Skip to content

টিউশনি মাস্টারের গল্প

  • by

আপনি কি জানেন, চায়ের মধ্যে পিপড়ে পড়লে চা খেতে কেমন লাগে?

আমি জানি, আপনি বলবেন, এটা আবার কেমন প্রশ্ন? পিপড়ে পড়া চা খাবেন কেন?

উত্তরটা আমি দিচ্ছি, তার আগে বলুন তো, আপনি বসের কাছে বেতন বাড়াবার জন্য কীভাবে বলেন?”

নিশ্চই ভাবছেন, “এটা একটা প্রশ্ন হল? গিয়ে বলি, “বস বেতন বাড়ান”। হা হা হা।

বস, আমি তিনদিন চেষ্টা করে, মনকে সাহস যুগিয়ে বলতে গিয়েছিলাম অন্তু’র মাকে। তিনি তারপর প্রায় একসপ্তাহ আমাকে ওই লাল পিপড়েওলা চা ও খেতে দেননি।” ওই লাল চা আর দুটো নোনতা বিস্কিটই ছিল আমার হল জীবনে বেশিরভাগ দিন সন্ধ্যে বেলার নাশতা। আমার মনে হত, বিস্কিটগুলো বিশেষভাবে আনা হত টিউশনি মাস্টারকে চায়ের সাথে দেবার জন্য। তা না হলেও, হয়তো বাড়ির লেফটওভার বিস্কিটগুলো টিনে রেখে দিত টিচারের জলখাবার হিসেবে। হাসবেন না বস, আমি এক বাড়িতে দেখেছিলাম, টিচারের জন্য কাঠের শক্ত চেয়ার রাখা হত, যাতে সে চেয়ারে না ঝিমায় আর পড়ার ঘরের দরোজায় একটা পিপ হোল করা। টিচার কী করে না করে, সেটা ওয়াচ করতে।”

আমি রবি। একটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হতে পাশ করে বেরিয়ে একটা বিদেশী কোম্পানীতে চাকরী করছি আমারই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সিনিয়র ভাইয়ের আন্ডারে। বস ধনীর ঘরের সন্তান। চাকরী করেন সখে। নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হওয়ায় বসের কিছু আনুকূল্য যে পাইনি তা বলব না। কলাটা মূলাটার পাশাপাশি অফিসে একটা একট্রা পাওয়ার আছে আমার।

বস আমাকে নিয়ে একটা সাইট ভিজিটে এসেছেন চট্টগ্রাম। ডিনারের পরে হোটেল সুইটের ব্যালকনীতে বসে সিভাস রিগ্যালের ছিপি খুলেছেন বস। কয়েক পেগ পেটে পড়তেই মনটা তরল হয়ে ওঠে বসের। অবশ্য তিনি এমনিতেই আমার সাথে যথেষ্ট ফ্রাঙ্ক। চাকরীর প্রথমদিনই তিনি আমাকে বলে দিয়েছেন, নো স্যার। অনলি ভাই। ভাইটা সাহস করে বলতে না পেরে বস বলি। এখন অবশ্য আমি তার ব্যালকনীতে শুধুই সঙ্গ দেবার জন্য।

মনের তরল অবস্থায় বস আমার কাছ থেকে আমার হল লাইফের গল্প শুনতে চান। বস হলে থাকেননি। আর ধনীর সন্তান হওয়ায় লাইফ স্ট্রাগল নিয়েও ভাবতে হয়নি। অনেকবার তিনি আমার গল্পটা শুনতে চেয়েছেন। চট্টগ্রামের এক বিলাসবহুল হোটেলে সুইটের ব্যালকনীতে বসে মদ্যপ বসকে আমি আমার সঙ্গোপনে রাখা গল্প বলে চলি।

আপনি হয়তো শুনে অবাক হবেন, মফস্বল বা গ্রাম হতে আসা আমাদের মতো নিম্ন মধ্যবিত্ত বা গরীব চাষীর ছেলেমেয়েদের কাছে হল লাইফ মানেই জীবনকে চাবুক মেরে এগিয়ে নেয়ার সংগ্রাম। হয়তো জানেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বেশিরভাগই আমাদের মতো গ্রাম হতে আসা নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত বাবা-মায়েদের সন্তানেরাই বেশিরভাগ পড়তে আসে। তারা জানে, কী করে মাত্র ১২০০ টাকা দিয়ে নিজের পড়ার খরচ, থাকা, খাওয়া, জামা, জুতো, ইয়ে মানে………বান্ধবীর খরচ পুষিয়েও মা’র জন্য, বোনের জন্য, ছোট ভাইটার জন্য ইদের সময় কিছু একটা কেনার মতো পয়সা জমিয়ে রাখতে হয়।

কীভাবে নীলক্ষেতের গলি, তস্য গলির ভিতরে মামা’র হোটেলে টুল পেতে বসে ৩০ টাকা দামের তেহারী গলা দিয়ে নামানো যায়। এক আমরাই জানতাম, ক্যাম্পাসের কোন হলে কবে খিচুড়ী হচ্ছে। ডায়নিং এর ডালের গামলার স্বচ্ছ তলা হতে কিভাবে অতি দক্ষতার সাথে কিছুটা হলেও ডাল চামচে করে তুলে আনা যায় নিপূণ দক্ষতার সাথে। ছাড়পোকার কামড় নিয়ে রীতিমতো একটা উপন্যাস লেখা যাবে। আমি নিজে দেখেছি, হলের ডায়নিং এর মাছের টুকরো কীভাবে সুনিপূনভাবে ব্লেডের চাকু দিয়ে পাতলা আর ছোট করে কাটা হয়। সেই মাছ যাতে ভেঙে না যায় তার জন্য তাতে আটা মাখিয়ে ভেজে পাপড় করে নেয়া হয়।

মনে আছে, একবার নাস্তার পরোটা হাত দিয়ে টেনে ছিড়তে গিয়ে বাটির ভাজি ধাক্কা লেগে পড়ে গিয়েছিল। তখনো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বিষয়টা বাংলাদেশে অতটা চালু হয়নি। আমরা গাঁয়ের কলেজকেই ভাবতাম বিশ্ববিদ্যালয়। তবু এক বড় ভাইয়ের পরামর্শ বা ধমক যাই বলেন, সেটার প্রেক্ষিতে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির চেষ্টা শুরু করি আর কী করে যেন চান্সও পেয়ে যাই। আমাদের পরিবার ও বংশে আমিই প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি। চান্স পাবার পরে বাবা বলেছিল, টাকার অভাব হবে না। তুই যা। যদিও তার সে কথায় আমি তার চোখে তেমন জ্যোতি দেখিনি।

প্রথম কিছুদিন সামান্য কিছু টাকা বাড়ি হতে আসত। বাবার পাঠানো সামান্য টাকার যোগানও যখন ফুরিয়ে আসতে লাগল, তখন খরচ চালানোর জন্য হন্যে হয়ে একটা বিকল্প ইনকাম করার চেষ্টা শুরু করি। তখনকার দিনে বিকল্প মানেই টিউশনি। হলের বড় ভাইরা কিংবা অলরেডি “মাস্টারী” করছে-এমন মেটরাই টিউশনি যোগানোর একমাত্র উৎস।

একবার নীলক্ষেতের দেয়ালে ’টিউশনি দিচ্ছি’ বিজ্ঞাপন দেখে খবর নিতে গিয়ে মাদক পাচারকারীদের কবলে প্রায় পড়ে গিয়েছিলাম। অবশ্য আমার টিউশনি জীবনের শুরু সেই স্কুলে থাকতেই। যার বাবা সামান্য একজন সরকারী কেরানী অথচ আটজন সন্তানের বাবা হয়ে বসে আছেন (কতকটা অজ্ঞতা, কতকটা ইচ্ছাকৃতভাবে), তার সন্তানকে অল্প বয়সেই জীবনযুদ্ধে নিজেকে নামতে হবে-এটাতো অনুমিতই। তাই ক্লাস নাইনে থাকতেই গ্রামে আমি টিউশনি শুরু করি।

টিউশনি বলতে, অনেকটা পেটেভাতে জায়গীর। আপনারা যাকে লজিং বলেন। আমার চেয়ে দুই ক্লাস নিচের একটা মেয়েকে পড়াই। তিনবেলা জলখাবার বাদেও মাস শেষে ১০০ টাকা পাই। না না ভাই, হাসবেন না। সে আজ হতে প্রায় ২৩/২৪ বছর আগের কথা। তার উপর গ্রামে। তাই ওই ১০০ টাকাই অনেক মনে হত তখন। তো সেই একশো টাকা হতেও মাকে পঞ্চাশ দিয়ে দিতাম। সংসার চালাতে।

মেয়েটা খুব সরল আর ভাল মানুষ ছিল। নিজের বোনদের মতোই ওকে দেখতাম। আপন ভাবতাম। বছর খানিক পড়িয়েছি। একদিন পড়ানোর সময় কী একটা জোক বলাতে মেয়েটা হেসে গড়িয়ে পড়ছিল। হঠাৎ করে ওর মা এসে পড়ে। মেয়েকে আর তার শিক্ষককে এই অবস্থায় দেখে কী মনে করেন কে জানে। পরের সপ্তাহেই তারা আমাকে জবাব দিয়ে দেয়। অনেক কেঁদেছিল অনু। ওহ, বলা হয়নি, মেয়েটার নাম অনু।

হলে এসে প্রথম যেই টিউশনিটায় গিয়েছিলাম বস”, “সেটা গেন্ডারিয়ায়। আমার ক্যাম্পাস হতে প্রায় ৭/৮ কিলোমিটার দূরে। ১৩ নাম্বার বাস সম্ভবত তখস ঢাকার সবচেয়ে নোংরা ও সবচেয়ে দীনহীন বাস ছিল। ওটাতে বাদুড় ঝোলা হয়ে ৪ টাকা বা ৫ টাকা দিয়ে যেতাম সেই ধূপখোলা, গেন্ডারিয়া। মনে হত ঢাকার বাইরে চলে যাচ্ছি। একটা অতি ধনী পরিবারের ছোট কন্যাকে পড়াতে হবে। ইংলিশ মিডিয়ামে লেভেল টু।

প্রথম দিনই বাচ্চা আবদার করে বসল, সে টেবিলের উপর বসে পড়বে। না হলে পড়বে না। বেশ। তাই সই। মেয়ের পরিবার আবার কঠিন পর্দানশীন। পর্দার আড়াল হতে বাচ্চার মা কুশল জানলেন। একটু পড়ে নাস্তা পাঠালেন। বড়লোক বাড়ির কারবার। তিন পদের নাস্তা, সুগন্ধী কফি। জীবনেও এর আগে কফি খাইনি। মনটাই ভাল হয়ে গেল। কিন্তু আমার নিম্নমধ্যবিত্ত মানসিকতা আমাকে ভিতর হতে বলতে লাগল, না রবি, ধৈর্য ধরো। তো বহুক্ষন কফির সুগন্ধ আর নাস্তার চো চো লোভ সামলে যখনি নাস্তা খাব, বাচ্চার আবদার, টিচার, আমি খাব। আমার পিত্তি জলে গেলেও প্রকাশ্যে বললাম, হ্যা, হ্যা, নিশ্চই।

তারপর সেই তিনপদের নাস্তার সবটা সে হাত বাড়িয়ে খেয়ে এঁটো করে দিল। কফির কাপে দু চুমুক দিয়ে রেখে দিল। আমি হতভাগার মতো চেয়ে চেয়ে দেখলাম আর আমার মধ্যবিত্ত লজ্জার মুন্ডূপাত করলাম। তারপর যতদিন ছিলাম এই একই কান্ড। দিন দিন আমার ভাল নাস্তা আর চা সব ছাত্রীর পেটে যেতে থাকল। অথচ আমি বিকেলের নাস্তাটা বাঁচাতে না খেয়েই ওখানে যেতাম। আমি নাস্তার আশা ছেড়ে তখন অন্য ভেজালে।

এই যে তিনপদের নাস্তা, জুস, কফি সব প্লেট ভেতরে খালি ফেরত যাচ্ছে, তাতে এরা না জানি মনে মনে ভাবছে কিনা, মাস্টার ব্যাটা হাভাতে। চেটেপুটে সব খেয়ে নেয়। ঈশ্বর, আমাকে তুলে নাও। অবশ্য আমার এই চাকরীর বয়স ছিল মোটে ৭ মাস।

তার পরে এক বড় ভাই তার ছেড়ে দেয়া ছাত্রকে পড়াতে নিয়ে গেলেন। এরকম বদলা ডিউটি শুধু মুটে মজুররাই করত তখন। আমিও বদলা টিউশনিতে গেলাম। ছাত্র মহা ত্যাদোড়। তাকে এক ঘন্টা পড়ালে একঘন্টা ছুটি দিতে হয়। সে একঘন্টা ভিডিও গেম খেলে, বাথরুম, সু সু, টিভি শেষ করে আবার এলে তবে তাকে পড়াতে বসতাম। এমনি করে তিন চার ঘন্টা ওকে পড়াতাম। তবে আমার মজাই লাগত। আমার তখন অঢেল সময় হাতে।

ছাত্রের বাসায় অসাধারন চা হত। ছাত্রের মা আমার চায়ের বাতিক জানতেন। যতক্ষন থাকতাম, আমাকে প্রতি ঘন্টায় মগ ভরে চা পাঠাতেন। বেতনের চেয়ে ওই চা টাই ছিল আমার প্রাপ্তি। ছাত্রের মায়ের ছিল এক বাতিক। প্রায়ই আমাকে বলতেন, পড়াটা ওকে ঝড়ঝড়া করে দিও। আমি ঝড়ঝড়া করতে পারতাম না। আর সেই ব্যর্থতায় বছর তিনেক পড়ানোর পড়ে নতুন আরেকজন ’ঝড়ঝড়া’ এসে পড়ায় আমার মাষ্টারির ইতি।

সেমিষ্টার পরীক্ষার খরচ তুলতে ৩ মাসের জন্য একটা বাচ্চাকে পড়াতে হয়েছিল। বাচ্চার মা যখন তার বাচ্চাকে পড়ানোর রিকোয়েস্ট করেছিল, এমন ভাব করেছিলাম যে, তাকে উদ্ধার করেছি। কিন্তু মনে মনে চাচ্ছিলাম, তিনি যেন বেঁকে না বসেন। আমার যতটা মনে পড়ে, একমাত্র এই টিউশনিটাতেই স্টূডেন্টের গার্ডিয়ান আমাকে শর্ত দিয়ে দিয়েছিল, কমপক্ষে ১:৩০ ঘন্টা পড়াতে হবে। বাপরে।

যাহোক, একটা বাচ্চা মেয়ে। হঠাৎ একদিন খেয়াল করি, পড়াবার সময়ে মেয়ের মা এসে রুমে বসে থাকেন। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম কেমন পড়াই সেটা দেখেন। কিন্তু একদিন বাসার কাজের মেয়েকে মায়ের যায়গায় বসে থাকতে দেখে সন্দেহ হল। ছাত্রীকে জিজ্ঞেস করতে বেচারা সত্যি কথা বলে বসল। ”স্যার, মা আসলে আমাকে পাহারা দেয়, যাতে আমি আপনার বা আপনি আমার সাথে…………………………” গুলি মারি, টিউশনির। ইস্তফা দিলাম।

টিউশনির ছাত্রের মা ও চাচীর কুনজরে পড়ে টিউশনী খুইয়েছিল আমার বন্ধু চারু। চারুর জবানিতেই বসকে বলি সেই ঘটনাটাও। চারু।

ইউনিভার্সিটি হোস্টেলে থার্ড ইয়ারের ছাত্র। নিজের খরচ চালাতে সে একটা টিউশনি করে। ছাত্র লেভেল ৭ এর। বাড়িতে বাবা-মা ও তার বড় চাচী, মানে যৌথ সংসার। ছাত্র’র চাচা থাকেন বিদেশে। চাচী সম্পর্কে বড় হলেও বয়সে ছাত্রের মায়ের থেকে ছোট। ছাত্রের বাবা বেশিরভাগ সময়ে ট্যুরে থাকেন।

পড়ানো শুরু করার কিছুদিন পরে চারু অবাক হয়ে খেয়াল করে, কাজের মেয়ের বদলে ছাত্রের চাচী চা পরিবেশন করতে শুরু করলেন। চা নামিয়ে রাখবার সময় অনেকটা সময় নিচু হয়ে চারুর সামনে কাপ এগিয়ে দিতেন। কাপের সাথে মৃদু হাসিও। পূর্ণ যুবক চারু কিছুটা আন্দাজ করলেও দুর্মূল্যের বাজারে টিউশনিটা বজায় রাখার স্বার্থ তাকে চুপ রাখে। কিছুদিন যেতে যখন তিনি দেখেন চারুর কোনো পরিবর্তন হয়নি, তিনি চা পরিবেশনের সময়ই একদিন ছাত্রকে বলেন, “রুপূ, তোমার স্যার এত নিরস কেন?”

তার ডেসপারেশন চারুকে হতবাক করে দেয়। বাসার মাঝের একটা রুমে রোজ পড়ায়। রুমের পাশেই ছাত্রের বাবা-মায়ের বেডরুম। যতক্ষন পড়াত রুমের দরোজাটা বন্ধই থাকত। কিছুদিন পরে সে খেয়াল করল, রুমের দরোজা খোলা থাকা শুরু করল। ছাত্রের মা মাঝে মাঝেই পড়ার সময় এই রুমে আসা শুরু করলেন। একটা তীব্র পারফিউমের গন্ধ পেত চারু। অনেক দামী ও উত্তেজক। সেটাকে সে আমলে নিত না। কিন্তু সবচেয়ে মারাত্মক ঘটনা ঘটে একদিন। চারু রুপূকে পড়াতে গেছে যথারীতি। বেডরুমের দরোজা আগে থেকেই খোলা। পড়ার ঘর হতে ওই রুমটার অনেকটা দেখা যায়। দরোজার উল্টোপাশে একটা বড় ড্রেসিং টেবিল।

হঠাৎ চারুর চোখ যায় সেদিকে। চারু হতবাক হয়ে আয়নায় দেখে রুপূর মা ছোট্ট একটা টুলে বসে। তার হাতে চিরুনী। আর গায়ে একটি সুতাও নেই। আয়নায় খুব পরিষ্কারভাবেই চারু আর রুপূর আম্মা-দুজনকে দেখা যাচ্ছে। রুপূর আম্মা সেটা দেখেও যেন দেখছেন না। চারু সেই মাসের বেতনটাও আর কখনো আনতে ওমুখো হয়নি। একদিন কথাচ্ছলে সে রুপূর কাছে শুনেছিল, রুপূর বাবা বেশিরভাগ সময়ই বাড়ির বাইরে থাকেন। আর তার বড় চাচার বয়স তার চাচী হতে ১৯ বছর বেশি।

দুটো বাচ্চাকে পড়াতে শুরু করলাম একবার। দু’জনই মাশাল্লাহ বিদ্যার বহর। দুই দু গুনে চার-সেটাও মনে রাখতে পারে না। বাচ্চা বছর বছর ফেল করে ক্লাসে। বাচ্চার বাবা-মায়ের অনুরোধে শুরু করলাম। বিশ্বাস করেন বস, জীবন ভাজা ভাজা হয়ে গেল। একদিন বিরক্ত হয়ে ভাবলাম, আর না, যথেষ্ট। ছাত্রের মায়ের সাথে বললাম। তিনি যেটা বললেন, তাতে আর ছাড়া হল না টিউশনিটা। বড় বাচ্চাটা ছিল প্রিম্যাচিওরড বেবি। জন্মকালীন জটিলতায় তার ব্রেইন আঘাত পায়। তার জের ধরে ডাল হয়ে যায় ছেলেটা। ছোট ছেলেটা তুলনামূলক ভাল হলেও তার দৌড়ও খুব না। কোনো মাষ্টারই বেশিদিন এই দুই মেধাহীন বাচ্চাকে পড়াতে বিরক্ত হয়ে যায়। তার উপরে তাদের আর্থিক অবস্থা ভাল না। বেশি বেতন দিয়ে মাষ্টার রাখতে পারত না। আমি তারপর আর অমত করিনি। যতটা পেরেছিলাম বাচ্চা দুটোকে শিক্ষা দেবার চেষ্টা করে যাই আন্তরিকভাবে। ওরা যেই ভালবাসা আমাকে দিত, তার কাছে টাকাটা কিছুুই ছিল না। বড় বাচ্চাটা এখন জব করে। ফোনে কথা হয় প্রায়ই। নিজেকে তৃপ্ত লাগে।

আমি আপনার এখানে জবে জয়েন করার আগে অনেকগুলো টিউশনি করিয়েছি বস। তার মধ্যে সবচেয়ে মনে থাকবে দুটো দারুন বাচ্চাকে পড়ানোর স্মৃতি। টিউশনি নিয়ে অনেক ব্যঙ্গ, টিটকারী, গবেষনা থাকলেও খুব ব্যতিক্রমী ছিল আমার এই টিউশনির অভিজ্ঞতা। বাচ্চা দুটো আমাকে স্যার না, নিজের মামার মতো দেখত। আমিও নিজের আপনজনের মতো হয়ে গিয়েছিলাম ওদের সাথে।

যারা টিউশনি টিচারদের নিচু নজরে দেখত, তাদের জন্য উদাহরন হতে পারত আমার এই অভিজ্ঞতা। কোনো উৎসব পার্বন এলেই নিয়ম করে উপহার দিত আমার ছাত্র/ছাত্রীরা। বিশেষ পার্বনে বিশেষ খাওয়া দাওয়ায় ছিল অবারিত দাওয়াত। অনেক কষ্ট হয়েছিল ওদের ছেড়ে আসতে। কিন্তু চাকরীটা হয়ে যাওয়ায় ইস্তফা দিতেই হত। ছাত্রীর বিয়ের কথাবার্তা চলছে। তার মা বলে রেখেছে, অবশ্যই যেতে হবে। এই সম্মানগুলো চোখে পানি এনে দেয়। টিউশনি মাস্টারকে নিয়ে কেন যেন একরকম আড়ষ্টতা আর একপ্রকার ট্যাবু প্রচলিত ছিল তখনকার সমাজে। সেই বোধটা আমাকে ঘিরে রাখত সারাক্ষন। টিউশনি কথাটাতেই কেন যেন একরকম শ্লেষ জড়িয়ে থাকত।

টিউশনি মাস্টারকে নিয়ে অনেক রসালো গল্প প্রচলিত আছে আমাদের সমাজে। প্রাচীন জায়গীর প্রথার আধুনিক রূপ টিউশন। অন এ্যান এ্যাভারেজ, প্রায় সব বাড়িতেই বিশ্বাস করা হত, টিউশনি মাস্টার মানেই হাভাতে, গরীব; আর মেয়ে ভাগিয়ে নেবার মতলব। মাইনে দিতে জান বেরিয়ে যেত এমন বহু টিউশনির গল্প আছে। জ্বর হয়ে তিনদিন যেতে না পারায় বেতন কেটে রেখেছিল আমার বন্ধু রাজিবের। একটা টিউশনিতে ঈদ মাসের মাঝে পড়ে যাওয়ায় আমি কিছু টাকা এ্যাডভান্স চেয়েছিলাম। স্টূডেন্টের বাবা আমাকে সেদিন একঘন্টা চিবিয়ে চিবিয়ে সবক দিয়েছিলেন, কিন্তু টাকা আর দেননি। রুমালের অভাবে জামার হাতায় চোখ মুছতে মুছতে হলে ফিরেছিলাম সেদিন।

আমার অনেক পয়সাওলা বন্ধুরাও কিছু কারনে টিউশনি করত। ওদের কথা অবশ্য আলাদা। জা

নেন বস, মাঝে মধ্যে আমার ইচ্ছে করে, চিৎকার করে বলি, শোনো অভিভাবকেরা, পত্রিকার সম্পাদকেরা, বাচ্চারা পরীক্ষায় জিপিএ পাঁচ পেলে তোমরা যে স্কুল আর তার শিক্ষকদের তুমুল প্রশংসা করো, আমাদেরও রেখো তার স্তুতিতে। এই আমরাই, এই পিপড়ে মেশানো হালকা সালফার গন্ধওলা লাল চা খানেওলা টিউশনি মাস্টাররাই তোমাদের সন্তানদের মানুষ করে তুলি, অনেকখানি। গাধা পিটিয়ে ঘোড়া করার কাজটা নিরবে করি আমরা। ………………..

আমি থামি এতক্ষন পরে। খেয়াল ছিল না, গল্প কতদূর এগিয়েছে। বসের দিকে নজর দিয়ে দেখি, বেচারা এতক্ষণ ঘুমিয়ে কাদা। ব্যালকনীর সোফাতেই ঘুমিয়ে পড়েছেন।

শোনাতে বসেছিলাম আমার হল জীবনের কাহিনী। কখন জানি না, অজান্তেই সেটা আমার টিউশনি লাইফে বাঁক নিল। আমি আর তাকে ডাকি না। চট্টগ্রামের রাতের আকাশ বোধহয় একটু বেশি কালো। আমি সেদিকে তাকিয়ে আমার ফেলে আসা অতীতকে খুঁজি। ঠিক যেমনটা করে সেই হল জীবনে ছাদে চিৎ হয়ে শুয়ে রাতের কালোয় খুঁজতাম আমার ভবিষ্যতকে।

[এই লেখার ত্যানা প্যাঁচানো কমেন্ট: ১.ভাই, এটা কি আপনার নিজের জীবন হতে বললেন? ২.ভাই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে এভাবে পঁচালেন? ৩.আপনাকে কে বলল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সব নিম্নমধ্যবিত্তরা পড়ে? ৪.ভাই, অনুর শেষতক কী হল? ৫.ভাই, একটা টিউশনি দিতে পারবেন? আপনার তো অনেক অভিজ্ঞতা।]

#tution #lodgingmaster #teacher

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *