আজকাল ফেসবুকে তো নানা ঘাঁইকিচিংই হয়। ফেসবুকের বদৌলতে আজকাল সবাইই কী-বোর্ড বিপ্লবী, সবাই লেখক, সবাই বুদ্ধিজীবি, সবাই মানবতাবাদী, সবাইই ধোয়া তুলসীপত্র বিশেষজ্ঞ। ঘরের কাজে ঘরের পুরুষরা হাত লাগান কি লাগান না-এই নিয়ে ইদানীং বেশ সরব আলোচনা গল্পে ও প্রবন্ধে চোখে পড়ে। নব্য নারীবাদ, যা মূলত খুব ভুলভালভাবে “পুরুষের কাউন্টার ও অনুকরন করা”কেই স্বাধীনতা ও ক্ষমতায়ন হিসেবে প্রতীয়মান করতে ব্যস্ত;
সেই নব্য নারীবাদ ঘরের পুরুষেরা গৃহস্থালী কাজে সাহায্য করেন না-এই প্রতিবাদের ধুয়া বেশ জোরেশোরেই উচ্চারন করে থাকেন।
গৃহস্থালী কাজ (মূলত বাচ্চা পালন, রান্না, ধোয়া, পরিষ্কার, বিলিং, স্কুলিং, সোশ্যাল ইনটারেকশন) এগুলো যে কেবলমাত্র পুরুষের ডোমিনেশনের স্টারভেশন ও জেন্ডার স্পেশালাইজেশনের কারনেই নারীর ওপর চেপে বসেছে-আমি তা মনে করি না।
এখানে ছোট্ট একটি ভাবনা বাদ পড়ে যায় আমাদের নিত্য আলাপে।
তা হল, এই কাজগুলো, যাকে আমরা মূলত গৃহস্থালি কাজ এবং নারীর কাজ বলে একতরফাভাবে চাপিয়ে দিই, কিংবা, দ্বিমত জানাই-উভয়েরই জেনে রাখা ও বিশ্বাসে রাখা ভাল, যে, এগুলো নারীর কাজ হিসেবে একরকম প্রতিষ্ঠা পেয়েছে বহু বহু যুগ আগে হতে। ঠিক যেমন, আয়, নিরাপত্তা, সুরক্ষা, ভবিষ্যত চিন্তা, সন্তানের শাসন-এই দিকগুলো পুরুষের নামের সাথে জুড়ে গেছে। দুই দিকের বিন্যাসই হয়েছে সুদীর্ঘকাল সময় নিয়ে, ধীরে ধীরে। এবং, সম্ভবত, আদিম মানব সভ্যতার সূত্রপাতের অল্পকাল তক নারী ও পুরুষের সমভূমিকার অব্যবহিত পর হতেই এই বিভাজন সহজাতভাবেই রুপ পেতে শুরু করে বলে আমার ধারনা।
এটা অনেকটাই হয়েছে ন্যাচারালি। জেন্ডার বায়াস ও জেন্ডার ডিসক্রিমিনেশন কিছুটা দায়ী অবশ্যই। তবে মূল দায় আমাদের সিভিলাইজেশন, সোশ্যাল এলোকেশন, বায়োলজিক্যাল প্যটার্ন ও ইকনোমিক সিস্টেমের।
পুরুষকে (ইন জেনারেল) ঘরের বাইরে আয় করবার কাজে দিনের প্রায় ৮-১২ ঘন্টা ব্যয় করতে হয়। বিধায়, গ্রাজুয়ালি ঘরের গৃহস্থালি কাজের আনজাম নারীকেই করবার দায়ীত্ব দিতে, কিংবা নিতে হয়েছে।
অনেকটা পরিপূরক ও স্বাভাবিক প্রবণতা হিসেবে। এখন নারীকে ঘরের ’বুয়ার কাজ’ করবার দায় চাপিয়ে দেয়া হয়েছে অন্যায়ভাবে-এই খুবই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিবাদ যদি কেউ করেন, তাহলে আমারও তাকে বলবার আছে, যে, তাহলে সংসারের রুজি-রোজগার, আয়, আর্থিক চাপ নেবার-তথা চাকরি-ব্যবসা করার মতো ভয়ানক স্ট্রেসের (ও কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপমানের) কাজ করার একক দায় পুরুষকে কে কবে দিল? কেন দিল? কে সেই দেয়াটাকে হালাল করল?
হ্যা, দুজনই যদি বাইরে জব বা প্রফেশনে থাকেন, তখন দায়ীত্বটি সমান না হলেও সমানুপাতিক হওয়াটাই রেশনাল ডিমান্ড। গৃহস্থালী ওই কাজগুলোকে আমি এখনো ‘বউয়ের কাজ’ বলে মনে করি না। ঠিক যেমন টাকা কামানোকে আমি অ্যাবসলুটলি ও সোললি ‘মরদের দায়’ বলে মনে করি না। জীবন যাপনের দুই দিককার সব দায়ীত্বগুলোই অবস্থা ও পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে নানামুখী বন্টন হতেই পারে।
আমার পার্টনার যদি আমাকে অফার করতেন ও সক্ষম হতেন, যে, তিনি আমাদের যৌথ জীবনের টাকা রোজগারের দায়ীত্ব নেবেন, তাহলে আমি খুব হরিষের সাথে ঘরকন্নার কাজ সামলাবার দায়ীত্ব নিতাম। বিন্দুমাত্র হেজিটেশন থাকত না। ইন ফ্যাক্ট, আমি তাকে সেই অফার কয়েকবার ফরমালি করেওছি। আমি চাকরি করি ঠিকই, কিন্তু, চাকরি আমার পছন্দের কাজ নয়।
ঘরের কাজে ’ব্যাডা’টা সাহায্য করে না-এই অত্যন্ত একচোখা দোষারোপকে যদি কারো কাছে হালালাইজড মনে হয়, আমিও তাদের বলতে চাই, কই, কেউতো কোনোদিন ’ম্যাডাম’দের কাছে দাবী করেন নাই যে, তিনিও অফিসে গিয়ে স্বামীর কাজে সাহায্য করুন।
উল্লেখ্য, আমার পার্টনার আয় রোজগারে সরাসরি কনট্রিবিউট করেন না যদিও, তবে তিনি আমার ক্যরিয়ার উন্নতি, আয় বৃদ্ধি ও ম্যানেজমেন্টে ভালই সাহায্য করে থাকেন। আবার, আমিও তাকে গৃহকর্মে যথাসম্ভব সাহায্য করি। মূলত ভারী ও শক্তি নির্ভর কাজ আমার, সূক্ষ্ণ, কম শক্তি সাপেক্ষ ও সৌন্দর্য সূচক কাজগুলো তার। এভাবেই আমরা দায়ীত্ব ভাগ করেছি।
আমাদের সমাজকে অহরহই Male dominated বলা হয়ে থাকে। মেল ডোমিনেশনের তীব্র সমালোচনা হয়ে থাকে। মেল ডোমিনেশন দূর করবার দৌড়ঝাঁপও প্রচুর।
প্রশ্ন হল, মেল ডমিনেশন বা মেলদের এই ডমিনেট করবার সিচুয়েশন, কালচার, প্রাকটিস বা স্কোপতো মেলরা নিজেরা জোর করে বানায় নাই। তারাতো বরং ঘটনাচক্রে ও বাধ্য হয়েই এই প্রথায় এনরোল করেছে। পরিবারের সবচেয়ে দায়ীত্ববান হবার চাপটাতো তারা সেধে নেয় নাই, হয়ে গেছে।
তাহলে যে দায়ীত্বের চাপটা বাধ্য হয়ে নিয়েছে, তার ডোমিনেশন তৈরীতে এত আপত্তি কীসের? দায়ীত্বের ডিফল্ট এনরোলমেন্ট এবং এনরোলমেন্টের অবভিয়াস সাইড এফেক্ট হিসেবে ডোমিনেশন আসবেই। কারন, ক্ষমতা ছাড়া দায়ীত্ব হয় না। মেলের দায়ীত্বের ডিফল্ট অ্যাভাটারে আপত্তি নেই, তার ডোমিনেটর হওয়াতে আপত্তি।
বিষয়টা একটু আপেক্ষিকতাসহ ভাববার অবকাশ আছে।
Work Life Balance করে করে মুখে ফেনা তুলে ফেলছি আমরা। সাধু। ধুসা।তো, ফেসবুক বুদ্ধিজীবিদের একটি অংশ নানা রঙে রাঙিয়ে একটি ট্রেন্ড ইদানীং খুব প্রমোট করছেন। সেটি হল, ক্যারিয়ার আর টাকার পেছনে খুব বেশি না দৌড়ে পরিবার ও সন্তানদের সময় দিতে। প্রকৃত মানুষ, সুনাগরিক, মানুষের মতো মানুষ, ডিভাইন সুখ, অল্পে সন্তুষ্টি, পরিবারকে সময় দাও-ব্লা ব্লা ব্লা এসব বাজ ওয়ার্ড খুব বাজার পাচ্ছে আজকাল। মোদ্দা কথা হল, ক্যারিয়ারের পেছনে দৌড়ে পরিবার ও সন্তানদের বখে যেতে না দিয়ে, তুমি লাগলে সব কোরবান করো। আরো কথা আছে, কথা বাড়ালাম না। সব সাধু। দারুন আহবান। নিঃসন্দেহে এই আহবান চমৎকার। তবে, দাদারা, আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, একজন পুরুষ, একজন বাবা, একজন স্বামী-তার কি আসলেই কোনো চয়েস আছে? দায়ীত্বের যে দাসখত পুরুষ হিসেবে আমরা দিয়ে জগতে এসেছি, সেই দায়ীত্ব পালনে কি সত্যিই লিমিট বেঁধে দেবার অধিকার আমাদের হাতে আছে? সুযোগ কি আছে বড় চাকরি ছেড়ে দিয়ে ঘরে ফিরে এসে সময় বাঁচানোর?পরিবারকে মানুষের মতো মানুষ করতে ইচ্ছে করে ছোট চাকরিতে চলে আসার সুযোগ কি ক্যাপিটাল এই জগত আমাদের দিয়েছে? একজন বাবার কি আসলেই সুযোগ আছে, অধিকারও কি আছে, যে, সে ব্যবসা-বানিজ্য কমিয়ে, গুটিয়ে এনে পরিবারকে সময় দেবে?বলবেন, আছে আছে। আমি তো দেখি না। আজ তক কোনো পরিবার, কোনো সন্তান, কোনো স্ত্রী, কোনো প্রেমিকা-কেউ কি বলেছে, ও গো বা’জান, ও প্রাণের স্বামী, ওগো প্রিয় বাবা, আমাদের মোটা চালেই হয়ে যাবে, আমাদের হাত খরচ লাগবে না, আমাদের চিকিৎসা না হয়ে মরলেও অসুবিধা হবে না, আমাদের ভাল স্কুলে পড়তে হবে না, আমাদের স্ট্যাটাস চাই না, আমাদের বন্ধু মহলে ঝাকমারি দেখাতে হবে না, আমাদের পকেটমানি লাগবে না, আমার বিয়েতে জাকজমক লাগবে না, আমার জন্য ঈদে শাড়ি, শশুরবাড়ির গিফট লাগবে না? না, কেউ বলেনি। বরং, সবাই লিস্ট ধরিয়ে দিয়ে গেছে। লিস্ট পূরণ করতে না পারলে অদৃশ্য অপমানের খাড়া ঝুলিয়েছে। পুরুষকে পুরুষত্বের চাবুকে অদৃশ্যভাবে পিটিয়ে তাকে নিজেকে ভুলে টাকা আয় করতে ঠেলে দিয়েছে। রাষ্ট্র ও পরিবার-দুই ই আমরা পুরুষদের সাথে দ্বিচারীতা করে গেছে, করে যাচ্ছে। রাষ্ট্র আমাদের পুরো ব্যবস্থাটাকেই এমনভাবে দাড়া করিয়েছে, যে, আমরা না চাইতেও আমাদেরকে অষ্ট প্রহর মুখে রক্ত তুলে সারভাইব করতে হবে। কর্পোরেট দানব আমাদেরকে এক দুষ্টচক্রে আবদ্ধ করে দিয়েছে।পরিবারকে সময় দেয়া গৃহমুখী, পরিবারমুখী স্বামী-বাবা-ছেলে সন্তানকে প্রিয়জনকে নিয়ে সরকারী হাসপাতালের বারান্দায় ঠাঁই নিতে যখন বাধ্য হতে হয়, যখন সেই সন্তানকে তার বাবা, তার প্রিয়তম মা, তার প্রিয়তমাকে ধুঁকে ধুঁকে বিনা চিকিৎসায় মরার দৃশ্য সহ্য করতে হয়, তার পরেও যদি তাকে গেলাতে চেষ্টা করা হয়, যে, ‘টাকা জীবনে কিছুই না, ক্যারিয়ার বাদ দাও, ঘরে ফেরো”-সেসব কি খুব বিকোয় বাজারে?ঘরে ফিরে স্ত্রীকে কাজে সাহায্য করার উপদেশ নিয়ে নারী পুরুষের ভুড়ি ভুড়ি পোস্ট রোজ পাই। কত কত বিজ্ঞাপনে মধুর করে তার দৃশ্যায়নও হয়। সাধু সাধু। কিন্তু, প্রতিদিন মুখে রক্ত তুলে যখন পুরুষ খাটে, প্রতিটি টাকার নোট আয় করার জন্য সে যে কতরকম অপমান সহ্য করে, বসের কত রকম তাচ্ছিল্য, মালিকের লাথি সে পশুর মতো সয়ে যায়, সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে তাকে প্রতিদিন নিজের সাথে নিজেকে কতটা যুদ্ধ করতে হয়, নিজের কী কী আরামকে বিসর্জন দিতে হয়, প্রতিটি টাকা আয় করার জন্য তাকে কতজনের গলগ্রহ সহ্য করতে হয়, কত কত কত দিনের দুপুরের ঘুম তাকে কোরবান করতে হয়-কই? কেউ তো কোনোদিনও বলেনি, তুমি এবার অবসর নাও, ঘরে বসে যাও। আমি আমরা দেখছি। কই, স্ত্রীকে ঘরের কাজে সাহায্য করার এডভোকেসী করনেওয়ালারা কোনোদিনও এই দাবী তো তোলেননি, যে, তাহলে, স্ত্রীও অফিস গিয়ে স্বামীর কাজে একটি দিন অন্তত সহায়তা করুক? করা তো দূরে, কেউ কোনোদিন উচ্চারন কি করেছেন? ঘরের কাজে সাহায্য করার এ্যাডভোকেসী খুব প্রশংসিত হয়। একটিবার স্রেফ কথার কথা হিসেবে সুশীল সাহিত্যের পাতায়ও কি বলা যেত না, তাহলে পুরুষকে তার অফিসের কাজে সাহায্য করো? সাহায্য কী করবেন, আপনারা তো বলেই দিচ্ছেন, অফিসের কাজ বাসায় এনো না, বাসাকে সময় দাও। অথচ, আমি পুরুষ, আমি স্বামী জানি, অফিসে শেষ করতে না পেরেই আমি ঘরে কাজ নিয়ে ফিরি। সারাদিন মুখে রক্ত তুলে খাটার পরে বাসায় এসেও কাজ করা কি পুরুষ সখ করে করে? আসুন, ভদ্রমহিলা ও নারীবাদি ভদ্রমহাশয়বৃন্দ,
আসুন, যাহারা বিগত প্রায় শতাব্দীকাল ব্যপিয়া নারীর গৃহকর্মে পুরুষের মহানুভব হস্তক্ষেপ, আর গৃহলক্ষীর সাংসারিক কার্যের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি আদায় লইয়া বিপুল ব্যস্ত ও মুখর রহিয়াছিলেন, তাহারা দয়া করিয়া শুনুন।
আসুন, আজিকে সেই শতাব্দীকালের বিপুল আন্দোলনখানাকে ক্ষণিকের তরে আমরা একটু উল্টা ঘুরাই। আজিকে আমরা আবারও কিয়ৎকালের লাগিয়া আমাদের প্রায় ভুলিতে বসা ‘মরদ’কূলের কর্মক্ষেত্রে গমনের রুক্ষ বাস্তবতা, সেই কর্মস্থলে ঈশ্বরের সৃষ্ট ৩৬৫ দিনে ঝড়-বৃষ্টি-রোদ্দুর-খরা-শীত উপেক্ষা করিয়া, শীতের প্রভাতের আরামের নিদ্রা, গরমের আলস্য ফুৎকারে উড়াইয়া, মুখে ফেনা তুলিয়া ছুটিয়া যাওয়াকে কিঞ্চিৎ স্মরন করি।
আসুন, আজিকে আমরা প্রায় ভুলিতে বসা সেই অবলা ও নিরুপায় অবহেলিত পুরুষকূলের আপিসের জীবনকে কিঞ্চিত প্রণাতি জানাই। আজিকে আমার নিদারুন অনুরোধ, আসুন, আমরা দল-মত নিবিশেষে সেই কলুর বলদ পুরুষকূল আপিসে, কর্মস্থলে অন্যের জেব হইতে নগদ কড়ি আপন আপন গৃহে লইতে যেই সীমাহীন ও অমানবিক নিগ্রহ, প্রবঞ্চনা, গঞ্জনা, আঘাতের মধ্য দিয়া যায়-তাহাকে কিঞ্চিত স্বীকৃতি দিবার কথা ভাবি।
আসুন হে বাঙাল সুশীল কূল। টাকা কামাই করিতে তাহাদের প্রতিদিন কতবার, কত প্রকারে প্যান্ট খুলিয়া নিজের পশ্চাতে বেত্রাঘাত সাগ্রহে ও সহাস্যে লইতে হয়, তাহা একটু তলাইয়া দেখিবার প্রয়াস পাই। কী-আমাকে খুব একপেশে মনে হচ্ছে? হলে হোক। আমি আজকে অন্তত দুইপেশে বলতে পারছি না। সারাজীবনই তো দুইপাশে বলেছি। আজ না হয় আমাদের নিয়ে একটু বেশিই বলি। পুরুষ আসলে কষা-মলের মতো। এপাশেও গন্ধ, ওপাশেও বদবু। তারা কাজ কম করলে ভাদাইম্যা। বেশি করতে গেলে পরিবারের প্রতি উদাস।
#WorkLifeBalance #income #masculinismfeminism #violenceagainstmen #পরেরপকেট #রোজগার