ভদ্র ভাষায় কথাটিকে ‘নিরাসক্তি’ বললেও খাস বাংলায় সেটাকে ঠিক কী বলে জানা নেই। ধরে নিলাম, শব্দটা ‘উদাস’ কিংবা বরিশালের ভাষায় ‘ল্যাচাওঁদা’ হবে।
নিজ বংশ, নাম, কাম কিংবা প্রতিষ্ঠান নিয়ে কখনো ইজম/হাউশ/উচ্ছাস/হামবড়াই না থাকলেও, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া নিয়ে আমার বিশেষ একটি আবেগ তো রয়েছেই। বিশেষ করে যখন আমার কৃষক পূর্ব পুরুষ কিংবা উত্তর পুরুষের কেউ কখনো ওই ‘প্রাচ্যের অক্স-ফোর্ডে’ যায়নি, তখন সেই ১৯৯৮ সালে মফস্বলের একটি অর্বাচীন বালকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়াটা স্বপ্নের মতোই ছিল।
হ্যা, আমরা যারা বিটিভিতে কলা ভবনের সামনের অপারাজেয় বাঙলাকে দেখে বড় হয়েছি, তাদের কাছে এ এক স্বপ্নই। যদিও, আমি মনে করি না, যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে হিসেবে আমার বিশ্ববিদ্যালয় জগত সেরা। আর, আমার জীবনে এখানকার একাডেমিক কার্যক্রমের চেয়ে একাডেমিক ফাদারহুড/মাদারহুড এবং আরও কিছু বিষয় বেশি ভূমিকা রেখেছে।
শুনে মজা পাবেন, যে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের নিয়ে একটি মজার কৌতুক চালু আছে-লাঞ্চের পরে আসেন। এই ‘লাঞ্চের পরে আসেন’দের জের আমি এখনো টানছি। কীভাবে-সেটি না হয় না’ই বললাম। ঠাকুর বেজার হবে।
তবে শুনেছি, এলন মাস্ক টুইটার কেনার আগে ঢা.বি কিনতে রেজিষ্ট্রার বিল্ডিংয়ে গিয়েছিলেন কথা বলার জন্য। কর্মচারীরা তাকে দেখেও বলেছিল, “লাঞ্চের পরে আসেন।” আর তাতেই তার ঢা.বি কেনার সখ মরে যায়। ঢা. বি. শুধু না, সমাবর্তনের ছবি দেখলে অজান্তেই একটা হিংসা মনে জাগে। দুঃখিত সে জন্য।
বহু কষ্টে, বহু সংগ্রাম করে, রক্ত পানি করে টাকা আয় করে পয়সা পয়সা হিসেব করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি ডিগ্রী হাসিল করতে পেরেছিলাম। কিন্তু সেই বহু সংগ্রামের ফসলের কেতাবী ও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি সমাবর্তনে গিয়ে নিতে পারিনি। কারন হল, পরিবারের কষ্টার্জিত অর্থে ভাগ বসিয়ে, বহু কষ্টে পয়সা কামিয়ে নিজের ডিগ্রী নিজে নিয়েছি। তার অর্থ জোগান করতেই প্রানান্ত হয়েছি। তার ফসলকে আরেক দফা পয়সা খরচ (সমাবর্তন রেজিষ্টেশন চার্জ) করে আনতে হলে অন্য বাজেটে টান পড়ে। কষ্টেসৃষ্টে কোনোমতে টেনেটুনে পাশ করতে পারলেও কনভোকেশনে কালো জুব্বা/বোরকা আর চারকোণা হ্যাট পড়তে হলে বিশ্ববিদ্যালয়কে যে বড় অঙ্কের গুনাগারি দিতে হয়-সেটি শাকের ওপর বোঝার আঁটি। সেই অভিমানে এবং টাকা যোগাড় করতে না পারায় কখনো কনভোকেশনে যাইনি। তদুপরি, ৫টি বছরের সবরকম দাবীকৃত অর্থ পরিশোধ করে ডিগ্রী নেবার পরে তার স্বীকৃতি সনদ কেন আবার চাঁদা দিয়ে নিতে হবে-তার ব্যাখ্যাও জানতাম না বিধায় সমাবর্তন চাঁদা দিয়ে সনদ নিতেও চাইনি। সমাবর্তনের জন্য ছাত্ররা কেন চাঁদা দেবে, আমি তা জানি না। ইউনিভার্সিটি তার জবাব দেবে না। আর যারা পয়সা দিয়ে সনদটি নেন, তাদেরও এত উদগ্রীব হবার কারন জানি না।
আবার চাঁদা দেয়া সবাইকে সনদ ওই অনুষ্ঠানে দেয়ওনা। শুধু কালো বোরকা পড়ে মাঠে যাবার জন্য বড় মাপের চাঁদা। বাহ। বিশ্ববিদ্যালয় কি এত গরিব? না। মোটেও না। ক্যাম্পাসে গেলাম গত হপ্তায়। ২০০৬ এ হল ছাড়ার পরে অন্তত ২০ টি বিশাল টাওয়ার হয়েছে। কর্মকর্তা, শিক্ষক, কর্মচারিদের থাকার জন্য। কেন দাদা? কর্মীদের আবাসনের দায়ীত্ব নিতে কবে হতে বিশ্ববিদ্যালয় সাংবিধানিক দায়ীত্ব হিসেবে নিল? যে বিশ্ববিদ্যালয় তার মূল কাজ শিক্ষা ও অবশ্যই গবেষনায় টাকা দেবার মতো সমর্থ না, সে কেন তাহলে কর্মীদের আবাসনের জন্য এত উদার? যাহোক, তাই সমাবর্তনের গাউন কখনো গায়ে চড়েনি। আজও আমি তাই প্রোভিশনাল নামের সান্তনা সার্টিফিকেটের গর্বিত ও তৃপ্ত ঢা. বি. স্নাতক। কনভোকেশনের টাকা না দিলে নাকি কখনো ‘অরজিনাল’ সনদ দেবে না। রাগ করে পেশায় ১৬ বছর পার করে দিলাম। ’অরজিনিয়াল’ ছাড়াই। এবং পণ করেছিলাম, সনদ চাইবে-এমন চাকরি করব না। এখনও সেই জিদ পূরণ করে যেতে পারছি-খোদাকে ধন্যবাদ।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুমূল্য কনভোকেশন হল। কালো বোরকা আর হ্যাট পরিহিত তরুণ, বৃদ্ধদের দেখে যে বুকটায় সামান্য হাহাকার হয়নি-তা বলব না। তবে আমার একজন টাটকা ’কনভোকেটেড’ টিমমেট আমাকে জানালেন, তাদের পয়সায় কেনা বোরকা নাকি ফেরত দিয়ে আসতে হয়। তা না হলে ‘সনদ’ মেলে না। বাহ! ভেবেছিলাম,যারা কনভোকেটেড হলেন, তাদের বোরকাটা চেয়ে নিয়ে পরে একটা ছবি তুলব। চতুর ঢা.বি কর্মকর্তা ও ডিসিশনমেকাররা ভালই রাস্তা করেছেন, যাতে কেউ মাগনা কনভোকেশনের স্বাদ না পেতে পারে।
এত অসঙ্গতি সত্তেও এখনও আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ অংশটুকুকে দেখতে ছুটে ছুটে যাই। এখনও মোহাসিন হলকে নিজের ঘর মনে হয়। মনে পড়ে, একবার বড় পর্দায় বিশ্বকাপ ফুটবল (সম্ভবত ২০০২) দেখতে রাত ২ টায় টি.এস.সি গিয়েছিলাম। খেলা শেষে গভীর রাতে পায়ে হেঁটে হলে ফেরা-ভয়ভীতি, চিন্তাহীন সেই জীবন আর কখনো পাবার নয়।
মাত্রই একটি ধুন্দুমার বিশ্বকাপ গেল। আবার ফুটবল বিশ্বকাপ এসেছে। বলছিলাম নিরাসক্তির কথা। আজ রাতে যে দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ শুরু হচ্ছে, তা নিয়ে কেন যেন আসক্তি, আকর্ষণ, টান অনুভব করি না। রাত জেগে খেলা দেখবার কোনোই সম্ভাবনা নেই। কারো সমর্থকও না। জার্সি উদ্দামও নেই। কে কাপ নিল, কে হারল, কে ক’বার পেপসি খেলো, কে হাত দিয়ে ঢোল বাজালো না গোল দিল-আমি আগ্রহ বোধ করি না।
হ্যা, ১৬ই ডিসেম্বরে বা ২৬ মার্চে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ওড়ানোর ধুম চোখে না পড়া সত্তেও যখন বিশ্বকাপের প্রিয় দলের পতাকা বা জার্সি পরবার হিড়িক দেখি, তখন বুকটাতে সামান্য ব্যথা করে।
এই লেখার জন্ম গাড়িতে যেতে যেতে। টাটকা। একে সমাবর্তন নোটও বলতে পারেন, আবার বিশ্বকাপ ফুটবল জ্বরের প্রলাপও। লিংকডইনকে ফেসবুকে রুপান্তর করা বাঙালিদের এক প্রতিনিধি পোস্ট দিয়েছেন, কাতার সরকার ড. জাকির নায়েককে কাতারে নিয়ে গেছেন, আগত অতিথি ও দর্শকদের মধ্যে ‘ধর্ম’ প্রচার করতে। একই সাথে, কাতার নাকি এই উৎসবের সুযোগে তাদের দেয়ালে দেয়ালে ধর্ম প্রচার করছে। সাধু সাধু।
যদিও কাতারই আবার কেন মিজ. নোরা ফাতহি এবং মিজ. শাকিরাকে বিশ্বকাপ উদ্বোধনীতে নাচাবে-তা আমার বোধগম্য হয় না। আর বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য কাতার কী পরিমান ঘুষ দিয়েছে, কত দূর্নীতি করেছে, আর কত পরিমানে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে-তার হিসাব চাওয়ার আমি কোন ক্যবলা? কোনো নির্দিষ্ট দলের সমর্থক না হলেও আমি প্রত্যাশা করি, বিশ্বকাপটি এবার মেসি কিংবা রোনালদোর হাতে উঠুক। ফুটবলকে তারা যতটা দিয়েছেন, তার বিনিময়ে এই পূর্ণতা প্রাপ্তির আশা খুব বড় প্রত্যাশা নয়।
#indifferent #apathetic #UniversityOfDhaka #convocation #certificate #worldcupfootball #original #provisional #ambiguity