Skip to content

দায় নেবার দায়: ভারবাহী বেকুবদের গল্প

  • by

১. #professionalism #patriotism

স্কটল্যান্ডের এক স্কুল বালক একবার স্কুল থেকে ফেরার পথে দেখল তাদের শহর রক্ষাকারী বাধের এক স্থানে ফাটল হয়ে পানি ঢুকছে। ব্যবস্থা না নিলে ফাটল বড় হয়ে সমুদ্রের পানিতে শহর তলিয়ে যাবে। উপায়ান্তর না দেখে সে নিজেই ফাটলের মধ্যে হাত দিয়ে পড়ে রইল। সারারাত ঠান্ডায় জমে যখন তার মরার দশা তখন পরের দিন তার শহরবাসী তাকে উদ্ধার করল। শহরকে রক্ষার জন্য তার এই অবদানের জন্য তাকে পুরষ্কৃত করা হয়। দায়ীত্ব ও কর্তব্য কাঁধে তুলে নেবার অনন্য নজির হিসেবে এই  গল্পটি ব্যবহৃত হলেও এর একটি বিপরীত গল্পও আছে। সেটাও বিবেচনার দাবিদার। ছেলেটি তার উপস্থিত কর্তব্য পালন করেছে সেটা যেমন প্রশংসার দাবীদার, তেমনি বাঁধের নিরাপত্তা ও রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্বে যারা ছিলেন তাদের সীমাহীন দায়িত্বজ্ঞানহীনতা যার জন্য ফাঁটল তৈরী হয়েছে, বাঁধরক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের বাঁধের ফাটল সবার আগে দেখার কথা যা তারা দেখেনি-এসবকিছুর বিচারও সমান গুরুত্ব দিয়ে করা উচিৎ। প্রায়ই একদল লোক তাদের কর্তব্যবোধের তাগিদে নিজের ও অন্যের কাজের বোঝা নিজের কাঁধে নিয়ে নেন দেশ বা সমাজের স্বার্থে। ফলে যাদের সেই দায়ীত্ব পালনের কথা তারা থাকেন আরামে। তাদের বিচার কে করবে?  একের দায়ীত্ব অন্যে পালন করা বাহবা পেলেও এতে সিস্টেম নষ্ট হয়, জবাবদিহীতার সংস্কৃতি তৈরী হয়না, ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কালচার গড়ে ওঠে না, একদল মানুষের কাজে ফাঁকি দেবার সুযোগ তৈরী হয়। রোজ রোজতো আর স্কুল বালক দায়ীত্ব নেবে না। সেদিন কি হবে?

২. #obligation #oneeyed #socialnuisance #citizenrights #selfresponsibility

গাড়ি করে যেতে যেতে জানালার গ্লাস নামিয়ে টিস্যু পেপারটি রাস্তায় ফেলে দিলেন। দু’পা জায়গা হাঁটা হতে বাঁচতে গাড়িটি দোকানের সামনে ব্যস্ত সড়কেই পার্ক করলেন। ম্যাচের কাঠি বাঁচাতে গ্যাসের চুলাটি ২৪ ঘন্টা জ্বালিয়ে রাখলেন। ওভারব্রিজ থাকা স্বত্বেও চলন্ত গাড়ির বহরের মধ্যে দিয়েই রাস্তা পাড় হলেন। সিগন্যাল পড়ায় অপেক্ষা না করে বাইকটি ফুটপাতে উঠিয়ে দিলেন। সিগন্যাল না উঠতেই গাড়িটি টান দিয়ে সবার আগে দৌড় দিলেন। বাড়ির সিঁড়িতে জোরে জোরে শব্দ করে ওঠানামা করলেন। বাসায় বা ছাদে লাউড স্পিকার বাজিয়ে অন্যদের জীবন নারকীয় করলেন। বাসা সংস্কারের আবর্জনা রাস্তার পাশে ফেলে রাখলেন। মাঝ রাস্তায় খক করে এক দলা কফ ফেললেন। সবাই যেখানে লাইনে দাড়িয়ে আছে, সেখানে লবিঙ করে সিরিয়াল ভাংলেন। ঝকঝকে পাবলিক টয়লেটটির ওয়ালে পানের পিক ফেলে নোংরা করলেন। চমৎকার একটি লেকে বেড়াতে গিয়ে চিপসের খোসা, বাচ্চার ডায়পার ফেলে দিলেন। চমৎকার দামী টাইলসের ফুটপাতকে দোকানের এক্সটেনশন বানালেন। খেতে পারবেন না জেনেও ১০ রকম আইটেম অর্ডার করে এঁটো করে রেখে এলেন। মাত্রাতিরিক্ত মুনাফার জন্য বেসমেন্টের পার্কিং এ দোকান ভাড়া দিলেন। দোকানে আসা কাস্টমার জিনিস দরদাম করে না নেয়ায় তাকে নোংরা অপমান করলেন। হেলমেটের সামান্য দাম বাঁচাতে আরোহীর জন্য খেলনা হেলমেট বরাদ্দ করলেন। পিক আপ পয়েন্টে যাবার সময় মিটার অন করে দিলেন।মুরগী পিস করে দেবার সময় কিছু পিস মেরে দিলেন। ওজনেও কম। টাকা ধার নিয়ে তাকে চিরতরে ভুলে গেলেন। অতিরিক্ত মুনাফার জন্য বাসার গ্যারেজে দোকান বানালেন। এক তলার ফ্লাটটাতে কেরোসিনের ডিপো বসালেন। বাসার দোতলার বারান্দাটা গলির ওপর ঝুলিয়ে দিলেন। মেয়াদোত্তীর্ন খাবার, ওষূধের লেবেল বদলে আবার বেঁচলেন। নাহ, আর পারছি না। বঙ্গবাসী ফেসবুক ক্রূসেডারদের জন্য একটি তালিকা করছি-আমরা কী কী নাগরিক অপকর্ম করি, তার। আপনার মাথায় কী কী আসে, লিখুন।

৩. #selfresponsibility #selfesteem #sensibility #victimization #sympathy #unevenquestion #titfortat

একবার এক ছাত্র তার ওস্তাদকে প্রশ্ন করল, “আচ্ছা হুজুর, যেখানে পানি আছে, সেখানে কীভাবে পবিত্র হব?”-”পানি দিয়ে ওজু করে।”–”হুজুর যেখানে পানি নেই, সেখানে?” –”তখন ধুলা দিয়ে তায়াম্মুম করে।” ছাত্র ভাবল, হুজুরকে এবার আটকাবে। সে প্রশ্ন করল, ”হুজুর, যেখানে পানিও নেই, ধুলাও নেই, সেখানে কী করবে?” হুজুর ছাত্রকে কাছে ডাকলেন। আসার পরে ঠাটিয়ে কানপট্টি জুড়ে দিলেন এক চড়। দিয়ে বললেন, “হারামজাদা, যেখানে পানিও নেই, ধুলাও নেই, এমন উদ্ভট যায়গায় তুই যাবি কেন তাই আগে বল।” বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন মাধ্যমে, বিভিন্ন ধরনে মানুষের দুর্ভোগ, জিম্মি বা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া নিয়ে আমরা নিঃসন্দেহে সমব্যথী হই। তার সাথে সাথে একটা বিপরীত দিকও সামান্য হলেও ভাবা উচিত। অন্তত একবারের জন্য হলেও। সেটা হল, ওই বিপদ বা জিম্মিদশা বা ভিকটিমাইজেশনের পিছনে আমাদের অবদানও কতটা? ঘরের খাটের তলে গোখরা সাপ কিনে এনে রেখে তারপর তার কামড়ে মরলে ওঝার দোষ দেয়াটা কতটা নিরেট যুক্তিযুক্ত? *দৌড়ের ওপরে একটা মেছাল দিই। যেই মার্কেটে অগ্নিনিরাপত্তার ন্যুনতম ব্যবস্থা নেই, সেই মার্কেটে লক্ষ টাকা দিয়ে দোকান কেন দিই আমরা? তারপরও সেখানে একবার আগুন লাগার পরেও কোনো ব্যবস্থা না বসাবার পরেও কীভাবে আবার বিনা প্রস্তুতিতে দোকান বসাই আমরা? সরকার না হয় “বিশ্ববেঈমান” ইত্যাদি ইত্যাদি। বুঝলাম। তো সামাজিক বয়কট ও সামাজিক প্রতিরোধ নামেও তো একটা পথ আছে। আমি সিনেমা না দেখলেই তো নায়িকার নাচানাচি বন্ধ হত। হত না?

৪. #abuse #blame #responsibility #accountable

দবির যদি ছবিরকে প্রহার করে তবে দবিরের দোষ নয়, দোষ হইল ছবির কেন পিঠ পাতিয়া দিল? আম যদি বোটা হইতে ঝরিয়া পড়ে তবে আমের দোষ নয়, বোটা কেন তাহাকে ধরিয়া রাখিতে পারিল না সেটা তারই দোষ। (সংগৃহিত) একা পথে তরুনীকে কোনো বখাটে টিজ করিলে বখাটের দোষ নয়, তরুনী কেন একা বাহির হইল, তাহারই সব দোষ। কে বা কাহাকে উদ্দেশ্য করিয়া কহিলাম তাহারা আন্দাজ করিয়া নিন। দবির একটি চাকরি করে, প্রতিমাসে বেতন পায় ৭৫ হাজার। ছবিরও চাকরি করে, মাসে বেতন পায় ৪৫ হাজার। আপনি কাকে বেশি যোগ্য মনে করেন?

আবার দবির বেতন বাদে প্রতিমাসে আরও ১ লাখ টাকা ঘুষ ও কমিশন বাবদ আয় করে;

ছবির মাসে মাসে বেতন বাদে ঘুষ ও কমিশন হতে গড়ে আরও ২.৫ লাখ টাকা আয় করে।

এবার বলুন, দু’জনের মধ্যে কে বেশি যোগ্য, সুপুরুষ ও করিৎকর্মা?

৫. #responsibility #load #obligation #thanklessjob #IdiotStupid

বেকুব কাহিনী এক:

২/৩ দিন আগে এক পুলিশ ভদ্রলোক একটি ডুবন্ত বাচ্চাকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাচান। ভার্চুয়াল জগতে এই নিয়ে ব্যপক লেখালেখি। তার ঘটনায় আমার আরেকটা কাহিনী মনে পড়ে গেল।

একবার এক সরল ভদ্রলোক রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন। হঠাৎ দেখেন একজন মহিলা বর্ষার জলে ডোবা রাস্তায় ম্যানহোলে পড়ে কোমর পর্যন্ত নোংরা নিয়ে পা ভেঙে পড়ে আছেন। ভদ্র (বা অভদ্র) নারীর স্বাস্থ্য মাশাল্লা। ওনার স্বামী বেচারা আবার অতিকায় কৃশ। বউকে দু’হাতে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারছেন না। দর্শকরা নানান মন্তব্য করলেও কেউ সাহায্য করতে এগোচ্ছে না। আমাদের সজ্জন বেকুব ভদ্রলোকের মানবতাবোধ (কিঞ্চিত বাঙালীত্ববোধও) চাগিয়ে উঠল। তিনি ছুটে গিয়ে ভদ্রমহিলাকে পাজাকোলা করে তুলে দৌড়ে হাসপাতাল নিয়ে গেলেন। ভদ্রমহিলার স্বামী এতক্ষণ কথাবার্তা বলেননি। তবে এইবার তিনি তার পৌরুষ নিয়ে স্বমুর্তিতে আাবির্ভুত হলেন।

আমাদের সরল ভদ্রলোক ভেবেছিলেন তিনি উপঢৌকন না হোক স্বামী ভদ্রলোকের কাছ থেকে একটা বিরাট ধন্যবাদ অন্তত পাবেন। কিন্তু গল্প এত সোজা হলেতো আমি এই গপ্পটা ফেঁদে বসতে পারতাম না। স্বামী সাহেব অগ্নিমুর্তি ধারন করে সরলকে নিয়ে পড়লেন। “আপনার এত সাহস? পরের বউয়ের গায়ে হাত? তোমারে কে কইছে আমার বউরে হাসপাতাল নিতে? মেয়ে মানুষ দেখলে আর হুশ থাকে না তাই না?” ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। দর্শকরাও কম যায় না। “শালা লুচ্চা……….টেংরী ভাইঙা দেওয়া দরকার” ইত্যাদি। আমি সেদিন বেকুব হইলাম।

বেকুব কাহিনী দুই:

ঢাকার রাস্তা। ব্যস্ত দুপুর। জ্যাম, ধুলা, চিল্লাচিল্লি, ট্রাফিক, রোদ-সবমিলে অস্থির সময়। জনৈক মহিলা বাসের জন্য ঘন্টাখানিক দাড়িয়ে আছেন। দু’একটা যা আসে তাও মানুষে ঠাসা। অনেকক্ষণ পর একটা বাস আসল। তিনি দৌড়ে গেলেন। তার প্রতিযোগী আরো পঞ্চাশজন। ছোট্ট দরজা দিয়ে বাসে উঠতে যুদ্ধ শুরু হল সবার মধ্যে। চাপাচাপিতে ভদ্রমহিলা হঠাৎ পা ফসকে পড়ে যাচ্ছিলেন। আল্লাহর দুনিয়াতে কখনো পরোপকারীর অভাব হয়না। মাত্র শহরে আসা একজন ছিলেন সেই ভীড়ে। তিনি হাত বাড়িয়ে মহিলা ধরে ফেললেন। টেনে তাকে বাসে তুললেন। তার দিকে তাকিয়ে একটা বোকা বোকা অমায়িক হাসি দিলেন সরল পরোপকারী। ভাবলেন তাকে ফোন নাম্বার না হলেও লম্বা একটা হাসি তো ফেরত দেবেনই মহিলা। কিন্তু ওই যে? দুনিয়াটা গোল। মহিলা আমাদের পরোপকারীকে লাগালেন এক রাম ধমক।

“মাত্র আসছ শহরে? জানো না জানো না একজন ভদ্রমহিলাকে কিভাবে সম্মান করতে হয়? চান্স পাইলেই গায়ে হাত দেয়ার তাল তাই না? বাড়িতে মা-বোন নাই?” ইত্যাদি ইত্যাদি। বেচারা আবার বেকুব।

বেকুব কাহিনী তিন:

আমার পরিচীত এক রিক্সাওয়ালা। থাকেন কল্যানপুর। সকালবেলা রিক্সা নিয়ে বের হয়েছেন। ভাগ্য ভাল অল্পসময়ের মধ্যেই খ্যাপ পেয়ে গেলেন তাও আবার এক সুদর্শনা। দামী থ্রি পিসে তাকে লাগছে দারুন। সুনয়না রিক্সায় করে যাবেন ধানমন্ডি লেক। ভাড়া ঠিক করে রিক্সায় চেপে বসেন তিনি। “আপা ওড়না সাবধানে রাখবেন” রিক্সাওয়ালা তাকে সতর্ক করে। “আপনার এতদিকে নজর কেন? রিক্সা চালান। আমাকে উপদেশ দিতে হবে না।” রিক্সা যখন শ্যামলী ক্রস করছে হঠাৎ পথচারীদের আহা উহু চিৎকার এই গেল গেল, ধর ধর, আহারে, ইস-ইত্যাদি। কি হল? সুনয়নার ওড়না চাকায় পেচিযে তিনি ধরনীর বুকে পপাত ধরনী তল। নিজে ওঠার ক্ষমতা নে্ই। সবাই ধরাধরি করে তাকে তোলে। রিক্সাওলা তার দামী ওড়না টানাটানি করে কোনোমতে চাকা হতে ছাড়াতে পাড়লেও কিঞ্চিত ছিড়ে যায়। ব্যাস আর যায় কোথায়? ওড়নার শোকে সুনয়নার সেকি গোস্যা।

“ইস দিলাতো শেষ করে? তোমারে কে কইছে ওড়না ছাড়াইতে? আমি পারতাম না? মাতবরী করলা কেন? ছোটলোকে কি করে বুঝবে এইটার দাম” ইত্যাদি ইত্যাদি। সেইদিনও বেচারা বেকুব হয়।

বেকুব কাহিনী চার:

ভাবছেন আমি নারী বিদ্বেষী পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতিনিধি? না পাগলা। তা ভাবলে আপনিও বেকুব হবেন। এই দেখেন, পুরুষদের নিয়ে এইবার একটা কাহিনী বলব তবে এটা ধার করা। আমি আমার মতো করে বলছি। পাড়ার মোড়ে একটা বাড়িতে আগুন লাগছে। মানুষজন দৌড়াদৌড়ি। ফায়ার সার্ভিস এসে পড়েছে। তাদের সাইরেনের বিকট শব্দে মানুষজন সচকিত। তারা ভীড় করা লোকজনকে সরিয়ে দিচ্ছে ঘটনাস্থল থেকে।

আমাদের চিরাচরিত একজন পরোপকারী ঘটনাস্থলে এসে পড়লেন। তার ঔচিত্যবোধ, মানবিকতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। তিনি আলি আলি বলে আগুনের মধ্যে ঢুকে পড়লেন। তারপর একে একে ৪ জনকে আগুন হতে বের করে আনলেন মহাবিক্রমের সাথে। মানুষতো তার বিরত্বে সাধু সাধু করতে লাগল। ঘটনাস্থলে ছিল ফায়ার সার্ভিসের লোকদের বস। তিনি কিন্তু খুশি হননি। তিনি আমাদের পরোপকারীকে মহাক্রোধে কাছে ডাকলেন। আমাদের পরোপকারী ভাবলেন হয়তো এবার তাকে তিনি পুরষ্কার দেবেন বা এরকম কিছু। কিন্তু তার বদলে বস ভদ্রলোক বেচারাকে এক রাম থাপ্পর লাগালেন।

কি ব্যপার? আসলে ঘটনা হল পরোপকারী অতি উৎসাহে আগুনের মধ্যে ঢুকে ফায়ারসার্ভিসের কর্মী যারা ঘরে আটকে পড়া লোকদের উদ্ধার করছিল তাদেরকে ধরে ধরে বাইরে নিয়ে এসেছে।

পাঠক এবার কে বেকুব হবে?

বেকুব কাহিনী পাঁচ:

এক চোর গেছে চুরি করতে। এক বেটার মাটির ঘরে সিঁদি কেটে ঢুকে পড়ল মাঝ রাতে। ঘর মালিকের গলার কাছে ছুড়ি ধরে একে একে ঘটি, বাটি, মালশা, বিছনা পত্তর, টাকা-পয়সা, হাড়ি-পাতিল, কাপড়, গামছা সব গাট্টি বেধে এরপর শোয়ার চৌকিখানায় যখন হাত দিল তখন ঘরওলা মৃদু আপত্তি করল। “এই হারামজাদা চুপ” এক রামধমকে কাজ হয়ে যায়। অতৎপর চোর বাবাজি মালামালসমেত তার নিজগৃহে এল। সবকিছু ঘরে রেখে সে পুকুরে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে চুরি করা গামছায় মুখ মুছতে মুছতে ঘরে ঢুকল।

হঠাৎ তার চোখ গেল চৌকির উপর যেখানা মাত্রই তিনি বাগিয়ে এনেছেন। সেখানে আর একজন বসে আছেন। ভাল করে নজর করে দেখলেন এতো সেই বেটা যার ঘরে মাত্র চুরি সেরে এসেছেন। “এই তুই এখানে কেন? কি মতলব তোর” চোর শুধায় গৃহকর্তাকে। “ভাই,আপনেতো সবই লইয়াইছেন মায় ঘুমানের চকিটাও। তাই আমি ভাবলাম, আমি আর আমার ঘরে থাকুম কেন? আর থাইকা করুমই বা কি? তাই আমার সবই যেহেতু এইহানে তাই আমিও চইলা আইলাম।”

এইবার বেকুব আমাদের চোর বেচারা।

বেকুব কাহিনী ছয়:

রাত ৯টা। অফিস ফেরত কামলা ও দায়ীত্বশীল পুরুষ আমি টিভিতে চোখ বুলাই। ফাঁকে ফাঁকে সখের লেখালিখি করতে থাকি। সনি টিভিতে একটা প্রোগ্রামে চোখ আঁটকে যায়। ক্রাইম পেট্রোলের একটা পর্ব হচ্ছিল। একজন স্কিৎজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত স্ত্রী কাম মা, আর সেই পরিবারের পুরুষ মানুষটির দু’টি বাচ্চাকে নিয়ে সংগ্রামের নাট্যরূপ। বাবাটা অসুস্থ স্ত্রী, সন্তান, কর্মস্থলের দায়ীত্বের বোঝা, সমাজের কাছে আদর্শ বাবা ও স্বামী হবার চোখরাঙানী-সবকিছুর চাপে এক পর্যায়ে ভেঙে পড়ে। সবার চোখের আড়ালে নিয়ে গিয়ে নিজ হাতে হত্যা করে বাচ্চা দুটোকে। নিজেকেও শেষ করে দেবার চেষ্টা করে। অত্যন্ত হৃদয়বিদারক দৃশ্য। দায়ীত্বশীল একজন মানুষের একা একা ভার বহনের করুণ ও নিষ্ঠূর পরিণতি। দায়ীত্বের ভারে ভেঙে পড়া একজন মানুষের বাস্তব নিয়তি। দায়ীত্বের এমন কর্কশতা আমাকে কীপ্যাডে বসায়। ঘ্যাসঘ্যাস করে লিখে চলি পাগলের মতো। লিখতে বসে দেখি কত কথা জমে ছিল এই তিন অক্ষরের শব্দটাকে নিয়ে। দায়ীত্ব। কর্তব্য।

বেকুব কাহিনী সাত:

কয়েক মাস আগে কোনো একটি বেসরকারী টিভি চ্যানেলে একটা নাটক দেখানো হয়। ’বড়ছেলে’ শিরোনামের সেই নাটকটি দেখে দীর্ঘদিন আমরা রাস্তায়, গাড়িতে, অফিসে, আড্ডায় ফেসবুকের খোরাক হিসেবে নানা হাস্যরস, মূল্যায়ন, হাহাকার, হতাশা, আশাবাদ, বাহবা, সাবাশি-অনেক কিছু করি। আমরা বেশ কয়েক সপ্তাহ মেতে ছিলাম বড় ছেলের চরিত্রে রূপ দেয়া অপূর্ব’র অভিনয়ের বিশ্লেষণে, মেহজাবিনের প্রশংসায়। কেউ কেউ আবার সমালোচনা করেছেন (নাটকের খুব স্বাভাবিক আর বাস্তবের অস্বাভাবিক হলেও) এই সীনে অপূর্ব এটা করতে পারত, ও কেন ওটা করল না? ইত্যাদি ইত্যাদি।

বাস্তবের বড় ছেলেরা কিন্তু ঠিকই বিরাজ করে সমাজে। নাটকতো আমাদের জীবনেরই প্রতিবিম্ব, তাই না? দায়ীত্বশীল মানুষটির একাকী হেরে যাওয়ার সেই চিরচেনা চিত্র।

বেকুব কাহিনী আট:

ছোটবেলায় বাংলা বইয়ে একটা গল্প পড়েছেন কি? ওই যে, বড়মিয়া বা ভাঙাকুলা এমন নামের? বড়মিয়া গাঁয়ের অশিক্ষিত ছেলে। রাখালদের সর্দার। শহর হতে লেখক গাঁয়ে কোনো একটা কাজে যাবার কালে বিপদে পড়লে তাকে নদী পাড় হতে সাহায্য করেন। গ্রামে বন্যা দেখা দিলে তিনি নৌকাডুবিতে পড়া একদল লোককে উদ্ধার করতে গিয়ে একসময় নিজেই ডুবে যান।

কিংবা মনে পড়ে কি শরতচন্দ্রের বিলাসী গল্পের মৃত্যুঞ্জয়কে। সারা গাঁয়ের গরীব মানুষের ছেলেদের বই, খাতা, কলম, কাপড়ের অর্থসংস্থান হত তার পয়সায় অথচ ছোটজাত বলে তার সাথে কথার সম্পর্কও কবুল করতে চাইত না কেউ। শেষতক তার মৃত্যু হয় গোটা গাঁয়ের চোখে ঘৃনিত অবস্থায় সাপের কামড়ে। দায়ীত্ব নেয়া সরল মানুষের অবশ্যম্ভাবি শেষ পরিণতি।

টিপিক্যাল বাঙালী হিসেবে আমাদের ছোটবেলা হতেই দায়ীত্ব নিতে শেখানো হয়। দায়ীত্ব নেয়াটাকেই স্বাভাবিক বলে চেনানো হয়। দায়ীত্ব নেবার মহান ব্রত নিতে অভ্যস্ত আমরা। কিন্তু কখনো কখনো দায়ীত্বটাই হয়ে যায় কারো জন্য অর্পিত। চাপিয়ে দেয়া। কলুর বলদ নামে একটি প্রবচনের ব্যবহার আছে বাংলা ভাষায়। দায়ীত্বের চাপে নুয়ে পড়া মানুষটি সমাজের চোখে বাহবা কুড়ায়। সমীহ পান দশজনের চোখে। কিন্তু এই সামাজিক স্বীকৃতির মেঘে আড়াল হয়ে যায় আরেকটি সত্য। দায়ীত্ববান মানুষটির নিজের জীবনটি। নিজস্ব স্বত্ত্বাটি।

পরিবার হতে আমাদের দায়ীত্ব নেবার পাঠ শুরু হয়। বাবা-মাকে দায়ীত্ব পালন করতে দেখে আমাদের দায়ীত্ব নেবার শিক্ষার শুরু। একজন বাবা বা মা কিংবা একজন বড় ভাই বা বোন দায়ীত্বে থাকেন আমাদের। তার ঘাড়ে সব দায়ীত্ব তুলে দিয়ে আমরা নিশ্চিন্তে থাকি। তারা ভরসার ডানা মেলে আমাদের সবরকম দায়ীত্ব নিজেরা নিয়ে, সব ঝড়ঝাপটা, বিপদ, অপ্রাপ্তির কষ্ট হতে দূরে রেখে সুখী করেন আমাদের।

আমাদের ’ক্ষিপ্ত’ টিভিতেও কয়েকদিন আগে একটা সিরিয়াল হত ‘অপরাজিতা’। সংগ্রামী একজন নারীর জীবনযুদ্ধের গাঁথা। উৎকট ইন্ডিয়ান সিরিয়ালের সব মালমশলা ওই নাটকে থাকলেও আমি ওতে অন্য এক চাপা আকর্ষন পেয়ে যাই। ওই যে, দায়ীত্ব নেবার মহান চিত্রায়ন। বাবা-মা’র অবর্তমানে ভাইবোনদের মানুষ করতে গিয়ে একজন বড়বোনের জীবন সায়াহ্নে ওই ভাইবোনদের হাতেই নিগ্রহ আর অবহেলার শিকার হবার সেই অসহ্য ঘ্যানঘ্যানানি আর সামাজিক কোষ্ঠকাঠিন্য।

অনেক সময়ই ওই দায়ীত্ব নেয়াদের বিরাট ব্যক্তিত্বের আড়ালে চাপা পড়ে যাই আমরা। একসময় ভুলে যাই দায়ীত্বে থাকা মানুষটিকে, তার অবদানকে। মনে হয় যেন এমনটাই হবার কথা। গা সওয়া হয়ে যায় অন্যের দায়ীত্বে থাকা আমাদের নিরাপদ জীবন। চোখেই পড়ে না বিশেষ কিছু। কিন্তু এতকিছুর ভীড়ে সেই মানুষটিকে কে দেখে? তার জন্য কে ভাবে? সবাইকে নিয়ে বাঁচতে গিয়ে, সবাইকে বাঁচাতে ব্যস্ত যেই মানুষটি, তার জন্যে কে কাজ করে? কখনো ভেবেছেন? পরিবার ও সমাজের দশটা দায়ীত্ব নিতে গিয়ে তিনি নিজেকে হারিয়ে ফেলেন। বহু বছর বহু রকম দায়ীত্ব পালন শেষে যেদিন পিছনে ফিরে তাকান তখন দেখেন, জীবনের নদীতে ভাটির টান। যাদের জন্য এতটা কাল বিলিয়ে এসেছেন নিজের জীবনের সব আশা, সব সম্ভাবনা, সব স্বাদ, আল্লাদ, সবরকম প্রাপ্যকে সমানে কোরবানী করে এসেছেন, তারা যখন প্রতিষ্ঠিত তখন সময় থাকে না তার জন্য।

মেয়েদের অসম্মান বা একজন নারীর বঞ্চনা নিয়েতো প্রচুর কথা সমাজে, সাহিত্যে দেখাই যায়। সে তুলনায় একজন বাবাকে নিয়ে কতটা লেখালেখি হয় সেটা নিয়ে আমার একটু দোনোমোনো আছে। আমি প্রচুর দেখেছি, একজন বাবা সারাজীবন স্ত্রী, বাবা-মা, সন্তান, ভাইবোনের জন্য জীবন উৎসর্গ করে কাজ করে গেছেন। তারপর যখন পরন্ত জীবনে সবাই দাড়িয়ে গেছে, তখন সেই পুরুষ বা বাবাটির জন্য সময় নেই কারো। (অন্যরকমভাবে নেবেন না।) মা’কে নিয়ে ব্যস্ত থেকে বাবাকে অবহেলা বা তাকে প্রান্তিক করে রাখার প্রচুর নজির আমি দেখেছি। মা’কে তো অবশ্যই ভালবাসবেন। কিন্তু বাবা, যিনি আমাদের জীবন গড়ে দিলেন, তাকে অপাংক্তেয় করে রেখে মা’কে নিয়ে ভালবাসার চরম পরাকাষ্ঠাকে আমার কাছে ভন্ডামী মনে হয়। পু

রুষ মানুষের অত্যাচারী আর পশুরূপী সত্ত্বাকে নিয়ে প্রচুর সাহিত্য রচনা প্রায়ই দেখি। কিন্তু ওই ছবিখানার একটা বিপরীত চিত্রও আছে। দায়ীত্ববান পুরুষ এবং অতঃপর তার একান্ত নিজস্ব জগত ও অধিকারের বৃত্তটুকুর অকাল মরন কেউ দেখে না। দেখে না, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের জন্য দায়ীত্ব পালন করতে গিয়ে তার নিজের একান্ত জীবন বলে আর কিছু যে থাকেনা। একজন দায়ীত্ববান বাবা বা বড় ভাইয়ের পাশে তারও যে একটি নিজস্ব জগত আছে, নিজস্ব চাওয়া, পাওনা, বাসনা, স্বপ্ন থাকে তা আমরা যেমন ভুলে যাই, হয়তো তিনি নিজেও ভুলে যান বা ভুলে থাকেন। এবার আবার বিপরীত দিকটাতে দেখি।

একদিন বাসে পরিবার নিয়ে চিড়িয়াখানায় যাচ্ছি। পথে এক স্টপেজ হতে সামনের সিটে উঠলেন এক ভদ্রমহিলা। ভদ্রমহিলা এতটাই মোটা যে তাকে তুলতে আর নামাতে বাসের স্টাফকে অনেক কসরত করতে হল। তিনি নেমে যাবার পর যাত্রীরা স্বাভাবিকভাবেই একটা মন্তব্য করে বসে, “কোন দোকানের চাল খায়?” একজন বলে, “জামাই আনে, বউ নিশ্চিন্তে খায়।” ভাবখানা এমন যেন, শুধু ভাত খাওয়ার কারনেই তার এই অবস্থা। কিছুক্ষণের জন্য আমারও মনে হল, তাইতো, মেয়েরা কী সুন্দর সারাটা জীবন খাওয়া পড়ার জন্য একটুও ভাবতে হয় না। চাকরি, ব্যবসা নিয়ে মরতে হয়না। সব স্বামীর ঘাড়ে ফেলে দিয়ে নিশ্চিন্তে সিরিয়াল দেখে বেড়াও, শপিং, গসিপিং কত কী?

কিন্তু পরে ঠান্ডা মাথায় একটা সত্যি কথা ভাবলাম। এই মেয়েরা ছোটবেলা হতেই বাবা-মায়ের কাছ হতে দায়ীত্ববিহীন বা ভরসা কাম্যহীন হয়ে বড় হয়। তাদের তৈরীই করা হয় দায়ীত্ব নেবার নয় বরং অন্যের দায়ীত্বে মাথা নত করে বাঁচতে শেখার জন্য। তাছাড়া এই মেয়েরাই তাদের সবরকম যোগ্যতা ও সম্ভাবনা থাকা স্বত্বেও স্বামীর উপর অন্ধের মতো ভরসা করে, নিজের ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়ে, স্বামীর (নিজেরও) সংসার ও সন্তানাদির দায়ীত্ব পালন করতে গিয়ে বছর বছর নিজেকে সম্পূর্নরুপে স্বামীর উপরে অন্ধের মতো সঁপে দেয় কিংবা বলা যায়, স্বামীর ওপর ভয়ানক রকম নির্ভরশীল করে নিজেকে একপ্রকার স্বেচ্ছা অকর্মন্য করে তোলে। নিজের সবটুকু কর্মশক্তি, পোটেনশিয়ালকে, নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতাকে ঘুম পাড়িয়ে কার্যত স্বাবলম্বি হবার সব রাস্তা ধীরে ধীরে বন্ধ করে দেয়। তো সেক্ষেত্রে তার সবরকম দায়ীত্ব বিয়ের সময় স্বামীকে তো তাই নিতেই হবে তাই না?

কিছু কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসেই দায়ীত্ব নিতে। কাজ করতে। বিলোতে। উজাড় করে দিতে। নিজের জন্য নিজে বাঁচতে শেখে না তারা। পারেও না। তাদের জীবনটার জন্মই যেন অন্যের তরে। অন্যকে সুখী করা, অন্যের মুখের হাসির জন্য জীবন দেয়া, অন্যের অধিকারের জন্য নিজের ন্যুনতম অধিকারটুকুও ছেড়ে দেয়া, অন্যের চাহিদাটা মেটাতে নিজের শেষটুকুও দিয়ে দেয়া, অন্যের বোঁঝা বইতে গিয়ে নিজের জীবন সায়াহ্নে নিজেকে নিঃস্ব, রিক্ত অবস্থায় আবিষ্কার করাই এদের ব্রত। মহান সাঁজবার এক নেশা তাদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় আজীবন। কেউ তাদের হয়তো দায়ীত্ব দেয়নি। সে নিজেই নিজেকে জড়িয়ে ফেলে। কারন তারা এড়িয়ে যেতে পারে না। তারা না বলতে শেখেনি। পলায়নপর মনোঃবৃত্তি তাদের চরিত্রে নেই।

কিন্তু নিষ্ঠূর ও স্বার্থপর এই পৃথিবী মনে রাখে না তাদের কথা। সবকিছু গুছিয়ে দিয়ে তারা থাকেন তফাতে। অন্যের প্রাপ্তি আর তৃপ্তি উদযাপন দেখেন দূর হতে। হয়তো একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করেন স্বক্ষেদে। তপ্ত দু’ফোটা পানিও হয়তো গোপন করেন। গোপন করতে হয়। কারন ওটুকুও তারা দেখাতে চান না কাউকে। দায় নেবার ভার যে বড় গুরু ভার। দায় যে নেয়, সেই তো দায়ীত্ববান।

জীবন,

তোমার ভারে আমি সত্যিই জর্জরিত। ক্লান্ত, লুপ্ত, রিক্ত

—–তোমাকে দিয়েছি সময় অনেকটা।

—–আজ আমি বড্ড ক্লান্ত। আমি নিঃস্ব।

—–আমার একটু সময় চাই। নিজস্ব।

—–নিজেকে নিজের করে পাবার

—-নিজের মতো করে, নিজেকে বুঝবার

—-একটু সময় চাই। একান্তে

—-রাতের আগক্ষণে অথবা দিনান্তে।

#duty #responsibility #punishment #selfobligation #sensibility

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *