Skip to content

বই প্রকাশের হিড়িক

আগমনি:

বইমেলা শুরু হয়েছে ২৪ দিন হল। এখন পর্যন্ত যাইনি। সহসা যাব-এমনটাও মনে হচ্ছে না। এ আমার এক স্বেচ্ছা নির্বাসন। নিটোল কয়েকবার জানতে চেয়েছে-আমি বইমেলায় যাচ্ছি না কেন? তাকে কী বলব? আমি নিজেই তো জানি না, কেন যাচ্ছি না। হয়তো, বইমেলা নিয়ে মানুষের অতি উচ্ছাস অথচ বই না কেনা, বই পড়ার চেয়ে বইয়ের সেলফীর প্রতি বেশি আগ্রহ, বইমেলার আবহের চেয়ে এর ফেসবুক গ্লামারের প্রতি মানুষের অতি আগ্রহ-এসবই কারন বিতৃষ্ণার।আসলে নিজেকে নিয়ে নিজে একরকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করছি। তাই ওমুখো খুব একটা হইনি। নিরীক্ষার বিষয়বস্তু উহ্যই থাক।

বিগত দুটি বইমেলায় সাত ভাগে কোরবাণী দেবার মতো করে, ভাগাভাগি করে কয়েকটি বইয়ে আমার লেখা গেছে। গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ। তাতে অবশ্য আমি লেখক বা কবি হয়ে যাইনি। বড় কোনো লিখিয়েও না। কিন্তু কেন যেন, একটা প্রবাহ তৈরী হয়েছিল, যে, প্রতিবছরই কিছু না কিছু তো বই বের হতেই থাকবে। এবছর তাই ইচ্ছা করেই দিইনি। কোনো বইয়ে আমার লেখা নেই। সহসা থাকবে-এমনটা সম্ভবনা কম। আমি আসলে নিজের সাথে একটা বোঝাপড়া করছি। সেটা হল, আমি কি আসলে লিখতে চাই, নাকি কেবল বই বের করতে চাই-সেটা বোঝা।

আখতারুজ্জামান আজাদ ভাইয়ের একটি লেখা আমাকে আরও উজ্জিবীত করেছে নিজেকে বই লেখা হতে সরাতে। আমরা আসলে বই লিখতে বেশি উদগ্রীব-এমনটাই মনে হচ্ছে। লিখতে যতটা না প্যাশনেট, তার চেয়ে ঢের বেশি প্যাশনেট বই প্রকাশে। আর বই একখানা প্রকাশ করে মানুষের হাতে পায়ে ধরা, অনুরোধ উপরোধ করা, নানা ঢঙে মার্কেটিং করা, একে তাকে গছিয়ে দেয়া। একুনে শ’দুয়েক বই ছাপানোর পরে সেগুলো অন্তত যেনতেন প্রকারে বেঁচে প্রকাশকের পুঁজি তোলার ব্যবস্থা করা। এই কাজ গত দুটি বছর করেছি। মতিভ্রম বলি আর ছেলেমিই বলি-করেছি। কানে ধরেছি।

আমার মনে হয়েছে-যথেষ্ট হয়েছে। অন্তত যতক্ষণ মানুষ মেলায় গিয়ে একজন লেখকের লেখা খুঁজবে-এমন না হওয়া পর্যন্ত তার বই বের করা উচিত না-এই চিন্তা আমাকে খু্ব ধরেছে। আর তাই এই পাতি লেখকের স্বেচ্ছা নির্বাসন। হয়তো আমি আগে ভুল করেছিলাম। হয়তো বা এখনও ভুল করছি। তাতে কী?

 আপাতত যেমনটা ভাবছি, সেটা অনুসরন করে, বই লেখা আর তারপর নিজের লেখক স্বত্ত্বাকে ভুলে গিয়ে রীতিমতো মার্কেটিং এ নামা-সেটাতে ইতি টানব। বই আকারে তখনই লেখাকে প্রাণ দেব-যখন তা মানুষের কাছে আকাঙ্খিত হবে, মানুষই তা আগ্রহ নিয়ে কিনবে। চাপে পড়ে বা লজ্জায় পড়ে নয়।

আর তা যদি কখনোই না হয়, তাহলে আমার বই বানিয়ে দরকারই বা কী?

অন্তরা:

সম্মানের ও স্নেহের অনুজ ফয়সাল ভাই বরাবরের মতো সেদিন চেপে ধরেছেন-বই বের করতে হবে। আমার অলসতার খোঁজ তিনি জানেন বলেই একদম আটঘাট বেঁধে তারপরই আমাকে ধরেছেন। ভদ্রতা ও ভালোবাসার একটা অদৃশ্য চাপ থাকে। আমি অভদ্রের মতো সেই চাপও উপেক্ষা করে ফয়সালকে বলতে পেরেছি, “না ভাই, এবারও বই বের করব না।”

দুঃখিত ফয়সাল। সামনের দিনে হয়তো হবে।

’বই লেখা’ নামের কোনো কাজে আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাসী নই। শুনেছি, আজকাল মানুষ কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প লেখে না। সবাই বই লেখে। লেখার চেয়ে বই বের করায় আমাদের বেশি উৎসাহ ও নজর। আমি এত কাবেল হতে পারিনি বলে বই লিখি না।

নিজের আত্মার ডাককে ভুলে তবু এর আগে দুয়েকটা বইয়ে লেখা দিয়েছিলাম। ক্ষণিকের আবেগে, ভুলে, সুনামের লোভে। এখন বড্ড শরম বোধ হয় সেজন্য।

এক সুহৃদ আরেক লেখিকা আপার চমৎকার একটি লেখা আজ শেয়ার করেছেন। বই প্রকাশ, বিনামূল্যে বা সস্তায় তার বিতরণ নিয়ে তার হৃদয়ের ক্ষোভ, হাহাকার তাতে ফুটে উঠেছে। আহা। আহা।

নিজের টাকায় বই প্রকাশ করে ভিখিরির মতো, নির্লজ্জের মতো, লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে নিজেই আবার যখন তার Promo করতে হয়, দ্বারে দ্বারে বই বিক্রীর বা জোর করে কেনাবার জন্য লেখককেই ধর্ণা দিতে হয়, দেশ ও জাতি যখন বই লেখায় অভ্যস্ত হয়, বই লেখার চেয়ে আবার বই প্রকাশে বেশি মত্ত হয়, লিখিয়ে হবার চেয়ে যখন তারকা হবার দিকে বেশি মত্ত হয়, বই কেনার চেয়ে বই মেলায় বই হাতে সেলফীর পোস্ট দিতে বেশি অভ্যস্ত হয়, বইমেলার প্রকাশকদের মোট বিক্রীর চেয়ে যখন বইমেলার ফুঁচকা ও মুরগী ভাজার দোকানদারদের মোট বিক্রী কয়েকশত গুন বেশি হয়, যখন করোনার ভয়ে বইমেলা পেছানো গেলেও বানিজ্যমেলা চলতে থাকে, যখন ফেব্রুয়ারি এলেই কেবল বইয়ের পোস্টে ফেসবুক ভাসে, তখন, বই প্রকাশে ঘেন্না হয়। না, এই ঘেন্না হয় নিজের ওপর। নিজের অক্ষমতার ওপর।

তাই, ফয়সলকে ফিরাই। ফয়সলদের ফিরাই। এই বইহীন সমাজকে ঘেন্না করে, এই ভার্চুয়াল মস্তির সময়কে ঘেন্না করে, ইউটিউব ও ফেসবুক মস্তির কাছে পঠন ও লিখনের নির্মম হারকে ঘেন্না করে বই প্রকাশ করতে ইচ্ছে করে না। বইকে যে দেশে ফেরি করতে হয়, সেখানে বইমেলা বর্জনীয়।

তবু হয়তো, খুব শীঘ্রই নিজের আত্মাকে বিক্রী করতে পারব। নিজেকে নিজের কাছে হারাতে পারব। লোভ ও আপোষের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে সক্ষম হব। সেদিন আমিও বই লিখব। কবিতা নয়, গল্প নয়,

সেদিন আমিও ‘বই লিখব।’

#bookfair #publication #writing

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *