আমার সহযাত্রীদের সাথে স্রেফ মজা করার জন্য প্রায়ই আমরা দু’ই রাজনৈতিক দলে নিজেদের ভাগ করি। কোন দল কেমন ভাল আর কেমন খারাপ এই নিয়ে কাল্পনিক তর্ক ও যুক্তি সাজাই। কে কোন দলের সাপোর্টার সেই নিয়ে তুমুল যুক্তি দেখাই। যদিও আমি ব্যক্তিগতভাবে রাজনীতি, রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক কর্মপদ্ধতির ব্যাপারে একেবারেই নিস্পৃহ। নিজের কোনো রাজনৈতিক পছন্দ নেই। রাজনীতির প্রতি কোনো রকম আগ্রহ বোধ করি না, বিরোধও অনুভব করিনা।
স্বাধীনতা প্রাপ্তি হতে বিগত ৪৫ বছরে আমাদের যা কিছু অর্জন তার জন্য মূল ক্রেডিট কার প্রাপ্য? আমার সচেতন সহযাত্রীদের একটা বড় অংশ মনে করেন, আমাদের রাজনীতিকবৃন্দ এই অর্জনের প্রধান নির্মাতা। আপনাদের কাছে একই প্রশ্ন রইল। এরপরে আমি একটি বিপরীত প্রশ্ন করি।
বিগত ৪৫ বছরে আমাদের রাজনীতিকরা সফলতার সাথে কী কী করতে পেরেছেন? আপনার কাছে নিশ্চই অনেকগুলো উত্তর আছে। আমি শুধু একটা নাম বলব-বিভাজন। হ্যা, আমাদের রাজনীতিক ও সুশীলসমাজ আমাদের ১৭ কোটি মানুষকে খুব সফলতার সাথে বিভাজিত করতে সক্ষম হয়েছেন যা বৃটিশরাও পারে নি। নানা মত, হাজার পথ, নানা শিক্ষা, নানা পছন্দ, মতামত, নীতি, দর্শন, ধর্মবিশ্বাস, রাজনৈতিক দর্শনে আমাদের শতধা বিভক্ত করতে তারা পারঙ্গমতা দেখিয়েছেন।
মতের ভিন্নতা এ নয়, আমি বলছি জাতির দর্শন ও ডিসকোর্সের বিভক্তি। বিভক্তির মাত্রাটা কখনো কখনো শিষ্টতার মাত্রাও ছাড়ায় এবং যুক্তিপূর্ণ বিতর্কে পরিশ্রম বেশি বলে সেটাকে খুব দ্রূত ব্যক্তিগত আক্রমনে রূপ দেয়া হয়।
আমি সম্প্রতি লিঙ্কডইনে একটি ছোট্ট প্রোফেশনাল পোষ্ট দিই যেখানে বেড়ালকে মরিচ খাওয়ানোর সেই বিখ্যাত মেটাফোর গল্পটি ছিল।
একজন প্রতিষ্ঠিত সিনিয়র কর্পোরেট সেটার মন্তব্যে লিখেছেন, “আপনার পা……য় মরিচ ডলে দিলে আপনার কেমন লাগবে?” অপরের বেডরুমে উঁকি মারাকে যেমন গর্হিত কাজ মনে করেন তেমনি অপরের পোষ্ট, মেসেজ, ছবিতে অনাহুত ব্যক্তিগত আক্রমনকেও আমি তেমন গর্হিত কাজ মনে করি। আপনি যদি কারো যেকোনো পাবলিক পোষ্টে দ্বিমত পোষণ করেন, তবে তার বক্তব্যের বিপক্ষে যুক্তি দেখান সংযতভাবে।
কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখছি, মূল লেখা না বুঝেই, যুক্তি না খুঁজেই, সম্পূর্ন ভিন্ন ইস্যু নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ি, ব্যক্তিগত আক্রমন শুরু করে। যে কথা বলছিলাম, বিভাজন এমন তীব্র রূপ নিয়েছে যে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী পশুরা আর তাদের কুলাঙ্গার বাঙালী দোসর দালাল রাজাকাররা আদৌ কোনো অন্যায় করেছেন, নাকি তারা সঠিক কাজ করেছেন-এই নিয়েও বিতর্ক করার মতো একটি দল এদেশে জন্ম ও বিকাশ লাভ করেছে।
১৯৪৭ হতেই আমাদের প্রাণ দেয়া শুরু তবু ১৯৭১ সালে আমাদের কতজন মানুষ শহীদ হয়েছেন আর কতজন মা সম্ভ্রম হারিয়েছেন সেটা নিয়েও কু-তর্ক করার মত, ধৃষ্ঠতা দেখানোর মতো একটি প্রজন্মও এদেশে পয়দা হয়েছে খুব কার্যকরভাবে। বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা নাকি আমাদের জাতির পিতা হযরত………. এই অদ্ভূৎ বিতর্কও বেশ প্রচলিত আছে এদেশে।
স্বাধীনতার ঘোষক, স্বাধীনতার পাঠক, স্বাধীনতার রূপকার, মুক্তিযোদ্ধা/অ-মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধাপরাধ/অ-যুদ্ধাপরাধ, বাঙালী জাতীয়তাবাদ/বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, মধ্যম আয়ের দেশ/গরীব দেশ, ভাস্কর্য ভাল/ভাস্কর্য শিরক, ইউএনও সালমন দেশপ্রেমিক/ইউএনও সালমন দেশদ্রোহী, আদালত অবমাননা/আদালতকে শ্রদ্ধা, ভয়াল বন্যা/যাস্ট নরমাল বন্যা, ত্রাণ কার্য/কোরবানী………………………………….উহ! প্রতিটি ইঞ্চি ইঞ্চিতে বিতর্ক ছাড়া কোনো কথা নেই।
কোনো একটা ইস্যুতে এই জাতি একমত নয়। অবস্থা এমন দাড়িয়েছে, আমার ভয় হয়, আমি যদি ফেসবুকে প্রশ্ন করি, আমাদের দেশের নাম কি বাংলাদেশ? মনে হয়, অন্তত ডজনখানেক মানুষ এখানেও হামলে পড়বে কনফিউশন নিয়ে, বিতর্ক নিয়ে, বিরুপ যুক্তি নিয়ে। আমাদের রাজনীতিকরা আর টকশো সুশীল সমাজ অত্যন্ত সুচারুভাবে, দক্ষতার সাথে, পরিকল্পিতভাবে, সফলতার সাথে আমাদের এই একদা ঐক্যবদ্ধ একপ্রাণ জাতিকে শতধা বিভক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। আর শুধু মতদ্বৈততা নয়, বিরুদ্ধ মতকে পিটিয়ে কাত করে ফেলার সংস্কৃতি বেশ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে এদেশে।
আমার আজকের লেখার মুল বিষয় দু’টি-আপেক্ষিকতা এবং বিতর্ক। অনেক আগে একটা লেখা লিখেছিলাম পপুলার মেজরিটি নিয়ে যার বিষয়বস্তু ছিল, কিভাবে মেজরিটির মতামত, দৃষ্টিভঙ্গি মাইনরিটির বা আইসোলেটেড মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে ডমিনেট করছে, কিভাবে তাকে আঘাত করছে, কোণঠাসা করছে। ভিন্নমতকে কিভাবে আক্রমন করা হচ্ছে তা নিয়ে।
যাহোক, উপরে বলা দু’টো বিষয়ে বিতর্ক এড়িয়ে কিভাবে পজিটিভলি বিষয়গুলোকে নেয়া যায় সেটা বলার চেষ্টা করব। আমি সব মতকে শ্রদ্ধা করি (রাজাকার ও ধর্মান্ধদের ব্যাতিত)। জানেন নিশ্চই, পৃথিবী কাঁপিয়ে দিয়েছে যেসব বিষয় তার মধ্যে নিউটনের ল অব গ্রাভিটি একটা, আর আরেকটা হল, আইনস্টাইনের ’থিওরী অব রিলেটিভিটি’ মানে আপেক্ষিকতাবাদ।’ আমি এমন একটা কাটখোট্টা বিষয় নিয়ে কেন পড়লাম সেটা ভেবে নিশ্চই আপনার কৌতুহল হচ্ছে। নাহ, আমি বিজ্ঞানের ছাত্র এককালে থাকলেও এখন আর নই। তাই এই নিঁখাদ বৈজ্ঞানিক বিষয়টির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় যাব না।
আমাদের বাস্তব জীবনে আপেক্ষিকতার উপস্থিতি নিয়ে কথা বলব। এখুনি রণেভঙ্গ দেবেন না। কষ্ট করে পড়াটা চালিয়ে যান। আপেক্ষিকতার উপর নিচের লাইনগুলো ধার করেছি অনুজ বন্ধু শুভ’র ওয়াল হতে। প্রিয় রং বলে অাসলে কিছু নেই। বিয়ের কনের কাছে লাল শাড়ী ভাল লাগলেও লাল রক্ত ভাল লাগবে না । লাল শাড়ি স্বপ্নের প্রতিক হলেও লাল রক্ত ভয়ের প্রতীক। কেউ হয়তো দোকানে গিয়ে একটা হলুদ শার্ট পছন্দ করবেন কিন্তু গাড়ি কেনার সময় এই রঙটাই অসহ্য লাগবে। বুৃঝতে পারছেন না তাই তো?
প্রিয় রঙের ঝামেলা থেকে বাঁচতে অনেকেই কালো রঙ বাঁছে। কিন্তু এই রঙ যদি তার ঘরের দেয়ালে লাগাতে বলা হয় তাহলে অবশ্যই সে নিষেধ করবে। প্রিয় রঙ বলে অাসলেই কিছু নেই। ব্যাপারটা ক্ষেত্রবিশেষ। প্রিয় মানুষ বলেও অাসলে কিছুই নেই।এই ব্যাপারটাও কিন্তু ক্ষেত্র-বিশেষ। অাজ যাকে অাপনার খুব ভাল লাগে। তার সাথে পরিচয় না হলে অাজ কিন্তু এমনটা হতো না ।
যেমন ধরুন, আজ আপনি বাংলাদেশের মানুষকে নিয়ে গদগদ আবার অাপনার জন্ম অামেরিকা বা জাপানে হলে অাপনি সেই দেশের মানুষকেই বেশি ভালবাসতেন। পেটওয়ালা ট্রাক ড্রাইভার মনসুর পেট চুলকাতে চুলকাতে পানের পিক ফেললেন। ওউ দৃশ্য দেখে কোন সুন্দরী “ইয়াক” করে উঠল। ঠিক এই মেয়েটিই যদি মনসুরের ঘরে জন্ম হতো। তাহলে বিশ্রী ভাবে পেট চুলকানো ড্রাইভারটাকেই মনে হতো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা।
প্রিয় মানুষ ব্যাপারটা অাপেক্ষিক, ক্ষেত্র বিশেষ।জন্মের পরই কেউ প্রিয় এবং অপ্রিয় থাকে না । অামরা নিজেই কাউকে প্রিয় এবং অপ্রিয় বানিয়ে ফেলি। অাপনার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে অাপনার ভালো লাগতে পারে। তবে কাল ঝগড়া হয়ে অাপনার কেই মানুষটিকেই শত্রু মনে হবে। উপরের গল্পটি পড়ে নিশ্চই একটা ধারনা জন্মেছে, কী ধরনের আপেক্ষিকতাকে বোঝাতে চাওয়া হচ্ছে।
আরেকটা গল্প বলি যেটা পড়েছিলাম ক্লাস সেভেনের র্যাপিড রিডারে। একবার এক পশ্চিমা শহরে। দুই দিকে দুটি পাহাড়। দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তি পাদদেশে একটি Pub। তো একদিন সেই দুই পাহাড় হতে দু’জন ঘোড়সওয়ার পাহাড় হতে নেমে Pubটির কাছাকাছি এলেন। একজন পাবের ডানদিক হতে আরেকজন বাম হতে। বামের ঘোড়সওয়ার বললেন, “কী সুন্দর এই রুপালী সেলুনটি”। কিন্তু ডানের ঘোড়সওয়ার বললেন, “এই স্বর্নালী সেলুনটি অত্যন্ত সুন্দর”।
প্রথম ঘোড়সওয়ার দ্বিতীয় জনকে উদ্দেশ্য করে বলল, ওহে ভাই, ওই সাইনবোর্ডে পরিষ্কার লেখা আছে এটা সিলভার সেলুন। তুমি কেন এটাকে গোল্ডেন বলছ? দ্বিতীয়জন বলল, কই, আমি তো পরিষ্কার লেখা দেখছি গোল্ডেন সেলুনে স্বাগত। ব্যাস আস্তে ধীরে এই নিয়ে তর্কে জড়াল দু’জন। সেলুনের নাম সিলভার সেলুন নাকি গোল্ডেন সেলুন। দু’জনের ঝগড়া এক পর্যায়ে বন্দুক যুদ্ধের উপক্রম করল।
এমন সময় সেলুনের ব্যাটউউংডোর ঠেলে এক বৃদ্ধ বের হলেন। তিনি দু’জন ঘোড়সওয়ারকে প্রায় যুদ্ধোদ্ধত দেখে তাদের ঝগড়ার কারন জানতে চাইলে দু’জনে বিচার দিলেন দ্বিতীয়জনের ভুলের ব্যাপারে। বৃদ্ধ একটু হেসে বামের ঘোড়সওয়ারকে ডানে নিয়ে গেলেন আর ডানের লোকটাকে বামে। এবার পড়তে বললেন সাইনবোর্ড। তারা দু’জনেই দু’জনের ভুল বুঝতে পারল। আসলে সেলুনের মালিক মজা করার জন্য সেলুনের সাইনবোর্ডের দু’পাশে দু’রকম নাম দিয়েছে-গোল্ডেন ও সিলভার। তার মানে দাড়াল কেউই ভুল না। শুধুমাত্র আপেক্ষিকভাবে তাদের দু’জনের ধারনা ভুল আবার সঠিক দুটোই।
আমাদের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে এমনি হাজারো আপেক্ষিক সত্য-মিথ্যা বিদ্যমান। লালন শাহ’র সেই গানটা মনে আছে-”পাপ পূন্যের কথা আমি কারে বা শুধাই? এই দেশে যা পাপ গন্য আরেক দেশে পূন্য তাই”। আসলেই। আমাদের পৃথিবীতে পাপ-পূণ্য, সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়, পূর্ব-পশ্চিম, উচিৎ-অনুচিতের ব্যাপারটি শুধুই আপেক্ষিকতার। নিখাঁদ সত্য ও মিথ্যা বলে কিছু নেই। সলিড ন্যায় ও সলিড অন্যায় বলে কিছু হয় না। দু’টোই আপেক্ষিকতার ব্যাপার। এক দেশে যা বেঠিক সেটাই অন্য দেশে চরম ঠিক। এক সময়ে যেটা সঠিক সেটাই অন্য কোনো সময়ে বেঠিক। জানেন কিনা, কেরালায় মাথা দু’পাশে হেলানো মানে হল ’হ্যা’ আবার সেটাই আমাদের দেশে করলে বোঝায় ’না‘। ভাষার ক্ষেত্রেও তাই। এক দেশের বুলি আরেক দেশের গালি। ঢাকায় বা যেকোনো শহরে পুরী খুব প্রিয় খাবার আবার সেই পুরীই সিলেটে গিয়ে কারো কাছে চাইলে আপনাকে মার খেতে হবে।
আমি যেটা বলতে চাই তা হল, জগতের সকল এডজেকটিভ বা এ্যাডভার্বই আপেক্ষিকতার মুরীদ। আপনি আপনার গার্লফ্রেন্ডের অপেক্ষায় বসে আছেন। সময় মনে হয় যেন প্রতিটি মিনিট ঘন্টার সমান। আবার সেই প্রিয়া যখন এসে বসে, আপনি তার সাথে বসে গল্প করেন তখন কোথা থেকে ঘন্টা কেটে যায় মনে হয় যেন এই তো কয়েক মিনিট হল। আপনি অফিসের বড় বস। মিটিং হবে ৫ টায়। আপনি এলেন ৬টায়। এসে ভাবলেন, আরে, ৬০ মিনিটইতো মাত্র লেট। সেই আপনিই যখন পিয়নকে পানি দিতে বলেন, সে ১ মিনিটে আনলেও মনে হয় অনেক লেট করেছে। রিক্সা চড়েছেন, ভাড়া ঠিক করেছেন ১০ টাকা। নামার পর বৃদ্ধ রিক্সাওয়ালা ৫টি টাকা বেশি চাইলে মনে হয় ও জুলুম করছে। আবার এই আপনিই কফি শপে প্রিয়াকে আরো ১৫ মিনিট ধরে রাখতে মিছিমিছি আরেকটা ৫০ টাকার কফির অর্ডার করেন অথচ আপনি আগেরটাই খাননি। আপেক্ষিকতার প্রভাব।
যেই রোদে আপনার চামড়া পুড়ে যায়, রোদ হতে বাঁচবার জন্য সুন্দরীদের হাজার চেষ্টা, সেই সুন্দরীই আবার মা হলে তার পিচ্চিকে রোদে শুইয়ে ভিটামিন ডি খাওয়ান।
আপনার কাছে প্রিয়ার দেয়া গোলাপের স্টিকটি ভালবাসার জলজ্বলে নিদর্শন সেটাই আবার ফুল বিক্রেতা মেয়েটার কাছে দু’টি ভাতের হাতছানি। সকালে অফিসে রওনা হবেন। বৃষ্টি নামল। মেজাজ খারাপ। বৃষ্টিকে শাপশাপান্ত করেন। বৃষ্টি পঁচা। আবার রাতে বাসায় আছেন, বৃষ্টি নামল, বউ এককাপ ধোঁয়া ওঠা কফি হাতে দিয়ে পাশে বসল বারান্দায়। তখন বৃষ্টির মতো রোমান্টিক আর কিছু হয় না।
সবচেয়ে মজার বিষয় কি জানেন? সূযাস্ত ও সূর্যোদয় বলে কিছু নেই। সূর্য কখনো ওঠেও না, ডোবেও না। রাত হল আলোর অনুপস্থিতি আর দিন হল আলোর উত্থান।
এবার একটু সিরিয়াস দিকে যাই। সন ১৯৪৭। উপমহাদেশ তথা বৃটিশ ভেঙে যখন ভারত, পাকিস্তান হয় তখন আমরা পাকিস্তান নিয়ে উচ্ছসিত, ভারত শত্রূদেশ। আবার ২৪ বছর পরে পাকিস্তান আমাদের শত্রূ আর ভারত পরম বন্ধু। আবার আজ ৪৫ বছর পরে ভারত আমাদের জাত শত্রূ (পাবলিক চয়েসে)। মানে হল, বন্ধুত্বের কোনো ইউনিভার্সাল রূপ নেই। সেটা রূপ পরিগ্রহ করে সময়ে সময়ে, অবস্থাভেদে।
আমরা যখন স্কুলে পড়ি তখন আমাদের মন মগজে পাখি পড়ার মতো ঢুকিয়ে দেয়া হত-ফার্স্ট হতেই হবে, স্টার পেতেই হবে, বোর্ড স্ট্যান্ড না করলে সে কোনো ছাত্রই না। আমরাও বুঝি না বুঝি, সম্ভব বা অসম্ভব যাই হোক-যেকোনো মূল্যে ক্লাসে ফার্স্ট হবার পেছনে জানপড়ান লাগিয়ে দিতাম। সেই ছাত্র বয়সে মনে হত ক্লাসে ফার্স্ট হতে পারাটাই সফলতার নিদর্শন। সেকেন্ড হওয়াটাই ব্যর্থতা।আবার এর মাঝেই কেউ কেউ ছিল স্বেচ্ছা বৈরাগী। ওদের দেখে মনে হত শুধু ভাল রেজাল্ট করা ব্যতিত আর সব কাজেই ওদের অসীম আগ্রহ। গার্লস স্কুলের সামনে দাড়ানো হতে মাঝে মধ্যে একটু আধটু বিড়ির টান-সবই চলত।
আমরা ওদের বলতাম দুষ্টু ছেলে। বাবা-মায়েরা ওদের সঙ্গ হতে দুরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। ওদের সাথে মিশলে জীবন ঝড়ঝড়া। তবে রুঢ় বাস্তবতা হল, সেইসব দুষ্টু ছেলেদের একটা বড় অংশকেই দেখেছি পরের জীবনে উপরে উঠে আসতে। সমাজের কাঙ্খিত যত স্ট্যাটাস, নর্মস, স্বীকৃতি-তার প্রায় সবটাতেই রেকর্ড মার্কস পেয়ে পাশ করতে। ইউনিভার্সিটিতে প্রথম দিন হতে সবার চেষ্টা থাকে সবচেয়ে সুন্দরী ব্যাচমেটকে জিএফ হিসেবে দখল নেয়া। যে যতটা চোস্ত ততটাই তার জিএফ ভাগ্য। তখন মনে হত, জিএফ বাগাতে যে যতটা কার্যকর সে ততটাই সফল। যাদের জিএফ নেই, থাকলেও তেমন মার্কা নেই, তারা ব্যর্থ। ইউনিভার্সিটি শেষ করলাম। হাঁচড়ে পাঁচড়ে একটা চাকরীও বাগিয়ে নিলাম। মনে হল সফল হলাম। আমাদের সহপাঠিরাও যে যার মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল। কেউ চাকরী, কেউ ব্যবসা, কেউ ধান্দা, কেউ রাজনীতি, কেউ শশুরের আদরের মনি! যারা ”বিসিএস ক্যাডার” হল তারা ভাবল চাঁদ হাতে পাওয়া গেল। যারা পেল না, তারা ভাগ্যকে মেনে নিল আর ঢুকল নানান প্রাইভেট জবে-উচ্চ মাহিনায়। ভাবল, যাক বেতনে পুষিয়ে যাবে-আমিও সফল।
ওদিকে বিসিএস ক্যাডারের মন খারাপ-সিল-সিগনেচার ছাড়া আর কী পেলাম জীবনে। হালে এসে আবার সরকার বাবাজি দিল সরকারী কামলাদের মজুরী আকাশ ছোঁয়া করে। বিসিএসদের পোয়া বারো আর প্রাইভেটারদের মাথায় হাত। কালে কালে বহু বছর পার হল। মধ্যবয়সে এসে পড়ল জীবন। মাঝে মধ্যে ন্যাংটো কালের জীবন হতে এই মধ্য বয়সের জীবনের ট্যালি করতে বসি। জীবন সফল নাকি বিফল? বাস্তব অভিজ্ঞতায় যতটা দেখেছি, মধ্যম বা পরের সারিতে যারা ছিল একাডেমিতে, তুলনামুলক তারাই এখন এগিয়ে আছে সোস্যাল স্ট্যাটাসে কিংবা আপেক্ষিক স্ট্যাটাসে। তথাকথিত ভাল ছাত্ররা মোটামুটি কেরানী কিংবা কর্পোরেট দাস হয়ে একটা টাইপড নাগরিক জীবন ধুঁকে ধুঁকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আর তাদের মিডিয়াম বা থার্ড ক্লাস সহপাঠিরা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন স্ট্যাটাসের ছক্কা মারছে।
নিত্যনতুন গাড়ি, বারিধারার ফ্ল্যাট, পূর্বাচলের প্লট, সুইস ব্যাংকে ব্যালেন্স, সেলফী কুইন শশুর-কন্যা (মানে বউ), কিউটের ডিব্বা দু”খানা মানব ছানা, চেকইন, ট্রাভেল, ট্যুর, সোস্যাল মিডিয়া, স্ট্যাটাস আপডেট, ক্রীকেট মাঠের দর্শক, তৃপ্ত আয়েশি সামাজিক সুখের ঢেকুর-অনেকটাই দিয়েছে জীবন তাদের। এখন মনে হয়, ওরাই সফল। সফলতার মিটার বয়সে বয়সে বারবার বদলেছে। কখনো সেটার নিয়ামক ছিল ভাল রেজাল্ট, কখনো ভাল জিএফ, কখনো বা বিসিএস, কখনো প্লট, কখনো ফ্ল্যাট, কখনো আবার অন্যকিছু। সফল হলাম কি ব্যর্থ হলাম সেটার বিচার করে শেষ করতে পারি না। ঠিক করেছি না বেঠিক, ঠিক রাস্তায় হেঁটেছি নাকি ভুল, ভবিষ্যত আলোকিত নাকি ঝরঝরা-সেটা একটা বিরাট প্রশ্ন।
এক রাজার এক চাকর ছিল যে বলত, খোদা যা করে বান্দার মঙ্গলের জন্যই। রাজা তা বিশ্বাস করত না। একদিন জঙ্গলে ঘুরে বেড়াবার সময় রাজার পা কেঁটে গেল। রাজা খোদার দোষ দিতে লাগল। চাকর বলল, খোদা আপনার ভাল’র জন্য করেছে। রাজা বিশ্বাস করল না। একটু পরেই একদল জঙলী তাদের বন্দী করে তাদের রাজ্যে দেবতার উদ্দেশ্যে বলি দিতে নিয়ে গেল। কিন্তু বলি দিতে গিয়ে দেখল রাজার পায়ে ক্ষত। কিন্তু তাদের বলি দিতে নিখুত হতে হবে। রাজাকে ছেড়ে দিল আর রাজা বেঁচে গেল। চাকর এসে বলল, দেখলেন, খোদা যে সবকিছু ভাল’র জন্য করে? তখন যদি আপনার পা না কাঁটত তবে আজ গলাটা কাঁটা পড়ত। সৌভাগ্য আর দুর্ভাগ্য দু’টোই যে আপেক্ষিক সেটা কি বুঝতে পারছেন?
তুমি কোন তালেবর?
#criticismatitsbest #relativityoflife বাবারও বাবা থাকে। কথাটা সবসময় মনে রেখে চললে নিজেরও ভাল, পরেরও। দশেরও মঙ্গল। আপনি যে সময়টাতে কারো ফ্যাশন সেন্স নিয়ে হাসাহাসি করছেন, হতে পারে, ঠিক সেই সময়টাতেই, আপনাকে ‘ক্ষ্যাত’ আখ্যা দিয়ে কেউ বন্ধুদের আড্ডায় খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসছে। বাকিরা মাথা দুলিয়ে সমর্থন করছে। আপনার মাত্রই সেদিন কেনা মান্যভরের শেরওয়ানীটা, যেটা পরলে আপনি মনে করেন, আপনাকে অভিষেক বচ্চনের মতো লাগে, ঠিক সেই শেরওয়ানীটাই হয়তো আপনার বস গেল সপ্তায় মান্যভরে নেড়েচেড়ে দেখে সস্তা ও থার্ড ক্লাস মনে করে রিজেক্ট করে এসেছেন। এমনকি, যেই রমনীকে আপনি বিশ্বসুন্দরী বিবেচনা করে ঘরে নিয়ে এসেছেন, সেই সুস্মিতা সেনকেই এর আগে হয়তো ৮ জন পুরুষ ও তার পরিবার ‘জাতের না’ বিবেচনা করে রিজেক্ট করে ফেলেছেন।
আপেক্ষিকতা, যাস্ট আপেক্ষিকতা।
আপনার ননদের বিয়েতে যে বেনারশিটা পরে গিয়ে আপনি আপনার বড় জায়ের পরনের ঢাকাই শাড়িটা নিয়ে মুখ টিপে তাড়িয়ে তাড়িয়ে হেসেছিলেন, আপনার সেই বেনারশি পরা ছবি দেখে হয়তো আপনার ছোট জা’ই আবার আপনার রুচি নিয়ে তার জামাইয়ের সাথে হেসে কুটি কুটি হয়েছে। আপনি যখন বান্ধবির ’শ্যামলা’ ও টাকমাথা জামাইকে নিয়ে হাসেন, তখন জেনে রাখতে পারেন, হয়তো এমা ওয়াটসন আপনাকে দেখলে ‘বেলাক’ বলে নাক কুঁচকাতেন। (যদিও তিনি সেটা করতেন না, বলার জন্য বলা।)
আপনি যখন কাউকে বেকুব, মফিজ, গাঁইয়া বলে পরিহাস করছেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই হয়তো কেউ না কেউ খোদ আপনাকেই গাধা, ছাগল, রাসকেল বলে গাল দিচ্ছে মনে মনে। অন্য কারো মেধা, বিচার, বিবেচনা, চয়েস, রুচি, বিশ্বাস, বুদ্ধিবৃত্তি নিয়ে হাস্য-পরিহাস, অথবা দাঁত কেলানো ফেসবুক মন্তব্য করে ফেলবার আগে আরেকবার ভাবুন, বাবারও বাবা আছে।
আপনি যদি মেধায় মেধা পাটকর কিংবা নানা পাটকরও হন, তাহলে আইনস্টাইনও তো একজন ছিলেন। তার সামনে আপনি হয়তো রীতিমতো পাটখড়ি।আপনি দিগগজ, স্টাইলিশ, চৌকশ, চোস্ত যতই হোন, আপনার চেয়েও ওপরে কেউ না কেউ আছে। সে আবার আপনাকে দেখলে বলত, “এই ’আবালটা’ কোত্থেকে আসছে রে?”
স্টাইল, রুচি, চয়েস, বুদ্ধিমত্তা-সবকিছুই ম্যাটার অব প্রিভিলেজ। যে যতটা প্রিভিলেজে জন্ম নেয়, বড় হয়, ওগুলোর ওপর একসেস তার ততটাই বেশি। ঢাকা শহরে জন্ম নিয়ে বেড়ে উঠেছেন। বয়স তিন কুড়ি হল। সেদিন গ্রাম হতে আপনার কাজিন শহরে আপনার বাসায় থাকতে এলো। তার পোশাক আশাকের ফ্যাশন নিয়ে আপনি উঠতে বসতে খূঁত ধরেন। ভেবে দেখেছেন, তিনি যদি আপনার মতো শহরে বড় হতেন, ঢাকার হাওয়া খেতেন, তাহলে তিনি আপনার চেয়েও বড় খিলাড়ি হতে পারতেন? ওভার প্রিভিলেজড আপনি হয়তো ফ্যাশনে জড়িমনিরও বস। কিন্তু, ভাবুন তো, নাওমী ক্যাম্বেলের সামনে পড়লে তিনি কি আপনাকে কিম কার্দেশিয়ান মনে করে সালাম দেবেন?
সূরত, রুচি, পছন্দ, চয়েস, স্টাইল ও বুদ্ধিমত্তা নেহাতই আপেক্ষিক বস্তু। ওগুলোর কোনো শেষ কথা বলে কিছু নেই। আপনার চোখে যাকে জরিনা লাগে, তাকেই অন্য কারো রোজিনা লাগে। আপনার পছন্দের জন এব্রাহামকেও কারো কাছে আদম আলীর মতো লাগতে পারে। নিজের এপ্রোচ নিজের জন্য, কেবলই নিজের জন্য রিজার্ভ রাখুন। নিজের কালা চশমায় অন্যের রং মাপতে যাবেন না। নিজের নিক্তিতে অন্যের পাপ ওজনও।
প্রত্যেকের কপালের ওপরে দুটো চোখ দেয়া আছে। তাকে তারটা সেই চোখ দিয়ে বেঁছে নিতে দিন না। [এই লেখার জন্ম কোনো বিশেষ ব্যক্তি, বস্তু, ঘটনা বা প্রেক্ষিতকে কেন্দ্র করে নয়। সম্প্রতি গুলিস্তান হতে গুলশান যাচ্ছিলাম। সাথে গাঁটছড়া বাঁধা শশুরকন্যা। পথে যেতে যেতে ‘স্যামসোনাইট’ আউটলেট দেখে আমার পার্টনার নিটোলের পুরোনো এক রসবোধ জেগে উঠল।
বহু আগে, নিটোল যখন আমাকে বিয়ে করতে চাইল, তখন দু’জনের চিন্তা করে একটা সুবিশাল ও ক্যাটকেটে লাগেজ ব্যাগ কিনি। সেটা আমাদের রসরঙ্গ করার অন্যতম ইস্যু। কথাপ্রসঙ্গে আমাদের অতি প্রিয় বিষয় রুচি, পছন্দ, ফ্যাশন জ্ঞান, বিবেচনাবোধ নিয়ে কথা উঠল। অনেক আগে, তখন আমরা স্বামী-স্ত্রী নই, নেহাত প্রেমিক-প্রেমিকা, তখন, তার মন জোগাতে আমি একটা পাঞ্জাবি কিনি। একা একা। বেকার ও ছাত্র তখন আমি অত্যন্ত সস্তায় কেনার জন্য গুলিস্তান হকার্স মার্কেটকে বেঁছে নিই। দাম নিয়ে ইস্যু না হলেও, তার কথামতো নীল পাঞ্জাবী কিনে আনি। কিন্তু, সেই সাধের পাঞ্জাবী পরে দেখে তিনি হেসে কুটি কুটি হয়েছেন আর সারাজীবন আমাকে কথা শুনিয়ে যাচ্ছেন। কথা হল, ওই পাঞ্জাবী নাকি আদৌ নীল রং না। সেটা নাকি ছিল ’পেস্ট’ নামের এক কালারের। সেই হতে তিনি আমাকে কথা শুনান-আমার কালার সেন্স নিয়ে।
আমি গুলিস্তান, স্যরি, গুলশান যেতে যেতে তাকে এই ১৫ বছর পরে স্বীকার করি, ওহে, তুমি কি জানো, লাল, নীল, সবুজ আর হলুদ-এই ক’টার বাইরে যে কোনো রং আছে, সেটাই আমি জানি না। তোমাদের কাছে যেটা ’বটল গ্রীন’, সেটা আমার কাছে গ্রীন? নিটোল আমার কালার সেন্সের অবস্থা শুনে মরে যায়। “তুমি এই ৪৩ বছর বয়সে রংও চেনো না? আল্লাহ, তোমাকে নিয়ে কী করব?” আমি পাল্টা তাকে বলি, ”তুমি কি জানো, মৌলিক রং মাত্র ৪ টা (মিজ. Rrumana Basher পরে আমাকে সংশোধন করে দেন, যে, মৌলিক রং তিনটা-লাল, হলুদ, নীল।) ? তুমি কি জানো, সাদা ও কালো কোনো রংই না?” নিটোলের বিষ্ময় বাড়ে-সে জানে না। আমি যা জানি, তা আপনি জানেন না। আবার, আপনি যা বোঝেন, তা আমি বুঝি না।
আপনি ভাবেন, “আল্লাহ, এই সামান্য জিনিসটাও সে বোঝে না?” সে আবার ভাবে, “বাপরে, এত সামান্য জিনিস না জানায় এত বিষ্ময়ের কী আছে?? তফাৎ এতটুকুই। আরো শুনবেন? আমি দেশী ও চাষের কৈ মাছের ভেদ ধরতে পারি না। তেলাপিয়া ও নাইলোটিকা যে দুটো আলাদা মাছ-তা জানি না। আমার কাছে নাইলোটিকা হল ’বিশাল’ তেলাপিয়া। আমি ফিরোজা ও সবুজের তফাৎ ধরতে পারি না। লাল আলু ও সাদা আলুর স্বাদের তফাৎ ধরতে পারি না। খাশির মাংস যে বিফের চেয়ে বেশি অভিজাত-সেটা হৃদয়ঙ্গম করতে পারি না। আটা ও ময়দার নিখূঁত পার্থক্য কী-সেটাই এই সেদিনই জানলাম। ৪২ বছর বয়সে। শার্ট কীভাবে ইন করতে হয়-সেই বিদ্যা আমি ইউটিউবে দেখে শেখার চেষ্টা করেছি জীবনে প্রথম-৪১ বছর বয়সে। অথচ, এতটাই ক্ষ্যাত এই আমি যদি বলি, ’জিন্স’ ও ‘ডেনিম’ যে এক না, গ্যাভাডিন নামে যে আদতে কোনো কাপড় নেই, আর শার্ট প্যান্ট যে কাপড় দিয়ে না বানিয়ে ‘ফ্যাবরিক’ দিয়ে বানানো হয়-সেটা আমি জানি, অথচ আপনি জানেন না!!
দেখুন, আপনি যা পারেন, জানেন, বোঝেন-তা হয়তো আারেকজন পারে না। আবার, সে যা জানে, হতে পারে না, যে, সেটা আপনি জানেন না? পারসপেকটিভ, প্রিভিলেজ ও রিলেটিভিটি ম্যাটারস।পরশু, আমাদের অফিস সহকারীকে নাস্তার জন্য নারকেল দিয়ে রাঁধা বুটের ডাল আনতে বলেছি। তিনবার বলে দিয়েছে, শুধু ডাল, হ্যা, শুধু বুটের ডাল আনবেন।” খেতে বসে দেখি, রেস্তোরাঁর সেই তথাকথিত ‘ডাইলভাজি’ মিক্স। যথারীতি আমি শেষ। আমার জুনিয়রকে ঘটনাটা বললাম। তিনি বললেন, ”ও এত বোকা?” আমি তাকে বলি, “ভাই রে, ও যদি আপনার লেভেলের বুদ্ধিমানই হত, তাহলে কি ও পিওন হত? ওতো তখন সিনিয়র অফিসারই হত? আর, সেটা সত্যিই যদি সবাই হত, তাহলে কি আপনি অফিস চালাবার জন্য পিওন পেতেন?
যে যেমনটা আছে, তাকে তেমনটাতেই ভালোবাসুন, মেনে নিন।আপেক্ষিকতার আনুসঙ্গিক দিক হল মার্জিনালাইজেশন ও জেনারেলাইজেশন। এক মহল্লায় এক তাহাজ্জুদ গুজার বুজুর্গ আর এক সিঁদেল চোর থাকত। একদিন ফজরের ওয়াক্তে তাহাজ্জুদ গুজার লোকটা পুকুরঘাটে ওজু করতে বসল। একই সময় সিঁদেল চোর সারারাত চুরি করে হাতমুখ ধোয়ার জন্য পুকুরের অপর পাড়ের ঘাটে নামল। বুজুর্গ লোকটা চোরকে দেখে ভাবল, আহা, ওই লোকটাও মনে হয় আমার মতো সারারাত তাহাজ্জুদ পড়ে এখন ফজর পড়তে মসজিদে এসেছে। আর চোর তাহাজ্জুদ পড়া বুজুর্গকে দেখে ভাবল, বেটা নিশ্চই আমার মতো চোর। সারারাত চুরি করে এখন বাসায় যাচ্ছে।
এই দৃষ্টিভঙ্গির নাম হল মার্জিনালাইজেশন ও জাজমেন্টাল এটিচুড। আমরা বাঙালীরা প্রচন্ড রকম জাজমেন্টাল। চোখের দেখাতেই কাউকে রাজা উজির বানিয়ে ফেলি। কোনো বিষয়ের তলানীতে যাবার প্রবণতা খুব কম। আপেক্ষিকতাকে হৃদয়ঙ্গম করতে পারলে জীবন সহজ হয়, সাবলীল হয়। জটিলতামুক্ত হয়। আপনি যদি জানেন জগতে দৃশ্যমান ঘটনাবলি ও সত্যাসত্য সবই আপেক্ষিক তাহলে মনের টানাপোড়েনটা কম হয়, পাওয়া না পাওয়ার কষ্টটা কমে যায়। বঞ্চনার আগুনটা ফিকে হয়ে যায়।
যখন আপনি জানেন, আজ যেটা আপনাকে পোড়াচ্ছে সেটাই হয়তো কাল হয়তো সেটাই আপনার আনন্দের কারন হবে। আজকে যার জন্য আপনি কেঁদে বুক ভাসাচ্ছেন কাল তার অনুপস্থিতিই হয়তো আপনাকে সুখের সাগরে ডোবাবে। তাই কোনো কিছুতে আনন্দ আবেগে আপ্লূত হওয়াও ভুল আবার মনের দুঃখে আত্মহারা হওয়াও ভুল। সুখ ও দুঃখ বড্ড সাময়িক ও আপেক্ষিক।
দু’য়ের অস্তিত্বই ইগনোরেবল।
#relativesuccess #division #unitydividation #nationaldestruction #socialdestruction #socialdeviation #destructivenation #debate #relativity #politician #absenceofunity #freedomofspeech #freedomofopinion #personalfreedom #righttotalk #differentopinion #disunitednation #unityofnation