Skip to content

বাঙালির পর্যটন মানস

  • by

এক দশক আগে কক্সবাজার আর সেন্টমার্টিন গিয়েছিলাম। একা একা। এবার আবার গেলাম নিটোলকে নিয়ে। দেখলাম আমার দেখা কক্স“বাজার”কে আক্ষরিক অর্থেই বাজারে পরিণত করা হয়েছে। অর্থলোলুপ মাড়োয়ারীরা এই অসাধারন স্থানটাকে স্রেফ একটা নদীর চর বা পরিত্যক্ত ভাগাড়ে পরিনত করেছে। কোনো এক মনীষি ঢাকা শহরকে দেখে বলেছিলেন “বিজ্ঞাপনে মুখ ঢেকে যায়”। কক্সবাজারকে দেখে আমার মনে হল “হোটেল, রেষ্টুরেন্ট আর ফাইভস্টারে বীচ দেখা দায়”। ন্যুনতম কোনো সৌন্দর্যজ্ঞান কী আমাদের নেই? মাঝে মাঝে পত্রিকায় দেখি কোনো সম্ভাবনাময় সৃষ্টি, আবিষ্কার, স্থান বা ঘটনা সম্পর্কে লেখা হয় “সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এটি আরো …………..হত”।

আমি বলি কি, ভাল কোনো কিছুর উপর সরকারের সুদৃষ্টি (বিষদৃষ্টি) যতক্ষণ না পড়ে ততক্ষনই ভাল। কারন নজর পড়লেই বরং সেটা শেষ। একবার সুনজর পড়ল মানেই………. প্রকল্প, এডিবি, একনেক, সংসদীয় কমিটি, প্রকল্প অফিস, এসি গাড়ি, বিষাক্ত ধোয়া,……..অতঃপর জমি দখল, কংক্রিটের জঙ্গল, গাছপালা সাফ, ব্যাঙ এর পোনার মতো হোটেল, ধান্দাবাজ লোকজন, দালাল, নিশীকন্যা, ওয়াটার বোট, ক্যামেরা, শুটিং, টেন্ডার, পরিবেশ দরদী দল, ক….ম বিক্রেতা-সবাই হামলে পড়ে। সুতরাং সরকারের বিষদৃষ্টি পড়ার আগেই যা দুয়েকটা স্পট এখনো নিজের মতো আছে সেগুলো দেখে সারুন। সরকারের বিষদৃষ্টি আর বেসরকারের মায়াবী! (লোলুপ) দৃষ্টি পড়ার আগেই যা করার করুন।

আমাকে আমার একজন অফিসার গাজিপুর সাফারী পার্কে ভ্রমনার্থী একটা দলের বাঘ দর্শন ও তৎসংলগ্ন বিপুল কলকাকলী,”শিৎকার (সরি ওটা চিৎকার)”, ব্যপক কোলাহল-এসবের একটা অডিও ক্লিপ শোনালো। আমি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে পুরোটা শুনলাম।

ছেলে, বুড়ো, বাচ্চা, মহিলারা সমস্বরে ”শিৎকার (সরি চিৎকার)” করে বাঘকে ডাকছে, গালাগাল দিচ্ছে, বাঘকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করছে। এর নাম সাফারি এবং সাফারি ভ্রমন অর্থাৎ পর্যটন? আমি এতকাল জানতাম আর ডিসকভারী বা ন্যাট জিও’র কল্যানে দেখতাম, সাফারি বা গেম রিজার্ভে গেলে তারা যতটা সম্ভব নিরবতা বজায় রাখে, শব্দ করে না যাতে প্রাণীদের স্বাভাবিক জীবন ক্ষতিগ্রস্থ না হয়। আর আমাদের এখানে সাফারি বা চিড়িয়াখানাগুলো পাবলিকের উত্তেজিত আনন্দের খোরাক। আরেকটা কথা। প্রায়ই টিভি বা পেপারে বলতে শুনি-সরকারী-বেসরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই সম্ভাবনাময় স্পটটি অসম্ভব সাধন করতে পারত। দেশকে পর্যটনে আসমানে তুলে দিতে পারত।

আমার মনে হয়-থাক, আমাদের পর্যটন স্পটগুলো বুনো, জঙলা, অবহেলিত, ন্যাচারাল থাকুক। মানুষের একটু দৃষ্টি পড়লেই সেটা শেষ। কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন আর সাজেকের অবস্থা তো দেখছেনই। একটা স্পট একটু নাম করল। ব্যাস, দলে দলে নাম কামানিয়া সদ্যজাত পর্যটক ছুটবে সেখানে। কারণ হল, সবাই “সাজেকে তোলা সেলফি” তার নিজের ফেসবুকে চান।

আমার অনেক সহকর্মী আর পরিচীত লোকজন ইদানীং বেশ পর্যটন করছেন তবে সেটা কয়েকটা টাইপট স্থানেই সীমিত। সেইসব স্থান যেখানে সবাই যায় আর গেলে দুই চারজনকে বলা যায়যে, “জানিস, গেছিলাম………….? এদের একটা বড় অংশই সারাবছর শুক্রবারে ছুটির দিনে লেপের তল থেকেও বের হয়না। তবে শীত আসলেই পর্যটন চেতনা লাফ দিয়ে ওঠে আর সবাই ছুট ছুট “বান্দরবন, সাজেক, কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন……….।

খুব বেশি কাউকে আড়িয়ল বিলে বা চলন বিলে, টাঙুয়ার হাওড়, ষাটগুম্বজ মসজিদ কিংবা ঝিনাঈদহের সুবিশাল আমগাছের বিষ্ময় দেখতে যেতে দেখি না। কারন ওইযে, ওগুলার ফেসবুকীয় বা সেলফীময় দাম কম। আর আমাদের লোকদের পর্যটন তো বোঝেন।

কয়েকদিন আগে পড়লাম, সেন্ট মার্টিনের প্রবালের ৮০% মরে শেষ। ওইযে, পৃষ্ঠপোষকতার ধাক্কা। আমাদের মানুষেরা এখনো সব রকম পশ্চিমা জীবনের জন্য তৈরী না। ম্যাচিওরড না। তাই সাফারি পার্ক বিষয়টা আপাতত “খাঁচাবিহীন চিড়িয়াখানা” নামে চলতে পারে।

সাফারি নামে ডেকে সেটাকে আর হাস্যকর করে তোলার দরকার কী?

#tourism #travel #safari #Bangali

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *