স্কুল পালালেই যদি রবীন্দ্রনাথ হওয়া যায় তবে সেটা আমারও হবার কথা। ক্লাস এইট পাশ করার পরে বাকি দুই ক্লাসে বলতে গেলে স্কুলে যাইইনি। কলেজে হাতে গোনা দুই/তিন দিন। ইউনিভার্সিটিতেতো চেহারাই দেখাইনি।
আমার একজন বন্ধু Shamim Ahmed Jitu কানাডায় আর আরেকজন Mahmud তুরষ্কে পিএইচডি করছেন। ইউনিভার্সিটির পরিচীতদের মধ্যে অন্তত ৫ জন করেছেন। কয়েকদিন আগে একজন পিএইচডি করতে চাওয়া হলমেট Moshiur Rahman আমার কাছে এসেছিলেন গার্মেন্টস সেক্টর নিয়ে কিছু তথ্য ও আইডিয়া জানতে। এই মানুষগুলোর ধৈর্য ও লক্ষ্যস্থীরতাকে আমি প্রণাম করি।
জীবনের প্রায় ১৮-২০ বছর পড়াশোনা করে তারপর যে আবার কেউ পড়াশোনা করার ইচ্ছা পোষণ করতে পারে, সেটাই আমার মাথায় ঢোকে না। আমি আমার আজীবন ক্লাস, পরীক্ষাকে ঘৃনা করেছি। আমার যতটা মনে পড়ে, ক্লাস ৫ পাশ করার পরে কোনো ক্লাসের কোনো পরীক্ষাই আমি জ্বর বা কোনো অন্যরকম অসুখ না নিয়ে সুস্থ্য শরীরে দিতে পারিনি। ওই সময় কারন বুঝতাম না। বড় হয়ে বুঝেছি, ওই অসুস্থ্যতার কারন ছিল পরীক্ষা ভীতি কিংবা মানসিক বিতৃষ্ণা। তীব্র বিতৃষ্ণা নিয়ে ক্লাসে গিয়েছি। যতক্ষণ ভিতরে থেকেছি, মনে হত জাহান্নামী আজাবে আছি। কখন ঘন্টা পড়বে আর কখন স্যার যাবে-সেই চিন্তায় অধীর হয়ে ক্লাসে ব্যাপক মনোযোগী (!) থাকতাম।
প্রথাগত শিক্ষাপদ্ধতিতে আমার কোনোকালেই বিশ্বাস ছিল না। আজও নেই। বড় হয়ে চিন্তা করতাম, আমি কেন স্কুল পালাতাম? কেন ক্লাসে যেতে আমার এত অনিহা থাকত?
আজ বুঝি। কারনটা ছিল একঘেয়ে, বৈচিত্রবিহীন, যান্ত্রিক ও নিরানন্দ ক্লাস সিস্টেম। শিক্ষকরা যে পদ্ধতি ও নীতিতে ক্লাসে পড়াতেন তার ভিতরে আমি কোনো আকর্ষন বা আনন্দ অনুভব করতাম না। গৎবাঁধা হোমওয়ার্ক খাতা লেখা, অংক সলভ করা-উফ! শিক্ষক ক্লাসে অংক বা ইংরেজি প্রাকটিস করাতেন না, অংকের মজাটা বের করতে পারতেন না। শুধু নিয়ম করে কতগুলো সলভ দিতেন। আমরা টুকে নিতাম। গৃহশিক্ষকও তাই।
গোটা স্কুলে একমাত্র মজার বিষয় হল, টিফিন টাইমে খেলার সময়টা, শেষ ক্লাসের পড়ে টিফিন খাওয়া আর মাঝে মাঝে ফেয়ারওয়েল হলে নাস্তার প্যাকেট। ফলে ক্লাস হতে কোনো ইনটারেস্ট নিতে না পেরে গোটা সময়টাকে একটা বন্দীদশা হিসেবেই নিতাম। একই কথা ছিল পরীক্ষার ক্ষেত্রে। সারাবছর পড়ে একটা গরু সম্পর্কে লিখতে বলা কিংবা ১০ টা বড় একপাতার প্রশ্নোত্তর ৩ ঘন্টায় লিখে শেষ করার তীব্র চাপ আমার ভাল লাগত না।
পড়াশোনা ছিল স্রেফ ঠ্যাকায় পড়া ঘটনা তখন। ফলে যেদিন মাস্টার্সের শেষ পরীক্ষাটি দিয়ে হলে ফিরি, সেদিনই সব বই, খাতা বেঁধে বাঙ্কারে তুলে রাখি। আর কখনো ধরিনি। এতটাই বিতৃষ্ণা ছিল। অথচ ওই একই বিদ্যা আমি ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবার পরে নিজের গরজে, নিজের আনন্দে শিখেছি। শিক্ষাকে আক্ষরিকভাবেই শিখেছি। অনেকের থেকেই ভালভাবে শিখেছি। শিক্ষাকে নিজের মধ্যে নিয়েছি। কিন্তু নিজের মতো করে, নিজের আনন্দে, বড় হয়ে।
আমাদের স্কুল, কলেজগুলো বই গিলিয়ে, পাতার পর পাতা মুখস্ত করিয়ে পরীক্ষায় লেখার উপযোগী করে তৈরী করার মোক্ষম কারখানা। ছাত্রছাত্রীদের শিখবার আনন্দ বা জানার ঔৎসুক্য তৈরীর ক্ষমতাও তাদের নেই, ইচ্ছাও নেই, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা তার কোনো অবকাশও রাখেনি। তবু আমি ওই ফাঁকি দেয়া সময়টাতে জীবনকে দেখেছি, জগতকে কাছে থেকে দেখেছি, জীবনকে নিজের মতো করে এক্সপিরিমেন্ট করতে পেরেছি, ক্লাস, স্কুল ফাঁকি দিয়ে নিজের যা ভাল লেগেছে করেছি, হাটে মাঠে বেড়িয়েছি, স্কুলে না গিয়ে মার্বেল খেলেছি, ঘুড়ি উড়িয়েছি, পথে পথে হেঁটে পাখি দেখেছি, গাছের নাম চিনেছি, নদীর পাড়ে বসে উদাস হয়েছি।
কিন্তু নো স্কুল। আজও আমার সেই খাসলত পুরোপুরি যায়নি। সময় পেলেই বেড়িয়ে পড়ি অগ্যস্ত হাঁটতে। গন্তব্যবিহীন, লক্ষ্যহীন। আমি খুব বড় মাপের কেউ হতে পারিনি জীবনে। না বড় ব্যবসায়ী, না বিশাল কর্পোরেট পারসন, না একজন ভূবনবিখ্যাত লেখক।
কিন্তু হ্যা, আমি আমার মতো হতে পেড়েছি। যা হতে চেয়েছি। যেমনটা হতে চেয়েছি। পথ আর বই আমাকে আমার আমি বানিয়েছে। তাতে কোনো দুঃখ নেই।
It’s my life. My life is my life. I will live it in my way.
#school #escapeclass #education #grooming #childhood #selflearning #repentence #ExcapeSchool #UnconventionalLearning #Bohemian