শৈশবে আমাদের পশ্চাৎপদ ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজব্যবস্থায় বাচ্চাদের ভয় পাওয়া, অল্পস্বল্প পেটে ব্যাথা, দুঃস্বপ্ন, ডায়রিয়া, স্বাস্থ্যহীনতার মতো ছোটখাটো সমস্যা হতে শুরু করে বড়দের নানারকম সামাজিক কিংবা শারীরিক সমস্যা, এমনকি মুরগী চুরির মতো ঘটনাতেও পাড়ার হুজুর বা একটু মুরব্বী বুজুর্গ এর কাছ হতে পানি পড়া, তেল পড়া নিয়ে ব্যবহারের প্রচলন ছিল। আমার মনে পড়ে, বাচ্চার ডায়রিয়া, বাচ্চার মা মসজিদের গেটে একটা বোতল হাতে দাড়িয়ে, ইমাম সাহেব জামাত শেষে সব ফরমালিটি শেষ করে যাবার সময় তার বোতলে কিছু পড়ে ফুঁ দিতেন। বিশ্বাসে ভর করে চিন্তিত মা সেই পানি বাচ্চাকে পান করাতেন। গোসল করাতেন বাড়তি পানি মিক্স করে।
কাজ হত কি হত না-সেটি আজকের ফোকাস নয়। আমার ফোকাস অন্যত্র।
হালজামানায় মুড়ি মুড়কির মতো আবালবৃদ্ধবনিতা সবার হাতের তালুতে ডিজিটাল প্রযুক্তির বিপুল অ্যাভেইলেবিলিটি মানুষকে ভয়াবহ রকম বদলে দিয়েছে। পানি, তেল বা ডিম পড়ার মতো বিষয়গুলো প্রায় বিলুপ্ত। কামরুপ কামাক্ষার মনিলাল টিপরাদের পসারও প্রায় বিলুপ্ত।
সেই ছোটবেলায় পানি বা তেল পড়া খাবার সময় একটা কথা সামনে আসত-”কাজ হবে তো?” অনেক সময় হত, অনেক সময় হত না। যার হত না, তাকে বলা হত, ”বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর।”
সেবা গ্রহিতা বিশ্বাস করতেন তো নিশ্চয়ই, না হলে তো তিনি যেতেনই না। কিন্তু, দাতা যিনি, তার বিশ্বাসও ম্যাটার করত। ওই সময়ে যারা সেবাটা দিতেন, তারা মনের বিশ্বাস হতে দিতেন। আর, তাদের নিজের ওপর বিশ্বাসও বহাল থাকত।
আজ, তিন দশক পরে, মাঝে যখন দেশ ও সমাজে একটা বিপুল পরিবর্তন ও আলোড়ন ঘটে গেছে, একটি অশিক্ষিত ও কুশিক্ষিত জাতি ডিজিটাল হয়েছে। ’বিশ্বাস’ নামের একটি জিনিস তাতে করে হারিয়ে গেছে। এই কমিউনিটিতে কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না।
এই অবিশ্বাসের সমাজে …জুরের তেল পড়ার কেরামতির ওপর বিশ্বাস উঠে যাওয়াই স্বাভাবিক।
হু…রের নিজের বিশ্বাসও টলে গেছে। তার ওপর থাকা ফলোয়ারদের বিশ্বাসও।
বিশ্বাস অবলুপ্ত হওয়ায় কী ঘটছে? এখন আর কোনো কিছুতে আছর হচ্ছে না।
এই অবিশ্বাসের আবহটাকেই কর্পোরেটে নিয়ে আসি। কর্পোরেট নামের ভন্ডামিতে পূর্ণ আমাদের মেকি কমিউনিটিতে প্রতিদিন হাজার হাজার সভা, সমিতি, সেমিনার, ওয়ার্কশপ, ওয়েবিনার, ক্লাস লেকচার, পডকাস্ট, অডিও-ভিজ্যুয়াল, লাইভ, কনফারেন্স, সামিট নামের লদকালদকি হচ্ছে। বিশাল বিশাল বক্তারা কি-নোট দিচ্ছেন। গবেষনা ছাড়াই রিসার্চ পেপার উপস্থাপন হচ্ছে। তাতে পিয়ার রিভিউ জমা পড়ছে টপাটপ। রাজনীতিকরা উদাত্ত ভাষায় দেশ বদলের, দেশপ্রেমের, বিপ্লবের ডাক দিচ্ছেন। ইনফ্লুয়েন্সাররা গরুকে ছাগল বনবার মন্ত্রনা ঝাড়ছেন। কিন্তু, কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। পাঠক ও শ্রোতাদের দিলে সেই জ্ঞানগর্ভ আলোচনা, উদাত্ত আহবান, ইনফ্লুয়েন্স, ভাষন কিছুই আছর ফেলতে পারছে না।
কেন পারছে না? সেটা বলার আগে একটা গল্প রিপিট করি।
তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি। টিউশনির পয়সায় জীবন চালাই। বিনোদন বলতে মল চত্বর, টিএসসির মুফতে বিনোদন। এমনি একদিন যাদুঘরের মিলনায়তনে লালন গায়িকা ফরিদা পারভীনের একক সঙ্গীত সন্ধ্যা। মুফতে। সময় ব্যবস্থা করে গান শুনতে গেলাম।
ফরিদা পারভীন আপা তার সূরের যাদুর মায়াজাল বিস্তার করে একটার পর একটা লালনসহ অন্যান্য গান দিয়ে শ্রোতাকে মুগ্ধ করলেন। গানের ফাঁকে ফাঁকে কথা বলছিলেন তিনি। তার সঙ্গীত জীবন নিয়ে নানা কথা। তার স্বামীর তার গান ও সঙ্গীতজীবন নিয়ে আপত্তি, অমিলের কথা। লালন সঙ্গীত নিয়ে আমাদের এককালের নাক সিঁটকোনো আর হালের উন্মাদনার কথা। একফাঁকে তিনি তার সঙ্গীত জীবনের একটি স্মরনীয় গল্প বললেন।
একবার তিনি সঙ্গীত ভ্রমনে ডেনমার্ক (কিংবা স্পেন) গেছেন। একটি বড়সড় আসরে গান গাইবেন। নির্দিষ্ট সময়ে গানের আসর শুরু হল। সেই আসরে গান শুনতে এসেছেন ডেনমার্কের (কিংবা স্পেনের) রাণী। অন্যান্য শ্রোতাদের সাথে তিনিও তন্ময় হয়ে লালন শুনছেন। গান শুনতে শুনতে কখন যেন তার দু’গাল বেয়ে পানির ধারা বয়ে যাচ্ছিল। গান শেষ হলে শ্রোতারা রাণীকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি তো বাংলা গানের কথা বুঝতে পারছেন না। তাহলে কাঁদছেন কেন?” রাণী উত্তর দিলেন, “পৃথিবীর সবদেশেই সঙ্গীতের সুরের নিজস্ব একটি ভাষা ও আবেদন আছে। কথা বা লিরিক না বুঝলেও সেই আবেদন হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করে। ওই সুরের ভাষাই শ্র্রোতাকে গানের মর্ম বুঝিয়ে দেয়।”
এই যে শিল্পীর গান, তার লিরিক না জানলেও তা মনের গভীর পৌছে যাওয়া, অবোধ্য ভাষাও গানের সুর হয়ে হৃদয়ের মর্মে আঘাত করা, শুধু সুর ও মুর্ছনাকে ভর করে অন্ততের অন্তঃস্থলে গানের মর্মবাণী পৌছে যাওয়া-তার অন্যতম কারন হল গানের সার্বজনীন আবেদন। আর, শিল্পীর চিত্তের গভীর হতে আসা গানের শক্তি। মিজ ফরিদা আজ প্রয়াত। বাঙলা তার শ্রেষ্ঠ লালন গাইয়েদের একজন হারালো চিরতরে। তিনি অন্তরে লালনকে ধারন করতেন। মন হতে যখন গান উৎসারিত হয়, সেই গান মানুষের মনের মূলে আঘাত করে। মানুষকে প্রভাবিত করতে বাধ্য সেই গান।
আজ আমাদের এত এত গান, এত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, এত বক্তৃতা, এত মোটিভেশন, এত বক্তার আগুন ঝড়া বিপ্লবী ভাষণ, এত লেখা, এত সাহিত্য, এত সেমিনার-এই সবকিছু কেন শ্রোতার বা দর্শকের মনকে প্রভাবিত করতে পারে না? কারন একটাই, এই কনটেন্টের স্রষ্টারা এগুলো এখন আর মন হতে, নিজ বিশ্বাস হতে করেন না। ফলে সেটা অন্যের বিশ্বাসেও নাড়া দিতে পারে না।
কর্পোরেট গুরুদের গুরুগম্ভীর ভাষন, মোটিভেশন, কি-নোট, পডকাস্ট তাই জলে যায়। বক্তাও মন হতে বলেন না। শ্রোতাও মন দিয়ে সেসব গ্রহন করেন না। একটা অভিনয়ের বাতাবরন সবখানে। যে কথা, গান, সূর, শিল্প, বক্তৃতা, লেখার জন্ম মনের বিশ্বাস হতে না, যার সৃষ্টি ও প্রকাশে মনের আবেগ জড়িত না, যে কথা বক্তার মন ছুঁয়ে আসে না, তা শ্রোতার মনও ছোঁবে না। শুধু ইথারে হারিয়ে যাবে।
#Belief #Trust #Faith #Disbelief #Society #SocialChange #Superstition #Culture #Tradition #Modernity #CorporateCulture #CorporateWorld #CorporateHypocrisy #Motivation #Leadership #Influence #Impact #Communication #Authenticity #Emotion #BelievingfromHeart #HeartTouching #Music #Song #Lyrics #Lalon #Art #Artist #Creativity #Expression #BanglaMusic #FaridaParveen #Denmark #Spain #UniversalLanguage #PowerOfMusic #HumanConnection #Humanity #Sincerity