গৃহকর্তা নন গৃহদেবতা:
বাসায় ছেলে ও মেয়ে ঝগড়া করছে। ছেলেটা কথা বেশী শুনছে, শোনাতে পারছে কম। বেচারী বাবা সবই দেখছিলেন। যেহেতু স্ত্রী এখনো ব্যপারটায় তার করণীয় বলেননি, তাই আপাতত শান্তিতে পেপার পড়ায় মনোযোগী তিনি।গিন্নী রান্নাঘর হতে এতক্ষণ টিভির জোরালো সাউন্ডের সহায়তায় সিরিয়াল মিস করার ক্ষতি পুষিয়ে নিচ্ছিলেন। ছেলেমেয়ের ঝগড়ায় তাতে বাগড়া দিল। হঠাৎ রান্নাঘর হতে খুন্তি হস্তে গিন্নীর আগমন।”তুমি কেমন পুরুষ মানুষ? সংসারের কোনো দায়ীত্ব নেই? ছেলেমেয়েকে একটু শাসনও করার মুরোদ নেই? বাবা হিসেবে কোন কর্তব্যটা পালন কর তুমি?” ইত্যাদি ইত্যাদি।
কিংকর্তব্যবিমূঢ় বাবা তার প্রকৃত পদমর্যাদা ও সংসারে তার অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবতে বসলেন। আরেক দিন। বাবা টিভিতে আই পি এল দেখছেন। গিন্নী সিরিয়াল দেখা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং যথারীতি অগ্নিমূর্তী হচ্ছেন। হঠাৎ ছেলে-মেয়ের ঝগড়া। বাবা আই পি এল এর মজা বাদ দিয়ে তার লুপ্ত গৌরব পূনরুদ্ধারে লিপ্ত হলেন।ছেলেকে এক রাম ধমক লাগিয়ে শুরু করলেন, “হারামজাদা, সারাদিন বাদরামি, রাতে বোনটাকে জ্বালাচ্ছ? পড়াশোনা নেই, খালি বজ্জাতি। একদম মামাদের মতো হয়েছ না?”
ব্যাস, দৃশ্যপটে গিন্নীর প্রবেশ।”তোমাকে কে বলেছে ওদের শাসন করতে? তোমাকে না বলেছি আমার সংসারে নাক গলাবে না? যা পার না তা করতে যাও কেন? বাইরে পার না, বাসায় এসে বেটাগিরী কর তাই না?”ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।
কর্তা আবার তার পদমর্যাদা ও পজিশান নিয়ে ভাবতে বসলেন।
গৃহদেবতাদের জীর্ন জীবন:
প্রতিদিন অফিসের গাড়ির জন্য অপেক্ষা করি। প্রায়ই দেখি একজন মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক হাতে ব্যগ নিয়ে আমার পাশেই অপেক্ষা করেন তার গাড়ির জন্য। কর্পোরেট দাসদের চলমান জীবনে যা হয় আরকি। কখনো তেমন খেয়াল করিনা।
হঠাৎ একদিন কী মনে হল আমি ভদ্রলোকের দিকে তাকালাম। মাঝবয়সী ভদ্রলোক, পরিপাটি করে চুল আচড়ানো, একটু তেলও বোধহয় দেন। আমি ভদ্রলোকের পরিচ্ছদের দিকে তাকালাম কেন যেন। আমি যা দেখলাম তার প্যান্টটি অল্পদামে ফুটপাত বা বড়জোর সস্তার দোকান হতে কেনা কাপড়ে বানানো। শার্টটি দীর্ঘ ব্যবহারে জীর্ণ। কোনোমতে সেটাকেই আয়রন করে, ব্লু দিয়ে মানুষ করে আবার গায়ে চড়ান।
আমি তার জুতাজোড়ার দিকে খেয়াল করে দেখলাম। সস্তা রেক্সিনের শু। মেয়াদ শেষ হয়ে তার এক পরত স্কীন বের হয়ে গেছে। কালি করে তা ঢাকার একটা চেষ্টা। হয়তো আরো কিছু খেয়াল করতে পারতাম তার আগেই তার গাড়ি এসে যায়। তিনি উঠে পড়েন। খানিকবাদে আমারও গাড়ি আসে। হয়তো তিনি একটি ভাল শা্র্ট পড়ে অফিস যেতে চান কিন্তু শার্ট কিনলে ছেলের স্মার্টফোনের টাকা হয়না। জুতাটার দামে হয়তো মেয়েটার একমাসের কোচিং খরচটা হয়ে যাবে। হয়তো ফুটপাতে একটা রঙিন শার্ট দেখে দামাদামীও করেছিলেন ১৭৫ টাকা পর্যন্ত কিন্তু বড়মেয়েটার ঘরের নাতনীর জন্মদিনে তাকে একটা সস্তা খেলনা কিনে দেবার কথাটা মনে পড়ায় শার্টটা আর কেনা হয়নি।
গাড়িতে যেতে যেতে ভাবি ভদ্রলোককে সেই আমরা যখন সেভেন এইটে পড়ি তখনকার আমার বাবার চরিত্রে বেশ মানিয়ে যায়। আমাদের একটু ভাল রাখতে বাবা মায়েরা সারাজীবন কী ভয়ানক কৃচ্ছতা সাধন করে যান তার খবর ক’জন সন্তান রাখে।
আমরা চার ভাইবোন ছিলাম। মা’কে দেখতাম কখনোই আমাদের সঙ্গে খেতে বসতেন না। ছোট হওয়ায় আমরা আশা করতাম মা কেন আমাদের সাথে খান না।
এখন বুঝি,আমরা যাতে তৃপ্তি মতো খেয়ে নিতে পারি তাই তিনি নানান অযুহাতে পড়ে খেতেন (আমাদের ভাইবোনের খাওয়ার পড়ে যা থাকত তাই।)
মা-বাবা তোমরা এত ভাল কেন হও?
মা’কে জীবনে অনেক কষ্ট দিয়েছি জানি। তার ৯৯%ই ছোটবেলায় বা একান্ত না বুঝে। কিন্তু একটা কষ্ট তাকে দিয়েছিলাম বোধহয় জেনে বুঝেই। মা’কে সেই কষ্টটার জন্য স্যরি বলার সময় কি পাব?
শুধু সেই কষ্ট দেয়াটার জন্য জীবনে কখনো নিজেকে ক্ষমা করব না।
#ambiguity #feminism #purush #women #roleofafather #Masculinism #middleclasslife #nakedlife #thuglife #father