আমাদের বলা হয়েছিল, এবং, আমরাও বিশ্বাস করেছিলাম, যে, ডিজিটাল হলে, অনলাইন হলে শোষণ কমবে, অনিয়ম কমবে, স্বাধীনতা বাড়বে, গণতন্ত্র বাড়বে, মনোপলি কমবে। হাসুন। হাসুন। হাসুন। ডিজিটাল ও অনলাইন বেজড অপারেশন ও সাপ্লাই চেইন আমাদের আরও মনোপলিতে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়েছে। আমাদের আরও ঘেরাও, আরও শোষণ, আরও শ্বাসরুদ্ধ করেছে। আমাদের আরও ঘেরাও করা হবে। আমরা নিকট ভবিষ্যতে প্রেমিকা বেছে নেবার স্বাধীনতাও হারাবো। প্রিয় গোলাপ অথবা বর্ষায় ভিজবার স্বাধীনতাও হারিয়ে ফেলতে যাচ্ছি কর্পোরেট তস্করদের ডিজিটাল হ্যান্ডকাফের হাতে। বিশ্বাস না হলে গরুর বাজারে নজর দিন, চালের বাজারে তাকান, বৈশাখের উদযাপনে দৃষ্টি দিন, স্টারডমের গতি বদলের ট্রেন্ড দেখুন, আমাদের সবরকম ন্যারেটিভ যে কেউ একজন পেছন হতে তার মতো করে এঁকে দিচ্ছে আর সেটাই হয়ে যাচ্ছে আমাদের একান্ত নিজস্ব ন্যারেটিভ-দেখতে পাচ্ছেন এমন? ডিজিটাল দাসত্ব-আমাদের অবশ্যম্ভাবি নিয়তি।
ওঁরা প্রথমে যখন পরিবার সৃষ্টি করতে আমাকে সাথে চায়, তখনই প্রথম মিথ্যে বলেছিল। তারপর ওঁরা আবার এলো। আর তারপর সমাজ বানাতে আমাকে সাথে পেতে আবারও মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিল।
তারপরও ওঁরা বারংবার আসতে থাকল। ওঁরা রাষ্ট্র সৃষ্টি করতে, সংবিধান সৃষ্টি করতে, গণতন্ত্র প্রসব করতে, সরকার প্রজনন করতে, বিশ্বব্যবস্থার ব্রিডিং করতে বারবার আমার কাছে আসতেই থাকল, আর প্রতিবার আমাকে কাছে টানার জন্য, দলে নেবার জন্য, আমাকে সম্মত করবার জন্য, ”তোমাকে উন্নত জীবন দেব, স্বাধীনতা দেব, প্রাইভেসি দেব, বাকস্বাধীনতা দেব, ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষা করব, সুরক্ষা দেব, নিরাপত্তা দেব, সভ্যতা দেব”-এরকম সব মিথ্যা ও গালভরা প্রতিশ্রুতি দিতে থাকল।
একটা সময়ে ওঁরা আমাকে রাজি বা বাধ্য করল, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, সরকার, বিশ্বব্যবস্থার অংশ হতে। ব্যক্তিসত্তা বিসর্জন দিয়ে, সমষ্টিক সত্তায় বিলীন হলাম। সুখের আশে।
তারপর বহুদিন পার হল।
ওঁরা এখন পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, সরকার আর বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। ওঁরা এখন দৈত্যাকার। আজকে আর আমার মতো ক্ষুদ্রের সম্মতি বা সমর্থন ওঁদের ছ্যাপেও লাগে না।
ওঁরা এখন আমার মতামত, ইচ্ছা, ভালো-মন্দ লাগা, আমার বিশ্বাস, চাওয়া, পছন্দ, দৃষ্টিভঙ্গি, স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা, গণতন্ত্র, আত্ম-অধিকার-সবকিছুকেই অস্বীকার করছে। যখন যেমন মনে চায়-তাকে নিয়ে খেলছে।
ওগুলোকে ওঁরা স্রেফ গিলে খেয়েছে।
আমার বা আমার মতো আরও হাজারও বোকা, যারা সেদিন রাজি বা বাধ্য হয়েছিল, সভ্যতা নির্মানে, তাদের আজকে রাষ্ট্র, সরকার, আইন, আদালত, মেজরিটি ডেকে বলছে,
”রাষ্ট্রে থাকতে হলে নিজের কিছু থাকবে না। নিজের মতো কিছু হবে না। নিজের কিছু থাকতে হলে রাষ্ট্রে থাকা চলবে না। এবং, রাষ্ট্র ছাড়া কোথাও কিছু থাকবে না।”
ত্রিংশ শতাব্দীর পৃথিবীর একজন হোমোসেপিয়েন সদস্য হিসেবে আপনাকে কিছু প্রেসক্রাইবড বটিকা থেকে একটি অবশ্যই গিলতে হবে:
১.মেজরিটি সেন্টিমেন্টে ফ্লেভারড গণতন্ত্র
২.নিয়ন্ত্রীত ও পূঁজিবাদী সমাজতন্ত্র
৩.কসমেটিক উন্নয়ন
৪.ধর্মের লেবেল আঁটা রাষ্ট্রতন্ত্র
৫.উগ্র জাতীয়তার লেবেল আঁটা দেশপ্রেম
৬.জাতিগত অধঃপতন
আপনার হাতে আর কোনো অপশন নেই। আপনার ইচ্ছা বা অনিচ্ছার কোনো বালাই নেই। আপনাকে যেকোনো একটি বা একাধিক প্রেসক্রিপশন ও দাওয়াই বড়ি গিলতেই হবে। ”ডেভেলপমেন্ট রাদার দ্যান ডেমোক্রেসী” শিরোনামের কসমেটিক উন্নয়ন তো বহুবার পৃথিবী ক্যাস্টর অয়েলের মতো গিলেছে আর বমন করেছে। উন্নয়নের গণধর্ষণে গর্ভধারন ও গর্ভপাতও বহুবার দেখেছে বিশ্ব। অন্যান্য তত্ত্বের বটিকাও গিলছি বা গিলতে হবে।
কসমেটিক উন্নয়নের গর্ভপাত বা উপজাত হিসেবে সামাজিক অবক্ষয়, শিক্ষার অবনমন, সামাজিক অস্থিরতা, জাতিগত অবনমন, অন্যায্য কিন্তু আরোপিত অসুস্থ সামাজিক প্রতিযোগীতা, বৈষম্য, প্রকৃত দারিদ্র হারের ক্রমোন্নতি, সিস্টেমে ধ্বস, নয়া বর্ণবাদ, সাম্প্রদায়িক বিভেদ, গণহারে সামাজিক লুটপাট, রাষ্ট্রীয় শোষণ কিংবা দমন, রাষ্ট্র সমর্থিত লুটপাট, রাষ্ট্রীয় মদদে সন্ত্রাস-পৃথিবীর হোমোসেপিয়েনরা কোনোটার স্বাদ হতেই বঞ্চিত হচ্ছে না। সবগুলো তাড়িয়ে তাড়িয়েই হোক, কিংবা উন্নয়ন গ্যাস্ট্রিকের আলসার বেদনার সাথেই হোক- উপভোগ করছে তারা। ফিনল্যান্ড হতে ফিজি কিংবা কন্যাকুমারি হতে হাইতি-সবাই।
মাঝে মাঝে খবরে দেখা যায়, বন হতে বন্য হাতি লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় তাকে পিটিয়ে মারা হয়েছে। অথবা, জঙ্গলের বাঘ ভুলে জনবসতিতে ঢুকে গরু শিকার করায় তাকে জনতা পিটিয়ে তাড়িয়েছে।
খবরের আড়ালে পড়া সত্যটা সবসময় ছিল এমন, জনতা বা জনবসতিই উল্টো আগে বাঘের বা হাতির এলাকায় ঢুকে, বিস্তার করে বাঘ/হাতির স্বাভাবিক জীবনটাকে রুইন করেছিল। বাঘ মানুষের টেরিটরিতে ট্রেসপাস করে নাই, বরং, মানুষই জোর করে তার এলাকায় ঢুকেছে।
জোর জবরদস্তি করে (তথাকথিত) পাগল অথবা বাউল অথবা সাধকের চুল, দাড়ি কর্তন করা নিয়ে একটা ধুন্দুমার হয়ে গেল। জটা যারা কেটেছেন, তারা সংখ্যায় একা না। অন্তত ওরকম ২টা গ্যাঙের ভিডিও আমি দেখেছি এর আগেও। দর্শক ও ভিডিওখোররা তাকে বিপুল সাধুবাদ আগেও দিয়েছেন। প্রকাশ্য নিয়ত মানব সেবা হলেও আড়ালে টঙ্কার ঝঙ্কার নিয়ে এমনিতে কেউ মাথা ঘামায়নি। ঘটনা এখন উল্টো মোড় নেবার পরও কিছু মানুষ জোর করে জটা কাটার কাজকে এখনো সোয়াব হিসেবে মেনশন করে যাচ্ছেন। তা যান, অসুবিধা নেই।
সোয়াব গ্রুপের একটা শক্ত যুক্তি হল, এই পাগলেরা (আদতে পাগল বলে কিছু যদিও নেই) জনসমাজে একটা ব্যাধি, ঝুঁকি, বেখাপ্পা আর বেসুরো। এরা এই সিভিল সোসাইটিতে বেমানান। তাই তাদেরকে ধরে সভ্য সমাজের আর দশজনের মতো শেপআপ করে দেয়াটা সভ্য সমাজের মানব সেবা বটেই।
বটে, বটে।
তবে ঝামেলা ও গোলের শেকড় এত শ্যালো জলে না। অনেক গভীরে। ওই যে শুরুতে বললাম না, বাঘ মানুষের টেরিটোরিতে জোর জবরদস্তি করে ঢোকে নাই, ট্রেসপাস করে নাই। মানুষ বরং বাঘের বাড়িতে জোর করে তার বসতি বিস্তার করে তার স্বাভাবিক জীবনকে নরকে পরিণত করেছে।
আমাদের সমাজে মানুষের মধ্যে ইউনিফরমিটি মেইনটেইন করবার ঝোঁক একটা বড় সমস্যা। আমরা সবাই চারপাশের সবকিছুকে ইউনিফরম দেখতে চাই। ডাইভারসিটি আমাদের রক্তে সয় না। ফলে, সমাজের প্রচলিত নিয়ম, প্রথা, চর্চা, সিস্টেম, কালচার-এসবের বাইরে কিছু ঘটতে বা করতে দেখলেই আমাদের আঁতে ঘা লাগে। আমরা তাকে থামিয়ে লেভেল করে দেবার জন্য প্রাণপাত করি। কারন একটাই, আমরা বৈচিত্র সহ্য করতে পারি না। ব্যতিক্রম এখানে পাপ।
এই পাগল, এই অপ্রকৃতস্থ, এই উন্মাদ অথবা এই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষটিকে আমাদের প্রচলিত সভ্যতায় একটা জলজ্যন্ত অসভ্য, বর্বর, জংলি, বিপজ্জনক, হুমকি, অসুবিধা মনে হয়। কারন একটাই-সে আমাদের মতো না। সে ইউনিফর্মড শেপের না। সে ব্যতিক্রম।
কেউ ম্যাজিষ্ট্রেট না হয়ে বাউল হয়েছে-সে খারাপ।
কেউ অ্যালজেব্রা না করে কবিতা লেখে-সে নষ্ট।
কেউ ব্যাবসায়ীর ছেলে হয়ে চিত্রকর হতে চায়-সে ভ্রষ্ট।
কেউ ছেলে হয়ে লম্বা চুল রেখে নাচে-সে পঁচা।
কেউ মেয়ে হয়ে জিন্স, টপস পরে অফিস করে-সে গন্ধ।
কেউ রাত বিরাতে কাজ করে-সে চরিত্র নষ্ট।
কেউ টিপ দেয়-সে কাফের।
কেউ মিলাদ পড়ে-সে বেদাতি।
কেউ গরীবদের সাথে বসে ভাত খায়-সে বামাতি।
কেউ পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়ে-সে জামাতি।
কেউ বিয়ে করছে না-সে সমাজবিরোধী।
কেউ ছবি আঁকে-সে গোস্তাকি।
কেউ মূর্তি গড়ে-সে শেরেকি।
কেউ গাজা টানে-সে গাঞ্জুটি।
কেউ নাচে-সে মাগী।
কেউ লুঙ্গি পরে-সে গাঁইয়া।
কেউ আমার মনের মতো কথা বলে না-সে শাঁ…য়া
এভাবে, নিজ নিজ বিশ্বাস, ন্যারেটিভের বিপরীতে কাউকে উল্টো পথে হাঁটতে দেখলেই তাকে অ্যাবোলিস, ডেমোলিস করবার একটা প্রবল আলোড়ন বাঙালি মনের মধ্যে ধারন করে। সব ব্যতিক্রম, সব দ্বিমত, সব ভিন্নমতকে মাড়িয়ে সে লেভেল করতে চায়।
কিন্তু, বাস্তবতা হল, এইসব নষ্ট, গন্ধ, পঁচা বিষয় মানব সভ্যতার জন্মলগ্নেও ছিল, আজও আছে। আমাদের তথাকথিত ’সভ্যতা’ ওই পুঁতিগন্ধময়তার মধ্য হতেই ইভলভড হয়েছে। আর যখন ইভলভড হয়, তখন এই তথাকথিত ’সভ্যতা’ই বরং ছিল সংখ্যালঘু। সভ্যতাকেই তখন প্রতিনিয়ত ব্যতিক্রম আর পথভ্রষ্ট সাব্যস্ত করে তাকে পেটানো হত। ঈশ্বরচন্দ্র যখন প্রথম বিধবা বিবাহ প্রচলনের কথা বলেন, তাকে পথভ্রষ্ট বলা হত। আজ যদি কেউ বিধবা বিবাহের বিপরীতে কথা বলেন, খোদ ঠাকুরই তাকে পথভ্রষ্ট বলবেন।
তো, শুরুতে সভ্যতা ও অসভ্যতা পিঠাপিঠি ভাইয়ের মতোই সমাজে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকত। একই সমাজে জড়াজড়ি করে থাকতে তাদের, সেই আদিম মানবদের কোনো অসুবিধা হত না। প্রথম যখন মানুষ কাপড় পরতে শুরু করল, তাকে নিয়ে ন্যাংটো মানবদের কোনো অসুবিধা হয় নাই। প্রথম যখন মানুষ উদোম উন্মুক্ত যৌনতাভিত্তিক দলগত জীবন হতে একক পরিবারে শিফট হল, তখনো কারো সমস্যা হয় নাই। কূ ও সূ একসাথে সমাজে বেঁচেছে। যে যার মতো।
আজকে যখন সভ্যতার ধারক ও বাহকরা সমাজে মেজরিটি, আজকে সভ্যতা যখন মাইটি, তখন সভ্যতা আর অসভ্যতাকে সহ্য করতে নারাজ। সে জোর করে হলেও সমাজ হতে অসভ্যতা, নোংরা, ব্যতিক্রমকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে উদ্যত, খরগহস্ত। কিন্তু, তাকে কে বলবে, যে, অসভ্যতা, পুরোনো, নোংরা জোর করে তোমার চৌহদ্দিতে ঢুকে পড়েনি। ওটা বরাবরই সমাজে ছিল। তুমিই বরং তার হতে তার এলাকা ধীরে ধীরে কেড়ে নিয়েছ। আর, তার এলাকাতেই তুমি জমিদার হয়ে বসেছ। বসেই তাকে খারিজ করে দিচ্ছ। ফলে, তার সাথে প্রতিদিনই সেজন্য তোমার ঠোকাঠুকি হচ্ছে।
কথা যখন উঠলই, তখন পুরোনো একটা তেতো কথা জুড়ে দিই। দল, সরকার, রাষ্ট্র-তিনটি স্বত্ত্বা। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা এই তিনটিকে তালগোল পাকাই। মানুষ নাকি তার সৃষ্টিলগ্নে আদিম যুগে পাহাড়ে, জঙ্গলে, বনে, গাছের ওপরে বাস করতে। ধারাবাহিক বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে সেই মানব জাতি একসময় নিজের সুরক্ষা, সুন্দর থাকা, সভ্য হবার তাগিদ হতে প্রথমে পরিবার, তারপর দল, তারপর সমাজ, তারপর রাষ্ট্র গঠন করে।
তো কথাটা হল, ব্যক্তিমানুষ বা একক মানুষ তার নিজের দরকারে রাষ্ট্র পয়দা করেছিল। রাষ্ট্র’র নিজের অস্তিত্বের জন্য ব্যক্তিমানুষের কাছে কৃতজ্ঞ থাকা উচিৎ। কিন্তু আজকে রাষ্ট্র নিজেই একটি দানবীয় প্রতিষ্ঠান। প্রায় সর্বত্রই রাষ্ট্রযন্ত্র নামক দানব ব্যক্তিমানুষের গলাটা টিপে ধরে তার যাবতীয় ইচ্ছা, অনিচ্ছা, চাওয়া, পাওয়া, ভাল-মন্দ লাগা, তার মতামত, স্বাতন্ত্র সবকিছুকে নির্মমভাবে পিষে মারছে। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, ব্যক্তিমানুষের কল্যাণ ও জীবনমান উন্নয়নের স্বার্থে। কিন্তু সেই রাষ্টযন্ত্র আজ প্রতিটি ক্ষেত্রে তার নিজের স্বার্থে জনগনের যেকোনো দাবীকে পদদলিত করার লাইসেন্স নিয়ে নিয়েছে।
বনে বাদাড়ে ও গাছে বসবাস করা মানুষ নিজেকে সভ্য ও নিরাপদ করার জন্য জন্ম দেয় রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠানের। সেই রাষ্ট্রই আজ ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানব হয়ে সেই মানুষকে গিলে খাচ্ছে। বুটে পিষে দিচ্ছে তার যেকোনো প্রাণের চাওয়াকে। নিজের সৃষ্ট রাষ্ট্র নামক অস্ত্রে নিজেই খুন হচ্ছে তার স্রষ্টা মানুষ। রাষ্ট্র যেটা বিশ্বাস করে, সেটা তার নাগরিকদের মানতে বাধ্য করা হয়। কোথায় সে তার সন্তানদের কাছে টানছে? সে ব্যস্ত কতিপয় ধান্দাবাজ ও পুঁজিপতিদের স্বার্থ রক্ষায়।
সাধারনের মুখ সেলোটেপ দিয়ে বন্ধ করে দেয়ায়। খুব দুর্ভাগ্যজনক হল, আমাদের এই প্রিয় রাষ্ট্রে যেকোনো রকম দ্বিমত পোষণ করাকে রাষ্ট্রবিরোধীতা বলে মনে করা হয়। আর তাই, রাষ্ট্রের আনাচে কানাচে যেকোনো স্থানে সামান্য জোরে কথা বললেও, শাসকরা শিউরে ওঠে। এই বুঝি রাষ্ট্রবিরোধী যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। সরকারের ভুলের বিরুদ্ধে সাধারন জনতার যেকোনো ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়াকেও তাই এখানে রাষ্ট্রবিরোধীতার তকমা পরিয়ে সাইজ করা হয়। রাষ্ট্র কেন ধরে নেয়, যা কিছু ক্ষোভ ও বিক্ষোভ, সবই রাষ্ট্রের বিপক্ষে? নাগরিকদেরই কেন বারবার নিজের বৈধ ও ন্যায্য অধিকারকে রাস্তায় নেমে চাইতে হয়? এ কেমন রাষ্ট্র? সব যুগের বঙ্গ শাসকরাই এই দলে নিজেদের নাম লিখিয়েছেন।
আসলে সমস্যাটা হল আদিম বুনো মানব জীবনে প্রথমে পরিবার, তারপর দল, তারপর পাড়া, তারপর গ্রাম, অঞ্চল হয়ে যখন রাষ্ট্র নামের একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠল, আর সেই রাষ্ট্র তার দানবীয় শক্তি নিয়ে যেদিন হতে তার জন্মলতিকার একদম আঁতুড়ের শুরুকে প্রবল দলনে লেভেল করে সবকিছুতে ইউনিফরমিটি আনতে উঠে পড়ে লাগল, সমস্যার সূত্রপাত সেদিন হতে। রাষ্ট্র হল বিশ্বের বুকে অকৃতজ্ঞতার সবচেয়ে বড় দেবতা। রাষ্ট্র তার নিজের জন্মকে ভুলে তার জন্মদাতাদেরই নাকচ করবার ফন্দি আটে অষ্টপ্রহর। যেই সামাজিক চুক্তির মধ্য দিয়ে হাজার হাজার বছর ধরে জাতি রাষ্ট্রের জন্ম, রাষ্ট্র নিজেই একটা বড় দানব হয়ে সেই জন্মদাতা মানুষের নিজস্বতা, নিজস্ব চিন্তা, ব্যক্তিগত বিশ্বাস, একক পছন্দ-এরকম সব বৈচিত্রকে গুড়িয়ে দিয়ে ইউনিফরমিটি প্রতিষ্ঠার মহান ব্রতে অবতীর্ণ হয়। সামাজিক চুক্তিকে অস্বীকার করে।
রাষ্ট্রকে দেখে তার জনতাও একই পথে হাঁটে। কেনই বা হাঁটবে না? সে তো এই রাষ্ট্রেরই সভ্য। এই দখলদার রাষ্ট্রেরই পান্ডা। ব্যতিক্রম, বৈচিত্র, ভিন্নতা, নিজস্বতাকে রাষ্ট্র ও তার সেবকরা সবসময় হুমকি হিসেবে দেখে। তাই এসব হুমকিকে ভ্রূনেই নাশের চেষ্টায় রাষ্ট্র এবং তার সভ্যতার প্রহরীরা সদা তৎপর।
আমাদের বুঝতে হবে, যে, আমাদের চোখে কাঁটার মতো বিধতে থাকা এসব বৈচিত্র, ব্যতিক্রম, ভিন্নমত, কূকাম-এসব রাষ্ট্রের জন্ম হতেই ছিল। সে আমাদের সভ্য রাষ্ট্রের চৌহদ্দিতে ঢুকে আমাদের সুখ ও স্বাচ্ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে না, বরং রাষ্ট্র ও তার তথাকথিত সভ্যরাই ওই বৈচিত্রকে বিনা কারনে বিধছে। সেটাও আবার এ কারনে, যে, সে কেন আমার মতো না। জটাধারীর জটা কাটার মচ্ছব সেজন্যই হয়। রাষ্ট্রীয় মদদে লেভেলিং অপারেশন সেজন্যই হয়।
রাষ্ট্র যখন নিজের রাষ্ট্রীয় চরিত্র সুচিন্তিতভাবে বাঁছাই ও নির্মান করে তখন সেটা গোটা রাষ্ট্রকে রিপ্রেজেন্ট করে এবং এই ইমেজ সার্বজনীন হয়।
রাষ্ট্র যদি নিজের ইমেজ নিজে না নির্ধারন করে আর সেটা কতিপয় ব্যক্তি বা ব্যক্তিদলের দ্বারা নির্মিত হয় সেটা হবে ডিসঅ্যাস্টার। এখন বোধহয় সেটাই হতে যাচ্ছে। যে যেখান থকে যেভাবে ইচ্ছা রাষ্ট্রের ব্যাক্তি নির্মিত চরিত্র প্রচার করছে আর রাষ্ট্র সেটা উপভোগ করছে। রাষ্ট্রীয় কিংবা সামাজিক উগ্রপন্থা, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, উগ্র জাতীয়তাবাদ, সামরিক কর্তৃত্বের অভিলাষ, নয়া হিটলারী অভিজাততন্ত্র, নয়া কলোনিয়াল এপ্রোচের শাসকগ্রোত্রের গ্রাত্রবর্ণতন্ত্রের তীব্র অর্গাজম -পুরো পৃথিবীর রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্বকে নতুন করে লিখছে। এ্যারিস্টোটল, সক্রেটিস কিংবা প্লেটো-বহু আগেই লজ্জায়, ঘৃনায় আত্মহত্যা করেছেন ওপাড়ে। বেঁচে থাকলে প্লেটোকে জীবন্ত চিতায় তুলত নয়া রাষ্ট্রব্যবস্থাপনার নয়া বিজ্ঞানীরা।
পৃথিবীতে ৩টি রাষ্ট্র আছে। ‘রাষ্ট্র’ বলেছি। ‘দেশ’ বলিনি। ‘জাতি’ বলিনি।
রাষ্ট্র অনেকটা সরকারের প্রতিরূপ। প্রায়শই সরকার ও রাষ্ট্র সমার্থক হয়ে দেখা দেয়। সরকারের কাজ ও চরিত্রই রাষ্ট্র’র চরিত্র হিসেবে প্রতিভাত হয়।
তো, পৃথিবীতে ৩টি রাষ্ট্র (অথবা সরকার) রয়েছে।
এই রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে খুবই পরিকল্পিত, গোছানো, মেটিকুলাস, টারগেটেড ও মিউচুয়াল একটা উদগ্র, উগ্র, কর্তৃত্ববাদী ও নিয়ন্ত্রণবাদী লক্ষ্য ও দৃষ্টিভঙ্গিকে এনডোর্স করে।
তারপর, জন্মের পরে এরা ধীরে ধীরে নিজেদের আরও আরও আরও বেশি উদগ্র, উগ্র, সাম্রাজ্যবাদী, কর্তৃত্ববাদী ও নিয়ন্ত্রণবাদী করে তুলেছে। খুব গুছিয়ে ও জেনেশুনে।
এরা এদের জনগনকেও খুবই সূচারুভাবে এদের মেটিকুলাস ও সিলেকটিভ দৃষ্টিভঙ্গিতে ল্যাবেলড, গ্রুমড ও ব্র্যান্ডেড করেছে। ফলত, তাদের জনতাও তাদের ব্রেইন ও ফিলোসফিক্যাল চাইলড।
একটি রাষ্ট্র বা তার সরকার যদি বিপথে যায়ও, তবুও তার আলোকিত মানুষদের ভিন্নতা, ভিন্নমত, প্রতিবাদ ও আলোকিত কর্মকান্ড অন্তত সরকার বা রাষ্ট্রের চরিত্রহীনতার দায় হতে জনতাকে মুক্তি দেয়, রাষ্ট্রের কু-চিন্তার কলঙ্ক কিছুটা হলেও মোচন করে। অন্তত সিংহভাগ জনতাও যদি তেমন আলোকিত হয়। যদি উগ্র জাতীয়তাবাদ ও কর্তৃত্ববাদ হতে মুক্ত হয়।
আফসোস, এই ৩টি রাষ্ট্রের মধ্যে এই বদগুনগুলোর প্রবল উপস্থিতিতে প্রচন্ড মিল। প্রচন্ড। আর, এদের সিংহভাগ জনতারও এই অসভ্যতায় ব্র্যান্ডেড হবার প্রবল আগ্রহ ও অভ্যাস। এমনকি, এরা গর্বের সাথে এই সাম্রাজ্যবাদ ও উগ্রবাদকে সেলেব্রেটও করে।
হ্যা, এক কোটি মানুষের মধ্যে যদি ১ জন ভিন্নমত দেখায়, আমি তবুও বলি, #সবাই১না
যদিও সেই ১ জনের দৃষ্টিভঙ্গি বা কাজ রাষ্ট্রের বা সরকারের চরিত্রের ইরেজার বা পিওরিফায়ার হতে অক্ষম।
সম্প্রতি একটি তথাকথিত ‘সভ্য’ মস্তান রাষ্ট্র আরেকটি তথাকথিত স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি বা রাষ্ট্রপ্রধানকে ডাকাত পাঠিয়ে কিডন্যাপ করেছে। করে আবার বুক ফুলিয়ে সেটা প্রচার করেছে। তারপর, আবার, সেই কিডন্যাপ যে প্রায় পুরোটা নিজেদের কুৎসিত স্বার্থে, সেটা প্রায় খোলাখুলি প্রচার করছে। একই পরিণতি আরও অনেককে করবার হুমকি সমানে দিচ্ছে।
হ্যা, ওনারা আবার বিশ্ব মোড়ল, সভ্যতার ঝান্ডাবাহি। গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা, আন্তর্জাতিক আইনের পুরোহিত।
বিষ্ময়ের বিষয়, ওই রাষ্ট্রের ৩০ কোটি মানুষের ১ জনও বলে নাই, এটা অন্যায়, এটা দস্যুবৃত্তি, এটা ক্রিমিনাল অফেন্স। ও মা! তার রাষ্ট্রের মহান কোর্ট আবার এই ডাকাতির বিচার না করে ধরে আনা আসামীর বিচারও করতে লেগে গেছে। ওয়াও!
একই চরিত্র বাকি ২ রাষ্ট্রেরও।
খুব আশ্চর্যের বিষয়, এই রাষ্ট্রগুলোর বিপুল জনতা তাদের রাষ্ট্রের উগ্র জাতীয়তাবাদে এতটাই ব্যুঁদ, যে, রাষ্ট্রের বা সরকারের কমপ্লিটলি অন্যায় ও ক্রিমিনাল অফেন্সকেও হাততালি দেয়। তাতে করে আমি ধরে নিতেই পারি, গোটা দেশটাই একটা ‘ন-সভ্য’ দেশ। এত বিপুল জনসংখ্যার মধ্যে একটা মানুষও কি নেই, যে, বলবে, ও রাষ্ট্র, ও সরকার, তুমি যা করছ ও আমাদের করাচ্ছ, সেটা অসভ্যতা, সেটা অন্যায়, সেটা সাম্রাজ্যবাদ, সেটা কলোনিয়াল এপ্রোচ, সেটা ডমিনেশন, সেটা শোষণ, সেটা ব্রেক অব ইন্টারন্যাশনাল ল।
একটা গোটা সাম্রাজ্যের দৈত্যাকার অন্যায়কে ঠেকানোর শেষ হাতিয়ার বা ভরসা কেবলই পৃথিবীর বিলিয়ন বিলিয়ন একদমই ভাত-পানি খাওয়া জনতার প্রতিবাদ। অন্তত সেই রাষ্ট্রগুলোর জনতার প্রতিবাদ। সুবুদ্ধিসম্পন্ন জনতার প্রতিবাদ। কিন্তু সে তো হবার নয়। সভ্যতার আলোকবর্তিকা হিসেবে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও শ্রেষ্ঠত্ববাদের বড়ি তাদের সবাইকে গিলোনো হয়েছে তো।
যদি মনে করেন, রাষ্ট্র তিনটা ম্যারিকা, আজরাঈল ও ভারাতমাতা-তাহলে ভুল হবে। ওখানে অনেকের নামই বসিয়ে দেয়া যাবে।
আন্তর্জাতিক আইন, গণতন্ত্র, ন্যায্যতা, নিয়ম নিয়ে কারো ছবক শুনলে এজন্য গায়ে জ্বালা করে। কারন, ওই ছবক দেয়া মানুষেরা, ছবক দেয়া রাষ্ট্রের সরকারেরা প্রকাশ্য ভন্ড। এই রাষ্ট্রগুলোতে শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ এতটাই বিরল হয়ে পড়েছে, সেটাই আশ্চর্য। শ্রেষ্ঠত্ববাদের লড়াইটা কে শুরু করেছে-শুধুমাত্র এটুকু প্রশ্ন নিজেদের করার মতো শুভ বুদ্ধিও লোপ পেয়েছে যাদের, তাদের ছবক গায়ে জ্বালাতো ধরাবেই।
অত্যন্ত হাস্যকর হলেও সত্যি, ছবক দেনেওয়ালা ভন্ডদের একটা হতেই গণতন্ত্রের অফিশিয়াল সংজ্ঞা উৎসারিত হয়েছে ““of the people, by the people, for the people”
এই ভুল পৃথিবীতে জন্মে আপনি কাকে দোষ দেবেন? কার কাছে যাবেন? কার কাছে প্রতিকার চাইবেন? কাকে সরিয়ে কাকে নেতা বানাবেন? কোন মহাপুরুষকে, কোন দলের সরকারকে নিজের দায়ীত্ব দেবেন? কোন ঈশ্বরকে অভিশাপ দেবেন? আমি তা বলতে পারছি না। তবে একটা কাজ করতে পারেন। অভিশপ্ত বৈশ্বিক কিংবা জাতীয় দুর্ভাগ্যের জন্য পুরোটা দায় আপনি আপনার পিতা-মাতাকে কিংবা রাষ্ট্রনেতাদের, বিশ্বনেতাদের পিতামাতাদের উপর চাপিয়ে একরকম আত্মশ্লাঘা অনুভব করতে পারেন। কেন?
আমার এক সুহৃদের কাছ থেকে শোনা একটি অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত বাণীকে কিঞ্চিত পরিমার্জন করে তবে বলি, “আপনার, আমার, জাতীয় কিংবা বৈশ্বিক নেতাদের পিতা-মাতাগণ যদি সময়মতো কনডম পরিধান করতেন, তবে আজ এই দানবদের অভিশাপ আপনাকে ছুঁতে পারত না।” একটি সামগ্রিক ধ্বস হয়তো শীঘ্রই আসন্ন। হয়তো সেটাই কেয়ামত। অথবা, হয়তো, সেটিই হবে এই ক্রান্তিকাল হতে নতুন করে আদিম অথচ সবুজ যুগে প্রবেশের একমাত্র দ্বার।
আমি কেন সুশীল সমাজ হব, কেন সমাজবিরোধী হব না?-এই প্রশ্নটি যদি আমার মনে এত কিছুর পরে ঘুরপাক খায়-সেটি কি খুব অযৌক্তিক হবে?
আমাদের ছোটবেলায় পত্রিকায় বা টিভিতে নিউজে সন্ত্রাসী, ডাকাত বা কোনো অপরাধীদলের বর্ননা দেয়া হত এভাবে, “কতিপয় সমাজবিরোধী………….কাল রাতে…………….”। আমি আমার জীবনে যতগুলো প্রশ্ন নিয়ে বার বার ঘুরপাক খেয়েছি, তারমধ্যে “আমি কেন সমাজকে ট্যাক্স দিয়ে চলব” এই প্রশ্নটা খুব ভুগিয়ে এসেছে। আজও এই প্রশ্নটার জবাব খুঁজি।
সত্যিই তো, আমাদের কেন সমাজকে এত ডরিয়ে চলতে হয়? সমাজ বিজ্ঞানীদের ভারি ভারি তত্ত্ব যদি একপাশে সরিয়ে রাখি, তবে বলব, মানুষ জঙ্গলের আদীম জীবনে নিজেদের মতো একরকম ছিল। সেই জীবন ছিল নেহাতই সারভাইভাল এবং খাদ্য সন্ধান করে টিকে থাকার জীবন। সেখানে না ছিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন, না ছিল আগামীকাল বেঁচে থাকবার নিশ্চয়তা। বলা হয়ে থাকে, যে, তখন মানুষের গড় আয়ুষ্কাল খুবই কম ছিল। আধুনিক বা তথাকথিত আধুনিক সমাজ ও বিশ্বব্যবস্থা, ওই সময়ের নাম দিয়েছে বর্বর, আদিম যুগ, যেখানে মারো অথবা মরো-এটাই ছিল নীতি।
সেই তথাকথিত অন্ধকার যামানা হতে যুগের প্রয়োজনে, বিবর্তনের ধীরগতির স্রোতে ভেসে ভেসে নিজেদের স্বার্থে, ঐক্যবদ্ধতার প্রয়োজনে, শ্রেয়তর জীবনের সন্ধানে, বর্ধিত জনগোষ্ঠীর সুশৃঙ্খল যৌথবাসের লক্ষ্যে মানুষ (বা আদিম বর্বর মানুষ) একসময় জোট বাঁধে, দলবদ্ধ হয়। আর তারপর এই ধারাবাহিকতায়ই পরিবার, সমাজ, ধর্ম, রাষ্ট্র, সরকার, আইন, বিশ্বব্যবস্থা নামক প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে ওঠে। সবকিছুই মানুষের নিজের দরকারে আর কল্যানে নিজের গরজে গড়ে তোলা।
সেই প্রতিষ্ঠানসমূহ গড়ে উঠেছিল বা মানুষই গড়ে তুলেছিল এই আশায়, কিংবা বলা যায়, মানুষকে এই প্রতিশ্রুতি (আসলে লোভ) দেখিয়ে, যে, এসব প্রতিষ্ঠান মানুষকে আরো সহজ, উন্নত, আধুনিক, নিরাপদ, শান্তিময় এক জীবন উপহার দেবে। মানুষ (ও গণমানুষ) সেই প্রলোভনে পা দেয়। (কিংবা হতে পারে, এটাই অমোঘ নিয়তি।) পা দিয়ে তারা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে আর প্রতিষ্ঠানের মাঝে নিজেদের একক ব্যক্তিসত্তাকে লীন করে।
মনে হতে থাকে, যে, মানুষ এককভাবে কিছু নয়, প্রতিষ্ঠানই ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই ব্যক্তি মানুষ বেঁচে থাকবে। কিন্তু, মানুষের নিজ গরজে, নিজের হাতে গড়া সেই পরিবার, সমাজ, ধর্ম, আইন, রাষ্ট্র ও বিশ্বব্যবস্থা যখন সুপ্রতিষ্ঠিত হল, তখন সেই কালে কালে হয়ে উঠল পেষণের, শোষণের, অত্যাচারের, নিপীড়নের, নির্যাতনের, নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র। সবচেয়ে বড় কথা, মানুষের নিজ হাতে গড়া ও মানুষকে উন্নততর জীবন উপহার দেবার প্রলোভন দেখানো সেই প্রতিষ্ঠান তথা পরিবার হতে রাষ্ট্র নিজের অস্তিত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হবার পরে, দানবীয় এক ক্ষমতা অর্জনের পরে নিজেই হয়ে উঠল ব্যক্তির নিয়ন্ত্রক ও ভাগ্যবিধাতা। সে ভুলে যেতে থাকল তার জন্ম ইতিহাস। তার জন্মানোর পেছনের পটভূমি।
রাষ্ট্র বা সমাজ বা পরিবার আর মানুষের অধীন থাকল না, বরং সে এক বুনো ষাড় অথবা মহাদৈত্যের আকার ও অবয়বে গিলে খেতে উদ্যত হল তার জন্মদাতা ‘ব্যক্তি মানুষ’কেই। সে অস্বীকার করতে থাকল তার জন্মদাতার অধীকার, স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্রকে।
এ যেন পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র-বিশ্বব্যবস্থা নামক ফ্রাঙ্কেনস্টাইন। মানুষের সেই কল্যানকামী প্রতিষ্ঠান যদি হয়ে ওঠে উল্টো কল্যানকামী অধিবাসী/সদস্যদের নিপীড়নের যাঁতাকল, পদে পদে সে মানুষের যাত্রাকে, ব্যক্তিস্বত্ত্বাকে করে বাধাগ্রস্থ তবে সেই সমাজ আমাদের কী দেবে? সেই সমাজকে মেনে নিতে আমরা বাধ্য কেন? মানুষ তার কল্যানের জন্য সমাজবদ্ধ হয়েছিল। এখন হাজার হাজার বছর সমাজবদ্ধ হয়ে থাকার পরে সমাজ এখন একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য এবং বাধ্যবাধকতা।
আপনি আমাদের বই কেতাবে দেখতে পাবেন-মানুষ সামাজিক জীব। সে সমাজ ছাড়া বাঁচতে পারেনা। যদিও এটি খুব আপেক্ষিক একটি বক্তব্য। মানুষ সমাজ ছাড়া বাঁচতে পারে-সেটা আদীমকালেই প্রমানিত ছিল। এখনো পারে কিনা-সেটা কিন্তু কেউ পরীক্ষা করে দেখেনি। এক্সপিরিমেন্ট ছাড়াই বলে দেয়া হয় ওটা। যাহোক, আত্মস্বার্থে সমাজে যোগ দিয়ে যখন দেখি সমাজই পদে পদে আমার অধিকার হানি করছে, আমাকে পীড়ন করছে, আমাকে আমার ইচ্ছাগুলোকে গলাটিপে হত্যা করতে উদ্যত হচ্ছে, আমাকে তার মতো করে বাঁচতে বাধ্য করছে, আমাকে আত্মস্বত্ত্বা ভুলে অন্যের চোখে পৃথিবী দেখতে বাধ্য করছে-সেক্ষেত্রে সমাজ রক্ষক না হয়ে ভক্ষকের ভূমিকায় নামছে বলেই তো মনে হয়।
আমাদের ছোটবেলায় অনেকগুলো ট্যাবু আমাদের জীবন ও জগতকে ঘিরে রাখত। ওই ঠিক যেন-ওটা কর না, ওটা কর না। সেই সময়টা যখন আজকের মতো দু’বছরের বাচ্চাদের হাতে ট্যাব নামক একটি সভ্যতা ধ্বংসকারী ইস্রাফিলের শিঙ্গা শোভা পেতনা, তখন আমাদের অর্বাচীন মফস্বল শৈশব জীবনে কিছু বিষয় ছিল ভয়ঙ্কর ট্যাবু যার সাথে আমাদের সংশ্লিষ্টতা অত্যন্ত গর্হিত পাকামো বলে গন্য হত। ঘটনাক্রমে যদি পাড়ার কোনো মুরব্বি ধরে ফেলতো, তবে তাকে পুরো সমাজ ব্রাত্য করে দিতে অনায়াসেই। আমি এই ট্যাবুগুলোর একটা তালিকা করবার চেষ্টা করেছিলাম। দেখুনতো মেলে কিনা:
১.মেয়েদের ছেলে বন্ধু আর ছেলেদের মেয়ে বন্ধু থাকা
২.শরীরি বিষয়
৩.নভেল বই
৪.ম্যাচবক্স
৫.তেলহীন চুল ও লম্বা চুল
৬.মার্বেল
৭.বিশেষ রাবারের টুকরো (!)
৮.নিঃশব্দে পরীক্ষার পড়া
৯.মুরব্বীদের দেখলে সালাম না দেয়া
১০.সন্ধ্যার পর বাসার বাইরে থাকা
১১.হোমওয়ার্কের খাতায় ছবি আঁকা
১২.তাস
১৩.এমনকি কারো সামনে পায়ের ওপর পা তুলে বসা পর্যন্ত।
আপনি হয়তো বলবেন, সমাজ একটি কমোন স্পেস। এটি একটি সম্মিলিত প্রতিষ্ঠান বিধায় এখানে ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখার স্বার্থে সবাইকে কিছু নর্মস মেনে চলতে হয়। হ্যা, সেটাতো সত্যি। কিন্তু সেটা হতে পারে রাষ্ট্রের প্রামান্য ও অফিশিয়াল আইন মেনে চলার ক্ষেত্রে কারন ভার্চুয়াল অস্তিত্বময় সমাজের ডিসকোর্স এখন রাষ্ট্র নামক ফর্মাল প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হয়। সমাজ চিরকালই ভার্চুয়াল সত্ত্বা কিন্তু বর্তমানে সে রাষ্ট্রের ফরমাবর্দার হয়ে স্থানীয় পর্যায়ে জনগোষ্ঠীকে পরিচালনা করে। রাষ্ট্রীয় সুনির্দিষ্ট আইন মানার বিষয়েই আমার কিছু বিতর্ক আছে। তবু যদি সেগুলোকেও মেনে নিই, তারপরে সমাজের আনঅফিশিয়াল প্রথা, নর্মস, ট্যাবু মানতে সামাজিক মানুষ কেন বাধ্য হবে?
তদূপরি যেই সমাজ তার সদস্যদের সুরক্ষা দিতে পারে না, পাশে দাড়ায় না, অন্যের অধিকারের জগতে অহরহ অনাহূত ঢুকে পড়ে যেই সমাজ, সমাজ গঠনের মৌলিক লক্ষ্যকে ভুলে যায় যেই সমাজ, আমার সৃষ্টিশীলতাকে পদে পদে বাধাগ্রস্থ করে যেই সমাজ, আমার নিজের মতো বাঁচতে চাওয়ার ইচ্ছাকে গলাটিপে আতুড়েই মেরে ফেলে যেই সামাজ, আমার সাথে ডাবল স্ট্যান্ডার্ড মেনে চলে যেই সমাজ, আমাকে সমাজের দশটি রক্তচক্ষুর চোখরাঙানী মেনে তার মতো করে নিজেকে সাজাতে বাধ্য করে যেই সমাজ-তাকে পদে পদে প্রণাম জানিয়ে সুবোধ সামাজিক প্রাণী হবার দায় আমার একার কেন?হাজার হাজার বছর ধরে সভ্যতার চর্চা করে, সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে নিজেকে দাবী করা মানুষ ও তাদের রাষ্ট্রসমূহ সভ্য হতে পেরেছে বলে মনে হয় না।
একদল অসভ্য গণতন্ত্র, জনতার দাবী, বিশ্বশান্তি রক্ষার প্রতিভূ হয়ে নিজেই জগতের সবাইকে গণতন্ত্র’র পাঠ দেবার জন্য মারণাস্ত্র নিয়ে হাউন্ড কুকুরের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। চাইলেই আজও স্রেফ শক্তির জোরে একটি স্বাধীন দেশকে শিক্ষা দেবার জন্য তার ঘরে অনায়াসে ঢুকে পড়া যায়। আবার তাকেই বলা যায়, “খবরদার, প্রতিরোধ করলে কিন্তু খবর আছে।” আরেকদল, আম্রিকা ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়ায় হামলা করেছে-এই দোহাই দিয়ে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণকে যায়েজ করে। আম্রিকা কিউবায় রাশান মিসাইল ডেপ্লয় করায় যেভাবে রিএ্যাক্ট করেছিল, সেভাবে রাশিয়ারও তো অধিকার আছে ইউক্রেন নিয়ে ভাববার। আরেকদল আবার রাশিয়াকে নব্য খেলাফত ও পুতিনকে খলিফা ধরে নেয়। আফটার অল, নাসারা ও কুফফার আম্রিকার অন্যায় দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে গোটা বিশ্বকে নাজাত তো রাশিয়াই দেবে। চায়নাও তাতে সঙ্গী হবে। দুই মহান রাষ্ট্র। কেউ কেউ আবার খুশি। একক কতৃত্ববাদী আম্রিকান ডোমিনেশন ভেঙে যাচ্ছে – সেই সুখে। শুধু ভাবতে পারছে না, যে, পরাশক্তির ডোমিনেশন পৃথিবীর ললাট লিখন। তবে, রাশিয়ান বা চায়নিজ ডোমিনেশন হতে আম্রিকান ডোমিনেশন ’কিছুটা হলেও‘ নিরাপদ।
আরেকদল ভাবছে, ‘৭১ এ এই আমরা, মানে তৎকালীন ঘাড়ত্যাড়া ও বিচ্ছিন্নতাবাদী (ফাকিস্তান ও আম্রিকার চোখে) আমাদের তো রাশিয়া এভাবেই সাহায্য করেছে। তাহলে চোখ বুজে থাকাই যায়। আরেকদল চির অসভ্য মনে মনে সুখ পাচ্ছে এই ভেবে, যে, এতদিন শুধু ‘মুশোলমান’রা মার খেয়েছে। এখন ইহুদী, নাসারা, কুফফাররা কামড়াকামড়ি করে মরছে। ভালই তো। জনগনকে ঢাল করে যুদ্ধ হয়। জনগনকে বাঁচানোর ঢাল নিয়ে যুদ্ধ হয়। জনগন কেবল পতঙ্গের মতো মরে।
আহ জনগন! কে তোমার মালিক? তুমি? নাকি রাষ্ট্র? যুদ্ধ ও অন্যের ঘরে হামলা কোনদিনই সভ্য মানুষের কাজ না। সে যে অযুহাতেই হোক। এবং, সেই হামলা তথাকথিত কুফফারের ওপর হলেও যায়েজ হয় না। কুফফাররা নিজেরা মারামরি করে মরছে-এই সুখে যারা আত্মরতির সুখে পাচ্ছে-এদের জন্য কেবলই করুণা। পৃথিবীতে পশ্চাৎমুখীতা নতুন কিছু নয়। বেশ কিছু বছর ধরেই পৃথিবী তার সভ্যতার আদিম লগ্নের চরিত্রের দিকে হাঁটছে।
রাষ্ট্রীয় ভন্ডামিও জগতে নতুন আমদানী হয়নি। ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্র নামের মূলার বয়সও নতুন নয়। ঠিক যেমন নতুন নয়, এর বন্দনাকারীদের ছ্যাচড়ামো ও ধ্যাস্টামোপূর্ন ভন্ডামী। ডিম আগে না মুরগী আগে-সেই সমাধান কোনো কোর্ট কোনোদিন করতে পারেনি। কিন্তু তাই বলে, আবার কোর্ট তার অপারগতা স্বত্বেও এই বিষয়ে রায় দিয়ে বসেনি। অযোধ্যায় উগ্রপন্থী একটি জনগোষ্ঠী কর্তৃক একটি প্রাচীন স্থাপনা ও প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন রাষ্ট্রীয় মদদে ধ্বংস করার পরে তারা আটাশ বছর ধরে খননের চেষ্টা করেছে, এটা বোঝার জন্য, যে, “আগে” ওখানে কী ছিল। তা, এই আগেটা কত আগে, মানে এই “আগে”র ভিত্তি বছর কোনটা হবে, তা কেউ বলেনি। ভগবান রামচন্দ্র যদি অযোধ্যার ঠিক ওই স্থানটিতেই জন্মে থাকেন, সেটা কত সালে? তার জন্মস্থান হবার আগে ওখানে আর কী ছিল. সেই “আগে”টা আবার কোর্ট আমলে নেয়নি। হতে পারত, তারও “আগে” ওখানে ইহুদীদের একটা প্যাগোডা ছিল। প্যাগোডার ওপর মন্দির, তার ওপর মসজিদ; আবার তার ওপর এখন মন্দির। কিংবা ধরেন, আগামী বছর কেউ দাবী করল, তাজমহলের নিচে একটি গির্জা ছিল। তাহলে কি তাজমহল ভেঙে খনন করে দেখা হবে, নিচে কী ছিল? যদি সত্যি সত্যিই ”আগে”র গুরুত্ব এত হয়? তাছাড়া এত আগে আগে করলে ভারতমাতাকে আবার ব্রিটিষ করতে হবে। তারও চেয়ে বিশুদ্ধ আগে চাইলে, তাকে খন্ড খন্ড জমিদারীতে ফিরে যেতে হবে। তা ভারত কি সেই ”আগে”র জন্য তৈরী?
আচ্ছা, ওই দেশে কি বিচারকেদের “বিব্রত” হবার কোনো সিস্টেম নেই? যাতে কোনো কিছুতে হ্যাডমে না কুলালে বিচারকরা “বিব্রত” হবার ভিতর দিয়ে কল্লা বাঁচাতে পারেন? ভাংচুরের বর্বরতায় তালেবানদের বামিয়ানের মূর্তি ভাঙা আর ভারতমাতার মসজিদ ভাঙা খুব একটা আলাদা অর্থ বহন করে না। কানাডা, আম্রিকা ও আরো আরো পশ্চিমা, উত্তরা, দক্ষিণা ভদ্দর ও উন্নত দ্যাশ সমূহের গণতন্ত্র, দানবাধিকার, সুশীল বাণী, উপদেশ ও নিদান শুনলে হাসব না কাঁদব বুঝি না। বাংলাদেশ হতে যাওয়া জৈনক ব্যক্তিকে ট্রুডোর খ্যানাডা তাদের দেশে ঢুকতে দেয় নাই। সুশীলতার দোহাই দিয়ে। তারা বঙ্গবন্ধুর খুনীকে ঠিকই রাষ্ট্রীয় মেহমান করে রেখেছে। এবং তাকে ফেরত দেবে না-বলে দিয়েছে। হাসি পায়। আম্রিকা দানবাধিকারের দোহাইতে বাংলাদেশের সরকারী কর্মকর্তাদের ওপর ব্যান দেয়। আবার মুদির ভাইকে নিয়ে চা ও খায়। গণতন্ত্রের দোহাইতে গণতন্ত্র মাহফিলে দাওয়াত দেয় না, ব্যান দেয়। আম্রিকার গণতান্ত্রীক চেহারা, দানবাধিকার নিয়ে তার নিজের চরিত্র দেখলে হাসি পায়। দুনিয়ার যে কোনো কোণায় যে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও রাষ্ট্রকে যে কোনো ছুতায় হামলা ও নিহত করার অধিকার যাদের আছে বলে বিশ্বাস করে, ওসামা বিনকে যারা বিনা বিচারে খুন করে আরেক দেশে বিনানুমতিতে ঢুকে, যেই আম্রিকা তার দ্যাশে আশ্রিত বঙ্গবন্ধুর খুনিকে ফেরত দেয় না, সে আবার তাদের প্যানট খুলে নেয়া জুলিয়ানকে ঠিকই ধরিয়ে আনে। তারা যখন self ও দানবাধিকার নিয়ে কথা বলে, হাসির দমকে পশ্চাতবায়ু নির্গত হয়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যখন ইরানের শীর্ষ জেনারেল সুলেমানীকে, কিংবা ইজরেল যখন ইরানী বিজ্ঞানীকে গোপন মিশনে হত্যা করার আদেশ দেয়, সেটার নাম আত্মরক্ষা ও সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধের বৈশ্বিক দায়বোধের হালাল বাস্তবায়ন। সৌদি আরবের বাদশাহ (হবু) যখন তার নিজের নাগরিককে হত্যা করার আদেশ দেয়, তার নাম মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বেআইনী কাজ। উভয় পক্ষকে আবার যে নিরবে চেটে শুধু খাশোগজির হত্যার তদন্ত ও বিচারের জন্য উদ্যোগ নিতে যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করে, তার নাম জাতিসংঘ। তারা যখন গণতন্ত্র ও দানবাধিকার নিয়ে কথা বলে, হাসির দমকে পশ্চাতবায়ু নির্গত হয়ে যায়। এসব দেখে দ্বিগুন উৎসাহে যে নিজের যত অকামের আরো নতুন ফন্দী আঁটে, তার নাম রাষ্ট্র। রাষ্ট্র ও জনগণ নামক পাঁঠাকে বলি দিয়ে যে আবার কাঁঠাল খায়, তার নাম ‘স্যারক্যার’।
স্যারক্যারকে নিজ নিজ পশ্চাৎদেশে আবাদ করার অধিকার প্রদানের নাম ‘ভুট’, আর নেই ভুট যারা দেয়, তার নাম ‘জানেমান’। ‘ছারখার’ এর অকামে নিরুপায় হয়ে যখন জানেমানরা আবার রুখে দাড়ায়, সেটার নাম ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’। রাষ্ট্রদ্রোহী জানেমানদের সাইজ করার জন্য আবার স্যারক্যার যখন কুত্তা লেলিয়ে দেয়, তার নাম সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ ও জানেমানদের সুরক্ষার দায়বোধ। এভাবেই বিশ্ব হতে দ্যাশ-সর্বত্রই চক্রাকারে ধাবিত হয় আইন ও ন্যায়ের উত্থানরহিত ঝান্ডা। কৃষ্ণ করলে লীলা, কেষ্টা বেটা করলে বিলা।
আম্রিকা তার নাগরিক অভিজিত রায়ের খুনিদের ধরিয়ে দেবার জন্য ৫০ লাখ ডলার বাউন্টি বা পুরষ্কার ঘোষণা করেছে। আনন্দ সংবাদ। আম্রিকা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত ও সাজাপ্রাপ্ত খুনিকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়নি। এটা শুধুই একটা সংবাদ। অভিজিতদের আত্মাও হয়তো রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে, দেশে দেশে, স্বদেশে বিদেশে নানান দ্বিচারিতার সংবাদ দেখেও হাসে। কোনো যুগেই কোনো জাতি অভিজিতদের ধারন করবার যোগ্যতা ধারন করেনি।
পৃথিবীতে ৩টি রাষ্ট্র আছে। ‘রাষ্ট্র’ বলেছি। ‘দেশ’ বলিনি। ‘জাতি’ বলিনি।
রাষ্ট্র অনেকটা সরকারের প্রতিরূপ। প্রায়শই সরকার ও রাষ্ট্র সমার্থক হয়ে দেখা দেয়। সরকারের কাজ ও চরিত্রই রাষ্ট্র’র চরিত্র হিসেবে প্রতিভাত হয়।
তো, পৃথিবীতে ৩টি রাষ্ট্র (অথবা সরকার) রয়েছে।
এই রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে খুবই পরিকল্পিত, গোছানো, মেটিকুলাস, টারগেটেড ও মিউচুয়াল একটা উদগ্র, উগ্র, কর্তৃত্ববাদী ও নিয়ন্ত্রণবাদী লক্ষ্য ও দৃষ্টিভঙ্গিকে এনডোর্স করে।
তারপর, জন্মের পরে এরা ধীরে ধীরে নিজেদের আরও আরও আরও বেশি উদগ্র, উগ্র, সাম্রাজ্যবাদী, কর্তৃত্ববাদী ও নিয়ন্ত্রণবাদী করে তুলেছে। খুব গুছিয়ে ও জেনেশুনে।
এরা এদের জনগনকেও খুবই সূচারুভাবে এদের মেটিকুলাস ও সিলেকটিভ দৃষ্টিভঙ্গিতে ল্যাবেলড, গ্রুমড ও ব্র্যান্ডেড করেছে। ফলত, তাদের জনতাও তাদের ব্রেইন ও ফিলোসফিক্যাল চাইলড।
একটি রাষ্ট্র বা তার সরকার যদি বিপথে যায়ও, তবুও তার আলোকিত মানুষদের ভিন্নতা, ভিন্নমত, প্রতিবাদ ও আলোকিত কর্মকান্ড অন্তত সরকার বা রাষ্ট্রের চরিত্রহীনতার দায় হতে জনতাকে মুক্তি দেয়, রাষ্ট্রের কু-চিন্তার কলঙ্ক কিছুটা হলেও মোচন করে। অন্তত সিংহভাগ জনতাও যদি তেমন আলোকিত হয়। যদি উগ্র জাতীয়তাবাদ ও কর্তৃত্ববাদ হতে মুক্ত হয়।
আফসোস, এই ৩টি রাষ্ট্রের মধ্যে এই বদগুনগুলোর প্রবল উপস্থিতিতে প্রচন্ড মিল। প্রচন্ড। আর, এদের সিংহভাগ জনতারও এই অসভ্যতায় ব্র্যান্ডেড হবার প্রবল আগ্রহ ও অভ্যাস। এমনকি, এরা গর্বের সাথে এই সাম্রাজ্যবাদ ও উগ্রবাদকে সেলেব্রেটও করে।
হ্যা, এক কোটি মানুষের মধ্যে যদি ১ জন ভিন্নমত দেখায়, আমি তবুও বলি, #সবাই১না
যদিও সেই ১ জনের দৃষ্টিভঙ্গি বা কাজ রাষ্ট্রের বা সরকারের চরিত্রের ইরেজার বা পিওরিফায়ার হতে অক্ষম।
সম্প্রতি একটি তথাকথিত ‘সভ্য’ মস্তান রাষ্ট্র আরেকটি তথাকথিত স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি বা রাষ্ট্রপ্রধানকে ডাকাত পাঠিয়ে কিডন্যাপ করেছে। করে আবার বুক ফুলিয়ে সেটা প্রচার করেছে। তারপর, আবার, সেই কিডন্যাপ যে প্রায় পুরোটা নিজেদের কুৎসিত স্বার্থে, সেটা প্রায় খোলাখুলি প্রচার করছে। একই পরিণতি আরও অনেককে করবার হুমকি সমানে দিচ্ছে।
হ্যা, ওনারা আবার বিশ্ব মোড়ল, সভ্যতার ঝান্ডাবাহি। গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা, আন্তর্জাতিক আইনের পুরোহিত।
বিষ্ময়ের বিষয়, ওই রাষ্ট্রের ৩০ কোটি মানুষের ১ জনও বলে নাই, এটা অন্যায়, এটা দস্যুবৃত্তি, এটা ক্রিমিনাল অফেন্স। ও মা! তার রাষ্ট্রের মহান কোর্ট আবার এই ডাকাতির বিচার না করে ধরে আনা আসামীর বিচারও করতে লেগে গেছে। ওয়াও!
একই চরিত্র বাকি ২ রাষ্ট্রেরও।
খুব আশ্চর্যের বিষয়, এই রাষ্ট্রগুলোর বিপুল জনতা তাদের রাষ্ট্রের উগ্র জাতীয়তাবাদে এতটাই ব্যুঁদ, যে, রাষ্ট্রের বা সরকারের কমপ্লিটলি অন্যায় ও ক্রিমিনাল অফেন্সকেও হাততালি দেয়। তাতে করে আমি ধরে নিতেই পারি, গোটা দেশটাই একটা ‘ন-সভ্য’ দেশ। এত বিপুল জনসংখ্যার মধ্যে একটা মানুষও কি নেই, যে, বলবে, ও রাষ্ট্র, ও সরকার, তুমি যা করছ ও আমাদের করাচ্ছ, সেটা অসভ্যতা, সেটা অন্যায়, সেটা সাম্রাজ্যবাদ, সেটা কলোনিয়াল এপ্রোচ, সেটা ডমিনেশন, সেটা শোষণ, সেটা ব্রেক অব ইন্টারন্যাশনাল ল।
একটা গোটা সাম্রাজ্যের দৈত্যাকার অন্যায়কে ঠেকানোর শেষ হাতিয়ার বা ভরসা কেবলই পৃথিবীর বিলিয়ন বিলিয়ন একদমই ভাত-পানি খাওয়া জনতার প্রতিবাদ। অন্তত সেই রাষ্ট্রগুলোর জনতার প্রতিবাদ। সুবুদ্ধিসম্পন্ন জনতার প্রতিবাদ। কিন্তু সে তো হবার নয়। সভ্যতার আলোকবর্তিকা হিসেবে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও শ্রেষ্ঠত্ববাদের বড়ি তাদের সবাইকে গিলোনো হয়েছে তো।
যদি মনে করেন, রাষ্ট্র তিনটা ম্যারিকা, আজরাঈল ও ভারাতমাতা-তাহলে ভুল হবে। ওখানে অনেকের নামই বসিয়ে দেয়া যাবে।
আন্তর্জাতিক আইন, গণতন্ত্র, ন্যায্যতা, নিয়ম নিয়ে কারো ছবক শুনলে এজন্য গায়ে জ্বালা করে। কারন, ওই ছবক দেয়া মানুষেরা, ছবক দেয়া রাষ্ট্রের সরকারেরা প্রকাশ্য ভন্ড। এই রাষ্ট্রগুলোতে শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ এতটাই বিরল হয়ে পড়েছে, সেটাই আশ্চর্য। শ্রেষ্ঠত্ববাদের লড়াইটা কে শুরু করেছে-শুধুমাত্র এটুকু প্রশ্ন নিজেদের করার মতো শুভ বুদ্ধিও লোপ পেয়েছে যাদের, তাদের ছবক গায়ে জ্বালাতো ধরাবেই।
অত্যন্ত হাস্যকর হলেও সত্যি, ছবক দেনেওয়ালা ভন্ডদের একটা হতেই গণতন্ত্রের অফিশিয়াল সংজ্ঞা উৎসারিত হয়েছে ““of the people, by the people, for the people”
তবে পৃথিবীর সভ্যতা গড়ে ওঠার কিছু ফাঁকি আছে। এই সভ্যতা খুব বেশি বাহুবল নির্ভর। তাই অদূর ভবিষ্যতে পৃথিবী সবকিছু ভুলে গিয়ে যদি বার্লিন প্রাচীর ভাঙার মতো করে বাবরী মসজিদ ভাঙাকে ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে পালন করতে শুরু করে, অবাক হবেন না। শক্তি যদি আপনার হয়, তাহলে ইতিহাস ও বিশ্বমত আপনার কথায় নির্মীত হবে। তা যদি না হত, তাহলে এককালে গুজরাট গণহত্যার জনক চায়েওয়ালা যিনি গণহত্যার জন্য মার্কিন মূলকে নিষিদ্ধ ছিলেন, তিনিই আবার ওই মার্কিন মূলকে “হাউডি” উৎসবে পূজিত হতেন না।
অনেক কাল আগে একজন ভদ্রলোক ‘ভিসামুক্ত বিশ্ব’ আন্দোলন শুরু করেছিলেন। অনেকেই তাকে নিয়ে হাস্যরস করতেন। আমি মনে মনে চাইতাম তিনি সফল হোন। আসলেই আমাদের ধরীত্রি মা’কে বর্ডার ও ভিসা দিয়ে টুকরো টুকরো বিচ্ছিন্ন দুর্গে রুপান্তরের বিরোধী আমি। যাহোক, যদি পারতাম, আমিও একটা আন্দোলন শুরু করতাম। ’কোরামমুক্ত’ বা ‘ব্লকমুক্ত’ বন্ধুত্ব আন্দোলন।
এটা এমন একটি স্বপ্ন যেখানে বন্ধুত্বে থাকবে না, কোরাম, ব্লক, কমিউনিটি, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ’এ্যালাকা’, ‘অমুক প্রজন্ম’, ‘তমুক ব্যাচ’, ”ওই বিশ্বাসের’, নির্দিষ্ট বলয়ের, সীমিত ঘরানার, ”নিজের কোলের”, “আমাদের মতো আমরা”-টাইপের কোনো সীমানা বা গন্ডি। বন্ধুত্ব হবে ওপেন, সবার সাথে সবার। কোনো ফিল্টারিং থাকবে না। নিজেদের ঘরের ছিটকীনি দিয়ে নিজেরা বন্ধু থাকব, বাকিদের সাথে বন্ধু বন্ধু কুতকুত খেলব-দারুন তামাশা। খুব কি অসম্ভব সেটা?
ধরিত্রী মাতা ও তার আদম সন্তানরা সেই আদিম সীমানাহীন পৃথিবীর ভূমিপুত্র আছে আজও। আজও একই ধরিত্রী মাতার সন্তান জগতের সকল মানুষ। এই বিশ্ব দেশ, মানব আদম ও অভিন্ন জাতির কোনো সীমানা নেই। আমরা একই ধরিত্রী মায়ের সন্তান। কেবল কিছু ধান্দাবাজ রাষ্ট্রযন্ত্রী একে ম্যাপ আর পাসপোর্ট নাগরিকতার দেয়াল তুলে বিভেদের সুর চির জাগরুক করে রেখেছে। আর তাই আজ বিহারের সরেনকে নিজেকে খাঁটি ভারতীয় প্রমান করতে হয়। ডগলাসকে প্রমান করতে হয় সে বিশুদ্ধ এমেরিকান।
আয়লান কুর্দি। তাকে মনে পড়ে? আয়লানের লাশ একটি মূর্ত প্রতিবাদ। সে সেই অসংখ্য হতভাগা গরীব, নিপিড়িত ও ঔপনিবেশিক শোষণের বিশ্ব শিকারদের একজন, যে তার যুদ্ধপিড়িত দেশ হতে আপাত মুক্তির দেশে মাইগ্র্যান্ট হবার অতি বৈধ অধিকার বুঝে নিতে গিয়ে, মানে সাগর পাড়ি দিয়ে অন্য ঔপনিবেশিক সাবেক প্রভূর দেশে যেতে গিয়ে সাগরে ডুবে মরেছিল। এই ঔপনিবেশিক ডাকাত প্রভূরা শত বছর আগে নিজ নিজ দেশের দারিদ্র হেতু ও তস্করি লুটেরা মনোভাবাপন্ন হয়ে তৎকালীন দুনিয়ার ধনী অঞ্চলগুলোতে প্রথমে পর্যটনের নামে, পরে বানিজ্য, সভ্যতা বিস্তার, ধর্ম প্রচারের নামে গিয়ে দখল, লুট, ধ্বংস করে।
এরাই আবার এখন সেইসব লুট করা অঞ্চলের অধীবাসীদের নিজ নিজ দেশে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী আখ্যা দিয়ে ঢুকতে দেয় না। আর তার বিপরীতে একদা ধনী ও হালের দরিদ্র এই দেশগুলোর ভাগ্যতাড়িত বা ভাগ্যান্বেষী মানুষেরা তাদের সাবেক লুটেরা প্রভূদের দেশে কাতারে কাতারে উত্তাল সমুদ্র বা দুস্তর মরুভূমি পাড়ি দিয়ে, মরে, বেঁচে, কঙ্কাল হয়ে ঢোকার চেষ্টা করে। কখনো সাগরের লোনা জলে ডুবে মরে। কখনো হয়তো মরুভূমিতে রেঞ্জারদের গুলিতে কুকুরের মতো মরে পড়ে থাকে।
সারা দুনিয়া সাগরে ভাসা মৃত্যুঞ্জয়ীদের উদ্ধারের লাইভ দেখায়। পানিতে ডুবে মরে ঢোল হয়ে ওঠা লাশের ছবি দেখায়। কেউ বলে না, ওহে সাবেক লুটেরা ও হালের নব্য ঔপনিবেশিক প্রভূরা, তোমরা দেশে দেশে যুদ্ধ ও হানাহানি উস্কে দাও, অস্ত্র ব্যবসা করে আমাদের জীবনকে এখনো যদি নরক বানিয়ে দাও, তাহলে তোমাদের লুটের ও লোভের বলি মানুষদের কেন নিজ দেশে ঢুকতে দেবে না?
কেউ প্রশ্নটি করে না, যে, একদা তোমরা জোর করে আমার দেশে মাইগ্র্যান্ট হয়ে লুটেপুটে চলে গেলে। তাহলে আজ আমাদের তোমার দেশে ঢোকার দাবী অতি অতি বৈধ। তোমরা কেন জোর করে বাংলায় ঢুকেছিলে? তোমরা কেন পলাশীর প্রান্তরে আমার স্বাধীনতা লুটেছিলে? কেউ প্রশ্ন করে না, কমানওয়েলথ নামের দাসত্ব শৃঙ্খলে আমার তোমার দেশ কেন তবুও সদস্য হয়?
#State #Government #StatePower #TyrannyOfState #OppressiveState #CoerciveState #StateMonster #TyrannicalSociety #OppressiveRule #ExtremeismInState #TyrannyOfCivilization #Domination #Extremism #WorldPower #Politics #CivilRights #HumanRights #FreedomOfExpression #FreedomOfChoice #FreedomOfSpeech #SocialJustice #SocialContract #Society #SocialNorms #Taboo #AntiSocialMovement #Uniformity #Diversity #Culture #Philosophy #History #PoliticalScience #Democracy #Quorum #Ambiguity #Humanity #CosmeticHumanity #HypocrisyNation #Friendship #Ism #Block #Change #Racism #West #InternationalLaw #UnitedNations #Bangladesh #Babrimosque #কোরামফোরাম #রাষ্ট্রনামকভন্ডামী