Skip to content

নষ্ট ছেলের উপাখ্যান

  • by

লম্বা লেখা দেখলেই যারা সাঁই করে অন্য পেজে চলে যান তারা চলেই যান। আপনাদের মুল্যবান সময় নষ্ট হবে। কারন আপনি যেটা চান সেই চান মিঁয়ার সেলফি মলম এখানে নেই। আর লম্বা লেখা দেখলে যাদের চোখ চকচক করে ওঠে অনেকক্ষন ধরে পড়া যাবে-এই নেশায়, তারা ধৈর্য ধরে পড়ুন।

গোঁপাল অতিশয় সুবোধ ও সুশীল বালক। গোঁপাল প্রত্যহ প্রত্যুষে গাত্রোত্থান করে। গোঁপাল প্রত্যহ প্রভাতে পাঠাভ্যাস করে। গোঁপাল প্রত্যহ কুসুম গরম জলে স্নান করে। গোঁপাল চুলে জবাকুসুম তৈল দেয়। গোঁপাল সিঁথি কাটিয়া চুল আচড়ায়। গোঁপাল প্রত্যহ সময়মতো বিদ্যালয়ে যায়। গোঁপাল অতি মনোযোগ সহকারে পাঠ গ্রহন করে। গোঁপাল দুষ্টু বালকদের সহিত মেশে না। গোঁপাল তাহাদের মতো বালিকাদের দিকে চোখ তুলিয়াও তাকায় না। গোঁপাল প্রত্যহ সন্ধ্যায় পিতার নিকট পাঠাভ্যাস করে। গোঁপাল টেলিভিশন দর্শন করে না। গোঁপাল প্রত্যহ রাত্রে এক গ্লাস দুগ্ধ সেবন করে। গোঁপাল সময়মতো নিদ্রা যায়। গোঁপাল অতিশয় সুবোধ ও সুশীল বালক (গোঁপাল কলা খায়)।।

আমার অধিকাংশ সহপাঠিরাই গোঁপাল হবার স্বপ্ন দেখত। তাকে প্রানপনে অনুসরন করত। ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় যাই হোক। আমিও করতাম তবে সেটা পিটানির হাত হতে বাঁচতে।

গতকাল একটা রং নাম্বার কল এলো। ওপাশ থেকে জিজ্ঞেস করে আমি হিমু কি না? সাধারনত রং কল এলে আমি বরাবরই তাদের নিয়ে মজা করি। বললাম, না, যেহেতু আমি হলুদ পাঞ্জাবী পড়ে নেই আর আমার পায়েও জুতা আছে তাই আমি হিমু হবার যোগ্য নই ।” ভদ্রলোকের ফোন রেখে দেবার পর একটা নষ্টালজিয়ায় ভুগতে লাগলাম। হুমায়ুনের চরিত্র হিমু’র বাবা হিমুকে মহাপুরুষ বানানোর জন্য একটা পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া অনুসরন করেছিলেন। হিমু অন্তত না হোক, আমাকে গোঁপালের মতো গড়ে পিটে তুলবার কি অসাধারন প্রয়াস আমার মুরব্বীরা ছোটকালে করেছেন আর তার বিপরীতে আমি কি হয়েছি?

ছোটবেলা হতে আব্বা আমায় সুবোধ বালক হিসেবে গড়ে তোলার সবরকম চেষ্টাই করেছিলেন। আমাদের বাল্যকালে আদর্শ লিপি ও বাল্যশিক্ষা নামক দু’টি বই আমাদের পড়তে হত। মা খালারা সুর করে করে আমাদের বাল্যশিক্ষা পড়তে দিতেন। জসিম-শাবানা-রাজ্জাক-কবরী যুগে সিনেমাতে প্রচন্ড রকম মিথ্যা একটি চালাকি থাকত। সেটা হল, দুটো গোলাপ ফুল কাঁপতে কাঁপতে একে অপরের সাথে টোকাটুকি (বা ঠোকাঠুকি) করলেই পরের দিন নায়িকা বমি করা শুরু করত, আর তার পরের সিনে নায়িকার ঘরে মানুষের ছানা চ্যাঁও চ্যাঁও করত। মানে, দুটো গোলাপ ফুলের টোকাটুকিতে বাচ্চা পয়দা হয়।

আমাদের সমাজে সিনেমা হতে শেখানো, সমাজে প্রচলিত এরকম আরও কিছু বোগাস মিথ আছে। যেগুলোকে আমরা দেখতে দেখতে, এবং দেখাতে দেখাতে সত্যের মতোই ধরে নিয়েছি। কেমন?

১. মুখে ক্লোরোফরম মেশানো রুমাল ধরলেই মানুষ অজ্ঞান হয়ে যায়। সিনেমায় আমরা তেমনই দেখি। অথচ, সায়েন্স বলে, ক্লোরোফরম দিয়ে মানুষকে অজ্ঞান করতে অন্তত ৫ মিনিট লাগে। হ্যা, তাই বলে আবার চেষ্টা করতে যাবেন না। এটা বলবার জন্য বলা। জিনিসটা ক্ষতিকর।

২. অজ্ঞান কারো মুখে সামান্য পানি ছিটালে সাথে সাথেই জ্ঞান ফেরে। কিন্তু, মানুষ অজ্ঞান হয় তার ব্রেইন ও নিউরোলজিক্যাল সিস্টেমের ফেইলিয়ার বা ম্যালফাংকশনের কারনে। মুখমন্ডলে পানি ছিটানো কীভাবে নিউরনকে বা ব্রেইনকে হিট করে?

এই মিথের হাত ধরে এবার আসল গপ্পটা পাড়ি। এটা অনেকটা আমাদেরকে শেখানো অসার বুলি, “বড়দের মুখে মুখে কথা বলতে নেই”, “বাবা-মা যা করে সন্তানের ভাল’র জন্যই করে” এসবের মতো।

ছেলেবেলায় আমাদের মুরব্বী ও শিক্ষকরা আমাদের প্রচুর নীতিগল্প বলতেন। আমাদের শিক্ষার জন্যই বলতেন। যার অনেকগুলো আবার থাকত ঐতিহাসিক সত্য ভিত্তিক বয়ান। তখন আমাদের কাঁচা বয়স। সেগুলোকে সত্য ধরে নিয়ে মান্য করতাম।

বড় হয়ে শিখলাম, ওনাদের বলা সেই গল্পগুলো অধিকাংশই ভূয়া। ভূয়া, তবে পবিত্র মিথ্যা। ওনারা মনে করতেন, নৈতিক ও পবিত্র শিক্ষার জন্য মিথ্যে গল্প বলা ঠিক আছে।

ঠিক সে কারণেই কিনা জানি না, আমরাও আবার পরীক্ষার খাতায় ভূয়া চিন্তক, তাত্বিক, অধ্যাপকের রেফারেন্স দিতাম। কোনো সংজ্ঞা মনে পড়ছে না, লিখে দিতাম, মি. কার্লাইল বলেছেন………………; অথবা, হয়তো নাম মনে আছে, সংজ্ঞা বা কোটেশন মনে নেই, লিখে দিতাম, বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মি. আব্রাহাম লিংকন বলেছেন……………..। বাস্তবে ওই মিয়া কার্লাইল নামে কেউ হয়তো জগতে কোনোদিন ছিলেনই না। অথবা, মি. আব্রাহাম হয়তো রাষ্ট্রবিজ্ঞানীই নন, তিনি হয়তো বাস্তবে একজন বাংলাদেশী আমলা। যারা আবার যার যার টপিক বা সাবজেক্টে কেউ এক্সপার্ট নন, সবাই স্রেফ প্রশাসক।

তো, এই যে, কল্পিত একেকজন চিন্ত্যক বা তাত্বিকের নাম মেরে দেয়ার কাজটা; এটা করতে গিয়ে সামান্য বিবেকের কামড় যে অনুভব হত না তা না। হাজার হলেও আমরা দাপর যুগের মানুষ।

তবে, কাজটা করতে আবার আমাদেরকে নৈতিক সাহস যোগাতো ওই যে বললাম, শিক্ষকদের বলা মিথ্যা অথচ পবিত্র গল্পগুলো, যেগুলোকে তারা শিক্ষক হয়েও অবলিলায় সত্য ঘটনা হিসেবে, বা, সত্য ঘটনার মতো করে আমাদের বলতেন।

আর দুঃসাহস যোগাতো এই ভরসা, যে, শিক্ষকরা আমাদের খাতাগুলো জীবনেও পড়ে দেখবেন না। সেই সাহসে আমরা সম্রাট হুমায়ুনের বাবার নাম সম্রাট সিরাজদ্দৌলা লিখে আসতাম বুক চিতিয়ে। কারন, জানতাম, যে, স্যার, খাতা পড়বেন না। পড়লেও, খাতা দেখার মূল কাজটা করবেন তার তরুনী কন্যা, বা, তার পেয়ারের কোনো ছাত্র/ছাত্রী। তো, এত ভয়ের কী আছে? গোঁপালের মতো একটি সুবোধ বালক হিসেবে গড়ে তুলবার কি প্রানান্ত চেষ্টা আমাদের চতুর্কুলের প্রিয়জনরা করেছেন তার ইয়ত্তা নেই।

আমার মনে পড়ে, যার সাথেই দেখা হত তিনিই একটা সদুপদেশ দিতেন।

”মন দিয়ে পড় খোকন, বড় মানুষ হতে হবে”-যদিও জানি না, মন কাকে দিয়ে তারপর পড়ব।

”কখনো মা-বাবার অবাধ্য হবে না”-যদিও জানি না কোনটা বাধ্যতা আর কোনটা অবাধ্যতা। ”বেশি বেশি টিভি দেখবে না”-যদিও জানতাম না, টিভি কেন দেখা যাবে না আর সবচেয়ে বড়রাই বা তাহলে কেন সারা সন্ধ্যা টিভি দেখে।

”মেয়েদের সাথে মিশবে না তাহলে মেয়েদের মতো হয়ে যাবে”-যদিও বুঝতাম না মেয়ে জেন্ডার কি ছোঁয়াচে যে আমরা তাদের ছোঁয়ায় মেয়েতে রুপান্তর হব। ”বেশী করে নামতা মুখস্ত করবে”-মাথায় ধরত না ক্যালকুলেটর থাকতে নামতা মুখন্ত কেন?

”পানির কাছে যাবে না, পুকুরে (মাইট !!!!!!) থাকে”-অথচ আমি পানির পোঁকা।

”বড়দের সামনে বেশী কথা বলবে না”-তবে কি ছোটদের সাথেই শুধু বেশী কথা বলা যাবে?

”বড়দের মুখে মুখে কথা বলবে না”-আমার মাথায় আসত না বড়দের মুখ দিয়ে আমি কবে কথা বললাম?

”মেহমানদের সামনে বেশী দুষ্টুমী করবে না, তারা পঁচা বলবে”-অথচ তাদের সাথে আসা বান্দরগুলা যত বাদরামো করত আমারদের মুরব্বীরা ততই বলত “বাহ! বাচ্চাটা খুব স্মার্টতো।”

”রোদে বেশী ঘুরবে না, অসুখ করবে”-অথচ রোদে রোদে ঘুরে মার্বেল না খেললেই তো আমার যত অসুখ করে।

অতঃপর আরো বড় হলাম। ইউনিভার্সিটি ঢুকলাম। গ্রাজুয়েশান করলাম। ম্যাচিউরড হলাম। একা থেকে দোকা হলাম। তবু সেই গোঁপালের ক্যানভাসাররা আমায় ছাড়ে না। তারা আমাকে তাদের মনমতো বানাবেনই।

”ভাইসাহেব, ফ্ল্যাট কবে কিনছেন, এখনি না করলে আর কখন?” (যদিও আমার কামাইতে ঘরভাড়াই ঠিকমতো শোধ করতে পারি না)।

জুম্মাবারেও আপনাকে দেখি না। বয়সতো কম হল না। (যদিও তিনিদ সপ্তাহের অন্য কোনোদিন ওখানে যান না)।

”এখনো দু’জনই আছেন? সেকি? আরো এনজয় করে নিতে চান? দেরী করা ঠিক না” (সাথে একটা তেরছা হাসি। যদিও আমি জানি কি দুর্বোধ্য যন্ত্রনায় ভুগি এই অসম্পূর্ণ দম্পতি)।

”কোলেষ্টেরোলটা টেষ্ট করে নেন, অবহেলা করবেন না” (অথচ তিনি জানেন না, পয়সার অভাবে আমি ওপেন হার্টটা করছি না ৭ মাস ধরে)।

ভাইজান, কখনো রাত করে ফিরবেন না, শহরের অবস্থা ভাল না” (রাত নামার আগে অফিস ত্যাগের স্বপ্ন দেখলেও চাকরী নাই হয়ে যাবে)।

”পরকালের কথা একটু ভাবুন এবার” (তিনি পরকালের কথা ভেবে এক বিধবার জমি দখল করে একটা প্রবীন হিতৈষী সংঘের অফিস খুলেছেন)। ”রোজ তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে কী হবে? মাঝে মাঝে একটু এনজয় করুন না লাইফটা” (এনজয় করতে গিয়ে তিনি গোপনে এইচআইভি নিয়ে ঘুরছেন আর তা অকাতরে বিলোচ্ছেন)। ”আপনি এখনো স্মার্ট ফোন নেন নি? নাহ, আপনি এখনো ব্যাকডেটেড রয়ে গেলেন” (ফোন কিভাবে স্মার্ট হয় তাইতো জানি না)।

একজন: ”মোটা হয়ে যাচ্ছেন, ডায়েট করুন”/ অন্যজন: ”একদম শুকিয়ে যাচ্ছেন, খাওয়া দাওয়া করুন ঠিকমতো” (বুঝি না, খাব নাকি রোজা রাখব)।

”ঈদে ভাবীকে নিয়ে কক্সবাজার ঘুরে আসুন” (তিনি নিজে ঈদের দিন নামাজ পড়েই সারাদিনের জন্য শ্বশুরালয়ে পড়ে পড়ে ঘুমান)। ”আরে ভাই এই বয়সেও না করলে আর কবে” (তিনি নিজে করার মধ্যে করেন পত্রিকা স্ট্যান্ডে ফ্রি পত্রিকা পড়া)।

অনেক চেষ্টা করেও আমি সবার মনের মতো হতে পারলাম না। শান্ত, সুবোধ, সুশীল, নির্বিবাদী, কুল, বিশিষ্ট-ইত্যাদি কোনো টাইটেল আমার নামের পাশে বসানোর কোনো উপায় আমি রাখি নি। না হতে পারলাম সমাজের দশজনের একজন না হলাম বিশিষ্ট টকশিয়াল (হু টকস কমার্শিয়াল)। ”ভুড়ুঙ্গামারীর ইউ এন ও“, বা “ ফার্স্টক্লাস ”গে”জেটেড (গে!!!)অফিসার, বিশিষ্ট ন্যাতা (বা ত্যানা)-কোনোটা হবারই কোনো চেষ্ট করলাম না। মরলে জানাজায় আসবে বড়জোর ৮-১০ জন। আব্বার সেই আরাধ্য “গোঁপাল সুবোধ বালক “ হতে পারিনি।

বরং গোঁপালের উল্টা হবার যত পথ আছে সবগুলোয় হেটেছি। আজীবন আমার গোঁপালদের চেয়ে বখে যাওয়া নেপাল চরিত্রকেই ভাল লেগেছে। স্কুল না গিয়ে আমার ডান্ডা-কুলুখ খেলতেই বেশী ভাল লাগত। হোমওয়ার্কের সময়টা ম্যাকগাইভার দেখতে। গোঁপালের তেল চর্চিত সিঁথির চুলের চেয়ে ধুলা, রোদে উস্কুখুস্কু মাথায় থাকতেই আমার ভাল লাগত। রোজ রাতে গোঁপালে মতো দুগ্ধ নয়, খড়ের গাঁদার পিছে লুকিয়ে গোপাল বিড়ি টানাতেই ছিল আনন্দ। সারাটা জীবন খালি উপদেশ আর উপদেশ।

এই হও ওই হও, এটা করো ওটা করো, ডানে যাও বামে যাও, ভাল হও-মন্দ হও, কালো হও-সাদা হও…………..ডিসগাসটিং। রীতির বিরুদ্ধে চলতেই আমার চির আনন্দ। কেন যেন গোঁপাল হতে বললেই গোঁ মানে গরুর একটা জাবর কাটা ছবি মনের মধ্যে ভেসে ওঠে। লুতুপুতু ললিপপ খাওয়া ক্যাবলাকান্ত। গোঁপাল হতে আমার চির আপত্তি। চেয়েছি কেবল নষ্ট ছেলে হতে। তবে হ্যাঁ………..

সবসময়ই মানুষ হতে চেয়েছি। কোনো রকম বা, কারো মতো নয় কোনো কিছুর মতোও নয়। শুধু একজন মানুষ। আর কিছু নয়।

#GoodBoy BadBoy #spoilt #hypocrisy #taboo #obscure #lowercast #popularmyth

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *