”মানুষের বিপদে পাড়াপ্রতিবেশীসহ গ্রামশুদ্ধ মানুষ ঝাপাইয়া পড়ে-উহা সত্যযুগের কোনো গাঁয়ে বিদ্যমান থাকিলেও আজকাল কলিকালে আমি তো কোথাও তাহা দেখিতে পাই না।”-শরতচন্দ্র-রাজলক্ষী
মানুষ যখন অসভ্য ছিল, বনে বাদাড়ে জননাঙ্গ উন্মুক্ত রেখে উলঙ্গ হয়ে ঘুরে বেড়াত, তখন হয়তো মানুষ বোকা ছিল। তাই একে অপরের বিপদে ঝাপিয়ে পড়ত। লাগলে জীবন দিত। মানুষ যখন প্যান্ট-শার্ট পরা ভদ্রলোক, সভ্যলোক হয়ে গেল, তখন হতে অন্যের বিপদে জীবন দান দূরের কথা, তিন মাইলের মধ্যে আসার মতো অসভ্যতাও বন্ধ করে দেয়। মানব সভ্যতা বলে কথা।
আমার এক অস্বাভাবিক সম্পর্কের ভাগিনা তার অসুস্থতার খবর বদনপুস্তকে প্রতিস্থাপন করে দোয়া কামনা করেছেন। সকাল সকাল তাকে কিছু সদুপদেশ দিতে গিয়ে নিজের অসুস্থ চিন্তা আরেকবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। আসলেই কি মানুষের বিপদে আমরা জীবনপণ করি আর? আমার তো খালি মনে হয়, কারও কোনো বিপদ হয়েছে-এটা শুনলে আমরা কেন্নোর মতো আরও গুটিয়ে যাই। আমি চোখ বুজে একটা কাল্পনিক দৃশ্য ভাবছিলাম।
ধরুন, আপনি বদনপুস্তকে প্রতিস্থাপন করলেন, “খোদা! এমন সর্বনাশ করলে কোন পাপে? সবার কাছে দোয়া চাই, আমীন!” কী ঘটতে পারে মনুষ্য মানসে? আপনার যারা তথাকথিত শুভাকাঙ্খী, যাদের জ্ঞাত করার জন্য আপনার এই উপস্থাপন, তাদের মানসে? মাফ করবেন। ইতোমধ্যেই আমার কিছু কিছু পাঁড় ঘৃনক আমার অসুস্থ ও নেতিবাচক চিন্তার জন্য আমাকে অভিশাপ দিয়ে ভষ্ম করার অপেক্ষায় আছেন।
তবু ঝুকি নিয়ে আমি কিছু সত্যি কথা বলি-
এক-আপনার পাওনাদার:
বদনপুস্তকে: আহা ভাই! সত্যিই খুব চিন্তা হচ্ছে আপনার জন্য। খোদা সাহায্য করুন। আমীন।
মনে মনে: ব্যাটা পাওনা শোধ না করে আবার মরে যাবে না তো? আমীন।
দুই-পাশের বাসার ভাবী:
বদনপুস্তকে: ইশ! ভাবীর জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে। ভাই, ভালমন্দ খান। যদি আপনার জন্য কিছু করতে পারতাম!
মনে মনে: ভাল হইছে। ওর বউ’র খুব বাড় বাড়ছিল। বেটি প্রত্যেক মাসে শাড়ি কিনে দেখাতে আসে। খুব দেমাগ।
তিন-সহকর্মী:
বদনপুস্তকে: স্যার/বস, খালি একটা আওয়াজ দিয়েন, বান্দা হাজির। খুব চিন্তা হচ্ছে, আপনার কী হল। অফিসের যা চাপ, না হলে এখুনি এসে পড়তাম।
মনে মনে: কেমন বুঝ চান্দু! প্রমোশন বাগাবা না এবার? তেল মেরে মেরে ভালই তো বাগাইছ। এবার ঠেলা সামলাও।
চার-জনৈক চাকরিপ্রার্থী:
বদনপুস্তকে: ওহ! এ কী হয়ে গেল? আপনার জন্য বুকটা মোচড় দিয়ে উঠছে।
মনে মনে: বিষয়টা ডিটেল খবর নিতে হচ্ছে। ব্যাটা মরলে টরলে ওই অফিসে একটা সিভি জমা দিতে হবে। আমীন। ছুম্মা আমীন।
পাঁচ-জনৈক পেশাগত জেষ্ঠ্য:
বদনপুস্তকে: শোনো, খোদা আমাদের ধৈর্য ধরতে বলেছেন। সাহস রাখো। নিজেকে মোটিভেট করো। তোমাকে শক্ত থাকতে হবে তো।
মনে মনে: দূর হ হারামজাদা! প্রত্যেক দিন গায়ে জ্বালা ধরানো প্রতিস্থাপন দিয়ে জ্বালাস না? এবার বোঝ ঠেলা। [ফোন নম্বর সাময়িক ব্লক]
পাঁচ-আপনার বাড়িওয়ালা:
বদনপুস্তকে: আমাকে নিঃসঙ্কোচে জানান। পাশে আছি ভাই [সহবাঁশ ভাই]। একটুও ভাববেন না।
মনে মনে: এই রে, ভাড়াটা বোধহয় এবার মার গেল। যাক, ব্যাটার বউটা তো আছে। আমীন।
ছয়-বন্ধু:
বদনপুস্তকে: দোস্ত, কী হইছে? আগে বলবি না? আমরা কি মরে গেছি? চল, সন্ধ্যায় আবেশের মালাই চা খেতে খেতে শুনি।
মনে মনে: এই রে, টাকা পয়সা চেয়ে বসবে না তো আবার? একটা এক্সকিউজ ঠিক করে রাখা দরকার। আবেশের চায়ের কথাটা না বললেও পারতাম। শালার তো এখন চায়ের বিল দেবার মুরোদও নেই মনে হচ্ছে।
সাত-বদনপুস্তক বন্ধু:
বদনপুস্তকে: ভাইয়াআআআআআ, বিশ্বাস করেন, আমি কালকেও আপনাকে নিয়ে দুঃস্বপ্ন দেখলাম। ভাবতেই পারিনি, সেটা সত্য হয়ে যাবে।
মনে মনে-দিল তো মুডটা অফ করে সকাল সকাল। যাই, একটু খলিফা মিয়ার ইউটিউব চ্যানেল দেখে মনটা হালকা করে নিই।
আট-ভাই/বোন:
বদনপুস্তকে: আমরা কি তোর পর? আমাদের না জানিয়ে বদনপুস্তকে প্রতিস্থাপন করেছিস? বাসায় চলে আয় এখনি।
মনে মনে-ঝামেলা! বালি ট্রিপটা মনে হয় আর দেয়া হবে না স্টূপিডটার জন্য। যতসব উটকো যন্ত্রনা।
আর এগোব না। অসুস্থ লাগে। এই নগর, এই ভার্চুয়াল অসহ্য লাগে। আমীন।
#philanthropy #socialwork #favoring #fraud #Pretend #socialbonding #villagepolitics #socialization