Skip to content

শিক্ষা হতে শিক্ষার বিদায়: আমরা কেন পড়ব, কেন পড়ব না?

  • by

আমাকে যদি কেউ প্রশ্ন করতেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যাটি কী সেটা বলতে হবে, আমি দু’টো নাম বলতাম-সবকিছুতে রাজনীতিকিকরণ আর শিক্ষাব্যবস্থার পঁচন। আপনি হয়তো বলবেন, এত এত সমস্যা থাকতে এই দু’টো কেন? আমার কাছে মনে হয়, এই দু’টো হল বাকি সবকিছুর জন্মদাতা। আমরা স্বাধীন হয়েছি ৪৫ বছর। এই ৪৫ বছরেও আমরা শিক্ষাব্যবস্থার ৩টি মূল ভিত্তি নিয়ে সার্বজনীন ঐকমত্যে পৌছাতে পারিনি। ৩টি বিষয় হল-

এক: আমাদের কোন থীম নিয়ে পড়াশোনা করানো হবে-গণতান্ত্রিক? সমাজতান্ত্রিক? সাম্যবাদী? ধর্ম নিরপেক্ষ? ধর্মবিশ্বাসবাদী? পুঁজিবাদী নাকি কল্যান রাষ্ট্রবাদী? মানে আমাদের কোন বিশ্বাসের ভিত্তিতে শেখানো হবে? আমাদের প্রজন্মকে কোন বিশ্বাসে বড় করা হবে?

দুই: আমাদের শিক্ষার্থীদের কোন সিস্টেমে পড়াশোনা করানো হবে-ইংলিশ মিডিয়াম? বাংলা মিডিয়াম? মাদ্রাসা? সলিড ধর্মশিক্ষা নাকি ক্যাডেট মাদ্রাসা? (তথাকথিত) সৃজনশীল নাকি গতানুগতিক মুখস্ত? এমসিকিউ নাকি ডেসক্রিপটিভ?

তিন: আমরা কি পৃথিবীর তাবৎ দেশের মতো ইন্টামিডিয়েট বা টুয়েলভথ ক্লাস পর্যন্ত পড়িয়েই শিক্ষার্থীদের জন্য যথেষ্ট মনে করব (যেখানে সব দরকারী টেকনিক্যাল বিষয় শিখানো হবে) নাকি আমাদের এই অদ্ভূৎ সিস্টেম (বাধ্যতামূলক ৫ বছরের অনার্স/মাস্টার্স) ফলো করব?

আপনি কি আপনার সন্তানকে স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবার উদ্যোগ নিচ্ছেন?

বা, আপনি নিজেই কি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির চেষ্টা করছেন?

ভুল করছেন।

হ্যা, ভুল করছেন। বড় রকম ভুল। আপনার সময়, অর্থ, চেষ্টা ও শক্তির ব্যপক অপচয়ের মতো ভুল করছেন।

কারন, একাডেমি আপনাকে বা আপনার সন্তানকে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, মনুষ্যত্ব, বুদ্ধিমত্তা, বোধ-এসব বিষয় প্রদান করবার দায় ও চেষ্টা বহু আগেই খতম করে দিয়েছে।

বেশ কিছু বছর ধরে তারা অন্তত মানসম্মত সার্টিফিকেট আর চাকরি পাবার মতো বিদ্যাটা যৎসামান্য হলেও দিত। এখন সেটাও দেয়া বন্ধ করেছে। (#সবাই১না)

আপনি আপনার টাকা, সময়, চেষ্টা একাডেমির পেছনে নষ্ট করবেন কিনা-সেই সিদ্ধান্ত আপনার। হ্যা, আপনার হাতে খুব একটা বিকল্পও যে আছে-তাও নয়।

আপনার বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে একাডেমি আপনাকে বা আপনার সন্তানকে ন্যুনতম এতটুকুও আজকাল পাইয়ে দিচ্ছে না-এটা জেনেও আপনি এটাকে অপচয় বলবেন না? দেখুন, একাডেমি এখন-

>সামান্য একটা চাকরির ফরম ঠিকভাবে পূরণ করবার মতো বুদ্ধিমত্তা শেখাতে পারছে না। 

>নিজের একটা প্রোফাইল মোটামুটি করে বানানোর বিদ্যা শেখাতে পারছে না।

>সিরিয়াসনেস, ইনকুইজিটিভনেস শেখাতে পারছে না।

>রেসিলিয়েন্স, পারসিভারেন্স, এড্যাপটেশন, পারসুয়েশন শেখাতে পারছে না।

>জব সার্কুলার পড়ে বুঝবার মতো সামান্য ক্ষমতাও জন্মাতে পারছে না।

চাকরি করবার মতো কাবেলিয়াত প্রদান তো বহু দূর কি বাত।

এতটা জানবার পরও কি আপনার মনে হয় না, একাডেমিতে যাত্রা নেহাতই অপচয়?

হ্যা, আপনি যদি নিজ দায়ীত্বে এগুলো একাডেমি হতে বাগানোর ক্ষমতা রাখেন, তাহলে হিসেব ভিন্ন। 

আমাদের নীতিনির্ধারক, ভাগ্য নির্ধারক, রাজনীতিক, আমলা, কামলা, নেতা, ত্রাতাদের প্রভূত ধন্যবাদ।

আপনারা খুব খুব সফলভাবে আমাদের শিক্ষা, শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনাটাকে ধ্বংস করেছেন। অত্যন্ত সুচারুভাবে। সেই ধ্বংসের স্বরুপটা নিয়ে লিখতে হলে কলমে কালি ফুরিয়ে যাবে। একদা আমি লিখেছিলাম কিছুটা। যাহোক।

ধ্বংসের একটা শাখা হিসেবে শিক্ষাক্রমের হাত ধরে মেধার বিকাশ, বুদ্ধির উৎকর্ষতা, দক্ষতার প্রকাশ তো জিরো। বাকিটা যা থাকতে পারত, তারও জানাজা দেয়া সারা। ফলে কী হয়েছে বলি।

১৭ বছরের অ্যাকাডেমিক জীবন শেষ করা, মানে, এই সুদীর্ঘ, চ্যালেঞ্জিং, কষ্টকর ও ব্যয়বহুল যাত্রা শেষ করা একজন শিক্ষার্থী যদি ধরুন ডিগ্রী শেষ করতেও না পারেন, যদি তার বিশেষ কোনো দক্ষতা না-ও তৈরী হয়, যদি তার জ্ঞানের বহর খুব কমও হয়, তবুও, তার মধ্যে যদি অন্তত মৌলিক বুদ্ধিমত্তা, সৃষ্টিশীলতা, ভিশন, স্বপ্ন, ডেসপারেশন, সিরিয়াসনেস, ক্যারিয়ারিস্টিক ভাবনা, দায় ও দায়ীত্ববোধ আর কিছু লাইফ স্কিল অন্তত তৈরী করে ছেড়ে দেয়া হত, তবুও তাকে এমপ্লয়াররা গড়েপিটে নিয়ে উপযুক্ত মানুষ করে তুলতে পারত। বিশেষত মৌলিক বুদ্ধিমত্তা আর সৃষ্টিশীলতাটুকু থাকলেও।

আপনারা অত্যন্ত হাই সাকসেস রেটে ওটুকুও তাদের মগজ ও সিস্টেম হতে গায়েব করে দিতে পেরেছেন। ফলত, তাতে করে আমার ভাই ও বোনেরা আস্ত ৪টা ডিগ্রী নিয়ে পথে পথে ঘুরছেন, অথচ সামান্য একটা A-4 কাগজের বিজ্ঞাপন কীভাবে দেয়ালে সাঁটাতে হয়, সেটুকু বুদ্ধি তক তার ঘটে নেই।

একজন মাস্টার্স পাস (দেশের প্রচন্ড ব্যয়বহুল একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী) মানুষকে একটি দুই লাইনের A-4 সাইজের কাগজে সাদাকালো নোটিশ কোনো একটা স্থানে সাময়িকভাবে লটকাতে দেয়ায় ভদ্রলোক বোথ সাইড টেপ দিয়ে পুরো দেয়াল মাখিয়ে সেটাতে কাগজ লটকেছেন। ওই আঠা দেয়াল হতে ওঠাতে হলে পুরোটা আবার ডিসটেম্পার করাতে হবে। পাশেই কাঁচের দেয়াল, সেখানে স্কচ টেপ দিয়ে লটকালেই হয়ে যেত।

এইটুকুতে তার অযোগ্যতা প্রমাণ হয় না। আমার ফোকাস হল, এই সামান্য ভাবনা ও বুদ্ধিটা করবার মতো চিন্তা তার মাথায় যে আসে না, বা সে করে না-সেটা অ্যালার্মিং।

(#সবাই১না) আর আপনি যদি এই লেখার মধ্যে হামবড়াই খুঁজে পান, অথবা “আমগো হোলাইনগো ইশকুল তোন ভাগাইন্নার ধান্দা করতাছে” বলে মনে করেন, তাহলে ভুল করবেন। বিপদ ও বাস্তবতা বয়ান করা মানেই রাজদ্রোহী-এই ভাবনা মধ্যযুগের মানুষ ভাবত। নিজ গরজে যদি বিপদ মুক্তি ঘটাতে পারেনই, তাহলে আপনি জাহান্নামের আগুনেও ঝাঁপ দিতে পারেন, কে আটকানোর আওকাত রাখে?

শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক নীতি ও পরিকল্পনাই যেখানে ঠিক হয়নি সেখানে শিক্ষাব্যবস্থা হতে আমরা বেশি কী আশা করতে পারি? তারচে যা পাচ্ছি সেটাই কি বেশি নয়? আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, কোর্স কারিকুলাম, টিচিং মেকানিজম, শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে মৌলিক কোনো ক্ষতি যদি ইতিমধ্যেই সাধন করা হয়ে থাকে সেটা হল, শিক্ষা হতে নৈতিকতা, সৃষ্টিশীলতা ও ফিলোসফি বিষয়টাকে পুরোপুরি নির্বাসন দেয়া হয়েছে। এখন শিক্ষা মানে হল শুধু তথ্য জানা বা মুখস্ত থাকার নাম। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যটি পর্যন্ত উহ্য হয়ে গেছে।

আপনি যেকোনো স্কুল হতে ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞেস করুন, সে কেন একাডেমিতে ভর্তি হয়েছে? আমার বিশ্বাস, বেশিরভাগের উত্তর হবে, একটা ভাল ক্যারিয়ার গড়তে চাই মানে টাকা পয়সা কামাতে চাই। আমাদের পিচ্চিকাল পর্যন্ত বাবা-মা কে দেখতাম, বয়স হলেই একজন শিক্ষকের কাছে নিয়ে গিয়ে বলতেন, আপনার হাতে তুলে দিলাম। ওকে মানুষের মতো মানুষ করার দায়ীত্ব আপনার।

কাজী কাদের নেওয়াজের সেই বিখ্যাত কবিতাটি মনে আছে? “বাদশাহ আলমগীর। কুমারে তাহার পড়াইত এক মৌলবী দিল্লীর। এখনকার দিনে ওসব বদান্যতা আর কোনো বিষয়ই না। তাছাড়া এই দেশে কমার্শিয়াল এডুকেশন নামেও যা আছে সেটার পর্যন্ত সর্বনাশ করা সারা। কোনো ধরনের প্রয়োজন যাঁচাই না করেই প্রতিবছর ৭ লক্ষ গ্রাজুয়েট  সৃষ্টি করা হচ্ছে যারা ৫ টি দীর্ঘ বছর একাডেমিতে আটকা থাকে।

যদি তাদের চাকরী জন্য রেডি করাও উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তবু বলব, যেসব সাবজেক্টে, যে পদ্ধতিতে ওনাদের রেডি করা হচ্ছে তার সাথে দেশের চাকরীর সম্পর্ক খুব সামান্য। এদেশে ওনাদের চাকরী পাবার ন্যুনতম যোগ্যতা যুগের ও পৃথিবীর সমস্ত দেশের সিস্টেমের বিপরীতে হল ন্যুনতম গ্রাজুয়েশন। মানে হল, আপনার সত্যিকারের দরকার থাক বা না থাক, গ্রাজুয়েশন তথা ৪ বছরের ডিগ্রী শেষ না করে আপনি কোথাও অ্যাপ্লাই পর্যন্ত করতে পারবেন না। তার উপরে, যেহেতু সারাদেশে একই কালচারে বাই ডিফল্ট মাস্টার্স করছে সব গ্রাজুয়েট, তাই ট্রেন্ড অনুসরন করতে গিয়ে এবং প্রতিযোগীতায় টিকতে গিয়ে আরো ১ বছর বসে মাস্টার্স করতে বাধ্য হচ্ছে কোনো রকম যুক্তি ছাড়া। আমাদের ছেলেমেয়েদের কাছ হতে অন্যায্যভাবে কেড়ে নেয়া হচ্ছে জীবনের মূল্যবান ৫ টি বছর।

চাকরির বিজ্ঞাপন দিলে আমরা প্রায় সবসময়ই উল্লেখ করে দিই, চাকরি প্রত্যাশীকে অন্তত স্নাতক পাশ হতে হবে। অর্থাৎ, হোয়াইট কলার চাকরিতে নিয়োগ করবার ডিফল্ট একাডেমিক যোগ্যতা গ্রাজুয়েশন।

প্রশ্ন হল, এই গ্রাজুয়েশন নিশ্চিত করে আমরা এমপ্লয়াররা কী পেতে চাই? অর্থাৎ, এই এমপ্লয়্যবিলিটি ফিচার বা ফ্যাক্টরটি দিয়ে আমরা কোন অবজেকটিভ পূরন করতে চাই? গ্রাজুয়েশন হতেই হবে-এই বাধ্যতামূলক ফিচার আমাদের কোন দিকটির নিশ্চয়তা দেয় বলে আমরা সেটির নিচে কাউকে হোয়াইট কলার জবে হায়ার করতে চাই না? 

কেউ বলবেন শিক্ষাগত যোগ্যতা। নাহ, আমি তো সেটিই বলছি, একজন গ্রাজুয়েট মানে গড়পড়তা শিক্ষিত। প্রশ্ন হল, আমরা শিক্ষা কেন চাই? নাকি, শিক্ষার ভেতর দিয়ে আমরা অন্য কিছু নিশ্চিত হতে চাই? চাইলে সেটি কী?

প্রশ্ন হল, আমাদের মূল অবজেকটিভ যদি শিক্ষা বা ডিগ্রীটি না হয়, ডিগ্রীটি যদি একটি ইনডিকেটর হয়ে থাকে, তাহলে সেটি কীসের ইনডিকেটর?

শিল্প কর্মী, সহজ কথায় ব্লূ কলার জবে শিক্ষা বা ডিগ্রী প্রায় কেউই চান না। শ্রমিক ও উৎপাদনশীল কাজের কর্মীরা কোনোরকম ডিগ্রী ছাড়া জব করেন। এবং, আজকাল তাদের বেতনও বেশ ভাল। তাহলে আমরা কর্পোরেটে শিক্ষাগত যোগ্যতা তথা ডিগ্রীর রিকয়ারমেন্ট তুলে দেবার সময় হয়েছে-তেমনটা কবে ভাবতে শুরু করব? বা, শুরু করা কি সম্ভব? আমি এমন একটি কালচারের কথা বলছি, যেখানে এমপ্লয়ার আর ন্যুনতম একাডেমিক ডিগ্রীকে হায়ারিং ফ্যকটর হিসেবে আর বিবেচনায় নেবেন না। বিজ্ঞাপনে মেনশন করবেন না। বরং সেখানে স্পেসিফিক হার্ড ও সফট স্কিল মেনশন করা থাকবে। যিনি সেটি নিশ্চিত করতে পারবেন, জব পাবেন। 

অনেক আগে একবার নগদ নামের একটি প্রতিষ্ঠান এমন ঘোষনা দিয়েছিল। তারা বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন কিনা-সেটা তারা আর জানান নাই। আপনাদের কী মনে হয়? হোয়াইট কলার জবে একাডেমিক ডিগ্রী অবসোলেট করে দেবার সময় কি হয়েছে? করা কি উচিত হবে?

ট্যালেন্ট অ্যাকুইজিশনের ওপর নাকি বিলিতি অনেক ডিগ্রী পাওয়া যায়। সেগুলো করলে নাকি নামের আগে পরে বড় বড় মওলানাদের মতো তকমা লাগে। তো সেই বিলিতি ডিগ্রী দিয়ে মাঠে কাজ করতে নামার আগে আমাদের দুটো বিষয় নিশ্চিত করা উচিত-কনটিনিউয়াস চেঞ্জ ও কন্টিনিউয়াস ইনোভেশন। ওহ, আউট অব বক্স ভাবনাও যুক্ত করা দরকার।

অনার্স ও মাস্টার্সের বাধ্যতামূলক সার্টিফিকেট তাদের যদি নিতে না হত, তাহলে সেই ১১ বছরের মাথায় (ইন্টারমিডিয়েট করেই) তারা জবে ঢুকত। যে বাড়তি ৫ টি বছর তারা জব করার ন্যুনতম যোগ্যতা পেতে খরচ করে সেই ৫ বছরে তারা ম্যানেজারিয়াল পজিশনে পৌছে যেত। ক্যারিয়ারে সেটেল করে ফেলত। মেধার কি ভয়ানক অপচয়! পাশাপাশি যে মৌলিক ক্ষতিটি শিক্ষাব্যবস্থায় করা হয়েছে সেটা হল, পড়ে পাশ করার প্রয়োজনীয়তাকে তুলে দেয়া।

উন্নত বিশ্বের মতো এখানে ওপেন বুক (নকল) আর ওপেন কোয়েশ্চেন (প্রশ্ন ফাঁস) চালু হয়েছে। এখন আর পড়াশোনা করাটা (এমনকি কমার্শিয়াল পড়াশোনাটুকুও পর্যন্ত) মুখ্য বিষয় না, পাশ করা, সার্টিফিকেট ও জিপিএ-৫ নিশ্চিত করা, ক্লাস ডিঙানোটাই মুখ্য। এখন টিচারকে মা-বাবা বলে দেন, “ও যেন গোল্ডেন-৫ পায় সেটা নিশ্চিৎ করবেন।”  সবচেয়ে আত্মঘাতি ও ধ্বংস্বাত্মক কালচার যেটা চালু হয়েছে সেটা হল, যেহেতু এখন ডিগ্রী নেয়ার পরেও ইন জেনারেল, জ্ঞানের ঘাটতি আসমান সম, তাই ধীরে ধীরে একটা ট্রেন্ডকে প্রমোট করা ও বিশ্বাস করানো হচ্ছে। সেটা হল, যেসব জ্ঞানের ঘাটতিকে শিক্ষার নিম্নমান হিসেবে ধরা হবে, সেগুলোর প্রয়োজনীয়তা, গুরুত্ব, তাৎপর্যটাকেই অস্বীকার করা, ওগুলোর অস্তিত্বকেই মূল্যহীন প্রতীয়মান করা। সেগুলো না থাকা কোনো ব্যাপারই নয়-এই বিশ্বাসকে ব্যাপক হারে প্রতিষ্ঠিত করা। অলরেডি শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট মেজরিটি অংশ এটা বিশ্বাসের অংশ করে নিয়েছে যে, অংক না পারা, ইংরেজি না পারা, ক্রিয়েটিভ লেখা না লিখতে পারা, রিডিং না পড়তে পারা, পাঠ্য বিষয় (যেটা পড়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে) সে সম্পর্কে ডেপথ না থাকা-এগুলো কোনো সিরিয়াস বিষয় না। অদ্ভূৎ এক বিশ্বাস ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে শিক্ষার্থীদের মন মগজে-মুখস্ত করা যাবে না, গুগল থাকতে কিছু মনে রাখার দরকার কী, অংক তো ক্যালকুলেটরেই করা যায়, কম্পিউটার থাকতে বানান জানতে হবে কেন, রচনা লেখা মানে জ্ঞান নয়, ইতিহাসতো সার্চ করে নিলেই হবে, রবীন্দ্রনাথ নজরুলের লেখা পড়ার দরকার কী-ইত্যাদি ইত্যাদি। তো প্রশ্নটা হল, তাহলে স্কুলে কলেজে কেন পড়তে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা? চাকরী করার ন্যুনতম সার্টিফিকেট আনবার জন্য সময় কাটাতে?

যাস্ট সফলতার সাথে ক্লাস ওয়ান হতে অনার্স ফোর্থ ইয়ার-এই ১৬ বছর স্কুল, কলেজ ও ইউনিভার্সিটির গন্ডিতে ঘোরাফেরা শেষ করতে পারলেই ধরে নিতে হবে হ্যা, শিক্ষণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে? ছেলে অবশ্যই শিক্ষিত হয়েছে? আর এত কথাবার্তা ও ডেফিশিয়েন্সিতো শুধু যেই কমার্শিয়াল শিক্ষাব্যবস্থাটুকু অন্তত চালু আছে সেটা নিয়ে বললাম। শিক্ষার সত্যিকারের যে উদ্দেশ্য-আলোকিত মানুষ তৈরী করা, সুনাগরিক তৈরী করা, দেশপ্রেমিক তৈরী করা, বিচক্ষণ নাগরিক সৃষ্টি করা, দেশকে এগিয়ে নেবার মতো নেতৃত্ব সৃষ্টি করা-ওগুলোতো বহু বহু দুরের কথা।

জানেন কি, প্লেটো কেন আইডিয়াল স্টেটের থীম নিয়ে ভেবেছিলেন আর কেনই বা তিনি আইডিয়াল সিটিজেন বানানোর জন্য একাডেমির দর্শন মনে ধারন করতেন? একাডেমির জন্ম কেন হয়েছিল সেটাকেই ভুলে যাওয়া হয়েছে বা ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন স্কুল হতে ইউনিভার্সিটি-ছাত্র হবার একটাই উদ্দেশ্য-ছাপোষা কিংবা কর্পোরেট কেরানী হওয়া। আর এই সার্বিক পঁচন ধরা শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যই আজ শিক্ষার্থী শিক্ষকের গায়ে হাত তুলছে, শিক্ষক ধর্ষনে নামছে, সালোয়ারের সাথে টি-শার্ট পড়া বন্ধ করতে নোটিশ পড়ছে, শিক্ষকের হাত হতে বাঁচতে ব্যাগে পিপার স্প্রে ঢুকছে, টিচারকে নামাতে আন্দোলন হচ্ছে, ছাত্রদের লাঞ্চনার জবাবে শিক্ষকদের রাস্তায় নামতে হচ্ছে।

সেই যে, আগের দিনে সিনেমাতে দেখতাম, সাবেক হেডমাস্টার পিতার হাতে লেখা পত্র নিয়ে নায়ক শহরে শিক্ষকের এককালের ছাত্রের বাসায় চাকরীর আশায় আগমন, ছাত্রের মেয়ের সাথে প্রেম……………..। কোথায় সেই দিন? ছোটবেলায় আমাদের চতুর্পাশের সবাই আমাদের একটা ভুল কথা শিখাত। লেখাপড়া কর যে গাড়ি ঘোড়ায় চড়ে সে। দুই দিক দিয়ে এটা ভুল।

প্রথমত: আজকের যুগে গাড়িঘোড়ায় তারাই চড়ে যারা পড়ালেখা না করে অন্য ধান্দায় বড় হয়। পড়ালেখা করে গাড়ি কেনার মতো পয়সা কামানো যায়না।

দ্বিতীয়ত: পড়ালেখার উদ্দেশ্য কখনোই গাড়িঘোড়ার মালিক হওয়া নয়, চাকরি বাগানো নয়, বড়লোক হওয়া নয়। পড়াশোনার একমাত্র লক্ষ্য মানুষের মতো হওয়া। যেখানে পড়াশোনার উদ্দেশ্যই ভুল শেখানো হয় সেখানে শিক্ষিত লোকেরা কি অশ্বডিম্ব প্রসব করবেন? (শিক্ষার মান, শিক্ষার পদ্ধতিগত ত্রূটি নিয়ে বলবার মতো যথেষ্ট শিক্ষিত ও একাডেমিশিয়ান নই। তাই যদি আপনি আরো বিস্তারিত ও গভীর বিশ্লেষন পড়তে চান তবে দু’জন বিজ্ঞ মানুষের এই দু’টি লেখা পড়ে নিতে পারেন:

১. https://www.facebook.com/alim.molla.9/posts/1074357412680724;

২. https://www.prothomalo.com/opinion/column/%E0%A6%8F%E0%A6%A4-%E2%80%98%E0%A6%89%E0%A6%9A%E0%A7%8D%E0%A6%9A%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E2%80%99-%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%81%E0%A6%B7%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%9C-%E0%A6%95%E0%A7%80;

# #educationofbangladesh #teaching #policy #national #academicexcellence #qualityofeducation #declineintalent #significanceofdegree #necessityofdegree #wastageofdegree #seriousness #sincerity

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *