ভাষা ও ভাষাতত্ব নিয়ে যাদের অল্প বিস্তর আগ্রহ ও পড়াশোনা আছে, তারা নিশ্চই জানেন, ইংরেজিতে যেমন ৫ টি স্বর/ধ্বনি আছে-A-এ, E-ই, I-ই, O-ও, U-উ-ওই ৫ টি স্বরের বর্ণ/লেখ্য রুপের ৫ টি সহ মোট ২৬ টি বর্ণ আছে (ভাওয়েল ও কনসোন্যান্ট), বাংলাতেও স্বর আছে ১১ টি-অ, আ, ই, ঈ, উ, ঊ, ঋ, এ, ঐ, ও, ঔ (অনেক আগে ৯ বা লি নামেও একটা স্বর/ধ্বনি ছিল), ওই ১১ টি স্বরের লেখ্য রুপ বা বর্ণ ১১ টি সহ দুই রকমের বর্ণ আছে ৩৯ টি ব্যাঞ্জন+১১ টি স্বরবর্ণ = ৫০ টি। এর ভিতরে ই ও ঈ; জ ও য; র, ড়, ঢ়; অ ও য়; ন ও ণ; স, ষ ও শ-এরকম কিছু অক্ষর বা বর্ণ আছে, যাদের উচ্চারন প্রায় একই রকম। প্রচন্ড সচেতন ও বোদ্ধা ভাষাবীদ ব্যতিত এদের উচ্চারনগত পার্থক্য মনে রাখা বা সেটা বজায় রেখে উচ্চারন করার কাজটি আমার মনে হয়না ০.১% লোকও করতে সক্ষম।
যে কারনে আমরা বারি ও বাড়ি-দুটোর পার্থক্য পাই কেবল অক্ষরে লেখার সময়, বলার সময় অনেকটা একই রকম করে বলি-আমি বারি (পানি) খাব, আমি বাড়ি (ঘরে) যাব। গাড়ুু ও রূঢ়-এই দুটোতে আলাদা উচ্চারন কেউ কি করেন? মনে হয় না।
সকল, সবাই, স্বচ্ছ, সচল>এখানে দন্ত্য স এর উচ্চারন শ বা ষ এর মতো। অথচ সফেদা, সবক-এসব শব্দে দন্ত স’কে উচ্চারন করা হয় ’ছ’ এর মতো করে। আবার দেখুন, সবক ও শাবক-দুটোরই শেষ উচ্চান বোক। অথচ ব তে ও’কার নেই। শুরুতে দন্ত স ও তালব্য শ, অথচ দুটোরই উচ্চারন ’শ’ এর মতো।
আবার দেখুন, গ-এর উচ্চারন হল গ+অ = গ (GA), গরু বানান হল, গ+র+উ কার। অথচ উচ্চারন হল গোরু (মানে গ+ও কার+র+উ কার)। একইভাবে কচু (উচ্চারন হল কোচু), কবুতর (কোবুতর), কিন্তু এই উচ্চারনগুলো দেখুন, কখন>ক+অ+খ+ও+ন (ক কিন্তু ক’ই আছে, খ এর উচ্চারন খো এর মত, ন আছে ন+অ এর মতো।) কতটা>ক+অ+ত+ও+ট+আ; করুন>ক+ও+র+উ+ন (ক এর উচ্চারন হচ্ছে ক+ও = কো, যদিও ক’তে এখানে ও’কার লাগানো নেই); অর্থাৎ দৃশ্যমান শব্দ, বানান ও উচ্চারনে একটি ভিন্নতা আছে। ও’কার না থাকা সত্ত্বেও কখনো কখনো ’ও কার ‘ উচ্চারন হয়ে থাকে।
সম্প্রতি গরু বানানকে ‘গোরু’ হিসেবে সংশোধন করা হয়েছে কিনা বা কেন-তা নিয়ে বিতর্ক ও বাঙালীদের স্বভাবজাত ট্রলিং দেখে আমার বিষয়টা মনে পড়ল। এর আগে ঈদ ও ঈদ-নিয়েও তর্ক হয়েছে। যদিও বলা হয়েছে, যে, এই সংশোধন বা পরিবর্তনগুলো অনেক আগেই অভিধানে যোগ করা ছিল, হয়তো কারো নজরে এসেছে নতুন করে, কিন্তু জাগ্রত জনতা যেকোনো কারনেই এই পরিবর্তন মানতে নারাজ। তারা গরুকে গরু, ঈদকে ঈদ রাখতেই ইচ্ছুক। তারা ঈদকে ঈদ করতে দেবেন না। যদিও বাংলা একাডেমি বলেনি, গোরুর যায়গায় গরু লিখলে জেল জরিমানা হয়ে যাবে। হ্যা, ভবিষ্যতে কোনো হাফেজেMP3 মেধাবী রাজকীয় আমলা কিংবা মন্ত্রণাদাতার মাথা হতে যদি এমনতর শাস্তির চিন্তা এসেও পড়ে, তাতে অবাক হব না। এদেশে সবই সম্ভব।
আর আপনি যদি ভেবে থাকেন, বাংলা একাডেমির এরকম অ্রপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে কাজ না করে আরও তো কতো জরুরী কাজ আছে, সেটা কেন করছে না। ভাইজান, একটি সরকারী কত্তিপক্কের কাজের গন্ডিও কি পাবলিক নির্ধারন করে দেবে? ফেসবুক দেখে দেখে যদি রাষ্ট্রযন্ত্র চালাতে হয়, তাহলে তো জুকারবার্গ আর শেরিল স্যান্ডবার্গকে দেশের প্রেসিডেন্ট আর প্রধানমন্ত্রী করা ভাল, তাই না? ব্যক্তিগতভাবে আমি যেহেতু ভাষাবীদ নই, তাই ঈ ও ই, কিংবা ন ও ণ এর উচ্চারনগত পার্থক্য, বর্ণমালায় উভয়ের থাকা বা না থাকার প্রকৃত তাত্বিক দিক নিয়ে আমার কথা বলা একদম অনুচিত। আমি একজন সাধারন ভাষাভাষি হিসেবে যদিও চাই, যে, বর্ণমালায় একটা ন, একটাই র, একটাই অ, একটাই স, একটাই ই বা ঈ থাকুক, যাতে আমাদের বানান রীতি নিয়ে ঝামেলার অবসান হয়। ঠিক যেমন কিছুদিন আগে চট্টগ্রামের ইংরেজি বানান Chittagong হতে Chattogram করা হয়েছে, কুমিল্লা’র ইংরেজি বানান উচ্চারনের সাথে মিল রেখে Comilla’র পরিবর্তে Kumilla করা হয়েছে। এতে সুবিধা হল, উচ্চারন বা প্রোনানসিয়েশন অনুযায়ী অভ্র’তে লেখার মতো করে একটি অভিন্ন ও সহজ লেখার পদ্ধতি অনুসরন করা যাবে।
বানানরীতি বা বানান মুখস্ত করা নিয়ে আমাদের হয়তো গলদঘর্ম হতে হবে না। হ্যা, ওই যে, বললাম, এটা একান্তই আমার নিজস্ব চাওয়া। প্রজ্ঞাবান ভাষাবীদরা বিষয়টার আদ্যোপান্ত জানেন এবং ভাষার বিশুদ্ধতা ও বিবর্তন নিয়ে কীভাবে এগোতে হবে-তার তাত্বিক দিক নির্দেশ করার অধিকার কেবল তাদের। একটা জিনিস পরিষ্কার। গণদাবী বা পপুলার মেজরিটি কখনোই ভাষারীতির আনুষ্ঠানিক বা ব্যকরণিক নিয়ম নির্ধারনের একদমই অধিকার রাখে না। অর্থাৎ, বিষয়টা গনভোটের জিনিস না।
দেশের ৫১% লোক যদি একটি কলাগাছকে ভোট দেয়, গণতান্ত্রীক পদ্ধতির মারপ্যাঁচে সে দেশপ্রধান হলেও হতে পারে। কিন্তু, একই পথ ধরে দেশের ৫১% লোক যদি বলে, ‘বাংলাদেশ’ নামটা আজ হতে ’বাঙলাদেশ’ হওয়া উচিত-তাতেই নাম বদলে যাবে না। সেভাবেই, গরু বা গোরুর বানান কীভাবে নির্ধারন হবে, সেটা ভাষাবীদ ও যথাযথ কর্তৃপক্ষেরই নির্ধারন করা যুক্তিযুক্ত। পাবলিকের সেটা নিয়ে এতটা ঘুম নষ্ট হওয়ার দরকার দেখি না। আপনি গরুই লিখুন আর গোরুই লিখুন, তাতে গরুর পা চারটার স্থলে ৩ টা হয়ে যাবে না, কিংবা কোরবাণীর ষাড় কে যদি সার বানানে লেখা হয়, তাতে গোরুর গোসের মোলাম আরাম কিছুমাত্র কমে যাবে না।
পরিবর্তন ও বিবর্তন ভাষা ও সংস্কৃতির চিরায়ত রীতি। আর সেই পরিবর্তন কখনো থামিয়ে রাখাও যায়ও না। হ্যা, সেটা একটা দীর্ঘমেয়াদী ও সময় সাপেক্ষ বিষয়ই বটে। ভেবে দেখুন, আজ হতে তিন দশক আগেও আমাদের পিচ্চিকালে লিচু বানান লেখা হত লী বা ৯ অক্ষর দিয়ে>৯চু। (লী অক্ষরটি কীবোর্ডে নেই, যেটা দেখতে অনেকটা ৯ এর মতো ছিল।) আজকেও কি আপনি তাহলে লিচু লিখতেন ৯চু দিয়ে? হ্যা, নানা বাস্তবতার কারনে আমাদের দেশে আমরা যথাযথ কত্তিপক্ক’র ওপর আস্থা রাখতে না ই পারি।
আমাদের নানা অভিযোগ থাকাটা খুবই যুক্তিযুক্ত। কিন্তু তাই বলে, গণহারে সেই কত্তিপক্ক’র বিরোধিতা করাও কোনো কাজের কথা নয়। কত্তিপক্কের বা তার রাজকীয় আধিকারীকদের নিয়ে আপনার প্রচন্ড অনুযোগ থাকতেই পারে, সেগুলো সত্যও হয়ে থাকতেই পারে, তাই বলে, আজ যদি আপনি বলেন, যে, না, যেহেতু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় কত্তিপক্ক বলেছে বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে স্বাধীন হয় আমি সেটা মানি না। কারন ওটা বাংলাদেশের একটা কত্তিপক্ক বলেছে। না, আপনার সেই বলাটা যৌক্তিক নয়।
ঠিক তেমনি, বাংলা একাডেমি গরু শব্দটির (বা এরকম আরও কিছু সংশোধন বা পরিবর্তন করেছে) বানান গোরু করে ফেলাতে আপনার যদি মনে হয় যে, না, বাংলা একাডেমি গরুকে গোরু করতে পারবে না, ওদের এই পরিবর্তনের ব্যাখ্যা ভূয়া, ওরা অযোগ্য-সেটা খুবই অগ্রহনযোগ্য যুক্তি হবে।
যতই অভিযোগ থাকুক, অসঙ্গতি করে থাকুক, একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে আপনার ভরসা করতেই হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স দেখে যদি আপনি অন্য সবারই যোগ্যতা ও দৌড় একই পাল্লায় করে ফেলেন, সেটা খুব একপেশে হয়ে যাবে। আর বিষয়টা যদি এমন হয়ে থাকে, যে, স্রেফ সরকার বা সরকারী একটা কর্তৃপক্ষ করেছে বা বলেছে বলেই তার বিরোধিতা করব, তাহলে তো কথাই নেই।
এধরনের গোড়ামি বিশ্বাস যাদের ভিতরে, তারা এমনকি গো.আযম নামক কসাইটাকেও অন্যায়ের শিকার বলে মনে করে (অনুহ্য কারনটা হল, স্রেফ বিচারকার্যটা আওয়ামী লীগের আমলে হয়েছে বলে।)
#spelling #standardlanguage #alphabet #banglish #linguistics