ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। মহসীন হল। আমার জীবনের মোড বদলে দেয়া ৭-৮টি বছর কেটেছে ওখানে। প্রায় প্রতিটা মানুষেরই তার স্কুলজীবন নিয়ে ফ্যান্টাসী থাকে। আমার আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যাম্পাস নিয়ে।
তবে আজকের লেখা আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের স্মৃতিচারনের জন্য নয়। ওখানে ৭-৮ বছর থাকাকালীন শহীদ মিনারে প্রভাতফেরিতে খুব নিয়মিত ছিলাম না। ওই যে, ”মক্কার মানুষ হজ্জ পায়না”র মতো। তবে অবশ্যই শহীদ মিনারে যেতাম ২১ তারিখ। হয়তো দুপুরে, বিকেলে। ভীড় কমে এলে।
ছোটবেলায় পিসি কলেজের মিনারে প্রভাতফেরীতে নিয়ে যেত মেঝ মামা, কখনো আপা, ভাইয়া। আমার সখের বাগানের ফুল রাত জেগে পাহারা দিতে হত, চুরির ভয়ে। সেই আমি ক্যাম্পাস ছাড়ার পরে প্রায় প্রতিটি ২১শে ফেব্রূয়ারীতেই শহীদ মিনারে গেছি। তবে শহীদ বেদিতে ফুল দিইনি সব সময়। শুধু দূর হতে মানুষের আগমন, ভীড়, শ্রদ্ধা অর্পণ, বাচ্চাদের অবাক ভালবাসা, বিদেশীদের বাংলা ভাষা সংগ্রামের প্রতি আগ্রহ ও শ্রদ্ধা নিবেদন দেখে আবেগে ভাসতাম। এমন করেই কেঁটে যাচ্ছিল জীবন।
২০১৮ সালে এসে নিয়মের বাত্যয় হল। এবছর ২১ শে ফেব্রূয়ারীর কয়েকদিন আগে আমাদের অদ্ভূতুরে ফেসবুক গ্রূপ “SSC 96 HSC 98” এর কিছু পাগলা ছেলেমেয়ে উদ্যোগ নিল গ্রূপের পক্ষ হতে প্রভাতফেরিতে যাবার। যথারীতি একটা চ্যাটগ্রূপ খুলে সেখানে গরম গরম প্রস্তুতি, আপডেট শুরু হয়ে গেল। আমি শুধু মেসেজ পড়ি, ওদের পরিকল্পনা শুনি, যারা রেসপন্ড করছে না-তাদের নিয়ে উষ্মা প্রকাশ দেখি, কিন্তু কিছু বলি না। ২১ তারিখ সকালেও জানি না, সকালে যাব কিনা। কিছু সমস্যা ছিল।
হঠাৎ করে ১০ মিনিটের নোটিশে সিদ্ধান্ত নিয়ে হাতের কাছে থাকা জামা, প্যান্ট পড়ে চলে গেলাম ক্যাম্পাসে। (আমি বিশ্বাস করি, ২১ যেমন কোনো ফ্রেমে আবদ্ধ নয়, তেমনি একুশের শ্রদ্ধাকেও কোনো পোশাকে অর্গলবদ্ধ করা উচিৎ নয়।) আগে থেকেই হাজির থাকা একদল ব্যাচমেট বন্ধুর সাথে শহীদ মিনারের একদম কাছে (স্বাধীনতার সংগ্রাম চত্বরের পাশে)। সেখান থেকে ভীড় ঠেলে শহীদ বেদিতে ফুল দিতে আমাদের লেগেছে প্রায় ৪ ঘন্টা। রোদ মাথায় করে ধুলো, গোলমাল, ধাক্কাধাক্কি সামলে দাড়িয়ে থাকা। মাঝে মাঝে আমরা বড় মানুষদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটলেও অবাক কান্ড হল, আমাদের বন্ধুদের ৪টি বাচ্চাও এসেছিল শ্রদ্ধা নিবেদনে, আমি ওদের এই পুরোটা সময়ে একবারের জন্যও ধৈর্যহারা হতে বা কষ্ট প্রকাশ করতে দেখিনি। আমি আক্ষরিক অর্থেই বলছি, একদমই দেখিনি। এই বাচ্চাগুলো আমাকে লজ্জায় ফেলে দিয়েছে। আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছে (ওদের দেখে), এই বাংলাদেশের বিশ্বাস বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট উপাদান আজও আছে, আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে নিয়ে আশাবাদী হবার যথেষ্ট কারন এখনো আছে।
তার উপরে, আমরা যারা গিয়েছি দল বেঁধে, তারাও সমাজে বেশ উচ্চ প্রতিষ্ঠিত (আমি ভ্যাগাবন্ড বাদে)। তারাও এই কষ্টকর প্রভাতফেরিতে ঘন্টার পর ঘন্টা দাড়িয়ে থেকে, ছুটির দিনে অন্যদের মতো ঘুমিয়ে আয়েশ না করে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে এসেছে দেখে বুকটা গর্বে ফুলে উঠেছে। আমি একমুহুর্তে অনুভব করেছি, ’আসব কি আসব না’-সেই দ্বিধায় ভোগাটা অন্যায় হয়েছে। আমাকে আসতেই হত। আমি আবার আসব। আসতেই হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে ওই দিন আমাদের 96/98 গ্রূপের যেসব বন্ধুরা প্রভাতফেরিতে গিয়েছে, যারা আয়োজন করেছে, যারা এটিকে বাস্তবায়ন করেছে, যেই বাচ্চারা আমাদের লজ্জায় ফেলেছে-ওদের সবাইকে একটা সশ্রদ্ধ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাতে এই লেখাটি লিখছি।
তোমরা খুব সময়োপযোগী একটি কাজ করেছ। খুব। হয়তো কিছু ছোটখাটো বিচ্যূতি ঘটেছে, সেটা কিছুই নয় পুরো ব্যাপারটার মহিমার কাছে। আমরা হয়তো একটু হালকা পাতলা বাদানুবাদ বা বিতর্কে লিপ্ত হয়েছি ওইদিনের পরে (কিছু অনাকাঙ্খিত/অনিচ্ছাকৃত ভুল বা বিচ্যূতি নিয়ে), তবে সেটা এমন কিছু নয়। তাছাড়া আমরা অন্যদের মতো ব্যাংক ব্যালেন্স বা কর্পোরেট স্বার্থ নয়, তর্ক করেছি মায়ের ভাষার শুদ্ধতা নিয়ে, ঐক্যবদ্ধতা নিয়ে-যেটা একুশের অন্যতম থীম।
আমি বিশ্বাস করি, দিন শেষে আমরা সশ্রদ্ধচিত্তে একমত হব, মাঠে বা বেদিতে আমরা যে ক’জনই হয়ে থাকি, পুরো 96/98 এর ১৪ হাজারের পরিবার সম্মিলিতভাবে ওই দিন দারুন করেছে। বিচ্যূতি যা হয়েছে সেটা খুব নগন্য ও ইগনোরেবল। ওটুকু তো হতেই হবে। আর আমরা ১৪ হাজার সদস্য এমন একটা গর্বের ভাগিদার। তাতে একটু কিলাকিলি না থাকলে কীসের বন্ধুত্ব? এবারের আয়োজনটি আগামীবার হতে বিশাল ও কেন্দ্রীয় আয়োজনে চলতে থাকুক-এমনটা আমার প্রত্যাশা।
আমাদের পরের প্রজন্মের কাছে রেখে যাবার মতো খুব বেশি কিছু তো আমাদের নেই। এটুকু অন্তত আমরা করতেই পারি। কেন্দ্রীয় মিনারে যদি যেতে নাও পারি, যার যার এলাকা বা জেলায়ও আমরা আলাদা করে উপস্থিত হতে পারি আর ব্যাপকভাবে শেয়ার করতে পারি গ্রূপে। কেন শেয়ারটা জরুরী-সেটা একুশের বিকেল হতে পরদিন পর্যন্ত পোস্ট করা কিছু অসহ্য মেসেজ বা ছবি দেখলেই বোধগম্য।
একুশকে অপমান করে করা কিছু পোস্টকে বোঝাচ্ছি। ওদেরকে একটা উপযুক্ত জবাব দিতে, আর আমরা যে এখনো ঘুমিয়ে পড়িনি-সেটা বোঝাতে এই শো অফটা দরকার। এবার একটু অন্যরকম ভাবনা বলি। আমার পরিচীত ও অপরিচীত অনেক মানুষ এমনকি সারাবছর নানারকম আধুনিক জীবনযাত্রায় পুরোদমে অভ্যস্ত-এমন মানুষকেও দেখি, ২১শে ফেব্রূয়ারী, ২৬ শে মার্চ, ১৩ই ফাল্গুন, ১৪ এপ্রিল (পহেলা বৈশাখ) এর মতো বাঙালী ঐতিহ্যের সময়গুলো এলেই তাদের মধ্যে কী এক অদ্ভূৎ কারনে এইসব জাতীয় অনুষ্ঠান ও আচারগুলোর প্রতি একরকম এলার্জি জেগে ওঠে।
নানাভাবে ইনিয়ে বিনিয়ে, নানা ছলছুতায় তাদের একটা বড় অংশকে দেখি ২১শে ফেব্রূয়ারীর প্রভাতফেরী ও শহীদবেদিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের ব্যাপারটিকে নিয়ে নানা কটাক্ষ করতে। সবচেয়ে বিরক্তিকর ও ঘেন্নার বিষয় হল, অনাহুত, অন্যায্য ও অযৌক্তিকভাবে ২১শে ফেব্রূয়ারীর অনুষ্ঠানমালা, বিশেষত ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোকে তারা ধর্মের বিপরীতে দাড় করানোর অপচেষ্টা করে।
আমি তাদের অন্যায়ের কোনো বিরুদ্ধ লজিক এখানে দেব না। শুধু এটা জানাতে চাই, বাংলা, বাঙালী, বাংলাদেশ, একুশ, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা, স্বাধীনতা, যুদ্ধাপরাধ-বাংলাদেশের এই গর্বের স্থানগুলো নিয়ে বিন্দুমাত্র কটাক্ষ, ক্রূঢ় ইঙ্গিত, সন্দেহ বা বিরুদ্ধাচারনকারীদের ব্যাপারে আমি অত্যন্ত ফ্যানাটিক ও ক্রেজি। ওই বিষয়গুলোতে কোনো লজিক আমি একদমই হজম করি না। সাফ কথা।
সব ভাল’র মধ্যেও আমার মতো নেগেটিভ মানুষের স্বভাবই হল খুঁতখুঁত করা। শহীদ মিনারে প্রভাতফেরি ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের আয়োজনটিতে কিছু কিছু সংস্কার বা ফাইনটিউন করা গেলে পুরো বিষয়টি আরো ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ হত। আমার খুব কষ্ট লেগেছে, এটা দেখে, হাজার হাজার মানুষ ধৈর্য ধরে ঘন্টার পর ঘন্টা রোদে দাড়িয়ে আছে ফুল দেবার অপেক্ষায়। বাচ্চারা পর্যন্ত কষ্ট করছে। সেখানে কিছু অর্বাচীন, অসভ্য এমন একটি পবিত্র স্থানেও এসে দুই নম্বরি করতে ব্যস্ত। ভীড় ও লাইন ভেঙ্গে প্রতারনা করে লাইনের মাঝে ঢুকে আগে আগে কাজ শেষ করার অপচেষ্টা করতে দেখলাম প্রচুর মানুষকে।
ধিক তাদের। এমন স্থানে এমন দিনে এসেও আপনারা দুই নম্বরি রাস্তা ধরতে চান। স্বভাব যায় না মরলেও। একুশের প্রতি শ্রদ্ধাতেও শর্টকাট মারতে চান? পু
রো মিনার এলাকাটা এবং তাতে শ্রদ্ধা নিবেদনের পুরো প্রক্রিয়াটি আরো সহজ, সাবলীল, কম ঝামেলাপূর্ণ, কম সময়ে সম্পন্ন করা যায় যদি আরেকটু সুন্দর ম্যানেজমেন্ট ও সিস্টেমে আনা যায়। পুরো আয়োজনটির সমস্ত বিধিব্যবস্থার ফোকাস থাকে মূল বেদির আশপাশে। ওটা হতে হবে পুরো ক্যাম্পাস নিয়ে। লাইন রক্ষা করে ধীরস্থির ও গাম্ভীর্য বজায় রেখে পুষ্পস্তবক অর্পনের কথাটা মাথায় রাখা উচিৎ সবার। আমার মনে হয়, আর একটা নিয়ম করা উচিৎ, শহীদ দিবসের অনুষ্ঠানে ওইদিন কেউ বেদিতে উঠে যাবার পর কোনো ছবি, সেলফী, ভিডিও করতে পারবে না। শুধুমাত্র আমাদের তীব্র ও ন্যাক্কারজনক সেলফী, গ্রূপফী প্রীতি, ভিডিও, ক্যামেরায় চেহারা দেখানোর বদ খাসলতের জন্য শহীদ মিনারে অপ্রয়োজনীয় ভীড় ও সময়ক্ষেপন ঘটেছে। এমনকি দায়ীত্বে থাকা স্বেচ্ছাসেবকদের পর্যন্ত বারবার মাইকে সতর্ক করা হচ্ছিল। দুঃখজনক। এই পুরো আচরনটি ২১শের শ্রদ্ধা, শোক ও গাম্ভীর্যকে ক্ষতিগ্রস্থ করে। তাছাড়া, একুশের অনুষ্ঠান লাইভ সম্প্রচার হয় টিভিতে। আমাদের হাস্যোজ্জল বদন দেখে বিদেশীরা আমাদের নিয়ে কী ধারনা পোষণ করতে পারে? শোকে পাগল হয়ে গেছি-এমনটা নিশ্চই নয়? আর ২১ ফেব্রূয়ারীকে একটি বাড়তি ছুটির দিন ভেবে যারা বাড়িতে বিবি বাচ্চা নিয়ে আয়েশে ঘুমান-তারা বছরে একটি দিন কম ঘুমালে বোধহয় ক্ষতি হত না।
২১শে ফেব্রূয়ারীকে আজীবন জেনে এসেছি আমাদের জাতীয় দিবস ‘ভাষা শহীদ দিবস’। কয়েক বছর আগে জাতিসংঘ দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষনা দেয়। সেই হতে কেন যেন ‘ভাষা শহীদ দিবস’ বিষয়টি হারিয়ে গেছে ২১শের চেতনা হতে। কে কবে এটা করল জানি না। আমি কিছুতেই মানব না, ২১শে ফেব্রূয়ারীর পরিচয় ‘ভাষা শহীদ দিবস’ হতে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ বেশি বাঙময়। একুশ প্রথমে আমাদের দিবস, আমাদের প্রাণের অনুষ্ঠান। কেবল তারপরেই সে আন্তর্জাতিক চেহারা পেতে পারে। আর আমাদের ’কূল ডুড’ জেনারেশনকে মনে রাখতে হবে, ২১শে ফেব্রূয়ারী কোনো উৎসব নয়, কোনো আনন্দ বিনোদনের উপলক্ষ্য নয়। একুশ আমাদের শোকের দিন, মাস। একুশ আমাদের প্রথম স্বাধীনতার দাবীতে উজ্জিবিত হবার ইতিহাস। ২১শে ফেব্রূয়ারীতেও দেখলাম সেলফী, রঙিন পোষাক, হেড ব্যান্ড (যার জন্ম প্রাচীন গ্রীসে), কড়া মেকআপ, হা হা হিহি, পার্টি, কাচ্চি, এনজয়মেন্ট, মুন্নী বদনাম হুয়ি, কাপলদের রিকশা রোমান্স, পার্ক রোমান্স, বইমেলা রোমান্টিসিজম-সবই আমদানী হয়েছে। মোবাইল কোম্পানী আর বুটিক হাউসগুলোর তো নোংরামীর শেষ দেখলাম না। বন্ধ হোক এসব অসভ্যতা। শোককে শোকের স্থানে রাখি। উৎসবের তো কমতি নেই এদেশে। একুশকে এই নোংরামির হাত হতে রেহাই দেয়া কি খুব কঠিন? [বাধ্য হয়ে কিছু ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করতে হয়েছে। আশা করি ক্ষমা পাব।]
#ekush #21stFebruary #language #martyrsday #patriotism