ছোটবেলায়, এই ৫ বা ৬ ক্লাসে পড়ার সময় খুব অসুখ করত। মাসের একটা বড় সময়ই অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকতাম। কলোনীর ছেলেরা যখন দলবেঁধে বিকেলে বৌচিঁ কিংবা দাড়িয়াবাঁধা খেলতে যেত, আমি তখন বিছানায় জ্বরে ছটফট করতাম। মনে হত, জ্বর না হওয়াটাই জীবনের সুখের উৎস। বড় হলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম। আমাদের বয়সে ২০০০ সালের দিকে বা এমনকি এখনো, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব ছাত্ররা ভর্তি হন, তাদের সিংহভাগই মফস্বল বা গ্রাম হতে আসা নিম্নমধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত ঘরের সন্তান। একটি টিউশনি বা অন্য কোনো অড কাজ করে পড়ার ও নিজের খরচ যোগাবার তাড়া যে তাদের কতটা সেটা লেখায় বোঝানো দুষ্কর। তখন মনে হত, একটি টিউশনি পেয়ে গেলেই সুখ চলে আসবে জীবনে। ফাঁকিবাজি বা পেটের ধান্দায় ব্যস্ত থাকায় সময়মতো পরীক্ষার প্রস্তুতি হত না। হঠাৎ পরীক্ষার ডেট দিত। অপ্রস্তুতিতে বিপদে পড়তাম। হঠাৎ কখনো কখনো ধর্মঘট পড়ে যেত আর পরীক্ষা পেছাতো। মনে হত, ধর্মঘটের মতো সুখের কোনো বিষয় নেই। অতঃপর চাকরীর বাজারের উমেদার হলাম। মনে হতে লাগল যেকোনো প্রকারের একটা কিছ হয়ে গেলেই সুখ কিনে ফেলব পাইকারী দরে।
আরো পরে বিয়ে। সেই একই ইচ্ছে। কিন্তু জীবনের আধাপড়ন্ত বেলায় এসে যদি হিসেবের খেরোখাতাটা মেলাতে বসি, তবে কতটা হিসেব মিলবে? সুখ কতটা কিনতে পারলাম? আজীবন জেনে এসেছি ‘পড়ালেখা করে যে, গাড়িঘোড়া চড়ে সে’। তাই বাউন্ডুলে ছোটবেলাটায় সবাই যখন দস্যিপনা করে জীবনকে উপভোগ করে নিচ্ছে, তখন আমি পড়ার টেবিলে ঘাড় বাঁকা করে বসে পাঠাভ্যাস করছি। দস্যিপনাময় শৈশবের সুখ হতে বঞ্চিত হয়েছি। স্কুলে গেলাম। হাইস্কুলে। একটু বেশি বয়সে। দস্যি সহপাঠিরা পাশের গার্লস স্কুল বা আরেকটু দুরের কমবাইন্ড স্কুলের গেটে আনাগোনা শুরু করল। কী এক নিষিদ্ধ সুখ সেই ঢুঁ মারা জীবনে। বাবা-মা’র শিক্ষা (বা চোখরাঙানী) ওপথে যেতে আঁটকালো। কিশোর বয়সের সেই নিষিদ্ধ সুখ হতে বঞ্চিত হলাম কোনো এক অজানা বড় বয়সে সুখী জীবন গড়ার আশে। সুখ নাকি বিকোয় পয়সায়। ঢাকার রাস্তায় গাঁটের কড়ি থাকলে সুখ কিনে নেয়া যায়। উদ্যানে, ফুটপাতে, অন্ধগলিতে, ঝোপেঝাড়ে, সীসাবারে, হলুদ পানীয়ের পানশালায়, রঙ্গমঞ্চ, মাজার, ওপেন এয়ার, লাইভ, ডিজে-কড়ি ফেললে কত কত সুখের হাতছানি। দু মিনিটের সুখ, দু’ঘন্টা বা একরাতের সুখ। জলীয় বা বাষ্পীয় সুখ। চোখের সুখ, পেটের সুখ, চকিতে সুখ, মুফতে সুখ। পয়সার গাছ খুঁজতে লাগলাম একটা সময়। এ ডালে ও ডালে সুখ মানে পয়সা খুঁজি। অন্যরা পায়, আমি পাই না। জীবনে সব শুরু করেছি দেরীতে। পয়সার সুখ খুঁজতেও দেরী হয়ে গেল। যতক্ষণে তার হদিস পেলাম, ততক্ষণে অনেক দেরী করে ফেলেছি। অন্যরা তার দখল নিয়ে নিয়েছে। কড়ি খোঁজায় মন দিলাম। দেখি, শুধু কব্জির জোরে বা ব্রেনের ধুসর অংশের তদবীরে কড়ি মেলেনা। লাগে আরো কাবেলিয়াত। কড়ির গাছের সন্ধান করি অনলাইনে, অফলাইনে। কড়ির সন্ধানে ঘুরি রাস্তায়, ঢুঁ মারি অন্যের চৌহদ্দিতে। আমড়াগাছি করি সিনিয়র, জুনিয়র-সবাইকে। তবু দেখি কড়ি ধরা দেয় না হাতে। অধরা কড়ির জন্য হা হুতাশ। কড়ি ঢুঁড়ে বড্ড অসুখ। সুখ খুঁজি চকচকে নতুন নোটে, নতুন গজানো সম্পর্কে। সুখ নাকি কড়িতে জোটে, সুখ আছে পুরোনো দাম্পত্যে। সুখ ধরি চশমার ঘোলা কাঁচে, বেঁচে থাকার মহারণে, সুখ চাই কয়েক মুহূর্তের সবেগ অবদমনে। লেখাপড়া করে যে, গাড়িঘোড়ায় চড়ে সে। ছোটবেলায় শেখানো এক মহান আপ্তবাক্য। কখনো কখনো মনে হয় এর চেয়ে বড় মিথ্যা কথা বোধহয় আর নেই। অন্তত আমি তো তার কোনো সাক্ষ্য কোথাও দেখি না। হ্যা, লেখাপড়া করে গাড়ি চড়ি বটে, তবে সেটা নিজের না। পরের কামলা দিতে আদর করে গাড়িতে নিয়ে যায়। কামলা দিতে বিশাল চার চাকার বাস গাড়িতে রোজ বাদুড়ঝোলা হয়ে আপিসে যাই। আমাকে হিংসুক ভাবতেই পারেন। হ্যা, আমি হিংসে করি। হিংসে করি জগতের সব সুখী মানুষকে। সব তৃপ্ত পুরুষকে। সব আদরে আদরে নষ্ট নারীকে। আমি ইর্ষায় পুড়ি কারো সাজানো বাগান দেখে। সন্তান সুখে গরবিনী দম্পতিকে দেখে ইর্ষা করি। ঝা চকচকে গাড়িতে তুলে দিয়ে শক্তিমান পুরুষ যখন সদম্ভে লাগায় SUV’র দরোজা, আমি সেই স্পর্ধিত পৌরুষত্বকে হিংসা করি। হাজার হাজার লাইক কমেন্ট পড়ে যখন কারো লেখায়, আমি জ্বলে পুড়ে মরি অকারন আক্রোশ আর হিংসায়। অন্যের সুখে আমার বড্ড অসুখ। অন্যের সুখ সয় না চোখে আমার। প্রশান্ত সরল স্বীকারোক্তি এ আমার। আমি মানুষটা বড্ড ইর্ষাকাতর। অন্যের সুখে আমার হিংসে প্রচন্ড, বুকে বাঁজে চাপ চাপ ব্যথা প্রকান্ড। অন্যের বিত্ত, সুখ, অন্যের বৈভব, চোখ টাঁটানো আমার মজ্জাগত স্বভাব।
কেউ দু’কলম ভাল লিখলেও আমি ইর্ষায়, জ্বলে পুড়ে মরি হতাশায়। আমি খালি মিলিয়ে নিতে চাই আদর্শ লিপির শ্লোক আর বাস্তবতাকে। বাস্তবতা মিলাতে গেলে দেখি, গাড়ি, বাড়ি, জমি, প্লট, ফ্ল্যাট, স্লট, স্ট্যাটাস, দহরম, মহরম-লক্ষীদেবীর আশির্বাদ সব সেইখানেই যাচ্ছে যেখানে স্বরস্বতি দেবীর চরম অভিশাপ। আমার অনুজ প্রায়ই আমাকে হতাশ হয়ে বলে, দাদা, লেখাপড়া করে তবে কী হল? চার চারখানা ডিগ্রী নিয়ে শেষতক সেই ৯-৫ টা কামলা আর উদয়াস্ত খেটেও জীবনের শেষ দিনগুলোর জন্য ছটাকখানিক সঞ্চয়নও না থাকা। নানা মিথ্যে (বা সত্যি) প্রবোধে তাকে থামাই। কিন্তু পরক্ষনে নিজেকে নিজে শুধাই, আসলেই কী হল? তবে কি বিদ্যার্জনে ঘাটতি ছিল? নাকি ব্রান্ডিং (আসলে আপনা ঢোল আপনি বাজানা) এর ঘাটতি? নাকি বিদ্যার্জন বিষয়টা স্রেফ ফাঁকি? ফ্রাস্ট্রেশন। ফ্রাস্ট্রেশন। কেউ যখন চেকইন দেয় ফাইভস্টারে, আমি তখন চেকইন করি মধ্যবিত্তের দু’কামরার সস্তা ফ্ল্যাটে। বিপিএলের টি টুয়েন্টি মজা উপভোগের সুখে মত্ত যখন ঢাকাবাসি, তখন রাতের বাজারে উচ্চবিত্তের উচ্ছিষ্ট কিনে গৃহলক্ষীর পদতলে ঢেলে দিয়ে সুখ প্রকাশের ব্যর্থ চেষ্টা। দু’টো বাড়তি কড়ির সন্ধানে ছুটির দিনের সুখ পায়ে ঠেলে বাড়তি কর্মসাধনের চেষ্টা। কড়ি জোটে খানকতক। বিনিময়ে পরিবারের দাম্পত্য সুখ লাটে ওঠে। দু’টো ছানাপোনা না থাকলে সুখ অধরা থেকে যায়। আবার তেনারা এলে পুরুষের নিজস্ব রকমের সুখে ব্যঘাত ঘটে। সুখ নিয়ে অসুখের কারবার। প্রিয় প্রেমকে যখন নিজের করে ঘরে নিয়ে আসতে পারি তখন মনে হয়েছিল পৃথিবীর সবটুকু সুখ বোধহয় জয় করতে পারলাম। নতুন করে সস্তা উপাচারে আমার জীর্ন ঘর সাজানোর সময় সে যখন ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে তবু একটা চোরা হাসি দিত, বুকে বাঁজত কী অনাবিল সুখের বান। আবার সেই প্রিয়তমের সাথেই কারনে অকারনে, তুচ্ছ বিষয় নিয়ে যখন অভিমান করি, মনে হয়, মরে যাব অসুখে। মনের অসুখে। সুখ বলতে তখন শুধু মনে হয় বিরহের বিপরীতকে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, বড় প্রেম শুধু কাছে টানে না, দূরেও সরিয়ে দেয়। প্রেমের মরা জলে হয়তো ডোবে না। কিন্তু তার ইর্ষার আগুনে পুড়ে, অভিমানের হুতাশনে অঙ্গার হয়ে, বিচ্ছেদের অগ্নিস্নানে প্রজ্বলিত হয়ে সুখের আঁশে ধুকে ধুকে মরতে তো কোনো বাঁধা নেই।
সুখের লাগিয়া পথে পথে ঘুরি,
নাহি মেলে তার বাও;
সুখের ছুরতে যাহা ছবি আঁকি,
নাহি বুঝি তার ভাও।
সুখ সুখ করি কাঁদি আমি সারা,
তবু নাহি আসে গৃহে;
সুখের মুখোশে রাশি রাশি দুখ,
অনলের সম দহে ।
#inthepursuitofhappiness #happy #success #middleclasslife #nakedlife #thuglife