Skip to content

একটি এপ্রিল ফুলের গল্প

  • by

আজ আপনাদের একটি এপ্রিল ফুলের গল্প বলব। করুণ এক গল্প। অমানুষের কাছে মনুষ্যত্বের পরাজয়ের গল্প।

১লা এপ্রিল এপ্রিল ফুল দিবস বা বোকা বানাবার দিবস কিনা-তার সততা বা অসত্যতা নিয়ে আজ কথা বলবো না। আজ কথা বলব অন্য কিছু নিয়ে।

কেন যেন মনে হয়, আমার চেনা জগতের অনেক মানুষ আমাকে একজন নেগেটিভ মানুষ হিসেবেই চেনেন, অথবা, হয়তো নয়।

যেমনটিই হোক, এই গল্পটি শেষ করবার পরে আপনার আমাকে নেগেটিভ মনে হবে, নাকি পজিটিভ মানুষ, বিচারের ভার আপনার।

এটিকে কি ঠিক গল্প বলবো নাকি একটি দুঃস্বপ্নের বয়ান, আমি এখনো পরিষ্কার নই। আপনি যা বিশ্বাস করেন না, আপনি যা বিশ্বাস করতে চান না-এমন অবিশ্বাস্য কিছু যখন আপনার সামনে ঘটে, আপনার সঙ্গে ঘটে, সেটিকে তো দুঃস্বপ্নই ভাবতে পারেন।

পজিটিভিটি দিয়ে শুরু করি। পজিটিভিটি আপনাদের খুবই পছন্দ। এক দু’দিন আগে আমার সুহৃদ আহবাব মুন্না ভাই কোন একটি মসজিদে তারাবির নামাজ আদায় করতে গিয়ে সেখানে মসজিদের তরফ থেকে এক বোতল পানি ও কিছু খেজুর উপহার দিতে দেখে খুব আপ্লুত হয়ে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন।

তার এই পোস্টটি আমাকেও ছুঁয়ে গিয়েছিল। নেগেটিভ আমি এই পজিটিভ পোস্ট দেখে একবারের জন্য হলেও পজেটিভ মানুষ হয়ে উঠবার স্বপ্ন দেখেছিলাম। এবার আমি আমার মূল গল্পটি বলি।

১ এপ্রিল ২০২৩, ৯ রমজান, সন্ধ্যা ৬:১৫, স্থান হাতিরঝিল, পুলিশ প্লাজায় যাবার পথে পার্কিং টাওয়ারটার উল্টোদিকে অ্যাম্ফিথিয়েটার সংলগ্ন রাস্তা এবং ফুটপাত।

আজান হয়েছে। রোজাদাররা যার যার মত স্থান করে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে বসে বসে ইফতার করছেন। আমি এবং নিটোল অ্যাম্ফিথিয়েটারের  ওভারব্রিজের কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। সামনের ফুটপাতেই এক বয়স্ক ভদ্রলোক কিছু পানি এবং জুসের বোতল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। পথ চলতি মানুষ, বা শাঁ করে ছুটে চলা গাড়ির মানুষেরা দুই একজন দাঁড়িয়ে তার থেকে পানি বা জুস নিচ্ছেন।

আযান শুনে আমি ওভারব্রিজ থেকে হেঁটে সামনেই দাঁড়িয়ে থাকা আমাদের যান্ত্রিক শকটে রাখা ইফতারের ঠোঙ্গাটি নিতে এগোচ্ছি। দূর হতে দেখছি একটি গাড়ি ওই বয়স্ক চাচার পাশেই থামল শাঁ করে। ড্রাইভার গাড়ির জানালার কাচ নামিয়ে কয়েকটি পানি ও জুসের বোতল নিলেন। আমি ঠিক যখন পাস করে যাচ্ছি, দেখলাম গাড়িটি আবার শাঁ করে টান দিল। আমার কেন যেন মনে হলো গাড়িতে থাকা মানুষগুলো এই ভদ্রলোকের পানী ও জুসের দান শোধ করলেন না।

আমি যখন আমার ইফতারের ঠোঙাটা যান্ত্রিক শকট থেকে নিয়ে নিটোলের কাছে ফেরত যাচ্ছি, ভদ্রলোক তীব্র বিষ্ময়, হতাশা, অবিশ্বাস এবং ক্ষুদ্ধ চিৎকার করে বলছিলেন, ”আমার ইফতারের দামডা দিয়া গেল না”। আমি দাঁড়িয়ে শুনলাম, তাকে কিছুটা অনুযোগের সাথেই বললাম ”টাকা না নিয়ে আপনি ইফতার কেন দিয়েছেন। সবসময় টাকা একহাতে, পণ্য আরেকহাতে।”। ভদ্রলোককে কিছুটা বিভ্রান্ত এবং খুব সরল মনে হল আমার।

নিটোলকে গিয়ে গল্পটি বললাম। আমরা দু’জন বহুক্ষণ গাড়ির সেই ভদ্রলোকদের অথবা অভদ্রলোকদের বিবেচনা বোধ নিয়ে কথা বললাম। ফেরার সময় ভদ্রলোকের পাশে আবার দাঁড়ালাম। তিনি তখনও তার আর্থিক ক্ষতি নিয়ে বিলাপ করছিলেন। আমাদেরকে তিনি আবার অনুযোগ করলেন। পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ না বলে এখানেই পজ দিচ্ছি।

আমার যতটুকু মনে পড়ে গাড়িটি ছিল বেশ দামী, ড্রাইভার বাদেও গাড়িতে তিনজন প্যাসেঞ্জার, এর ভেতরে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক, সঙ্গে দুজন নারী এবং তাদের বোতল খুলে পানি পানের দৃশ্যও আমি আবছাভাবে দেখেছি, যার মানে দাড়ায়…….রোজা।

আমি আমার পুরনো পজিটিভিটির গল্পে আবার ফেরত যাই।

বিদেশে, কিংবা বাংলাদেশেও কখনো হয়তো আপনারা দেখেছেন, ইফতারের সময় দেবদূতের মতো কোনো মহাত্মন ব্যক্তি রাস্তায় দাঁড়িয়ে মানুষকে বিনামূল্যে ইফতার সামগ্রী বিতরণ করছেন। এপ্রিল ফুলের সন্ধ্যায় এই বয়স্ক লোকটি (এবং পরবর্তীতে জেনেছি দিনের বেলায় তিনি আরো একটি চাকরি করেন, সন্ধ্যায় পরিবারের ব্যয় নির্বাহের জন্য পার্ট-টাইম পানি/জুস বিক্রি করেন।) তাকে ঠকিয়ে, প্রতারিত করে এই যে দু বোতল পানি, দু বোতল জুস নিয়ে যাবার মত যারা, তারাও হয়তো ভেবেছিলেন, কোন এক দেবদূত ফুটপাথে তাদের জন্য ইফতার নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ জন্যই হয়তো তারা টাকা না দিয়ে চলে গেছেন। অথবা যদি একটু পজিটিভ হই, আমি ধরে নেব তারা ভুলে গিয়েছিলেন। (যদিও ড্রাইভার এবং তার  তিন তিনজন প্যাসেঞ্জার একই সঙ্গে কীভাবে ভুলে গেলেন সেটি এক রহস্য।)

পজিটিভিটির গল্প আর বলবো না। পজিটিভিটির গল্প শেষ করছি এই বলে, যে হয়তো তারা ভুলে গিয়েছিলেন অথবা তারা এই চাচাকে দেবদূত মনে করেছিলেন।

নেগেটিভিটির গল্প হল, আমি একটু আগে বলা পজিটিভিটির গল্পটি নিজেই বিশ্বাস করতে পারছি না। তারা বয়স্ক ওই চাচাকে প্রতারিত করেছেন, ফাঁকি দিয়েছেন এবং আমি মনে করি তারা মহাপ্রভুকেও ফাঁকি দিয়েছেন। দু বোতল পানি, দু বোতল জুস, মাত্র ১০০ টাকা দাম। হয়তো এখান থেকে আয় করা লাভের দশটি টাকা এই চাচার ছেলেটির জন্য বাসি জেলাপী, ছোট মেয়েটির স্কুলের খাতা, নয়তো তার মায়ের গ্যাসের ওষুধ কিনতে কাজে লাগতো। সেহেরির জন্য একটি ডিম কিনতে লাগত। খুব স্বাভাবিকভাবেই দু বোতল পানি আর জুস থেকে তিনি প্রচন্ড লাভ করেন না।

আমি জানি না এই গল্প আপনি পড়বেন কিনা। আমি জানিনা এই গল্প কোন সুদূর পরাহত রহস্যের বিনিময়ে এপ্রিল ফুলের সন্ধ্যায় গাড়িতে থাকা প্যাসেঞ্জার অথবা ড্রাইভার ওই জানোয়ার, ওই অভদ্র, ওই অসভ্য, ওই অমানুষদের চোখে পড়বে কিনা। তবুও কোন কাকতালীয় রহস্যের কারণে যদি চোখে পড়ে, প্লিজ আপনারা আবার হাতিরঝিলে যান। ঠিক অ্যাম্ফিথিয়েটারের পাশের ওভারব্রীজটির পাশেই ওই বুড়ো চাচা প্রতিদিন দাঁড়িয়ে পানি বিক্রি করেন। এক ঢোক পানি খেয়ে ইফতার করে তিনি অন্যদের ইফতারের পানি যোগানোর জন্য চেষ্টা করেন। ওনাকে আপনাদের টাকা দিতে হবে না। ওনার টাকার ব্যবস্থা মহাপ্রভু তার এক পাপী বান্দার মাধ্যমে করে দিয়েছেন এবং গরীব এই বৃদ্ধকে সেই টাকা ওই পাপীষ্ঠ অনেক কষ্টে গছিয়েছেন।

আপনারা শুধু এই চাচার কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইবেন। জাস্ট ক্ষমা চাইবেন। অন্যথায় অভিশাপ বলে যদি কিছু থাকে, সেটিতে অবশ্যই পতিত হবেন। অন্যদের অভিশাপ গায়ে লাগে না, তারা ভাল মানুষ। আমার অভিশাপ লাগবেই, মিস হবে না, কারণ আমি নষ্ট ও পাপীষ্ঠ মানুষ।

#aprilphool #deceit #fraud #humananimals #religion #hypocrisy #inhuman #curse

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *