আজ আপনাদের সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ’র লালসালু’র একটা ছোট্ট অংশ পড়ে শোনাব। হ্যা, আমার স্মৃতি ভয়ানক খারাপ হওয়ায় নিজের মতো করে রং চড়িয়ে বলব। প্রেক্ষাপট জানতে চেয়ে লজ্জা দেবেন না। যার যার দরকার মতো প্রেক্ষাপটে বসিয়ে নিন।
লালসালুর অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র মজিদের তখন উঠতি ক্যারিয়ার। পীরানীর ও মাজারের ব্যবসা জমে গেছে। এমন সময় গ্রামের এক উঠতি শিক্ষিত যুবক গ্রামে একটা স্কুল করার জন্য উঠেপড়ে লাগল। হাওয়ায় ভেসে এ কথা মজিদের কানে আসে। সে জানে, স্কুল বসাতে দিলে একসময় তার ব্যবসা লাটে উঠতে পারে। ইয়ে, গল্প’র আধাটা পড়ে বা পড়ে কিছু না বুঝেই যদি আপনি এর মধ্যে ধর্মবিদ্বেষ পেয়ে বসেন, তবে আর পড়বেন না প্লিজ।
আজকাল আধাখিচড়া মনগড়া ট্রল নিয়ে বাঙালী বেশি উদগ্রীব। গভীরে যাবার সময় ও মন তার কোনোটিই নেই। তাইতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির ভাষন কেটে ৩০ সেকেন্ড নিয়ে বিখ্যাত ভাইরাল ট্রল হয়। এদেশে নাকি আবার ’বাঘস্বাধীনতা’ নেই।
যাহোক। লালসালুতে আসি। কী বলছিলাম? হাওয়ায় ভাসে, কোন এক যুবক, ধরি তার নাম উপন্যাসে ছিল আক্কাস, সে গ্রামে একটা স্কুল দেবার চেষ্টা করছে। তো মজিদ দেখে, স্কুল হলে তো সে শেষ। কীভাবে এটাকে ভন্ডূল করা যাবে? একদিন বৈঠক বসালো গ্রামে। গ্রামের গন্যমান্য সবাই এসেছে। চাষাভূষারাও এসেছে। সেই যুবক আক্কাসও এসেছে। সে রেডি হয়েই এসেছে, যাতে স্কুল নিয়ে প্রশ্ন করলে হাজারটা যুক্তি দিতে পারে।
মজিদও তৈরী।
আসলে খলের তো ছলের অভাব হয় না। পুরো বৈঠক পিনপতন নিরব। আক্কাস স্কুল নিয়ে প্রথম প্রশ্নের জন্য রেডি হচ্ছে। মজিদ গলা খাকারি দিয়ে তার প্রথম বোমাটা ছোড়ে, ”ওই মিয়া, তোমার দাড়ি কই?” আক্কাসকে প্রথম গোলাটাই মোক্ষম করে ছোড়ে মজিদ। তারপর বাকিটা ইতিহাস।
আক্কাসের স্কুল গাঁয়ের মুরব্বীদের বকা, গালি, তিরষ্কার, দাড়ি না থাকার বিচার, আহাজারিতে খড়ের মতো উড়ে যায়। পাবলিক সেন্টিমেন্টকে এক্সপ্লয়েট করে সত্যকে ধামাচাঁপা দেবার পুরোনো কায়দা।
যৌক্তিক পথে, ন্যায্য পথে যুদ্ধ জিততে না পারলে, সোজা পথে আলোকে রূখতে না পারলে, উচিত পথে হারের সম্ভবনা থাকলে, পেছন পথে কীভাবে সত্যকে গলা টিপে মারতে হবে, তার মোক্ষম তরিকা জানা থাকে মজিদ নামের খলদের। কি কর্পোরেটে, কি সমাজে, কি মাঠেঘাটে, সবখানে মজিদরা একই পন্থা অবলম্বন করে আপনাকে কাত করে দেবে। সাধু সাবধান।
জনতার ডাইভারশন নিয়ে আরেকটা ছোট উদাহরন বলি।
খাঁজকাটা খাঁজকাটা নামে একটা পপুলার গপ্প আছে কুমিরের রচনা নিয়ে। এক ব্যাটা, তাকে যাই লিখতে দেয়া হয়, সে সেটাকে ত্যানা প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে কুমিরের খাঁজকাটা লেজে নিয়ে ফেলে।
তেমনি কিছু আজারিয়া ত্যানা প্যাঁচানো সিনিক পাঠক পেয়েছি। এই গ্রূপটা কোষ্ঠকাঠিন্য ও ফ্রাস্টেশনের ডিব্বা। পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবনে অতৃপ্ত ও বঞ্চিত এই পাবলিকগুলো যাই লিখি, এরা বুঝুক না বুঝুক, তারে ত্যানা পেঁচিয়ে আরেক যায়গায় নিয়ে যায়। যেই ইস্যুতে লিখি সেটার কিছুই বোঝে না, ত্যানা প্যাঁচায় তাই আরেক যায়গায়।
এক লেখায় লিখেছি ডাক্তারদের সারাজীবনই পড়াশোনার মধ্যে থাকতে হয়। যাস্ট একটা উদাহরন। মূল গল্প অন্য ইস্যুতে। তিন ব্যাটায় তারে ত্যানা প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে নিয়ে গেছে ডাক্তাররা কসাই, হেরা মানুষ খুন করে, হেরা সব স্পয়েল্ট সেই প্যানপ্যানানিতে। আমি তাদের বুদ্ধি দিছি অসুখ করলে দরবেশ খুঁজতে বনে গিয়ে। ডাক্তার যেন না দেখায়।
ইস্যু নিয়ে বঙ্গদেশ সবসময়ই ঢিঁসু ঢিঁসু। জনশ্রতি আছে, দেশের ছারখারই নাকি গদি টিকিয়ে রাখতে সবসময় ইস্যুর জন্ম দেয়। তো ঘটনা যেটাই হোক, ইস্যু কীভাবে ডোমিনেট করে, রেজিম কীভাবে জনতাকে ডাইভার্ট করে সেটা দেখাই।
ইঙ্গ-মার্কিন জোট ইরাকে হামলা শুরু করার কিছু মুহূর্ত আগে। ট্যাকটিক্যাল রুমে। বুশ, ব্লেয়ার আর জাতিসঙ্গম এর প্রেসিডেন্ট বসে।
বুশ বলল, ইরাকে ব্যাপক হারে হামলা করব। ১ লাখ মানুষ আর ১৫ টা উট মেরে ফেলব।
জাতিসঙ্গমের প্রেসিডেন্ট জিজ্ঞেস করল, বস, ১৫ টা উট কেন? বুঝলাম না?
বুশ বলে, দেখলে ব্লেয়ার, কেন আমি তোমাকে বলেছিলাম, যে, ইরাককে তামা বানিয়ে দিলেও কিছু হবে না। ১ লাখ মানুষ মেরে ফেলব, তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই, ১৫ টা উটে ফোকাস।
ঐতিহ্যগতভাবে, ইতিহাসের পাঠ ধরে দেখলে খাসলতগতভাবেই বাঙালিরা কখনোই মৌলিক, বুনিয়াদি ও গভীরের চিন্তা নিয়ে চিন্তিত হতে রাজি না। তারা সবসময় দুধের ওপরে ভাসা সর, ইস্যুর ওপরে ভাসা হাইপ, এবং, গামছা চোখে দিয়ে কানামাছি খেলতে বেশি আগ্রহী।
তারা ১৫ টা উটের মৃত্যু নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন হবে; বা বলা যায়, তাদেরকে সবসময় মূল ইস্যু, মূল ফোকাস হতে সরিয়ে দুই নম্বরি ফোকাসে নিবদ্ধ করা খুব সহজ।
মূল ফোকাস হতে কায়দা করে সরিয়ে আবজাব বা ফালতু ইস্যুতে তাদের আটকে রেখে ফায়দা তোলা খুব সহজ। এবং, মজার বিষয়, এই রাজ্যে সত্যি কথা বলা, ন্যায্য কথা বলা মানেই আপনি শ্যাষ। মেজরিটির মতের বিরুদ্ধে বললে তো আপনার গর্দানই নেই।
কোটা ভারসাস মেধা নিয়ে দেশ উত্তাল। রাষ্ট্র নাকি মেরামতও চলছে। (যদিও কোটটা অন্য আন্দোলন বাচ্চাদের ’নিরাপদ সড়ক’ হতে ধার করা।)।
তা এই মেরামতের ফোকাস দেখানো হচ্ছে, মেধা ভারসাস কোটা। কোটা নাকি মেধাকে শেষ করে দিচ্ছে।
আমি যেহেতু এই চাকরি সিস্টেমের কিছুই জানি না, তাই মেধা ও কোটার যেকোনো কিছু নিয়ে কথা বলতে অপারগ। যে বিষয়ে জানি না, তা নিয়ে কথা বলা বেত্তমিজি।
কিন্তু, একজন দানবসম্পদ পেশাজীবি হিসেবে কয়েকটা মৌলিক প্রশ্ন আমার আঁতেল মস্তিষ্কে ঘুরপাক খায়।
১. রাজকীয় চাকরি ও চাকরিদাতা কর্তৃপক্ষের দিকটাতে HR জিনিসটা, ও HR বিভাগটা যে নেই, অথচ, সারা দুনিয়ায় এখন একটা মাস্ট, এই প্রশ্ন আমাকে ভাবায়।
২. প্রাইভেট সেক্টরে আমরা HR ও (সার্বিকভাবে) HR উন্নয়ন নিয়ে যে প্রচন্ড এফোর্ট দিই, প্রতিষ্ঠানের টপ হতেও সিরিয়াসলি এফোর্ট দেয়, সেটা যে রাজকীয় জবে একদমই অনুপস্থিত, কেউ সেটা নিয়ে কনসার্ন না কেন-তা আমাকে ভাবায়।
৩. রাজকীয় যে কোনো জবে ‘মেধা’ সত্যিই ফোকাসড কিনা-তাও আমার কৌতুহল। মেধা ফোকাসড কিনা-মানে আমার জানতে ইচ্ছে করে, যে, রাজকীয় চাকরির (আবেদনযোগ্যতা, আবেদন প্রক্রিয়া, পরীক্ষা, বাছাই, নিয়োগ, ব্যাকগ্রাউন্ড ইত্যাদি) এ টু জেড বিষয়টাতে ‘মেধা’ আদৌ কোনো ফোকাস কিনা।
৪. রাজকীয় চাকরির বাছাই প্রক্রিয়াতে ’মেধা’র যাচাই ফোকাসড কিনা? নাকি স্রেফ কিছু সেট মেকানিজমের ফিল্টারে কারা পাস আউট হয়-সেটা ফোকাসড? বলতে চাইছি, যে, যেকোনো গ্রেডের, যেকোনো কর্তৃপক্ষের যে বাছাই প্রক্রিয়া (আবেদন, আবেদন স্ক্রূিটিনি, MCQ, Written, Viva, background check) এর পুরোটাতে মেধা যাচাইকে ফোকাস করা হয় কিনা? আমরা যে প্রাইভেট চাকরিতে নেবার সময় তাদের ইনটেনসিভ যাচাই করি (দারুন সব আধুনিক টুলস, মেথডস), যাকে আমরা এক কথায় বলি কমপিটেন্সি বেজড হায়ারিং-সেটা ওখানে হয় কিনা? কৌতুহল মাত্র।
৫. রাজকীয় নিয়োগ কর্তৃপক্ষের মানুষদের আমাদের বেরাজকীয় HR প্রফেশনালদের মতো নানা রকম প্রফেশনাল ট্রেইনিং ও সার্টিফিকেশন নিতে হয় কিনা? যারা নিয়োগের কাজ করেন, তাদের PGD in HRM/MBA in HRM করতে হয় কিনা? আমি তো দেখি তাদের মধ্যে PHD করার ঝোঁকই বেশি।
মেধার মূল্যায়ন হচ্ছে না-এই যখন জাতীয় আক্ষেপ, তখন ওপরের মৌলিক ও বুনিয়াদী প্রশ্নটাও প্রাসঙ্গিক হবার কথা।
৬. সবচেয়ে বড় কথা, রাজকীয় কর্তৃপক্ষের কোটালদের কাজে কর্মে মেধা বা প্রতিভার সাক্ষর রাখার স্থানটা কোথায়-সেটাই একটা বড় প্রশ্ন। আমি তো মেধার প্রয়োগের স্কোপও দেখি না। প্রশাসক যে দেশে পি.এইচ.ডি হোল্ডার হয়, সেই ডক্টর সাব কী গবেষনাটা প্রশাসনে করবেন-সেটাই রহস্য।
এগুলো স্রেফ আমার কৌতুহল। অর্বাচীন কৌতুহল। কেউ যদি চলমান কোনো হাইপড ইস্যুর বিপরীতে এটাকে টুইস্ট হিসেবে মনে করেন, ভুল করবেন।
যে কোনো মানুষের কাজ ও মতাদর্শ নিয়ে আমি দ্বিমত পোষণ করতে পারি। কিন্তু তার দ্বিমত বা নিজস্ব মত পোষণের যৌক্তিকতা ও অধিকার নিয়ে কথা বলবার অধিকার আমার নেই।
আমি নিজেও অনেকবার বলেছি, যে, একটি অন্যায়ের প্রতিবাদ হয়নি বা হচ্ছে না বলে অন্য আরেকটি অন্যায়ের প্রতিবাদ হতে পারবে না-তা নয়। হতেই পারে। প্রতিটি ইস্যুই ভিন্ন।
তবে, যখন ক্রমাগত দেখতে হয়, যে, মানুষ তার মৌলিক ও বুনিয়াদি প্রতিবাদটিতে সরব হয় না, সরব কেবলমাত্র ব্যক্তি ও দলগত স্বার্থকেন্দ্রীক ইস্যুতে, যখন মানুষ ম্যাক্রো ইস্যুতে প্রতিবাদ করে না, বুনিয়াদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে পথে নামে না, তখন মনটা সায় দিতে খচখচ করে।
যখন মৌলিক অধিকার হরণ করে নেয়া হয় অথচ প্রতিবাদ করে না জনতা, যখন স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হয় অথচ বিক্ষুদ্ধ তারুণ্য পথে নামে না, যখন জাতির মাথা হতে মেধা ও মনুষ্যত্ব কৌশলে বের করে নিয়ে গিয়ে তাদেরকে টিকটক আর ভিউয়ের মাদকে মোহাবিষ্ট করে দেয়া হয় আর তখন কোনো আন্দোলন হয় না, তার পরে যখন আরেকটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ওঠে যেটি অন্যায় অথচ প্রান্তিক, যেটি অন্যায় অথচ সার্বজনীন নয়, যেটির প্রতিবাদ হওয়া দরকার অথচ সেটি অন্যায়ের আতূড় নয় বরং অফস্প্রিং মাত্র, তখন নিজের হাতখানা মুষ্টিবদ্ধ হতে গিয়েও কেন যেন পিছিয়ে যায়।
আমাদেরকে বছরের পর বছর যখন সুবিধাবাদী ও ভীরু করে তোলার প্রকাশ্য অন্যায়টা হয়ে এসেছে, তখন প্রতিবাদ হয়নি, কৌশলে পাশ কেটে গেছি আমি-তুমি-সে, এই বলে, যে, ওটা তো আমার ইস্যু না; তখন আজ যখন যবন এসে আমাদের কলিজাটাও কেটে নিয়ে যেতে উদ্যত হয়, তখন বাকিরা কেবল দর্শক রয়ে যায়।
কেন যেন মনে হয়, আমাদের কেবলই ডাইভার্ট করা হয়। ইস্যুর পিঠে ইস্যু দিয়ে আমাদের কানাগলিতে আবদ্ধ রেখে যবন তার কার্যসিদ্ধি করে যায়। আমাদের সামনে থাকা সুঁইটাতে নিবদ্ধ রেখে পেছন হতে হাতিটাকে পার করে নিয়ে যায় চোরাকারবারির দল। ইস্যুর পিঠে ইস্যু বাজারে আসে, আমরা হাইপে মাতি, নতুন হাইপে ডাইভার্ট হই, কেউ কোটায় মাতে, কেউ চেতনায়, আরেকদল মেসি বন্দনায়; ওদিকে সাম্রাজ্যবাদী বুট ব্যবসায়ীরা আমাদের গা হতে চামড়া খুলে নিয়ে যায়।
#revolution #khajkata #diversion #transformation #manipulation #complexity #readers #blame #defame #criticism #review #bypass #divert #diversion #tricks #issue