সামাজিক সৌহার্দ্যের অংশ হিসেবে প্রায়ই বিভিন্ন রকম সামাজিক আয়োজনে আমাদের দাওয়াত হয় যেখানে আমাদের ভাল লাগুক বা না লাগুক, যেতেই হয়। সামাজিক অনুষ্ঠান সেটা হোক ব্যক্তিগত, কর্পোরেট বা সামাজিক নেটওয়ার্কের হাত ধরে, অনুষ্ঠানে গেলে উপহার দেয়াটা আমাদের সামাজিক রীতির অংশ হয়ে আছে অনেক আগে থেকেই। কিন্তু যুগের বদলের হাত ধরে কিছু কিছু ক্ষেত্রে গিফট জিনিসটা প্রায় অত্যাচারে পরিণত হয়েছে। সামাজিক বা পারিবারিক অনুষ্ঠানে অনেক ক্ষেত্রে মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও যেতে হয়ই।
ব্যস্ত নাগরিক জীবনে এমনিতেই সময় করে অনুষ্ঠানে যাওয়াটা এখন বেশ টাফ। এমনিতেই সারা সপ্তাহ অফিস, ব্যবসা সামলে সপ্তাহের একটি দিন থাকে নিজেকে, ফ্যামিলীকে দেবার মতো। তার হতে সময় কেটে দিতে হয় দাওয়াতে। তার উপর যোগ হয়েছে নতুন উপদ্রব। এখনকার দিনে এক বিয়েতেই অনুষ্ঠান যোগ হয়েছে ডজনখানেক। সেগুলো হয়ও এমন ভয়ানক বিলাসীতাপূর্ন ভেন্যুতে যে, আপনাকে স্রেফ মানুষের মতো হয়ে সেখানে যেতেই গাটের কড়ি গুনতে হবে অনেকগুলো। তার উপর মরার উপর খাড়ার ঘাঁ হয়ে আসে গিফট। ভাবুনতো একবার, মাসে যদি কমপক্ষে ৩টি দাওয়াত থাকে আর প্রত্যেকটাতে গিফটের ঠোঙা কিনে নিয়ে যেতে হয়, তার চাপ একজন মধ্যবিত্ত’র ওপর কিভাবে পড়ে?
গিফট হাতে না গেলে মানইজ্জত পাংচার। আর সেটা যদি হয় শ্বশুরবাড়ির সূত্রে কোনো অনুষ্ঠানে তবে তো আপনার মাসের খরচে টান ধরবেই। ভাল রকমের একটা লোনও হয়ে বসতে পারে। আজকাল আবার ছোটোখাটো উপহারে হয় না। দাওয়াতকারীর আভিজাত্য আর পার্টির জেল্লার সাথে মিল রেখে উপহার কিনতে হয়। বই উপহার দেবার যে পৌরাণিক প্রথা আমাদের ছিল, ফেসবুক ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা এসে তাকে কলঙ্কের দাগের মতো ধুয়ে নিয়েছে। আপনি একখানা মোটা সঞ্চয়িতা কোনো দাওয়াতে গিফট করলে সেখানা পরের দিন বাড়িতে বিয়ারিং ডাক হয়ে ফেরত আসারও সম্ভাবনা আছে। কেউ কেউ আবার দাওয়াতপত্রে লিখে দেন, “উপহার আনবেন না”।
তবে আমরা একটু বুদ্ধিমান হলেই বুঝি, ওটা আসলে একটা ধোঁকা বা কথার কথা। ওই ফাঁদে কেউ পা দেবার ভুল করবে না। তবুও এর মধ্যেই কেউ যদি সত্যি সত্যি মনে থেকে চান যে তার দাওয়াতি মেহমানরা কোনো গিফট না নিয়ে আসুক, তার সেই শুভ ইচ্ছা চলমান সামাজিক পঁচনের কারনে দাওয়াতিরা বিশ্বাসে নিতে না পেরে ঠিকই গিফট নিয়ে আসবেন। গোটা সমাজ যখন পঁচনে আক্রান্ত সেখানে হঠাৎ একজনের অস্বাভাবিক উল্টোযাত্রায় ভরসা রেখে সামাজিক অসম্মান ফেস করার রিস্ক আসলে কেউ নিতে চায় না।
ফলাফল ওই-মানিব্যাগের স্বাস্থ্যহানি।
উপহার দেয়া বা নেয়া নিয়ে আমার ব্যক্তিগত অনাগ্রহ রয়েছে। বিশেষত যেখানে আনুষ্ঠানিকতা, দাবী, দায়, স্বার্থ বা নিয়মের চাপ কাজ করে। বিষয়টা যতক্ষণ সিমপ্লেস্ট, অনাড়ম্বর, তুচ্ছ, ক্ষুদ্র ও সারপ্রাইজ থাকে, ততক্ষণ ঠিক আছে। হ্যা, কেউ একটা উপহার দিলে সেটিকে অসম্মান করবার মতো বুদ্ধু আমি নই। যত তুচ্ছই সেটি হোক।
ভদ্রলোকের সাথে আমার একটাই মাত্র যোগ-নেটওয়ার্ক। যাকে Mr. Md Abdul Kaium (Sohel) নাম দিয়েছেন নেট.ওয়ার্থ।
অনেকেই ভাবেন, বিদ্যুতের বিশাল একটা নেটওয়ার্ক আছে। যখন কেউ সেটা প্রকাশ্যে বলেন, আমি নিজেই ‘পুলকিৎ’ হয়ে পড়ি। সত্যিই কি আমার নেটওয়ার্ক বলে কিছু আছে?
থাকলে বলুন তো, আপনি কি আমার নেটওয়ার্কে আছেন? হালকা কাশি দিন তো সেটা হলে।
উপহার নিয়ে আবারও বলি। আমি দিতে ও নিতে ভালোবাসি না। আবার, যারা উপহার বিনিময় করেন, তাদেরও প্রশ্নবিদ্ধ করি না। ইটস এ পারসোনাল চয়েজ।
উপহার প্রেরককে অনেক ধন্যবাদ। উপহার না-প্রেরকদের আরও ধন্যবাদ।
দূর হতে আমার বিশ্বাস, কথা, লেখা ও কাজের বিশুদ্ধতা ও অক্ষুন্নতার জন্য মনে মনে দোয়া/আশির্বাদ করবেন। দ্যাটস দ্যা মোস্ট এডোরেবল গিফট ফর মি।
তবু বলি, গিফট যদি দিতেই হয়, তবে বই দিন। এই একটা ক্ষেত্রে অন্তত সমাজের সাথে একটু ফাইট করুন। আর আসুন, গিফট নামক অত্যাচারকে না বলি। অনুষ্ঠানে গিফট দেবার বাধ্যবাধকতার সামাজিক ব্যাধিকে নির্মূল করি। আর যদি দিতেই চাই, সেটা হোক একটি গোলাপ, আর একখানা বই।
#book #gift #society #socialprejudice