটা, সেটা আমাদের নিজেদের চিন্তার ফসল, অন্তত অনেকটাই।
অদৃষ্টরে শুধালেম, চিরদিন পিছে
অমোঘ নিষ্ঠুর বলে কে মোরে ঠেলিছে?
সে কহিল, ফিরে দেখো। দেখিলাম থামি
সম্মুখে ঠেলিছে মোরে পশ্চাতের আমি।
যেমন দেখুন, গার্মেন্টস সেক্টরকে নিয়ে ভিতরের, বাহিরের মানুষদের অভিযোগ, অনুযোগের অন্ত নেই। এখনকার সবকিছুরই- গুনাগুন, যোগ্যতা, মেধা, মেধার লালন ও বিকাশ, উৎকর্ষ, চর্চা, দৃষ্টিভঙ্গি, ব্যবস্থাপনা, মানবীয় দিক-এসব নিয়ে এন্তার অভিযোগ। মানুষ এখনও আমাদের গালি দেয়, “শালা গার্মেন্টস”। যাহোক, মানুষের সব কথা ধরতে নেই। এই বঙ্গদেশে পাবলিকের কথা শুনে তাতে গুরুত্ব দেয়া আর মুড়ি খাওয়া সমান।
হা, যতই আমরা জোর গলায় অস্বীকার করি, এর মধ্যে কিছুটা সত্যতা তো অবশ্যই আছে। তার অন্যতম কারন হল মেধার সমাবেশ, মেধার চর্চা, মেধার লালন ও বিকাশ-এসবের একটি বিরাট গ্যাপ। কেউ বলেন, এখানে মেধাবী লোকেরা আসে কম। তাই উৎকর্ষও কম।
আর মেধাবীরা বলেন, এখানে মেধার কদর কম, তাই মেধাবীদের সমাবেশ ও স্থিতিও কম। জিনিসটা ভাইস ভারসা। যেভাবেই দেখি, এই সেক্টরে মেধাকে আকর্ষণ করা, মেধাকে লালন ও বিকাশ করা আর মেধাকে ধরে রাখা ও তার উন্মেষ ঘটানোর অভাব প্রকট। মেধাবীদের স্মার্টলী ডিল করারও গ্যাপ আছে। আমরা আজও সেই ডিলিং শেখার ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছি। মেধাবীদের আমরা আমাদের স্বভাব মতোই, অর্ডিনারী পথে ডিল করতে চাই। আর সিনিয়ররা তাহাদের টীমের জুনিয়র বা নবাগত ট্যালেন্টদেরকে অত্যন্ত হাস্যকর ও আনস্মার্টলি ডিল করার নজিরও এন্তার। কেউ কেউতো এখনও বিশ্বাস করে, ভাত ছড়ালে কাকের অভাব হয় না।
কোনো এক মনিষী (সম্ভবত জনাব ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ) যেন বলেছিলেন, যে দেশে গুনের কদর নেই, সেই দেশে গুনী জন্মাতে পারে না। সুতরাং, ওপরের কবিতার মতো করে, নিজেরাই একটু পিছনে তাকালে দেখব, আমরাই আমাদের দুঃখের অডেসী রচনা করার জন্য দায়ী।
প্রাসঙ্গিক মনে হওয়ায় আমি এখানে মি. মহিউদ্দিন মোহাম্মদের কিছু কথা জুড়ে দেব।
[“প্রকৃতিতে ডোয়ার্ফিজম ও জাইগান্টিজম নামে দুটি ঘটনা ঘটে। ঘটনাগুলো একটু ব্যাখ্যা করছি:
বড় প্রাণীরা, যেমন হাতি, বাঘ, সিংহ, এরা যখন ছোট ও বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বসবাস শুরু করে, তখন বংশপরম্পরায় এদের আকার ছোট হতে থাকে। শরীর, মগজ, হাত-পা, সবই ধীরে ধীরে খর্বাকায় হয়। কারণ বড় শরীর ধারণের জন্য যে-বিপুল খাদ্য দরকার, তা ছোট জঙ্গলে পাওয়া যায় না। ফলে টিকে থাকার তাগিদে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, প্রাণীগুলোর আকার খর্ব হয়ে আসে, যেন কম খাবারে বেশিদিন বাঁচা যায়। বড় অতিকায় প্রাণী পরিণত হয় বেঁটে জন্তুতে।
অন্যদিকে ছোট প্রাণীরা, যেমন ইঁদুর, ছুঁচো, ও টিকটিকি, ওই পরিবেশে বংশ পরম্পরায় বড় হতে থাকে। কারণ ছোট দ্বীপে বড় প্রাণীর খাবার কম থাকলেও ছোট প্রাণীর খাবার থাকে অঢেল। প্রিডেটর বা শিকারী প্রাণীর ভয়ও কম। ফলে ছোট প্রাণীগুলো নির্ভয়ে প্রয়োজনীয় খাদ্য গ্রহণ করতে পারে। এতে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, ছোট প্রাণী পরিণত হয় বড় প্রাণীতে।
উদাহরণ হিশেবে মাদাগাস্কার, সার্ডিনিয়া, ও মৌরিশাসের কথা বলা যায়। ওখানে ইঁদুর, টিকটিকি, কোমোডো, এসব প্রাণী দানবাকৃতির, কিন্তু হাতি, ছাগল, জলহস্তী, এগুলো খর্বাকৃতির।
এই যে কোনো এলাকায়, রসদের অভাবে বড় প্রাণীর ছোট হয়ে যাওয়া, এটি হলো ডোয়ার্ফিজম; আর রসদের প্রাচুর্যে, ছোট প্রাণীর বড় হয়ে যাওয়া, এটি হলো জাইগান্টিজম।
ইভোলিউশোনারি বায়োলোজির এ চমৎকার ধারণাটি সংস্কৃতি, দর্শন, সাহিত্য, শিল্পকলা, এগুলোতেও প্রয়োগ করা যায়। গভীর চোখে তাকালে দেখতে পাই, জাইগান্টিজম ও ডোয়ার্ফিজম, প্রাণিজগতের মতো সমাজেও প্রতিদিন ঘটে চলছে।
কোনো এলাকায় মহৎ সাহিত্য, মহৎ দর্শন, মহৎ শিল্পকলা, মহৎ বৈজ্ঞানিক চিন্তা, উঁচু রাজনীতিক ভাবনা, এগুলোর গ্রাহক যদি কমে যায়, বা এপ্রিশিয়েশন উধাও হয়ে যায়, তাহলে ওই এলাকায় প্রতিভাবান মহৎ মানুষের সংখ্যা, ধীরে ধীরে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, কমতে থাকে। ফলে যা কিছু উঁচু ও মহৎ, তার আকার ও প্রভাব আস্তে আস্তে বেঁটে ও খর্বাকায় হতে শুরু করে। হাই-আর্ট ও হাই-কালচার পর্যবসিত হয় নিম্নমানের মেঠো-শিল্পকলা ও মেঠো-সংস্কৃতিতে। উঁচু সভ্যতা ক্ষয় হয়ে রূপ ধারণ করে বামন-সভ্যতার।
সংস্কৃতির রসদ ও খাদ্য মূলত সমাজের বাসিন্দারা। বাসিন্দাদের কর্মকাণ্ডেই সংস্কৃতি বেঁচে থাকে। তাদের রুচির ওপরই দর্শন, শিল্পকলা, সাহিত্য, বিজ্ঞান, এগুলোর বিকাশ ও বিস্তার নির্ভর করে। উঁচু সাহিত্য, উঁচু দর্শন, উঁচু শিল্পকলার জন্য দায়ী মানুষের উঁচু রুচিবোধ। সমাজে মানুষের গড় রুচিবোধ নিচে নেমে গেলে, হাই-আর্ট ও হাই-থট এপ্রিশিয়েট করার মতো মগজ মাথা থেকে হারিয়ে গেলে, সেখানে বিকাশ ঘটে বেঁটে সাহিত্য, বেঁটে দর্শন, বেঁটে বিজ্ঞান, ও বেঁটে শিল্পকলার। গৌণ বিষয়াদি বিরাজ করতে থাকে মুখ্য রূপে। বেঁটে সংস্কৃতি পায় উঁচু সংস্কৃতির মর্যাদা।
সংস্কৃতি কী? লর্ড রাগলান বলতেন— মানুষ যা করে, আর বানর যা করে না, তাই সংস্কৃতি। কিন্তু বাংলাদেশে মনে হচ্ছে, বানরদের কাজকর্মই সংস্কৃতির প্রধান শাখা। লোকজন শরীর ধারণ করছে মানুষের, মন ধারণ করছে বানরের। বাস্তবের সুবোধ বানর নয়, কল্পনার নির্বোধ বানর; কারণ আমরা যা করছি, তা জঙ্গলের বানর করে না।
গোশালাকে বলা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়, স্ক্রিপচারকে ডাকছি বিজ্ঞান, পাগলামোকে বলছি রাজনীতি। অ্যারিস্টোটল এ সমাজে বড় হলে তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর উপর তসবিহ লিখতে হতো। বার্ট্রান্ড রাসেলকে দেখা যেতো শিক্ষক সমিতির আহাম্মকী পদে। রবীন্দ্রনাথকে খাতির রাখতে হতো শাহবাগ থানার ওসির সাথে। অর্থাৎ কালচারাল ডোয়ার্ফিজম এখানে প্রকট। প্রতিভাবানরা টিকে থাকার তাগিদে প্রতিভা কমিয়ে ফেলছে। উঁচু সংস্কৃতি কদর হারিয়ে পরিণত হচ্ছে বেঁটে সংস্কৃতিতে। আর এই ফাঁকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে বিসিএস গাইড, স্পোকেন ইংলিশ, হিরো আলম, আহমদুল্লাহ, আয়মান সাদিক, ধর্মযুদ্ধ, মোটিভেশোনাল স্পিচ, এসব। এ জঙ্গলে এগুলোই এখন মেইনস্ট্রিম জাইগান্টিক এনিম্যাল।”
-মহিউদ্দিন মোহাম্মদ পৃষ্ঠা ১৪-১৫, বই: মূর্তিভাঙা প্রকল্প]
একটি জনগোষ্ঠী যদি তার মাটিতে বাস করা রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, সুকান্ত, পিকাসো, লিওনার্দো, ভ্যান গগ, মোজার্ট, অমর্ত্য সেন, ঋত্তিক ঘটক, জেমস ক্যামেরন, স্টিফেন হকিংস, চার্লস ডিকেন্স, হেনরি ওয়ার্ডস ওয়ার্থ, কিটস, জাকির খান, রবিশংকর কিংবা বিটোফেনকে আবিষ্কার করতে না পারে, পারলেও পাত্তা দিয়ে পাতে না তোলে;
তাহলে ওনাদের ক্ষতিতো নিশ্চয়ই হবে। ওনারা অব্যবহৃত ও অকোজো হয়ে পড়ে থাকবেন। ভাতের অভাবে কষ্ট পাবেন। মেধা ও শিল্পের অপচয়ে মানসিক পীড়নে ভুগে ভুগে মরবেন।
তবে, বড় ক্ষতি ওই মাটি ও জনগোষ্ঠীর। একা রবীন্দ্রনাথ ভাতের কষ্টে, পিন্ধনের কষ্টে মরলে তার একক ক্ষতি। কিন্তু, একটা ১৮ কোটির জনগোষ্ঠী যে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গান হতে বঞ্চিত হল, একটা পঞ্চান্ন বর্গমাইল ভূখন্ড যে রবিশংকরের সেতারের ঝংকার হতে বঞ্চিত হল, একটা গোটা জেনারেশন যে ঋত্তিক ঘটককে ভাতে মারার অপরাধবোধের ঋনে গেঁথে রইল-তার ক্ষতিও কি বড় নয়?
ট্যালেন্ট, প্রতিভা, শিল্প, সৃষ্টিশীলতা, মেধা, জিনিয়াস, যোগ্যতা, মূল্য-খোঁজা, এক্সপ্লোর করা, যাচাই করা, মূল্যায়ন করা মানুষের আদিমতম প্যাটার্ন। সেই প্যাটার্ন বজায় না রেখে কয়লাকে হিরের মূল্যে কিনতে থাকলে কাউয়ার কা কা কেই বিথোফেন ফিল করে সন্তুষ্ট থাকতে হবে।
”যেই দেশে গুনের কদর নেই, সেই দেশে গুনী জন্মাতে পারে না
”যেই কর্পোরেটে কমপিট্যান্সির চাহিদা নেই, সেখানে এক্সেলেন্স জন্মাতে পারে না।”
#SurfaceSignal #SignalTrait #SurfaceTrait #SurfaceGlamour ও পেডিগ্রি হায়ারিংয়ের জয়জয়কার যে কর্পোরেট বাজারে, সেখানে মেধা বেচতে আসাটাও একটা বিরম্বনা বৈ কি।
”হাতের কাছে থাকতে মানিক রইলা যে কাঙ্গাল।” ও গাড়িয়াল।
শুরু করেছিলাম প্রশংসার ঘাটতি নিয়ে লিখব বলে। চলে গেলাম স্বীকৃতির মরূদ্যানে। আসলে প্রকাশ্য প্রশংসার যেমন দরকার আছে, তেমনি কখনো কখনো সেই প্রশংসা মেকি হয়ে পড়ে, যদি না সেটা স্বীকৃতিতে গড়ায়। প্রশংসা হয়তো স্বীকৃতির খুব প্রাথমিক একটা ধাপ, তবে পরের ধাপেও পদার্পনের দরকার আছে।
#naming #reward #recognitionoftalent #evaluation #appreciation #merit #garments #grooming #ThanksGiving