কোনো একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকার সময় আমার অধঃস্তন একজন নিম্নপদস্থ কর্মচারী ছিলেন। অফিসের ডেকোরাম অনুযায়ী আমাকে দেখলেই তিনি সশব্দে একটা স্যালুট দিতেন। অফিসের একজন উচ্চমান কেরানীর প্রতি তার এই প্রোটোকল মানিয়ে গেলেও আমি বড্ড কুঞ্চিত বোধ করতাম।
আমার বলতে খুব কুন্ঠা লাগে, তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। একজন মুক্তিযোদ্ধার কাছ হতে আমার মতো অর্বাচীনের স্যালুট পাবার বিপরীতে, আমার মনে হয়, একজন মুক্তিযোদ্ধাকে সামনে বসিয়ে তার জুতা মুছে দেবারও যোগ্য আমি নই। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে লেখার মতো যোগ্যতা আমার নেই বলেই মনে করি। মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে লিখবার জন্যে আমি অতি তুচ্ছ। যখনি এই নিয়ে কিছু লিখতে বসি তখনি মনে হয়, এতবড় একটি ঘটনাকে আমার মতো ক্ষুদ্র মানুষ কিভাবে একটি ফ্রেমে বাঁধতে পারে যেখানে মুক্তিযুদ্ধ নিজেই কোনো ফ্রেমে বন্দী নয়? মুক্তিযুদ্ধ তো ক্যাজুয়ালী একটি শীতের বিকেলে বারান্দায় চা খেতে খেতে লিখে ফেলার মতো কোনো টপিক না।
লিখতে বসেও তাই বহুবার থেমে গেছি। মুছে ফেলেছি লেখা। আবার পরক্ষনেই মনে হয়, আমি তো মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখব না। আমি লিখব আমার অনুভূতি নিয়ে। আমার কিছু প্রশ্নকে নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে সমসাময়িক বাংলাদেশের অদ্ভূৎ মানসকে নিয়ে। প্রাণহীন আবেগ নিয়ে।
আকাশকে বা সমুদ্রকে নিয়ে হয়তো লেখা যায় না কিন্তু তাদের দেখে ক্ষুদ্র মানবের মনের অনুভূতি নিয়ে লিখতে তো পারিই। সেই ভরসাতেই শুরু করলাম। গল্প লেখাটা আমার আসে না, প্রবন্ধও না। আমি পারি শুধু যা ভাবি সেটাকে কাগজে লিপিবদ্ধ করতে। এমন একজন লিপিকারের কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধের ৪৬ বছর পরে নিশ্চই নতুন কিছু শোনার আশা আপনি করেন না? আমিও ঠিক ওই রকম কোনো ইতিহাস বা প্রবন্ধ লিখিনি। আমি শুধু মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা, শহীদ ও স্বাধীনতা নিয়ে আমার কিছু পর্যবেক্ষণ ও প্রশ্ন এখানে লিপিবদ্ধ করেছি।
আমি দুঃখিত যে, স্বাধীনতা’র চেতনাকে কিংবা মুক্তিযুদ্ধের বিশাল ক্যানভাসকে দুই তিন প্যারায় ব্যাখ্যা করা আমার পক্ষে সম্ভব না। বিধায় আমার লেখাটি বিশাল হয়ে গেছে হয়তো। জানিনা, আপনার ভালো লাগবে কিনা। অবশ্য আজকাল মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে কথা শুনতে আমাদের নতুন প্রজন্মের খুব একটা ভাল এমনিতেই লাগে বলে মনে হয়না। আবেগের বহুধাবিভক্তি আমাদের আবেগকে এমনিতেই ভোঁতা করে দিয়েছে। আমি যেহেতু কোনো স্কলার নই, আমি শুধু আমার মনের কথাগুলোই বলে গেছি।পাশাপাশি লেখার কিছু বিষয়ে কিছু প্রাজ্ঞ মানুষদের লেখার লিংক দিয়েছি যাতে আপনি তথ্য ও সত্যটাকে বিস্তারিত জানতে পারেন।
এক:-
আমার মনে পড়ে, যখন স্কুলে পড়ি, তখন জেলা স্টেডিয়ামে ২৬ মার্চ আর ১৬ ডিসেম্বর জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠান হত। ওখানে নানারকম অনুষ্ঠান, ডিসপ্লে, কুঁচকাওয়াজ, বক্তৃতা দেখে মনে করতাম, স্বাধীনতা যুদ্ধ’র চেতনা বোধহয় এগুলোই।
ডিসপ্লেতে বড় ভাইয়েরা মুক্তিযোদ্ধা, রাজাকার, হানাদার পাক সেনা-এসব নিয়ে নাট্যাংশ প্লে করত। সবটা না বুঝলেও বইয়ে লেখা ভাসা ভাসা মুক্তিযুদ্ধ, মা-চাচীদের মুখে গল্প, নিজেদের কল্পনা-সব মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধ’র একটা নিজস্ব চিত্র মনে তৈরী করে নিয়েছিলাম। ওই সময়ে সমাজের একটা বড় অংশের মুরব্বীদেরকে (কখনো কখনো এমনকি তরুনদেরও) বলতে শুনেছি, ”৭১ এ গন্ডগোলের বছর”……………………….। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, যেই দেশ তার ৩০ লক্ষ ভাই ও বোনের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন দেশ পেয়েছে, সেই দেশের একটা বিরাট সংখ্যক মানুষ ঠিক কোন বিবেকের অনুসমর্থনে হৃদয়হীন এই প্রশ্ন করতে পারে, “সত্যিই কি আর ’৭১ সালে ৩০ লক্ষ লোক শহীদ হয়েছে নাকি?” কিংবা সেই দেশের আপামর ১৭ কোটি মানুষ কিভাবে স্বাধীন হবার সাথে সাথেই তার ৩ লক্ষ সভ্রম হারানো মা বা বোনকে দূরে ঠেলে দিতে পারে ’অচ্ছুৎ’ আখ্যা দিয়ে।
দুই:-
আমি নিজে কোনো রাজনৈতিক দর্শনে বিশ্বাস করি না। কারো বিরুদ্ধেও না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তো কোনো রাজনৈতিক দর্শনের একক মহামানব নন। তিনি তো এই বাংলাদেশ নামক দেশের পিতা। কেউ মানুক আর না মানুক। কী বিশ্বাসঘাতক এক জাতিকেই না ভালবেসে একটি দেশ এনে দিয়েছিলেন তিনি! এমন এক জাতি, যে তার স্বাধীনতা ও জন্মের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে স্বাধীন দেশ পাবার মাত্র ৪ বছরের মধ্যে নৃশংসভাবে খুন করলো। অথবা বলব, খুন করার পরে গোটা দেশের ৭ কোটি মানুষ নিরবে তা মেনে নিল। (অল্প সংখ্যক বীর নিমকহালাল আদম সন্তান বাদে।) আজকে ২০১৭ সালে স্বাধীন দেশের বুকে দাড়িয়ে নব্য দেশপ্রেমিক কত বাঙালী সন্তান অবলীলায় বলে দেয়, “আরে, জানো না তো, অনেক ব্যাপার ছিল!”………………… ধিক, ধিক তোদের। পিতাকে হত্যার কোনো যুক্তি আমাকে দিবি না দুরাচার। পিতাকে খুনের কোনো লজিক আমি শুনব না। তোরা মানিস আর না মানিস, তিনি আমার দেশ ও জাতির পিতা। লজিক যা দিবি, সবই তোদের দুষ্কর্মের গোঁজামিল ব্যাখ্যা। সেই জাতির পরের প্রজন্মই আজকে যেকোনো ঘটনায় রব তোলে, “গেল, গেল, দেশের স্বাধীনতা গেল।” স্বাধীনতা কী ও তার মূল্য কত-সেটাই কি বুঝেছে বাঙালী কোনোকালে? স্বাধীনতা কবে হতে চাওয়া শুরু হল তা কি জানেন?
তিন:-
অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খানের একটা টকশো বক্তব্য হতে আমার বেশ পুরোনো একটা প্রশ্ন মনে পড়ে গেল। সেটা হল, বাংলাদেশ কেন কমোনওয়েলথ সদস্যভুক্তি ধরে রেখেছে যেই কমোনওয়েলথ আমার মতে দাসস্ব ও গোলামীর জিঞ্জিরের সাক্ষ্যবহ? ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ পাকিস্তান হতে আলাদা হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে-এটা অফিশিয়াল ইতিহাস। কিন্তু আমি মনে করি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস আরো অনেক পুরোনো। যার সূচনা ফকির বিদ্রোহ, সিপাহী বিদ্রোহ হতে। বিপ্লবী সূর্যসেনের বিপ্লব হতে, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা হতে। বাংলা নামক স্বাধীন ভূখন্ড পরাধীনতার কালিমায় আচ্ছন্ন হয় মুঘলদের বা তারও আগে থেকে। বৃটিষরা নবাব সিরাজদ্দৌলা হতে বাংলাকে অফিশিয়ালী কেড়ে নেয়। সেই হতে বাংলায় স্বাধীনতার বীজ বোনা হতে থাকে।
১৯৪৭ সালে বর্তমান বাংলাদেশ আর আরো অন্যান্য বাংলাভাষী জাতিসত্ত্বাকে নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ গঠিত হওয়াই ছিল ইতিহাসের গন্তব্য কিন্তু তা না হয়ে বৃটিষরা কৌশলে আমাদের স্বাধীনতাকে আরো ২৪ বছর পদানত করার ব্যবস্থা করে আমাদের পাকিস্তান নামক অদ্ভূৎ এক বিকলাঙ্গ রাষ্ট্রের অংশ করে বিদায় নেয়। যেই বিকৃত রাষ্ট্র পাকিস্তানের অংশ আমরা মানসিকভাবে কোনোকালে ছিলামও না, হতে চাইও নি। আবার শুরু হল স্বাধিকার ও পরবর্তিতে কার্যত স্বাধীনতার সংগ্রাম।
ফাইনালি ১৯৭১ সালে আমরা আমাদের বহু আগে লুপ্ত স্বাধীনতা, বহু এলিজিবল স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনি। অথচ বাংলাদেশে আপনি প্রায় শুনতেই পাবেন না, বাংলাদেশের অন্যতম শত্রূ ও দখলদার হিসেবে বৃটিষের নাম, যে হাজার হাজার মানুষ বৃটিষের হাতে শহীদ হয়েছে বাংলাকে স্বাধীন করতে, তাদের কোনো মর্যাদা/স্বীকৃতি নেই। খুব অবচেতন বা সচেতনভাবে বৃটিষ দখলদারিত্ব, অন্যায় ও শোষনের সময়কাল, তাদের তাড়ানোর সংগ্রাম, শহীদ সংগ্রামীদের ইতিহাস-সব মিলিয়ে ওই সময়কালটিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার কোনো প্রেক্ষাপট হিসেবেই ধরা হয় না। পাকিস্তানকে তাও কিছু সচেতন দেশপ্রেমিক মানুষ আজও শত্রূ ভাবে কিন্তু বৃটেন যেন কোনোকালেই দৃশ্যপটে ছিল না। আমরা বরং অত্যন্ত আনন্দের সাথে বৃটিষ কমোনওয়েলথের সদস্য হই। আমি মনে করি, আমাদের স্বাধীনতার যুদ্ধে মূলত দুটি প্রতিপক্ষ-বৃটিষ ও পাকিস্তান। ১৯৪৭ সালে আমাদের স্বাধীনতা পাবার কথা। অত্যন্ত সুকৌশলে সেই স্বাধীনতাকে অপমান করে বৃটিষরা আমাদের আরেক দখলদারের হাতে গছিয়ে দিয়ে যায়।
আরো ২৪ বছর পরে আমরা যুঝে বুঝে নিই নিজেদের বহুল কাঙ্খিত স্বাধীনতা। স্বাধীনতার প্রেক্ষিতে আমি বৃটিষ ও পাকিস্তান-দুটি আমলের ২২৪ বছরকে একই ইতিহাসের দুটি চ্যাপ্টার মনে করি। মীর কাসিম, মীর জাফর আর গোলাম আযমকে আমি একই তালিকার রাজাকার মনে করি। ঠিক বিপরীতে মোহনলাল, মীর মর্দান, ভাষা আন্দোলনকর্মী ও শহীদ, ৩০ লক্ষ মুক্তিযুদ্ধ শহীদকে একই স্বাধীনতার সংগ্রামে সূর্য সৈনিক হিসেবে হৃদয়ের প্রণতি নিবেদন করি।
চার:-
আমার বড় আফসোস হয় যে, আমাদের দেশে স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও মুক্তিযুদ্ধের একটি পূর্নাঙ্গ সিনেমা নির্মীত হয়নি। যেগুলোই হয়েছে সবই খন্ডিত। শুধু কাঠের রাইফেল বা মেকি এসএলআর হাতে কিছু গোলাগুলির দৃশ্য বা খান সেনাদের হাতে বাঙালী নিগ্রহের খন্ডিত চিত্র দেখিয়ে মুক্তিযুদ্ধের মতো বিশাল ক্যানভাসকে সিনেমা, নাটকে ফুঁটিয়ে তোলা সম্ভব না। কোনো টিভি চ্যানেল (যারা সুলেমান এমনকি মহিশুরের স্বাধীনতার বীর টিপুকে নিয়ে পর্যন্ত সিরিয়াল প্রচার করেছে) মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা, শহীদদের নিয়ে ৪৬ বছরেও একটি ধারাবাহিক নাটক বা অন্তত দীর্ঘ ম্যাগাজিন প্রচারের কথা ভাবতে পারেনি। সারাবছর ডিজে ড্যান্স, সুলেমান, পাখি, কিরনমালা, কুটনামি নাটক, বমির মতো বিজ্ঞাপন। কিন্তু ১৬ ডিসেম্বর এলেই বাংলাদেশের মিডিয়াসমুহের বার্ষিক দেশপ্রেম মহড়ার প্রদর্শন আড়ম্বর শুরু হয়। দুশ্চরিত্র টিভি চ্যানেলগুলোতে মুক্তিযুদ্ধ ও দেশপ্রেমের কপোট রিহার্সেল শুরু হয়। ১৬ তারিখ গ্রান্ড ফিনালের মধ্য দিয়ে এই ভন্ডদের মৌসুমী জাতীয়তাবাদের পর্দা নামে। আচ্ছা মুক্তিযুদ্ধ কি শুধু ২৬ মার্চ আর ১৬ ডিসেম্বর-এই দুইদিনই হয়েছিল? আমার মা তো আমায় জানিয়েছেন ১৭৫৭ হতে ১৯৭১ মোট ২২৪ বছর মুক্তির জন্য জীবন দিয়েছে বাঙালী। বঙ্গ মা! তোমার শ্রেষ্ট সন্তানেরা কি মাত্র মার্চ ও ডিসেম্বর-দু’মাসই যুদ্ধ করেছিল? হায়রে দেশ! হায় মুক্তিযুদ্ধ।
পাঁচ:-
পৃথিবীতে এত অদ্ভূৎ জাতি মনে হয় কমই আছে যারা একটি টোটাল জাতি হিসেবে যুদ্ধ করে মাত্র ৯ মাসেই একটি স্বাধীন দেশ পেয়ে গেছে অথচ যার ইতিহাস আরো বহু বছর আগে রচিত হচ্ছিল। সেই জাতির অর্জিত দেশেই মুক্তিযুদ্ধ আর স্বাধীনতা নিয়ে কত দ্বিখন্ডিত দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ মাথা উঁচু করে বাঁচে? আমি কতগুলো কুলাঙ্গার দৃষ্টিভঙ্গির নাম বলি যা আপনি একটু কান পাতলেই শুনতে পাবেন চলমান বঙ্গদেশের বিষ বাতাসে:-
১.সবচেয়ে বড় কুলাঙ্গারগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি হল পাকিস্তান নামক একটি জঘন্য রাষ্ট্র হতে আমাদের স্বাধীন হওয়া মোটেই ন্যায্য কাজ হয়নি। এই গোষ্ঠিটিকে আমরা ‘রাজাকার’ বা ’দালাল’ নামে চিনি।
২.আরেকদল কুলাঙ্গার আছে যারা ৭১’র মুক্তিযুদ্ধকে বলে ’গন্ডগোল’। কুলাঙ্গাররা জানে না, গন্ডগোল তো আছে তাদের জন্মে।
৩.তৃতীয় একদল আছে যারা খুব সুকৌশলে প্রচার করে, ‘৭১ সালে মোটেই ৩০ লক্ষ লোক শহীদ হননি।’
৪.একদল বিশ্বাস করে, ভারত তার নিজের স্বার্থে যুদ্ধে না জড়ালে আমাদের সূর্যসন্তান মুক্তিযোদ্ধারা কিছুতেই দেশ স্বাধীন করতে পারতেন না।
৫.একদল বিশ্বাস করে, বাংলাদেশ এক না একদিন আবার পাকিস্তানের সাথে মিলে ‘পেয়ারা পাক+ইস্তান হয়ে যাবেই। ২৫ মার্চ ১৯৭১ এর রাত হতে ১৬ ডিসেম্বর ৯ মাসে কতজন পাক বাহিনীর হাতে শহীদ হন, কতজন সম্ভ্রম হারান, সংখ্যাটা ৩০ লাখ নাকি ২৯,৯৯,৯৯৯ জন এই নিয়ে যারা সুশীল-তথা মিনমিনে শয়তানের মতো চূলচেরা যুক্তিতর্ক করতে চান তাদের গায়ে থুথু ফেলতে ইচ্ছা করে।
তাদের কাছে আমার জানতে ইচ্ছে করে সংখ্যাটা যদি ৩০ লাখ না হয়ে ৩০ জন হত তাতে পাকি কুত……র বাচ্চাদের বা তাদের সহযোগীদের কুৎসিত অন্যায়ের সামান্যতম দোসস্খলন হত কি? আরে শালারা, এদেশের ৩ জন লোককেও হত্যার লাইসেন্স কি পাকি কু.ত…..র বাচ্চাদের দেয়া হয়েছিল? নির্মম অন্যায়ের মুখে মৃত্যুর ক্ষেত্রে ৩০ লাখ আর ৩ লাখের তফাৎ কী?
কষ্টের বিষয় হল, ওই লোকগুলো আমাদের চারপাশেই থাকে। সভা-সমাবেশে বুক ফুলিয়ে তাদের কুলাঙ্গার ভিতরটাকে প্রকাশ করে, আমরা তাদের সাথে বিনা দ্বিধায় নিজের মেয়েকে বিয়ে দিই, তাদের নাতীর মোসলমানিতে আমরা কব্জি ডুবিয়ে খেয়ে আসি। আর সবচেয়ে বড় কথা-ওরা না হয় ’অমন’, আমরা যারা ’অমন’ না, তারাও কেন ওদের জাতীয়ভাবে ঘৃনার ঘেরাটোপে একঘরে করে রাখতে পারি না।
ছয়:-
মুক্তিযুদ্ধ বলতেই চোখের সামনে আমাদের বীর ভাইদের বীরত্ব ভেসে ওঠে। জানেন কি, বীর সৈনিকদের নামের পাশে এদেশে ’বীরাঙ্গনা’ নামের আরেকটি টার্ম আছে? খেয়াল করেছেন কি, মুক্তিযুদ্ধের আবেগের লিঙ্গান্তর-বীর=বীরাঙ্গনা? মজার বিষয় হল বীর শহীদ বা জীবিত বীরেরা বীরের আসনে পূজিত হলেও বীর টার্মটির স্ত্রী-লিঙ্গের তকমা পাওয়া বীরাঙ্গনারা কিন্তু বীরের আসন পাননি এদেশে। বরং বিশেষ অচ্ছুৎ মানবীর দুজ্ঞেয় অসম্মানে তাদের সমাজ হতে বিতাড়িত করা হয়েছে স্বাধীনতার পরপরই। যে দেশ তার ৩০ লক্ষ শহীদের গৌরবের ভাগিদার, যে দেশে ‘যশোর রোড’ নামে একটি রাস্তা আজও মহান মুক্তিযুদ্ধের ১ কোটি শরনার্থীর পদচিহ্ন বুকে ধরে রেখেছে, যে দেশের লক্ষ বিধবা আজও তাদের প্রেমিক বা স্বামীদের হারানোর শোকগাঁথা লেখে, সেই জাতিই আবার তার ৩ লক্ষ যুদ্ধ ধর্ষিত মা-বোনকে মেনে নেয়নি নিয়মিত সমাজযাত্রায়। এমন এক জাতি আমরা, যার জাতির পিতাকে বাধ্য হয়ে ঘোষনা করতে হয়, বীরাঙ্গনারা সবাই তার কন্যা। পিতা তার সম্ভ্রমহারানো সন্তানের দায় একা নিয়েও তার আপামর ৭ কোটি বা আজকের ১৭ কোটিকে শেখাতে পারেননি বীরাঙ্গনার প্রাপ্য সম্মান।
হ্যা, বলবেন, সম্প্রতি সরকারতো তাদের সম্মানের স্থানটির স্বীকৃতি দিয়েছেই। হায়! জাতির ধর্ষিত বিবেকের হুশ ফেরাতেও এদেশে কোর্টের আর সরকারী আদেশের দরকার হয়। সরকারী আদেশের পর বিগত ৩ বছরে এই ৭ বীরশ্রেষ্ঠ’র দেশে ৩ লক্ষ বীরাঙ্গনার স্থান পতিত নরক ছেড়ে মানুষের পূজার বেদীতে এসেছে কি? যদিও তারা সরকারী বালামে ২০১৪ হতে পরিচিত হবেন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে।
আপনারা মোতালেবের কথা নিশ্চই মনে করতে পারবেন, যে বিটিভি অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র মাধ্যমে দীর্ঘ ২০ বছর পরে কানাডা হতে তার হারানো বাবা-মাকে খুঁজে পান বাংলাদেশে। আমি নিজে সেই মধুর মিলনের দৃশ্য টিভিতে দেখেছিলাম। মনে হয়েছিল এর চেয়ে স্বর্গীয় দৃশ্য আর নেই। হৃদয় নিংরানো ছিল সেই দৃশ্য। আমার ক্ষুদ্র মেমোরীতে যতটা মনে আছে, নিকট অতীতে অন্তত ৩টি ঘটনা পেপারে পড়েছিলাম যেখানে ৩জন বীরাঙ্গনার সন্তান তাদের মা’কে খুঁজতে বাংলাদেশে এসেছিলেন।
অবাক হচ্ছেন? ওহো! আপনিতো জানেনই না, স্বাধীনতার পরে হাজার হাজার বাঙালী নারীর এবোরশন করানো হয় জাতিসংঘের উদ্যোগে। তবু যারা মা হয়ে পড়েন, তাদের সন্তানদের একটা বড় অংশই দত্তক হিসেবে পাঠানো হয় ইউরোপ, আমেরিকায়। আমি তো জানি না, আপনারা কেউ কি জানেন, বাংলাদেশে বিগত ৪৬ বছরে কোথাও কোনো স্মৃতিফলক, সৌধ হয়েছে কিনা বীরাঙ্গনাদের সম্মানে? যেই বীরাঙ্গনারা যুদ্ধ পরবর্তি সময়ে পরিবার সমাজ হতে পরিত্যাক্ত হয়েছিলেন, সর্বসাম্প্রতিক সরকারী ঘোষনার পরও কি তারা সমাজে তাদের স্থান ফিরে পাবেন? তাদের নিয়ে কোনো ন্যাশনাল ইভেন্ট হয়েছে কি? (ওহ, স্যরি, আমরা তো আবার প্রাইভেট সিক্রেসী মেইনটেইন করি।)
সাত:-
বীরাঙ্গনাদের সন্তানদের একটা বড় অংশকে দত্তক হিসেবে বিভিন্ন দেশে সরকারী-বেসরকারী মধ্যস্ততায় পাঠানো হয়। স্বাধীনতার নানা আবেগের ফাঁকে কখনোে এক মুহূর্তের জন্য ভেবে দেখেছেন, ওই যুদ্ধশিশুদের মানসিকতা আর তাদের অদ্ভূৎ মানসিক অন্তঃর্দ্বন্দ্বের কথা? কয়েকদিন আগেও একটা আর্টিকেল পড়ছিলাম। একজন যুদ্ধশিশু জানত তার প্রকৃত মা কে। বড় হয়ে মানসিক দ্বন্দ্বে সে আত্মহত্যা করে। কী ভয়ানক অনুভূতিকে ভোগে একেক মানুষ যখন সে জানে তার জন্ম এমনকি শুধুমাত্র পিতৃপরিচয়হীন হিসেবে নয়, তাদের প্রত্যেকের পিতা একজন খুনি, একজন হানাদার, আর এই পৃথিবীর জঘন্যতম, নিষ্ঠুরতম গণহত্যার একজন দানব। যখন তারা জানতে পারে, ’৭১ এর নৃশংষতম গণহত্যা, পৌশাচিক গণধর্ষণের যে নারকীয় দুর্যোগের শিকার এই বঙ্গদেশ ও তার ৩ লক্ষ মা-বোন, তাদের সেই ভয়াল অভিজ্ঞতার সংহারকই হল তাদের বাবা। কী নিষ্ঠুর অনুভূতি!
একবার চোখ বন্ধ করে ভেবে দেখেছেন, ওই যুদ্ধশিশুরা তাদের সত্যিকারের মায়েদের ব্যাপারে মনের গোপনে কীরকম অনুভূতি ধারন করে? বিদেশে দত্তক পাঠিয়ে তো বাংলাদেশ একরকম বেঁচে গেছে, কিন্তু ওদেরকে কি বেঁচে মরার হাত হতে বাঁচাতে পেরেছে?
আট:-
আচ্ছা, আপনাকে যদি হঠাৎ একদিন কেউ জিজ্ঞেস করে, বলুনতো কয়েকটি সংখ্যা-বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বীরশ্রেষ্ঠ, বীর উত্তম, বীর বিক্রম ও বীর প্রতীক কতজন? আমি অস্বীকার করব না, এই লেখা যখন লিখছি, তখনও আমি নিজেও জানতাম না সবগুলো প্রশ্নের সহজ উত্তর। অথচ এই জাতির নিজের নাম জানারও আগে জানবার কথা ওই প্রশ্নগুলোর উত্তর। নায়িকা এঞ্জেলিনা জোলির কতটি বাচ্চা, কী তাদের নাম-তা হয়তো ঠোটস্থ থাকে আমাদের। আচ্ছা বাদ দিন, বলতে পারব কি, আমাদের ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠ’র কবর কেন একটি স্থানে এনে একটি স্মৃতিসৌধে সম্মিলিত করা গেল না?
কেন আমাদের ৭ শ্রেষ্ঠ সন্তানকে অজানা, অচেনা, অপরিচীত, অখ্যাত পারিবারিক বা আধো-স্বীকৃত কবরে শুয়ে থাকতে হয় আজও ৪৬ বছর পরে? আমাদের ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠ’র কবর কেন পরিণত হয় না এদেশের মানুষদের ছুটিতে বেড়াতে যাবার অবশ্যম্ভাবি গন্তব্য? ২৬ মার্চ বা ১৬ ডিসেম্বরে কি তাদের কবরে কোনো ধুপ ধুনো পড়ে? কোনো রাষ্ট্রীয় আয়োজন যায় কি তাদের কবরে? আমার তো চোখে পড়েনি। আমরা কেন পারি না, অন্তত ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠ’র কবর একটি স্থানে এনে একটি স্মৃতিফলক বা মিনার অন্তত করতে? কতগুলো জাতীয় সড়ক আছে মুক্তিযোদ্ধাদের নামে? আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ইংরেজিসহ সবগুলো আন্তর্জাতিক ভাষায় অনুবাদের ও প্রচারের কী ব্যবস্থা? আমাদের একমাত্র মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রীক এক্সক্লুসিভ যাদুঘর-তাও গড়ে উঠছে বেসরকারী উদ্যোগে।
দেশে এমনকি বন্যপ্রাণী যাদুঘর আছে সরকারী। অথচ মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর গড়তে উদ্যোগ নিতে হয় সেই ব্যক্তিমানুষদের আর হাত পাততে হয় সেই নাগরিকদেরই কাছে। রাষ্ট্র ব্যস্ত বিপিএল আয়োজনে। ওহ! ক্রীকেটতো আবার সব দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধের উর্দ্ধে। আমাদের কিছু নব্য ’প্রগতিশীল’ ও ”সুশীল” একটা চরম ধান্দাবাজী রাস্তা ধরেছেন। “ভাই খেলা আরা রাজনীতি আলাদা”।
তাদের বক্তব্য হল, ”৭১ এ পাকিস্তান যা করেছে তার জন্য এই ২০১৭ সালে পাকিস্তানের ক্রীকেট টীমের সাপোর্টার হওয়া কেন চলবে না। ক্রীকেটাররাতো আর সেসময় ”গন্ডগোল” করে নাই।” আমার জানতে ইচ্ছা করে আমার ভাই, আমার বাবা অথবা আমার সন্তানকে কেউ রাতের অন্ধকারে ধরে নিয়ে হত্যা করলে ঠিক কত বছর পার হয়ে গেলে হত্যাকারীকে ক্ষমা করতে পারতাম? হত্যাকারীর ছেলের সাথে আবার আমার মেয়ের বিয়ে দিতাম। পাকিস্তান যতদিন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা না চাইবে ততদিন পাকিস্তানের গোলাপের গন্ধও আমার কাছে পা….র গন্ধ মনে হবে। ততদিনের আগে তাদের সাথে এবং তাদের দোষরদের সাথে কোনো ”সুশীল” চর্চা নয়।
নয়:-
হয়তো আপনার মনে হবে বেশি বায়াজড কথা বলছি। তবে ঠান্ডা মাথায় ভেবে বলুনতো, আমাদের দেশের সবকটি গণকবর কি চিহ্নিত হয়েছে সরকারীভাবে? যে কয়টি চিহ্নিত হয়েছে সেগুলোর যথাযথ সম্মান সহকারে রক্ষনাবেক্ষনের কোনো ব্যবস্থা কি হয়েছে আজও এদেশে? আমি তো দেখি (অন্তত ঢাকায় যেগুলো আছে সেখানে) গণকবরগুলো সাধারন কবরস্থানের চেয়েও অবহেলিত ও অপমানিত হয়ে পড়ে থাকে সারাবছর। ঢাকার স্মৃতিসৌধ, ভাসানটেক, রায়েরবাজার গণকবরে যাবার হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। এমনিতে একটি পারিবারিক কবরস্থানকে পর্যন্ত আমি যতটা সম্মানের ও গাম্ভীর্যের সাথে সমীহ করতে দেখেছি, তার ছিঁটেফোটাও আমি পাইনি ততোধিক সম্মান ও মর্যাদা পাবার অধিকারসম্পন্ন গণকবরগুলোতে। প্র
তিটি গণকবরে যে অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে তা হল, হাজার হাজার তরুন কপোত-কপোতী ভয়শূন্য, সংকোচশূন্য ডেটিং এর নিরাপদ অভয়ারন্য হিসেবে গণকবরকে বেছে নিয়েছে। বাদামওলা, ফুলওলা এমনকি ডেটিং হোটেলের দালালরা নিরাপদে তাদের সওদা বিক্রি করছে। গর ছাগল চড়াবার অভয়ারন্য সব গণকবর। যাদের রক্তে, যাদের জীবনের দামে পাওয়া এদেশ, তাদের বুকের উপর দাড়িয়ে দেশের স্বাধীনতার সুযোগভোগীদের কী নিদারুন উপহাস! কী নিদারুন উপহার তাদের জন্য! দশ:-আচ্ছা, আপনারা কি খেয়াল করেছেন, শুধুমাত্র ২১ ফেব্রূয়ারী, ২৬ মার্চ, ১৪ ও ১৬ ডিসেম্বর ব্যাতিত এই দেশে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ, বীরাঙ্গনা, স্বাধীনতা-এই শব্দগুচ্ছ খুব একটা উচ্চারিত হয়না? (’মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ নামে চালু একটি কমার্শিয়াল টার্ম বাদে।)
শুধু বছরের ৪টি মাসের ৪টি বিশেষ দিবসে ও তার আশেপাশে মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রীক সভা, অনুষ্ঠান, টিভি অনুষ্ঠান, নাটক, জনসভা, সেমিনার, মিছিল, কুচকাওয়াজ, পতাকা উত্তোলন-এসব আনুষ্ঠানিকতা হয়। আচ্ছা বলতে পারেন, এদেশের ১০০ ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কি জাতীয় পতাকা প্রতিদিন নিয়মমতো উত্তোলিত হয়? আমি নিশ্চিত, উত্তরটা হল-‘না’।
একটি স্বাধীন দেশ তার সব ফর্মাল প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন বাস্তবায়ন করতে পারেনি। কী লজ্জা! আচ্ছা, জাতীয় পতাকার মাপ, রেশিও, ডিজাইনার, প্রথম জন্ম, উত্তোলনের নিয়ম, নামানোর নিয়ম-আমাদের সব শিশুরা, সব সরকারী কর্মকর্তারা এমনকি মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রনালয়ের সব কর্মীরা জানেন কি? জানেন কি, আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের অফিশিয়াল স্বরলিপি ও সুরের কপিরাইট/ট্রেডমার্ক কোথাও রক্ষিত আছে কিনা? আজ হতে ৫০ বছর পরে কেউ যদি প্রশ্ন করে, জাতীয় সঙ্গীতের অফিশিয়াল স্বরলিপি ও সুর কোনটি-কে কিভাবে উত্তর দেবেন? এখনিতো দেখি প্রচুর বিকৃত সুরে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার রেকর্ড ইউটিউবে ভাসছে।
এগারো:-
আচ্ছা এদেশের কতগুলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদ অলংকৃত করেছেন মুক্তিযোদ্ধারা? মাসিক মাসোহারা, দিবসে দিবসে দাওয়াতি চিঠি, আর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ব্যাতিত জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ঠিক কী কী আমরা পরের প্রজন্মের লোকেরা করেছি? চাকরীর কোটা বহাল করেছি বিভিন্ন সরকারী চাকরীতে যা দখল করে আছেন অসংখ্য ড্রয়ীং রুম মুক্তিযোদ্ধা বা তার পরিবার। কেউ বলতে পারেন, কোনো বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের কি দায় নেই মুক্তিযোদ্ধা কোটা থাকার? নাকি মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কাজ করার দায় শুধু সরকারের? সিএসআর এর ফান্ড দিয়ে দেশ উদ্ধারতো বহু বেসরকারী প্রতিষ্ঠান করছেন। বড় বড় পুরষ্কারও পাচ্ছেন। কেউ কি আছে যে মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযুদ্ধ’র সাথে সম্পর্কিত কোনো বড় প্রজেক্ট নিয়েছেন বা ফান্ড দিয়েছেন (মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের দান ব্যাতিত?)
কিছু হলেই আমরা সরকারকে গালি দিই। কেন বেসরকারী দেশপ্রেমীকদের কি কোনো দায় নেই? রাজাকারের গাড়িতে জাতীয় পতাকা আর মুক্তিযোদ্ধারা ফেরিওলা, রিক্সাওলা, দারোয়ান, ভিক্ষুক, ড্রাইভার-কত কী ভূমিকায়। কত চমৎকার প্রতিদান তাদের দিয়েছে এদেশ। সরকারী ভাতার অপেক্ষায় দিন গোনেন একেকজন শহীদের মা, বিধবা স্ত্রী। ওটুকু না পেলে যে ক্ষুধার অন্ন যোগাড় হয় না। এত এত বেসরকারী কংলোমারেট। তারা কি কয়েকজন করে জীবিত মুক্তিযোদ্ধার দায়ীত্ব নিতে পারতেন না?
একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানও কি পারতো না, এটা নিশ্চিত করতে, তাদের প্রতিষ্ঠানে মিনিমাম একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান চাকরী পাবেন? বা তারা একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের পড়াশোনার দায় নেবেন? ওহ, স্যরি! মুক্তিযোদ্ধা কে আর কে নয়-তার সংজ্ঞাই তো নির্ধারন হল মাত্র সেদিন। আমরা কী করে দায়িত্ব নিতাম? কত বয়স, কতগুলো গুলি করলে, কোন অঞ্চলে কার অধীনে, কীভাবে যুদ্ধ করে থাকলে, কী কী কাজ করে থাকলে মুক্তিযোদ্ধা খেতাব মিলবে, আর খেতাব থাকলে কী কী মিলবে ভাগ্যে-১৯৭১ সালে যদি মুক্তিসেনারা তাদের মায়েদের, গর্ভবতী স্ত্রীদের, প্রিয়তমা বান্ধবীদের, সন্তানদের চোখের জলে ভাসিয়ে যুদ্ধে জীবনদানের জন্য যাবার সময় ভাবতেন, তবে পেতাম কি এই সোনার বাংলা?
বারো:-
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে তো এদেশের একসময়ের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কিছু মানুষও বিভক্ত হয়ে গেছেন। চিহ্নিত কিছু মুক্তিযোদ্ধা পর্যন্ত এই বিচারের বিরোধিতা করে আসছেন। (তথাকথিত বিশুদ্ধ নিরপেক্ষ, মানবিক ও আন্তর্জাতিক বিচারের দাবী তুলে।) এইসব জ্ঞানপাপী যদি সত্যিই ওই তিনটি দাবীতে এটা করতেন তাও কিছুটা সান্তনা হত। অলিখিত বা অঘোষিতভাবে এদের এই অমার্জনীয় অন্যায় আবদারের কারন হল, তাবেদারী, দ্বিধাবিভক্তি, অন্ধ দলবাজি, অতি প্রগতিশীলতা, ভন্ডামী আর স্বার্থ। আমি জানি, আপনার মুখ নিশপিশ করছে প্রচলিত কিছু তর্ক শুরু করতে। দাড়ান, দাড়ান। ওই তর্কগুলো আমিও জানি।
আপনি খালি বলুন, আপনার বোনের ধর্ষণকারীকে যদি ৪৬ বছর পর হাতের কাছে পান, আপনি কি অপেক্ষা করবেন কখন আপনি বাড়ি গিয়ে ইমাম সাহেবের কাছ থেকে সব মাসয়ালা জেনে, ওজু করে, পবিত্র হয়ে, গ্রামের সবলোক জড়ো করে (পারলে জাতিসংঘকে জড়িত করে) তারপর ওই ধর্ষককে একটা থাপ্পর দেবেন? আমার আর একটি প্রশ্ন মনে জাগে। ২০১০-২০১৭, মোট মামলা দায়ের, তদন্ত ও বিচার সম্পন্ন এতটুকু বিবেচনায় নিলে এই বিশাল বিচার প্রক্রিয়া কতটুকু গতিতে এগোচ্ছে?
বিগত ৭ বছরে মামলা রায়ে গেছে মাত্র গোটা তিরিশেক। বিচারাধীন ও তদন্তাধীন আরো সামান্য কিছু। যদি স্রেফ তর্কের খাতিরেও ধরি, এদেশে বড় বড় যুদ্ধাপরাধী (পাতি রাজাকার বা দালালরা না, ধাড়ি অপরাধি) আছে শ’পাঁচেক, তাহলে তাদের বিচার শেষ হয়ে বাস্তবায়নে মোটামুটি ১০০ বছর লাগার কথা। তো সেই ১০০ বছর এইসব রাজাকার যুদ্ধাপরাধীরা বিচার মোকাবিলার জন্য বেঁচে থাকবে? মরে গেলে আবার আরেক বিপদ। ওদের মরনোত্তর অমরত্ব ও ইনডেমনিটি। গোলাম আযম নামক সারমেয়টার যেই মৃত্যু হল, অমনি বিচার কাজ ইনকমপ্লিট অবস্থায় এবানডন করা হল। যেহেতু আপিল অবস্থায় মামলা ক্লোজ হয়েছে, তার মানে দাড়ায় গো.আযম দোষী ও নির্দোষ কোনোটাই প্রমানিত হয়নি। ট্রাইবুনালে যদিও তাকে দোষী করা হয়েছে কিন্তু আইন বলে যতক্ষন বিচার শেষ হয়ে কাউকে দোষী বা নির্দোষ না বলে দেয়া হয়, ততক্ষন সে নির্দোষ (অন্তত আইনের মারপ্যাঁচের চোখে।) তো এইরকম আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত কেন নেয়া হল, যে গো.আযম মারা যাওয়ায় বিচার ইনকমপ্লিট অবস্থায় থেমে যাবে?
ভবিষ্যতে যদি ২০ বছর পরে কেউ প্রশ্ন করে, তার বিচার তো শেষ হয়নি, আদালত তো তাকে দোষী করেনি, তাহলে কী জবাব দেয়া হবে প্রজন্ম?
তেরো:-
প্রতিবছর ২১ শে ফেব্রূয়ারি, ২৬ মার্চ, ১৪ ডিসেম্বর, ১৬ ডিসেম্বর জাতীয় পর্যায়ে দিবস পালনের ঘটা চলে আসছে। আমরাও ওই দিনগুলোতে ধোয়া ইস্ত্রি করা পাঞ্জাবী পাজামা পড়ে, বডি স্প্রেতে নিজেকে সুরভিত করে দিবসগুলো পালনে নানা আচার অনুষ্ঠান করি। আমি সব অনুষ্ঠানেই দেখি সমাগত সব মানুষ হাসতে হাসতে, অত্যন্ত আনন্দ মুখর পরিবেশে শোক ও সম্মান প্রদর্শন করছে (দিবসটির প্রকৃত তাৎপর্য যাই হোক)। স্মৃতিসৌধে, শহীদ মিনারে হাস্যোজ্জল মুখ ক্যামেরায় মুখখানা প্রদর্শনের জন্য হাতাহাতি, গুতোগুতি, লাফালাফির মধ্য দিয়ে শোক প্রকাশ চলে। মুক্তিযোদ্ধারা স্মৃতিসৌধে যান একা একা এতিমের মতো। নয়া প্রজন্মের মুক্তিযুদ্ধপ্রেমিকদের ভীড়ে চ্যাপ্টা হয়ে, অপাংক্তেয় হয়ে। তাও হয়তো মানতে পারতাম। ওই বেয়াদবীর সাথে ইদানীং যোগ হয়েছে ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবি হত্যার দিনে পর্যন্ত ঘটা করে গরু জবাই আর গরুর মাংস, পোলাও, দধিসহযোগে ফিস্ট খাবার জাতীয় কালচার। আহা শোক, আহা মুক্তিযুদ্ধ।
জানেন কিনা জানি না, শহীদ আজাদের মা তার সন্তানের জন্য পাক শিবিরে শেষ ভাত রেঁধে নিয়ে গিয়েও খাওয়াতে পারেননি। সেই শোকে তিনি তার বাকি জীবন কখনো ভাত খাননি। আর আমরা গোস-পোলাও দিয়ে শহীদদের আত্মত্যাগ উদযাপন করছি। সন্ধ্যার পরের ডিজে পার্টির কথা না হয় নাই বললাম। যেহেতু ওগুলো ‘দিবস’ কেন্দ্রীক অনুষ্ঠান, তাই রাতে তরুন চেতনাপন্থীরা একটু আধটুতো ওগুলো করতেই পারে। (দয়া করে চলমান রাজনৈতিক বিতর্ককে এখানে টেনে আনবেন না। ওগুলো আমার আলোচ্য নয়।)
চৌদ্দ:-
আচ্ছা, আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম এবং বর্তমান শিশুদেরকে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতা, ভাষা আন্দোলন, জাতীয় চেতনা, আমাদের সত্যি ইতিহাস জানানোর, বোঝানোর, শেখানোর, উজ্জিবিত করার সত্যি সত্যি কতটা ব্যবস্থা হয়েছে বলতে পারেন? প্রতিটি ক্লাসের বইয়ে মুক্তিযুদ্ধকে কতটা যত্ন করে পড়ানোর ব্যবস্থা হয়েছে? আপনি জানেন কিনা জানি না, ছাত্ররা সাধারনত সেই টপিকগুলোই বই হতে পড়ে যেগুলোর প্রশ্ন পরীক্ষায় আসে। তো কখনো চেক করে দেখেছেন, ক্লাস ওয়ান হতে ক্লাস ১২, পরীক্ষায় মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রীক বা ওভারঅল স্বাধীনতা কেন্দ্রীক প্রশ্ন কতটা থাকে? টেক্সট বইয়ে খুব ছোট করে কিছু গল্প বা প্রবন্ধ থাকার পাশাপাশি বাধ্যতামূলক মুক্তিযুদ্ধ’র ইতিহাস ছাত্রদের জানানোর কী ব্যবস্থা আমরা করতে পেরেছি? বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন, এই ২০১৭ সালের বাংলাদেশে ক্লাস ওয়ান হতে ক্লাস ১২ পর্যন্ত যত শিক্ষার্থী আছে তারা মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস কতটুকু জানে? ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্ররাতো আরো এগিয়ে। বিসিএস পরীক্ষায় না লাগলে তো আমরা বড়রাও ওই লাইনে পড়াশোনা করতাম না। পনের:-আমাদের দেশে প্রতিবছর স্বাধীনতা দিবস পুরষ্কার দেয়া হয়। আমার একটা বিষয় খুব খটকা লাগে। স্বাধীনতা দিবসে যেখানে স্বাধীনতা যুদ্ধ বিষয়টি জড়িত, সেখানে আমাদের একজন বীরশ্রেষ্ঠ, বীর বিক্রম, বীর উত্তম, বীর প্রতীক, বীরাঙ্গনাকে কখনো স্বাধীনতা দিবস পুরষ্কার দেয়া হয়েছে কি? নিশ্চই হয়েছে!!
স্বাধীনতার জন্য জীবন দান করা বা বেঁচে থাকলেও সর্বস্ব দেয়া মানুষগুলো বেঁচে থাকতে আমার মতো কাছামারা প্রোফেশনালরা কিভাবে স্বাধীনতা পুরষ্কার পায়? বলতে পারেন, স্বাধীনতা দিবস পুরষ্কার স্পেশালি ওদের জন্য তো না। ওটা দেশের জন্য অবদান রাখছেন এমন সকল মানুষদের জন্য। আচ্ছা? স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদ, বেঁচে থাকা বীর মুক্তিযোদ্ধা, ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠ, ৬৯ জন বীর উত্তম, ১৭৭ জন বীর বিক্রম, ৪২৬ জন বীর প্রতীকসহ কয়েক লক্ষ মুক্তিযোদ্ধা, ৩ লক্ষ বীরাঙ্গনা এবং ভাষা আন্দোলনের কর্মী ও শহীদদের চেয়ে বাংলাদেশের জন্য বেশি অবদান কে কবে রেখেছেন আর কবে রাখতে পারবেন? কোনো এক বছরের স্বাধীনতা দিবসের পুরষ্কারটি কি সম্মিলিতভাবে ওঁদের উৎসর্গ করা যেত না? নাকি এদেশে মরোনোত্তর কোনো পদক দেয়া হয়ই না?
ভাল কথা, স্বাধীনতার প্রথম সূচনাটি যারা করেছেন সেই ভাষা আন্দোলনের কর্মী ও শহীদদের কোনো তালিকা কি করেছি আমরা? ধ্যুৎ, কীসব বাজে কথা বলি আমি? আরে এদেশে তো এই ৪৬ বছরে মুক্তিযোদ্ধার তালিকাই করা হয়নি নির্ভূলভাবে। আমি খুব অবাক হব না, ভবিষ্যতের বাংলাদেশে কোনো এক কালো সময়ে কোনো এক অর্বাচীন যদি গো.আযম নামক সারমেয় সন্তানের নামও মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় ঢোকানোর চেষ্টা করে। (আমি খোদার কাছে দাবী করি, সেই পর্যন্ত যেন না বাঁচি।) অতিকল্পনা ভাববেন না। গো.আযমের বিচার কাজতো আমরা শেষ করিনি। জানোয়ারটা মরার সাথে সাথে বিচার অসমাপ্ত রেখে শেষ করেছি। কেন, বর্বরটার ফাঁসি না দেয়া যাক, অন্তত বিচার প্রক্রিয়াটাতো চালিয়ে নিতে পারতাম যাতে অফিশিয়ালী কসাইটা যে রাজাকার আর যুদ্ধাপরাধের মূল হোতা-সেটা প্রতিষ্ঠিত হত। ইস! কি বোকা আর আত্মভোলা আমরা। এতবড় ভুল কীভাবে করল পুরো একটা জাত?
ষোলো:-
আসলে একটা অনুচ্চারিত সত্যি কথা বলব? নানা দিবস আর অফিশিয়াল ফর্মালিটি বাদে, মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সত্যিকারভাবে গভীর আবেগে বাঙালীর মন মানসে কতটা আছে বলতে পারেন? বাংলার কত পার্সেন্ট মানুষ মুক্তিযুদ্ধ’র সঠিক ইতিহাস জানে? জর্জ হ্যারিসনের মৃত্যুতে রবিশংকর আর তার কন্যা আনুশকা শংকরের পরিবেশনায় কনসার্ট দেখেছিলাম ইউটিউবে। কই, বাংলাদেশ তো তার অকৃত্রিম বন্ধুর বিদায়ে করতে পারল না কোনো জাতীয় আয়োজন? মরণপূর্ব বা মরণোত্তর পদক বিতরনের বাইরে মুক্তিযুদ্ধের বিদেশী বন্ধুদের মনে রাখার কী ব্যবস্থা নিয়েছি আমরা? নতুন প্রজন্ম ও প্রজন্মান্তরে মুক্তিযুদ্ধকে বয়ে নিয়ে যাবার ঠিক কী কী ব্যবস্থা আমরা করেছি? আমি একটু দ্বিধাগ্রস্থ যে, এই মুহূর্তে যদি ১৯৭১ সাল আবার ফিরে আসত, বলতে পারেন, এই দেশের কত পার্সেন্ট মানুষ মুক্তিযুদ্ধে যেত আর কত পার্সেন্ট যুব সমাজ তাদের বিসিএসের প্রস্তুতি কোরবানী করে, ট্যাব/মোবাইলের ফেসবুক আপডেট করা তুলে রেখে, কতজন আমলা জরুরী দেশোদ্ধারমূলক কর্মোদ্যোগ বাদ দিয়ে, কতজন কবি, লেখক বইমেলার বানিজ্য ধান্দার জন্য বই লে্খা শিকেয় তুলে, কতজন পাংক প্রেমিকা তার প্রেমিককে হাতে অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধে পাঠাবে? আমার বিশ্বাস ১০০ ভাগ।
তবে দুঃখের বিষয় হল, আমার বিশ্বাসটা খুব নড়বড়ে। তবু জয় বাংলা।
#warofindependence #liberty #warofliberation #freedomfighter #martyr