আমার অনেক দিনের একটা ইচেছ ছিল ঢাকার স্ট্রীট ফুড নিয়ে লেখা। অনেকদিন ধরে তথ্য যোগাড় করে সেই লেখাটা লিখি গত বছর। সেই সময় হতেই আরেকটা লেখার প্ল্যান ছিল। ঢাকার অপ্রচলিত ও ব্যতিক্রমী ধরনের পেশার মানুষদের নিয়েও লিখব। আমার একটা অভ্যাস আছে। রিক্সায় উঠলে বা এমনকি মোটরবাইকে চড়লেও তার ড্রাইভারের হাল, ঠিকুজি জেনে নেয়া। তার ব্যবসার খোঁজ খবর নেয়া। তাদের রুজি রুটি, কাজের ধরন, জীবন জগত সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি। এই সাধারন কৌতুহলটাই আমাকে জানবার সুযোগ করে দেয়, এই ঢাকার বুকে কত মানুষ কতরকমভাবে যে বেঁচে আছে। এর কোনো সীমা নেই। অত্যন্ত আগ্রহ উদ্দীপক সেই জগত। আমার কাছে তাদের রোজগারের পরিমানের চেয়েও বেশি আগ্রহের জন্ম দেয় তাদের সংগ্রামের ধরনটি। কীভাবে একজন প্রায় অশিক্ষিত মানুষ ঢাকার বুকে এসে নিজের চেষ্টায় বেশ ইর্ষনীয় একেকটি স্বাধীন পেশায় নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছেন, সেটাই আমাকে টানে। আমার অনুজ ও প্রফেশনের যে কত রকম ধারা হতে পারে-সেটি একটি বিষ্ময়। যেমন ধরুন, বুড়িগঙ্গার তলা হতে ম্যাগনেটে দড়ি বেঁধে লোহা তুলে বিক্রী করা-স্রেফ এই কাজ করে জীবন চালান এমন ২ জন মানুষ আছেন ঢাকায়। আবার, রাস্তায় হেঁটে হেঁটে কান পরিষ্কার করে দিয়ে আয় করেন-এমন মানুষও আছেন। ঠিক তেমনই আছেন কথা বিক্রী করা মানুষ।
আমি নিয়মিত দেখি-এমন তিনজন ভারতীয় স্পিকার হলেন মি. সাধগুরু, মি. সিমারজিৎ এবং মি. গৌড় গোপাল। সম্প্রতি দেখা শুরু করেছি মি. ধ্রুব রাঠোড়কে। যদিও তিনি কোনো বলিয়ে নন।
শুধু কথা বলাকে যে একটা শিল্প, শক্তিশালী পেশা আর অর্থ রোজগারের খুবই নির্ভরযোগ্য একটি মাধ্যম হিসেবে অবলম্বন করা যায়-এই তিনজন তার খুব ভাল তিনটি উদাহরণ। যদিও এই দলে প্রচুর মানুষ আছেন এখন। ওনারা নতুন নন। প্রেসিডেন্ট ওবামা হতে মুনিবা মাযহারি-কথা সেল করেন। বিশেষভাবে মি. সাধগুরুর কথা মন্ত্রমুগ্ধ করে।
প্রফেশন হিসেবে এই ট্রেইটটাতে নতুন করে মজেছি। আমার লেখালিখিকে বিক্রীর চিন্তা কখনো মাথায় আসেনি। কথা বিক্রীর চিন্তা যদিও এখনো মাথায় আসে নাই, তবে কথা বলা বিক্রীকে একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যত পেশা হিসেবে আমার পরিকল্পিত অলটারনেটিভস এর তালিকায় রেখেছি। ওই তালিকায় আরও রয়েছে- টোটো রিক্সা চালনা, ফুড কার্ট অফ সিঙ্গারা, মুদী দোকান। ৬০ বছর তক যদি বেঁচে থাকি আর ততদিন যদি জব করে যেতে পারি, তাহলে ৬০ এ এগুলোর একটা করব-সেটা অন্তত এই মুহূর্তে সুনিশ্চিত মনে হচ্ছে।
#Unemployed #RealFear চাকরি চলে গেলে কিংবা ব্যবসা নষ্ট হলে কী হবে-এই নিয়ে যে মারাত্মক দুঃশ্চিন্তাটা আমাদের কুরে কুরে খায়, সেটার মূল ভয় বা আতঙ্কটা কিন্তু, আয়হীনতা না। মূল আশঙ্কাটা হল যেরকম কমফোর্ট, স্ট্যাটাস ও সামাজিক অ্যাকসেপট্যন্সসহ বর্তমান আয়টা আসছে, সেটা আর থাকবে না-সেই ভয়।
অর্থাৎ, আয় হারানো বা অবনমনটা মূল চিন্তা না, ওই একই পরিমান আয় হয়তো অড জব বা নন-কনভেনশনাল প্রফেশনে ঢুকেও আয় করা সম্ভব, তাতে রিজিক বন্ধ হবে না, তবে পড়ে যাবে সমাজের কাছে অবস্থান, কমফোর্ট, পাবলিক পারসেপশন ও স্ট্যাটাস। টাকার চেয়ে টাকার আসার নতুন সম্ভাব্য পন্থাগুলোর প্রতি সামাজিক ট্যাবু ও নিজের ভয়ই মূল উৎস ওই টেনশনের।
অথচ, এই তথাকথিত সমাজ, পরিবার, আত্মীয়, বন্ধুর মহলটা কী কাজে আসে? একটাই কাজে আসে, সেটা হল, আপনি মরলে আপনার ’আৎমার’ শান্তি কামনায় খাসির নলি চিবানো আর ফিরনির মিষ্টতা নিয়ে খুঁত ধরতে।প্রোফেশনাল মেট জাহিদ ভাই নন-কনভেনশনাল পেশার উত্থান নিয়ে একটি আর্টিকেল লিখেছিলেন। বিশ্বব্যাপীই ননকনভেনশনাল পেশার বাজার বড় হচ্ছে। দাপট বাড়ছে। বাংলাদেশও হয়তো তার কাছে নতি স্বীকার করবে অচীরেই। ঢাকার নন-কনভেনশনাল পেশার রকমফের, আয় রোজগার, প্রফিট মার্জিন, টিকে থাকা, পুলিশি ঝামেলা, শহরে নতুন আসার পর সার্ভাইভাল টেকনিক শেখার ইতিহাস জানার চেষ্টা করতে হলে পড়ুন। এই পেশাগুলোকে নন-কনভেনশনাল বললেও আসলে এইসব পেশায় বিশাল সংখ্যক মানুষ জড়িত আছেন। কিন্তু মানুষ ওগুলোকে খুব একটা দাম দেয় না। আমি ওগুলোকে নন-কনভেনশনাল বলছি যে জন্য, তা হল, বাংলাদেশের মানুষ তাদের নানারকম সামাজিক ট্যাবু পেরিয়ে যেই দুটো সহজ দিককে পেশা হিসেবে সামাজিক স্বীকৃতি দেয়, তা হল, হয় চাকরী করো নয় বড় ব্যবসা করো। এর বাইরে সবই তাদের কাছে ওঁচা।
আমি যেই মেসেজটি এখানে দিতে চেয়েছি, তা হল, আমরা যাতে পড়াশোনা শেষ করে একটা বিসিএস কিংবা কেরানীর চাকরি পেতেই হবে, না পেলে জীবন শেষ, তা না করে বিকল্প ভাবনাটাও ভাবি।আমার আলাপ হওয়া ও বিভিন্ন জনের কাছ থেকে পাওয়া গল্পগুলো সাজাতে চেষ্টা করেছি আমার এই লেখায়। কিছু গল্প জোড়া দিয়েছি আমার সুহৃদদের পাঠানো গল্পের সাথে:
১.পান বিক্রেতা:
কেরামত আলি। থাকেন বাড্ডা। পেশায় একজন পান বিক্রেতা। যমুনা ফিউচার পার্কের ওদিকে গিয়েছি একটা কাজে। রাত ১১:১৫টা। বৃদ্ধ কেরামত আলি ছোট্ট একটা টিনের বাকেটে করে পান বিক্রি করেন। চুল ও দাড়ি সব সাদা হয়ে গেছে। ধূসর ভ্রূ যুগল তাকে একটা আলাদা পবিত্র লুক এনে দিয়েছে। আমি অভ্যাসবশত অন্যান্য পান বিক্রেতাকে এড়িয়ে তার কাছ হতে একটা পান নিই। চাচা অনেক আয়াসে কাঁপা কাঁপা হাতে পান সাজেন। পানটা মুখে পুড়ে তাকে জিজ্ঞেস করি, বয়স কত? ”৭৫ বৎসর” তার উত্তর। ”ছেলেমেয়ে নাই?” “না বাবা, মেয়ে ছিল, বিয়া দিছি। ছেলে নাই।” বৃদ্ধ কেরামত আলি ৭৫ বছর বয়সে এখনো পেটের ভাত জোগাড়ে পান বিক্রী করেন। রাত ১১:১৫ তেও। প্রতিদিন তিনি সকাল হতে সন্ধ্যা গড়িয়ে গভীর রাত অব্দি তাই যমুনার সামনের চত্বরে পান বিক্রী করেন। প্রতিটি পান এখন ৭ টাকা (একটি পান, দুটুকরো সুপারি, চুন, সামান্য জরদা, কখনো কখনো মিস্টি পানের উপকরন)। তিনি প্রতিদিন প্রায় দুই পোণ পান (৮০ টাতে এক পোণ) বিক্রী করতে পারেন। তার মানে দাড়াল, ১৬০টি পান X ৭ টাকা = ১১২০ টাকার সেল। প্রতিটি পানে গড়ে তার লাভ ২ টাকা। মানে প্রতিদিন নেট লাভ ৩২০ টাকা, মাসে গড়পড়তায় ৯ হাজার টাকা। যা এখনও বেশিরভাগ প্রাইভেট জবে একজন এমবিএ হোলডারের প্রাথমিক বেতনের সমান।
২.চামেলী ছবিটি দেখেছেন কারিনার?
ঢাকা শহরের চামেলীদের (আমি মানুষ হিসেবে তাদের প্রাপ্য সম্মান দেখানোর স্বার্থে চামেলী নামে লিখব।) নিয়ে লিখলে প্রথমেই আপনি একটি প্রশ্ন করে বসবেন জানি, “কী করে জানলেন ওদের কথা?”, সাথে থাকবে আপনার অর্থপূর্ণ একটি ক্রূঢ় হাসি। না ভাইজান, চাইলেই অনেক কিছু জানা যায়। চামেলীদের প্রতি পূর্ন সম্মান ও সমীহ নিয়েই বলছি। ঢাকায় তিন রকমের চামেলীরা আছে। ফাইভ স্টার হোটেল ও এসকর্ট চামেলীরা, মধ্যম/সস্তা মানের হোটেল ও ভাড়া বাড়ির চামেলীরা আর পার্ক, ফুটপাত, স্ট্রীট চামেলী। ফাইভ স্টার হোটেল ও এসকর্ট সার্ভিসের কর্মীরা প্রতিরাতের কয়েক ঘন্টার সার্ভিসের জন্য আয় করে ৫০০০ হতে ১৫০০০ পর্যন্তও। ফুটপাত ও পার্কের ভাসমান চামেলীরা প্রতি রাতে গড়ে ২ হতে ৫ জন কাষ্টমার ডিল করে। গড়ে তারা প্রতিজন হতে চার্জ করে ৫০ হতে ১৫০ টাকা। তার মানে প্রতিরাতে তাদের আয় ১০০ হতে ৬৫০ টাকা। মাসে গড়পড়তায় ৩০০০ হতে ১৫০০০ টাকা।
৩.চায়ের দোকান:
মালিবাগ মৌচাকের একটি চায়ের দোকানের কথা শুনেছিলাম যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৪০০ কাপ চা বিক্রী হয়। প্রতিকাপ ৫ টাকা হতে ১৫ টাকা। যদি সবাই ৫ টাকার চাও খায়, তবে ৫ টাকা X ৪০০ কাপ = ২০০০ টাকা হতে ৬০০০ টাকার বিক্রী। তাতে মাসে বিক্রী ১২০০০ কাপ। প্রতি কাপে যদি তার ২ টাকাও লাভ থাকে তবে নেট লাভ ২৪০০০ হতে ১ লক্ষ টাকাও হতে পারে। যা একজন সিনিয়র ম্যানেজার হতে এজিএম লেভেলের আদমীর বেতনের সমান।৪.ফুড কার্ট: মিরপুর স্টেডিয়ামের বিপরীতে ঝাল মুড়ি বিক্রেতা ইয়াকুব মিয়া। তিনি প্রতিদিন সন্ধ্যায় আসেন তার কলিজা ঝালমুড়িরে ডেকচি নিয়ে একটা ঠেলা ভ্যানে। সন্ধ্যা হতে রাত ১১টা পর্যন্ত প্রায় একবস্তা (১০-১২ কেজি মুড়ি তিনি বিক্রী করেন। একটি প্লাস্টিকের পিরিচে করে বা কাগজের ঠোঙায় করে কাগজের চামচ দিয়ে সাজিয়ে। প্রতি ইউনিট ২০ টাকা, ৩০ টাকা। কমপক্ষে ২০ টাকা করে তিনি প্রতিদিন বিক্রী করেন প্রায় ২০০ ইউনিট। তার মানে প্রতিদিন তার বিক্রী ৪০০০ টাকা। নেট লাভ থাকে ৮০০-১২০০ টাকা, তার মানে মাসে ২০ হাজার হতে ৩০ হাজার টাকা। একজন গড়পড়তা অফিসারের মাসিক বেতনের সমান।
৪.মুচি:
আমার অফিসের পাশে মসজিদের গেটে দু’জন মুচি কাজ করেন। শেড, চৌকি বিছিয়ে তাদের স্থায়ী অফিস। খুব আজব হল, আমি কখনো দু’জন মুচীকে একত্রে ব্যবসা করতে দেখিনি। যেটা ওনাদের দু’জনকে দেখি। একবার বুট পালিশ করাতে গিয়ে আলাপ হল। দুইজনের কেহই আদিম ডোম বা মুচি সম্প্রদায়ের নন। দু’জনই বাঙালী এবং মুসলিম। তারা প্রতিজোড়া জুতা পালিশ করতে নেন গড়ে ৫০ টাকা। আমার বুট রং করতে তারা ১২০ টাকা চার্জ করেছিল। প্রতিদিন তাদের গড় আয় ন্যুনতম ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা। তার মানে মাসে ৪৫০০০ থেকে ৬০ হাজার টাকাও। হ্যা, এটা অংকের হিসাব। এর মধ্যে অনেক ব্রেকডাউন, লস আছে। সেটা ভিন্ন কথা।
৫.সব্জি হকার:
মিরপুর কাঁঠালতলা মসজিদের সামনে দিয়ে বাসায় ফিরছি। হঠাৎ বৃষ্টি নামায় একটা দোকানের শেডের নিচে দাড়ালাম। একজন সব্জি বিক্রেতা বৃষ্টি হতে বাঁচতে সেখানে এলেন। আমি তার কাছে জানতে চেষ্টা করি তার ব্যবসার ধরন। তিনি মিরপুর ১ নম্বর হতে সব্জি কেনেন। সকাল হতে দুপুর ২/৩টা পর্যন্ত বাসাবাড়িতে গিয়ে গিয়ে, কখনো রাস্তার মোড়ে দাড়িয়ে সব্জি বিক্রী করেন। প্রায় সময়ই তার সংগ্রহে থাকে ৫-৬ ধরনের সব্জি। প্রতিটার গড়ে ৫-৭ কেজি। প্রতিদিন সামান্য ফেলে দেয়া সব্জি বাদ দিলে তিনি প্রায় পুরোটাই বিক্রী করতে পারেন। গড়ে তিনি প্রতিদিন বিক্রী করেন ৪০ থেকে ৬০ কেজি সব্জি। প্রতি কেজিতে মার্জিন রাখেন ৫-১০ টাকা। তার মানে প্রতিদিন লাভ প্রায় ৩০০ টাকার মতো। মাসে ৯ হাজার টাকা।
৬.ডিম/হাঁস বিক্রেতা:
অফিসের গাড়ির জন্য দাড়িয়ে আছি। সামনেই দেখি একজন হকার এক ঝুড়ি হাঁসের ডিম নিয়ে বসেছেন। তার ডালায় প্রচুর ডিম। জিজ্ঞেস করে জানলাম, তার বাড়ি উত্তরবঙ্গে। ঢাকার তেজগাও হতে ডিম কেনেন। প্রতিদিন গড়ে ৩০ ডজন হতে ৫০ ডজন ডিম কেনেন। দাম পড়ে ৭০/৭৫ টাকা ডজন। বিক্রী শেষে তার গড়ে লাভ থাকে ১০ টাকা ডজন, মানে প্রতিদিন তার লাভ ৩০০ হতে ৪০০ টাকা। মাসে আয় ১০ হাজার হতে ১৫ হাজার টাকা। মাঝে মধ্যে ডিমের সাথে হাঁসও বিক্রী করেন। বাড়তি লাভ।
৭.গার্মেন্টস কর্মী: কিউআই:
যদিও আসলে এটি খুবই কনভেনশনাল একটি পেশা। কিন্তু আমি এটিকে আমি এটিকে নন-কনভেনশনাল বলছি কেননা, এই দারুন একটি কার্যকর পেশায় আমাদের তথাকথিত শিক্ষিতদের আগ্রহ নেই। একজন এসএসসি হতে এইচএসসি পাশ ছেলে বা মেয়ে এই পেশায় প্রতিদিন ৮-১০ ঘন্টা শ্রম দিয়ে মাসে ওভারটাইমসহ ৯-১০ হাজার টাকা আয় করতে পারেন। তার চেয়েও বড় সুবিধা হল, যেসব ছেলেমেয়ে গ্রামে ডিগ্রী পড়াশোনা চালানোর সঙ্গতি নেই, তারা এই পদে কাজ করে তাদের পড়াশোনা দিব্যী চালিয়ে যেতে পারে। পরীক্ষার সময় হলে ছুটি নিয়ে বা জব ছেড়ে দিয়ে পরীক্ষা দিতে চলে যায়। পরীক্ষা শেষে আবার নতুন জবে ঢোকে। জব পেতে কোনো সমস্যাই হয় না। আমার দেখা, বহু ছেলেমেয়ে এভাবে তাদের গ্রাজুয়েশন করছে। চাইলে এই পেশা হতেই তারা পরবর্তিতে সিনিয়র পদেও যেতে পারে। এমনকি জিএম পর্যন্ত। গ্রামে অর্থাভাবে যেসব ছাত্রছাত্রীরা বিপদে পড়েছে, তারা এই পেশাটা অবলম্বন করতে পারে।
৮.মিন্তি:
ঢাকার যেকোনো বাজারেই আপনি মিন্তিদের দেখতে পাবেন। মিন্তি কোনো আলাদা বা নতুন পেশা না। ছোট ছোট বাচ্চারা (৭-১২ বছর বয়সী, অবশ্য এখন বড়রাও ওদের এই রুজিতে ভাগ বসিয়েছে।) পেটের টানে বা পরিবারের দায় টানতে বাজারে নিজের চেয়ে আকারে বড় ঝুড়ি নিয়ে যারা বেশি বাজার করেন, তাদের বাজার সওদা মাথায় বয়ে বেড়ায়, গাড়িতে তুলে দেয়। তাদের কোনো নির্দিষ্ট রেট নেই। তবে বাজারের অবস্থানভেদে তাদের দরদাম ওঠানামা করে। জীবনে একবারই আমি তাদের সাহায্য নিয়েছিলাম। সেটাও বাচ্চাটার বারংবার অনুরোধে। কারন,
প্রথমত, মিন্তি দিয়ে বয়ে নেবার মতো বাজার আমি করি না।
দ্বিতীয়ত, একটি শিশুকে স্রেফ টাকার জোরে শ্রম দেয়ানোর মতো কাজ করতে আমার বাঁধে।
মিরপুর ১ নম্বর বাজারে একজন শিশু মিন্তি গড়ে প্রতিদিন আয় করে ৩০০-৩৫০ টাকা। মাসে সেটা হয় ৭-৮ হাজার টাকা। সাধারনত অতি দরিদ্র বা অসহায় পরিবারের শিশুরাই মিন্তির কাজ করে। যদিও শিশুশ্রম দেশে নিষিদ্ধ। তবে হ্যা, সেটা শুধু গার্মেন্টস শিল্পে প্রযোজ্য বলে আমার কাছে দৃষ্ট হয়। বাকিদের জন্য সাতখুন মাফ। এমনকি শিশুশ্রম বন্ধ করতে যেসব এনজিও, সরকারী দপ্তর কাজ করে, তাদের কর্তারাও দিব্যি বাজারে মিন্তিকে কাজে লাগান। বাজারের ব্যাগ হাতে বয়ে বেড়ানোর মতো নিচু কাজ তারা পারেন না।
৯.বাইক রাইডার:
ঢাকাতে সবশেষ নন-কনভেনশনাল পেশার সংযোজন বোধহয় এটা। উবার ও পাঠাওসহ অনেকগুলো রাইড শেয়ারিং বিজনেস এসে পড়ায় নিজের বা ভাড়ার বাইক, গাড়ি দিয়ে কাউকে গন্তব্যে পৌছে দিয়ে আয় করার অভিনব বিজনেস কনসেপ্ট এই মুহূর্তে ঢাকার মাটি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তবে গাড়ি ও বাইকের রাইডারের আয়ের একটা বড় অংশ নিয়ে নেয় কোম্পানী। রাইডারের নিজের গাড়ি বা বাইক যদি থাকে আর সারাদিন যদি তিনি রাইড নিতে পারেন তবে আয় বেশি। তবে অনেকেই আছেন, অফিসে যেতে বা ফিরতে কিংবা ছুটির দিনে বাইক/কার রাইড সার্ভিস দিয়ে কিছু বাড়তি পয়সা আয় করার চেষ্টা করেন। এই পেশায় যারা পার্টটাইম, মানে অফিসে যাবার বা সেখান হতে ফেরার সময় একটা দুটো রাইড নেন, তাদের জন্য বড় লাভ হল, বাইক বা গাড়ির তেলের খরচটা উঠে যায়। আর যারা পারমানেন্টলী চালান, তাদের যদি নিজের গাড়ি থাকে আর নিজে চালান, তবে আয় একটু বেশি। অন্যদের জন্য ড্রাইভারকে বাড়তি পয়সা দিতে হয়। যাহোক, একজন পারমানেন্ট রাইডার দিনে মোটামুটি ২০-২৫ টি রাইডও পেতে পারেন। তার ন্যুনতম প্রতি রাইডে চার্জ ১৫০ টাকা হলেও দিনে মোট আয় ৩০০০ টাকা। তেলের খরচ ও ওভারহেডসহ অন্যান্য প্রযোজ্য কস্ট বাদ দিয়ে নেট লাভ থাকবে অন্তত ১০০০-১৫০০ (আনুমানিক, আমার কাছে পারফেক্ট তথ্য নেই।) গাড়ি সার্ভিস হলে আয় আরো বেশি। কারন ভাড়া বেশি।
১০.টিউশনি:
ঢাকার এমনকি মফস্বলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, কিন্তু টিউশনি করায়নি জীবনেও এমনটা আপনি খুব বিরল ঘটনা জানবেন। আমরা যখন একাডেমিতে ছিলাম তখন একজন টিউশনি মাস্টারের বেতন ন্যুনতম ১০০০ টাকা হতে রকমভেদে ৩০০০ টাকাও ছিল। আজকাল শুনি সেটা অনেক বেড়েছে। গ্রামে আমার ২ ভাগনিকে এক ম্যাম পড়ান। সপ্তাহে ৫ দিন। তার স্যালারিই ৩০০০ টাকা। যতটা জানতে পারলাম, বর্তমানে ঢাকায় বাংলা মিডিয়ামের ক্লাস ৪ থেকে এসএসসি পর্যন্ত পড়াতে একজন টিউশনি টিচারের মাসিক বেতন হতে পারে ৪,০০০ থেকে ৭,০০০ টাকা পর্যন্ত। ইংলিশ মিডিয়ামে সেটা ৮,০০০ থেকে ১৫,০০০ তক আছে। টিউশনির সম্মানি নির্ভর করে, বাচ্চা কোন ক্লাসের, সপ্তাহে কতদিন পড়াবে, কোন স্কুলের বাচ্চা, দিনের কোন সময়ে, কতগুলো সাবজেক্ট পড়াতে হবে এবং টিচার কোন বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবজেক্টে পড়েন-তার ওপর। [এই অংশটুকু লিখেছেন জনাব Biswas Istiak Tahmid]
১১.প্লাম্বিং:
জনাব রাজু আহমেদ।
বাসা: রাজশাহী।
বয়স=৩৮ (প্রায়)
পেশা: সেনেটারি মিস্ত্রী।
নিরক্ষর হওয়ায় নিজের নাম লিখতে জানেন না। প্রায় ১৫ বছর আগে একজন ৩০ টাকা দৈনিক লেবার হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। তারপর মিস্ত্রী হন। এখন বাসাবাড়ি কন্ট্রাক্ট নেন। বাড়ি যদি ১ তলা হয় তবে সেই বাড়ির যাবতীয় পানির লাইনের কাজ তিনি নিজে প্ল্যান করে করে থাকেন। মালামাল বাদে চার্জ করেন ৫০,০০০ টাকা। তার লেবার খরচ ৫,০০০ টাকার বেশী হয় না। বিল্ডিংভেদে কাজের দর ভিন্ন হয়। মাসে তিনি ২,৫০,০০০ টাকা আয় করেন। খরচ ২৫,০০০ টাকা।
১২.নরসুন্দর/নাপিত:
জামিলুর রহমান।
বাড়ি: রাজশাহী।
বয়স ৩৫ (প্রায়),
পেশা: নরসুন্দর বা নাপিত।
অত্যন্ত পরিশ্রমী ব্যক্তি। সকাল ৮ হতে রাত ১১ টা পর্যন্ত দোকান খোলা থাকে। মাঝে ১ ঘন্টা রেষ্ট নেন। হাতের কাজ খুব ভালো না হলেও দোকানে ভিড় লেগেই থাকে। চুল কাটা ৫০ টাকা, সেইভ করা ৩০ টাকা। সাথে গাভির দুধের ব্যবসা আছে। প্রতিদিন গড় আয় ২,০০০ টাকা। সে হিসেবে মাসে ৬০,০০০ টাকা। দোকান ভাড়া ও বিদ্যুৎ বিল বাবদ মাসিক খরচ ৩,৫০০ প্রায়। ল্যান্ড প্রোপার্টি বেশ কিছু করে ফেলেছেন।
১৩.অটো ড্রাইভিং:
এহতেশামুল হক। বাড়ি: রাজশাহী। বয়স ৩০ (প্রায়), পেশা: অটো ড্রাইভার।২০০৯ সালেএকটা অটো দিয়ে ব্যবসা শুরু করে আজ ২১ টি অটোর মালিক। নিজে অটো চালান এবং অটো ভাড়ায় খাটান। ২০ টি অটোর ভাড়া পান দৈনিক ৫৫০ x ২০ = ১১,০০০ টাকা। দৈনিক বিদ্যুৎ ও সার্ভিসিং খরচ ১৫০ x ২০ = ৩,০০০ টাকা। থাকে ৮,০০০ টাকা। মানে মাসিক ২,৪০,০০০ টাকা। শহরে ২ তলা বাড়ি করেছেন। [এই অংশটুকু লিখেছেন জনাব Md. Safiqul Islam]
১৪.হাউজ মেইড/বুয়া:
আমার বাসার কাজের খালার নেট ইনকাম ৬,০০০/- আনুষঙ্গিক আর ও ৬০০০/- টাকা পায় পরোক্ষ ভাবে যেমন-থাকা,খাওয়া,পরা ও চিকিৎসা বাবদ। ঢাকাতে ছুটা বুয়া নামে একটা কনসেপ্ট আছে। তারা স্থায়ী নন। দিনের নির্দিষ্ট সময়ে একটি বাসায় আসেন। বাসন ধোয়া, ঘর মোছা, কাপড় ধোয়া, রান্না করা-এই ৪ টি কাজ একেকটি ইউনিট। তার ১টি হতে ৪টি করেন বিভিন্ন বাসায়। প্রতিটি কাজ মাসের ২৬-২৮ দিন। প্রতি ইউনিট কাজের জন্য তাদের চার্জ ৫০০ থেকে ১২০০ (এলাকাভেদে)। বেশিরভাগ বুয়াই ২টির বেশি কাজ নেন না। তার মানে একটি বাসায় তার ২ ইউনিটের কাজে ২৬ দিনের সার্ভিসে তিনে পান কমপক্ষে ১০০০ টাকা। গড়ে তারা ৪-৬ টি বাসায় কাজ করে। দিনে শ্রম দেন ৫-৭ ঘন্টা। তাতে তার মাসিক আয় কমপক্ষে ৪০০০ থেকে ১০ হাজার টাকাও আছে। স্টান্ডার্ড একটি পার্ট টাইম জব। ঠিক এই কাজটিই আমরা আমেরিকা গিয়ে করি লেখাপড়ার খরচ বা প্রাথমিক সময়ে খরচ চালাতে। কিন্তু সেই আমরাই ঢাকাতে থেকে এই কাজ করলে থু থু দেবে লোকে। [এই অংশটুকু পাঠিয়েছেন জনাব Robiul Rubel Protik]
১৫.কাটিং মাস্টার:
রাজশাহীর একজন কাটিং মাস্টার (টেইলর) এর কথা জানি যার মাসে ইনকাম লাখ টাকার উপরে। তিনি কখনো কখনো স্টাইল ভেদে একটা শার্ট কাটিং করতে হাজার টাকাও নেন।[এই অংশটুকু লিখেছেন জনাব Saleh M. Arman]
১৬.ভেলপুরিওয়ালা:
আমাদের FBS-DU এর সামনে যে ভেলপুরিওয়ালা আছে সে প্রায় ১০-১১ বছর ধরে ওখানে সেল করে। ২০১০ এ আমি যখন বিবিএ লাস্ট সেমিস্টারে তখন তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তখন সে বলেছিল যে তার ডেইলি সেল প্রায় ৩,০০০ পিস। সে সকালে আনত প্রায় ২,০০০ পিস এবং সন্ধ্যায় সে আনত প্রায় ১,০০০ পিস। তখন সে ৩ টাকায় সেল করত, যেটা সে এখন ৫ টাকায় সেল করে। সে নিজেই এগুলা বানাতো। পার পিস কস্টিং কত সে তা না বললেও আনুমানিক ৬০-৭০ পয়সার বেশি হবে বলে মনে হয়না। এখন হিসাব করেন, তার প্রফিট কত। ৩ টাকাও যখন পিস ছিল, তখন নেট লাভ হত কমপক্ষে ২ টাকা x ৩,০০০ পিস = ৬০০০ টাকা প্রতিদিন। আমি ধরে নিলাম ওটা ৩,০০০ টাকা। মাসে ৯০,০০০ টাকা। যেই বিজনেস ফ্যাকাল্টির সামনে তিনি ভেলপুরি বিক্রী করেন, সেই ফ্যাকাল্টির একজন ছাত্র ওই টাকার মাসিক আয়ের ঘরে পৌছাতে সময় লাগবে কমপক্ষে ৪ বছর।
১৭.বিভিন্ন দোকান/কারখানার সহকারী:
ঢাকা শহরে যারা কাঁচা বাজারে যান, তারা দেখবেন, প্রতিটি মুদী দোকানেই একটি বাচ্চা ছেলে থাকে। ফুটফরমাস খাটে। জিনিসপত্র এগিয়ে দেয়, চা খাওয়ায়। তার মাসিক বেতন ২,৫০০ টাকা। প্রায়ই দেখবেন পেঁয়াজ, রসুন, আলুর দোকানদারকে সাহায্য করেন একজন মহিলা। কুলায় ঝেড়ে তিনি পেঁয়াজ, রসুন দোকানীর ঝুড়িতে দেন। ওই মহিলা এরকম ৭/৮টি দোকানে কাজ করেন। তার বেতন দিনঠিকা। প্রতিদিন দোকান প্রতি তিনি পান ৫০-১০০ টাকা। ৪টি দোকান হলেও পান কমপক্ষে ২০০ হতে ৪০০ টাকা। মাসে সেটা দাড়ায় ৫,০০০ থেকে ৯,০০০ টাকা।
১৮.টোকাই:
ঢাকায় পথচলতি প্রায়ই দেখবেন কিছু কমবয়সি বাচ্চা হতে কিশোররা একটা প্লাস্টিকের বস্তা কাঁধে করে প্লাস্টিক, কাগজ টোকায়। এরা সেই পথশিল্পী যাদের নিয়ে রনবী বিখ্যাত “টোকাই” কার্টুন করেছিলেন। নামটাও বোধহয় তার দেয়া। একজন টোকাই দিনে সংগ্রহ করতে পারে ৫ থেকে ১০ কেজি কাগজ, প্লাটিকের আবর্জনা। ভাঙ্গারীর দোকানে সেগুলো বিক্রী হয় কেজি প্রতি ১০ থেকে ১৫ টাকায়। তার মানে দিনে আয় ৫০ থেকে ১৫০ টাকা। এদের একটি অংশ সিটি কর্পোরেশনের ময়লা ফেলবার ডাম্পিং ইয়ার্ড হতে অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশেও বর্জ্য সংগ্রহ করে। যা খুবই বিপদজনক।
১৯.ময়লা নেবার লোক:
কলাবাগান লেক সার্কাস রোডে এই ধারনাটির জন্ম। এখানকার একজন উদ্ভাবনি মানুষের মাথায় এই সামাজিক উদ্যোগ (আজ ব্যবসা) এর কথাটি প্রথম আসে। সেখান থেকে আজ সারা ঢাকাসহ বড় বড় সব শহরে বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহের সার্ভিস আছে। সাধারনত এলাকার বাড়ি মালিকদের সমিতি বা ব্লক ভিত্তিক কমিউনিটি সমিতি এই সার্ভিস চালায়। কখনো কখনো ব্যক্তি উদ্যোগেও এই সার্ভিস দেবার ব্যবস্থা আছে। একটি গারবেজ নেবার গাড়িতে সাধারনত দু’জন লোক থাকে। বাসাপ্রতি মাসিক চার্জ নেয় ১০০ টাকা হতে ১৫০ টাকা (এলাকাভেদে)। সাধারনত তাদের কভারেজ ন্যুনতম ৫০ বাসা হতে ৬০ বাসা। তার মানে দাড়াল মাসে তাদের আয় কমপক্ষে ৫০ বাসা ও ১০০ টাকা = ৫,০০০ টাকা। অবশ্য সমিতি হলে তারা ওই টাকা পাবে না। তারা পাবে বেতন। সেটাও ওই টাকার কাছাকাছি। সাথে বাড়তি আয় আছে। কারন সংগৃহিত গারবেজের থেকে তারা বিক্রয়যোগ্য কাগজ, প্লাস্টিক, কাঁচ আলাদা করে পরে বিক্রী করে। তা হতেও একটা বাড়তি আয় থাকে তাদের। তবে খুবই রিস্কি কাজ এটি।
২০.দোকানের সেলসম্যান:
ইদের সময় আপনি যখন মার্কেটের পর মার্কেট ঘুরছেন, একটার পর একটা জামা কিনছেন, তখন আপনার হাতে রাত ১২ টার সময়ও হাসি মুখে কাপড়ের প্যাকেটটি তুলে দিচ্ছেন যে সেলসম্যান, তার মাসিক আয় কত জানেন? মাত্র ৪,০০০ টাকা হতে সর্বোচ্চ ,৮,০০০ টাকা। কি, অবাক হলেন? আমার নিজের সংগৃহিত তথ্য এটি। রোজা বাদে রোজ ডিউটি সকাল ১০ টা হতে রাত ৮টা, কোনো ব্রেক ছাড়া। তার মানে ১০ ঘন্টায় তারা আয় করে গড়ে ২০০ টাকা। অথচ তার সমান বা কম শিক্ষাগত যোগ্যতায় গার্মেন্টসের একজন QI মাসে আয় করে ৯-১০ হাজার টাকা। তার ছুটি আছে, ইনসুর্যান্স আছে, প্রভিডেন্ট ফান্ড আছে, অসুখ হলে ডাক্তার আছে, সরকারী ওয়েলফেয়ার ফান্ড আছে। তবুও মানুষ গার্মেন্টসে না গিয়ে ওই জব কেন করে জানি না।
২১.রিক্সাওয়ালা/বাস স্ট্যাফ:
রিক্সা চালানোকে নন-কনভেনশনাল পেশা বলা যায় না। স্রেফ একটি ভাল ইনকামের পেশা বলে এটিকে নিয়ে আমি বলছি। নিজের একটি রিক্সা প্রায় কারোরই নেই। তাই ভাড়ার রিক্সার ভিত্তিতে বলছি। একবেলা ও ডবল বেলা-দু’রকমভাবেই রিক্সাওয়ালারা রিক্সা চালান। একদিনে তাদের সর্বনিম্ন ট্রিপ হয় ১০০০ টাকা হতে ১৫০০ টাকা তক। রিক্সার জমা/ভাড়া বাবদ দিতে হয় গড়ে ১৫০ হতে ২০০ টাকা। অন্যান্য খরচ, ওভারহেড বাদ দিয়ে তার নেট ইনকাম প্রতিদিন ৭০০ টাকার মতো। মাসে গড়ে ১৮-২০ হাজার। কী? ভাবছেন, তারা তো তাহলে বড়লোক হয়ে যেত? না, এটি শুধু অঙ্কের হিসাব। বড়লোক তারা হয় না। তার অনেক কারন আছে। ঢাকার পাবলিক ট্রান্সপোর্টে যেসব বাস চলে, তার একজন ড্রাইভারের প্রতিদিনের ইনকাম গড়ে ১০০০ হতে ১,২০০ টাকা। ভাবতে পারেন, তবে তো সে বাড়ি গাড়ি করে একাকার করে ফেলেছে। না, তার কারন তারা মাসে ১৫ দিন ডিউটি করে। আর তাদের প্রচুর ন্যায্য ও অন্যায্য খরচ আছে।
২২. হাতিওয়ালা:
মিরপুরের রাস্তায়সহ ঢাকার রাস্তায় আস্ত হাতির দেখা পাওয়াটা খুব আজব, তাই না? কিন্তু আমি প্রায়ই এক হাতিকে দেখি। মাহুত পিঠে বসে পিচঢালা রাস্তায় হাতিকে নিয়ে টাকা তুলতে বেড়িয়েছে। একদিন তাকে থামালাম। জিজ্ঞেস করলাম হাল হকিকত। তার থেকে জানা গেল, একদিনে তার হাতি দোকান, বাড়ি, পথচারী হতে তুলতে পারে হাজার পাঁচেক টাকা। দিনে হাতির পেছনে খরচ হয় হাজার চারেক। সবমিলিয়ে দিনে তার লাভ থাকে হাজার খানেক। সবদিন হাতি রাস্তায় নামে না। আমার ধারনা তিনি মাসে অন্তত ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা কামাই করতে পারেন। তবে তিনি কীভাবে ঢাকাতে হাতি জোগাড় করলেন সেটা একটা রহস্য। হাতি ধরা বেআইনী হবার কথা।
২৩.প্যাটিসওলা:
স্থান: ঢাকার লোকাল বাস;
কাল: অদ্য সন্ধ্যা;
পাত্রপাত্রী: আমি, নিটোল ও জনৈক প্যাটিসওলা;
দর্শক: লোকাল বাসের আমজনতা;
ঘটনাক্রম: আজ সন্ধ্যায় গিন্নী নিটোলকে নিয়ে গিয়েছি আসাদগেট। জরুরী একটা কাজে। ফেরার সময় বৃষ্টি। কোনমতে দৌড়ে মিয়া বিবি উঠে পড়ি একটা লোকাল বাসে। কায়ক্লেশে দুটো সিট ম্যানেজ হওয়ায় খোদাকে ধন্যবাদ দিই। একটু থিতু হয়ে বসার পরে সামনে খেয়াল করে দেখি একজন প্যাটিসওয়ালা তার বক্স নিয়ে বসেছেন। বাঙালী মাত্রই সহযাত্রীর সাথে খোশ আলাপে মজে। আমি এমনিতেই মানুষের পেশা নিয়ে সবসময় আগ্রহী। প্যাটিসওয়ালার সাথে আলাপ জমাতে তার কাছে তার কাজের খোঁজখবর নিলাম। যা জানলাম তাতে শ্রদ্ধা আর সমীহবোধ জাগল মানুষের ঐকান্তিকতা, চেষ্টা, অধ্যবসায়, শ্রম ও সততার প্রতি।
ভদ্রলোক (প্যাটিসওলাদের কেউ ভদ্রলোক বলেন না বোধহয়) প্রতিদিন দারুস সালাম কারখানা হতে মালিকের কাছ থেকে এক টিন প্যাটিস কেনেন। টিনে ধরে ২০০ পিস। ১০-১৫-২০ টাকা-তিন রকমের প্যাটিস থাকে। তার মানে কমপক্ষে ২০০ পিস/২০০০ টাকার প্যাটিস তিনি বিক্রি করেন। প্রায় সবদিনই বিক্রী হয়ে যায়। যতটা তিনি বললেন, তাতে জানলাম ১০ টাকার প্যাটিস তিনি কেনেন ৩-৪ টাকা করে মালিকের কাছ থেকে। বাকিটা তার। তার মানে প্রতিদিন ২০০ পিস বিক্রী করলে তার মার্জিন থাকে ৭ X ২০০ = ১৪০০ যেটা তার নিজের। তার থেকে বাদ যাবে তার যাতায়াত খরচ আর দুপুরের/বিকেলের খাওয়া দাওয়া, চা, পানি, সিগারেট, পান ইত্যাদি। যাহোক, ধরে নেয়া যায় প্রতিদিন কমপক্ষে তার নেট মুনাফা ১,২০০ কমপক্ষে। আর তিনি মাসে ২৫ দিন কাজ করেন। মানে দাড়াল, তার মাসে ন্যুনতম আয় ৩০,০০০ টাকা যেটা আসলে ৩৫-৪০ হাজার হবে। কারন বেশি দামের প্যাটিসও থাকে। ভদ্রলোককে আমি জিজ্ঞেস করি, তিনি গ্রাম হতে এসে এই বুদ্ধি বা সুযোগ কীভাবে পেলেন। তিনি হেসে জবাব দেন, “ঠ্যাকা ভাইজান, ঠ্যাকা।”
আমিও তাই ভাবি। ঠ্যাকা মানুষকে কতকিছু করতে শেখায়। কত কী ভাবতে, আবিষ্কার করায়। তা না হলে একজন অশিক্ষিত মানুষ, শহরে এসে নিজের মতো করে স্বাধীন ব্যবসা করছেন। আর আমরা বিএ/এমএ পাশ করে চাকরীর পেছনে হত্যে দিয়ে মরি। কোট টাই পড়া চাকরীর পেছনে ঘুরে মরি, সারাজীবন কেঁচোর মতো বাঁচি। অথচ এইসব অশিক্ষিত অথচ উদ্যমী উদ্যোগী মানুষেরা নিজের চেষ্টায় নিজের স্বাধীন পেশা বেছে দারুনভাবে জীবন চালাচ্ছেন। আয় রোজগারও বেশি। একজন এম এ পাশ মানুষ বর্তমান বাংলাদেশে খুব ব্যাতিক্রমী কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া শুরুতে অনেকদিন ওই আয়ের ধারেকাছেও বেতন পান না।
তাই বলে ভাববেন না, আমি পড়াশোনাকে অনুৎসাহিত করছি। আমি পেশার ডাইভারসিফিকেশন ও যেকোনো পেশাকে সম্মান ও সুযোগ হিসেবে নেবার বিষয়টাকে দেখাচ্ছি। এটাকে সুসংবাদ বা দুঃসংবাদ যেভাবেই নিন নিতে পারেন। খবরটা হল, বাংলাদেশে প্রথাগত বা কনভেনশনাল চাকরীর থেকে, অপ্রচলিত বা ননকনভেনশনাল কাজের আনুপাতিক নেট ইনকাম দিন দিন বাড়ছে। অনেকক্ষেত্রে তা বেশিও। বিসিএস বা ’মুল্টিন্যাশনালের’ কেরানী হবার স্বপ্ন না দেখে নিজের কিছু একটা করার স্বপ্ন দেখতে শুরু করুক আমার দেশের গ্রাজুয়েটরা-সেই কামনা করি।
#careerplanning #nonconventionalcareer #uncommon #income #struggle #oddjob #bluecollarjob #survivaltechnique