টিভিতে আজকাল ‘যুক্ত’ হবার খুব বাজার কাটতি। সবাইই যুক্ত হতে উদগ্রীব। যুক্ত হবার ক্রেইজে সবাই তারকা, সবাই বিশেষজ্ঞ। আজীবন অকাজ-কুকাজ করে পার পেয়ে গিয়ে কোনোমতে অবসরে যেতে পারলেই, ব্যাস, তিনি বিশেষ অজ্ঞ।৩ দিনের ব্যাপক দক্ষযজ্ঞ শেষে ৯০ মিনিটের ইন্টারভিউ টেক-সেখান থেকে ১১ সেকেন্ড টেলিকাস্ট করা-তার নাম এক্সপার্ট’স অপিনিয়ন।
আপনি যে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নন, সেই বিষয়ে মতামত প্রকাশ করতে বাধা নেই। তবে, বিশেষজ্ঞ মতামত প্রকাশে অসুবিধা আছে। যেমন ধরুন, আপনি ভূ-তত্ববীদ নন, আবহাওয়াবীদ নন, তাহলে ভূমিকম্প বিষয়ে আপনার নিজস্ব ভাবনা প্রকাশ করতে বাধা নেই। কিন্তু, সেই ভাবনার আগে পরে মেনশন করে দিন, যে, এগলো আপনার একান্ত নিজের চিন্তা মাত্র, এগুলো বিশেষজ্ঞ পরামর্শ নয়।
জ্বি হ্যা, নিজে যে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নন, সেই বিষয়ে পাবলিক অ্যাডভাইস দিয়ে, বা শেয়ার করে আরও বিপদ বাড়াবেন না। বঙ্গীয় অনলাইন মাধ্যম ভূমিকম্পের কনসালট্যান্সিতে ছেয়ে গেছে। সবাই এক্সপার্ট। সবাই দিচ্ছে, আমিও একটা দিয়ে ফ্লোতে থাকার চেষ্টা করছি। ব্যাস। সেটা সত্যি কিনা, সঠিক কিনা, কোনো এক কানা কুদ্দুস সেটা চ্যাটজিপিটি দিয়ে বানিয়েছে কিনা-ভাবার বালাই নেই। শেয়ার শেয়ার শেয়ার। মজার বিষয়, ভূমিকম্প সারা বাংলাদেশকে কার্যত প্রায় ডিসঅ্যাসটারের মতো একটা ঝাঁকি দেবার ১৫ মিনিটের মধ্যেই সুদৃশ্য ফটোকার্ডে ছেয়ে গেছে বঙ্গীয় অনলাইন আকাশ।
ভাল কথা, কোনো বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হবার জন্য উগান্ডেশে ঠিক কী কী দরকার হয়?
জনপ্রিয়তা থাকা?
জননন্দিত বা স্বীকৃত হওয়া?
জনসম্পৃক্ত হওয়া?
ভাইরাল হওয়া?
আলোচনায় থাকা?
টিভিতে মুখ দেখানো?
পত্রিকায় কলাম লেখার অভিজ্ঞতা?
দশটা ডিগ্রী থাকা?
এই যে পত্রিকায়, টিভিতে, ইউটিউবে, লিংকডইনে, ফেসবুকে ভূমিকম্প বিষয়ে অনেক বিশেষজ্ঞের কলাম, ফিচার, বক্তব্য, আলোচনা পড়ছি, তারা বিশেষজ্ঞ হলেন কোন পন্থায়? একটা ট্রেডে ২০ বছর চাকরি করলেই তাকে বিশেষজ্ঞ বলে?
এই যেমন, বাংলাদেশের আমলা। সারাজীবন যেনতেনভাবে কাটাতে পারলেই তারপর অবসরের পরে তিনি হয়ে যান ঝানু আমলা। বাস্তবে হয়তো চিঠি সাক্ষর করা ছাড়া তার আর কোনো কেরেদদারী জীবনে কখনো ছিল না। অভিজ্ঞতাকে বিশেষজ্ঞতার নামান্তর ভাববার এই হাওয়া কীভাবে বঙ্গীয় ভূখন্ডে আমদানি হল?
পর্যটন দিবসে বাংলার গর্ব এক বিশ্ববিদ্যালয়ের টুরিজ্যম বিভাগীয় একজন মহান অধ্যাপকের ইন্টারভিউ নেয়া হল। ৭ সেকেন্ড প্রচার, যার বক্তব্য হল, “টুরিজ্যম আবার ঘুরে দাড়াতে হলে সরকারকে অবশ্যই তাদের পাশে দাড়াতে হবে।” ব্যাস, এটুকুই। এই মহান জ্ঞান দেবার জন্য একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ব্যস্ত শিডিউলের ফাঁকে টিভি স্টোরি নির্মাতাকে সময় দেন। তাও আবার করোনার ঘরে থাকা কোরবানি করে।
টিভিতে যুক্ত হন বড় বড় ষাড়রা। যুক্ত হবার বিষয়টাতে এখনো অনভ্যস্ত হওয়ায়, যুক্ত হবার পরেও তারা ইয়ারফোন, টাই, চুল, কোট, হেডসেট, ওয়েবক্যাম ঠিকঠাক করতে থাকেন। অতঃপর খেলা (মানে যুক্ত হবার টকশো) জমে ওঠে। মজার বিষয় হল, যখুনি টকটক, মানে ঝগড়া ও যুক্তি জমে ওঠে কিংবা যখুনি ওই ***টকমারানি (ভাষাটা এক সুহৃদের কাছে শেখা) এশটাবলিশমেন্টের বিষয়ে মারাত্মক বা বেফাঁস কিছু বলে বসবেন অথবা কোনো বেওকুফ দর্শক উটকো প্রশ্ন করে বসেন ঠিক তখুনি চতুর এ্যাংকর বিজ্ঞাপন বিরতির ঘন্টা বাজিয়ে দেন, “আমরা নিয়ে নিচ্ছি একটি ছোট্ট বেরেক, বিরতি হতে এসেই আপনার প্রশ্নের জবাব দেব।” আজ তক দেখলাম না, বিরতির পরে ওই প্রশ্ন বা প্রসঙ্গ আর রিভাইভড হতে। ওই বিরতির ফাঁকে, হয় ওই প্রশ্নকর্তা গুম হয়ে যান, অথবা ওই বিশেষ-অজ্ঞকে আন্ডা থেরাপী দেয়া হয়। তবুও তারা ’যুক্ত’ হবার নেশায় টিভিতে যান।
মনে পড়ে গেল, একবার একদল সুহৃদ এলেন, তাদের নব-নির্মীয়মান বায়বীয় সংগঠনে আমি যাতে ‘উপ-দেষ্টা’ পদ অলংকৃত করি-সেই অনুরোধ নিয়ে। আমি সসংকোচে বললাম, ভাই উপদেষ্টা হবার মতো কেউ তো আমি হইনি। উপদেষ্টা হবেন আরো বড় ষাঁড়রা। আমাকে দিয়ে যদি কোনো কাজ হবে বলে মনে করেন, তাহলে আমাকে ‘প্যাট্রোনাইজার’ বা ‘ওয়েল উইশার’ এরকম যেকোনো একটা রূপে দেখাতে পারেন। এই পাঁকনামি করার কারনে আমার আর উপদেষ্টা হয়ে ওই সংগঠনে ‘যুক্ত’ হওয়া হল না।
আরেকবার একজন সুহৃদ তাদের অনলাইন ম্যাগাজিন বা নিউজ পোর্টালে আমার একটা ইন্টারভিউ ছাপানোর প্রস্তাব করলেন। আমাকে একটা লিখিত প্রশ্নোত্তর পাঠালেন। দুঃশ্চরিত্র আমি সেটা পড়ে বললাম, ভাই, এই প্রশ্নগুলো বেশি ফোকাস করছে আমি ও আমার সুনাম নিয়ে। আমাকে নিয়ে। তার চেয়ে ভাল হবে, যদি আমার দর্শন ও অভিজ্ঞতাকে হাইলাইট করে, আমার পেশার বিভিন্ন খুটিনাটি নিয়ে প্রশ্ন’র সেট বানানো হয়। আমি কে-সেটাকে ফোকাস করে কী লাভ হবে অন্য পেশাজীবিদের। আমি তো ভোগ ম্যাগাজিনে অথবা টাইম ম্যাগাজিনে নিজেকে বিক্রী করতে চাই না।
তিনি সেই এঙ্গেল একসেপট করলেন আর কথা দিলেন, শীগগীরই প্রশ্নের সেট পরিমার্জন করে আবার ফিরবেন। সেই দিনটা আর কখনো আসেনি, আমারও আর ম্যাগাজিনের কভার গার্ল হওয়া হয়নি। [না, আমি কিন্তু ক্ষুদ্ধ নই মোটেই। নিশ্চয়ই মানুষের নিজস্ব একটি ব্যস্ততা ও বাস্তবতা থাকে।]
ইদানীং ‘সার’ বা ‘ষাড়’ বিক্রীর একটা দারুন চল হয়েছে কর্পোরেট হাটে। সেটা হল, উদীয়মান বা উদয় হতে ‘চনচনায়মান’ কোনো ব্যক্তি বা ফেসবুক গ্রূপ তাদের স্বল্প পরিচীতিকে আরো চাগিয়ে তুলতে অথবা স্রোতের সাথে গা মেলাতে একটা জোড়াতালি মার্কা ট্রেইনিং বা লার্নিং সেশন নামের গোঁজামিল আয়োজন করবেন। ৩ ঘন্টার ট্রেইনিং। তার ১ ঘন্টা যায় চা খেতে, গলা খাকারি আর বক্তার পরিচয় দিতে দিতে। আমার মতো খ্যাতির পাগল বক্তারা ওনাদের শিকার। এই শিকারদের ওনারা মাগনা তথা বিনা সম্মানীতে হায়ার করে খেলতে নিয়ে যান। আমরাও যাই নিজেদের বাজার দর বাড়াতে।
তো, এরকম একটা মজমায় একবার দাওয়াত পড়ল। গ্রাজুয়েট শিক্ষার্থীদের ১ টা ক্লাস নিতে হবে। নিলাম। কথা ছিল, প্রথম ক্লাসে নিজেকে যোগ্য প্রমান করতে পারলে ২য়টাও নিতে হবে। ভাল করলাম। করার পরে তো আমার দর বেড়ে গেল। জানতে চাইলাম, লেচকার দিয়ে কোনো পয়সা কড়ি পাব কিনা। ব্যাস, আমার দ্বিতীয় প্রেম আর এলো না। বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টারী করার ওখানেই ইতি।
আরেকবার আরেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সামনে এইচআর নিয়ে ’লেচকার’ দেবার ডাক পড়ল। যথারীতি বিনা মজুরীতে শ্রম। নিলাম তাও। শত হোক, আমিও তো রক্তমাংসে গড়া। খ্যাতির আশায়, ভবিষ্যতে দর বাড়ার আশায় গেলাম। এক পেটা খাওয়াল। অনুষ্ঠান শেষে একটা কাঠের টুকরা উপহার দিল (ক্রেস্ট)। আগামীতে অবশ্যই যেন আবার গিয়ে তাদের আবার ধন্য করি, সেই অনুরোধ বারংবার ব্যক্ত করল। তবে সেই ’আগামী’ আর কখনো এলো না।
পেশাজীবি জগতে খ্যাত ও অখ্যাত, সেলেব ও ক্ষ্যাত, অস্তায়মান ও উদীয়মান-সবরকম তারকাদের বিক্রী বাট্টার একটা ভাল বাজার চালু হয়েছে। আমরা হায়ারড হয়ে নানা অনুষ্ঠানে আধাঘন্টার জন্য ওয়ায়েজীন স্টারদের মতো হাজির হই। একটুকরা ফ্রুট কেক, কোক, ঠান্ডা কফি, স্যান্ডউইচ দিয়ে, অনুষ্ঠান শেষে অর্থহীন স্তুতিতে খুশি করে, গ্রূপ ছবি তোলার সুযোগ দিয়ে অতঃপর কাঠের টুকরো ধরিয়ে বিদায়। সেসব জ্ঞানোন্নতি সভায় কেউ শিখতে যায়ও না, কেউ শেখাতেও না। পুরোটাই শো-অফ ও দর বাড়ানোর মজমা।
এভাবেই চলছে মেধা কেনা, মেধা বেঁচা, আমাদের বহুল আলোচিত লারনিং ও গ্রূমিং দুনিয়া। আর ওদিকে টিভিতে চলে যুক্ত হবার মচ্ছব।
#selfbranding #selfpromotion #selfmarketing #personalbranding #showoffatitsbest #exhibitionism #TRPaholic #fameseeker #attentionseeker #connectivity #popularity #celebrityaholic #Expert #Bureaucrat