Skip to content

মৃত্যু নামক অপরাধের কাফফারা

  • by

আমাদের দাহকালে ভিউ ব্যবসা তার সুপার পিকে পৌছাবে। সেই সময়ে দেখবেন, কারো *মা মারা গেছে, অথবা *সন্তান। ’মানুষ’টা সেই মৃতের সৎকার, কাফন, দাফন, জানাজা, দাহ-পুরোটার ভিডিওগ্রাফি ও লাইভ টেলিকাস্টের রাইট বিক্রী করবেন মোটা টাকার বিনিময়ে। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানী এমনকি হাত পা ছড়িয়ে কাঁদার লোক রুদালিও সাপ্লাই দেবে। মৃতের স্বজনদের কাঁদার সুযোগ ও সময় নেই; তারা তো ব্যস্ত ভিডিও শুটে। চড়া দামে সেই ভিডিও স্বত্ব বিক্রী হবে যে।

এক ভদ্রলোকের খুব প্রিয়, কাছের একজন মানুষের মৃত্যু পরবর্তী দায়শোধ বা ৪০শা’র (যেটি কেউ মরে যাবার অপরাধে তার সন্তান বা বাবা-মা করতে বাধ্য হয়) অনুষ্ঠানে গরুর গোসতের ছালুন, মোলাম আলুর টুকরা, ডেকোরেটর, সেলফি, হাসি মুখে শোক প্রকাশ, পান চিবানো ইত্যাদি দেখে আর সহ্য হল না।

আমি এরকম একটি সেনসেটিভ বিষয়ে কিছু বলি না। প্রত্যেকের তার নিজের মতো চলার পূর্ন অধিকার আছে। কিন্তু এতটা কি?

ফেসবুক, ভাইবার, টুইটারে জন্ম, মৃত্যু, অসুখ কোনো খবর দেবার সাথে সাথে কি ঘটে? আহা, ইস, উহ, ওহ, ইন্না লিল্লা……, জান্নাত নসিব…., দুঃখ ভারাক্রান্ত, জাতির বিশাল ক্ষতি….., তোমার পাশে আছি….., ইত্যাদি। এগুলা পোস্ট হলে যার কেউ মারা যায় তিনি কি করবেন? সান্তনা বোধ?

আপনি নিশ্চিত থাকুন প্রবল বেদনাবোধ থেকে কেউ এগুলা লেখে না। এইসব চোস্ত সান্তনা লিখতে লিখতেই সবাই আই পি এল এর গরম গরম ম্যাচ দেখেন, পুরি সিঙারায় কামড় বসান, দেশের অন্ধকার ভবিষ্যত নিয়ে ভাবগম্ভীর বক্তব্য রাখেন, মদিরার পেয়ালায় চুমুক দেন, গরম কফি খান, রেস্টুরেন্টে বন্ধুদের সাথে কিচেন উইং চিবোন। কোনো কিছুতেই ব্যঘাত হয় না। এইগুলা হইল আধুনিক শোক সিস্টেম। কি দারুন তার কাছে যেতে হয় না, সময় লাগে না, পয়সা খরচ হয় না, গায়ে গতরে খাটতে হয় না, তেমন কোনো এফোর্ট দিতে হয় না। জাস্ট মোবাইলটা একহাতে আর পাগলাপানির গ্লাস আরেক হাতে। ব্যস, আলগোছে কি প্যাড চাপুন আর দু চারটা মুখস্ত সান্তনা বাক্য ছেড়ে দিন অন এয়ারে। দায়িত্ব শেষ।

আগে মানুষ কারো মৃত্যু সংবাদ পেলে দুরদুরান্ত হতে ছুটে যেত, মৃতের বাড়ি খাবার রান্না করে নিয়ে যেত।আজকাল মৃতের লোকেরা হোটেল হতে বিরিয়ানি আনিয়ে নেয় নিজেদের আর আগত লোকদের জন্য। আমি নিজে দেখেছি মৃতের বাড়িতে মিস্টি সাধা হচ্ছে খাওয়ার জন্য, আর বিরিয়ানি অঢেল। আগত ”শোকাহত” মানুষেরা নিজেরা খাচ্ছেন আর নতুন কেউ এলে তাকে সাধছেন।

একটুও বাড়িয়ে বলছি না। কাল হাসপাতালে মাকে নিয়ে অপেক্ষা করতে করতে এই লেখাটা ছোট করে লিখেছিলাম। আমার অগ্রজ কাজি দা আমাকে পজিটিভ হতে বলেছিলেন। কাজি দা, ফেসবুকে, ভাইবারে আহা, উহু, ইন্না লিল্লাহ……, জান্নাত নসিব…. এসবের মানে কি? মৃতের কষ্টে কষ্টিত হওয়া নাকি যার কেউ মরেছে তার নজরে পড়া? তাকে জাস্ট জানানো যে, জ্বি, জনাব, আপনার কস্টে কষ্টিত হইলাম। আর আপনারা নিশ্চিত থাকেন মৃত্যু ও তার পরবর্তী জীবনে মৃতকে নিয়ে যে জগত ও যারা ডিল করেন সেখানে তারা ভাইবার বা ফেসবুক হতে আপডেট নেন না। তারা ফেসবুক ব্যবহার করেন না। তাই ফেসবুকে বা ভাইবারে কতবার ইন্না লিল্লাহ বলা হয়েছে সেটা মৃতের কোনো কাজে আসবে না। পরকালের কর্মীরা এখনও আমাদের মতো এত ”আপডেটেড” না। আপনার শোকে শকড হলে কেউ এত কষ্ট করে শোকবার্তা লেখার (তাও আবার বেশিরভাগ মোবাইলের অতি আয়াসসাধ্য প্রক্রিয়ায়) সময় বা মনবল পেতো না।

আমাকে অনেকে অসামাজিক বলেন। জ্বি, আমি অসামাজিক ও অসভ্য। আমি আমাদের প্রচলিত লোক দেখানো সমাজকে পায়খানার কৃমির!!!! মতো ঘেন্না করি। একজন বাবা, মা, ভাই-বোন বা স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যুতে আমরা অনতিবিলম্বে তার মরে যাওয়ার অপরাধে খাশি জবাই করে, ডেকোরেটর ডেকে, মিষ্টি-দধি সহযোগে আড়ম্বর করে তার দায় শোধ করি।

কেন?

স্বজনহারা একজন মানুষের সামনে আমরা আয়েশ করে খাশির পায়া চিবাই, কোল্ড ড্রিংকস দিতে দেরী হলে বেয়ারাকে ধমকাই, হাসিমুখে পিতাহারা সন্তানটিকে শোক জানাই!, পানের যোগাড় আছে কিনা সে খোজ নেই। “বাবা, তোমার খালাম্মার আসতে পারেনি, নাতীটার পাতলা পা……খানা…………..” মানে বক্স করে বাসায় দাও-এই ধান্দাও করি। ফিরনীটাতে মিষ্টি আরেকটু দিতে হত-মর্মে বিজ্ঞ মন্তব্য করি। বাবুর্চীর বাড়ি কই-জানতে চাই এবং ফরিদপুরের বাবুর্চীর উপরে বাবুর্চী নাই-এই খবর জানান দিই।

মৃতের স্বজনেরা কখনো স্বেচ্ছায়, কখনো অনিচ্ছায়, কখনো নাম কামাতে মৃত্যু উপলক্ষে এই ভয়াবহ অমানবিক, পাশবিক, বিকৃত, নিষ্ঠুর, পৈশাচিক প্রহসনের যজ্ঞটি চাপিয়ে দেই বা নিজেরাই করি। আমার বাবার মৃত্যুর অপরাধে আমার কিছু “শুভাকাঙ্খি”! আমাকে বাবার মৃত্যুর অপরাধে কড়া ভাজা জিলাপী দিয়ে এই অপরাধের দায়শোধ করতে বাধ্য করেন। বাবার শোকে বির্দীর্ন কলিজার এই আমরা, ভাইয়েরা, বোনেরা, আমার মা বাধ্য হই জিলাপীর দরদাম জানতে, পরিমান নিয়ে হিসাবনিকাশ শুনতে। সমাজকে খুশি করতে বাবার মৃত্যুতে আমি সবাইকে মিষ্টিমুখ করাই।

৪০ দিবসের পাপস্খলন দিবসেও খাশি জবেহ করারও একটা মচ্ছব হয়েছিল কিন্তু আমি নিতান্তই দরিদ্র হওয়ায় আর আমার ভয়াবহ আপত্তির মুখে সেটি আর হয়নি। আমাকে কেউ কেউ একটা খোড়া ব্যখ্যা দিয়েছেন পুরো ব্যপারটার।

স্যরি! আমি এই দস্যুবৃত্তিটির কোনো সুশীল যুক্তি শুনব না। স্যরি।

#facebookmania #facebookhype #facebookdestruction #facebooktrend #like #condolence #socialism #hypocrisy #hypocritenation #funeral #death #viewbusiness #viewmania #virtualfeeling #virtualcondolence

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *