কয়েক দিন আগে দুইজন কনিষ্ঠ ভ্রাতাকে উপদেশ দেবার সময় কথাচ্ছলে দুটো কথা বলেছিলাম। কাকতালীয়ভাবে দুটোই আমাদের তথাকথিত মধ্যম আয়ের দেশে যাত্রা নিয়ে। এর মধ্যেই শুনলাম, যাবতীয় শত্রূর মুখে ‘স্বাস্থ্যবিধি’ দিয়ে (কথাটা শত্রুর মুখে ছাইই ছিল, এখন করোনাকালে কথা বলতে বসলেই সব কথায় জিহবার ডগায় স্বাস্থ্যবিধি এসে পড়ে) আমাদের মাথাপিছু ইনকাম বেড়ে গেছে ২০২৪ ডলারে। তার মানে, এবার আমি একটা দামী ফোন কিনতেই পারি।
যে কথা বলছিলাম, দুটো বাণী বলি।
১. পৃথিবীর যেসব দেশেই কসমেটিক ডেভেলপমেন্ট হয়েছে, সেখানে তার কিছু অবশ্যম্ভাবি ইমপ্যাক্ট হয়েছে। তার একটা হল, ব্যাপক ও দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক বৈষম্য, সামাজিক অবক্ষয়, সামাজিক অস্থিরতা, সামাজিক সহিংসতা ও মানবিক অবনমন। এটা ম্যাক্রো লেভেলে শুনতে তেমন কষ্ট না হলেও, যখন মাইক্রো লেভেলে, মার্জিনাল লেভেলে নেমে আসে, তখন বুঝবেন, জ্বালাটা কী। কসমেটিক ডেভেলপমেন্ট, যেমনটা ভেনেজুয়েলা, নাইজেরিয়া কিংবা ভারত, নাউরু বা ঘানায় হয়েছে, সেটার অবশ্যম্ভাবি পরিণতি হল, আপনি যেমন মানুষই হয়ে থাকুন না কেন, আপনাকে আপনার মার্কেট একটা অন্যায্য প্রতিযোগীতার মধ্যে ঠেলে দেবে আর একসময় আপনি না চাইলেও সেই প্রতিযোগীতায় যোগ দিতে বাধ্য করবে। আমাদের বঙ্গ সমাজে যে সর্বব্যাপী দূর্নীতি আর লুটতরাজ শুরু হয়েছে, এই যে মসজিদের ইমাম সাবও ধর্ষণে জড়াচ্ছেন, তার অন্যতম কারন ওই কসমেটিক ডেভেলপমেন্ট। কসমেটিক ডেভেলপমেন্টের অঙ্গাঅঙ্গী সঙ্গী দানবীয় রাজনীতিকিকরন, সর্বগ্রাসী রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন আর শিক্ষার অবর্ণনীয় অবনমন। দুয়ে মিলে এইরকম রাষ্ট্রে মাৎসন্যায় যুগের শুভ মহরত।
’উন্নয়ন’ একটি দৈত্যাকার ক্ষুধার টগবগে লেলিহান শিখার জলন্ত ফার্নেসের মতো। তার ক্ষুধার বলি হতে হবে সমস্ত মধ্যবিত্তকে। বলি না বলে একটু মাইল্ডলি বললে, উন্নয়নের অগ্নিকুন্ডে সমস্ত ‘মধ্য’ ছদ্মবেশের নিম্নবিত্তের আত্মাহুতি দানের বিনিময়েই উন্নয়ন দেবী পা রাখেন মাটির ধরায়। মধ্য বা নিম্নবিত্তের রক্ত, মাংস, আশা, স্বপ্ন, জীবন-সবকিছুকে জ্বালিয়ে ভস্ম করেই উন্নয়নের উদরে রসদ সরবরাহ করা হয়। এ হতে মধ্যবিত্তের রেহাই নেই। মধ্যবিত্তের কোনো চয়েজও নেই। এই আত্মদান বাধ্যতামূলক ও অনৈচ্ছিক ও অবভিয়াস। এবং সেটাই শুরু হয়েছে।
প্রথম প্রথম হয়তো নিরবে আসবে, আসন গেড়ে বসবে। তারপর আগ্রাসীভাবে সে থাবা বসাতে শুরু করবে। তার নিরব হানা শুরু হয়ে গেছে। যা কিছু দেখছেন, যা কিছু অনুভব করছেন, যে আতঙ্কে কলিজাটা গলার কাছে উঠে আসছে-তা হতে রেহাই নেই। আজ হোক, কাল হোক, আপনাকে সে গ্রাস করবেই। হয়তো ভাবছেন, আরেহ, আমি তো এখনো দিব্যি আছি। ওদিকে রেসেশন, উন্নয়ন দেবীর আসূরিক ত্রিশুল বলছে, “আহো, ভাতিজা আহো।”
জগতের সব দেশে, সব জাতিতে, সব যুগেই এটা হয়েছে। উন্নয়ন দেবীর প্রণয়ের মোহে পড়েছে যারাই, তাদের মধ্যবিত্তকে জ্বালিয়ে অঙ্গার করেই সিদ্ধিলাভ হয়েছে। মধ্যবিত্ত উন্নয়নের জ্বালানী মাত্র। তার বুকের পাজরের ওপরেই রচীত হয়ে এসেছে উন্নয়নের সুউচ্চ সৌধ।
দুঃখিনী, দুঃখ করো না।
২. একবার একটা প্রশ্ন করেছিলাম, বাংলাদেশের সিংহভাগ স্টার্টআপ বা উদ্যোগ কেন একদিন আরেকটি অ্যামাজন বা স্যামসাং বা নিদেনপক্ষে আদমজি হয়ে ওঠে না?
অনেকেই অনেক উত্তর দিয়ে আমাকে বাধিত করেছিলেন। সেইসব ফিডব্যাক খুব মজার আর চিন্তার উদ্রেককারী ছিল।
এতদিন পরে আমি একটা যোগ করতে চাই।
আমাদের সিংহাভাগ ব্যর্থ স্টার্টআপ অথবা ক্ষুদ্র/প্রান্তিক উদ্যোগের ব্যর্থ হবার জন্য যত কারণ, তার একটি বড় কারণ হল আমাদের জাত্যাভিমান, আমাদের ইগো, আমাদের ক্লাস চিন্তা। মূখ্যত, একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে আরেকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবধান গড়ে দেয় সেই কোম্পানীর সৃজিত ইনটেলেকচুয়াল ক্যালিবার। ওটার অভাবেই একটি আল্লার দান কখনো অ্যামাজন হয়ে ওঠে না।
কী রকম?
রকমটা বলার আগে একটু বলি। এমনিতে, আমরা সামাজিক মাধ্যমে নিজের নিজের জীবনের সংগ্রামের কাহিনী, ওপরে ওঠার, সফল হবার কাহিনী রসিয়ে রসিয়ে বলতে খুব ভালোবাসি। কীভাবে আমরা প্রথম জীবনে সামান্য টিউশনি করে বেঁচেছি, তারপর প্রথম ব্যবসায়, কীভাবে নিজের কাঁধে কাপড়ের গাঁট অথবা কাঁচকলার কাঁদি অথবা পাঁঠা ছাগল বহন করে ব্যবসা করেছি-তার করুণ গল্প বীরত্বের সাথে বয়ান করতে আমরা খুবই পুলকিত হই। সেইসব কাহানি ঘারঘারকি ফিল্ম করে আবার ভিউ কামানোর ব্যবসা করতেও আমরা সিদ্ধহস্ত।
এবার রকম বলি।
ওই পাঁঠা বাহক আমরাই একটু জাতে উঠলেই, ব্যবসাটা একটু জমে উঠতেই, সামান্য পসার বাড়তেই মনে করি, ব্যবসা এবার স্যামসাং বা অ্যামাজন না হোক, অন্তত আলিঈঈবাবা (ডোর) তো হয়েই গেছে। এবার আর কেন?
ব্যাস। ব্যবসা টাটা না হলেও,
তার পরদিন হতে আমাদের সামান্য ম্যাকবুক বা লাঞ্চের ব্যাগটাও আমাদের নিজের বহন করার জন্য অনেক ভারী হয়ে যায় বিধাও তাকে টাটা করে দিই।
সেদিন হতে আর কাঁধে কাঁচকলার কাঁদি বা কাপড়ের গাট্টি বহন করা তো দূর। ওই কাজের জন্য তিনটা চাকর লাগে। অফিস লাগে ঢাকার সবচেয়ে পশ দালানে। পর্চে ৪ টা পোরশা, হ্যামার, বি.এম.ডব্লিউ, জাগুয়ার লাগে।
ফলাফল?
ওপর হতে লেখাটা আবার পড়ুন।
বিজনেস সাসটেইনেবিলিটি/সাসটেইনেবল বিজনেস/লং টার্ম বিজনেস?ভিশনারী বিজনেস স্ট্র্যাটেজি-
- চাকরিজীবি প্রফেশনাল হয়ে এগুলো বিষয় নিয়ে বিজনেসম্যান বা ওনার লেভেলের মানুষদেরকে উপদেশ/পরামর্শ দেয়া কি আওকাতের মধ্যে পড়ে বলে মনে করা যাবে? এখানে সবচেয়ে তীব্র যে প্রশ্নটা, সেটা হল, “আপনি যদি এতই বিজনেস বোঝেন, তাহলে আপনি চাকরি করছেন কেন? নিজে বিজনেস কেন দেন নাই?” এই রে, বিজনেস কনসালট্যন্টরা আমার গর্দান নিয়ে নেবেন। (স্যরি, আই এ্যগ্রি, দেয়ারস লজিক ইন ইওর পার্ট।)
বিদেশে কোম্পানী ১ হাজার বছর ধরে ব্যবসা করছে, আর আমাদের দেশে জাস্ট দ্বিতীয় প্রজন্মে গিয়ে ব্যবসা মুখ থুবড়ে পড়ে, এদেশে কেন ৩০০ বছরের বিজনেস নেই-এই আক্ষেপ সোশ্যাল প্ল্যাটফরমে ঝরে ঝরে পড়ে।
এটা আমারও আক্ষেপ, কৌতুহল। কেন?
বাট, অন্য দিকটা কি আমরা ভেবেছি?
আপনার কি মনে হয়, উগান্দেশে যারা বিজনেস করেন, বা, শুরু করেন, বা করতে চান, তারা তাদের বিজনেস প্রজন্মের পর প্রজন্ম সত্যিই জিইয়ে রাখতে চান? কী মনে হয় আপনার? সেটা কি আদৌ বিজনেস ওনারদের চাহিদার তালিকায় আছে? আই হ্যাভ ডাউট। বিজনেস করতে চান কিনা-সেটা ডাউট না। বিজনেসের সাকসেশন বা প্রজন্মের পর প্রজন্ম কোম্পানী হিসেবে টিকে থাকুক-সেই নিয়তের বিদ্যমানতা নিয়ে ডাউট। আমার ডাউটকে নেগেটিভলি নেবেন না। আমি এটাকে নেগেটিভ ভাবছি না। কে কার নিজস্ব জিনিস কীভাবে দেখবেন-তা নিয়ে উপদেশ বা ভর্ৎসনা করার আমি কে? আমি শুধু গণ-চাহিদার বিপরীতে সত্যটার খোঁজ করছি।
স্টার্টআপের মজা নিয়ে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে এসে একটা প্রাণঘাতি লেখা লিখবার জন্য হাত নিশপিশ করছিল। বিশেষ করে স্টার্টআপের টিম সাজাবার সময়ে রিলেটিভলি প্রতিষ্ঠিত কোম্পানীর রেডি ট্যালেন্টদের আকাশচুম্বি বেতন দিয়ে উঠিয়ে এনে, উড়িয়ে এনে, ভাগিয়ে এনে যে কালচারাল শক ও সুনামিটা তারা করছেন, তার প্রেক্ষিতে ক্ষিপ্ত হয়ে দু’কথা লেখার খুব সখ হয়েছিল। শেষতক সম্ভবত লেখা হয়নি। তখনই এই লেখাটা আমার প্রচন্ড ভাল লেগে যায়। বিধায় আমার লেখার অংশিভূত করি। লিখেছেন জনাব Shanjidul Alam Seban Shaan
ভারতের ইউনিকর্ন স্টার্টাপ BYJU’S এর ভ্যালুয়েশন ২২ বিলিয়ন ডলার (২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা) থেকে ৯৯% কমে ২০ মিলিয়ন (২২০ কোটি টাকা) তে নেমে এসেছে!!!
বাইজু’স ছিল ভারতের সবচেয়ে বড় এডুকেশন টেকনোলজি কোম্পানি, আমার দেশের টেন মিনিট স্কুলের মত। এক রুমের ক্লাস থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠাতা বাইজু রাভিন্দ্রান প্রায় ৬০ হাজার কর্মচারীর আড়াই লাখ কোটি টাকার কোম্পানি দাড় করিয়ে ফেলেছিল। শুধু ইনভেস্টমেন্টই তুলেছিল প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার মত। আর কোম্পানির মূল্যমান কমতে কমতে দাড়িয়েছে ২২০ কোটি টাকার মত। প্রতিষ্ঠাতা বাইজু এবং তার স্ত্রীকে বোর্ড ডিরেক্টররা পদ থেকে সরানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বাইজুর নিজের সম্পদের পরিমাণ দাড়িয়েছিল প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকায়, সেটাও এখন ধুলোয় মিশে গেছে।
এক স্কুল মাস্টার এতটাই সম্পদশালী হয়ে গিয়েছিল যে তার ১৫০ কোটি টাকার বাড়ি কিনেছিল, কোম্পানির ধ্বংসাবস্থায় সে বাড়ি বিক্রি করে ১৫০০০ কর্মীর বেতন দেয়ার কথা হয়েছিল। কোম্পানির দেনার পরিমাণ এখন ২০ হাজার কোটি টাকা।
আমাদের দেশেও সবাই ভ্যালুয়েশন গেইমে মেতেছে। ব্যবসার সাস্টেইনেবিলিটির চেয়ে বেশি দরকার ভ্যালুয়েশন, বার বার ফান্ডিং, চকচকে অফিস, আর ফাউন্ডারদের লাক্সারি লাইফস্টাইল। স্টার্টাপ ফেইল করলে ফাউন্ডার আর ইনভেস্টরদের তেমন ক্ষতি হয়না। ক্ষতি হয় কর্মীদের। ফাউন্ডাররা মোটা অংকের বেতন, লাইফস্টাইল আর পার্শিয়াল শেয়ার বিক্রি করে কোটি টাকা বানিয়ে নিতে পারে। ইনভেস্টররা জানেই তাদের ১০ টা ইনভেস্টমেন্টের মধ্যে ৯টা ফেইল করবে। তাদের জন্য এটা অনেকটা ব্যবসায়িক জুয়া।
কিন্তু এই যে শত কোটি ফান্ডিং বার্ন করার উদ্দেশ্যে বেশি বেতনে হাজার হাজার ছেলে মেয়েকে চাকরি দেয়া হয়, হঠাৎ কোম্পানি বন্ধ হওয়াতে এদের পরিবার কতটা অসহায়ত্বের মধ্যে পরে সেটা কল্পনাতীত। আর সাধারণ যে কাজে ৩০ হাজার বেতন পাওয়ার কথা, ইনভেস্টরের টাকা বার্ন করতে গিয়ে সেই পজিশনে বেতন দেয় ৬০-৮০ হাজার। এই যে চাকরির বাজার নষ্ট করা, এতেও ইমপ্যাক্ট অনেক বড়।
স্টার্টাপ মানে স্ক্যালিবিলিটি, রিপিটেবিলিটি এবং সাস্টেইনেবিলিটি; ইনভেস্টমেন্ট আর ভ্যালুয়েশন নয়।
কার্টেসি: Shanjidul Alam Seban Shaan
এমনিতে স্টার্টআপের জন্মইতিহাস ও তার তাত্বিক জন্মগুরুদের সংজ্ঞা যা-ই হোক, বাঙ্গুদের দেশে তার সংজ্ঞা হল-
যেই ব্যবসা উদ্যোগ কোরবাণীর আগ দিয়ে দুবলা-পাতলা গরু কিনে তাকে দেড় মাসে মোটাতাজা করে বকরি হাটে মোটা দামে বেঁচার মতো মডেল ফলো করে গ্রহন করা হয়, তাকে এশটারটাপ বলে। আর জানেনই তো, অর্থনীতিবীদরা না বললেও এটা সত্যি, যে, বড় পুঁজি ছোট/পুঁটি পুঁজিকে গিলে ফেলে। আগে শুনতাম, কালো টাকা সাদা টাকাকে খেয়ে ফেলে। খারাপ মূদ্রা ভাল মূদ্রাকে বিতাড়িত করে। এখন বলি, বড় পূঁজি ছোট পূঁজিকে গিলে ফেলে।
তাই এই গিলে ফেলার চাপে ছোট ছোট পূঁজি ওলারা টিকতে পারবে না। তাদের তাই ভবিষ্যতে ব্যবসা বা স্টার্ট আপ দিয়ে একজন বিল গেটস, ওয়ারেন বাফেট না হোক, অন্তত আকিজ সাহেবের মতো জিরো থেকে হিরো হবার সুযোগ নেই। একটু হিসেব করে দেখুন তো, বিগত ২০ বছরে বাংলাদেশে একদম গোড়া হতে, জিরো হতে শুরু করে একটা জায়ান্ট কোম্পানী হয়েছে-এরকম নজির মোট কয়টা? যারা একটু আবার হয়েছে, তাদের ব্যবসায়িক বিশুদ্ধতা আবার প্রশ্নাতীত না। তার ওপর আবার, যেসব প্রতিষ্ঠান সময়ের বিচারে টিকে গিয়ে বড় হবার নজির রাখতে পেরেছিল, তাদের একটা বড় অংশ আবার সেকেন্ড জেনারেশনে এসে অতলে তলিয়ে গেছে বা যাচ্ছে। বিরাট সংখ্যক ক্ষেত্রেই, একটি বড় প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠার ব্যাপার যতটা না, তার চেয়ে ঢের বেশি কাঁচা টাকা আর হাই প্রফিট রেট নিয়ে বড় ব্যাবসায় পরিণত হওয়াই যেন মূল মোটো। আমাদের বিজনেসগুলো, উদ্যোগগুলো ব্যাবসা হয়ে ওঠে, প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে না। ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির যখন তথৈবচ অবস্থা, তখন রাষ্ট্রীয় আয়োজন ততোধিক দমবন্ধ কক্ষের মতো।
এই দেশ আম্রিকা না, যেখানে একজন মানুষ যদি লুঙ্গি মাথায় বেঁধে ফুটপাতে ঘুমিয়েও জীবন কাটাতে চায়, রাষ্ট্র তার সব আয়োজন করে রাখে। আবার কেউ যদি সেই লুঙ্গী কাছা মেরে জীবনে কোনো অর্থবহ কিছু করতে চায়, তারও সব সাপোর্ট রাষ্ট্র তৈরী করেই রেখেছে। আমাদের এখানে উল্টো যাত্রা।
আপনার যাবতীয় উৎসাহ, সাইনার্জি, এনার্জি, উদ্যাগ, উদ্যম, পূঁজিকে আতুড়েই গলাটিপে মেরে ফেলা আর বড় বড় পূঁজিবাদীদের তোষণের সব ব্যবস্থাই রাষ্ট্র অত্যন্ত যত্ন নিয়ে করে রেখেছে। বিশ্বাস না হলে আপনি আমাদের দুটো ইনডেক্স দেখুন-কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস এই বৈশ্বিক ইনডেক্সে আমরা সবার ওপরে। ফাসটো। আর অপর্চুনিটি অব ডুয়িং বিজনেস-এই বৈশ্বিক ইনডেক্সে আমরা সবার শেষে। দুধভাত স্কোর।
এর পরও যদি আপনি সোলেমান ভাইয়ের ভিডু দেখে অতি উত্তেজিত হয়ে আজই জ্যাক মা হবার জন্য স্টার্ট আপ শুরু করে অচীরেই লাল হয়ে যাবার স্বপ্ন দেখা শুরু করেন, তবে স্বপ্নদোষের ন্যাকড়াটাও সাথে রাখিয়েন। হুহ। সারাজীবন বড়জোর পেটেভাতে খাবার মতো কিছু করে যদি জীবন পার করতে পারেন, সেই ঢেড় বেশি, তার বেশি আর আশা করবেন না।
এখন যারা স্টার্টআপে নামছেন, তারা চোখ বন্ধ করে-লেক্সাস গাড়িতে চড়ছেন-এই সিমুলেশন না করে বরং বড়জোর এক প্যাকেট লেক্সাস বিস্কুট খান। কাজে দেবে। অম্বলের ব্যথা কমবে।
আমাদেরকে কুমিরের তিন নম্বর বাচ্চা দেখানোর মতো করে যেই ক্রমশ ফুলে ফেপে ওঠা জিডিপি মূলা দেখিয়ে উন্নয়নের অন্ধভক্তে পরিণত করা হয়েছে, তা নিয়ে একটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ন একটি সংগৃহিত গল্প বলি।
একজন বৃদ্ধ ইকনোমিক্সের প্রফেসর তাঁর মেধাবী ছাত্রকে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছেন। রাস্তায় কিছুদূর গিয়ে তাঁরা একটা মরা ইঁদুর পড়ে থাকতে দেখলেন। প্রফেসর বললেন – শোনো, তুমি যদি এই মরা ইঁদুরটা খেয়ে ফেলতে পারো তাহলে তোমায় ৫০,০০০ টাকা দেব। ছাত্রটি দ্রুতই কস্ট বেনিফিট এনালিসিস করে ইঁদুরটা গপ করে খেয়ে ফেলল। মরা ইঁদুরের বিকট স্বাদ পেটে যেতেই ছাত্রের মনে প্রতিশোধ নেবার ইচ্ছে হল৷
কিছুদূর গিয়ে আরেকটা মরা ইঁদুর দেখতে পেয়ে ছাত্র প্রফেসরকে বলল, স্যার আপনি যদি এই ইঁদুরটা খেয়ে ফেলতে পারেন, তাহলে আমিও আপনার ৫০,০০০ টাকা ফেরত দেব। প্রফেসরও সদ্য ৫০,০০০ টাকার ক্ষতিপূরণের আশায় ইঁদুরটা তুলে পেটে চালান করে দিলেন তক্ষুণি।
এরপর খানিকক্ষণ দুজনেই নিঃশব্দে পথ হাঁটছিলেন। নীরবতা ভেঙে ছাত্র প্রশ্ন করল – আচ্ছা স্যার, আপনার কি মনে হয়না, আমরা দুজন নেহাই বেহুদা বেকুবের মতো দুটো মরা ইঁদুর খেয়ে ফেললাম? স্মিতহাস্যে প্রফেসর উত্তর দিলেন-তা ঠিক, কিন্তু তুমি আর আমি মিলে মাত্র কিছুক্ষণের মধ্যে জিডিপিতে একলক্ষ টাকা যোগ করলাম, সেটা দেখলে না !
#GDPgimmick #economicgrowth #middleincomecountry #cosmeticdevelopment #perheadincome #startupbusiness #startupgimmick