এক.
আজ হতে বছর দশেক আগে হবে হয়তো। ঈদ এলো। বাড়িতে যাওয়া হল না বিশেষ কারণে। অবশ্য, সারাজীবনই বিশেষত্ব নিয়েই যার কাজ, তার জন্য সেটা নতুন কিছু নয়। মানসিক অবস্থা খুব সহজেই অনুমেয়। গায়ে পায়ে বড় হয়ে ওঠার পরে ঈদ নিয়ে কখনোই উচ্ছাস দেখানো হয় না। তবু, বছরে কয়েকবার শিকড়ের কাছে যাওয়ার টান তো বেঁচে থাকেই। টিভিতে ‘স্বপ্ন যাবে বাড়ি আমার’-শুনলেই ভিজে চোখে টিভির সামনে ঝাপসা দৃষ্টিতে বসে থাকা হয় সেজন্যই। খুব ভোরে বাড়ি হতে একটা ফোন এলো। অসময়ের ফোনে বুকটা ধ্বক করে ওঠে। ফোন ধরতেই ওপাশ হতে মায়ের কান্না। আমার হার্টটা গলার কাছে উঠে আসে। মায়ের কান্না থামাই। কী হয়েছে জানতে চাই। ঘটনা হল, চাঁদ রাতে বাড়িতে চোর ঢোকে। সে বাইরের রান্না ঘরে লক করে রাখা ঈদের সব বাজার চুরি করে নিয়ে গেছে। ভোরে উঠে রান্নাঘর খুলতেই বিপত্তি নজরে পরে। সেই সময়ে সেই অতি সামান্য চাল, ডাল, চিনি, সেমাই ছিল আমাদের জন্য অনেক কিছু (আজও অবশ্য ’নিম্নবিত্ত’ গন্ধ গা হতে মুছতে পারিনি। বেঁচে থাকার দরকারী সওদা আজও পয়সা পয়সা দরাদরি করে কিনতে হয়।)। বেচারা চোর নিজেও হয়তো ভাবেনি, সে ঠিক কী নিয়ে গেল। সে নিয়ে গেছে একটি গোটা পরিবারের জীবন, আবেগ, পিতা বা মাতার আনন্দাশ্রু। মাত্র একটি রাতের ব্যপ্তি একটি পরিবারের ঈদকে হৃদয়ভাঙা দিনে পরিণত করে দিল। সেবারের সেই বিপাক কীভাবে পরে সামাল দেয়া হল-সে গল্প করেছিলাম আগেও।
দুই.
১৩ ই মে ২০২১। গোটা আরব ভূখন্ডের মতো ফিলিস্তিনেও ঈদের দিন। তবে সেই ঈদ ৯৮ জন ফিলিস্তিনীর পরিবারে গজব হয়ে এসেছে। সেই ৯৮ জন, যারা মাত্রই এই সপ্তাহে ইজরেলি এয়ার স্ট্রাইকে মারা গেছে। খোলা আকাশের নিচে সেই ৯৮ জন ফিলিস্তিনির পরিবারসহ আরো বিদ্ধস্ত ফিলিস্তিনি পরিবারের ঈদ কেমন হবে-সেটা নিয়ে ভাবছি। ভনিতা পূর্ণ আন্তর্জাতিক আইন ও রাজনীতিতে পুষ্ট এই পৃথিবীতে অত্যন্ত বিষ্ময়ের সাথে দেখি, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য দেশে দেশে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মোতায়েন করেছে। অথচ, ৫০টি বছর ধরে সংঘাতপূর্ণ এই অঞ্চলটিতে কোনো শান্তিরক্ষী মোতায়েনের কথা কেউ ভাবেনি। না, ফিলিস্তিনে মুসলমান থাকে না অ-মুসলমান, আমি তা খুঁজি না। আমি বুঝি, তারা মানুষ। ঠিক যেমন হিটলারের জার্মানির দানবীয় নিষ্ঠূরতার শিকার বৃহত্তম জনগোষ্ঠীকে আমি ইহুদী বা খ্রীষ্টান বিচার করি না। তারাও ছিল মানুষ। ইজরেল বা যায়নবাদ সেই ক্ষত ঠিক ভুলে গেছে, নাকি ভুলে আছে-জানি না। মানুষ ইতিহাস হতে শিক্ষা নেয় না। ঠিক যেমন কেউ ভাবেনি, রোহিঙ্গা, ইয়ামেন, সিরিয়া, কুর্দ, বালুচ, চেচেন, কাশ্মীর অথবা জাফনার তামিল অঞ্চলের মানুষ কী চায়-সেই তত্ত্ব তালাশের কথা। দেশের মানুষ প্রবাসে আটকে থাকলে তাদের ঈদের দিনটি কীভাবে কাটে-সেই চিন্তারও হয়তো একটি দিশা থাকে। কিন্তু থাকে না, সেইসব নিজ দেশে পরবাসী জনগোষ্ঠীর দিশা-হোক সেটি এশিয়ায়, হোক পশ্চিমে। হোক সেটি সার্বিয়া, আয়ারল্যান্ড, কাতালুনিয়া হতে শুরু করে রাখাঈন। বিশ্বের কোণায় কোণায় বৃহতের গ্রাসে ক্ষুদ্রের স্বপ্নের অপমৃত্যু-সেটা ঈদেরই হোক, পূজার অথবা ক্রিসমাসে। জীবন যেখানে অন্যের দয়ার পণ্য, উৎসব সেখানে স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন, যে কখনো বাড়ি যায় না।
তিন.
নিজ স্মৃতিতে আবার ফেরত আসি। আজ হতে পনের বছর আগে। সেবারও বাড়িতে যাওয়া হয়নি। হোস্টেলে রয়ে গিয়েছি। সেই ’বিশেষ’ কারণে। যখন একটি একটি করে ব্লকের ছেলেরা ব্যাগ হাতে বাড়ি রওনা হল, তখনও তেমন কিছু মনে হয়নি। ঈদের আগের দিন সকালেও রুম হতে ছেলেদের বাড়িতে স্বপ্নযাত্রা দেখে মনটা দমে গেলেও সেটা মারাত্মক হয়ে দেখা দেয়নি। বিপত্তি বাঁধল সন্ধ্যায়। দুপুর বেলাটা একটা ঘুম দিয়ে বিকেলের শেষে নিচে নামলাম। সুবিশাল হোস্টেলের করিডোরে একটি প্রাণীরও সাড়া নেই। ধুঁ ধুঁ করছে হাজার চারেক ছেলের গমগম করা হোস্টেল। ঠিক সেই সময়টিতে আমার হার্টটা ঠিক কীভাবে গলার কাছে উঠে এসেছিল-তার বর্ণনা আজও লিখে উঠতে শিখিনি। মনে হল, কান্নায় গলা ধরে আসবে। হয়তো পা দুটো জগদ্দল পাথরের মতো জমে যেতে থাকল। হু হু করতে লাগল বুকের চারপাশ। শুন্যতা ছাড়া তার আর কোনো নাম হয় না। চার. করোনা আসার পরে এই নিয়ে বোধহয় ঈদ, নববর্ষের মতো ৬টি বড় বড় জাতীয় উৎসব চলে গেল। মৃত্যু আর আতঙ্কময় এই জনপদে বহু বহু মাস ধরে আমরা ভুলে গেছি হাসতে, মন খুলে বাঁচতে। খোলা হাওয়ায় বুক ভরে নিঃশ্বাস সেবার সুযোগ হয়নি কত কত মাস। সেই মৃত্যুর জনপদে আবার ঈদ এসেছে। মরিয়া মানুষ মৃত্যুভয়কে উপেক্ষা করে পাগলের মতো ছুটে গেছে গ্রামে। শত অনুরোধ, উপরোধ, চোখ রাঙানী, বাঁধা, প্রতিবন্ধকতা-কিছুই আটকাতে পারেনি তাদের। গোটা দেশ দুই ভাগ হয়ে, কেউ তাদের দেখে পরিহাস করেছি, কেউ কপাল চাপরেছি, কেউ দুঃখ পেয়েছি। তাতে তাদের কিছুই আসে যায়নি। অতিমানবিক অথবা অমানবিক স্বপ্নযাত্রার ভিতর দিয়ে তারা বাড়ি ঠিকই গেছে। ছবির মানুষদের মতো করে দড়িতে ঝুলেছে যেমন তাদের দুঃসাহসী স্বপ্নযাত্রা, তেমনি, দড়িতে ঝুলছে জাতির করোনা ভাগ্য। আবার ৭ দিন পরে একই অতিমানবিক পন্থায় পেটের ধান্দায় শহরে ফিরবে। কেউ কেউ আর ফিরবে না এই নিষ্ঠূর নগরে। চিরতরে ছেড়ে গেছে অনেক দিনের বসবাসের এই শহর। ফিরবে না, কারন ফেরার উপায় নেই। এই শহর তাকে আর ফিরবার পথ খুলে রাখেনি। যেই পেটের টান এখানে ছিল, সেই পেটের উপায়ই যে হারিয়েছে। শিমুলিয়ায় সেদিন যেই পাঁচটি হতভাগা পদপিস্ট হয়ে স্বপ্নযাত্রার ইতি টানল-তাদের পরিবার; সেই ৮ বছরের অবুঝ বালকটি, যে, মাকে হারিয়ে ফেরীতে তার লাশ ধরে হৃদয়বিদারক সুরে বিলাপ করছিল, তাদের বাড়িতে কি আজ পোলাও আর মাংস চড়েছে হাড়িতে-খুব জানতে ইচ্ছে করে। আমরা আটকে আছি একটা অব্যখ্যাত সময়ে। পাথরের মতো চেপে বসে আছে বুকে। কবে কাঁটবে এই অমানিশা-জানা নেই। আমাদের চোখে স্বপ্ন নেই। আছে কেবল দূর পানে দৃষ্টি। টানেলের ওপাড়ে আলো দেখা যায় কিনা-তার আশায়। নগরে আগুন লাগলে দেবালয়ও নাকি পোড়ে। অদ্রস্টব্য আমাদের আটপৌড়ে জীবনে, ততোধিক আটপৌড়ে ঈদের আগমনে উচ্ছাস আজ ১৪ই মে ছুঁয়ে না গেলেও মানুষের সহজাত স্বভাবে স্বপ্ন দেখে মন। সামাজিকতার দায় চুকাতে কাল ও আজ সারাদিনের অমানুষিক শ্রম দেবার পরে, সহধর্মীনি অবশেষে একটু ফুরসত পেয়েছে বিছানায় গা এলিয়ে দেবার। সে মরার মতো ঘুমে কাদা। আর আমি কী বোর্ডে বসে স্বপ্নচারীদের স্বপ্ন অথবা স্বপ্নভঙ্গ নিয়ে লিখতে বসি। নিজেকে শতবার কিরে কসম দেবার পরও লিখি। এই নগরের বিষন্নতা, বিচ্ছেদের করুণ সুর নগরের দুই নগণ্য মানব ও মানবীর জীবনেও তার আছর ফেলবে-সেটাই তো স্বাভাবিক। অজানা, অচেনা, অদেখা ও অবিশ্বাস্য এক সময়ের সাক্ষী হয়ে ভালই কেটে যাচ্ছে তাদের দিন। তবু জীবন সুন্দর। জীবন চলে জীবনের মতো। চলতে সে বাধ্য। আর তাই, বাস্তবকে চাপা দিয়ে স্বপ্ন দেখে মন। স্বপ্ন যদি আবার কখনো বাড়ি যেতে দেয় টান। সেই আশায়………………….বাকিটুকু শুধুই নিরবতা। আবার যেদিন আসবে সেই মুক্ত দিন, সেদিন আবার বলব, ’ঈদ মুবারাক’।
#eidcelebration #dream #exile #Eidjourney #homesweethome