উগান্ডা’ জিনিসটা বঙ্গদেশে এতটাই বাজার পেয়েছে, যে, আর ক’দিন পরে হয়তো এটি গুগলের মতো একটি ফেনোমেনন বা প্রপঞ্জে রুপান্তরিত হবে। খুব সম্ভবত ‘উগান্ডা’ পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যেখানে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে, প্ররোচনায়, প্রশ্রয়ে, আশকারায় ও চেতনায় চুরি, বাটপারি, ডাকাতি, প্রতারনা, ঠকবাঁজি আর তস্করিকে প্রমোট করা হয়। উদাহরন হাজার হাজার।
দূর্নীতিতে কিংবা দূর্নীতির ধারনা সূচকে বাংলাদেশ পরপর কয়েক বছর চ্যাম্পিয়ন হবার পরে অনেকটা ”বহুত খায়া হেলচি, এইবার তোরা খা” এর মতো করে, অন্যান্য দেশকে চ্যাম্পিয়ন হবার সুযোগ দিয়ে আবার বেশ কয়েক বছর বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিটা ঘরে আনছে না। মনে হতে পারে, দেশ এবার পবিত্র স্থানে পরিণত হয়েছে।
প্রদর্শিত বা সুনির্মিত ডাটা, ইনফরমেশন ও নিউজ দেখে যারা সত্যকে অনুসন্ধান করেন, তারা হুক্কা বা সীসা খেতে থাকুন আর দিবা বা নিশা-যেমন স্বপ্ন ইচ্ছা দেখতে থাকুন।
সত্যিটা হল, দূর্নীতি, যা আমাদের দাদার আমলে ছিল, বড়জোর রেশনিং অফিসে দুই চার টাকা ‘চা পানির টেঁয়া”, কিংবা আমার বাবার আমলে ’খরচাপাতি’, সেটা আজকে হয়েছে ‘স্পিড মানি’। রাজকীয় অফিস আদালত ও সেবাদানকারী স্থানে ঘুষ ছাড়া যদি আপনি লাশটাও কবরস্থ করতে পারেন, ধরে নিতে পারেন, সেটা আপনার তিন পুরুষ আগে কোনো আওলিয়ার কীর্তিতে। আর রাজকীয় কর্তারা আজকাল আর ঘুষ খান না। তারা এখন অনেক পরিণত ও ডিজিটাল। তারা এখন ’প্রোজেক্ট’ খান।
দুঃখ হল, বেসরকারী প্রতিষ্ঠান ও সেবায়ও ওই ‘খরচাপাতি’, ’প্রোজেক্ট’ আর ‘টু পাইস’ ভালভাবেই গেড়ে বসেছে। বাচ্চা বাচ্চা পোলাপানের ফ্ল্যাট কেনার মচ্ছব, গাড়ি কেনার ঝকমারি, ডায়বেটিকসের রোগীর পেশাব করার মতো প্লেন ও বালি যাত্রা, চেকিন তারই নিশান। কয়েকদিন আগেই এক ছোট ভাই তার সাবেক দুই সহকর্মী (যাদের নাক টিঁপলে এখনো দুধ পড়বে), তাদের টু পাইস আর ঘুষের ওই পয়সায় গাড়ি-বাড়ি বানিয়ে ফেলবার বিলাস নিয়ে আফসোস করছিলেন। যাদের ক্যারিয়ার মাত্রই বালেগ হয়েছে।
মজার বিষয় হল, ওনারা দু’জনই বেসরকারী খাতে কাজ করেন, যেখানে স্কোপ খুব কম। তবুও কথায় বলে না, সুপুরুষ হলে সে সবখানেই গুছিয়ে নিতে পারে? ঘুষ ও কমিশন-এটা এখন আমাদের সরকারী, বেসরকারী, শিল্প, দোকানপাট, পরিবার-সবখানেই সামাজিকভাবে স্বীকৃত ও বাহবায়িত এক অতি জরুরী যোগ্যতা।
পাবলিকের পকেট কাটার সব আয়োজন রাষ্ট্র নিজে দায়ীত্ব নিয়ে তস্করদের দিয়েছে। সরকারি উন্নয়ন কাজ হবে।
সিস্টেমেই আছে, সরকারী অফিস নিজে কোনো কাজ করবে না। তারা কনট্রাকটর ভাড়া করবে। ছোটবেলা হতেই জানি, কনট্রাকটর মানেই চুরি। দুই টাকার কাজ করে ১০ টাকা মেরে দেবার নাম কনট্রাকটরি। আবার সেই চুরিটাই অফিশিয়াল সিস্টেম। একটা রাস্তা হবে। সিএ্যান্ডবি সেটা নিজেরা কেন করবে না-সেটা আজও মাথায় ঢোকে না। একটা দালান হবে। পিডব্লিউডি কেন সেটা নিজেরা না করে কনট্রাকটর দিয়েই করাতে হবে-তা আজও মাথায় ঢোকে না। কনট্রাকটর সিস্টেমটাই হল, একটা দালান বানাবেন, ব্রীজ বানাবেন, নামকা ওয়াস্তে একটা ওয়ার্ক স্পেসিফিকেশন তৈরী হবে। যে কনট্রাকটর যত কম টাকায় সেই স্পেসিফিকেশন পূরনের দর দেবে, সেই কাজ পাবে। সেই দর, মানে হল সর্বনিম্ন দর।
খেয়াল করুন, বিষয়টা হল সর্বনিম্ন দর। সিস্টেমটা সবচেয়ে কস্ট ইফেকটিভ দর না। ফলাফল, ব্রীজ বানাতে সত্যিকারে যদি খরচ হয় ১ লাখ, কনট্রাকটর দর দেবে ১০ লাখ। ৯ লাখ তার লাভ, ১ লাখ খরচ দেখানো। মানে, ডিলের টাকা বা ওই এস্টিমেটেড প্রজেক্ট কস্ট হতেই তাকে লাভ তুলে নিতে হবে। সে তো তখন চুরি করবেই। এটা না করে, সরকারের নিজস্ব প্রকৌশলি ও কর্তারা যদি ওই ব্রীজটার সবচেয়ে ইফিশিয়েন্ট একটা কস্টিং করে দিত আর সরকার সিস্টেম করে দিত, যে, যে কোনো কনট্রাকটর এখন হতে নিজস্ব দরে কাজ করবে না।
সরকার তার প্রকল্পের সব খরচ ও অন্যান্য স্পেসিফিকেশন তার নিজস্ব কর্মী দিয়ে সেট করে দেবে। কেনাকাটা কনট্রাকটর করবে, তবে সেগুলোর মনিটরিং সরকারের অলস কর্তারাই করবে। তাহলে কনট্রাকটরের মুনাফা কোথায়? সরকার প্রতি হাজার বা লক্ষ টাকার পূর্ত বা যেকোনো কাজ করাতে নির্দিষ্ট রেটে কনট্রাকটরকে চার্জ/ফিস/কমিশন দেবে, আর মূল কাজের কস্ট সরকারই ফিক্স করবে-তাহলে আর কনট্রাকটর মূল কাজের বাজেট আর নিজের মুনাফা গুলিয়ে ফেলে সমানে চুরির সুযোগ পেত না। এই বিদ্যা হয়তো আমার মতো আবুলের মাথায়ই ঘোরে। নিশ্চই এটা একটা থার্ড ক্লাস চিন্তা। এর চেয়ে স্মার্ট চিন্তা করার মতো বুদ্ধিজীবিতো দেশে কম না। তাদের মাথায় নিশ্চই কার্যকর কোনো বিদ্যা আছে। সেটা নিয়ে নিলে এই যে উন্নয়ন বা পূর্ত কাজে চুরির নারকীয় উৎসব-সেটার রাস্তাটা বন্ধ হত। কনট্রাকটরের দয়ার ওপর সব ছেড়ে দিয়ে আবার দেশপ্রেমের বুলি আওড়ালে কেমন কেমন লাগে না?
তস্করির পুরোনো খেলোয়াড় মোবাইল কোম্পানী, যারা ডাটা গতির দরে কিনে গন্ডার দরে বেঁচে। তার আবার মেয়াদও থাকে। সরকার এই ডাকাতির সব সুযোগ তাদের দিয়ে রেখেছে। সেই ডাকাতরা ’উগান্ডা’র দ্বিখন্ডিত রাজধানী খোদ ’ফাঁকা’ শহরেই নিরবচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক দিতে পারে না। তারাই আবার টিভিতে এ্যাড দেয়, নীলগিরির পাহাড়ের ওপর বসে আদিবাসী বালক বালিকার ইউটিউব করার। উগান্ডান টিভিতেই একটা এ্যাড দেখলাম, এক খ্যানাডিয়ান বালিকা তার আরেক ইউটিউবার উগান্ডান বান্ধবীকে বলছে, “মলিন কাপড় পরে ইউটিউবে আসা যাবে না।”
এত বকবকের আসল কাহিনী এবার বলি। প্রায় ১৭ বছরের পুরোনো ফোন সীম ৩ দিন আগে নতুন করে তুলেছি। ৩ জি এর জায়গায় ৪ জি পেতে। নিজের সিম নিজে পেতে ২০০ টাকা গুনাগারি দিলাম। মাগনা কিছু ’এমবি’ পেলাম। সেই মাগনা ’এমবি’ আর ৪জির খ্যামতা পরীক্ষা করতে সকালে একটা নতুন যায়গায় যাব, গুগল ম্যাপের সহায়তা নিলাম। ‘সার্চ’ দিয়ে যায়গাটা ম্যাপে একবারই দেখতে পেলাম। তারপরই নেট হ্যাং। ৪ দফায় রিফ্রেশ হল, রি-সার্চ হল। ফলাফল সেই একই। বরাবরের মতোই গুগল ম্যাপ ব্যর্থ।
সেই আদিম কালের মতো “ভাই অমুক যায়গাটা কোথায়?” আর উত্তরে “ওই তো দেহা যায়” এর সাহায্য নিয়েই গন্তব্য চিনতে হল। যত যা ই বলেন, আমাদের দেশের এইসব ‘মানব ম্যাপ’ এর থেকে গুগল ম্যাপ মোটেই এ্যাডভান্সড না। ম্যাপ বাফারিং করতে করতে ওই গন্তব্যে পৌছে গেলাম। আমার ম্যাপ আর আমাকে যায়গা দেখানোই শেষ করে না। এটার নাম ৪জি। মোবাইল অপারেটরের নাম প্রকাশ করলাম না। মামলা খাবার ভয়ে। কয়েকদিন আগেই এক সুহৃদ সামান্য এক সত্য কথা প্রকাশ্যে বলে পৈতৃক নামটাই হারাতে বসেছিল।
সত্যি কথা সত্যি করে বলার মতো বুকের পাটা আছে সুহৃদ মাযহার সাহেবের। আমার সেই সাহস নেই। আমি নপুংশক। হয়তো স্ত্রৈণও হব।
#roleofstate #patronize #promote #backing #provoke #corruption #bribe #malpractice #scam