Skip to content

শারদীয়া পার্বণ আর আমাদের মৌসুমি সাম্প্রদায়িকতা

  • by

সে বহু বহুকাল আগের কথা। যখন আমেরিকানরা লুঙ্গী পড়িত না।

তখন আমাদের পাড়ায় দুইখানা পুজা আয়োজন হইত। একখানা পাল পাড়ায়। একখানা বাসাবাটি কৃষ্ণচূড়া তলায়। গরিমা ও অাভিজাত্যে কৃষ্ণচূড়ার পুজা অনেক চাকচিক্যময় ছিল। সে তুলনায় পালপাড়ার ঠাকুর হয়তো কুলাইয়া উঠিতেন না।আমরা ছেলেবুড়োরা সেকালে আজিকার মতো নব্য ডিজিটাল ধার্মিক হইয়া উঠি নাই। সবাই সবাইকে চিনিতাম। কেহ কাহারো ধর্ম লইয়া মাতামাতি করিতাম না।

সামাজিক মিথস্ক্রীয়ার স্থলে আমাদের ধর্ম পরিচয় আমাদিগের সম্পর্ক নির্ধারনের মাপকাঠি তখনো হইয়া উঠে নাই।

সেই কালের পূজার স্মৃতি খুব বেশি স্মরনে আসিতেছে না। কেবলি স্মরন আছে, পূজা আসিলে ইক্ষুরস মিষ্ট হইবে আর ইলিশ সস্তা হইবে-মাতার এমন আশ্বাস বাণীতেই পূজার জন্য আগ্রহ বাড়িত। কারন, বিশ্বাস করিতাম, পূজা আসিলেই গৃহে ইক্ষু খরিদ করা হইবে। আর ইলিশেও সস্তা দর ও স্বাদ ফিরিবে। আমাদের কৃষ্ণচূড়া তলার পূজার আয়োজন শুরু হইত প্রায় মাস দেড়েক বা তারও আগে।

আমরা কাচ্চাবাচ্চারা প্রতীমা দেখিতে উঁকি ঝুঁকি মারিতাম। পুরুত ও ঠাকুর তাহা দিতেন না। চক্ষু দানের আগে নাকি দেখিবার নিয়ম নাই। আমরা তাও ঝুঁকি লইতাম। রঙে রঞ্জিত প্রতীমার চাইতে আমাদের কাঁচা মাটির প্রতীমা বেশি ভাল মনে হইত। কেমন যেন, মাটির মানুষের মতো মনে হইত।

পালেরা কী করিয়া যে এক তাল মাটিকে প্রাণের অবয়বে পরিবর্তন করিতেন, তাহা আমাদের কাছে এক রহস্য মনে হইত।

আমাদিগের শৈশবের প্রাইমারী স্কুলের সিংহভাগ শিক্ষিক শিক্ষিকাই ছিলেন সনাতন। পূজা আসিলেই আমাদের দিন আর কাটিত না, কবে ওনারা নাড়ু আর সন্দেশ খাইবার জন্য গৃহে নিমন্ত্রণ করিবেন। তখনকার দিন সমাজের মানুষগুলি আজিকার মতো এমন নিরস, সম্পর্কহীন, ব্যক্তিকেন্দ্রীক হইত না। আমরা শিক্ষকদের গৃহে নিমন্ত্রণ খাইতাম। তাহারাও ইদে আসিতেন। আমরা উহাদের কাঁচা গো-মাংস সাধিব কিনা আর ওনারা আমাদের গাত্রবলে ত্রিশুলে বিদ্ধ করিয়া ধর্মান্তরিত করিয়া ফেলেন কিনা-সেই কল্পিত আতঙ্কে আর হিংসাত্মক মনোবৃত্তিতে পুড়িতাম না।

আজিকার মতো এমন অদ্ভূত সাম্প্রদায়ীক সমাজদর্শনের বিষবাস্প তখনো সমাজকে কলুষিত করিয়া উঠে নাই। পূজার নবমীতে অবশেষে নিমন্ত্রণ হইত।

আমরা ছেলেমেয়েরা দল বাঁধিয়া শিক্ষকের গৃহে নাড়ু, গজা, লুচি আস্বাদন করিয়া আবার পোটলায় বাঁধিয়া লইয়া গৃহে ফিরিতাম। এলাকার অন্যান্য সনাতন গৃহে দফায় দফায় নিমন্ত্রণ রক্ষা তো ছিলই।

পূজার দিনগুলিতে, আর তার পরেও যতদিন স্কুল হইত, সনাতন বন্ধুদের নাড়ু নিয়া স্কুলে আগমন ও উহাতে হামলা-উভয়ই আমাদের হাস্য পরিহাস ও স্ফুর্তির কারন হইত। তখনকার দিনে হাতুড়ি বোমা (আমরা কহিতাম আতুড় গোম) খুব জনপ্রিয় আছিল। জেষ্ঠ ভ্রাতারাই কেবল উহা ফাটাইয়া বিকট শব্দ করিয়া মজার কারন ঘটাইতে পারিতেন।

আমরা শুধু দর্শক। আজিকার মতো তখনকার শিশুদের নিকট অপর্যাপ্ত অর্থ সমাগত হইত না। তাই আতুড় গোম কিনিবার সামর্থ্য তখন আমাদের হইত না। আমাদের দৌড় আছিল, স্কুলের রাস্তায় বসা মেলা হইতে দুই টাকার কোবরা গুলি ও টীনের পিস্তল কিনিয়া ডাকু ডাকু খেলার অস্ত্র হাসিল করা, শোলার টোপর, দুই টাকার মুড়ালি ইত্যকার জিনিসে কোচড় ভরিয়া গৃহে প্রত্যাবর্তন করা। কোচড় বলিতেছি, কারন তখনো শিশুরা পান্তালুনে ততটা জাতে উঠে নাই। তাই লুঙ্গী ও একপ্রকার ইলাস্টিক দেয়া ঢোলা হাফপান্তালুনই ছিল ভরসা।

আজকে অর্বাচীন পুরাকালের সমাজের পূজাসহ সার্বজনীন সব উৎসবকে যখন আপনারা অ্যামাজন.ইন, মান্ত্রা, আড়ং, ভরং, ডিশ টিভি, স্মার্ট ফোন দিয়ে রাঙিয়ে উৎসবকে কার্নিভালে আর আনন্দকে মাস্তিতে রূপান্তর করে ফেলেছেন, তখন আমাদের সেই দিনগুলোর মতো প্রাণখোলা আনন্দ, ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা, সরলতা সুদূর পরাহত। আজ হয়তো উৎসব আছে, প্রাণটা নেই।

সে সব উৎসবেই। সার্বজনীন উৎসবগুলো আজ সাম্প্রদায়ীকতার বিষবাস্পে বিষাক্ত।

আমার না তোমার, আমরা না তোমরা-সেই প্রশ্নই আমাদের দুই মেরুতে চিরে বিভক্ত করে দিচ্ছে আমাদের একদা এককালের বঙ্গীয় সমাজকে। তাই আর কথা নাই বা বাড়ালাম।

#Durgapuza #CommunalHarmony #ReligiousBrotherhood #Resilience

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *