টিভি কমার্শিয়ালে একটি পন্যকে যেভাবে তুলে ধরা হয় বাস্তবে কি সেগুলো সত্যিই সেরকম? ফেসবুকে আমরা আমাদের তথাকথিত ফেবু ফ্রেন্ডদের যেই ইমেজে দেখি সত্যিই কি তারা সেরকম? আমরা আমাদের আলোকিত অংশ, সবচেয়ে উন্নত অংশ, অর্জন, প্রগতিশীল অংশই শুধুমাত্র ফেসবুকে পোষ্ট দিই। নিজের মনের অন্ধকার দিকটা নিয়ে বা নিজের কুরূপের ছবি বা পোষ্ট নিশ্চই কেউ দিই না। তাই ফেবুর মানুষকে বাস্তবেও সেই একই রকম সুশীল, প্রগতিশীল, বিনয়ী, আনন্দময়ী, আলোকিত চমৎকার মানুষ ধরে নিয়ে প্রতারিত হবেন না। অধিকাংশ সময়ই আমরা আমাদের নখদন্ত গুটিয়ে রাখি-স্বার্থের প্রয়োজনে কিংবা সুযোগের অপেক্ষায়। তাই ভার্চুয়াল মিডিয়াতে নখদন্ত দেখতে না পাওয়ায় তার নখদন্ত নেই-সেটা একচেটিয়াভাবে বিশ্বাস করবেন তো মরবেন।
আজ একটা গল্প দিয়ে শুরু করব তবে কিঞ্চিত অতিরঞ্জিত করে। জনৈক আধুনিকা ভদ্রমহিলা (যিনি এই পৃথিবীতে শুধু জিপিএ-৫ চেনেন, চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে ফ্রি পেতে জিনিস কেনেন আর শুধু ইন্ডিয়ান সিরিয়াল দেখেন)। তিনি মারা যাবার পর বিধাতা তাকে জিজ্ঞেস করলেন যে তিনি স্বর্গে যেতে চান, নাকি নরকে। আধুনিকা বললেন যে, তিনি একবার ঘুরে দেখে আসতে চান বাস্তব অবস্থা, তারপর সিদ্ধান্ত নেবেন।
তো তাকে প্রথমে স্বর্গে পাঠানো হল। তিনি গিয়ে দেখেন স্বর্গে শুধু বৃদ্ধ লোকেরা বসে আছে। কোনো গান নেই, সিনেমা নেই, টি-২০ নেই, হিন্দি সিরিয়াল নেই, শপিং মল নেই। শুধু খালাম্মা বয়সী কিছু মানুষ আর দাদু-দিদারা সেখানে বেতের চেয়ারে বসে আদা চা খাচ্ছে। কেউ বাতের ব্যথায় কাতরাচ্ছে। কেউ কেউ উলের সোয়েটার বুনছে। ভিতরটা বেশ গরম। দুই আনা দরে হাত পাখা বিক্রি করছে ঢাকার হকাররা। আধুনিকার এই ম্যাড়মেড়ে জৌলুসহীন সাধারন স্বর্গ পছন্দ হলনা।
তিনি এবার গেলেন নরক দর্শন করতে। সেখানে গিয়ে দেখেন দুর হতে ব্যাপক হই-হুল্লোর, সিডিতে হিপহপ মিউজিক বাজছে। ঐশ্বরিয়া, সুস্মিতা, দিপিকা, সালমান, আমির, নায়ক রাজ্জাক হতে মায় আমাদের ময়ুরী তক সেখানে লাইভ অনুষ্ঠান করছে। জায়গায় জায়গায় পাব, বার, ক্যাসিনো। ক্রিকেট ম্যাচ চলছে। বিনা পয়সায় তরুন-তরুনীরা দল বেধে দেখছে। ঝা-চকচকে স্পোর্টস কারে করে মানুষজন ছুটে বেড়াচ্ছে। বিনা পয়সায় ফুসকা খাওয়ানোর জন্য বিক্রেতারা হাত ধরে অনুরোধ করছে। সর্বোত্র সেন্ট্রাল এসি’র মৃদু ঠান্ডা বাতাস। আমাদের আধুনিকা অভিভূত হয়ে গেলেন। তিনি ভাবলেন এমন এন্টারটেইনিং নরক ছেড়ে ম্যাড়মেড়ে স্বর্গে যাবার প্রশ্নই ওঠেনা।
তিনি গেলেন ঈশ্বরের কাছে। কোনো দ্বিধা না করে ঈশ্বরকে বললেন তাকে নরকে পাঠাতে। ঈশ্বরের আদেশে দেবদূতরা তাকে নরকে নিয়ে তার দরজা খুললেন। দরজা খোলামাত্র ২০০ ডিগ্রি আগুনের আঁচে তার মূখ ঝলসে যাবার জোগাড় হল। কোনোমতে ভিতরে ঢুকে দেখেন সেখানে শুধু আগুন আর আগুন। চারিদিকে চিৎকার আহাজারি। কোথায় সেই সেন্ট্রাল এসি, কোথায় ঐশ্বরিয়া আর সালমান। যতদুর চোখ যায় খালি বাংলাদেশের পলিটিশিয়ান, চোর বাটপার, ঘুষখোররা লাঠিপেটা হচ্ছে পেটোয়া জল্লাদের হাতে। পানির বদলে আছে ঢাকার সুয়ারেজের ময়লা জল। হিপহপ মিউজিকের বদলে মানুষের আর্তনাদ। বিনা পয়সার ফুসকা তো নেইই উপরন্তু সেই সুয়ারেজের পানিও ১ লাখ টাকা প্রতি বোতল হারে বিক্রি করছে ঢাকার ব্যবসায়ীরা।
রাস্তাঘাটে কাদায় পথচলা দায়, গান নেই, সিনেমা নেই। তার টেস্ট করে দেখা সেই স্বর্গের কোনো নামগন্ধ নেই।
তিনি ছুটে গেলেন দেবদূতদের কাছে। চিৎকার করে বললেন, আমাকে এখানে কেন এনেছ? আমাকে তো এই নরক দেখানো হয়নি। নরক তো অনেক সুন্দর ছিল। সেসব আরাম আয়েশ কই?
দেবদূত হাসতে হাসতে বললেন, “ম্যাডাম ওটাতো ছিল নরকের বিজ্ঞাপন, এখন আপনাকে আসল জিনিস দেয়া হয়েছে।”
এই লম্বা গল্পটা বলার উদ্দেশ্য হল চটকদার কোনো কিছুতেই বিভ্রান্ত হবেন না। বিজ্ঞাপনে বিভ্রান্ত হবেন না। কোনো কিছুর জন্য হুমড়ী খেয়ে পড়বেন না। যাচাই করুন, বিবেচনা করুন, বিশ্লেষণ করুন। তারপর সিদ্ধান্ত নিন।
বিজ্ঞাপন মানুষের মাথায় ভুত হিসেবে ঢুকছে। আপনার বিবেচনা ও বিবেককে নষ্ট করে দিচ্ছে। সচেতন হোন নিজের জন্য।
মনে কিছু না করলে আরেকটা গল্প বলি। গল্পটি অনেক আগে পড়া। লেখক বা গল্পের নাম কিছুই মনে নেই তবে বিখ্যাত কারও এতটুকু মনে আছে। এমনকি গল্পটাও অনেক ক্ষেত্রে নিজের মতো বানিয়ে বললাম। চারিদিকের চলমান পরিস্থিতিতে গল্পটা খুব প্রাসঙ্গিক মনে হওয়ায় মূল গল্পটা খুজছিলাম। না পেয়ে তাই নিজের স্মৃতি হাতড়ে এতটুকু বললাম। ভুলগুলো মাফ করবেন। নিজেদের একটু মিলিয়ে নেবার অনেক উপাদান এখানে আছে। কেউ মূল গল্পটা পেলে দয়া করে শেয়ার করবেন।
ওস্তাদ সাগরেদ ভ্রমন করছে। বহু দেশ ঘুরতে ঘুরতে তারা এক আজব দেশে হাজির হলেন যেখানে পানি আর মাখন একই দাম-এক আনা। শুধু তাই না। যা কিনবে সব কিছুরই দাম এক আনা-কাগজ, কালি, সোনা, মাটি, শাক, মাংস, ঘী, কচু,ঘেচু-সব এক দাম। শিষ্যতো মহাখুশী। এমন আজব দেশ আর কোথায় পাবে। ওস্তাদ কিন্তু বিপদটা আঁচ করতে পারলেন।তিনি শিষ্যকে বললেন এদেশ ছেড়ে দ্রুত প্রস্থান করতে হবে।যেদেশে পানি আর মাখন একদাম সেদেশে নিশ্চই কোনো একটা গন্ডগোল আছে। এই সুযোগে আমি আরও একটা বাণী দিই। ”যখন দেখিবে, কোনো ভূখন্ডের শিক্ষক ও মৌলানাগণ পঁচিয়া গিয়াছেন, তাহার পরে আর সেই ভূখন্ডে সুখের নহর বহিলেও বসবাস করিবার সাহস করিও না। উহা তখন আর মনুষ্য বাসের যোগ্য নাহি। যথাসম্ভব দ্রুত সেই ভূখন্ড ত্যাগ করো। আর যদি তাহা না করো, তাহা হইলে অচীরেই ফল ভোগ করিবার জন্য প্রস্তুত হও।” বাণীতে মহামতি ভিসুভিয়াস
কিন্তু এত সস্তার দেশ দেখে শিষ্য কি আর যায়। সে রয়ে গেল এদেশে আর চর্ব্য, চোষ্য, লেহ্য পেয়’র লোভে।
ওস্তাদ তার জন্য আফসোস করতে করতে চলে গেলেন এই বলে, “একদিন তুমি পস্তাবে এমন আহাম্মকের দেশে বাস করার কারণে”।
অনেক দিন পরের কথা। সেই সব সম্ভবের আজব দেশে এক চোর গেছে চুরি করতে। সিঁদ কাটার সময় হঠাৎ দেয়াল ধসে পরে সেখানেই মরে গেল চোর।
সকাল বেলায় চোরের বউ গিয়ে নালিশ ঠুকে দিল বাড়ির মালিকের নামে।
“মহারাজ, এ কেমনতর বাড়ি বানানো যে দেয়াল ধ্বসে পড়ে? চোরেরা কি একটু নির্ভয়ে চুরিও করতে পারব না।” সব দোষ বাড়িওয়ালার।”
ঠিক ঠিক। রাজা হুকুম করলেন বাড়িওয়ালাকে ধরে আনতে।
বাড়িওয়ালা ভয়ে ভয়ে সব শুনল। তারপর, “মহারাজ সব দোষ রাজমিস্ত্রীর কারণ সে খারাপ করে দেয়াল বানিয়েছ “।
রাজমিস্ত্রীকে আনা হল।
সে বলল, “সব দোষ আমার সহকারীর কারণ সে খারাপ করে মসলা বানিয়েছে বলেইতো দেয়াল খারাপ হয়েছিল”। রাজা ও সভাসদ দেখে ঠিকই তো। সহকারীকে বেঁধেছেঁদে হাজির করা হল। “মহারাজ, কসুর মাফ করুন। দোষ সব কুমার এর। সে খারাপ কড়া বানিয়েছে। খারাপ কড়ায় মসলা বানালাম। কড়া চুইয়ে পানি বেড়িয়ে গেল। তাইতো মসলা খারাপ হল। শাস্তি যা দেবার তাকেইতো দেয়া উচিৎ।”
ব্যস আর যায় কোথায়, মুহুর্তের মধ্যে পাইক গিয়ে কুম্ভকারকে ধরে নিয়ে এল। কুম্ভকারও দোষ নিতে নারাজ। সে মিনতি জানাল, “আমি কড়া বানিয়েছি ঠিকই কিন্তু মাটি খারাপ ছিল বলেইতো কড়া পাকা হয়নি। তাই বেটা জমিওয়ালাকেই ফাঁসিতে ঝুলানো উচিৎ।
তৎক্ষণাৎ সৈন্যরা গিয়ে বেঁধে নিয়ে এল জমির মালিককে। জমির মালিক আর কাকে দোষ দেবে? সে দোষ স্বীকার করল।
তবে সে ছিল খুবই ধুরন্ধর। সে বলল, “মহারাজ, আমি ফাঁসিতে চড়ব। তবে আমার মতো রোগা-পটকা লোককে ফাঁসিতে ঝুলালে তো মুহুর্তেই মরে যাব। আপনারাতো ফাঁসি দেখার মজাটাই মিস করবেন। তাই বলি কি, রাজ্যের সবচেয়ে নাদুস নুদুস মোটা লোকটাকে যদি ফাঁসিতে দেন তাহলে সবাই খুব মজা করার একটা সুযোগ পায়।”
রাজা ভাবেন তাইতো। প্রজাদের মজা দেয়ার সুযোগতো হাতছাড়া করা উচিৎ না। তিনি তৎক্ষনাৎ হুকুম জারি করলেন রাজ্যের সবচেয়ে নধর মোটা লোকটাকে এনে ফাঁসিতে চড়াতে। রাজার সৈন্যরা রাজ্য তোলপাড় করে মুহুর্তে কাকে হাজির করলেন?
সেই যে শাগরেদ যে ওস্তাদের কথা না শুনে এ রাজ্যে রয়ে গিয়েছিল-তাকেই। এতদিনে সস্তায় ঘি, ননী খেয়ে তিনি হাতিতে পরিণত হয়েছেন। আর যায় কোথায়? কোতোয়াল তাকে শুলে চড়াতে উদ্যত হলেন। পাবলিক ব্যাপক মজা পেয়ে হাত তালি দেয়।
বেচারা শাগরেদ হাতজোড় করে যতই বলে আমার কি দোষ? ততই লোকে মজা পেয়ে হাততালি দেয়।
শাগরেদের প্রাণ যখন সুতোয় ঝুলছে এমন সময় সেখানে এক ভিনদেশী প্রবীণ ব্যক্তি হাজির।চিনতে পারছেন? তিনি শিষ্য’র সেই ওস্তাদ যিনি শিষ্যকে সাবধান করেছিলেন সেই দেশে থাকতে যেখানে পানি আর মাখন এক দাম। শিষ্য ওস্তাদের কাছে তার প্রাণ বাঁচানোর আবেদন করল।
ওস্তাদ রাজাকে ডেকে বললেন, ”রাজা মশাই, কাল রাতে আমি স্বপ্নে দেখলাম যে আজ একটা মহাপবিত্র দিন। আজ যদি কেউ ফাঁসিতে মারা যায় তবে সে ও তার চৌদ্দ পুরুষ সরাসরি স্বর্গে যাবে।”
রাজামশাই ভাবেন, তিনি থাকতে প্রজা কেন এমন দুর্লভ সুযোগ ভোগ করবে। তিনি তক্ষুনী ফাঁসির দড়িতে ঝুলে পড়লেন (আর নিশ্চয়ই স্বর্গেই গেলেন)।

আমি কোনো মন্তব্য করব না। যে যার মতো ভেবে নিন। শুধু “চিলে কান নিয়েছে” কিংবা ”টিভিতে শাহরুখ খান বলেছে” শুনেই ঝাঁপিয়ে পড়াটা বন্ধ করুন।
#ostadshagred #Unusual #Unprecedented #stupidity #relativity #titfortat #king #advertisement #exagiration #exhibitionism #coloring #idiotstate #fabrication #advertisement #mediadomination #mediamanipulation #mediadestruction #mediahype #froud #disguise #হিরকরাজারদেশ