কোনমতে খেয়ে পড়ে বেঁচে বর্তে থেকে একটা গড়পড়তা জীবনযাপন করতে আর ভাল লাগে না। নিজেকে কেঁচো কেঁচো মনে হচ্ছে। শুধু দুমুঠো ভাত আর জামা-প্যান্ট কেনার পয়সা জোগাড়ের পিছনে এত মূল্যবান জীবনটা ব্যয় হয়ে যাবে? কতদিন বৃষ্টিতে ভিজি না, রাস্তার নোংরা মুরালী খাই না, টং দোকানের কাঁচের কাপের লাল চা খাইনা, পানা পুকুরের নোংরা জলে ডুব দিই না, মার্বেল খেলার জন্য স্কুল কামাই করি না, টিকা দেবার ভয়ে স্কুল পালাই না, বাবার বাইসাইকেলে হাফ প্যাডেল করে পাড়ায় সাইকেল নিয়ে ঘুরি না, সাইকেলে এক্সরে ফিল্ম বেঁধে ফরফর শব্দ করে সাইকেল চালিয়ে সবার বিরক্তির উদ্রেক করার মজা পাইনা, পেঁপেঁর ফাঁপা ডাঁটি দিয়ে ডুবুরী ডুবুরী খেলি না, বাঁশের টুনির ছিপ আর পাটখড়ির ফাতনা দিয়ে বানানো বড়শি নিয়ে অপটু হাতে মাছ ধরার মজা করি না। জীবনটা এত যান্ত্রিক, নিয়মতান্ত্রিক, নৈমিত্তিক, একঘেঁয়ে, বর্ণহীন, ঝামেলাহীন, নৈশব্দময়, গতানুগতিক, ছঁকে বাধা অর্থহীন হয়ে গেল কোন ফাঁকে?
আজ হতে ১৮-২০ বছর আগের ঘটনা। আব্বা বাজারে যেতেন। মা লম্বা একটা ফর্দ হাতে ধরিয়ে দিতেন। যদিও আমার বাপজান ওই লিস্টি দেখে থোরাই বাজার করতেন। বাজার নিয়ে ফিরলে মা মিলাতে বসতেন। লিখেছেন ৩ কেজি পেঁয়াজ, আব্বা এনেছেন ১ কেজি। চিনি ৪ কেজির যায়গায় আব্বা কিনেছেন ১.৫ কেজি। মা রেগে যেতেন। এই দিয়ে কিভাবে চালাবেন।
আব্বার পরাজিত মুখের বেদনা তখন বুঝতাম না। আব্বা বলত, পিঁয়াজ ছাড়া রান্না করো। চিনি খেয়ো না। ডায়বেটিস হবে না। তখন আমরা ভাবতাম আব্বা খামখেয়ালী করে কিনতেন না। আজকে ১৮-২০ বছর পরে নিজেই যখন সংসারের কর্তা, বাজারে যেতে হয়, দরদাম করতে হয়, মানিব্যাগের সাথে মেলাতে হয় তখন বুঝি আব্বা কেন অমন করতেন। তখনো আব্বা ছিলেন মধ্যবিত্ত। আজকে তার সন্তান আমি নিম্ন মধ্যবিত্ত। একটা সময়ে বাজারে টুকটাক ২/১ টাকা দামাদামি ছিল মধ্যবিত্তের হাউসের দরাদরি।
আমরাও ভাবতাম একটু আধটু দাম ওঠানামা করবেই, দোকানী সামান্য বেশি করে বলবেই, আমরাও একদামে না কিনে একটু দরাদরি করাটাকেই বাজার করার নিয়ম মানতাম। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষত গত ৩/৪ মাসে বেঁচে থাকার মতো প্রতিটি পণ্যের দাম দরাদরির বহু উর্দ্ধে চলে গেছে। বাজারে গেলে কোনো জিনিসের দাম ১ টাকা কম বললেই বিক্রেতা মুখ ঝামটা দেয়-আপনার নিতে হবে না, যান। এইসব কথা যখন বলি, মানুষ মনে করে গুল মারি। ব্যাটা হাইয়ার পজিশনে জব করো আর পেঁয়াজের দাম সহ্য হয় না?
ভাই, দুই বছরের বাচ্চার থেকে মানুষ যখন ২০ বছরের বাচ্চা হয় তখন তার হাত পা যেমন বড় হয়ে কর্মক্ষমতা বাড়ে, তেমনি ক্ষুধাটাও তো বড় হয়, তাই না? আমি সত্যি খুব দুঃশ্চিন্তায় আছি, আমাদের মানুষেরা কিভাবে বেঁচে আছে? যাদের ২/৪টা বাচ্চাকাচ্চা, স্কুল কলেজ, ওষূধপত্র, ইনসুলিন, বাড়িতে বাবা-মা-এমনসব খরচ আছে তারা ঠিক কিভাবে দু’বেলার ভাত যোগাড় করছেন জানি না। ছোটবেলায় দেখতাম বাজারে মাংস, মাছের দাম বাড়তি হলে সবজির যোগান বাড়ত বাসায়। এখনতো সেই সবজিও কেনা যাচ্ছে না।
৩টি লাউ লতা যদি ৮০ টাকা হয় তাও এই ঘোর শীতে, তবে আমি বুঝি না, একথালা সাদাভাত কী দিয়ে মেখে খাব? লবন দিয়ে চটকে খাব? লবনও তো ৫০ টাকা কেজি। সকালে পরোটা ডিম না হয় খাব না। পান্তাভাত খাব। তো সেই পান্তা, একটা পিঁয়াজ, একটা পোড়া মরিচ আর একখাবলা লবনের দামও তো সবমিলে আমাদের নাগালের বাইরে। বউ ভাত বেড়ে দিলে আমি বসে বসে ভাবি, এর এক দানা ভাতের দাম কত পড়ল? জীবন এত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইউনিটের হিসেবে লেপ্টে গেল কেন ঈশ্বর?
দ্রব্য/পণ্য, হ্যা, আমি একজন কর্মীর কাজ বা কর্মসক্ষমতাকে পণ্যই মনে করি। এবং সেটি বিক্রয়যোগ্য পণ্য। একারনেই, এমপ্লয়্যাবিলিটিকে আমি নিয়োগযোগ্যতাও বলি, বিক্রয়যোগ্য পণ্যও বলি।
তো, দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতি গোটা বিশ্বেই মারাত্মক হয়েছে গত ১ বছরে। সামান্য টুথপেস্ট এর দামও বেড়ে দ্বিগুন হয়েছে ১ বছরে। একটা ২ টাকার ম্যাচবক্স’র ভেতরের কাঠি ৪০টা হতে ২০ টা হয়ে গেছে।
এই বৃদ্ধির কোনো গ্রামার নেই, নিয়ন্ত্রণ নেই, প্রেডিকশন নেই। নেই ন্যুনতম কোনো নৈতিক অবস্থান। তবে তিক্ত সত্যি হল, দাম বাড়ছে।
কনজ্যুমার প্রোডাক্টের ক্ষেত্রে বিষয়টা আমাদের চেচামেচি করার মতো নজর কাড়লেও অন্য অনেক ক্ষেত্রেই সেটা ঘটছে।
প্রশ্ন হল, এমপ্লয়্যাবিলিটি এবং লেবার অ্যাজ এ প্রোডাক্ট কতটা প্রাইস হাইক দেখছে?
চলুন, দেখার চেষ্টা করি।
১ বছরে,
রিক্সাভাড়া, তথা রিক্সাওয়ালার শ্রম ও সময়ের মূল্য বেড়েছে। অর্থাৎ রিক্সা সেবার দাম বেড়েছে। ন্যুনতম ভাড়া ১০ টাকা হতে ২০ টাকা হয়েছে আরও আগেই।
বাসা ভাড়া, তথা, বাসস্থান সেবা অ্যাজ এ প্রোডাক্ট, দাম বাড়ে বছরে ১ বার হতে দু’বার।
গত ১ বছরে তার প্রাইস বেড়েছে। অর্থাৎ, বাসস্থান সেবা বিক্রেতা অন্যত্র যে প্রাইস হাইকের শিকার নিজে, তিনিও আবার তার নিজের প্রডাক্টে তার কিছুটা মেকআপ করছেন। বা তিনি নিজেও পণ্যের দাম বাড়ানেওয়ালাদের দলে।
মাঠে ধান কেটে দেয় যে লেবার,
বাসায় রং করে যে লেবার,
জুতা সেলাই করে যে মুচি,
বাসাবাড়িতে কাজ করে যে বুয়া,
জামা ইস্তিরি করে যে লন্ড্রি,
বাজারে মাছ কাটে যে কাটুয়া,
দর্জি দোকানে জামা সেলাই করে যে কারিগর,
দেবতার মূর্তি গড়ে যেই পটুয়া,
সরকারী অফিসে আপনার বৈধ/অবৈধ কাজ করে দেয় যে কর্মচারী, বিভিন্ন সরকারী/বেসরকারী ডিল হতে টু-পাইস (আজকাল সেটা শত কোটি) নিজের ভাগ কাটে যে কুমির,
মসজিদের সামনে ভিক্ষা করে যে ভিক্ষুক,
ঝাড়ফুঁক বা তাবিজ দিয়ে আপনাকে স্বর্গে বা নরকে পাঠায় যে ঈশ্বরের দূত,
লাউড স্পিকারের মাউথপিস কাপিয়ে আপনাকে ঈশ্বরের সাথে কানেকট করেন যে কন্ঠ্যদূত,
আপনাকে সস্তার ঝোঁপঝাড় হতে শুরু করে 5* এর দুগ্ধফেনিল শয্যায় যৌন সেবা দেয় যে নিশীকণ্যা ও নিশীপূত্ররা—
এনারা সবাই গত ১ বছরে নিজের নিজের পণ্যের দাম বাড়িয়ে নিয়েছেন।
কনজ্যুমার পণ্যের দাম বৃদ্ধির সঠিক হার বা পরিসংখ্যান সরকারী বা অ-সরকারী কিংবা সরকারবিরোধীরা যত যাই বলুক, একটাও বিশ্বাস করি না। তবুও, সত্যি সত্যি একটা হারে তো বেড়েছে।
এই দ্বিতীয় ধরনের পণ্য বিক্রেতারা কনজ্যুমার পণ্যের দাম বৃদ্ধির রেশিওর সমানে সমান না হলেও কিছুটা মেক-আপ করতে পেরেছেন।
কিন্তু, যারা এই সময়ে পারেননি তাদের বিক্রয়যোগ্য পণ্যের দাম এক পয়সাও বাড়াতে, তাদের পোষাকী নাম White collar employee (সেই সাথে তাদের কাজিন, তথা প্রথাগত চাকরিজীবিরাও)।
এঁরা পৃথিবী দুইভাগ হয়ে গেলেও আগের মতোই থাকবেন। কারন, তাদের বিক্রীত বা বিক্রয়যোগ্য পণ্য ‘Employability’ বা দক্ষতা’র বাজার তাদের হাতে না। সেই বাজার সাপ্লাই ড্রিভেন না। সেই বাজার কাস্টমার ও ডিমান্ড ড্রিভেন।
সুতরাং, প্রাইস হাইক ও ইনফ্লেশনের বাজারে তারাই একমাত্র গিনিপিগ।
#pricehike #middleclasslife #nakedlife #thuglife #market #limitedincome #capacityofbuying #inflation #whitecollar #economicdepression #childhood #monotony #middleclasslife #nakedlife #thuglife