আমরা জানি না, আমরা বুঝি না: কীভাবে জানব? কীভাবে শিখব?
পৃথিবীতে মানুষ চার রকম হতে পারে-
যে জানে, যে, সে জানে।
যে জানে, যে, সে জানে না।
যে জানে না, যে, সে জানে।
যে জানে না, যে, সে জানে না।
তুমি কোন দলে? **বাণীসমূহ মি. রেজভির নিকট হতে শ্রুত।
মানুষের কথা বুঝতে এবং মানুষকে আমার কথা বোঝাতে খুব সমস্যায় পড়ি।
রিফ্লেক্স সীমাবদ্ধতা ও আরও কিছু কারণে অন্যের কথা বুঝতে সমস্যা হয়।-সেটা তো আমার জানাই আছে, আর সেজন্য যা করতে হবে, তা করতে পারি। সেটা হল, তাকে আমার মতো করে বলানো, বা আমি যেমন করে শুনতে চাই, সেভাবে তাকে বলানো। স্বল্পগতির রিফ্লেক্স এবং নিজস্ব ছকে কথা শুনলে সেটি না বোঝার কারণেই, আমি ক্লাসরুম, লেকচার সেশন, টেক্সট বুক হতে খুব বেশি শিখতে পারি না। একইভাবে দলগত ইভেন্ট বা লারনিং সেশন হতে বেশি উপকৃত হতে পারি না।
শিক্ষকরা, ট্রেইনাররা তাদের মতো করে লেকচার দিয়ে যান, কিন্তু, আমি তা হতে ধরতে পারি কম। কারন সেটাই, আমাকে শিখতে বা বুঝতে হলে আমার মতো করে আমার ব্রেইনকে তথ্য দিতে হবে। আমার শিখবার পদ্ধতি অনুসরন করে ধাপে ধাপে প্রশ্ন করে বিষয়টি আত্মস্থ করতে হবে-যা ক্লাসরুমে, লেকচার সেশনে সম্ভব না। ক্লাসরুমে শিখতে পারতামনা ছোটবেলা হতেই। ফলে, আজীবন ক্লাস ছিল আমার বিতৃষ্ণার ও ভীতির স্থান। শুনে মজা পাবেন যে, আমি ক্লাস এইট শেষ করবার পরে পোস্ট গ্রাজুয়েশন শেষ করা তক প্রায় কখনোই ক্লাসে যাইনি। মানে, স্কুল পলাতক, কলেজ পলাতক, বিশ্ববিদ্যালয় পলাতক। ডিসকলেজিয়েট হবার ঝুঁকিতে যে কতবার পড়েছি-তার ঠিক নেই।
কিন্তু, সমস্যা আরও বড় হয়ে যায়, অন্যরা যখন আমার কথা বোঝে না। সমস্যার সবচেয়ে বড় কারন হল, তারা যে বোঝেনি, সেটাই তো বুঝি না। তারাও বুঝায় না। কেবল মাথা নাড়ে, যে, সব বুঝেছে। পরে গিয়ে দেখি, মূল কথার কিছুই বোঝেনি। বহুবার দেখেছি, জুনিয়রদের বা অন্য কাউকে সময় নিয়ে কিছু বলেছি, তারাও মাথা ওপর নিচ করে গেছেন। অতঃপর, সময় হলে দেখি, মূল আলোচ্য বা নির্দেশনার কিছুই আসলে বোঝেননি। চেয়েছি মূলা, নিয়ে এসেছেন চুলা। অনেকটা হাঁস ও বাঁশের মতো।
প্রতিটি বছর শুরুর সময়ে আমি নিজের জন্য নিজের একটি উপদেশনামা লিখি। ২০২৩ সালের উপদেশমালায় এটাও আছে, ওয়ালিদ, মারফতি কথা ছাড়ো, সোজা ভাষায় কথা বলবার অভ্যাস করো।
আসলেই এই বিড়ম্বনায় পড়ি। একটা বিষয় নিয়ে শ্রোতার সাথে কথা বলি। জুনিয়রদের নির্দেশনা দিই। দিনশেষে দেখি, সে কিছুই বোঝেনি। এমন নয়, যে আমি সবসময় অতি উচ্চমার্গীয় ভাষায় অতি ইনটেলেকচুয়াল বিষয়ে কথা বলি। আমার কাছে লাগে, আমি তুচ্ছ বিষয় নিয়ে অতি তুচ্ছ কথাই বলি। কিন্তু, তারপরও শ্রোতারা কেন যে বোঝেন না, জানি না।
একই জিনিস হয় লেখার ক্ষেত্রে। অনলাইনে লেখালেখি নিয়ে ঝামেলাই হয়। পাঠকরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লেখার থীম ও মেসেজ ধরতে পারেন না। ফলে অপ্রাসঙ্গিক সমালোচনা, প্রশ্ন, শ্লেষ সহ্য করতে হয়।
কথা না বোঝা আর কথা বিকৃত করতে বাঙালি সিদ্ধহস্ত ও বিখ্যাত। তারপরও এটার ধরন বোঝাতে এই গল্পটি পড়তে পারেন-
A King enrolled his donkey in a race & won.
Local newspaper read: ‘KING’s ASS WON’
The kingwas so upset with this kind of publicity that he gave the donkey to the queen.
The local paper then read: “QUEEN HAS THE BEST ASS IN TOWN.”
The king fainted….
Queen sold the donkey to a farmer for 10$.
Next day paper read: “QUEEN SELLS HER ASS FOR $10.”
The queen fainted…
The next day king ordered the queen to buy back the donkey and leave it in jungle.
The Next Headlines: “QUEEN ANNOUNCES HER ASS IS FREE & WILD.”
The king died… !!
এমনিতে, বাংলাদেশে আপনি কাউকে ডেকে আনতে বললেন, দেখবেন, আপনি যদি হ্যাডোমিক কেউ হন, তাকে থাপড়াতে থাপড়াতে নিয়ে আসবে।
আমাকে যখন কেউ কল করে ক্যরিয়ার বা অন্য পেশাগত প্রয়োজনে কিছু বলেন, তাকে সবার আগে আমি বলি, আপনি কেন বা কী পেতে আমাকে কল করেছেন-সেটি আগে ১ লাইনে বলুন। কারন, তিনি কেন ও কী দেবার জন্য আপনার হতে শুনছেন-সেটি জানা থাকলে তিনিই আপনাকে ডিরেক্ট করবেন, যে, আপনি কী বলবেন, বা বলতে হবে, আর কী বলবেন না, বা বলবার দরকার নেই।
অনেকেই আমার কাছে কাউন্সেলিংয়ের জন্য এপ্রোচ করেন। তাদের সাথে যখন কথা শুরু করি, তারা আমার কাছে ঠিক কী চান, বা কী জানতে চান-দেখা যায়, তা স্পষ্ট করে নিজেও জানেন না; বা, জানলেও সেটি বোঝাতে পারেন না। আর, তখন আমিই বারংবার নিজস্ব ধরনে প্রশ্ন করে করে যখন সেটা বের করি, তখন তিনি হড়বড় করে দরকারী, অদরকারী সব কথা, তথ্য দিতে শুরু করেন। ফলাফল, তাকে বলবার কিছুই মাথায় আসে না।
তারপর তাকে থামিয়ে, আমার গোড়া হতে শুরু করতে হয়। এবং, ঠিক যা আমার জানা দরকার, সেটা জেনে তারপর তাকে কিছু দিতে হয়।
কারো কাছ হতে কিছু জানতে হলে, বা, কাউকে কিছু বলাতে হলে, সবার আগে আপনি নিজের জিজ্ঞাসা সুস্পষ্টভাবে ঠিক করে নিন আর তাকে সেভাবেই বলুন, যে, আপনি তার কাছে ঠিক কী চান। আর তারপর আপনি কিছু বলার আগে তাকেই ঠিক করতে দিন, আপনাকে ওটা বলার বা বোঝানোর জন্য তার ঠিক কী কী দরকার বা কোন কোন তথ্য জানা দরকার। উনি যা বা যতটা জানতে চান, তাকে ঠিক সেটা ও ততটাই জানান।
ওনার চাওয়া ছাড়া হড়বড় করে আপনার বলা অপ্রয়োজনীয় হাজারো কথা ও তথ্য দিয়ে তার মাথাটা ভরে দিয়ে আলটিমেটলি আপনি কিছুই পাবেন না তার কাছ হতে। ভাল কমিউনিকেশন এবং সফল কমিউকেশনের টোটকা এটা। যখন কোনো সুনির্ধারিত ও পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্য নিয়ে কাউকে ফোন করবেন, তখন প্রাথমিক সম্ভাষণগুলো যথাসম্ভব পেশাদার, স্মার্ট ও সংক্ষিপ্ত করে, তারপর প্রথমেই আপনি তার কাছ হতে এক্স্যাক্টলি কী পেতে চান, বা কী পাবার জন্য তাকে কল করেছেন-সেটি তাকে জানান।
আপনার কাঙ্খিত ফিডব্যাক আপনাকে দেবার জন্য তার কী কী তথ্য দরকার-সেটি না জেনে আগেই তার জন্য অপ্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে তার মাথা ভরে দিলে আপনার ও তার-কারোরই কার্যসিদ্ধি হবে না।
পৃথিবীতে ভাল বক্তা প্রচুর আছে। কিন্তু ভাল শ্রোতার সংখ্যা খুবই বিরল। আজকের দিনে কথা শোনার চেয়ে বলার দিকে মানুষের ঝোক বেশী। আমরা বলব কম, শুনব বেশী। আমার কথাটি যেকোনো মুল্যে শুনিয়ে দেবার মধ্যে কোনো ক্রেডিট নেই। অন্য একজন যখন কিছু বলছেন বা কোনো বিষয় নিয়ে বলছেন, তখন আমি চুপ করে শুনব। অনেকেই অন্যের কথার মধ্যে কথা বলে বসেন বা একটি বিষয়ের কথার মধ্যে অন্য বিষয়ের কথার অবতারনা করেন। এতে কোনো ইস্যুরই সমাধান ভালভাবে হয় না।
একটি একটি বিষয় নিয়ে কথা বললে অন্তত কিছু বিষয় সমাধান হয়। ভাবতে শেখা, ভাববার সক্ষমতা থাকা, ভাবনার মানসিকতা- গুরুত্বপূর্ণ একটি যোগ্যতা। ঠিক একইভাবে শুনতে শেখা, শুনবার মতো আগ্রহ থাকা এবং ভাল শ্রোতা হওয়াও একধরনের যোগ্যতার বিষয়। একটি বড় সংখ্যক মানুষের এই দুটি থাকে না।
ভাল শ্রোতা না হওয়াতে, এবং, ভাল করে না শোনাতে কী বিপত্তি হতে পারে-তার একটা ক্লাসিক উদাহরণ হতে পারে এই শোনা গল্পগুলো: –
১. খুক খুক কেশো না:
১৭৯৯ সালে নেপোলিয়ন মধ্যপ্রাচ্যে একটা যুদ্ধক্ষেত্রে ছিলেন। একদিন তার সেনাদলের একজন বড় ব্যক্তি এসে তাকে ১২০০ যুদ্ধবন্দী তুর্কীর বিষয়ে তার আদেশ জানতে চাইলেন। নেপোলিয়ন মুক্তি দেবার আদেশ দিতে চাইলেন। কিন্তু ঠিক আদেশটি দেবার মুহুর্তে তিনি প্রচন্ডভাবে কাশতে শুরু করলেন। তিনি খুব বিরক্ত হলেন এবং বিরক্তিভরে বলে উঠলেন “মা সাকরি তাকস” যার অর্থ হল কি বিরক্তিকর কাশি। কিন্তু নেপোলিয়ানের কাশির কারণে তার অনুচর সেটাকে শুনলেন “মা সাকরি তাওস” যার অর্থ দাড়ায় ওদের সবাইকে হত্যা কর। সেই ১২০০ বন্দীকে সাথে সাথে হত্যা করা হয়।
২. কার পাপে কে মরে:
কাশেম মতিঝিলের একটা আন্ডার কনসট্রাকশন টাওয়ারের ৮৫ তলার ওপর লেবারের কাজ করছিল। হঠাৎ করে তার সহকর্মী ছুটে এসে বলল, কাশেম, তোমার বউ জমিলা মারা গেছে। এই কথা শুনেই কাশেম দ্রুত পৌছানোর জন্য ৮৫ তলা হতে নিচে ঝাঁপ দিল। নিচে পড়তে পড়তে যখন ৬৫ তলার কাছে, তখন তার মনে হল, আরেহ, আমার বউয়ের নাম তো জমিলা না। কিছু করার নেই, সে পড়তে থাকল। পড়তে পড়তে ৫০ তলার কাছাকাছি এসে তার মনে পড়ল, আরেহ, আমি তো বিয়েই করিনি। জমিলা আসবে কোত্থেকে? কিচ্ছু করার নেই, সে পড়তেই থাকল। ২৫ তলা বরাবর এসে তার হঠাৎ মনে পড়ল, আরে শালা, আমার নাম তো কাশেমই না। আমি কেন লাফ দিলাম? কিছু করবার নেই। কাশেমের বউ জমিলার মৃত্যুতে ৮৫ তলা হতে ঝাঁপ দিয়ে মফিজ জান দিল। অ্যাটেনশন টু ডিটেল নিয়ে এক ভদ্রলোকের আক্ষেপের প্রেক্ষিতে শোনা গল্পটি প্রথম লিপিবদ্ধ করি।
৩. শাপে বর:
আমার বাপের বাড়ি বাগেরহাটে একটা এলাকা আছে, যাত্রাপুর। গল্পটা যাত্রাপুরের। বহু আগে সেই যাত্রাপুরের ওপর দিয়ে বাগেরহাট-খুলনা ট্রেন লাইন নির্মানের তোড়জোড় শুরু হল। জমি মাপজোক হচ্ছে। এক বুড়ির বাড়ি পড়েছে একোয়ারের ভিতর। তো ক্ষতিপূরণের হিসাব নিকাশ করতে সার্ভেয়ার তার কাছে জিজ্ঞেস করল, তা বুড়ি, তোমার জমিতে ঘর আছে? বুড়ি বলল, আছে। কী রকম ঘর? বুড়ি বলতে গেল, “দো চালা”-মানে শন দিয়ে ছাওয়া দুই চালের কাঁচা ঘর। বুড়ির দাঁত নেই।
তার ফোকলা মুখে বলা সেই “দো-চালা”কে সার্ভেয়ার শুনল “দো-তলা”। সেটাই সে টুকে নিয়ে গেল। ক্ষতিপুরণ পাবার দিন বুড়ি তার সেই ‘দো-চালা” কাঁচা ঘরের ক্ষতিপুরণ পেল ‘দো-তলা” পাকা ঘরের।
শান এ বয়ান: আদেশ দান, তা শোনা ও সেটা তামিল করার ক্ষেত্রে আামাদের সতর্ক হওয়া উচিত। আজকের দিনে কথা শোনার চেয়ে বলার দিকে মানুষের ঝোক বেশী। পৃথিবীতে বিখ্যাত বক্তা প্রচুর আছেন। তবে বিখ্যাত শ্রোতা এজন্য খুবই বিরল।
৪. নামে নামে, জমেরে টানে:
আমাদের বাগেরহাট মাজার এলাকায় একজন সাধারন মানুষ ছিলেন যার নাম ইরান। আমরা ইরান ভাই বলতাম। তো তিনি চকবাজার হতে নানান রকম আতর, তসবি, জায়নামাজ ও অন্যান্য জিনিস কিনে বাগেরহাটে মাজারের দোকানগুলোতে পাইকারি বিক্রি করতেন। চতুর দোকানদাররা জিনিস বেচার সময় কাষ্টমার আকর্ষন করার জন্য ডাকত, “নিয়ে যান ভাই, ইরানের তসবিহ, ইরানের জায়নামাজ”……. লোকজনও ভাবত তাইতো “ইরানের” তসবিহ…..আসলেওতো ইরানের তসবিহ। ইরানের তসবি ভেবে ব্যপক বিক্রি। এখন বলেন এই দুই নাম্বারিতে ইরান ভাইর দোষটা কোথায়? এইবার বলেন আমার অজ্ঞাতে যদি কেউ আমার নামে তাবিজ বেঁচে বেড়ায় তাহলে আমার কি করার আছে?
৫. এই, শুনো না:
একবার ব্যাঙেদের একটা প্রতিযোগীতা হচ্ছিল একটা উঁচু গাছের ওপরে ওঠার। কোনো ব্যাঙ সাহস করল না। একটা বধির ব্যাঙ সামনে এলো। সে গাছটিতে উঠতে গেল। সাইড থেকে বাকি ব্যাঙেরা চিৎকার করে তাকে না না করল। টিককারী দিল, অনুৎসাহ দিল, ঢং বলে গালি দিল, কানা বোবা কালা বলে গালি দিল, ধান্দাবাজ বলে টিটকারী দিল, জিতলে সব পুরষ্কারে ভাগ দিতে হবে-এই হুমকী দিল, তারে কে এই দায়ীত্ব দিয়েছে-সেই অধিকারের প্রশ্ন করল, কে তাকে ফান্ডিং করল-সেই প্রশ্ন করল, অন্য সুস্থ্য ব্যাঙেরা বাদ দিয়ে সে কেন-সেই শ্লেষ জানালো ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু সব মোকাবেলা করে সেই বধির ব্যাঙটি গাছের মগডালে ঠিকই উঠে গেল। জেতার পর ওই ব্যাঙেরাই তাকে মাথায় নিয়ে নাচতে লাগল। একজন সাংবাদিক তার ইন্টারভিউ নিল। তাকে জিজ্ঞেস করল, সে কীভাবে সফল ও জয়ী হল। জবাবে সে বলল, “আসলে আমি বধির তো। আমি যখন উঠতে শুরু করি তখন পাশে থেকে সবাই চিৎকার করছিল। আমি তাদের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু তাদের মুখের ব্যবহার দেখে মনে করছিলাম, তারা আমাকে তীব্রভাবে উৎসাহ দিচ্ছে। সেই উৎসাহই আমাকে উপরে উঠতে সাহায্য করেছে।”
৬. অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্কর:
একবার এক কাঠমোল্লা গ্রামের কোনো একটা মক্তব ভেঙে বানানোর সময় তার জঞ্জালের মধ্যে একটা পুরোনো কেতাব পেলো যার বেশিরভাগটা উঁইপোকায় খেয়ে ফেলেছে যায়গায় যায়গায়। তো সেই বই পড়তে গিয়ে সে এক জায়গায় লেখা দেখে, “…………………..নারীকে বিবাহ করা হারাম।” ব্যাস, আর যায় কোথায়? সেতো এক লাফে রাস্তায়। সারা গ্রাম ঢোল পিটিয়ে সে প্রচার করতে লাগল,
“জানো তোমরা? হায় হায় হায়! কী ভয়ঙ্কর গুনাহ তোমরা এতদিন করে এসেছ। নারীকে বিবাহ করা হারাম। তোমরা সেই গুনাহ করেছ। তোমরা কী ভয়ানক পাপী।”
তো পুরো গ্রামে ঢ়ি ঢ়ি পড়ে গেল। সারাগ্রাম তো উত্তেজিত। পারলে সারা গ্রাম তাদের বউদের তালাক দিয়ে দেয় পাপ হতে বাঁচতে। তো একদিন পথে চলার সময় তার সাথে এক বড় মাওলানা সাহেবের দেখা। তিনি ওই কাঠমোল্লার সাথেই দেখা করতে আসছিলেন।
তিনি মোল্লাকে জিজ্ঞেস করলেন, সে “নারীকে বিবাহ করা হারাম” এই ফতোয়া কোথায় পেয়েছে। সে বলল, কেতাবে। তো তিনি সেই কেতাবটি দেখতে চাইলেন। মোল্লা তাকে তার বাসায় নিয়ে গেল। কেতাব বের করে তাকে সেই পাতাটি বের করে পড়তে দিল।
মাওলানা সাহেব কেতাব পড়ে দেখেন যেখানে যে লাইনে ওই কথাটি ছিল (………………….নারীকে বিবাহ করা হারাম) সেখানটা উঁইপোকায় খাওয়া। তিনি চট করে ওই কেতাবখানার একখানা ফ্রেশ কপি তার বাসা হতে আনিয়ে সেই পৃষ্ঠার সেই লাইনটি মিলাতে বসলেন।
ভাল কেতাবখানায় দেখেন ঠিক ওই লাইনটির “………নারীকে” শব্দটির আগের অংশটুকু যেটা উঁইপোকা খেয়েছে সেই অংশে লেখাসহ লেখাটি হবে, “দুইউছ নারীকে বিবাহ করা হারাম।” উঁইপোকায় খাওয়ায় লেখাটাকে মনে হয়েছিল, “………………….নারীকে বিবাহ করা হারাম।” মানে পুরো উল্টো মিনিং। তারপরে তিনি ওই কাঠমোল্লাকে এক রাম থাপ্পড় লাগালেন। তাকে বুঝিয়ে দিলেন, কেন অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্কর। তারপরে পুরো গ্রামকে শান্ত করলেন। সত্যিটা শেখালেন।
উপলব্ধি: অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্কর। আর ওই যে, চিলে কান নিয়েছে-কবিতার মতো।
সতর্কতা: কেউ ব্যক্তিগতভাবে নেবেন না। কাউকে উদ্দেশ্য করে বলা না। আর এই গল্পকে স্রেফ উপমা হিসেবে মনে করবেন। কোনো ধর্মীয় ফ্লেভার বা অবমাননা মনে করার কোনো কারন নেই। সব ধর্মই তার বিশ্বাসীদের কাছে পবিত্র। তাকে খাটো করার অধিকার কারোর নেই।
৭. হারুনের ভাতের হোটেল:
ঢাকার যে কোনো রেস্টোর্যান্টে যান। দেখবেন তার নাম ’রেস্টোর্যান্ট’ না, ’হোটেল’। যেমন-আবুল হোটেল-বেঁচে ভাত, অথচ ‘হোটেল’। কোনো এক বিচিত্র কারনে, বাঙালীরা রেস্টোর্যান্টকে ’হোটেল’ নামে ডাকে। ।।আবার আসল ও আদি যে হোটেল, সেই হোটেলের নামের শেষে ‘ইন্টারন্যাশনাল’ কথাটা থাকবেই। যেমন:-মগবাজারের বিখ্যাত সরাইখানা হোটেলগুলোর নাম সব দেখবেন, “শান্তিনিবাস ইন্টারন্যাশনাল”, “সামাজিক হোটেল ইন্টারন্যাশনাল” ইত্যাদি। যদিও, ঢাকার ’হোটেল’গুলোতে অতিথীদের আবাসিকতার চেয়ে ‘বিশেষ অতিথী পাখির’ আনাগোনা ও কাজ বেশি হয়। ওগুলো পয়দাও হয়েছে সেজন্যই। উত্তরায় কিছু ‘হোটেল’ আছে, যার কাজ আবাসিক সেবা দেয়া না। তাদের কাজ হল ‘টেরনিং’ এর জন্য হল ভাড়া দেয়া। তবুও তারা ‘হোটেল’।
তো, আপনি ’হোটেলে’ যান। ভাত খাবেন। বয় বা ওয়েটার কাউন্টারে হাঁক পাড়বে, “অঁই, দুইটা খানা ল”। ভাতকে এই হোটেল নাম্নী রেস্টোর্যান্টে কোনো এক বিচিত্র কারনে ভাত না বলে ’খানা’ নামে ডাকা হয়। ।।ঠিক একই বিচিত্র রঙ্গ, এদেশে নাপিতের দোকানকে ‘সেলুন’ বলে ডাকা হয়। কোনো সাদা চামড়ার মানুষ যদি ঢাকায় এসে ‘সেলুনে’ লাল পানি গিলতে চান, আর তার ‘হোটেলে’র পাশেই ‘জাভেদ ডাক্তারস সেলুনে’ ঢুকে পড়েন, তাহলে কেলেঙ্কারী হয়ে যাবে।।।সদরঘাটে গেলেন। যাবেন ”আইতে হাল, যাইতে হাল, মোগো মনুর বাড়ি বরিশাল”।
লঞ্চে উঠলেন। তো লঞ্চের কোথাও ’লঞ্চ’ কথাটা পাবেন না। লঞ্চের গায়ে, বাথরুমে, ডেকে, ছাদে সর্বত্র যত যত নীতিকথা ও নির্দেশনা লেখা থাকে [জাহাজের গায়ে নৌকা ভিড়াইবেন না-টাইপ], তার সবগুলোতেই লঞ্চের নাম হল ‘জাহাজ’। ভাবা যায়! ওই লঞ্চ নাকি একটা শীপ। ।।কয়েকদিন আগে ভেড়া নিয়ে কিছু পড়াশোনা করার দরকার পড়ল। গুগল মামার পেটে সুড়সুড়ি দিতে গিয়ে ভুলে Sheep না লিখে Ship লেখায় ক্রূজ শীপের কিছু ছবি এলো। ছবিতে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় ও বিলাসবহুল ক্রূজ শীপ Symphony of the Seas দেখে টাস্কি খাবার যোগাড়।
অনেক আগে আশুলিয়ায় যখন অফিস করতাম, তখন ধৌড়ের মোড় পথে পড়ত। [বাস ও টেম্পূর হেলপাররা ওই ধৌড়ের মোড়কে দৌড় বলে ভুল করত। এক যাত্রী একবার বাসে উঠে বলেছিল, ’ধৌড়ের ওপাড়ে’ নামাবি। হেলপার তাকে ওই মোড়ে নিয়ে ‘চলন্ত’ অবস্থায় নামিয়ে দিতে ধাক্কা দিল। ব্যাটাতো রেগে অস্থির। হেলপার বলে, কেন, আপনেই না কইলেন, “দৌড়ের ওপরে’ নামাইয়া দিস।] ।।ঠিক একই কান্ড ঘটে গাজিপুর-শফিপুরের কাছের ‘চন্দ্রা’ মোড়ে। বাস হেলপাররা কোনোদিনও ওটাকে ‘চন্দ্রা’ উচ্চারন করতে পারে না। বলবে ‘চান্দুরা’। শহরে নতুন আসা লোকেরা ধন্দে পড়ে।
একবার এক কলিগ গল্প করেছিলেন, তিনি, ফার্মগেট হতে কোথাও যাবেন। হঠাৎ শোনেন, বাসের হেলপার যাত্রী ডাকছে, “অঁই আহেন আহেন আহেন, ছ্যাড়াব্যাড়া, গাঁজিপাড়া, মিপপুঁ মিপপুঁ মিপপুঁ।” তার অনেক সময় লাগল বুঝতে, গাড়িটা কোথায় যাবে। ।।যাহোক, ওই ধৌড়ের মোড়ে ঝিলের পানিতে একখানা ক্রূজ শীপ নোঙর করা থাকত। নাম তার “ছেড়ি না” ক্রূজ (স্যারিনা)। বুঝলাম, সে ছেড়ি নয়, ছ্যাড়া, মানে পুরুষ। তো, তাকে দেখে আমার মনে হত, ছাল নাই কুত্তার বাঘা টাইটেল।
কয়েকদিন আগে শুনলাম, ‘ককশোবাজার’ হতে ’সেন্টূ-মতিন চরে’ যাবার জন্য, সেখানকার ‘কেরেশ ত্যালের’ (কেরোসিনের বরিশাল ভারশন) মতো নীল পানি দেখার জন্য ‘বিদেশী’ ’ক্রূজ শীপ’ চালু হয়েছে। যদিও জানি না, দেশী মুরগার বাচ্চার মতো দেশী ক্রূজ শীপ আদৌ কোনো কালে ছিল কিনা, যে ’বিদেশী’ কথাটা লাগাতে হল। তো সেই ক্রূজ শীপের ছবি দেখলাম আজকে। ।।সেই থেকে হাসতেই আছি আর হাসতেই আছি। হাসা থামাতে এই লেখা পয়দালাম। আচ্ছা? বলুন তো, চাঁনপুর, মানে চাঁদপূরের লঞ্চ ’বোগদাদিয়া ইন্টারন্যাশনাল’ আর নবযাত্রা করা ‘বিদেশী ক্রূজ শীপ’ এর ভিতরে কী কী পার্থক্য আছে? ।।
একবার চিড়িয়াখানার এক কর্মী বলেছিল, আমাদের জেব্রাগুলোর যখন প্রচন্ড পেটে ব্যথা করে, সেগুলোকে আমরা চিড়িয়াখানা হতে বের করে ঢাকার রাস্তার যেকোনো জেব্রা ক্রসিংয়ে কিছুক্ষণ দাড়া করে রাখি। ওরা সেই ‘জেব্রা ক্রসিংয়ের’ চেহারা দেখে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খায়। তাতেই ওদের পেটে ব্যথা ভাল হয়ে যায়।
মফস্বলের ভোইঙ্গা জাতকদের শহর চেনা, শহর জানা:
আমরা যারা ঢাকায় বহিরাগত মানে যাদের ঢাকা শহর আসতে বহু কাদা মাটি পেরিয়ে অবশেষে হাঁটুতে কাদা নিয়ে ঢুকেছি তাদের জন্য একটি গল্প আছে আমার ঝুলিতে।
ঢাকায় পা রাখার পর ভাইয় বলল, ঢাকা শহরে কেউ ১৭ বার ধরা না খেলে ঢাকার বাসিন্দা হতে শেখে না। তবে তার সেই মহান বাণী কোনো কাজে আসেনি। গুলিস্তানের ২০০ টাকার নাইকীর কেডস দেখলে কার মাথা ঠিক থাকে। কিনেছি এবং যথারীতি ২ পা হাঁটার আগে সেই জুতার তলা খুলে যাওয়ায় সেলাই মামার দারস্থ।
এমনি করে একে একে গুলিস্তানের পশ ব্রান্ডের সস্তা পারফিউম, লী বা ব্লু জীনস সস্তায় কিনে, ব্রান্ডের ওয়াকম্যান, ঘড়ি সস্তায় পেয়ে কিনে ধরা খেয়ে শিখেছি। কিন্তু ওই যে, চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী। এরপর এলো আমার ছোট ভাই ঢাকায়। ওকেও একইভাবে প্রথমদিন সতর্ক করলাম। কাজ হয়নি। একই তরিকায় একে একে জুতা, প্যান্ট, সেন্ট, বেল্ট, ঘড়ি কিনে ধরা খেয়েছে। এটা নিয়ে খুব হাসি মাঝে মধ্যে।
#GroomingOfHR আমাদের ছোট্ট HR টিমটিকে গ্রুমিংয়ের সময়ে আমি প্রায়ই বলি, আপনাদের শেখার কোনো নির্দিষ্ট সীমানা বা গ্রামার নেই। সব দেখবেন। সবই লাগবে। কোনটা কবে কোন কাজে আসবে, আর কীভাবে সেটা কাজে দেবে তা ভাবতে হবে না, শুধু দেখে যান, পড়ে যান, শুনে যান, শিখে যান। শেখার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তো থাকেই। তবে সেটা ১০০ ভাগ শিক্ষণে নয়। শেখার পথে যখন চলছেন, তখন কোনটা শিখলে কী পাবেন-সেই ভাবনা ভুলে যান। শিক্ষা একটি সার্বিক বিষয়।
এই ভাবনাটি আরেকটু পোক্ত হল সেদিন।
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধনের দিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর টোল প্রদানের একটি ভিডিও দেখছিলাম। প্রধানমন্ত্রী যখন টোল দিলেন তখন কাউন্টার অফিসারের সাথে বাম হাত এড়িয়ে ডান হাতে টাকা ও রিসিট বিনিময়ের দৃশ্যটি আমার মাথায় নাড়া দিল। বেশ ক’বার ভিডিওটি দেখলাম। এই দৃশ্যটি আমার চিন্তায় একটি বড় ছাপ ফেলল। এবং, সেটি দুই ডাইমেনশনে।
এক; ওই যে, ওপরে বলছিলাম, যে, শিক্ষার কোনো গ্রামার ও ম্যানুয়াল নেই। সেটা আবারও প্রমাণ পেলাম। ওই ভিডিওটি কেউ কাট করে পোস্ট করেছেন, লক্ষ্য হয়তো তার পছন্দের মানুষটির বদান্যতা ও শিক্ষাকে হাইলাইট করা। যখন ভিডিওটি দেখছি, ক্যাপশন ও ডিটেল দেখে একজন দর্শক হিসেবে নিশ্চয়ই সেই অবজেকটিভ নিয়েই দেখতে শুরু করব আমরা। কিন্তু, ভিডিও দেখে ফোকাস পড়ল অন্যত্র। ইমপ্যাক্ট হল অন্যখানে। সম্পূর্ণ ভিন্ন এক শিক্ষা সেখান হতে নিলাম নিজের জন্য। এ হতে আমি আবারও শিখলাম, কেন সব কিছু দেখতে, শুনতে, পড়তে হবে। কারন, যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই।
দুই; ব্যক্তিগতভাবে আমি ডান হাত-বাম হাত ভেদাভেদে যাই না। কিন্তু, আমি জানি, আমাদের কমিউনিটিতে বাম হাতকে কিছুটা ট্যাবু হিসেবে দেখা হয়। বাম হাত অনেকটা অবসকিউর, অবসোলেট। বাম হাতে খাওয়া, কিছু নেয়া বা দেয়াকে এখানে অগ্রহনযোগ্য (আসলে অভদ্রচিত) মনে করা হয়। আমি সেটা মনে করি না। আমি মনে করি ও মেনে এসেছি, যে, আল্লহ’র সৃষ্ট দুটি হাতই সমান; সমান মর্যাদার ও সমান গুরুত্বের। কোনো হাতই অবসকিউর না। বরং, মানুষ তার বাম হাতের প্রতি বেশি কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত (যদি হাতের জান থাকত), কারন, সে মানুষের যাবতীয় ঘৃন্য ও অশৌচ কাজ করে দেবার দায়ীত্ব নিয়েছে।
কিন্তু, তারপরও, আমার মনে হল, একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ এক্সেকিউটিভ, মানে প্রাইম মিনিস্টার যদি ভাবতে পারেন, (ব্যক্তিগত বিশ্বাস যা-ই হয়ে থাকুক), যে, প্রকাশ্যে তিনি গ্রেটার কমিউনিটির সেন্টিমেন্ট, প্রথা ও প্রচলনকে সম্মান দেখাবেন, তাহলে আমি ব্যক্তিগতভাবে যা-ই ভাবি না কেন, প্রকাশ্যে যখন অন্য কারো সাথে মোয়ামালাত করছি, তখন খুব মারাত্মক কোনো কমপ্রোমাইজ না হয়ে থাকলে তার কাস্টমস, নর্মস এর প্রতি সম্মান দেখিয়ে কিছুক্ষণের জন্য নিজের অভ্যাস বা আচরনকে তো বদলাতেই পারি।
ঘটনা এক, শিক্ষা দুই। সবকিছু গোগ্রাসে গিলতে হবে-এজন্যই কই।
এইচ.আরের অ্যালম্যানাক:
#GrammarOfLearning যখনই আমাদের HR টিমে নতুন কেউ আসেন, তাকে লিখিত একটি সিলেবাস ও কারিক্যুলাম দিই-তাকে প্রথম ৬ মাসে কী কী জানতে, পারতে ও শিখতে হবে, তার।
শেখার এই যাত্রাটায় তারা কীভাবে চলবেন, তা নিয়ে কথা বলবার সময় তাদেরকে একটা কথা বলি।
”যদিও লিখিত ও পরিকল্পিত সিলেবাস দিচ্ছি, কিন্তু, মনে রাখবেন, আপনারা যারা এইচ.আর নিয়ে কাজ করবার জন্য আর এইচ.আর শেখার জন্য প্যাশনেট, তাদের শেখার-
কোনো নির্দিষ্ট বাউন্ডারি নেই,
কোনো নির্দিষ্ট ম্যানুয়াল নেই,
কোনো নির্দিষ্ট গ্রামার নেই,
কোনো নির্দিষ্ট স্বরলিপি নেই,
কোনো নির্দিষ্ট সিলেবাস ও কারিক্যুলাম নেই,
কোনো নির্দিষ্ট টেক্সটবুক নেই,
কোনো নির্দিষ্ট মাজহাব নেই,
আপনারা মুক্ত ও বিশাল আকাশে উড়ন্ত মুক্ত পাখি।
সব শুনবেন,
সব শিখবেন,
সব জানবেন,
সব পান করবেন,
সব গোগ্রাসে গিলবেন।
শেখার এই যাত্রায় নৈতিক ও অনৈতিক বলে কিছু নেই। ভাল ও মন্দ বলে কিছু নেই। পজিটিভ ও নেগেটিভ বলে কিছু নেই। ডার্ক ও হোয়াইট বলে কিছু নেই। সব কিছুর ওপর আপনার মৌলিক ধারনা নিতে যা যা দেখা, শোনা ও বোঝা দরকার-করুন।
আপনাকে এমনকি এ ও জানতে হবে-
কখন কথা বলতে হয়,
কখন কথা বলতে নেই,
কোন কথা বলতে নেই,
কীভাবে কথা বলতে হয়,
কী শিখতে হয়,
কী না শিখলেই নয়,
কী করে শিখতে হয়,
কী করে শেখাতে হয়,
কী করে ভাবতে হয়,
কী করে নিজ ভাবনাকে লুকিয়ে রাখতে হয়,
কী করে কল্পনা করতে হয়,
কী করে স্বপ্ন বুনতে হয়,
কী করে রি-এক্ট করতে হয়,
কী করে ভয় দেখাতে হয়,
কী করে অভিনয় করতে হয়,
কী করে পলিটিকস মোকাবেলা করতে হয়,
কী করে পলিটিকস করতে হয়,
কী করে বুক চিতিয়ে সত্য বলতে হয়,
কী করে চোখের পাতা না কাঁপিয়ে মিথ্যা বলতে হয়,
কী করে প্রভাবিত করতে হয়,
কী করে প্রভাবমুক্ত থাকতে হয়,
কী করে প্রলুব্ধ করতে হয়,
কী করে প্রলোভন মুক্ত থাকতে হয়,
কী করে প্ররোচিত করতে হয়,
কী করে ইমোশনালি বাউন্ড করতে হয়,
কী করে চাপ তৈরী করতে হয়,
কী করে চাপ কমাতে হয়,
কী করে নাচতে হয়,
কী করে নাচাতে হয়।
কোনটা শিখলে কোন কাজে আসবে,
কোন শেখাটা কীভাবে পে-ব্যক করবে-এসব ভুলে যান।
শেখা ও তার এক্সপেকটেড আউটকামকে হুবহু এলাইন ও সিংক করা যায় না। হাজারটা শিক্ষা আপনাকে লাখো রকমের সিচুয়েশনের জন্য কানেক্ট করে। শেখা কখনো সারেগামার অষ্টপদি সুর না, যে, সা শিখলে সা’ই বেরোবে।
এরকম বিচিত্র কেন HR এর লার্নিং কোর্স?
কারন, HR হল একটি কাস্টমার সার্ভিস ডিপার্টমেন্ট। HR এ কাজ করায় আপনিই একমাত্র পেশাজীবি ও টিম, যার কাজ হল মানুষ নিয়ে কাজ করা, সেই মানুষ, যারা হাজার ও লক্ষ রকম ডাইভারসিটির। হাজার ও লাখ তাদের ডাইভারসিফাইড টাইপ অব ইস্যুজ। তাই আপনাদের হতে হবে দূর্গার মতো দশ হাতওয়ালা, রাবণের মতো দশ মাথাওয়ালা। অক্টোপাসের মতো অষ্ট শুড়ওয়ালা।
শেখার চেষ্টা আমাদের অনেকের মধ্যেই আছে। কিন্তু, জানা থাকা দরকার, শিখবার সঠিক পথটা আসলে কী? অনেকে বলে, ঠেকে শেখে। অনেকে বলে দেখে। আমার পাঠকদের জন্য আমার ভাবনাটা শেয়ার করলাম:
১. জটিল, গভীর, যথাযথ ও উপযুক্ত (Accurate, Appropriate, Perfect) প্রশ্ন করা (এটা আমার সবচেয়ে পছন্দের রাস্তা।)
২. সূক্ষ্ণভাবে দেখা ও ভাবা।
৩. মনোযোগ ও আগ্রহ নিয়ে শোনা।
৪. অভিজ্ঞতা বিনিময় ও মেনটরিং।
৫. হাতে কলমে করা, ভুল করা ও শেখা।
৬. এক্সপিরিমেন্ট করা।
৭. কল্পনা ও সৃষ্টিশীল চিন্তা।
৮. সবরকম কিছু পড়া।
৯. হিউম্যান ইন্সটিংকট ও স্পনটেনিয়াস ইনহেরিটেন্স
১০. বয়স হওয়া।
১১. আগের শেখা জ্ঞান, তথ্য, অভিজ্ঞতার বিক্রিয়া ও ফিউশন।
শিক্ষণ (শেখা ও শেখানো) প্রক্রিয়ার খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা হল,
”তাকেই শেখাও, যে শেখার জন্য আগ্রহ ও আকুতি প্রকাশ করে। যে সেটা করে না, তাকে শেখাতে যেও না।”
অনাগ্রহীকে সেধে বা জোর করে শেখাতে যাওয়া মূলত শিক্ষণ নয়, অত্যাচার বটে। অপচয়ও।
You can drag the horse to the water, but, you can’t make it drink.
You can force someone to work, but, you can’t make him perform.
আমরা কিছু কিছু শিক্ষা/বিদ্যা/ইনসটিংকট আমাদের জিনে, আমাদের নিউরনে, ডি.এন.এ তে, কপি হিসেবে পেয়েই জন্মাই। মনুষ্য সভ্যতার লাখো বছরের ইতিহাস ও ঘটনাপ্রবাহের হাত ধরে অর্জিত জ্ঞান আমাদের নিউরনের ডিস্কে কপি করে দিয়ে দেয়া হয়। জন্ম নেবার পরে জীবনের প্রতিটি বছর এই পৃথিবী, এই পরিবার, কমিউনিটি, রাষ্ট’র ভেতরে অতিবাহিত করার ভিতর দিয়ে আমরা বিপুল পরিমান শিক্ষা চেতনে, অবচেতনে শিখি। আমাদের একাডেমিক ১৭ বছরের জীবনে আমরা নানা প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাই, তখন শিখি। আমরা কর্মক্ষেত্রে ঢুকলে সেখানেও নানা প্রক্রিয়া, ঘটনা, পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাই। সেগুলোর ভেতর দিয়ে শিখি।
সারাজীবন আমরা ফরমাল পথে শিখি যদিও সেটার স্থিতি খুব কম। আমরা ইনফরমাল পথে শিখি, এবং, সেটির ব্যপ্তি ও স্থায়ীত্ব অনেক বেশি।
শেখার জন্য আপনাকে খরগোশের মতো কান, ৫ ব্যাটারির টর্চের মতো চোখ, মরুর বালু বা চাতকের মতো তৃষ্ণা, জুতার তলার মতো বিনয়ী হতে হবে। হিজ মাস্টার্স ভয়েসের কুকুরটির মতো হাটু মুড়ে আপনার বক্তা ও দাতার পায়ের কাছে পড়ে থাকতে হবে। আপনাকে শুনতে হবে এবং মুখটা বন্ধ রাখতে হবে।
প্রশ্ন করা-সম্ভবত জানবার, শিখবার, বুঝবার সবচেয়ে চমৎকার কার্যকর পন্থা। সঠিক প্রশ্নটি করতে জানা-সম্ভবত এটা বুদ্ধিমত্তা যাচাইয়ের সর্বোত্তম ও সর্বাধিক কার্যকর পন্থা। প্রশ্ন করুন। সঠিক উত্তর দিতে পারা নিশ্চয়ই একটি বড় বিদ্যা। তবে সঠিক (Appropriate, acurate, perfect) প্রশ্ন করতে পারা তার চেয়েও বড় বিদ্যা। আমাকে ব্যক্তিগতভাবে ক্যারিয়ার কাউন্সেলিংয়ের জন্য যারা ফোন করেন, প্রায়ই তাদেরকে আমি বলি, আপনি কী জানতে চান, বা আমার কাছে কী চান-সেটি স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট করে বলুন। অনেক সময়ই হয় তারা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যান, অথবা, তারা প্রশ্নটিকে মূর্ত করতে পারেন না।
অবাক হবেন না। সত্যিই মানুষ সঠিক, উপযুক্ত, টু দ্য পয়েন্ট প্রশ্ন করতে পারে না। প্রশ্ন করবার জন্য বিখ্যাত বা কুখ্যাত ছিলেন সক্রেটিস। শুনেছি, তাকে কেউ কিছু জানবার জন্য প্রশ্ন করলে তিনি সরাসরি উত্তর দিতেন না। প্রশ্নকর্তাকে পাল্টা প্রশ্ন করে করে উত্তরটা বের করে আনতেন। শুনতে মনে হতে পারে, এগুলো জটিলতা বাড়াবার বুদ্ধি, ডেঁপোদের কাজ। আসলে না। ইন ডেপথ কিছু জানতে হলে প্রশ্ন করতেই হবে। এবং, সেটা হতে হবে যথাযথ প্রশ্ন।
#apprehensive সন্দেহ করতে শিখুন। সন্দিহান হতে শিখুন। কৌতুহলি হোন।
যদি কখনো কুকুরকে মিউ মিউ করতে দেখেন, বেড়ালকে ঘেঁউ;
যদি কখনো মোরগকে ডিম দিতে দেখেন, আর মুরগীকে কুক্কুরু কুঁ;
যদি দেখেন যে, বোবায় টক শো করছে আর চিনি ঝাল লাগছে;
সন্দেহ করুন, কৌতুহলি হোন, প্রশ্ন করুন।
যার যেটা কাজ, যার যেটা ফোকাস হবার কথা, তাকে সেটার বাইরে চমৎকারিত্ব দেখাতে দেখলে, সেটার বাইরে ‘আউট অব বক্স’ ভানুমতির খেল দেখাতে দেখলে গলে যাবেন না। সন্দেহ করতে শিখুন।
যার যেটা কাজ, আগে সেটা ঠিকঠাক করে কিনা-সেই প্রশ্ন করুন। তারপর সে জাহান্নামে যাক-আপত্তি নেই।
সন্দেহ করুন আপনার এইচ.আরকে। তার মূল কাজ, প্রায়োরিটির কাজের খোঁজ না থাকা সত্তেও যদি তাকে দেখেন নিরোর মতো সুন্দর বাঁশি বাজিয়ে সবাইকে ঘুম পাড়াচ্ছে, তাকে সন্দেহ করুন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী? তার পিওর ভূমিকা কী? তার হাইলাইট হবার কথা কী নিয়ে? বাংলাদেশে হচ্ছে কী নিয়ে-প্রশ্ন করুন, নিজেকে, কমিউনিটিকে, অনলাইনকে, অফলাইনকে। প্রশ্ন করুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভানুমতির খেল দেখানোতে তুখোড় হয়ে ওঠাকে যারা প্রমোট করতে চান-তাদেরও।
রাষ্ট্রের মূল কাজ ও করণীয় কী-সেটার খোঁজ না থেকে যদি সে ডুগডুগি বাদনে শ্রেষ্ঠত্বের শো করে, তাকে সন্দেহ করুন, তাকে প্রশ্ন করুন। সিংহ যদি চিকন সুরে জাজ মিউজিক গেয়ে সবাইকে চমৎকৃত করতে থাকে, তাকে সন্দেহ করুন। ঠিক যেমন মাতাল যখন বিশুদ্ধ স্বরে রবীন্দ্রনাথ আবৃত্তি করতে থাকে, তাকে সন্দেহ করেন।
শিক্ষণ কার্যক্রম, বিশেষত কর্পোরেটে, প্রফেশনাল লাইফে পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতা শেখার জন্য অন্যতম একটি পন্থা হল পীর ধরা, মানে মেনটরিং। যদিও, ইন জেনারেল, মেনটর বা পীর-দরবেশকে দেখে চাকরি নিতে আমি সবসময় অনুৎসাহিত করি। অভিজ্ঞতা বেশিরভাগই নেগেটিভ। তবে, এই মেনটর বা পীরভাইয়ের টিমে কাজ করতে চাওয়ার ব্যপারটার কিছু পজিটিভ দিক আছে। সেই দিকটি নিয়ে আমার ভাবনাটি বলব।
একজন মেনটর বা আইকনের সরাসরি অধীনে কাজ করতে পারলে ইনফরমাল, নন-ইনসটিটিউশনাল, আন-অফিশিয়াল, নন-কনভেনশনাল এবং হ্যা, ফরমাল লারনিংয়ের প্রচুর সম্ভাবনা ও সুযোগ থাকে। সেই লারনিংয়ে ফটোকপি করতে পারা, মেইল লিখতে পারা যেমন আছে, যেগুলো খুব প্রনিধানযোগ্য নয়।
মূল লারনিংটি হল ওই বস বা মেনটরের নিকট হতে চিন্তা করতে শেখা, ভাবতে শেখা, যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণ করতে শেখা, জীবন ও জগত সম্পর্কে বোধ অর্জন করা, তার অভিজ্ঞতাগুলো জানা ও সেগুলো হতে নিজের ডিসকোর্স ঠিক করতে পারা, স্ট্রেস নিতে পারার শিক্ষা, ডিসিশন মেকিং সক্ষমতা অর্জন।
এগুলোর ভিতরে আমার কাছে সবচেয়ে দামী মনে হয় চিন্তা করতে শেখার ক্ষমতা অর্জনটি। একজন অ্যাডমিনিসট্রেটর, মেনটর, কোচ, বস, লিডারের সবথেকে মূল্যবান দিক হল তার থট প্রসেস। হাউ টু থিংক। কীভাবে যৌক্তিক ও বিধিবদ্ধভাবে চিন্তা করতে হয়, কীভাবে স্তরে স্তরে মেথডিক্যালি ভাবতে হয়, সেটি শেখা যায় মেনটরের অধীনে থাকলে। এটাই মানুষে মানুষে পার্থক্য গড়ে দেয়।
জানেন কিনা, আমরা অনেক অনেক কিছু হয়তো পারি না। তবে তার ভিতরে সবচেয়ে মারাত্মক অক্ষমতাটি হল আমরা যৌক্তিক ও যথাযথ তরিকায় ভাবতে বা চিন্তা করতে অক্ষম।হয়তো আপনার খটকা লাগবে, আরেহ, ভাবনা চিন্তা করা আবার এমন কি রকেট সায়েন্স। তবে, একটু তলিয়ে দেখলেই বুঝতে পারবেন, গভীরভাবে কোনো কিছু নিয়ে ধাপে ধাপে চিন্তার ধারা সাজাতে পারা সহজ কাজ নয়।
বিশেষত, যখন ক্রাইসিস আসে, যখন স্ট্রেস বা হেকটিক সিচুয়েশনে পড়ে যাই, তখনও ঠিক যেটি ভাবা দরকার, যেভাবে ভাবা দরকার, যেরকম করে ভাবলে মুশকীল আসান হবে, সেটি সেভাবে ভাববার অভ্যাস ও সক্ষমতা অর্জন খুব বড় বিষয়। একজন পীর বা সহমত ভাই, যদি তিনি উপযুক্ত হয়ে থাকেন, তার বসশিপে কাজ করলে এই দিকটি রপ্ত করবার ভাল সুযোগ থাকে। ওই থট প্রসেসটা শেখার জন্য, র্যাশনাল থিংকিং শিখতে, জাজমেন্ট শিখতে একসাথে কাজ করতে পারা এক নেয়ামত।
#questionning #clever #intelligence #lesson #Dhaka #yellowjournalism #activelistening #survival #patience #misinterpretation #manipulation #socialdeterioration #socialdestruction #socialdeviation #maniscript #mistranslate #misinformation #disinformation #listening #beinggoodlistener #audience #speaker #knowing #misunderstanding #counseling #effectivecommunication #wayoflearning #habitoflistenning #attentivelistener #crowdlearning #openlearning #learningbydoing #understandingcontext #littleknowledge #mollah #marriage #littlelearning #restaurant #hotel #saloon #cruiseship #socialdeterioration #socialdestruction #socialdeviation #misleading #misinterpretation