এক;
অনেক আগে সম্ভবত ক্লাস সেভেন বা এইটে মুজতবা আলী বা অন্য কারও লেখা একটা গল্প পড়েছিলাম-পন্ডিত মশাই। সেখানে পন্ডিত মশাই’র নানা কীর্তিকান্ডের পাশাপাশি একদম শেষে একটা অংশ ছিল। সেখানে পন্ডিত মশাই তার প্রিয় ছাত্র শাখামৃগকে একটা অংক কষতে দেন যে, পন্ডিত মশাই’র ৮ সদস্যের পরিবার লাট সাহেবের পালিত ল্যাংড়া কুত্তাটার কত ঠ্যাংএর সমান।
অনেক দিন আগে একটা দাওয়াত খেয়েছিলাম। বুফে হওয়ায় সবাই যার যার সাধ্য ও ক্ষুধার তিনগুন প্লেটে বোঝাই করে টেবিলে বসেছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রচুর অপচয় হয়ে উচ্ছিষ্ট আকারে পড়ে থাকছে। আমি হাত ধুতে গিয়ে খেয়াল করলাম সার্ভিসম্যানদের মধ্যে এক কাকা সবার প্লেটের উচ্ছিষ্ট এক টুকরা মাংস, ভাঙ্গা একটুকরা মাছ, একটু সালাদ, কামড়ানো একটা টিকিয়া, লালা লাগানো ক্ষির-এসব একটা গামলায় জড়ো করছে নিয়ে যাবার জন্য। সেটাও খুব সাবধানে যাতে বাবুসাবরা দেখে না ফেলে। কারণ বাবুসাবদের মেজবান হতে এঁটো খাবারও নেয়া নিষেধ। হয়তো বাড়িতে একটা বিধবা মেয়ে আছে। আছে তার ৬ বছরের পিলে পেটের নাতি। রোগা স্ত্রী হয়তো সেই এঁটো খাবারই মেজবানের তৃপ্তিতে খাবে। তাই বাড়িতে নিয়ে যাবার চেষ্টা। তবে বাবুসাবরা তাও তাদের দেবে না।
অনেকদিন আগে ওয়েষ্টইন হোটেলে একটা প্রোগ্রাম করেছিলাম। অর্গানাইজার আমি ও সহকর্মী রাসেল। মেডিটারনিয়ান ডিশ নামক ভয়ংকর মেন্যু হওয়ায় টু থার্ড খাবার বেঁচে যায়। অনুষ্ঠান শেষে আমরা হোটেলের লোকদের জিজ্ঞেস করলাম যে উদ্বৃত্ত খাবার কি হবে। তারা জানালেন ওয়েস্টইনের নিয়ম হল লেফট ওভার ফুড পার্সেল হয় না বা নিতে দেয়া হয় না। সব বাজেয়াপ্ত হয়। এখন কথা হল এত এত বেচে যাওয়া খাবার তারা কি করে? চমৎকারভাবে প্যাক করে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়? আমাকে হাসাবেন না প্লিজ। সেখানকার বো পড়া, টাই পড়া স্ট্যাফরা রাতে কাজ শেষে নতুন প্যাক করে বাসায় নিয়ে যান আর তাদের সদা পেটুক ঘরওয়ালাদের কাছে ক্রেডিট নেন।
উভয় ঘটনাতে একই ইস্যু। লেফট ওভার ফুড। শুধু বাবুসাবরা নিলে ক্ষতি নেই। ক্ষতি শুধূ লুঙ্গি পড়া কাকু নিলে। কাল একটা অনুষ্ঠান ছিল। হোষ্ট মশাই ১০-১৫ জন লোকের জন্য মোটামুটি মেজবান করে ফেলেছেন। আমার ধারনা মতে খরচটা লাখের কম না। উপলক্ষ্য? আমাকে হাসাবেন না। আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে বাংলাদেশের ব্যপক উন্নতির যে বিজ্ঞাপন আমাদের গিলানো হচ্ছে তারপরও যে জনসংখ্যার ৯০% অতি দরিদ্র, দরিদ্র, নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত (এরা সবচেয়ে ওঁচা)-এদের গোটা মনুষ্য জীবন সমাজের বাকি ১০% অতি ভাগ্যবানের পালিত কুকুর, বিড়াল, ময়না’র কত ঠ্যাং এর সমান?
দুই;
বাংলাদেশের বাঙালরা এত জমিদার সন্তান হয়ে গেল কবে হতে? কোলকাতার লোকেরা এক ইলিশ তিনজনে ভাগে কেনে, তারা এক ডিম দুজনে খায়-ছ্যাচড়া বাঙালদের দাঁত কেলানো এই উপহাসে ফেসবুক সয়লাব।
সুহৃদ মিঠুলের দেয়ালে জনাব রিপন দে’র লেখা এই লেখাটা পড়ছিলাম আর ভাবছিলাম: https://www.facebook.com/rayhanul.m.islam/posts/10157735767828176
কেন দাদা? আরেকজনের পাতলা পায়খানা হলে আপনার কী? আরেকজন যদি ‘পাড়া’য় যায়, তাতে আপনার ক্ষতি কী? আপনি যদি সেখানে না যান, তাহলেই তো আপনার আর সিফিলিসটা হয় না। আরেকজন যদি কৃপণ হয়-তাতে আপনার অসুবিধা কোথায়?
আপনার বাপের জমিদারী ছিল, কিংবা আপনি আবজাল বা মালেকের মতো ভূঁইফোড় তাল্লুকদার হয়েছেন, আপনার মানিব্যাগ গর্ভবতীর মতো নোটে নোটে স্ফিত, আপনার দশটা ক্রেডিট কার্ড আছে-বলেই বাজারে গিয়ে হাঁক পেড়ে তিন হালি ইলিশ কিনতে পারেন। তাই বলে কি সবার সেটা আছে? আমার বাপ জমিদার না (সামান্য সরকারী কর্মচারী), আমার দাদাও কামলা কৃষক, আমিও গার্মেন্টসের কামলা। আমি কৃপণ নই, কিন্তু আড়ম্বরহীন ও বাহুল্যহীন। তাই বলে কি আমি সস্তার পাঙ্গাস বা তেলাপিয়া কিনতে পারব না? আমি কি ভাগা দরে পুরো মৌসুমে একবার হলেও ইলিশের কাঁটাকুটা কিনতে পারব না?
কেন আমি আপনার বা ‘পাশের বাসার ভাবী’র দাঁত কেলানোর ভয়ে বউয়ের নাকফুল বেঁচে গোটা ইলিশ কিনতে বাধ্য হব? কেন আমি অবশ্যই এক ডজন আপেল, এক ক্রেট কমলা, এক খাঁচি ডিম পুরোটা ধরে কিনতে বাধ্য? ভাগে সিগারেট খেতে পারলে কেন ভাগে মুরগী কেনা যাবে না? কেন আমি তিন পিস মিষ্টি কিনে আপনার বাসায় বেড়াতে যেতে পারব না? আপনি জীবনেও মিষ্টি খান নাই? আপনার কোনো ধারনা আছে, এই দেশের নিম্নবিত্ত একজন বাবা ঠিক কীভাবে তার সংসার চালান? আপনাদের এইসব নাক উঁচু দৃষ্টিভঙ্গীর জন্যই মানুষ আবজাল হয়, মালেক হয়। সামাজিক অপমান হতে বাঁচতে মানুষ অসৎ হয়। সামাজিক খোঁটা মানুষকে খুনি বানায়।
আমি কোনো সমাজ সংস্কারক নই। হবার ইচ্ছেও নেই। আমি বিপ্লবী নই, আবার বিপ্লবের সুবিধাভোগীও নই। ঘৃন্য রাজনৈতিক কীট কিংবা রাজনীতির হক-মওলাও নই। আমি খুব সামাজিক নই, তবে আমি সমাজ বিরোধীও নই। আবার আমি সমাজের সব রীতিনীতির সুবোধ অনুসারীও নই। তথাকথিত ট্যাবু, সামাজিক চোখরাঙানী আর সামাজিক অনুশাসনের তোয়াক্কা আমি খুব করি না। সমাজ আমাকে কী চোখে দেখে-তা নিয়ে আমি খুব ভাবিত নই। কারন একটাই। আমার নিজের বিয়ে হয়ে গেছে এক যুগ আগে আর আমাকে আমার মেয়ে বিয়ে দিতে হবে না-যে আমাকে সমাজকে খুব সমঝে চলতে হবে। আর যারা সমাজকে খুব সমঝে চলেন, ট্যাক্স দিয়ে চলেন, আপনাদের কে ভগবানের মাথার কিরা দিয়েছে, সমাজের এইসব নষ্টামীকে গুরুত্ব দিতে?
আপনার কি তিনটা মেয়ে আছে? মেয়েদের বিয়ে দিতে হলে সমাজকে হাতে রাখতে বাধ্য আপনি? মেয়েকে প্রেম করে ভেগে যাবার বুদ্ধি দিন, তাও ছ্যাচড়া সমাজকে পাত্তা দেবেন না, যেই ছ্যাচড়া সমাজ আপনি মরতে বসলে দুইটা টাকা চিকিৎসা সাহায্য করবে না, আবার মরলে বাড়ি বয়ে এসে কব্জি ডুবিয়ে গরুর মাংস খাবে। সমাজ নামের শুয়োরমুখো দৈত্যের চাপেই আমরা সামর্থ না থাকলেও ঋন করে ধুমধামে মেয়ে বিয়ে দিই।সামর্থ না থাকলেও নিজের হাপানির ওষুধ না কিনে, বাজারে গিয়ে দুটো ইলিশ কিনে আনি। সামর্থ না থাকলেও বন্ধুদের আড্ডায় কেটু সিগরেট না টেনে বেনসন ফুঁকি।সামর্থ না থাকলেও বাড়িভাড়া বাকি ফেলে অমুকের পোলা তমুকের বিয়েতে দামী উপহার কিনি। সামর্থ না থাকলেও, জীবনে কখনো ব্যবহার হবে না জেনেও দামী ডিনার সেট কিনে সাজিয়ে রাখি।সমাজের লজ্জাতেই, স্টাটাস বজায় রাখতে বাসা অপ্রয়োজনীয় সোফা, কেবিনেট, ঝাড়বাতি দিয়ে সাজাই।
নষ্টা সমাজের লজ্জাতেই আবার ওজু না থাকলেও অফিসে নামাজের কাতারে দাড়িয়ে যাই। নষ্টা সমাজের চাপে রজঃশলা হওয়া সত্বেও ‘শরীর খারাপ’ বলতে বাধ্য হই। আরেহ! রজঃশলা হওয়া কি শারীরিক অসুস্থতা?নষ্টা সমাজের ভয়েই শনির আখড়ার প্রেমিককে রমনায় পার্কে গিয়ে প্রেমিকার হাতটা ধরতে হয়। এই নষ্ট সমাজই সী-বীচে হাত ধরে হাঁটার সময় জামাই-বউয়ের কাছে কাবিনের প্রাপ্তি দাবী করে। এই নষ্ট সমাজের অপমানের নির্দয় আঘাতের ভয়েই চাকরি হারিয়েও কাউকে বলা যায় না।
এই নষ্ট সমাজই ফেসবুক, ‘পাশের বাসার ভাবী’, ‘আমার ননদ’, ‘অমুকের জামাই তো…..’এইরকম হাজারটা অঘোষিত চাপ দিয়ে দেহ বিক্রী করে, মন বিক্রী করে, আত্মাকে বিক্রী করে ফুটানী আর স্ট্যাটাস ধরে রাখতে নির্দয়ভাবে নিরুপায় মানুষকে বাধ্য করে।সমাজ লজ্জা আর লোক লজ্জার মুখে মুত্রত্যাগ করে মেরুদন্ড সোজা করুন। যতক্ষণ অন্যের ক্ষতি আর অন্যের কোর্টে ঢুকে না পড়ছেন, ততক্ষণ,যা সামর্থে কুলায় কিনুন। যা করতে মন চায়, করে ফেলুন। যা সাজতে মনে চায়, সাজুন। বুড়ো হয়েছেন, তবু লাল জামা পরবেন? পরুন।
নিজেকে যেমন দেখতে মনে চায়, তেমন দেখুন। ছেলে মানুষ বাবরি রাখবেন? রাখুন না। মেয়ে মানুষ, বয়কাট দেবেন? দিন না। মাথা ন্যাড়া করতে মনে চায়, করুন। পাড়ায় আত্মীয় স্বজন আছে, রাস্তায় দেখা হয়ে যায়, অথচ বর্ষার দিনে একটা বিড়ি ধরিয়ে রাস্তায় উদাস হয়ে হাঁটতে ইচ্ছে করছে-গোপাল বিড়ি ধরিয়ে নির্দ্বিধায় হাঁটুন। চাকরি করতে করতে ক্লান্ত, বিরতী চাচ্ছেন? আজই ছাড়ুন চাকরি। শশুর বাড়িতে দাম কমে যাবে? যাক না। এত দাম পেয়ে কোন হাতিঘোড়াটা করবেন?প্রকাশ্য রাজপথে দিবালোকে প্রেমিকাকে চুমু খেতে মনে চায়, খান।লম্পট জামাইকে ডিভোর্স দিতে মন চায়, দিন।বিয়ে না করে স্বাধীন থাকতে মন চায়, থাকুন।বিয়ে করেও বাচ্চা নিতে মন চায় না, না নিন।
পেটে জমা হাজারটা ক্ষোভের বায়ু আটকে রেখে বিস্ফোরনম্মুখ? পশ্চাদদেশ হতে তাকে সশব্দে বের করে দিন। পাবলিক হাসবে? হাসুক। লুঙ্গী পড়ে বিমানে চড়তে ইচ্ছে করে? ভদ্দরনোকরা হাসবে বলে করছেন না? হাসুক না। লাগলে ওনাদের আরও হাসানোর জন্য লুঙ্গীর ওপর একটা লাল জাঙিয়া পড়ে নিন।অন্যায্য সুবিধার টোপ দেয়া-নেয়া বসকে ঠাটিয়ে চড় দিতে ইচ্ছে করে? দিয়ে দিন। মানুষ আপনাকেই দুঃশ্চরিত্র ভাববে? ভাবুক না। চরিত্র কি ধুয়ে খাবেন? নাকি নোবেলের জন্য আবেদন করবেন?সামর্থে কুলোচ্ছে না-সন্তান তবু বাইক কিনে দেবার জন্য বায়না করছে? কী ভাবছেন? না দিলে সমাজে মান থাকবে না?
আরে, পশ্চাতদেশে লাত্থি দিয়ে ঘর হতে বের করে দিন।ছেলেটা ড্রাগ নেয়, মেয়েটা বাবা খায়? মানুষ কী বলবে ভেবে চেপে যাচ্ছেন? দুটোকে আজই রিহ্যাবে পাঠান। ওদের মা ভেউ ভেউ করে কাঁদবে? তাকেও পাঠিয়ে দিন। তারও রিহ্যাব দরকার। সমাজ নামের নিষ্ঠূর ও ভন্ড সত্বা যখন তার অসহায়, নিরুপায়, প্রতারিত, ভাগ্যাহত সদস্যকে রক্ষা করে না, সাহায্য করে না, আর তারপরও ‘সমাজ বলে একটা কথা আছে’ এই মহান খ্রীষ্ট বাণীর জাক্কুম আপনাকে গিলাতে আসে, তখন মুখ দিয়ে ‘ফোঁৎ’ করে একটা শব্দ করুন, ’সমাজ কী বলবে’কে পিচিক করে থুতুর মতো নিক্ষেপ করুন, আপনার হাতটি মুষ্টিবদ্ধ করুন, আর তারপর -মুষ্টিবদ্ধ হাতের মধ্য হতে আপনার ঘৃন্য মধ্যম আঙুলটিকে বের করে বাপের বেটার মতো সমাজকে বলুন,
‘ন ডরাই’।
তিন;
সমাজের মোটামুটি একটা ভাল লেভেলে থাকার সুবাদে প্রায়শই নিশ্চই আমাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাবার বা বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের সুযোগ হয়। অবশ্যম্ভাবীভাবে এসব অনুষ্ঠানে প্রচুর খাবার উদ্বৃত্ত হয় যা ফেলে দেয়া হয় অথবা আয়োজকরা সংরক্ষন করেন। পরবর্তি কয়েকদিন প্রয়োজন না থাকা স্বত্বেও তারা এগুলো খান বা অপচয় করেন। আমরাও যতটা পারব তার তিনগুন প্লেটে নিয়ে শেষে এঁটো করে খাবারের একটা বড় অংশ নষ্ট করি। বিশেষত এই রমজানে যেখানে প্লেটে হাজারটা ইফতার আইটেম দেয়া হয় তার কতটা আমরা খাই কতটা নষ্ট করি খেয়াল করেছেন কি? এই সংস্কৃতি পরিবর্তন হওয়া দরকার। প্লেটে দু’য়েকটা আইটেম দিলে হয়তো প্রেস্টিজ নষ্ট হবে কিন্তু আমরা সবাই সেটাকে সহজ করে নিলে দেশ তথা পৃথিবীর বড় একটা অংশ অন্তত একবেলা খেতে পারবে।প্লেটে একটু কম খাবার নিলে অপচয় কম হবে।
বেঁচে যাওয়া খাবারগুলো গরীবদের দিলে কোনো ক্ষতি নিশ্চই নেই। অনেকে হয়তো সার্ভ করা পুরো খাবার সত্যিই খেতে পারেন না বিধায় রেখেই উঠে আসেন। আমরা কি পারি না লজ্জা না করে খেতে না পারা খাবারটা প্যাকেট করে সেটা কোনো দরিদ্র বাচ্চাকে দিতে? আমি শপথ করেছি এখন থেকে যেকোনো অনুষ্ঠানে খেলে আমাকে দেয়া কোনো খাবার যদি বেঁচে যায় সেটা দাওয়াত দাতাকে বলে প্যাকেট করে বাইরে নিয়ে কাউকে দেব। প্লেটে খাবার বেড়ে না দিয়ে যদি বুফে দেয়া হয় তাহলে অনেক খাবার এঁটো না করা সম্ভব। নিচের ভিডিওটা দেখুন। আমরা কেন এমন করি না। প্লিজ দেখুন। মাত্র কয়েক মেগাবাইট খরচ হবে কিন্তু সেটা অনেকগুলো খালি পেট হয়তো ভরাতে সাহায্য করবে।
(কৃতজ্ঞতা: মিঃ গাজ্জালী এবং দেশ বিদেশের বিজ্ঞাপন https://www.facebook.com/dbbads/videos/1323082794369741/)
চার;
বিসিএস প্রশ্ন: বানিজ্য মেলা কাকে বলে?
যেই বার্ষিক মেলাকে কেন্দ্র করে বঙ্গদেশের রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকার প্রায় কোটি খানিক নারী ও পুরুষ মাসখানিকের জন্য ফেসবুক ও সিরিয়াল হতে মুখ ফিরিয়ে মনোযোগ মাটিতে নামান, -যেই মেলার অপেক্ষায় বঙ্গদেশীয় সুদূর প্রত্যন্ত গ্রামের পুরুষ ও রমনীকূল বাড়ির অতি প্রয়োজনীয় প্লাস্টিকের বদনা না কিনে (মেলা হতে কিনবেন বলে) আপাতত কয়েক মাস পুরোনো পানির বোতল দিয়ে কাজ চালান, -যেই মেলা হতে দর্শনার্থীরা পরবর্তি এক বছরের জন্য অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিকের বাক্স কেনেন, অদরকারী কাঠের জিনিসপত্র, শোপিস কেনেন, -যেই মেলাতে কোনো এক অলৌকিক উপায়ে মাত্র ৮০০ টাকায় একটা ঝাক্কাস ব্লেজার কেনার অপেক্ষায় থাকে বাংলার মধ্যবিত্ত পুরুষকূল, -যেই মেলা এলে বাংলার পুরুষকূলের জানুয়ারী মাসের কমপক্ষে ২ টা ছুটির দিন ওখানে বাধ্যতামূলকভাবে স্ত্রীদের চাপে বিনোদন নিতে আর বাসার ঝাড়ু, বালতি, বেলন, বয়ে নিয়ে কোমর ব্যথা করতে হয়, -যেই মেলাতে মূলত প্লাস্টিকের ফুল, পিড়ি, টেট্রন বা পলিয়েস্টারের ব্লেজার, আলু ভাজা, গজা, চিরুনী, বাদামের চাট, নোংরা বিরিয়ানি, প্রচুর বালু, শ্বাসকষ্ট কিনতে বঙ্গনারী ও পুরুষরা ভীড় করেন, -যেই মেলার মাসে বাধ্যতামূলকভাবে বঙ্গপরিবারগুলোতে কমপক্ষে দুইটা প্রানঘাতি পারিবারিক ঝগড়া হয়ে থাকে (যার কোনো কোনোটা একটুর জন্য ডিভোর্সে গড়ায় না), -যেই মেলা রাস্তাঘাটে, মাঠে, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে, নিউমার্কেটে ”জিনিস” দেখতে দেখতে বোরড লুচ্চা তরুনদের নতুন কিছু দেখার সুযোগ করে দেয়। -যেই মেলা বাংলার নারী ও পুরুষকূলকে অন্তত একবারের জন্য ভাবতে বাধ্য করে, “বাসায় কি কিছু লাগবে?”-যেই মেলা বছরে দুই ঈদ, পহেলা বৈশাখ, নববর্ষ, ভ্যালেনটাইন, পূজা, জন্মদিন, মৃত্যুদিন, হেন ছুতা, তেন ছুতায় এমনিতেই ফতুর হওয়া মধ্যবিত্ত পরিবারের নারী ও পুরুষকূলকে আরো একদফা ফতুর হবার সুযোগ করে দেয়-যেই মেলায় গেলে অবিশ্বাস্য ও অলৌকিক উপায়ে পায়ে ব্যথা, বাতের ব্যথায় কাতর, এমনকি প্যারালাইসিসের রোগীও মাইলের পর মাইল ঘন্টার পর ঘন্টা হাঁটার ক্ষমতা ফিরে পান-তার নাম ’বানিজ্য ধান্দা মেলা’।
পাঁচ;
টিভিতে সিরিয়াল দেখাকে যারা মেয়ে মানুষের কাজ বলে মনে করেন, সেসব পুরুষরা লেখাটা না পড়ুন। যারা ঘেটু ফুলেও পজিটিভিটি দেখেন, সেইসব পজিটিভ মানুষেরা পড়ুন।স্টার জলসায় রাতে দেবী চৌধুরাণী একটি সিরিজ চলছে। মেকিঙ ও কোয়ালিটি ইন্ডিয়ান টিভির মতোই হাস্যকর। আমি শুধু সিরিজটির কাহিনি দেখি। আর ভাবি, বঙ্কিমের মতো অভিজাততন্ত্র সমর্থক একজন মানুষ এমন একটি উপন্যাস কীভাবে লিখেছিলেন? অভিজাতদের হাতে দুর্বলের নিগ্রহের ইতিহাস যুগে যুগে একইভাবে লিখিত হয়েছে। দেখতে পারেন। এই মুহূর্তে ঢাকার একখানা অভিজাত কাঁচামালের আড়তে (ভদ্দরনোকরা শপিং গুঁ মানে মল বলেন) হাঁটছি আর অভিজাত রমনীদের তাদের সুপুরুষ পয়সাওলা টেকো ও ভুড়িয়াল স্বামীদের বাহুলগ্না হয়ে আহ্লাদে গলে গলে পয়সার শ্রাদ্ধ উৎসব দেখছি।
ছয়;
একটি সংগৃহিত ঘটনা। একশোভাগ সত্যি কিনা সেটার নিশ্চয়তা দেয়া কঠিন। এই গল্পটি রতন টাটার জবানিতে লেখা। সত্য বা মিথ্যা এখানে মূখ্য নয়, শিক্ষাটা খুব চমকপ্রদ।
রতন টাটা একবার উর্দ্ধতন কর্মীদের নিয়ে জার্মানিতে যান ব্যবসায়িক কাজে। তারা একটি বিলাসবহুল েষ্টুরেন্টে খেতে যান। মেনু দেখে অনেক খাবারের অর্ডার করলেন। ওয়েটার অর্ডার মতো খাবার দিয়ে গেলে তারা সেখান থেকে যা খাবার খেলেন। এরপর ওয়েটার এলো বিল নিতে এসে দেখে প্রচুর খাবার টেবিলে পড়ে আছে উদ্বৃত্ত হয়ে। ওয়েটার তাদের বলল খাবার নষ্ট করা যাবেনা। তাদেরকে সেই সব অর্ডার করা খাবার পুরোটা অবশ্যই খেতে হবে। টাটা বুঝে উঠতে পারলেন না এর কারন কি। তিনি ও তার সঙ্গীরা ওয়েটারকে বরং ধমকানোর সুরে বলতে লাগলেন তারা যেটার জন্য বিল দেবেন তার কতটা খাবেন কতটা নষ্ট করবেন এতে রেষ্টুরেন্টের এত মাথাব্যথার কি আছে। তর্কাতর্কি শেষতক ম্যানেজার পর্যন্ত গড়াল। সেও একই কথা বলল যে, তারা অতিরিক্ত অর্ডার কেন করেছেন এবং কিছুতেই খাবার নষ্ট করতে পারবেন না। টাটা ও তার সঙ্গীরা সেটা না মানতে চাওয়ায় ম্যানেজার এমার্জেন্সি কল করলেন।
সাথে সাথে সোস্যাল সিকিউরিটি পুলিশ হাজির। সব শুনে তারা টাটা ও তার সঙ্গীদের বড় অঙ্ক জরিমানা করলেন খাবার অপচয়ের অপরাধে। টাটা পুলিশের কাছে জানতে চাইলেন, তার যেহেতু টাকা আছে, খাবার অরডার করেছেন এবং তার কতটা খাবেন বা ফেলবেন সেটাতে সরকারের কী? পুলিশের লোকেরা তখন তাকে জানালেন, জার্মানিতে খাবার অপচয় আইনত অপরাধ। আপনার অর্থ থাকতে পারে।সেটা অঢেলও হতে পারে। সেটা আপনি অপচয়ও করতে পারেন। কিন্ত পৃথিবীর সম্পদের পরিমাণ সীমিত এবং সেটা আপনার একার নয়। তাই টাকা অপচয়ের অধিকার থাকলেও সম্পদ বিশেষত খাবার অপচয়ের কোনো অধিকার আপনার নেই। ঠিক ততটাই আপনাকে অর্ডার করতে হবে যতটা আপনি খেতে পারবেন। তার বেশি নয়।সুতরাং আমার টাকা আমার সম্পদ আমি ইচ্ছা মতো উড়াব-সেটা পৃথিবীর সবাই বিশ্বাস করেন না।
সাত;
আমাদের পরিবেশবান্ধব অফিস অপারেশন-কাগজের খামের পুনর্ব্যবহার। কাগজ সাশ্রয় মানে গাছ সাশ্রয়। আমাদের দেশে অনেক জ্ঞানী-গুনী উদ্যোক্তা রয়েছেন। এদের মধ্যে কেউ কি আছেন যিনি একটা উদ্যোগ নেবেন কচুরীপানা বা এই জাতীয় কোনো দুর্ভোগসৃষ্টিকারী আগাছা হতে কাগজ তৈরীর কারখানা বানানোর? বিশেষ করে টিস্যু পেপার/টয়লেট পেপার বানাতে? কচুরীপানাতে আমার ধারণা খুব ভাল টিস্যু পেপার বানানো যাবে। কাগজের যত ব্যবহার আছে তার মধ্যে এই একমাত্র টয়লেট পেপারটি এমন যে, একবার ব্যবহারেই শেষ, যেহেতু টয়লেটে ফ্লাশ করে দেয়া হয়। এটা রিইউজ করা যায়না। টিস্যু বানাতে প্রচুর গাছের দরকার হয় আবার একমাত্র গাছের এই ধরনের ব্যবহারটিরই (টিস্যু বানানো) রিসাইক্লিং সুযোগ নেই। গাছের মতো বান্ধবের কি মারাত্মক অপচয়!
কচুরীপানা বা এরকম ক্ষতিকর আগাছা যা আমাদের নানান ক্ষতি/সমস্যার উৎস সেটা দিয়ে বানাতে পারলে দ্বিমুখী উপকার হয়-গাছ বাঁচে আবার ক্ষতিকর আগাছা কমে যাবে আর, ফিরে আসবে না। কচুরিপানা নিয়ে ফেসবুকের জাগ্রত জনতার উন্মত্ততা থামলে একটি ছোট্ট বিষয় নজরে আনতে চাই। কাগজের যত ব্যবহার আছে, তার মধ্যে বিভিন্ন রকম টিস্যু পেপারের ব্যবহারকে আমার সবচেয়ে পীড়াদায়ক মনে হয়। নানারকম টিস্যু পেপার মাত্র একবারই ব্যবহার করা যায়। টিস্যু পেপারের ব্যবহার প্রায় জিরো রিসাইকেলেবল। বিশেষত টয়লেট টিস্যু। প্রতিদিন সারাবিশ্বে কোটি কোটি টন টিস্যু পেপার একবার ব্যবহার করেই ফেলে দেয়া হয়। ভাবুন তো, একটি মহামূল্যবান গাছ এতবছর ধরে বড় করে, তার ব্যবহার মাত্র একবার টয়লেটে শেষ।
যতটা জানি, টিস্যু পেপার বানানোর একটি অতি জরুরী উপাদান হল পাল্প, যা আসে গাছ হতে। টিস্যু বানাতে প্রচুর গাছ কাটা হয়। সামান্য পরিমান হয়তো রিসাইকেল করা পেপারও ব্যবহার হয়। তো, টিস্যু পেপার মানেই প্রচুর গাছ কাটা। লক্ষ লক্ষ গাছ, প্রতিদিন। ওদিকে আমাদের দেশে কচুরীপানার ভয়াবহ বিস্তারে খাল বিল নদী সয়লাব। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ হতে শুরু করে নৌচলাচল, নদী দূষণসহ ফষলের ক্ষতিও হয়। আবার আমাদের সোনালী আঁশ পাট তার বাজার হারিয়েছে এবং পাট নির্ভর বিশাল সংখ্যক মানুষ ধুঁকছেন। এই দুটি কাঁচামাল হতে যদি পাল্প বানিয়ে টিস্যু পেপার ও কাগজ বানানোর কোনো লাগসই প্রযুক্তি বের করা যায়, তাহলে অত্যন্ত সস্তায় কাগজ ও টিস্যু উৎপাদন যেমন করা যাবে, রপ্তানী করা যাবে বিশাল পরিমাণে, তেমনি, কচুরীর ক্ষতি হতেও দেশ বাঁচবে আর গাছ কাটা কমবে। পাট শিল্পও জেগে উঠবে। পাট হতে পলিথিন বানানোর প্রযুক্তি সম্ভাবনা জাগালেও এর বিনিয়োগ ধুঁকছে। আর পাট হতে প্রচলিত পণ্য বানিয়ে পাট শিল্পকে বাঁচানো সম্ভব না।যতটা মনে আছে, ছোটবেলার সমাজ বইয়ে আমরা কচুরীপানা ও পাট হতে কাগজ উৎপাদনের বিষয়ে পড়েছিলাম। কেউ কি বিষয়টা একটু ভেবে দেখবেন? অন্তত টিস্যুও যদি বানানো যায়, তাহলে আমাদের জন্য একটি বিশাল সম্ভাবনার দ্বার খুলে যেত।
#classstatus #classconflict #classdiscrimination #poverty #middleclasslife #nakedlife #thuglife #invitation #wastage #leftover #poverty #misery #showoffatitsbest #exhibitionism #TRPaholic #fameseeker #attentionseeker #projectionist #rebel #expensive #lifestyle #hilsha #humanity #humanrights #event #socialism #Tradefair #TVserial #lavish/ #aristocracy #mighty #RatanTata #food #recycling #waterhyacinth #bandwagoneffect #comparison