Skip to content

ব্রাত্যজনের ঈদ

  • by

এটা প্রায় একটা ব্যক্তিগত প্রথা হয়ে গেছে, যে, চান রাতে অথবা ঈদের দিন সাত সকালে কী-বোর্ডে বসব আর ঘ্যাস ঘ্যাস করে সব ট্র্যাস লিখব। ট্র্যাস এই অর্থে, যে, সময় ও স্রোত যেদিকে যাচ্ছে, তার ১৮০ ডিগ্রী উল্টো কিছু মাথায় নিয়ে কী-বোর্ডে আঙুল চালানো। ইদের দিন সকালে কি আমার এই সস্তা লেখাটি লেখার কথা? বিশেষত যখন আশপাশের ব্যালকনি হয়ে ইলিশ ভাজা, কড়া পাক জর্দা সেমাইয়ের ঘ্রান আর গরুর গোশ কষানোর চিত্তাকর্ষক লোভ এসে নাকে নাকে সুরসুরি দেয়?

হ্যা, আমি পারি। বহুদিন ধরেই পারছি। বিশেষ করে শেষ কয়েক বছরে জীবন অবিশ্বাস্য বাঁক নেবার পর হতে তো অনেক কিছুই দেখি পারছি। পারতে হচ্ছে। ঈদ বা ঈদ কখনোই বিশেষ দ্যোতনা নিয়ে না এলেও রক্ত-মাংসের মানুষের পক্ষে তার চারপাশের সময়কে অস্বীকার করা, উপেক্ষা করা শতভাগে কখনোই তো সম্ভব না। তাই বলা চলে, আরোপিত এক উৎসব আনন্দের ঘেরাটোপে বন্দী জীবন। মনে দোলা না দিলেও উৎসব এসে চারপাশের চৌহদ্দীতে কড়া নাড়ে। মনে করিয়ে দেয়, তুমিও মানুষ। তোমারও একদিন ছিল সব। তোমারও মনে লাগতে পারত উৎসব রঙের ছোপ।

অদ্ভুৎ এক চান রাত দিয়ে এবারের ঈদের শুরু জীবনে। অদ্ভুৎ এজন্য যে, কাল চান রাতে দুটো বেয়াদবকে জামাই-বউ মিলে আচ্ছামতো বাক-ধুনো করে এসেছি। যথেষ্ট মাসল পাওয়ার আর মানি পাওয়ার থাকলে লাঠি-ধুনোও করতাম হয়তো। অন্যায় ও বেয়াদব ঔদ্ধত্য যখন সীমা ছাড়ায়, তখন তো গান্ধীজিরও মুখে চ বর্গীয় সূধা বর্ষণ হতেই পারে। সংযমের মাসের সদ্য বিদায়ের মুখে সদ্যই শৃঙ্খলমুক্ত শয়তানের সদর্প হাজিরায় এ-তো হতেই পারে।

তার পর আজ সকাল হয়েছে মৃদু কালবৈশাখী আর বিপুল বর্ষণের শব্দে। বৃষ্টি চিরকাল আমার শত্রু হলেও বুড়ো বয়সে এসে সে-ই হয়ে পড়েছে আমার প্রচ্ছন্ন এক প্রেম। বৃষ্টি হলেই তাই বারান্দায় দাড়াই, বৃষ্টিকে ফ্রেমবন্দী করি। আমার হার্ড ড্রাইভের একটি বড় অংশ তাই বৃষ্টির ভিডিও আর ছবিতে সয়লাব।  রুজী রোজগারের ধান্দালয়, মানে, অফিস ছুটি দিয়েছে হপ্তাখানিক। কামলাদের জীবনে অবিশ্বাস্য কোনো কোনো ক্ষণে যখন এরকম দীর্ঘ বিরতি এসে পড়ে, তারা আনন্দে আত্মহারা হবে, নাকি একঘেয়েমিত্বে আক্রান্ত হবে-তা ঠিক করে উঠতে উঠতেই ৬ দিন কেটে যায়।

আর তারপরে, কী হল এটা, কী করে সময় গেল-সেটা ভাবতে ভাবতে বাকি একদিন। সব মিলিয়ে ঈদ ছুটি সেই থোড়বড়িখাড়া-খাড়াবড়িথোড়। আমাদের অবস্থাও হয়েছে তাই। লম্বা ছুটিগুলোয় আমার ব্যস্ততা বাড়ে। ঘরে বাইরে মাত্র দুইজন প্রাণী হওয়ায় সারা সপ্তাহের জমে থাকা গৃহস্থালী ও আটপৌরে জীবনের দরকারী কাজগুলো যেমন সপ্তাহান্তের ছুটিতে করতে করতে হপ্তাহান্ত শেষ। তেমনি, উৎসব পার্বণে সামান্য লম্বা ছুটি হলে সেটা ঘুমিয়ে বা বেড়িয়ে কাটাবার সুযোগ থাকে না। সেটা কাটে দীর্ঘদিন ধরে জমানো কাজে ব্যয়ের মধ্য দিয়ে। তা না হলে কোন পাগলে চান রাতে বউয়ের হেশেলের হলুদ-মরিচ গুড়ো করতে ভাঙানির দোকানে দৌড়ায়?

চান রাতে জামাই-বউ মানে দুই পার্টনার বেড়িয়েছি। উদ্দেশ্য, রোজকার রুটিন মতো, মিরপুরের বিখ্যাত ’হাপিষ হোটেলের’ গলিতে টঙ চা আস্বাদন, আর অতঃপর রাস্তায় অগ্যস্ত হন্টন। ফাঁকে দিয়ে হলুদ-মরিচ গুড়ো করা। (ওই কাজটা ৬ মাস ধরে পড়ে ছিল, তাই)। রাস্তায় জনচলাচল স্বাভাবিকভাবেই অত্যন্ত কম। শহরটাকে যেন ভুতুড়ে লাগে। আমাদের গলিটা পাড় হয়ে ‘হাপিষের’ কাছে যেতেই দেখি, জনপ্রিয় ‘ফুডগুন্ডা’ সেবার একটা বাচ্চা বয়সী ছেলে পিঠে বিশাল একটা ব্যাগের ওজনে ঝুঁকে ঝুুঁকে চলছে আর ফোনে ঠিকানা মিলাচ্ছে। বুঝলাম, সে এই চান রাতেও কোনো এক ধনীর ঘরে হালিম, কিংবা ‘হাপিষের’ মাটন হান্ডির চালান নিয়ে যাচ্ছে।

নেহাতই বাচ্চা বয়সী সেই ছেলেটার মুখটা অন্ধকারে একবার দেখি। সেখানে উৎসবের উচ্ছাস নেই, চান রাতের উদ্দাম নেই, বন্ধুদের সাথে চান রাতে ‘লেইট নাইট শপিং’ এর তাড়া নেই। সেই চোখে আমি বিষাদ দেখি, দায়ীত্ববোধ দেখি, দায়ীত্বের চাপ দেখি। আরেকটা বাড়তি রাইডে আর ক’টা পয়সা হাতে আসবার আকূতি দেখি। হয়তো, ওই বাড়তি ক’টা টাকাতেই তার বাসায় সেমাইয়ের প্যাকেটটা আসবে। চান রাতে নয়, ঈদের দিন সকালে যদি কোনো দোকানদার দোকান খোলে, তাহলে তার থেকে সবার রেখে যাওয়া ভাঙাচোরা একটা সেমাইয়ের প্যাকেট, সামান্য চিনি, দুধ, হয়তো আধাসের পোলাও চাল জুটবে। সেই বাজার টোকানো পসরাতেও তার চোখে যে আনন্দাশ্রু দেখা দেবে, আমি তার চোখে সেই বিলম্বিত সুখের হাতছানিটা আগাম দর্শন করি। আহা, বাচ্চা ছেলেটা। এই বয়সেই সবার দায়ীত্ব নিতে শিখে গেছে।

টঙের দোকানের সূজন, সবুজ, বাসার দারোয়ান মফিজ, আগোরার অপত্য বয়সী সেলসম্যান অথবা মহল্লার পাশেরই ব্র্যান্ড মেকআপ শপের সেলসগার্ল মেয়েগুলোর তাই চানরাত হয় না। গভীর রাত তক তারা বাবুসাবদের সার্ভিস দেয়। আমাদের পারিবারের বন্ধু একজন সেলসগার্ল। প্রতি ইদে চান রাতে রাত তিনটায় তার বর এসে বসে থাকে শপে। তার ছুটি হলে তাকে নিয়ে ঘরে ফিরবে। পাড়ার সেলুনের ছেলেগুলো গভীর রাত অব্দী আমাদের কেশবিন্যাস করে দেবে। তাদের ছুটি নেই। আসলে সবার ছুটি থাকে না। ছুটি হয় না। জীবন তাদের ছুটি দেয় না।

উৎসব সবার জন্য উৎসব হয়ে আসে না। তারা ছুটে চলে। সবার চানরাতকে রোশনাই করতে। সবার লেটনাইট উচ্ছাসকে বাড়তি রং দিতে। আজ সকালের কালবৈশাখীতে সেই ছেলেটা সেমাই কিনতে পারল কিনা জানি না। বড় মানুষ, মহান মানুষ হলে ও’র ফোন নম্বরটা হয়তো নিতাম। সকালে ফোন করে ডেকে নিতাম। আমার পার্টনার রাতে বহু বহু কষ্টে, তীব্র শারিরীক অসুস্থতা নিয়েও ভালোবেসে যে সামান্য সেমাই রান্না করেছে (জর্দা সেমাই নামের একটা পদ-যেটা আমার মায়েরও একটা সিগনেচার আইটেম-সে কী করে কী করে যেন আবিষ্কার করেছে) সেটার সামান্য আস্বাদ তাকেও দিতে পারতাম। কিন্তু, আমি তো মহামানব নই। আমাদের মহামানব হবার সুযোগ নেই। আমরা সাধারন মানব হয়েই তাই ঈদের দিন শুরু করি। আর তাদেরকে ভুলে যাই।

মনের মধ্যে হালকা অপরাধবোধ হয়তো টুকটাক জাগে। কিন্তু, পরক্ষণ্যেই ঈদের দিনের হাজারটা নাগরিক আয়োজন তাকে চাপা পড়িয়ে দেয়। বৃষ্টিটা সামান্য ধরে এসেছে এতক্ষণে। গভীর রাতে ঘুমোনো আমি ভোরে উঠে লিখতে বসেছি ঝড়ের আবহে। পার্টনার নিটোলের ঘুম ভেঙেছে বোধহয়। এবার তাহলে নাগরিক সমাজে নামার সময় হলো। ফাঁকা ঢাকায় এমন অকালের বৃষ্টিতে দু’জনে ছাতা মাথায় ঘুরব, ঘুরব, বৃষ্টি উপভোগ করব। আজ পথে পথে হাঁটার দিন। সমাজকে ভুলে থাকার দিন। সমাজ হতে দূরে থাকার দিন। আজ বৃষ্টিবিলাসের দিন। যাদের এরকম দিনেরও বৃষ্টি বিলাসের সখ আছে, তারা এসে পড়তে পারেন সঙ্গ দিতে, সঙ্গ নিতে।

তবে যাদের জন্য আজ আটপৌরে ঈদের দিন, তাদের সবাইকে, ঈদ মুবারক।

#eidcelebration #Eidfestival #marginalpeople #vulnerablepeople

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *