সন ১৯৮৮-৯২ হবে বোধহয়।
অখ্যাত মফস্বল (বর্তমানে যা প্রায় মৃত একটি শহর) বাগেরহাটে থাকি। বছর দুই বছরে কোনো কারনে হয়তো দুই চারবার ঢাকা যেতাম। বাগেরহাট হতে তখন লঞ্চ আসত ঢাকায়। সেটাকে বলা হত ডাক লঞ্চ। যেদিন বিকেল ৫ টায় লঞ্চ ছাড়ত, তার পরদিন সন্ধ্যার পরে সেই দেড়তলা লঞ্চ সদরঘাট পৌছাতো।
সেই লঞ্চের নিচের খোলের ভিতর পরিবাহিত হত তাজা নারকেল তেল, ডাব, তাল, গাব, ছাগল, মুরগী, আলকাতরা, ঢেউটিন ইত্যাদি। পুরো লঞ্চ পাঠাও ছাগীর গন্ধে ভরপুর। লঞ্চের পিছন দিকে দুই দিকে দুটি ছোট্ট টাট্টিঘর।
তারই পিছনে হাতে চালিত ছোট্ট চাপকলই পানির উৎস। দু’হাত সামনে থাকা টাট্টিখানায় সদ্য নিঃসৃত হলুদ পুরিষ দু’হাত পেছনের চাপকলে উঠে আসত। আস্ত অথবা সম্পৃক্ত আকারে।
বিকল্প ছিল বাস। ৩২ সিটের কোষ্টারই ছিল তখন আমাদের একমাত্র ভরসা। দ্রূতি ও দিগন্ত নামের দু’টি সার্ভিস সকালে ছাড়ত। রাতে ৭ টার দিকে আরো দুটো। রাত ৭ টায় ছেড়ে সেই মুড়ির টিন বাস বন বাদাড়ের রাস্তা দিয়ে তেভাঙা দিয়ে ঢাকা যেত। পথে যতটা মনে পড়ে ৪ টি ফেরী বা নদী। তার মধ্যে রূপসা (খুলনা), মাগুরা, ফরিদপুর না কোথায় যেন ফেরী। আর তারপর আরিচাতে এসে একতলা কাঠবডি লঞ্চে নদী পাড় হয়ে আবার কানেকটিং শাটল গাড়ি। মোটামুটি ঝড়ের দিনে জান হাতে ধরে নদী পার হতে হত। মনে আছে, একবার ঝড়ে পড়ে কাপড় নষ্ট হবার দশা হয়েছিল।
এত কিছু করে সেই সন্ধ্যা ৭ টার বাস পরের দিন সকাল ৯ টা ১০ টাতে ঢাকা পৌঁছাতো। আরিচা লঞ্চে কোনো কারনে টাট্টি না করে থাকলে সেই পরের দিন সকাল ১০ টা তক পেটের ভিতর টগবগ করতে থাকা উদগীরন নিয়ে দুই পায়ে প্যাঁচ দিয়ে বাসের সিটে বসে থাকতে হত। আজ হতে ২৫ বছর আগের কথা বললাম।
জীবনটা তখন ছিল নেহায়েত সাদাকালো। ন্যাশনাল ও নিপ্পন তখন একমাত্র টিভি আর মায়া হাজারিকা সিনেমার একমাত্র ধনী ভিলেন। বাংলাদেশ তখনো ডিজিটাল হয়নি। মধ্যম নামের নিম্নবিত্ত দেশ হয়নি।
মনে মনে স্বপ্ন দেখতাম, একদিন…………………পদ্মা সেতু হবে। রুপসা সেতু হবে। আর আমরা সকালে বাগেরহাটে চা খেয়ে দুপুরে ঢাকায় লাঞ্চ করব। এই স্বপ্ন খুব অমূলকও না। বাগেরহাট হতে আরিচা হয়ে ঢাকা মাত্র ৩৬৫ কিলোমিটারের মতো রাস্তা। আর আজকাল মাওয়া হয়ে বাগেরহাট ঢাকা মাত্র ১৮৬ কিলোমিটার। আন্তর্জাতিক মানদন্ডে ২.৫ ঘন্টা ও ১.৫ ঘন্টার রাস্তা। বাংলাদেশের হাইওয়ের মানদন্ড ধরলে ৬ ঘন্টা বা ৩ ঘন্টার রাস্তা। বিধাতা হয়তো মুচকী হেসেছিলেন সেদিন।
সেই ৪টি ফেরী/নদী/লঞ্চ কমে আজ শুধু ১টি পদ্মা ফেরীতে নেমেছে। পদ্মা ব্রীজও হল বলে। কিন্তু আমরা আজও রাত ৭ টায় বাস ছাড়ি। বাসে মানুষ থাকে, চিংড়ি মাছ, মুরগী,খরগোশ, হাঁস, কাঁকড়া, টার্কি, কঁচু আনাজ, নারকেল, ডাব, কলার কাঁদি সবকিছুই থাকে। সকাল ৭ টায় ঢাকায় নামি। আর কখনো সখনো গাবতলিতে রাত ৫টায় পৌছে গেলে নিরাপত্তার জন্য সকাল ৬ টা তক বসে থাকি। মানে সেই ১২ ঘন্টাই। মাঝখানে চলে গেছে ২৫ বছর। আর পদ্মা নদী মরে হয়েছে এঁদো ডোবা। ১৩ টি স্প্যান বসেছে নদী নামের পদ্মা ডোবায়।
নতুন চালু হওয়া ৩টি ব্রীজের কল্যাণে ঢাকা টু চট্টগ্রাম ৪ ঘন্টায়, ঢাকা টু কুমিল্লা ১.৫ ঘন্টায় পৌছে যাওয়ায় যারা যারপরনাই উল্লসিত, উত্তেজিত, তারা একটু সবর করুন। বিধাতা এখনো হাসছেন। হয়তো এবার অট্টহাসি। শহরে ফিরি।
বিগত প্রায় এক যুগ কেন্দ্রীয় ঢাকা, মানে শহরে অফিস না করায় ঢাকার যানজট ও অফিস দিনের নারকীয় যন্ত্রনা আমাকে প্রায় স্পর্শই করতে পারেনি। যতটা করেছে, তা নেহায়েত বাধ্য। কাঁশবন বিহারের ঘন ঘন পোস্ট ওই কারণেই পেতেন। বিধাতা তখন হাসেননি। শুধু আমার কাঁশবনের স্ট্যাটাস দেখে ভুরু নাচিয়েছেন। [দাড়া বৎস, দাড়া।]
কিন্তু এই একযুগ পরে এখন ঢাকার একদম কলিজার মধ্যে অফিস যাওয়া আসায় নতুন করে জীবনকে শিখছি। জট কাহাকে বলে ও কত প্রকার, জানার চেষ্টা করছি। ”ফেমিকন, যেন কাঁশফুলের নরম ছোঁয়া”র বিশাল বিলবোর্ডের সামনে জটে বসে বসে বিজয় স্মরনীর ফুটপাতে পরিত্যাক্ত ”রাবারের টুকরোর” সংখ্যা গুনি। রাবারের টুকরো গোণা হয়ে যায়, কাল রাতে কতজন “আসল পুরুষের” পদধূলি পড়েছে চন্দ্রীমা ও বিজয় স্মরনীর ঝুপড়িতে, তার বীজগণিতও মিলিয়ে ফেলি।
তবু জট ছাড়ে না। বাসা হতে অফিস ঠিক ১৫ মিনিটের রাস্তা। সেটা পৌছাই ১.৫ ঘন্টায় (তাও কয়েক কোটি বার দোয়া দরুদ পরে।)
হ্যা, জটে বসে লেখালেখির অভ্যাসটা দারুন উপভোগ করছি। যারা যারা মেট্রো, এক্সপ্রেস, বাইপাস, ছাইপাশ, পাতাল, মাতাল, দাঁতাল, নানারকম নতুন প্রকল্পের ঢেউ দেখে ঢাকার এ মাথা হতে ওমাথা যেতে মাত্র কুড়ি মিনিট লাগবে ভেবে আবার আশায় বুক বাঁধছেন, তারাও জেনে রাখুন, বিধাতা এসব শুনে হাসতে ভুলে গেছেন।
#thuglife #road #transport #travel #trafficjam #distance