Skip to content

শুককুর বারের পাঁচালী

  • by

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-১: #thuglife #selfdignity #selfish #selfless #music:

একটি সপ্তাহান্তের বার্তা আপনাকে আলোড়িত করে? নাকি হন ত্যাক্ত? বার্তার প্রভাব যাই হোক, একটি সপ্তাহান্তের আবেদন অনেক। শীত আসি আসি করেও আসছে না। হয়তো সদা উত্তপ্ত এই কর্পোরেট নগর সভ্যতায় সে ভয় পায় শীতলতার চাদর বিছাতে। পাছে নগর গোস্বা করে। নগরের কোলাহলে, বাস্তবতার হলাহল ব্যস্ত রাখে দম দেয়া পুতুলের মতো। পরিবার, সন্তান, সমাজ, অফিস সব সামলে, সবাইকে খুশি করতে করতে কখন যে জীবন সায়াহ্ন এসে পড়ে তা টেরই পাওয়া যায় না। অথচ দুয়ারে পালকী। তাই যা করার এখুনি। যা কিছু ভাল কাজের নিয়ত ছিল। যা কিছু গুছিয়ে যাবার, গুছিয়ে বলে যাবার ছিল, যা কিছু করে দিয়ে যাবার ছিল, তা করুন আজই।চলে যাবার আগে, সপ্তাহান্ত চিরতরে ফুরোবার আগে,রেখে যাব নিজের পদচিহ্ন। It’s now, or never.শুভ সপ্তাহান্ত। সেটি আপনার যেদিনই হোক।

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-২: #musicpower #powerofmusic #appealofmusic #loveformusic:

সীমাহীন ব্যস্ততার একটি সপ্তাহ গেল। ব্যস্ত নগর সভ্যতায় অবশ্য ব্যস্ততাই বাস্তব।আর সত্যিই, একটি ব্যস্ত সপ্তাহ গেলেই কেবল একটি ডে অফের মর্ম খুব ভাল করে অনুভূত হয়।শীতের পিঠা আর খেজুর রসকে খুব মিস করেন নিশ্চই? আচ্ছা, ছুটির দিনে অফিসকে কি কেউ মিস করে? হাসলেন? এ সপ্তাহে বিরাট ফর্দ নয়। ছোট্ট এই বার্তা আপনাকে সপ্তাহান্ত নিশ্চিতভাবে এনে হয়তো দেবে না, তবু আশা করি, আপনার আগামিকাল দিনটা ভাল কাটুক। তারপরের দিনগুলো আরো ভাল। আচ্ছা ভাবুন তো, ৬ দিন উদয়াস্ত খাটার পরে মন নিশ্চই আঁকুপাঁকু করে একটি ছুটির দিনের জন্য? সারা সপ্তাহের জমানো ঘুম পুষিয়ে নেয়া, বন্ধুদের সাথে বকেয়া আড্ডার ক্বাজা আদায়, গত বৃহষ্পতিবারের পজ দেয়া মূভির বাকিটা দেখা-কত পরিকল্পনা আছে। ছুটির মানেই তো সব বকেয়া পাওনা পূরন। তবে একটু অন্যদিক দেখাই। আপনার আমার ঘরে একজন নারী আমাদেরই সাথে সারা সপ্তাহ আমাদের সমান্তরালে শ্রম দিয়েছেন। ঘর গোছানো, বাচ্চা মানুষ করা, রান্না, সামাজিকতা, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, বাবা-মা’র যত্ন নেয়া, স্বামীর মন যোগানো, লন্ড্রি-কত কী? তারও কিন্তু একটা উইকএন্ড চাই। সেটুকু তারও অধিকার। এখন তিনি তো নিজেই নিজের এমডি। তাকে কে ছুটি দেবে? কে দেবে সপ্তাহান্তের অবসর? কে তাকে বলে দেবে, “আর তোর ছুটি।” হতে পারে না, কাল আমি ও আমরা আমাদের গৃহলক্ষীদের জীবনে একবারের জন্য হলেও সপ্তাহান্তের ছুটি দিয়ে দেব? হয়তো তাতে আমার আপনার সপ্তাহান্ত’র আয়েশী অবসরে কিছুটা টান পড়বে। পড়ুক না। একদিনের জন্য আরেকজন কর্মবীরের একটা সপ্তাহান্ত তাতে না হয় রঙীন হয়ে উঠলই? আপনি ও আপনার পরিবারের জন্য একটি অন্যরকম সপ্তাহান্তের শুভকামনা।

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-৩: #spring #perception #attitude

আজ বিষ্যুদবার। ২১ চৈত্র। বসন্তের আজ ৫১ তম দিন। ক্রীসেন্ট লেকের কৃষ্ণচূড়াগুলোতে আগুন লেগেছে যেন। সবুজের মাঝে রক্তরাঙা আগুনে প্রকৃতিরর এ যেন জাজ্বল্যমান কোনো প্রতিবাদ। হয়তো প্রকৃতির বিরুদ্ধে আমাদের ধ্বংসযজ্ঞের কিঞ্চিৎ প্রতিকী প্রতিবাদ এটা। আচ্ছা, কখনো লাল রঙে কালো পোষ্টার রাঙানো সম্ভব? এই বসন্ত বাংলার রাজধানীকে সর্বোতভাবে আগুনরাঙা করতে যেন উঠেপড়ে লেগেছিল। এই বসন্তে আরেক রকম লালে রঞ্জিত হয়েছে এই নগরের কংক্রীট বুক। রক্তলাল আগুনের লেলিহান শিখায় কালো রাত নেমে এসেছে এই ‘লাশধানী’তে। লাল আগুনে কালো ছাইয়ে কালো কয়লার মতো পোড়া মানব পোষ্টার বারবার দেখেছি এই বসন্তে। স্বজন হারানো অভাগাদের কালো চোখ কেঁদে কেঁদে ফের রক্তজবার লাল রঙ ধরেছে। চাই না এই রক্ত রঙে লাল কালোর খেলা। সচেতন হই। ঘরে ও অফিসে নিজ দায়ীত্বে আজই কিছু সতর্কতা ও প্রস্তুতি নিন। আজ, এখুনি। কালকের সপ্তাহান্তটা এই প্রস্তুতিতে ব্যয় করি। কালকের জুমুয়া হোক নিহতদের জন্য ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য সবার দোয়া কামনার জুমুয়া। ছেলেদের জন্য ১৩ আর ৩৯ দুটো বেয়াড়া বয়স। দুটোই দুটো যুগসন্ধিক্ষণের উপক্রমণিকা।চল্লিশের আশপাশে বয়স হলে হাবে, ভাবে, চালে, চলনে একটা মুরব্বীয়ানা চলে আসে। যাকে তাকে যখন তখন জ্ঞান দেবার, উপদেশ দেবার,  চান্স পেলে হালকা বকে দেবার প্রবণতা তৈরী হয়ে যায় এই বয়সের মানুষের। যেটা হয়েছে আমার। সামান্যক্ষণ একটু দুটো হাত মুক্ত হলেই কীপ্যাডে ঘ্যাস ঘ্যাস করে লিখতে থাকি। হয়তো বিরক্তই হন, এত এত জঘন্য কনটেন্টে।চালশে দোষ আরকি। আমার বয়সটা চালশে না আলসে-সেই রহস্য থাক। তবে বেয়াড়া কথা বলার বেয়াড়া অভ্যাসটা আছে। শুনে কেউ বাহবা দেয় ঠিকই। তবে বেশিরভাগই দেয় বকা। কখনো প্রকাশ্যে। কখনো গোপনে। হয়তো বলে, ব্যাটা, বাচাল। বক বক করতেই থাকে। নিজে যেন বক ধার্মিক। করুন। রাগ করুন। যেমনটাই ভাবুন, যত বিরক্তই হোন, তারপরও আপনাকে একটা সপ্তাহান্ত বার্তা পাঠাতে আমার ভালই লাগবে। চল্লিশ মানেই ফুরিয়ে যাওয়া নয়। নয় দিন গোনার শুরু। চল্লিশ হোক ১৩ এর মতো নতুন কোনো রহস্যাভিযানের শুরু। আরেকটি লম্বা ইনিংস শুরু করার। সুহুদ তালিকার সব চালশেদের শুভ সপ্তাহান্ত। আর চালশের বহুদূরের যারা, তাদের জন্য শুভকামনা।

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-৪: #majorityminority #popularmajority #majoritypressure #exceptional #misdeeds #reaction #demonstrate

গ্যালিলিও যেই যুগের মানুষ ছিলেন, সেই যুগে নতুন কিছু ভাবা, প্রথার বিপরীতে চলা, বলা মানেই ছিল পাপ। তিনি প্রথম আবিষ্কার ও প্রচার করতে শুরু করেন, “সূর্য পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে না, বরং পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘোরে।” যা ছিল তৎকালীন পুরোহিতদের মতের বিপরীত। তারা দেখলেন, বিপদ। তাদের মসনদ টলে যাবে। তাদের কুমন্ত্রণায় রাজা ভুল বুঝলেন। গ্যালিলিওকে হুমকী দেয়া হল, তিনি যদি তার বক্তব্য না বদলান, তাকে শুলে চড়ানো হবে। গ্যালিলিও বিজ্ঞানী ছিলেন, বীর হয়তো নন। জীবন বাঁচানোর জন্য তিনি প্রকাশ্য কলোসিয়ামে ঘোষনা করলেন যে, তার তত্ব ভুল, পুরোহিতদের মতামতই ঠিক। কিন্তু, তারপরেই সেখানে মাটিতে তার পা ঠুকে বিড় বিড় করে বললেন, “তারপরও আমি বলব, সূর্য স্থীর, পৃথিবী তার চারপাশে ঘোরে।”সব যুগেই যারা একটু নতুন কিছু ভাবেন, বিশ্বাস করেন, অন্যরকমভাবে চিন্তা করেন, প্রচলিত স্রোতের বিপরীতে চলেন, মেজরিটির ভাবধারা ও মতবাদ অনুসরন করেন না। সব যুগেই তাদেরকে মানুষ পথভ্রষ্ট, সমাজবিরাধী ও মাথানষ্ট হিসেবে পরিগণিত করেছে। কিন্তু এই মাথা নষ্টরাই চিরকাল পৃথিবীকে নতুন কিছু, দারুন কিছু, সৃষ্টিশীল অনেক কিছু দিয়ে সমৃদ্ধ করেছে। ’অন্যরকম’ মানেই তাই ‘নষ্টরকম’ নয়। যাহোক।সমাজে বিবেকবান কিন্তু ভীরু মানুষ অনেক আছেন। হয়তো দুঃসাহসী নন বিধায় সব অন্যায়, অনিয়ম, অবিচার, অশুদ্ধ, অনাচারের প্রতিবাদ জোর গলায় করেন না। করতে সাহসী হন না। প্রতিবাদের, প্রতিরোধের সৎ সাহসটুকু হয়তো গলাটিপে বহুজনেই মেরে ফেলেছে। আজ তাই অন্যায়কারী, খুনিরা বীরদর্পে প্রকাশে খুন করে, উপস্থিত লাখো আম জনতা অসহায় হয়ে চেয়ে চেয়ে দেখে আর গোটা দেশ একজন হারকিউলিসের উপস্থিতি কামনা করে। নিজেই সেই হারকিউলিস বনে যায় না। সবাই এ ওকে ঠেলে, কিছু করার জন্য। সবাই ও একে দোষে, কিছু না করার জন্য। সেই সুযোগে অন্যায়ের নেকড়েরা বারবার হানা দেয়। হয়তো চলমান নিষ্ঠূর বাস্তবতার কারনে অনেকেই আমরা প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, প্রতিকার, প্রতিশোধ নিতে না চেয়ে প্রকাশ্যে পদে পদে আপোষ করছি। প্রতিবাদকারীর অসংখ্যবারের করুন পরিণতি আমাদেরকে আরো গুটিয়ে রাখে। হোক। তবু, গ্যালিলিও’র মতো ভিতরের আগুনটুকু প্রজ্বলিত থাকুক। অন্তত অন্যায়ের বিরুদ্ধে অন্তরের ঘৃনাটুকু বেঁচে থাকুক। অন্তত অন্যায়ের কাছে নিজের আত্মাটুকু যেন বিক্রী না হয়ে যায়। মুখ ফুটে বলতে না পারি, অন্তর হতে অন্যায়কে ঘৃনা করার মতো মনুষ্যত্বটুুকু অন্তত বাঁচিয়ে রাখি। ধিকি ধিকি জ্বলুক ঘৃনার অগ্নিগীরি। শুদ্ধ হোক সবার অন্তর। শুভ হোক সবার সপ্তাহান্ত।

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-৫: #time #change

আচ্ছা, আপনি তো মানবেন, জীবন বাঁক নেয়, যখন তখন? ওই গানটা শোনেন নি? “একূল ভাঙে, ও কূল গড়ে, এই তো নদীর খেলা। সকাল বেলা আমির রে ভাই, ফকির সন্ধ্যাবেলা।” নবার সিরাজদ্দৌলার নাটকের অডিও ফিতায় গানটি একসময় শুনতাম। কার গলা জানি না। অত্যন্ত ভরাট কন্ঠ।জীবনের সাথে সাথে বাঁক নেয় সময়, চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি, রুচি, বিশ্বাস, ভালোবাসা। তাই, ভালোবাসলে এতটাও নয়, যাতে পরে বিচ্ছেদে পাগল হতে হয়। আবার ঘৃনা করলেও এতটা নয়, তাকে একদিন আপন করতে হয়। তবে দুর্মূখেরা বলে, “ইর্ষায় যে পোড়েনি, ভালো সে বাসেনি।” দেখুন অবস্থা, ভালোবাসা প্রমান করতে হলে আপনাকে ইর্ষাকাতর হতেই হবে। এই দেশে তাহলে সকল মানু্ষেরই মনে প্রচন্ড ভালোবাসা আছে। কী করে? আরে, ইর্ষাকাতর না-এমন মানুষ দেখেছেন এই দেশে? তার সাথে আবার আছে আরেকটা। পরশ্রীকাতরতা-একটি শব্দ, যার উপযুক্ত বাংলা বা ইংরেজি শব্দ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। অথচ পরশ্রীকাতরতা আমাদের স্বভাবের অঙ্গাঅঙ্গি আত্মীয়। কোনো কারন নেই, এমনকি, আপনার ফোনের রিং টোনটা কেন এত সুন্দর-এই নিয়েও আমরা জেলাস হই। আগে জানতাম, মেয়েরা জেলাসিতে ভোগে। অথচ আমি দেখি, পুরুষও ইর্ষাতুর হয়। পুরুষ ও নারী-উভয়ের প্রতি। বলছিলাম, জীবন বাঁক নেয়। বাঁক নেয় সময়। ছোটবেলায় আমরা চোখের পাতা হাতে টেনে উল্টে দিয়ে বাচ্চাদের ভূত দেখাতাম। আজকাল অবশ্য ভূত দেখাতে না, মানুষ আপন চেহারা চেনাতে চোখ উল্টে ফেলে। আপনজন মরা মাছের দৃষ্টিতে তাকায়। একদা স্বার্থ পাওয়া কেউ, ইনবক্স করলে বলে, “আপনি কে যেন?” অথচ তারা জানে না, অতীত মেসেঞ্জার ইনবক্সের মতোই, যেখানে আগের সব মেসেজ আপনি মুছে দিলেও অন্যপাড়ের মানুষটির বক্সে তবুও থেকে যায়। সেই একদা ইনবক্সের মানুষটির সাথেও সম্পর্ক স্বার্থে বাঁক নেয়। বাঁক নেয়া সময়ের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রাখুন। সেটা হোক ভালোবাসা কিংবা জাগতিক বা আর্থিক বিষয়ে। আর আরেকটা বাঁকের জন্যও। সেটা বলছি। সপ্তাহান্ত বার্তার এই ধারনাটা আমি ধার করি আমার এক সুহৃদের কাছ থেকে। স্রেফ শখের বশে, ভাল লাগার বশে অনুকরন করা। ভাল জিনিসের কপিরাইট থাকতে নেই। তাই আমি নির্দ্বিধায় ভাল জিনিস চুরি করি। তবে শখে শুরু করলেও আজকাল একটা নেশা হয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার এলেই মনে হয়, কী বলি, কী বলি। আবার ধারাবাহিকতা আমার খুব নেই। যাহোক, অনেকে বলেন, সময় নষ্ট। অনেকে বলেন, উৎপাত। তবে যাই বলেন, সপ্তাহ দু’হপ্তায় ১০০ শব্দের বার্তাটা পেয়ে আপনি যখন একটা সুন্দর নীল রঙের কাঁচকলা (থাম্বসাইন ইমো) দিয়ে উত্তর দেন, তখন অজান্তেই মনে হয়, ওই কাঁচকলাটাই আমার পরম প্রাপ্তি। এই যুগে ওটাই বা কতজনে দেয়? ওটার আশায় পরের হপ্তায় আবার দিই। তবে নিন্দুকেরা বলে, আজকালকার ভার্চুয়াল ভালোবাসার যুগে সবচেয়ে ভদ্রভাবে বিরক্তি প্রকাশের চিহ্ন নাকি ওটা। কী জানি বাপু! আমি আবার সে যুগের মানুষ।তবে এবার তাতে রাশ টানতে হচ্ছে। কারন সময়, ব্যস্ততা আর নতুনত্বের আহবান। নানা দিক হতে সময় কাঁটছাট করতে হচ্ছে। কিছু বুনিয়াদী কাজে সময় দিতে। আর তাই সপ্তাহান্তটা এবার থামছে। সেদিক হতে এটাই শেষ ‘সপ্তাহান্ত বার্তা’। তবে সে জ্বেলে রাখবে তার কিছুটা স্ফূলিঙ্গ। এখন হতে সপ্তাহান্তের বদলে নতুন একটা ধারাবাহিক-”শুককুরবারের পাঁচালী”। তবে শুধুমাত্র মেসেঞ্জারের অটোমেটেড কানেকশন ডিসপ্লের প্রথম ১০১ জনকে। জানি না, ফরোয়ার্ড করার সময় মেসেঞ্জার ওই ডিসপ্লেড নেমগুলো কীসের ভিত্তিতে বাঁছাই করে। বোধহয় সেন্ডারের সাথে ইনটার‌্যাকশনের ফ্রিকোয়েন্সীর ভিত্তিতে।তার মানে হল, যদি আপনি সপ্তাহান্তকে ভালো বেসে থাকেন, তবে কিছুটা বিরহে পুড়তে হবে। আবার যদি বিরক্ত হয়ে থাকেন, তবে তাকে পুরোপুরি ঝেড়ে না ফেলে কিছুটা সহ্য করে যেতে হবে। কী করবেন বলুন? এই যামানাতে ভালোবাসা খুব উদোম ও উগ্রভাবে বিকোনো গেলেও বিরক্তি, রাগ নাকি খুব হিসেব করে প্রকাশ করতে হয়। কারন, কে জানে, কবে জীবন বাঁক নেয়, আর কাকে কখন কী কাজে লেগে যায়। স্বার্থ ও ’ভবিষ্যৎচিন্তা‘ নামক দুই জিনিস জগতে ঈশ্বর সৃজন করেছেন, যার যৌবন কখনো লুপ্ত হয় না। সে চির আবেদনময়ী। স্বার্থের জন্য সাইবেরিয়ার বরফেও মানুষ উদোম ঘুরে বেড়াতে পারে। কিংবা পারে মিউ মিউ করতে। ধ্যাত! যত্তসব বাজে কথা। আর বলব না। বাসা এসে গেছে। নামতে হবে। শুককুরবারের পাঁচালী পড়ার আমন্ত্রণ রইল। ।।–।।

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-৬: #love #greed #lust #extramarital #contentment

ভালোবাসা এক অদ্ভূৎ চাপ। বিশেষত যদি সেটা গণমানুষের হয়। আপনি কাউকে চেনেন বা অল্প চেনেন, অথবা; কখনো দেখেন নি অথচ আপনি জানেন তিনি বা তারা আপনাকে ভালোবাসেন, পছন্দ করেন। কেউ কেউ আবার পছন্দও করেন কিন্তু মাঝে মধ্যে বিরক্তও বোধ করেন। এই ভালোবাসা একটা অদৃশ্য চাপ। বিশেষত একজন লিখিয়ের জন্য। লিখিয়েকে তাই নিজের বাস্তবতা ও স্বত্বাকে অনেকখানি আপোষ করে বা উপেক্ষা করে পড়ুয়াদের, অদৃশ্য ভালোবাসার মানুষদের নিয়ে ভাবতে হয়। তাদের আবেগকে মূল্য দিতে হয়। আর তাই, মন, মেজাজ, শরীর, সময়-কোনোটাই অনুকূলে না থাকা স্বত্বেও কী-প্যাডে বসতে হয়। মনে করুন, বৃহস্পতিবারের বিকেল ৬ টা। বাসায় ফেরার রাস্তায় বাসে প্রচন্ড ভীড়। একটার পর একটা বাস হারাচ্ছেন। এমন সময় একটা লাল দোতলা বাস সম্পূর্ন খালি। মোড় ঘুরে ডাকা শুরু করল, “ওই, আসেন আসেন, ছ্যাড়াব্যাড়া, কাজিফাড়া, মিরপুর মিরপুর”। খেয়াল করে দেখবেন, যাত্রীরা লাফ দিয়ে একবার একতলা, একবার দোতলা, একবার ডান পাশের আসনে, একবার বামে, সামনে পিছনে হুড়োহুড়ি করতে থাকেন। হঠাৎ পেয়ে যাওয়া মহাসৌভাগ্যকে নিয়ে মানুষ একটু উত্তেজিত ও উদভ্রান্ত হয়ে পড়ে। শেষতক দেখা যায়, বাসের সবচেয়ে খারাপ আসনটাই জুটেছে। কারন ওই দৌড়াদৌড়ির সুযোগে বাকিরা ভাল আসন দখলে নিয়ে নিয়েছে। তাই বলি কি, অল্পে তুষ্ট থাকি। অতি লোভে তাতী নষ্ট। এই কথাটা বলার একটা কারন আছে। নারী ও পুরুষ উভয়েরই, বিশেষত আজকালকার ভার্চুয়াল রিয়েলিটির যুগে, নিজ নিজ সঙ্গী বা সঙ্গীনিকে নিয়ে অপ্রাপ্তি বা আক্ষেপ থাকতেই পারে। ওই যে, কথায় বলে না, “যে মাছটা জাল হতে বেরিয়ে যায়, সেটিই হয়ে পড়ে বড় মাছ”। কিংবা “বিয়েতে কবুল বলার সাথে সাথেই দেখি, বউয়ের চেয়ে বান্ধবীরা বেশি সুন্দরী হয়ে পড়ল।” মিড লাইফ ক্রাইসীসের কথাতো শুনেছেন। বিশেষত চালশে বয়সে এসে নিজ নিজ সঙ্গী বা সঙ্গিনীর প্রতি অনাসক্তি ও ’অন্য’ পুরুষ বা নারীর প্রতি আলগা আসক্তি তৈরী হবার খুব সম্ভাবনা থাকে। শেষ পরিণতি ওই বাসের আসনের মতোই। ঘরও হারাবেন, বাইরেরটার জন্যও নাক ডলা খাবেন। শেষ বয়সে ওই ‘মিনসে ব্যাটা’ কিংবা  ’ঘাটের মরা বউ’ই আপনার সাথে থাকবে। আপনার ওযুর পানি, পানের বাটা, হট ব্যাগ, বাতের ব্যথায় গা মালিশ, মাথায় কোমল হাত-এসব ওই ব্যাটা বা বেটিই করবে। উটকো প্রেমিক বা প্রেমিকা বড়জোর আপনার সাথে চায়নিজই খাবে কিংবা ফেসবুকে হায়-হাই করবে। আর কিছু নয়। আরেকটা ব্যপার বলি। বিবাহিত পুরুষদের একটি খুব নিয়মিত কৌতুক করতে দেখবেন, স্ত্রী বাপের বাড়ি থাকা নিয়ে। দেখে মনে হয়, স্ত্রীর ঘরে না থাকাটা একটা বিরাট উৎসব। বিষয়টা কৌতুক যতই হোক, কারো কারো জন্য বিষয়টি খুবই সত্যি। স্ত্রী ঘরে না থাকলে কেউ কেউ সত্যিই চাঁদ রাত ভাবেন। বাদ দিন সেসব ন-পুরুষ ধান্দাবাজের কথা। যারা ন-পুরুষ নন, কৌতুক করলেও, মনে মনে তারা জানেন, তার বিগত ১০-২০-২৫ বছরের সহধর্মীনির অনুপস্থিতি, সেটি এক রাত হলেও তার জন্য খুবই মুশকীল হয়ে দাড়ায়। কারন, বহু শতাব্দী ধরেই প্রকৃতিগতভাবেই পুরুষ নারীর যত্নে মানুষ। নারী পুরুষের চওড়া দায়ীত্ববোধে মানুষ। আদি যুগে কী ছিল জানিনা। নারীবাদিরা একে কীভাবে নেবেন, তাও জানি না। এই কৌতুকের ফাঁকে একটা কাজের কথা বলি। একা থাকার অভ্যাস করুন। হ্যা, আবারও বলি, একা থাকার অভ্যাস করুন। একা থাকুন বলিনি, অভ্যাস রাখুন। আর হ্যা, সক্ষমতাও রাখুন। বিশেষত আপনি যদি চালশে বয়সে ইতিমধ্যেই পৌছে গিয়ে থাকেন, মাঝেমধ্যেই আপনাকে একা থাকতে হতে পারে। তবে সেটা নিয়ে এখন কথা বলছি না। বলছি, জীবনে একটা দীর্ঘ একাকিত্বে আপনাকে শীঘ্রই পড়তে হতে পারে। আমি নিজে দেখেছি, স্বামী বিয়োগে স্ত্রীর অথৈ জলে পড়ার অভিজ্ঞতা। এককালের জানের জানদের শীতল চাহনীর অভিজ্ঞতা। সহানুভূতির নামে “গরীবের বিধবা সবার ভাউজ” এর সুযোগ নেবার চেষ্টার কথা। আর দেখেছি, সহানুভুতি দেখাতে গিয়ে একা মানুষটাকে আরো ততোধিক আঘাত দেবার কথা। এমনকি, নিজ সন্তানরাও জানে না বা চায় না, তাদের মাকে বাকি সময়টা একাকিত্ব থেকে কীভাবে দূরে রাখতে হয়। আমরা ভাবি, বাবা নেই। মাকে শাড়ি, কাপড়, ভাল খাবার দিয়ে সুখি রাখাই একমাত্র কর্তব্য। অথচ দীর্ঘ চার দশকের দাম্পত্য সঙ্গীকে হারিয়ে ওই নারীর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সঙ্গ, সাহস, অভয়, নিরাপত্তাবোধ, নিশ্চয়তাবোধ, সম্মানবোধ। সন্তানরা, বিশেষত আজকালকার সন্তানরা সেটা বোঝার মতো অবস্থায় জাতীয়ভাবেই নেই। এই ফাঁকে আরেকটা বাজে কথা বলে রাখি। মিলেনিয়াল প্রজন্ম, যাদের নিয়ে প্রায়শই আমরা আফসোস করি, তাদের বাবা-মা যারা আছেন, তারা মোটামুটি ধ্রূব সত্য বলে ধরে নিতে পারেন, এই মিলেনিয়াল প্রজন্ম আগামী ১৫-২০ বছর পরে যখন আপনারা প্রৌঢ়ত্বে বা বার্ধ্যকে পৌছাবেন, তারা অবশ্যম্ভাবিভাবেই আপনাদের দেখবে না। দেখবে না। দেখবে না। তাই প্রস্তুত হোন। এবার একটু বলি পুরুষের কথা। স্বামীর অবর্তমানে স্ত্রীর তাও একটা গতি হয়। সন্তানরা চক্ষুলজ্জায় হোক বা দায়বোধ মিশ্রিত ভালোবাসায়, মা’কে তাও মোটামুটি চালিয়ে নেয়। কিন্তু সবচেয়ে বিপদে পড়ে স্ত্রী হারানো বাবা। একজন একা পুরুষকে স্ত্রীর অবর্তমানে দীর্ঘ বার্ধক্য একা একা বা সন্তানদের তত্বাবধানে কাটানো কিংবা সন্তানদেরও তাকে প্রতিপালনের অভিজ্ঞতা সার্বিকভাবে অতি সুখময় নয়। আমি নিজে দেখেছি। স্বামীহারা মায়ের অভিজ্ঞতা যদি হয় অসহায়ত্বের, তবে স্ত্রী হারা বাবার অভিজ্ঞতা আরো বেশি অবহেলা ও বিরক্তির। কেন? দেখুন, বিয়ে দেওয়া মেয়ে চাইলেও বাবাকে কাছে রাখতে পারে না। পারলেও বাবা সেটা ‘মধ্যবিত্তের ইগো’তে নিতে পারে না। ছেলেরাতো বরাবরই মায়ের নেওটা। সে তো আগে হতেই বাবার থেকে দূরে। ছেলে বউ পুরুষ শশুরের সাথে চাইলেও অতটা ঘনিষ্ঠ বা সন্তানতূল্য হতে পারে না। আর সাথে যদি সে হয় অসুস্থ্য বা বিছানায় পড়া। তার সেবা সুশ্রূষা করার ব্যবস্থা হয়ে পড়ে একটি ঝক্কি। প্রথম প্রথম চোখের লজ্জায় বাঁধলেও, একটা সময়ে সন্তানরা বিরক্তিবোধ দেখাতে আর লজ্জা করেন না। যারা এটার মধ্যে পড়েছেন, তারাই জানেন। আমি আজগুবি কথা বলছি না। দেখা সত্যি বলছি। একতো সেই পুরুষটি অসহায়। তার চেয়েও বড়, আজীবনের যত্নশীল সঙ্গীনি, যে তাকে আজীবন পরম মমতায় আগলে রেখেছেন, তার অনুপস্থিতিতে পুরুষ পড়ে মহাবিপদে। তাই বলি কি, একা থাকার অভ্যাস করুন। স্ত্রী বাপের বাড়ি যাক বা স্বামী ঝগড়া করে পাশের রুমে দরোজা দিয়ে রাত কাটাক, অভ্যাস করুন। কাজে দেবে। একা কী করে থাকবেন? আপাতত একটা কথাই মাথায় আসছে। রাস্তায় হাঁটুন। আমি হেঁটেছি। এখনো হাঁটি। একা একা। অগ্যস্ত। অজানা গন্তব্যে। অনিশ্চিত সময় ধরে। যতক্ষণ পা অসাড় না হয়। পৃথিবীর পথে পথে কত কী যে দেখার, বোঝার, জানার আছে, তার ইয়ত্তা নেই। আপনি দেখে এক জীবনে শেষ করতে পারবেন না। হেঁটে হেঁটে দেখুন, কীভাবে একটা ঝুড়ির মধ্যে মানুষ কুকুরের মতো গোল হয়ে ঘুমায়, কীভাবে পার্কের বেঞ্চিতে একজন রিটায়ার্ড বাবা শূন্য দৃষ্টিতে বসে রাস্তায় চলা গাড়ি দেখেন, কীভাবে একটি নুলো ভিখিরি তার ইঁদূরের ছানার মতো বাচ্চাকে নিয়ে নেওটা করে, কীভাবে সন্ধ্যার আগে দিয়ে পলিথিনের ঝুপড়ির সামনে বসে রূপপসারিনি তার রাতের মেহমানদের জন্য তেলে চুপচুপ করে তার চুঁলটাকে টেনে টেনে বাঁধে, কীভাবে গার্মেন্টসের মেয়েটা সারাদিনের কর্মক্লান্ত দেহ নিয়েও বিদ্যুতের বেগে পা চালায় ঘরে ফিরতে, কীভাবে দামী প্রাইভেট কারে বাসার পানে ফেরা অসুখী কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব কাঁচের ওধারে উদাস নয়নে বসে থাকে, কীভাবে সদ্য চাকরি হারানো একজন পুরুষ পরিবারকে লুকিয়ে রাস্তায় উদ্দেশ্যহীন হাঁটে, কীভাবে একটি অপত্য পিচ্চি কায়দা করে বাসের হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে ঝুলে পেপার বিক্রী করে, কীভাবে একজন রিক্সাওয়ালা ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যেই তার ট্যাঁকে থাকা শেষ বিড়িটা বাতাসের মধ্যেই এক ঘষায় জ্বালিয়ে পরম সুখে টানে। কত কী যে দেখার আছে এখনো। কত কী জানার। নিজেকে। জগতকে। কিংবা পরস্পরের পরস্পরকে। আমরা আসলে কখনো নিজেকে জানতে চাই না। আজীবন কাটিয়ে দিই অন্যকে জানার বা বোঝার পিছনে।

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-৭: #relative #relativity #popularmajority #majoritypressure

একটু খেয়াল করে দেখবেন? জীবন ও পৃথিবীর প্রায় সবকিছুই খুব আপেক্ষিক। একটা সময়ে আপেক্ষিকতা জিনিসটা জটিল প্র্রায়োগিক বিজ্ঞান আর সামাজিক বিজ্ঞানের বিষয় হলেও বর্তমানে মনুষ্য সভ্যতার প্রায় সবই আপেক্ষিক। যেমন আপেক্ষিক হল আবেগ, দুঃখ, সুখ। আপেক্ষিক ভালোবাসা, আপেক্ষিক প্রেম, সততা, দেশপ্রেম, নৈতিকতা, ন্যায্যতা সবই। কীভাবে? মনে করুন, আপনার অর্ধাঙ্গিনী আপনার জন্য জম্পেস একটা খিচুড়ী করলেন। আপনি কব্জি ডুবিয়ে খেয়ে ভাবলেন, আহ, গিন্নীর মতো ভাল মানুষ আর হয় না। চট করে হাতটা না ধুয়েই ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিলেন, “জীবন সুন্দর”। পরক্ষণেই জানতে পারলেন, খিচুড়ীর সাথে যে ভূনা মাংসটা ছিল, সেটি আপনার চরম অপছন্দের ও সন্দেহের রসূল সাহেবের বাসা হতে আসা। রসূল সাহেবকে আপনি দুই চক্ষে দেখতে পারেন না। আপনার এখন আবার মনে হতে লাগল, “জীবন কেন প্রতারনাময়।” গিন্নীকে নিয়ে অবশ্য ’মর্দ ই মুমীন’ এর মতো স্টাটাস দেবার সাহস করলেন না। সামাজিক মাধ্যমে আজকাল এক বিপদ হয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে কাউকে পীর, নায়ক বানিয়ে দেয়া হয় এখানে। আবার তেমনি বানানো যায় তস্কর, বেইমান, নাস্তিক, মুরতাদ। একটা ছোট্ট স্টাটাস দিলেন, এমন কাউকে নিয়ে, যাকে আপনি দু’চোখে দেখতে পারেন না। ব্যাস। যেন টলটলে পেট্রোলে একটা ম্যাচের কাঠির মতো। মুহূর্তের মধ্যে দর্শক ও পাঠকরা ওই লোককে ধুয়ে ফেলবে, তার কল্লা চাইবে। তাকে নানা প্রাণীর সন্তান হিসেবে গাল দেবে। সব মিলে ওই শিকারের দফারফা। জাগ্রত বিবেক জনতা একবারও ভেবেও দেখবে না, ঘটনাটা সত্যি, নাকি প্ররোচনামূলক নাকি মিথ্যা। কারন নির্বিচারে কাউকে বিলিগোট বানিয়ে ঘায়েল করে মুখের সুখ, হাতের সুখ মেটাতে পারলে এক ধরনের জান্ত্যব শীর্ষসুখ পায় মানুষ নামের প্রাণীরা। এটা মানবের আদিম ঐতিহ্য। এই অনলাইন বুলিং, সম্মানহানি, চরিত্রহননের ফাঁকে কেউ যদি আবার একটু মাথা উঁচিয়ে বলে, “ভাই, আরেকবার ভেবে দেখলে হত না?” ব্যাস, তাকেও ন্যাড়া করা হবে। জাগ্রত জনতার এতটাই শক্তি। অথচ ভাল করে তলিয়ে দেখলে বোঝা যেত, এখানে কে শিকার, আর কে শিকারী। কে পীর আর কে তীর।অনলাইনে ‘সহমত’, ‘সাথে আছি’, ‘আমরা তনুর ভাই’, ‘আমরা আছি লাখো সন্তান” পদের ভালোবাসা আর গুনগ্রাহীরও শেষ নেই। কাউকে কোনোকিছু না ভেবেই আকাশে তুলে দেয়া, পীর বানিয়ে নেয়া, জাতীয় বীরের আখ্যা দেয়া, মহিয়সী কিংবা ফেরেশতার তকমা দেয়ারও হিড়িক চলে ভার্চুয়ালে। আর তারপর সবকিছু থামলে দেখা যায়, আরে, এতসব বয়ানের ফাঁকে চোর বেটাই হয়ে পড়েছিল গেরস্ত। ভার্চুয়াল ঝড় থামলে দেখা যায়, শিকার আসলে নিজেই শিকারী। একটু নিকট অতীতে চোখ রাখলেই অনেক উদাহরন পাবেন। তাই বলি কি, একটু ধীরে চলুন। সাধু বা চোর-উভয় তকমা দিতেই একটু ধীরে যান। বলা তো যায় না। পৃথিবী বড্ড আপেক্ষিক। এখানে একই স্থানে রোজ দু’বার জল আসে, জোয়ার হয়; দু’বার তা সরে গিয়ে ভাটা হয়। জাজমেন্টাল না হোন। হিড়িকের অনুসারি না হোন। মেজরিটির পুজারী না হোন। সত্যকে জানুন। গভীর হতে সবকিছুকে অবলোকন করুন। আগপাছ ভাবুন। মনে রাখবেন, ”যেটা সত্য, সারা পৃথিবীর লোক সেটাকে মিথ্যা বললেও সেটা সত্যই থাকে। যেটা মিথ্যা, সারা পৃথিবীর লোক সেটাকে সত্য বললেও সেটা মিথ্যাই।”

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-৮: #history #past #passedout #nostalgia

লোকে বলে, যায় দিন ভাল, আসে দিন খারাপ। কেউ কেউ আবার গান বাঁধেন, “আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম!” যদিও এই ‘আগে’ ও ‘পরে’র সত্যিকার অস্তিত্ব ও সময়কাল কখন-সেটা নিয়ে যথেষ্ট কথা কাটাকাটি করা যাবে। আর সত্যি সত্যিই আগে আমরা ভাল ছিলাম কিনা-তা নিয়েও আছে চিন্তার অবকাশ। ভাবুন তো, সেই ৩৫ বছর আগে ইদের নতুন কাপড় হিসেবে একটা ইলাস্টিক দেয়া ছিট কাপড়ের হাফ প্যান্টকে পেতে আপনাকে সারা উঠান গড়াগড়ি দিতে হত। আর আজকে! আপনি আরমানীর দামী স্যুট কিনে ফেলতে পারেন চাইলেই। ৭০ এর দশকের আশপাশে যাদের জন্ম, তারা জানেন, জীবনে বিনোদন বলতে তখন ছিল ম্যাকগাইভার আর আরেকটু বড় হয়ে বিদ্যুৎ মিত্র’র বই। কিন্তু এখন কত কত মাধ্যম। আমার এক প্রাচীন কালের চাচী ছিলেন। তার নিজের সন্তান ছিল ১০ জন। তার বড় সন্তান একজন মেয়ে। সেই মেয়ের সন্তান ১২ জন। তো, স্বাভাবিকভাবেই তাদের সব সন্তানদের আদর যত্ন সমানভাবে দেয়া তো দূরের কথা, কে খেয়েছে আর কে না খেয়ে আধমরা, সেই খবর সেই যুগের মায়েরা নিতে পারতেন না ঠিকঠাক। ’কাজের লোক‘ কিংবা ‘কাছের লোকের’ কাছেই মানুষ হতাম আমরা। উঠোনে গড়াগড়ি দিতেন কাদায়, বর্ষাকালে হাঁটু সমান কাদা পেরিয়ে ভূতের মতো হয়ে স্কুলে যেতেন ১০ মাইল দূরে। ছাতা বলতে মানকচুর পাতা। পড়নে লুঙ্গী কিংবা ছিট কাপড়ের ’হাপ্পেন’। আর আজকে আপনার মাত্র ৮ বছরের বাচ্চার হাতে ‘ট্যাপ’। আপনি একটা চোস্ত সেলফী দিলে মুহূর্তে হাজার হাজার ’পছন্দ’, ‘মন্তব্য’। আপনি মুহূর্তে ’সেলেব্রিটি’। আজকে আপনি কী সুন্দর না চাইতেই বাবা-মা হাজারটা গিফট দিয়ে আপনার জন্মদিন স্মরনীয় করে রাখেন। আর আমি দেখেছি, বৃটিশ আমলের মানুষ এক মাকে তার সন্তানের জন্মতিথি জানতে চাওয়ায় বলেছিলেন, ”অর জন্ম হেই বইন্যার সনে।” আগে কি সত্যিই দারুন ছিলেন? যাহোক, এই নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকবে। মানুষ নষ্টালজিক। আবার সেই একই মানুষ অতীত বিমুখ। সে অতীতকে মনে রাখতে চায় না। সেটা নিজের গোপন অতীতকে আড়াল করার চেষ্টায় যেমন হয়। তেমনি, মানুষ তার অতীত অন্ধকারের মুখোমুখি হতে ভয় পায়-সেই বাস্তবতা হতেও। আর তাই, আমরা আমাদের শৈশব নিয়ে স্মৃতিকাতরতায় ভুগি। কিন্তু যৌবনের নানা কান্ড কীর্তিকে কখনো মনে করি না। মনে করতে চাই না আর কি। মনে রাখি না, ঢাকায় যেদিন প্রথম পা রাখি-সদরঘাট কিংবা যাত্রাবাড়ি বাস টার্মিনালে, সেদিন আমাদের পোষাকের স্টাইল কী ছিল। আমাকে সেদিন দেখতে কী গেঁয়ো গেঁয়ো লাগছিল। আর আজ আমি যখন ফেসবুক সেলেব হবার মতো বড় মানুষ হয়েছি, আমিই আবার অনন্ত জলিল কিংবা হিরো আলমকে নিয়ে, তাদের হাস্যকর গেটআপ নিয়ে হাসি। এই সেদিনও গ্রাম হতে যখন শহরে আসি, গুলিস্তানের মোড়ে চকচকে বোতলে হলুদ রঙের কেমিক্যাল সুগন্ধি কিনে গায়ে ইচ্ছেমতো ঢেলে তারপর টিউশনিতে যেতাম। আজকে আমি শাকিব খানের স্টাইল নিয়ে হাসি। অতীতকে ভুললে এমনই হয়। আজকাল অবশ্য দেশে একটি নতুন শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছে। যারা কথায় কথায় বলে, ”কী হবে অতীত নিয়ে ঘেঁটে? আসুন সব ভুলে যাই। এখন সময় দেশ গড়ার। দেশের জন্য সবাই এক হয়ে যাই। অতীত ভুলে যাই।” অতীত মানে অবশ্য তাদের কাছে শুধুই ‘৭১’। তার আগে পরে আর কোনো ’অতীত’ নেই।তাহলে কি অতীতকে আকড়ে পড়ে থাকব? অতীতের জঞ্জাল কখনো সরাবো না? অতীতের পাপবোধকে সঙ্গে নিয়ে কি তবে একটু একটু করে ডুববো? নাকি ভুলে যাব পেছনের সব? সবকিছু, সব স্মৃতি, অতীত? অবশ্য চাইলেই কি সব ভোলা যায়? বা মানুষ আদৌ কি ভোলার চেষ্টা করে? চেতনে বা অবচেতনে অতীত কি মানুষের মনের চৌহদ্দীতে বিরাজ করে না? ফেলে আসা সময়, অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, জীবন বারবার তবু পিছু ডাকবেই। চাইলেও তাকে ভোলা যায় না। বা মানব মন ভুলতে চায়ও না। আজ জীবনের বহু দশক পার হয়ে একবার কি পিছনে তাকাবেন? পিছু ফিরে কি দেখবেন একবার, সেখানে পড়ে আছে কত কত সাদা কালো জীবন? কত রঙীন পাপ? কত আঁধার ধূসর সময়? পড়ে আছে কত বেদনা, সুখের মুহূর্ত? অতীতের ডায়রীর পাতা হাতড়ালে দেখবেন, সেখানে জমে আছে কত জমা বেদনা। অতীতের পাতায় পাতায় কত বোবা কান্না। স্মৃতিকে হাতড়ে চলুন আজ একবার বেড়িয়ে আসি আশৈশব আমার জীবনে। যৌবনের আমি, ভরা বয়সের আমি, বার্ধক্যের আমি’কে একবার দেখি পিছন হতে। কে ছিল, কেমন ছিল সে? সে কি পুরোটাই সাদা ছিল? নাকি ছিল অনেকটাই কালো? কেমন ছিল আমার অতীত? অন্ধকারময়? নাকি আলোকোজ্জল এক ইতিহাস পড়ে আছে আমার হারানো অতীতে? আসুন ভাবি একবার। চোখ বন্ধ করে অসামান্য গায়কীর এই গানটি শুনুন https://youtu.be/ai4QvTZPz9k। আর ভাবুন, পিছনে কী ফেলে এসেছেন।দভাবুন অতীতকে। নিজেকে। জীবনকে। সময়কে।

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-৯: #Dhakalife #urbanlife #lifeinmetro #change #style #ambition #rich

৯ অগাস্ট ২০১৯-ঢাকাবাসের দুই দশক পূর্তিতে-আমরা যারা ঢাকায় ’বইঙ্গা’, মানে ঢাকার বনেদী ও অভিজাত ঢাকাইয়া নই, আরে ওই যারা পেটের টানে ঢাকায় এসে মাটি কামড়ে পড়ে থেকে দাড়িয়ে গিয়েছি, আমাদের সবার জীবনের একটি গল্প আছে। হাঁচড়ে পাঁচড়ে ঢাকায় এসে নানা কায়দা কিসিম করে ঢাকার বুকে দু’মুঠো অন্ন বস্ত্রের সংস্থান করে নিতে পেরেছি। আস্তে আস্তে সময়ে পরিক্রমায় সমাজের দশজনের একজন হতে শুরু করে হয়তো পাড়ার দোকানের দোকানদার হিসেবে হলেও টিকে গিয়েছি। সেই গল্পের শুরুটা প্রায় সবারই এক। টিউশনি, জীর্ণ পলিয়েস্টার প্যান্ট, কলের জল, হেঁটে হেঁটে ঢাকায় ভাগ্য অন্বেষণ, বন্ধুর প্রতারনা, পরিবারহীন ঈদ, চপ্পলের গল্প, প্রেমিকার বিয়ের চাপ-অসংখ্য ছোট ছোট ছোটগল্প সবার। গল্প একই, চরিত্র শুধু বদলে যায়। আজ হতে বহু বছর আগে গাবতলী কিংবা সদরঘাটে একদিন সকালে একটা ক্যানভাসের ব্যাগ কাঁধে, সস্তা স্যান্ডেল পায়ে সারারাতের ভ্রমনে বিদ্ধস্ত চেহারায় একটি ছেলে বা মেয়ে পা রেখেছিল স্বপ্নের এই শহরে। বুকে দুরু দুরু ভয়। এই বিশাল নগরে টিকে যেতে পারবে তো? নাকি হারিয়ে যাবে কালের আবর্তে? না। কীভাবে কীভাবে যেন এই নগরের বুকে সে একটা উপায় করেই নেয়। ঢাকা নগর কাউকে ফেরায় না। সবাইকে তার বুকে স্থান দেয়।  যেই ছেলেটি বা মেয়েটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বড় ভাইয়া/বোনের রুমে মেঝেতে ঘুমিয়ে কিংবা গণকক্ষে ছারপোকার কামড় আর রোজ সকালে লাড্ডু-বন অথবা এগ-বার্গার দিয়ে পেট ভরাত, সেই হয়তো আজ সরকারের বড় কর্তা। অথবা বনে গেছে বিশাল মাড়োয়ারী। কেউ কেউ অতটা ভাগ্যবান না হলেও এ নগর তাকে একদম নিরাশ করেনি। আমার সবচেয়ে অবাক লাগে, কীভাবে ঢাকার রাস্তার হকাররা একা একা এই নিষ্ঠুর নগরের বুকে ঠিকই নিজের চেষ্টায় নিজের একটি সংস্থান বের করে নিয়েছে। কে তাকে দিল সাহস, কে যোগালো পূঁজি, কে দিল সূত্র, যোগাযোগ-সে এক রহস্য। সে কিন্তু ঠিকই সাবলম্বি হয়ে দাড়িয়ে গেছে। আজ তার হাতের ওপরে বাড়িতে ৬ সদস্যের একটি পরিবার। কাউকে দেখলাম, গ্রামে নিঃস্ব বা সর্বশান্ত হয়ে শহরে এসে বড় একজন কেউকেটা বনে যেতে। আবার এরই পাশে নদীভাঙনের শিকার হয়ে রাতারাতি পথের কাঙাল হয়ে পড়া এককালের বনেদী জমিদারকেও ঢাকা শেষ আশ্রয় দেয়। তাদের ঠাঁই হয়েছে কড়াইল, বেগুনবাড়ি কিংবা আগারগাঁও বস্তিতে। তারাও কিছু একটা অন্তত করে খাচ্ছে। আমি ও আমার চারপাশে যারা সেই ২০০০ সালের আশপাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন, তাদের প্রায় ৯৯% ই এসেছেন গ্রাম হতে। যাদের আবার ৯৫% ই হতদরিদ্র কিংবা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের। আমি আমার সহপাঠীদের মধ্যে প্রচুর মানুষকে জানি, যারা প্রথম ঢাকায় এসেছিলেন সেই ১৯৯৯ সালে-বোনের হাঁস বিক্রীর টাকা সম্বল করে, অথবা মায়ের হাতের সরু দু-গাছি বালা বিক্রী করে। আজকে সে ঢাকায় বিএমডব্লিউ হাঁকায়। রিক্ত হস্তে ঢাকায় এসে বিশাল সামাজিক প্রতিপত্তির মালিক-এমন মানুষজন আমার নিজস্ব সহপাঠীদের মধ্যেই প্রচুর আছেন। তাদের দিকে তাকিয়ে কখনো বুকটা হয়তো ইর্ষায় টাঁটায়, কখনো হয় গর্ব আবার কখনো নিজেকে সাহস দিই। এটা সত্যি, ঢাকা মানুষকে বদলে দেয়। সেই পরিবর্তনটা যদি কেউ নিবিড়ভাবে খেয়াল করেন, তবে দেখবেন, ঢাকা ১৮০ ডিগ্রী বদলে দেয় মানুষকে। ঢাকায় এসে গ্রামের আক্কাস হয়ে যায় আকাশ, মোমেনা হয়ে যায় মমি। বিদ্যালয়ের গলায় গলায় বন্ধু মন্তাজ হয়ে যায় মোমতাজ সাহেব। আবার গাঁয়ের খাঁ বাড়ির গিন্নী নদী ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে ঢাকায় এসে বনে যায় আবুলের মা।  এই ঢাকায় দেখলাম কতজনকে। কত কিছু, কত পরিবর্তনকে। চোখের সামনে কতজন বদলে গেলো। বন্ধু বন্ধুকে ভুলল। সন্তান তার বাবা-মাকে। ভাই ভাইকে, বোন দিদিকে। গাঁয়ের ফুলি তার তৎকালীন প্রেমিক ছুরতকে নিয়ে ঢাকায় এসেছিল গার্মেন্টসে কাজ নিতে। আজকে সেও মাসে দশ হাজার টাকা মাইনা পায়। ছুরতের ছূরতও সে ভুলে গেছে কবে। তার ঘরে এখন তারই সহকর্মী মামুনের দুই সন্তান। বাণীশান্তার ’বেশ্যা’ কুসূমের শুধু বদলেছে ঘর। পশুর নদের পাড়ের সেই টীনের চালার ‘মাইয়া’র জায়গায় আজ সে ’নগরের নটি’। তবু তো বদলেছে তার জগৎ। এই নিষ্ঠূর ঢাকা নগরে  সবই বদলে যায়-ভাগ্য, সম্পর্ক, জীবন, জীবনবোধ। বদলায় মন। হাওয়া ঘোরে, ঘোরে লোভ, প্রতিযোগীতা আর হিংসার লু হাওয়া। মানুষকে সে বদলে দেয় রূঢ় বাস্তবতা আর বেঁচে থাকার আদিম সংগ্রামের বাতাবরনে। ঢাকায় থাকি সেই সন ৯৯ হতে। আজ ৯ অগাস্টে বোধহয় কুড়ি বছর পূর্ন হল। বদলেছি আমিও। বদলে যাওয়া জীবনে অন্যরকম সময়ের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে জীবন। যারা কোনো আদি নেই, ইতিহাস নেই, নেই কোনো দৃশ্যমান ভবিষ্যত। এক অজানা ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে জীবন। পরিণতি অজানা। এই দুই দশকে বদলেছে অনেক কিছু। অচেনা হয়েছে সময়, মানুষ, সম্পর্ক, চাহিদা আর বোধ। চেনা মানুষ হয়েছে অচেনা। কাছের মানুষ গেছে দূরে। আজকাল তাই সবই অচেনা লাগে। বদলে যাওয়া পথ পরিক্রমায় আসন্ন ছুটিতে ঢাকায় আছি। ”আমার আর কোথাও যাবার নেই, কিচ্ছু করার নেই।” কেউ যদি চা পানে আগ্রহী হন, এবারও আসতে পারেন সঙ্গ দিতে, সঙ্গ নিতে। সারা বছর যাদের সময় দিতে পারিনি, তারা সময় দিতে আসতে পারেন “ভালোবাসা সড়কে”। প্রয়াত জনাব আইয়ুব বাচ্চুর  বদলে যাওয়া অচেনা সময়ের একটি গান দিয়ে শেষ করি। আমার অত্যন্ত প্রিয়। শুনেছেন নিশ্চই: https://youtu.be/9US5QeBtw6w?t=75

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-১০: #melancholy #depression #ইচ্ছেবিষন্ন

সত্যিই। জগতের সব দুঃখগুলো বড্ড একা। একাই তার জন্ম, বেড়ে ওঠা, আবার একা একাই নির্বাণ। দুখী মানুষ একা ভবঘুরে।  সে একা মা, একাই বাবা, একা পুরুষ, একা যোদ্ধা কিংবা একাকী রমনী। যে লড়ে যায় তার নিজের যুদ্ধটা। দারা, পুত্র, পরিবার, সমাজ, মহল-সবই সেখানে ক্ষণস্থায়ী সম্পর্কমাত্র। ক্ষণিকের শরতের মেঘের মতো উদ্বায়ী। ভেসে আসে, দিগন্তে ভীড় করে, মনে রঙ ধরায়, কিন্তু বর্ষণের দুরাশা জাগায় না। দুঃখবোধের এক সহোদর আছে, যার নাম বিষন্নতা। শুনেছি বিষন্নতা নাকি এক ছোঁয়াচে স্বভাব। খুব সহজেই সে সংক্রামিত হয় হৃদয় হতে হৃদয়ে, জন হতে জনে, মন হতে মনে। বিজ্ঞজনেরা, হুশিয়ার মানুষেরা বিষন্ন মানুষ হতে সবসময় দশহাত দূরে থাকতে বলেন। ঠিক যেমন করে ছোটবেলায় মা বারণ করতেন পাড়ার দুষ্টু ছেলেদের সাথে মিশতে। বিষন্ন মানুষ নাকি তার আশপাশের সবাইকে বিষন্নতার অসুখ বিলায় উদার হাতে। কী জানি, হয়তো তাই। বিষন্নতাকে সবার ভয়। বিষন্ন হতে ভয়। অথচ সে নিজের অজান্তেই চুপি চুপি এসে পাশে বসে পড়ে। স্তরে স্তরে জমে মনকে ভার করে। একসময় তার ভর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে বুকে। বিষন্নতার ঠিক ঠাক কোনো সংজ্ঞা হয় না। ঠিক যেমন জানা যায় না, তার সত্যিকারের উৎস। বিষন্নতা হঠাৎই আসে। শত চেষ্টাতেও সে পিছু ছাড়ে না। আবার সে বিদায় নেয় তার নিজস্ব সময়ে, নিজ মর্জিতে। নিঃশব্দে যেমন তার আগমন, তেমনি নিরবেই তার প্রস্থান। বিদগ্ধজনেরা বলেন, বিষন্নতা নাকি এক বিলাসিতা। এই মার-মার কাট-কাট টিকে থাকার সংগ্রামের কর্পোরেট নগর সভ্যতায় তা এক প্রকার সত্যিই বলা যায়। যেখানে টিকে থাকার সংগ্রামে প্রতিনিয়ত কেউ কারো মাথা ভাংছে, কেউ বেঁচে দিচ্ছে গায়ের রক্তিম লহু, সেখানে বিষন্নতা নিয়ে বিলাসিতার সময় কই? জীবন এখানে নিষ্ঠূর, নিরানন্দ, নিস্পন্দ। জীবন এই নগরে বড়ই বাস্তবতাময়, বড়ই ভাত-কাপড়-টাকা-অতৃপ্ত কাম নির্ভর। এই চারের উদরে মহাপ্রসাদ যোগান দিতেই মানবের প্রাণ ওষ্ঠাগত। তার সময় কই, বিষন্ন হয়ে দু’দন্ড কাটানোর? ধুর ছাই বলে নগরের নাগর তাই বাস্তবতার ট্রয় নগরের পথে নামে। তবু আপনার, আমার, আমাদের মনের অন্দরে বিষন্নতা ভীড় করে অচেনা সন্ধায়। ব্যস্ত জীবনের পোতাশ্রয়ে কোনো এক সন্ধায় নোঙর করে বিষন্নতার বাষ্পীয় শকট। হয়তো সে অনেক আগে অকালে ঝরে যাওয়া প্রেমের জন্য। হয়তো বহু আগে ভুলে যাওয়া কারো জন্যে। হয়তো ভবিষ্যত অনিশ্চয়তার ভারে। হয়তো কোনো এক অজানা কারনে। তবু সে আসে। বুকে চেপে বসে। সাথে ডেকে নেয় পুরনো দুঃখরে। বিশ্বাস না হয়, কখনো কোনো বর্ষণমুখর দিনের সন্ধ্যায় বৃষ্টি থেমে গিয়ে যখন হালকা ধোঁয়াটে পরিবেশ ঘনিয়ে আসে বিশ্বচরাচরে, জানালার গরাদের ফাঁকা দিয়ে বাইরের আঁধার নামা গোধূলী সময়ের দিকে চোখ পেতে বসে থেকে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। পরখ করে দেখুন, ভুলে যাওয়া জীবনের রাশি রাশি দুঃখবোধ ভীড় করে কিনা গোধূলীর বিষন্ন মায়ায়। আমার খুব অদ্ভূৎ একটা রোগ আছে। ঠিক সন্ধায়, যখন চারদিকে আজানের ধ্বনি বাজে, আমি ঘরে থাকতে পারি না। যেদিনই থাকি, প্রচন্ড রকম অব্যখ্যাত বিষন্নতায় আক্রান্ত হই। আজ পর্যন্ত এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। ঠিক এই কারনেই শুককুরবারের বিকেলে যখন ঘরে ফিরি, পশ্চিম দিগন্তে ডুবতে বসা সূর্যদেবের হলুদ আলোয় ভরা আকাশের দিকে তাকাই না। ওই সময়টাকে আমার বড্ড বিষন্ন মনে হয়। বিষন্ন একটা গোটা পৃথিবী যেন সেই বিষন্ন আকাশে মুখ ব্যদান করে থাকে আমার জন্য। স্বজনহীন, সূজনবিহীন, বান্ধববর্জিত আমার নিজস্ব পৃথিবীতে ততোধিক বিষন্ন একটি সময় যেন তখন হাতছানি দিতে থাকে। পালিয়ে বাঁচি সেই অসহ্য গুমোট হতে। নিজেকে ভুলাতে ডুব দিই গানে। আমার একটি অদ্ভূৎ অভ্যাস আছে-বিষন্ন সময়ে বিশেষ ঘরানার গান শোনা। আমি তার নাম দিয়েছি Song in Depression। এই যেমন এখন শুনছি। আপনিও শুনতে পারেন। বিষন্নতা কাটাতে। কিংবা আরো গভীর বিষন্নতায় ডুবতে। যেটা আপনার পছন্দ। কারো জন্য বিষন্নতা হেমলকের মতো। আকন্ঠ পান করেই যার তৃপ্তি। কারো জন্য সে চোরাবালির মতো, যে কাছে টানে, কিন্তু তাকে কাছে টানা যায় না। গানটি শুনে দেখবেন। হলেনই না হয় একদিন ইচ্ছে বিষন্ন। https://youtu.be/sWL95bsa4SA

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-১১: #corporateslavery #corporateexploitation #corporatedeceit #corporatehypocrisy #hypocritenation #corporatemockery

একজন কর্পোরেট: আচ্ছা, মানুষ যদি আগে হতে জানতে পারত, যে, তার জীবনের যাবতীয় দৌড় ঝাঁপ, জীবিকার যুদ্ধ, উপরে ওঠার ইঁদুর দৌড়-কোনো কিছুই শেষতক সফল হবে না, সে ব্যর্থ হবে, তাহলে সে কী করত? কিংবা ধরুন, হাল আমলের  শতাব্দীক প্রজন্ম (মিলেনিয়াল জেনারেশন) যদি সত্যিই বিশ্বাস করা শুরু করে, যে, তাদের খোমাকিতাবের (ফেসবুক) কামানো (পছন্দ, মন্তব্য, প্রতিক্রিয়া, অনুসারী, ভক্ত (লাইক, কমেন্টস, রিঅ্যাকশনস, ফলোয়ার, ফ্যানস)-এসবের সংখ্যাকে ব্যাংকে নিয়ে নগদায়ন (ক্যাশ) করা যাবে না, তাহলে তারা কী করা শুরু করবে? বাদ দিন। যা হবার নয়, তা নিয়ে ভেবে লাভ কী? অবশ্য লাভ ক্ষতি বিবেচনা ছাড়া আজকাল কোনোকিছুই আমরা করি না। হাসতে গেলে ভাবি, কাঁদতে গেলে ভাবি, নাচতে গেলে, গাইতে গেলে, এমনকি ভালোবাসতে গেলেও ভাবি-লাভ কী? ও তুই লাভের আশায় বাঁধলি রে ঘর,জীবন নদীর তীরে,মরন এসে ভাসিয়ে নিল শেষ ঠিকানার নীড়ে।এক দিনের জন্য না হয় লাভ ক্ষতি আজ ভুলে যাই। আজ অন্য কিছু ভাবি। সেই অন্য কিছু কী হতে পারে? হতে পারে বাংলার প্রকৃতিতে আসা অদ্ভূৎ শরত। না আছে বর্ষার কোনো ঠিক। না আছে কাঁশফুলের খবর। আমার কর্মজীবনের একটি বড় সময় যেখানে কাটিয়েছি, তার পথে পড়ত একটি চমৎকার কাঁশবন। শরত এলে সেখানে কত যে নেমেছি, কত যে থেমেছি, তার ইয়ত্তা নেই। হঠাৎ করে পেটের টানে চাকরি বদল। ভাগ্য বদল। একই সাথে বদলে গেল কাঁশবনের ভাগ্য। শরতের শুভ্রতার বদলে এখন চোখে পড়ে নগরের তীব্র জনরোল। দিনে, রাতে যাওয়া আসার সময় পিলপিল করে ভাগ্যান্বেষণে ছুটে চলা উদভ্রান্ত অাপিসমুখী মানুষগুলোর চোখে মুখে কী এক ব্যগ্রতা। আপিসে যাবার, ঘরে ফেরার। অবশ্য, হ্যা, আজকাল নতুন একটি অবসরভোগী কর্পোরেট শ্রেণী তৈরী হয়েছে। শ্রেণী চরিত্রে উপরের দিকে থাকা এই গোষ্ঠীটির অবশ্য ঘরে ফেরার তাড়া কম। আপিস ফেরত ক্লাবে, চায়ের আড্ডায়, রঙিন তরলের আড্ডায় দু’চার গেলাস গলায় ঢেলে মনকে তরল করে তবে বাড়ি ফেরা হয় তাদের। বাদ দিন তাদের কথা। গল্পে ফিরি। অনেক দিন আগে লিখেছিলাম, কর্পোরেট আপনাকে এমন একটি জীবন বাস্তবতায় ভাসাবে, যার আছে শুধু শুরু, কোনো শেষ নেই। কিংবা আছে, তবে তার নিয়ন্ত্রণ আপনার হাতে নয়। কর্পোরেট আপনাকে এমন একটি লোভনীয় মূলা (মানে মাইনে ও অন্যান্য আর কি) দেবে, যেটা দিয়ে আপনি তৃপ্ত স্ত্রী, বন্ধুমহল, আড্ডা, বিদেশ গমন, একটি চার চাকার যন্ত্রশকট, ছো্ট্ট মুরগীর খোপ-এসব নিয়ে সমাজের দশজনের একজন হয়ে নিজেকে হৃষ্ট পুরুষ হিসেবে সুখী করতে থাকবেন। শান্তি না থাকলেও, সেখানে সুখ আছে। এই আরামের লোভ ছাড়বার মতো সাহস আপনার হবে না। আবার কর্পোরেট আপনাকে এতটা বেশিও দেবে না, যা থেকে মোটা একটি অংশ বাঁচিয়ে অচীরেই আপনি কর্পোরেটকে যেকোনো সময় বিদায় বলার মতো ঘাড় মোটা করতে পারবেন। ফলাফল? কর্পোরেট সুখের চোরাবালিতে আজীবন ”দিন যায় কথা থাকে।” জ্বি, ওটাই আসলে সত্যি। দিন যায়, কথা থেকেই যায়। আমি মোটামুটি একজন অকর্মা। না হতে পেরেছি কর্পোরেট, না হতে পেরেছি কামলা। মাঝামাঝি এক অপদার্থ, যে আখের গোছানোতেও ব্যর্থ, বন্ধূ মহলে নির্বান্ধব। মনুষ্য সমাজে অপাংক্তেয়। তাই আমার হাতে অঢেল সময়, জীবন নিয়ে বসে বসে ভাববার। তাই তো ভাবি, কর্পোরেট কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? আমরা কর্পোরেটের হাত ধরে কোন অলীক জীবনের জন্য ছুটছি? কোথায় শেষ এই ছোটার? কবে থামবে এই ছুটে চলা? আর যখন থামে, বা থেমে যেতেই হয়, তখন কী ঘটে? ব্যক্তিগত জীবনে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নেতিবাচক অভিজ্ঞতার অধিকারী এই আমি দেখেছি, কর্পোরেট মহামানবেরা পড়ন্ত জীবনে সুদে আসলে শোধ দেন যৌবনে কর্পোরেট ইঁদুর দৌড়ের মাসুল। কর্পোরেটের চাপে প্রায় প্রবাসীদের মতো জীবন যাপন করা আমাদের পরিবার, সমাজ, সন্তান, স্ত্রী-সবই যন্ত্রের মতো চলে। হঠাৎ একদিন ব্যস্ত কর্পোরেট পিছুটানে ঘরে ফিরে দেখেন, যাহারো তরে জীবন করিনু পণ,ভুলেছি সময়, ভুলেছি আপনজন।রাতেরে করেছি দিবস আমি, দিবসে করেছি রাত,দেখিনি তো কভু, আছে কে আমার সাথ।আজকে যখন ফিরে চাই সবটাই,মেলে না হিসেব, আমার কিছুই নাই।লাভের মধ্যে এই। ক্ষতির মধ্যেও। তবু কিছু কথা থাকে। এর মধ্যেও। যাক, আজ বোধহয় খানিকটা বিভ্রান্ত করে দিলাম আপনাকে। বাদ দিন না। আমার এলোমেলো কথায় কী আসে যায়। বরং জনাব সুবীর নন্দীর এই গানটাতে কিছুটা হলেও কিছু পেতে পারেন। শুনে দেখুন।

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-১২: #envy #rival #friendship #achievement #gain #jealous #wealth #status

হিংসুকের মনোঃবেদনা:

যদি বলি, তোমার চকচকে নতুন প্রিমিও গাড়িটা দেখে আমার বুকের মধ্যে একটুও টাটায়না, তবে মিথ্যা বলা হবে। যদি বলি তোমার একটুকরো সোনার টুকরো ঢাকাই জমি কেনার খবরে বুকটা ছ্যাৎ করে ওঠে না তবে সেটা আত্মপ্রবঞ্চনা হবে।

ফি বছর তুমি যখন হিল্লী দিল্লী যাবার সেলফী আর চেকইন স্ট্যাটাস দাও তখন একটা অকারন ইর্ষায় পুড়ি না-তেমনটা বুকে হাত রেখে বলতে পারছি না।

বন্ধুমহলে তুমি যখন চকচকে সুখী মুখে ততোধিক সুখী আদুরে মুখের স্ত্রীকে নিয়ে গ্রূপ ছবি পোষ্ট দিতে থাকো তখন আমি যে আমার রোগা পটকা, গাল তুবড়ানো, সংসারের ঘানি টানা, ক্লান্ত ঘরনীর চেহারা কল্পনা করে নিষ্ফল ইর্ষায় পুড়ি না-সেটা বললে ঠকানো হবে।

ভার্চুয়াল সমাজ ও ভাইবেরাদরগন, আমি না চাইতেও তোমার চাকচিক্য ও তীব্র ব্যক্তিগত সুখের ঝলকানী আমার ভাঙা জানালার মধ্যে দিয়ে এসে আমার জীর্ন জীবনকে আরো ক্লিষ্ট করছে। প্রতিনিয়ত তোমার তৃপ্ত সুখের একঘেয়ে আঘাত আমাকে একটু একটু করে দহন করে প্রায় ছিবড়ে করে এনেছে।

না চাইতেও আমাকে তোমার মতো হতে, তোমার মতো করে ভাবতে, তোমার মতো সাজতে আলেয়ার মতো মরিচিকায় টানছে। প্রতিনিয়ত তোমাদের নানান নৈতিক বা অনৈতিক অর্জন, নানান আভিজাত্যের সম্ভার, বৈভবের ছটা আমার আজীবনের সংস্কার, কষ্ট করে পাওয়া উচ্চশিক্ষা, সযত্নে লালিত ঔচিত্যবোধ, সততার অহংবোধ, তৃপ্তিবোধ, শিরদাড়া সোজা করে তাকানোর সম্ভ্রম-সবকিছুকে অবিরত প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

আমাকে ও আমার আত্মসম্ভ্রমসিক্ত মানবসত্ত্বাকে বিদ্ধ করছে ইর্ষার হুতাশনে। প্রিয় সামাজিক সমাজ ও সদাতৃপ্ত মানবকূল, তোমরা পর্দা নামাও তোমাদের অভিজাত মানব-মানবী লাইফস্টাইলের রূপালি প্রেক্ষাগৃহের।

আমাদের জন্য আমাদের ব্রাত্য জীবনটিকে আরো ঘনঘোর নিষ্ফল ব্যর্থতাবোধের কালিতে ছেয়ে দিওনা।

ইর্ষাতুর পুরুষ মন:

ইশ! ইর্ষা-বিষয়টিকে ঠিক ইর্ষা বলব, নাকি জাত্যাভিমান, তা জানি না। হয়তো বিষয়টি তাও নয়, হয়তো এটি আত্মপ্রবঞ্চনা।

ছেলেবেলায় যখন স্কুলে পড়তাম, যত ভাল ফলাফলই হোক, মা-চাচীরা কখনো বলতেন না, যথেষ্ট বা ভাল। বলতেন, “যা, সঞ্জয়ের পা ধুয়ে পানি খা। ও তো অংকে ৯০ পেয়েছে।” নিজে ক্লাসে দ্বিতীয় হয়েও হয়তো তখন বুকটা ভেঙে যেত। নাহ, আমি আসলেই গাধা। সঞ্জয় বোধহয় ঘোড়া। অন্যের আয়নায় নিজেকে মাপার সেই বোধহয় সূত্রপাত।

বড় হয়েও আজকে আমাদের সেই রক্তমাংসের স্বভাব মরে গেছে-তা জোর গলায় বলা কঠিন। ইর্ষা মানবের এক জিনগত উত্তরাধিকার। হোমোসেপিয়েনরা তার লক্ষ কোটি বছর আগের স্বজাতি হতে আর কিছু না পেলেও এটি ঠিকই অর্জন করেছে। বড় বেলাতে এসেও তাই, সহকর্মী পদোন্নতি পেলে আমাদের বুকে বাজে। বন্ধু নতুন ফ্ল্যাট কিনলে আমাদের বুকে বাজে। ভায়রার বাসায় নতুন ৫৬ ইঞ্চি প্লাজমা দূরদর্শন কিনবার খবর স্ত্রী এসে দিলে আমরা একটু দমে যাই। সাবেক সহকর্মী অফিস হতে বিদেশ ভ্রমনের সুযোগ পেলে আমাদের আফসোস লাগে। অনলাইন গ্রূপে আমার মতোই কোনো বেকার চাকরি পাবার খবর দিলে আনন্দের পাশাপাশি সুক্ষ্ণভাবে কোথায় যেন একটু চিনচিন করে।

সামাজিক মাধ্যমে পরিচীত কেউ সামান্য একটু পরিচীতি পেলে, কোথাও একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেবার ছবি দিলেও আমরা নড়েচড়ে বসি। প্রেমের বাজারে কাউকে আরেকটু সুন্দরী বান্ধবী নিয়ে ঘুরতে দেখলে নিজের ঐশ্বর্য রাই থাকা স্বত্বেও হিংসা হয়। মানুষের প্রতিটি চেকইন, প্রতিটি সুখবর, এমনকি, নিজের দুটো বাচ্চা থাকা স্বত্বেও কেউ বাবা হয়েছে, মা হয়েছে-শুনলেও মনে হয়, ইশ!! এমনকি ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়া সাবেক প্রেমিকা কোনো টাকলু বয়স্ক পুরুষকে বিয়ে করে হানিমুনের ছবি দিলেও আমাদের ইর্ষা লাগে।

কী বললেন? আপনি ইর্ষান্বিত হন না? ভাল ভাল। আমি কিন্তু সাধু পুরুষ নই। আমার প্রবল হিংসে হয়। দুয়েকটা উদাহরন বলি।

সুহৃদ ও কবি রানা এমনকি বামহাতে গাড়ি চালাতে চালাতে ডানহাতে একটি কবিতা লিখে ফেলতে পারে। ওকে আমার ইর্ষা হয়।

প্রিয় শিবলী ভাই দিনে ১৮ ঘন্টা পরিশ্রম করতে চরকির মতো ঘোরেন। ওনাকে ইর্ষা হয়। বড়ভাই নূর। যেটাই চায়, সেটাতেই তার একাডেমিক সক্ষমতা থাকা আমাকে পোড়ায়। শ্রদ্ধাভাজন খান ভাই। সেক্টরে তার বিপুল গ্রহনযোগ্যতা আমাকে ইর্ষিত করে। আমার ভাই (আপনাদের স্যার) কাজী রাকিব ভাই। ওনাকে এত এত মানুষ শ্রদ্ধা করেন। ওনার প্যাটেন্ট করা একটি রিক্রূটমেন্ট মডেল আছে। তাতেও আমার ইর্ষা হয়।

শুভাকাঙ্খী আলিম ভাইকে সারা দুনিয়াতে এত মানুষ তার কাজ দিয়ে চেনে। সেটাতেও আমার গাত্রদাহ হয়। আমার রিজভান ভাই জগতে যেকোনো বিষয় নিয়ে যুক্তি দিতে পারেন। যুক্তি দেবার ক্ষমতাতে আমি তাকে তীব্র ইর্ষা করি। সুহৃদ আব্বাসী। সে জগতের সকল মানুষকে অবাধে ভালোবাসতে পারে। আমি তার অন্তরের নির্মলতাকে ইর্ষা করি।

মাষ্টারদা কাওছার। ওর বাসায় এত ভয়ানক ‍সুন্দর একটি বারান্দা আছে, যাকে শুধু ছবিতে দেখেই আমি ইর্ষায় মরে যাই।

বড় ভাই মুকুল। হঠাৎ হঠাৎ একদিন ফোন করে একটি সুযোগ হাতে ধরিয়ে দেন। আমি তার এই অযাচিত স্নেহ করার ক্ষমতাকেও ইর্ষা করি।

এক ছোটভাইকে চিনি। সে তার সাবেক বসের নামে একটা বাঁদর পালে। আমি তার এই পাগলামিকেও ইর্ষা করি। আমার এক ভক্ত মুক্ত। ছোট্ট মানুষ হয়েও চারপাশের সবাইকে নিঃশর্তে শ্রদ্ধা বিলায়। তার এই ক্ষমতাকে ইর্ষা করি।

অদেখা সুহৃদ নীল। মানুষের পশ্চাৎবায়ু নিয়েও সে মানুষকে ঠা ঠা করে হাসাতে পারে। আমি তার প্রানপ্রাচুর্যকে ইর্ষা করি। এমনকি আমার তিনজন পছন্দের টুপটাপ লেখক আছেন। তাদের টুপটাপ লিখবার ক্ষমতাকেও ইর্ষা হয়।

আশ্চর্য মানব ইগলম্যান। সে হঠাৎ এক একদিন একটা ছইওয়ালা নৌকা নিয়ে ভরা বর্ষার বিলে হারিয়ে যায়। আমি তার এই অবাধ স্বাধীনতাটাকে ইর্ষা করি। লেখক জেলিসের নূরা পাগলা চরিত্র বানানোর ক্ষমতাকে আমি ইর্ষা করি।

কবি রবীন্দ্রনাথ জগতের সব বিষয় নিয়ে কিছু না কিছু কোনো না কোনো ধরনে লিখে গেছেন। তার লেখনীকে সবচেয়ে বেশি ইর্ষা করি। ইর্ষা আমার চোখের চাহনীতে, ইর্ষা আছে মনের আরশিতে। ইর্ষা যদি নাইবা করি, পারব কি গো ভালোবাসিতে?

স্বীকার করি আর না করি, ইর্ষা আমাদের সহজাত চরিত্র। কারো জন্য সেটা হিংসায় রূপ নেয়। ইর্ষা বলি, আর হিংসাই বলি, অন্যের প্রাপ্তি, সুখ, অর্জন, সফলতাকে নিয়ে আমাদের গ্রাত্রদাহ, অস্থিরতার দুটো দিক আছে।

এক; এটা আমাদের ধ্বংস করতে পারে।

দুই; কিংবা এটা আমাদের ভিতরে নিজের সুপ্ত ক্ষমতাকে প্রজ্জলিত করার আগুনটিও জ্বালতে পারে। যে যেভাবে একে কাজে লাগাই।

হ্যা, ইর্ষা ও হিংসার ভিতরে ভাষাগত পার্থক্য হল, ইর্ষা শুধুই নির্বিষ ইর্ষা। তাতে অপর পক্ষের কোনো ক্ষতি লাভ নেই। কিন্তু হিংসা বড় ধ্বংসাত্মক। উভয় পক্ষেরই সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে। কোনটা নিজের ভিতরে ধারন করব, তা নিজে ঠিক করি। কারন, কবি বলেছেন, “হিংসা পতনের মূল।”

আরেক কবি আবার বলেছেন, “ইর্ষায় যে পোড়েনি, প্রেমে সে পড়েনি।” কাউকে ভালোবাসলে নাকি তার ব্যাপারে ইর্ষা হওয়াটাই রীতি। তাইতো আমি উপরের মানুষগুলোকে ইর্ষা করি। (হা হা হা) নিজের আমিটাকে প্রজ্বলিত করুন।

অন্যের সুখে সুখী হই। অন্যের অর্জনে নিজেকে শামিল করি। অন্যের সামান্যতম সফলতায়ও নিজেকে সুখি করি। হিংসামুক্ত পৃথিবী, জীবন এক নির্মল আনন্দের আধার। সেই আনন্দকে আপনার করে নিই। পৃথিবীটা আনন্দময় করি।

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-১৩: #showoffatitsbest #exhibitionism #TRPaholic #fameseeker #attentionseeker #socialization

ওপাড়ের ডাক যদি আসে: আজ হতে মাত্র বছর পাঁচেক পরেই দেখবেন, বঙ্গদেশে কেউ কারো জানাযায় যাবার আগে মৃত ব্যক্তির ডিজিটাল লাইফ ডাটাবেজ হতে ওই লোকের TRP কত-তা জেনে তারপর যাবে। হাই TRP না হলে শোনামাত্রই অন্য প্রসঙ্গে চলে যাবে লোকে। লো- TRPর লোকের জানাযায় লোক আনতে চাইলে তখন ভাড়া করে লোক আনতে হবে। কমার্শিয়াল পৃথিবীতে কে যায় বিনা লাভে জানাযায়? বন্ধুত্ব তখন হবে TRPর সাথে TRPর। ৯০ এর দশকের সিনেমার চৌধুরী সাহেবেরা তখন ডায়লগ দেবে, “তুই জানিস আমার মেয়ের TRP কত?” নায়িকা বাবাকে বলবে, “বাবা, TRPই কি জীবনে সব?” TRP জগতের খোঁজখবর যারা রাখতে চান, তারা জেনে রাখলে ভাল, নেগেটিভ থ্রাস্ট এর মাধ্যমেও TRP বাড়ানো যায়। এই ধরুন, >”ভাই, আমি কিছুই জানি না। আমি এই লাইনে একজন ছাত্র।” [আসলেই সে কিন্তু শিশু। কিন্তু মুখে বলায় লোকে তাকে মহাবিনয়ী ভেবে তাকে বিনয়ে ১০/১০ TRP রেটিং দিয়ে দিল।] >”আমাদের ছোটবেলা প্রচন্ড অভাবে কেটেছে। রোজ ভাত জুটত না। আমরা ভাইবোনেরা এক জামা-কাপড় ভাগ করে পড়তাম।” [বাস্তবে ছোটবেলা হতেই বাবা-মাকে জ্বালিয়ে খেলেও লোকে শুনে তাকে সংগ্রামী ব্যক্তিস্বত্তা হিসেবে ৯/১০ TRP বাড়িয়ে দিল।]>”অমুক বিষয়ে আমার কোনো একাডেমিক নলেজ নেই। আমি নিতান্তই অজ্ঞ। (এইটা আমি করি।) [শুনে লোকে তাকে সব্যসাচী TRP দিয়ে দেয়। ১০০/১০০।>”ভাই আমার মতো অসামাজিক লোককে ডেকে এনে এত সম্মান দিলেন!” (পুরোটাই আমার কপি।) [লোকে পড়ে সত্যভাষীতায় সুপারহিট TRPতে ভরে দেয় টাইমলাইন। আজকে অবশ্য TRP নিয়ে পড়িনি। পড়েছি মউতের পরের সমস্যা নিয়ে। সকালে অফিসে আসতে আসতে ভাবছিলাম, আমি যদি হঠাৎ করে মরে যাই (আজব, মরে তো হঠাৎ করেই যাব), দুনিয়ার কোথায় কে কোন সমস্যায় পড়বে জানি না। সত্যি বলতে, কারো সমস্যায় পড়ার চেয়ে, আমার মনে হয়, সমস্যা দূর হবার সম্ভাবনাই বেশি। জিন্দা থাকায় প্রচুর উপদ্রব উৎপাদন করেছি, তা জানি। আপনজন ও পরজন-সবার কাছেই। আমার পিতা (ও মাতাও) আমার বকবকানীতে শৈশবে অত্যন্ত ত্যক্ত বিরক্ত ছিলেন। জীবনে খাওয়া সমস্ত কানমলা ও কানপট্টি গরম করা থাপ্পরের বিশাল অংশই কথা বলার অপরাধে খেয়েছি। যাহোক, সবই লো TRPর কাজ। তাই আর ও নিয়ে বেশি ঘাঁটাই না। তবুও, আমি মরলে যদি কেউ কোনো সমস্যায় পড়েও, (আমার ধারনা মতে) সেটা হবে , আমার সাথে তোলা যৌথ ছবি ফেসবুকে দিয়ে শোক প্রকাশ করতে পারবেন খুব কম লোক। [খুব কম মানুষের সাথে আমার ছবি আছে।] তার মানে কী? আমি ছবি তুলি না? ভাবছেন, ব্যাটা রোজ প্রোপিক বদলায়। সে এই কথা বলে! হ্যা, তা গোটা কতক ঠাকুরমার ঝুলি আমলের সুদিনে তোলা ছবিই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দিই। কোথাও গেলে, কারো সাথে দেখা হলে, ”ভাই, একটি ছবি তুলি”-বলতে জিহবা জড়িয়ে আসে। ফলে ছবি তোলা হয় না। কেউ মেহেরবানী করে ছবি তুলতে ডাকলে বর্তে যাই। কিন্তু তাতে ফলাফল, সেই একই। মরার পরে কারো সাথে আমার তোলা ছবি দিয়ে শোক জানাতে পারব না। আমাকেও কেউ শোক জানাতে পারবে না। সমানে সমান। হিসাব বরাবর। https://youtu.be/jZMyyXsUFt8   ”মরিলে কান্দিস না আমার দায়।  ও যাদুধন  মরিলে কান্দিস না আমার দায়।” [সম্ভবত হুমায়ুন স্যার, হিমুর স্রষ্টা]

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-১৪: #death

মরিবার হল তার সাধ: আজ অফিসে আসতে আসতে এক ভদ্রলোকের লেখা পড়ছিলাম। হৃদয়ের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে কেউ মারা যাবার পরেও নাকি বেশ কিছুক্ষণ তার মস্তিষ্ক সচল থাকে, সে শুনতে পায়, দেখতে পায়, বুঝতে পায়। এমনকি আবার সে এটাও বোঝে, যে, সে মৃত বা মৃতপ্রায়। তারপর আস্তে আস্তে মস্তিষ্কও মরতে শুরু করে। স্মৃতি মুছে যেতে শুরু করে। মানুষের ব্যখ্যার অযোগ্য কিছু বিষয় আজও আছে। আমার ধারনা, চিরকালই তা এমন রহস্যময়ই থাকবে। তার দুটি হল-আত্মা (মানুষের জীবনিশক্তি) আর মৃত্যু। মৃত্যু নিয়ে মানুষের আগ্রহের কমতি কোনোকালেই ছিল না। মৃত্যু বলতে ঠিক কী বোঝায়, বিজ্ঞানীরা তাতে একমত হতে পেরেছেন কিনা জানি না। মানুষের মৃত্যু কি হৃদয়ের কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়াকে বলে, নাকি মস্তিষ্ক পুরোপুরি স্মৃতিহীন হয়ে গেলে তাকে মৃত্যু বলে? গতানুগতিকভাবে ডাক্তাররা ব্যক্তির পালস ও হার্টরেট অনুভব করে যে তাকে মৃত ঘোষনা করেন, সেটিই কি আসলে সত্যিকারের মৃত্যু? নাকি “কাদম্বিনিকে মরিয়া প্রমান করিতে হইবে, যে, সে মরিয়াছে”? আমার প্রচুর কথার মধ্যে মৃত্যু জিনিসটা বারবার এসেছে। কী এক অদ্ভুৎ কারনে, মানুষ মৃত্যু নিয়ে কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করে। নাটক চলচ্চিত্রে প্রায়ই দেখবেন, এমন একটি কথোপকথন থাকে, “মরার কথা মুখেও আনবে না”, কিংবা “অমন কথা মুখেও আনবে না।” মৃত্যু কি আসলে নিষিদ্ধ কোনো বস্তু? ট্যাবু? নাকি মৃত্যুকে মানুষের সহজাত প্রচন্ড দানবীয় ভয়ের কারনে তাকে নিয়ে কথা বলতে গেলেও মৃত্যুকে মানুষ অত্যাসন্ন বিপদের মতো মনে করে? ”মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে , মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।” (প্রাণ-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)  আচ্ছা? ভাবুন তো, আপনি যদি ঠিক এই মুহূর্তে মরে যান, ঠিক কী কী ঘটবে পরবর্তি তিন ঘন্টায়? কিংবা তিন দিনে? ভাবতে থাকুন। ব্যক্তিগতভাবে আমরা কেউই বোধহয় কুসংস্কারের উর্দ্ধে নই। সবার মধ্যেই থাকে কিছু না কিছু সংস্কার। যতই মুখে বলি, আমি বিশ্বাস করি না, কিন্তু সকালে বের হতে গিয়ে হোঁচট খেলে ঠিকই মনের মধ্যে একটা ধাক্কা লাগে, “ইশ, সকাল বেলাতেই একটা বাঁধা!” আমার ব্যক্তিগত একটি পাগলামি বিশ্বাস আছে। সেটা হল, আমার পরমায়ূ খুব কম। (সেরেছে, এই ভাবনার নাকি একটি পোষাকি বৈজ্ঞানিক নামও আছে।) মৃত্যু আমাকে সবসময় তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। কোনো কাজে হাত দিলেই মনে হয়, শেষ করে যেতে পারব তো? নিজের মনকে জিজ্ঞেস করি, “তুমি মরে গেলে কার কী অসুবিধা? আর তুমি মরার পরে অন্যের অসুবিধা হলে তোমার ক্ষতি কোথায়?”  আসলে আমরা সবাই পার্থিব জীবনে যেমনই থাকি, আমরা এই জীবনের প্রতি আসক্ত। বাঁচতে পারাটাই হল মানব সত্তার জীবন চলার সংগ্রামের পাথেয়। বেঁচে থাকার লড়াইটাই তাকে চালিয়ে নেয়। সেখানে মৃত্যুকে সে তো ভালোবাসার কথা নয়ই। তবু কেউ কেউ মরতে ভালোবাসে। কিংবা বলা চলে, মরে যাওয়াকে বেঁচে যাওয়া মনে করে। কিংবা মরে বেঁচে যেতে চায়। এই দলটা তারা, যারা বেঁচে মরে আছে-এমনটা ভাবে। নিজেকে মৃত্যুর হাতে সঁপে দেয়াই তারা সহজ সমাধান হিসেবে বেঁছে নেন। আত্মহত্যা নামের এক অমৃত পান করে। খুব হাস্যকর হল, যেই মহল, সমাজ, পরিবার, দেশ, রাষ্ট্র, বিশ্বব্যবস্থা, একজন মানুষকে বাঁচার আশা যোগাতে পারে না, সে আবার তার মরে যাবার চিরন্তন অধিকারকে অবৈধ করে রেখেছে। আমার কাছে খুব অবাক লাগে, মানুষের নিজের জীবনের মালিক তো সে নিজে। তাহলে সেটাকে থামিয়ে দিতে চাইলে রাষ্ট্র তাকে আটকাবার কে? ভেবে দেখতে হবে। আজকাল নাকি সমাজ অনেক বদলে গেছে। তবে এই দিক দিয়ে মনে হয় একটু এগিয়েছে। অন্তত চলচ্চিত্র, নাটক যদি সমাজের দর্পন হয়, তাহলে, আজকাল নাটক, চলচ্চিত্রে ‘বিষ’ খেয়ে মরে যাবার দৃশ্য অত্যন্ত বিরল। ছোটবেলায় দেখতাম, নায়ক, নায়িকা পুরো চলচ্চিত্রে অন্তত একবার বিষ খাবার চেষ্টা করবেই। তাহলে কি মানুষ আজকাল আত্মহত্যাকে পরিহার করতে শিখে গেছে? জোর দিয়ে কী করেই বা বলি? এই তো সেদিন, মিরপুরে বাবা-মা-সন্তান তিনজন বুদ্ধি করে, পরামর্শ করে, প্রস্তুতি নিয়ে একত্রে আত্মহত্যা করল। প্রতিযোগীতার জগতে টিকে থাকার সংগ্রামে ব্যর্থ হয়ে। এর কী ব্যখ্যা হয়? আমার চার দশকের জীবনে আমি প্রায় কখনোই মৃত মানুষকে দেখিনি। কিন্তু খুব ছোটবেলায় কলোনীর পাশে একজন বয়োজেষ্ঠ ভদ্রলোক গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। আমাদের সহপাঠির বাবা। আজও সেই মৃত ভদ্রলোকের দড়িতে ঝুলন্ত মৃতদেহ বিভিষিকার মতো চোখে ভাসে। ঠিক কতটা তিতিক্ষা জমা হলে কেউ নিজেই নিজের জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দেবার সাহস করতে পারে, নিজেই নিজের শাহানা সাজ আয়োজন করতে পারে, চোখের সামনে কালো একটি পর্দা নেমে আসছে, খুব ঠান্ডা লাগছে, চোখগুলো প্রচন্ড চাপে কোটর হতে বড় বড় হয়ে ফেটে বেরিয়ে আসছে, গলার শ্বাসনালী নীল হয়ে ফুলে আসছে ফুসফুসকে যেকোনো ভাবে একটু বাতাস এনে দিতে, অদ্ভুৎভাবে ভুলে যাওয়া সব স্মৃতি মনে আসছে, আপনি একইসাথে পরম নির্ভার আবার সবকিছু ছেড়ে যাবার দুর্ভার বেদনাটা যুগপৎ অনুভব করছেন-এটা কীভাবে মেনে নেয়া যায়? ধুর! এত কিছু ভাবলে মরা যায় নাকি? শান্তিতে মরারও উপায় নেই। জীবনানন্দ শুনুন https://youtu.be/oojA0XV8pCw   

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-১৫: #knowing #showoffatitsbest #exhibitionism #TRPaholic #fameseeker #attentionseeker #friend #change #decay

কে জানে তা, কে জানে? দুঃখের বিষয়। ইদানিং TRP কমে যাচ্ছে। লেখায় কাটতি কমে যাচ্ছে। চিন্তায় আছি। এই লেখাটি যদি আমার শেষ লেখা হয়, আর সেটা আপনি আজ হতে তিনদিন পরে উপলব্ধি করতে পারেন, বা জানতে পারেন, কেমন লাগবে? এই লেখাটিকে তখন আপনার অনেক দামী মনে হবে? হঠাৎ করে আমার লেখার কদর বেড়ে যাবে? মরনোত্তর পুরষ্কারের জন্য আমাকে মনোনীত করবেন? নাকি, “যাক, বাঁচলাম” বলে বাতিলের খাতায় ফেলবেন? হতেও পারে, এটাই আমার শেষ লেখা। আর সুযোগ পেলাম না লেখার। তার আগেই উড়াল। চারদিন ধরে রোজ সকাল ৮ টা হতে বিকেল ৫ টা তক একটি খুচরো জ্বর জ্বর আসে। ব্যাটাকে কিছুতেই তাড়ানো যাচ্ছে না। আমার আজীবন জ্বরের ধাত। আমার জীবনের বড় বড় পরীক্ষার একটি বড় অংশই আমি জ্বর নিয়ে দিয়েছি। তারপর বহু বহু দিন ধরে জ্বর আমাকে ছোঁয় না। জ্বর নামক বস্তুটার নানা অসুবিধার একটা হল, ডিলেরিয়াম। প্রতি ৩ ঘন্টা পরপর নিয়ম করে করে জ্বর হানা দিচ্ছে। একবারের ঝটকা শেষ না হতেই পরেরটা হাজির। ফলাফল, কোনটা ডিলেরিয়াম আর কোনটা বাস্তব, বোঝা কঠিন হচ্ছে। এই লেখাটাও ঘোরের মধ্যে লিখছি কিনা জানি না। চারপাশের জগতে যা ঘটে যাচ্ছে তার কিছুই মাথায় ঢুকছে না। ডিলেরিয়াম লেভেলে এই এক রহস্য। সব দেখি, আবার কিছুই দেখি না। জ্বরটা যখন ১০৩ এ ওঠে, প্রচুর অবাস্তব বিষয় নিয়ে হেলুসিনেশন হয়। এটাই ছোটবেলা হতে জ্বরকে যমের মতো ভয়ের অন্যতম কারন। তার ওপর কড়া ডোজের ওষুধের ধাক্কায় হিলুসিনেশনের মাত্রা বাড়ছে। অনেক অনেক বছর পরে জ্বর নামক বস্তু আমাকে ধরেছে। আমার স্ত্রী আমাকে অসুস্থ দেখে অভ্যস্ত নন। আমি নিজেও না। তাই অভ্যস্ত হবার চেষ্টা করছি। রিগেইন করার হাজার চেষ্টা স্বত্বেও অফিস কামাই করতে হচ্ছে। যা আমার একদমই ধাতে সয় না। আমি কি এটা লিখছি? নাকি এটাও হিলুসিনেশন?  এই পোস্টটা লিখছি, মানেই, এই নয়, আমি ফিট আছি। আসলে একটু আগের ১০৪ জ্বরটা এখন ১০০ তে নেমেছে। ঘরের একজন জ্বরে কাত, আরেকজন স্টমাক কমপ্লেক্সে মাত।  কে যে কার মাথায় পানি দেবে আর কে কাকে ওষুধ খাওয়াবে জানি না। যখন যার হুশ আসছে, সেই সেবকের ভূমিকায় নামছি। এই কান্ড চলছে দেড়দিন ধরে। জ্বরে নাকি পাপ কাটে। আপাতত পাপ কাটতে কাটতে যদি মরে যাই, তাহলে কাফফারাটাও হয়ে যায়।শেষ সময়ে নাকি অতীত ফিরে আসে আরেকবার। কে জানে? সবই আপেক্ষিক। আমাদের পৃথিবী, জীবন ও জগত-অত্যন্ত আপেক্ষিক। জগতের সব অ্যাডজেকটিভ ও অ্যাডভারব আপেক্ষিকতার সন্তান। ভাল>মন্দ কু>সু ন্যায়>অন্যায় আলো>আঁধার সত্যি>মিথ্যা সাদা>কালো   সব, সব আপেক্ষিক। যেমন আপেক্ষিক বন্ধুত্ব। আজ যে বান্ধব, কাল সেই আবার হয়ে পড়ে চরম শত্রূ। আজ যে, আপনাকে কৃতজ্ঞতায় গদ গদ হয়ে কলিজার দোস্ত বলে জড়িয়ে ধরছে, হতে পারে, কালকে সেই আপনাকে জনসম্মুখে অপদস্থ করতে পারলে খুশি হবে। আজ যে পরম আপনজন, কাল পরিবর্তনের ধারায় সেই আপনার কাছে হয়ে যেতে পারে ঘৃনিত দূর্জন। আপনার সন্তান, যারা আপনার কলিজা, যাদের মানুষ করা নিয়ে আপনি গর্বিত, আপনি কেবল একটা ব্লাফ ঘোষনা দিন, যে, আপনার সব এসেট আপনি আপনার সবচেয়ে ছোট সন্তানকে দিয়ে যাবেন, তারপর দেখুন, তারা কতটা মানুষ, কতটা দানুষ!চারগন্ডা জীবনে কতজন উল্কার মতো এসেছে। বন্ধু ডাকে, আপন জ্ঞানে কত্ত কত্ত ভালোবাসা অযাচিতভাবে দিয়েছে। আবার সেই একদিন ব্যাখ্যার সুযোগ না দিয়ে একতরফা অভিমান করে চলে গেছে। আবার হয়তো কোনোদিন নিজে হতেই ভুল ভাঙবে। সেদিন………………………. কে জানে। আপেক্ষিকতা নিয়ে বহু আগে একটি লেখা লিখেছিলাম। আপনি যদি বিরক্ত না হন, তবে পড়ে দেখতে পারেন: https://www.facebook.com/walidur.rahman1/posts/2623548791036445 শুনেছিলাম, শালিক পাখি নাকি আকাশের দিকে পা ছড়িয়ে চিৎ হতে ঘুমায়। কেন? তাকে নাকি কোনকালে কে বলেছিল, আকাশটা একদিন ভেঙে পড়বে। আর সেই সময় যাতে আগে দেখতে পারে আর পা দিয়ে ঠেকা দিতে পারে, তাই………………………..। ভবিষ্যতের ভয়ে, মানুষ পরিবর্তন হবার ভয়ে তাহলে কি আপনি নিজেকে গুটিয়ে নেবেন? বন্ধ করে রাখবেন হৃদয়ের কপাট? মনের অবগুন্ঠন খুলে কাউকে কি আপন করে নেবেন না? হয়তো নেবেন। হয়তো না। কে জানে? দু’জন অদ্ভুৎ মানুষের সাথে দেখা হল সম্প্রতি। প্রতিষ্ঠিত চাকরি ও ব্যবসা ছেড়ে, নিশ্চিত জীবন ছেড়ে নতুন ধরনের স্বপ্ন ও প্রকল্প নিয়ে দেশোদ্ধারে নেমেছেন। আমার কাছে এসেছেন বুদ্ধি নিতে। আমি ঘন্টাখানেক কথা বলে আর কিছু না হোক, তাদের মাথাটা কিছুটা হলেও গুলিয়ে দিতে পেরেছি। তাদের চিন্তাভাবনা শুনলে আপনার কাছে পাগল মনে হতেই পারে। হোক। আমার কাছে লাগে, এরকম পাগল এই দেশে আরো হাজার হাজার দরকার। বিশেষত এই নষ্ট সময়ে। আমার কথাবার্তাকেও আপনার পাগলামি মনে হতেই পারে। হোক। আজ যেটা আপনার পাগলামি মনে হচ্ছে, কাল সেটাই আবার বেদবাক্য মনে হবে না, কে জানে? দূর্জনেরা বলে, “বাঙালের কথা বাসি হলে ফলে।” এমবি খরচ করে গান শোনার লোক হয়তো কম। আমি নিজেও কৃপণ মানুষ। তবু মাঝে মধ্যে একটু বেহিসেবী হওয়াই যায়। এই গানটির জন্য হতে পারেন: যে তোরে পাগল বলে (মাছের ঝোল) https://youtu.be/m0iaaCLH87k   

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-১৬: #mask #jointsociety/ #teamwork #image #disguise #identify #recognize #WhoAreYou #explore

আমি চিনি গো চিনি তোমারে। রাস্তাঘাটে প্রায়ই বহুল উচ্চারিত একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হবেন, “এই তুই আমাকে চিনিস?” বাসের টিকেটের পয়সা কম দিতে চাইলে, পাড়ার দোকানে ফ্রিতে বিড়ি পেতে চাইলে, ট্রেনের টিকেটের লাইনে বাড়তি সুবিধা চাইলে, কারো বাইক কারো গায়ে উঠিয়ে দিলে, সার্জেন্ট কাগজপত্র চাইলে আমরা চোখ মুখ খিঁচিয়ে, চোখ উল্টিয়ে, হাতা গুটিয়ে, পেট ফুলিয়ে, কলিজা শক্ত করে, জোরসে হ্রেষা রবে ডেকে উঠি, “এই, তুই আমাকে চিনিস?” সত্যিই তো! আপনি কি আমাকে চেনেন? তারও চেয়ে বড় কথা, আপনি কি আপনাকে, নিজেকে চেনেন? ভাবতে থাকুন। দুর্জনেরা বলে, বাঙালিকে চেনার অনেকগুলো রাস্তা আছে। আজকে তার কয়েকটা বলি-কী কী উপায়ে মানুষের সত্যিকারের রূপ চেনা যায়? >ভাগে চিংড়ি মাছ কিনলে (মধ্যবিত্ত বাঙালি মাত্রই ভাগের চিংড়ী কিনে থাকবেন, যা দাম!)>সাবলেটে ঘর নিলে (বাথরুম কে পরিষ্কার করবে তা নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে যেতে হয়।) >হরতালের দিন একসাথে বাসে অফিস গেলে (মানিব্যাগ পকেটে গদের আটায় লেগে থাকে) >খুচরা ১০-২০ টাকা রিক্সাভাড়া হিসেবে ধার দিলে (তুচ্ছ জিনিস মনে কে রাখে?) >একসাথে নীলক্ষেতের হোটেলে সিঙ্গারা খেলে (খুচরা টাকা পকেটে না থাকারইতো কথা, তাই না?) >ভীড়ের বাসে হঠাৎ একটা সীট খালী হলে (আনমনে বসে পড়ে, যেন সাথে কেউ আছে এমন কিছুই মনে নেই) >মুমূর্ষ রোগীর জন্য রক্ত চাইলে (আমার এইডস আছে, দিতে পারব না) >বন্ধুকে ৫৪ ধারায় পুলিশ ধরলে আরেক বন্ধুকে সাহায্যের জন্য ফোন করলে (আপনি কে যেন? )” >দোস্ত, এই কোশ্চেনের নোটটা আছে?” জিগরী দোস্তকেও এই প্রশ্ন করলে। >পাশাপাশি প্লটে জমি কিনলে (উপরের তলার রুমগুলার দেয়াল একজনেই দেয় অন্যজন খালি ভিতরে প্লাস্টার করে নেয়)। >চরম ডায়েটে আছেন-এমন কাউকে বিয়ের খানাতে দাওয়াত দিলে। >বেগানা আওরতকে দেখা তো দুরে, দেখা দেয়ার মতো কাজও করেন না-এমন বুজুর্গকে মোবাইলে ইন্টারনেট লাইন দিয়ে দিলে।>তুচ্ছতম কোনো স্বার্থের লেজুরে ঘাঁ দিলে। >আর এর কোনোটাতেই যদি কাজ না হয়, তাহলে কাউকে দশ টাকা ধার দিয়ে দেখুন। আর কিছু লাগবে না। কাল, পরশু-দুই দিন বাংলাদেশ ছুটি। দিবসের তাৎপর্য ও আমাদের খাসলত যাই হোক, ছুটি সব সময়ই মধুর। ঠিক যেমন, পহেলা বৈশাখ বেদাত, কিন্তু সেই উপলক্ষ্যে বোনাস ও ছুটি চরম দাত। আমার ছুটি নেই। কাল ও  পরশু হতে যাচ্ছে আমার প্রচন্ড ব্যস্ততার দুটি দিন। কী কাজে জানতে চাচ্ছেন? থাক, না বলি। আজারিয়া কাজের ফিরিস্তি শুনে কী করবেন? তার চেয়ে বরং মানুষ চেনার চেষ্টা করুন। মানুষ চেনা আমার একটি প্রিয় কাজ। কীভাবে মানুষ অমানুষ হয়ে যায়, কীভাবে মানুষ বদলে যায়, সেই মানুষই কেন অন্যের বদলে যাওয়া দেখে ক্রূদ্ধ হয়, তাই নিয়ে গবেষণায় সময় কাটে আমার। আজারিয়া সময় হাতে থাকলে যা হয়। তাছাড়া, আমার যে কাজের প্যাটার্ন, সেটার জন্যও মানুষ চিনতে হয়। তবে কখনো কখনো চেনা মানুষও অচেনা হয়ে যায়। বহুবার দেখেছি, তিন দশক একই ছাদের নিচে সহবাস করার পরেও নর ও নারী উভয়ে উভয়কে চেনে না। আজকের জিগরী দোস্ত, কালকেই আর বন্ধুকে চেনে না। আমার মা বলেন, “মা মরলে বাবা হয় তালুই।” বাবা মরলে মায়ের হয়তো মাঐ হবার সুযোগ নেই। কিন্তু বাপ মরলে অনেকেই তাঔ হয়ে যায়। আপনি যদি আমার কাছে প্রমান চান, আমি লাচার। আমার ছোট্ট জীবনে আসলে তুলনামূলক অনেক কিছু দেখেছি। দেখে যে খুব একটা শিক্ষা হয়েছে তা নয়। তবে দেখার ও জানার ঝুলিটা সমৃদ্ধ হয়েছে। মানুষকে জানারও। নাহ, আজকে সত্যিই মন বিক্ষিপ্ত। লিখতে বসে মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে। লেখা এলোমেলো হচ্ছে। আর সেটাকে না বিগড়াই। একটা আবৃত্তি শুনবেন? https://youtu.be/DxY6eFJYXhk?t=11    

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-১৭: #fear #afraid #apprehension #panic #phobia

ভয়কে আমি না যেন করি ভয়: ইদানিং খুব ভয়ে আছি। দিবা নিশি অনঙ্গ ভয়। উঠতে ভয়। বসতে ভয়। বলতে ভয়, টলতেও ভয়। নিদ্রায় জাগরনে হিম শীতল ভয়। মাঝে মধ্যে এমনও হয়, মরতেও ভয় করে। জানি না, কবে হতে এত ভীরু ভীতু জড়ুয়া হয়ে গেলাম। ভয়ের কোনো কায়া নেই, অথচ ছায়ায় আমার বড্ড ভয় করে। ভয়ের করাল কালো ছায়া রাত দিন অস্তিত্বের চারপাশে ফিসফিস করে। এই ভয় পৃথিবীর মায়া ছেড়ে যাবার ভয়। এই ভয় কাউকে কাউকে অসহ্য অপদার্থতা কিংবা অন্যায়ের মুখে ঘৃনায় দগ্ধহত করার ভয়।এই ভয় পশুর মতো নিজেকে মার খেতে খেতে মরতে দেখার ভয়।এই ভয় মুখ খুললেই অপ্রিয় ও ঘৃনার পাত্রে পরিণত হবার ভয়।এই ভয় বাকস্বাধীনতা হারানোর ভয়। এই ভয় অামার ঠোঁটে অন্যের ‍বুলি বুলতে বাধ্য হবার ভয়।এই ভয় রাত কি দিন, রাস্তা কি মাঠে, ঝোপে ঝাড়ে লাওয়ারিশ লাশ হয়ে মরে পরে থাকার ভয়। এই ভয় জাগ্রত জনতার আচানক উদ্যত চেতনার হাতে লাশ হয়ে পড়ে যাবার ভয়।চাকরি হারাবার ভয়। দারিদ্রের ভয়। পুলিশের ভয়। ছিনতাই হবার ভয়। ইনবক্স ফাঁস হয়ে যাবার ভয়। TRP কমে যাবার ভয়। ইমেজে আঘাতের ভয়। ভাবমূর্তির ভয়। পিছিয়ে পড়ার ভয়। ঠকে যাবার ভয়। মেজরিটিকে ভয়। মাইনরিটি হবার উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ভয়। প্রেম হারানোর ভয়। প্রেম হয়ে পড়ারও ভয়। বন্ধুত্ব হারানোর ভয়। বন্ধুত্ব গাঢ় হলেও ভয়। সব লুকোনো সত্য প্রকাশ হয়ে পড়ার ভয়। কোনো গোপন পাপের অভিশাপ লাগার ভয়।ছোটবেলা হতেই আমার বড্ড ভয়। ছোটবেলার ভয়গুলো সবারই খুব কমোন। একটা সময় পর্যন্ত ভূতের ভয় ছিল জীবনে সবচেয়ে বড় ভয়। জগতে এই এক ভয়, যেটা কেউ মুখে কবুল করবে না। আবার অমাবস্যার রাতে একা শ্মশানেও যাবে না। আমি বহুবার এই ভয়ে প্রায় আধমরা হবার যোগাড় হয়েছি। গ্রামে বেড়াতে গেলে ভূতের ভয়ে রাতে বিছানা না ছেড়ে সারারাত পিপি চেপে ঘুমোনো আর এপাশ ওপাশ করা আজও মনে পড়লে হাসি পায়। পরীক্ষাকে আমি আজীবন ভয় পাই। শুধু পরীক্ষা দেবার জান্ত্যব আতঙ্কে জীবনের সব পরীক্ষা আমি দিতে গিয়েছি প্রচন্ড জ্বর নিয়ে। এসএসসি পর্যন্ত এই কান্ড করেছি। ভয় পেয়েছিলাম, যেদিন প্রথম হোস্টেলে উঠি, আর সে রাতেই পুলিশ হল রেইড করে গভীর রাতে। সাথের বড় ভাই যতই সাহস দেন, তাতে কি আমার আতঙ্ক কাটে। মায়ের ফোন এলেই ভীত হয়ে পড়ি, না জানি কোনো খারাপ খবর আসে। সহধর্মীনিকে ফোন করে না পেলে ভয় পাই, কী হল কী হল? মানুষকেও আজকাল ভয় পাই। মানুষ এত দ্রূত বদলাচ্ছে, এত দ্রূত অবস্থান বদলে ফেলছে, এত দ্রূত জাজ করে ফেলছে, ভয় না করে যাব কই? কেউ বেশি প্রশংসা করলেও ভয় লাগে। কারো প্রশংসা করতেও। যদিও আমার একজন মেনটর আমাকে বারবার বলে যাচ্ছেন, “ওয়ালিদ ভাই, ভয়কে কীসের ভয়?” ঠিকই তো। ভয় পেলেই ভয়, ভয় না পেলে কীসের ভয়?আপনি কীসে সবচেয়ে বেশি ভয় পান? প্রশ্ন করেছেন কখনো নিজেকে? শুনেছি, ডরপুক পুরুষ (নিন্দুকেরা বলে মেয়েছেলে) নাকি বউকে ভয় পায়। অন্য পুরুষের সামনে নিজেকে বলবান বীর্যবান বীরপুরুষ প্রতীয়মান করার নেশাগ্রস্থ পুরুষ তাই বলে, ”আমি কি ডরাই সখী ভিখারী রাঘবে?”যদিও বলার আগে দেখে নেয়, গিন্নী আশপাশে আছে কিনা। জগতে নারী ও তার নরের পরষ্পরকে ভয়ের প্রকৃতিটা ভিন্ন ও বিচিত্র। নারী ভয়ে থাকে, তার নর কখন যেন অন্য নারীতে মজে। কখন সে পানশালায় গিয়ে বসে, কবে যেন তাকে ছেড়ে দেয়, কিংবা সে গোপনে তার পরিবারকে বেশি বেশি দিয়ে দিচ্ছে কিনা। সেই নারীর নরই আবার ভয়ে থাকে, কখন বউ মোবাইল হ্যাক করে সব মেসেজ আর ব্রাউজিং হিস্ট্রি দেখে বসে, কবে যেন শার্টে কার চুল ধরে ফেলে, কবে যেন কী জেনে ফেলে, গোপনে বাপের বাড়িতে সব পাচার করে কিনা, আগের বয়ফ্রেন্ডটার সাথে সময় দেয় কিনা-আরও কতো ভয়। একই ছাদের নিচে বছরের পর বছর সহবাস করেও দু’জনকে দু’জনের কত বিপরীতমূখী ভয়।ভয়ে কুকড়ে থাকা এক জাতিকে জানি। যে জাতি একদা দানবের মুখ থেকে ছিনিয়ে এনেছিল নিজের পতাকা। নিঃসীম জীবনশক্তি আর দুরন্ত সাহস বুকে পোরা সেই অতিমানবদের উত্তরসুরী এই জাতিই এখন ভয়ে আধমরা। নিজেকে নিজের খোলসে আবৃত করে অবগুন্ঠনে নিরাপদ বসবাস তার। সে এখন কথা বলতে ভয় পায়। সে ভাবতে ভয় পায়, হাসতে ভয় পায়। ভয় পায় স্বপ্ন দেখতে, ভয় পায় মাঠে নামতে, ভয় পায় উঁকি মেরে বাইরে দেখতে। ভয়ের কুৎসিত হিমবাহের জমাটি অন্ধকারে গুটিশুটি মেরে পড়ে থাকে অন্ধকার কোণে। আতঙ্কে কন্ঠস্বরও বসে যায়। ফ্যাঁসফেঁসে স্বরে যেন কোনো অবলা জানোয়ার কুঁই কুঁই করে। যেন কোনো ভিতচকিত পশুর মসৃণ গলকম্বলে উদ্যত কৃপাণ। ভয়ের এক চেনা দানব যেন ত্রাসের চাদর বিছিয়ে বশ করে রেখেছে সেদিনের সেই দুঃসাহসী মানুষগুলোর উত্তর প্রজন্মকে। ভয়ের হিমশীতল চাহনী প্রতিনিয়ত আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে চলে ভবিষ্যতের পানে। তিনটি ভূত আপনাকে জীবনের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়, সিন্দাবাদের ভূতের মতো তাড়িয়ে বেড়ায়, আপনার ঘাড়ে বসে ধাক্কা দিয়ে আপনাকে সামনে চালায়। সেই তিনটি হল-

১. অ্যামবিশন/গ্রিড।

২. এ্যংজাইটি/ফোবিয়া।

৩. কৃতজ্ঞতা/প্রতিহিংসা।

যা কিছুই করেন, এই তিনের যে কোনোটার দ্বারা চালিত হয়েই করেন। আর যদি এর একটাও না হয়ে থাকে, তাহলে আপনার বসত হেমায়েতপুরের বিশেষ মেহমানখানায় হবার কথা।

চালিকা শক্তি বা ড্রাইভার হল এই তিনটার যেকোনো একটা। এরা আপনাকে কোন পথ দিয়ে নিয়ে যায় জানেন? ড্রাইভার ফ্যাকটরের ড্রাইভওয়ে হল ৭টি-

ড্রিম>ডিটারমিনেশন>ডেসপারেশন>ডেডিকেশন>ড্রাইভ>ডেক্সটারিটি>ডেসটিনিদ ভয় আমাদের থামায়। আবার ভয়ই আমাকে চলায়। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভয়ই মানুষকে উদয়াস্ত ছুটতে বাধ্য করে। কী হবে ভয় উত্তরণের পথ বাতলে? কী হবে আলো খুঁজে? তার চেয়ে বরং ভয়কে আরো জড়িয়ে নিই। ভয়ের অচেনা কুয়াশার ঘোরকেই নির্বান ভেবে সান্তনা পাই। ভয়ের কাছে হার মেনে দোর বন্ধ করে, চোখ মুদে সোনালী দিনের স্বপ্নের আফিম ঘুমে তলিয়ে যাই। ভয় নিয়ে নচিকেতার একটা দারুন সৃষ্টি: https://youtu.be/6H1_M1P-x9A?list=PL8Vc_kqzSYJ-Os6GOdni7VoKYNw6wnfud     

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-১৮: #forgetmemory #hype

বাঙালিরা হয় একটি বিস্মৃতিপ্রবণ জাতি: ১২ ডিসেম্বর ২০১৯ গত তিন সপ্তায় আমার নিয়মিত লেখা শুককুরবারের পাঁচালী যে লিখি না, কেউ অবশ্য সেটা খেয়াল বা জানান দেননি। যেমন দেননি, গত ৪ মাস ধরে এক চিমটি ক্যারিয়ার লিখি না। প্রথম প্রথম ভাবতাম, এই রে, আজই বোধহয় কেউ মেসেজ দেবে, ভাই লেখা দেন না যে? তবে পরে আস্তে আস্তে বুঝলাম, না। কেউ দেবে না। আসলে, কারও জন্য কিছু ঠেকে থাকে না। আর রদ্দি লেখার জন্য তো না ই। দেশে এখন কী-লিড-চিফ-এর বন্যা। তার মাঝে টেক্সট বয়ান পড়ে ক্যারিয়ার বানানোর আর কোনো আবেদন থাকে নাকি? ঠিক যেমন করে আবেদন হারিয়েছে নূর হোসেনের “স্বৈরাচার নিপাত যাক” দাবী, কিংবা সেভেন মার্ডারের নূর হোসেনের বিচারের দাবী। নিমতলীতে আর চকবাজারে কেমিক্যালের আগুনে দুই দফা কয়েক শ মানুষ কয়লা পাপড় হয়ে পুড়ে মরেছে। শুনেছিলাম কত কী হবে। হাজারী বাগের চর্ম বানিজ্যের লালসাপূর্ন জিহবায় বুড়িগঙ্গার অশুচী হবার দিন নাকি শেষ করা হবে অতি দ্রূত। (কোনো এক বছরের কোন মাসে যেন, মনে নেই।) হয়নি তার কিছুই। বুড়িগঙ্গায় হাজারীবাগের রজঃনিঃসরন আজও বহমান। যদিও আর বহমান নেই প্রমত্তা পদ্মা। স্বপ্নদোষের পদ্মাব্রীজের নিচে একদা যৌবনবতি পদ্মাদেবীর জলপ্রবাহ আজ এক মেনোপজের রুগ্ন রুদ্ধ প্রবাহ। এফআর টাওয়ারের আগুনে কয়েক ডজন আদম আত্মহুতি দেবার পরেও আমরা নড়েচড়ে বসেছিলাম। এবার কিছু হবে বলে। সারা ঢাকায় মাপজোঁখ হল। রাজুক বিস্তর দৌড়ঝাঁপ করল। তারপর সব ঠান্ডা। শুনেছি, রাজুকের ওইসব দলিল দস্তাবেজ নিমতলীর রদ্দি কাগজের দোকানে ঠোঙ্গা আকারে বিক্রী হচ্ছে। সেই ঠোঙায় করে গরম গরম পিঁয়াজু খায় নিমতলীর পুড়ে মরা মানুষদের স্বজনেরাই। রাজিব-মিম মরার পরে দেশের সড়কব্যবস্থাকে সুইজারল্যান্ডের কাতারে নিয়ে যাবার আশাবাদ উচ্চারিত হয়েছিল। আমরা আবার নড়চড়ে বসেছিলাম। একবার ঢাকার বুকে মাস্তানের মতো দাপিয়ে বেড়ানো মোটর সাইকেলে অবশ্যই দুইজন চড়ে রাস্তায় নামার আইন করায় কে কাকে গার্লফ্রেন্ড বানিয়ে সহযাত্রী সাজাবে, তা নিয়ে ব্যপক দুঃশ্চিন্তায় ভুগলাম আমরা। বাইক এখন ফুটপাতে। দুজন চাপানোর রাজকীয় আদেশ এখন নতুন সড়ক আইনের বাড়িতে মেজ্জান খায়। আচ্ছা, রাজিব-মীমের কাফন কি কবরে পঁচে গেছে? এত তাড়াতাড়ি হয়তো তা হবে না। আমাদের স্মৃতির পঁচন কিন্তু চলছে। সাঈদী নামের একটা কেহেরমান যাদুকরের জন্য চন্দ্রশেখর দেখার মাসুল হিসেবে শ’খানেক লোককে বেঘোরে মরতে হয়েছে। শুনেছিলাম, দেল্লার মামলার রায় নিয়ে রিভিউ পিটিশন হবে। হবে জামাত নিষিদ্ধের আইন। অভিজিতের খুনিদের বিচার হতে হতে তো বেচারা অজয় স্যার মরেই গেলেন। সবই কথা ছিল ঈদের পরে হবে। ঈদ আসতে কত দেরী পাঞ্জেরী? অজয় স্যারের দানকৃত দেহ হতে মাংস খুলে খুলে যখন মেডিক্যাল ছাত্ররা এনাটমি শিখবেন, তখন সেই মাংসখন্ড যদি প্রশ্ন করে? যদিও তনুর গায়ের পঁচা মাংসরা দেই দাবী করেনি। খাদিজার গলার চাপাতির কোপের দাগ শুকিয়ে গেছে। রুনীর কবরের পাশে মেঘের লাগানো হিজল গাছে ফুল ধরল কিনা-সেটা অবশ্য জানা যায়নি। মেয়াদোত্তীর্ন সিএনজি ও এলপিজি সিলিন্ডার বাজেয়াপ্ত করার নাকি এক মহান উদ্যোগ নিয়েছিল রাজকীয় কানুনপ্রয়োগ সংস্থা। সেটাও কি ঈদের পরে হবে নাকি আগে-জানি না। রোহিঙ্গারা এই গেল, এই গেল, এই গেছে-শুনছি সেই দুই বছর ধরে। এখন আবার সূ চি আপা (আসলে চরম অশুচী) বলেছেন, তাদেরকে গণহত্যার মামলা দিলে রোহিঙ্গাদের বাপের বাড়ি নাইওর যাওয়া বনধ। সুতরাং, ওনারা ১১ লাখ ’মোমিন বান্দা’ থাকছেন  এই দেশের মাটির উর্বরতা বাড়াতে। [যারা রোহিঙ্গারা স্রেফ মুসলিম হওয়ায় তাদের জাতি ভাই বিবেচনায় আশ্রয় দেবার দাবীদার ছিলেন, তাদের জন্য ‘মোমিন বান্দা’ শব্দটি ব্যবহৃত। অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই।] পেঁয়াজের দাম নিয়ে কেউ আর কথা বলবে না-এটাই স্বাভাবিক। যেমন করে কেউ বলে না, গরুর মাংস যখন ৬০০ তে ওঠে, তখন প্রতিশ্রূতি দেয়া হয়েছিল, তা ৩৫০ টাকায় নামানো হবে, কোনো এক ঈদের পরে। চালের গড় দাম ২৫-৪০ হতে সেই যে ৫০-৭০ টাকার ঘরে চলে গিয়েছিল, সেটাকে যে নামানোর কথা ছিল, সেটার রেকর্ড আজ আর যাদুঘরেও পাওয়া যাবে না। ডেঙ্গুকে মঙ্গল গ্রহে পাঠাতে সুধী মহলের নানা প্রতিশ্রূতি আপাতত আগামী বছরের ২৮০ জন হতভাগার আত্মাহুতির অপেক্ষায় তুলে রাখা হয়েছে। আত্মভোলা জাতি। ইন্দ্র ও ইন্দ্রীয় সুখে মত্ত জাতি। ’মিথিলা’কে গালি দিয়ে স্বর্গে যেতে উদগ্রীব জাতি। যাও, নিজের রচীত শ্বাসরুদ্ধ স্বর্গেই যাও। শুধু অনেক চেষ্টা করেও আমরা কিছু মানুষ ৫২, ৭১, ১৬/১২, ২৬/৩, ২১/২, ৩০ লাখ, ৩ লাখ, ৭ বীরশ্রেষ্ঠ সংখ্যাগুলোকে ভুলতে পারছি না। ১৬ ডিসেম্বরের মুফতের ছুটি আর ১৪ তারিখের দামী কালো কাপড়ের পাঞ্জাবীর ঝকমারিই হয়তো সেটাকে ভুলতে দেয় না। বারবার বারবার মনে করিয়ে দেয়।

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-১৯: নিজের কাছে নিজের লিখিত অন্তিম পত্র: #life #friendship #misunderstanding #betrayal #deceit

প্রিয় জীবন, এই ক’ছত্র তোমাকে লিখিতেছি বড়ই দুর্জ্ঞেয় ও দূর্বহ এক ক্রান্তিকালে। তুমি ও তোমরা এই পত্রখানাকে কীভাবে লইবে জানি না। বুঝাইতে চাহিও না। ইহাকে স্রেফ আমার আরেকখানা সাধারন লেখাও ভাবিতে পারো। আবার অক্ষরের কালো কালো অবয়বের আড়ালে আমার অবদমিত ও রুদ্ধ কথামালাও ভাবিতে পারো। হয়তো পত্রখানা পড়িবেই না। কিংবা কে জানে, হয়তো নজরে লাগিলে পড়িতেও পারো। তোমাদের যেইরূপ অভিরুচী। তোমার লাগিয়া বরাদ্দকৃত সময়কাল হইতে আরও একটি বছর কমিয়া গেল। তোমার জীবনচক্রের তীব্রতম বাঁক পরিবর্তনেরও তো তিন সাল হইয়া গেল। এই চারিটি দশকের জীবন কিংবা গত তিনটি বর্ষ আগাইয়াছে সদ্য হন্টন শেখা শিশুর মতো করিয়া। যে উঠিয়া দাড়ায়, হাঁটিতে পারিবে না, বেশি দূর যাইতে পারিবে না-জানিয়াও কতকটা হাঁচড়াইয়া পাঁচড়াইয়া হেঁচড়াইয়া চলে। গত অমোঘ তিনটি বর্ষ এমনই করিয়া কাটাইয়াছি। শুরুতে যাহা অসম্ভব মনে হইয়াছিল, তাহা আজিকে অভ্যাসে পরিণত হইয়াছে। বর্ষ অবসান হইতে আরও কয়েকটি দিন বাকি রহিয়াছে। প্রভাতে অভ্যাসবশত কর্মস্থলে গমন কালে এক চিলতে শীতের রোদ যান্ত্রিক শকটের জানালা দিয়া কোলের উপরে রাখা আমার হাতখানিতে পড়িল। কী যে আদর মিশ্রিত সেই রোদ। চক্ষু মুদিয়া এতক্ষণ কত কী ভাবিতে ছিলাম। রোদের আহবানে মুখ তুলিয়া বাহির পানে দৃষ্টি রাখিলাম। দেখিলাম, কাঁচা সোনার মতো রোদ্দুরের সহিত বাহিরের সার্বিকতায় কী তীব্র বিষন্নতা। আজ কী হেতু যেন সংগীতযন্ত্রটাতে চৌরাশিয়া মহাশয়ের বাঁশি শুনিতেছিলাম। সব মিলাইয়া কর্মস্থলে একাকী যাত্রাপথের আজিকার সময়টুকু আরও ভারী হইয়া উঠিল। নিজ জীবন ও পৃথিবীকে একখানা অন্তিম পত্র লিখিয়া যাইবার মনোষ্কামনা তো অনেকদিন হইতেই ছিল। খালি কিঞ্চিত দুর্ভাবনায় রহিয়াছিলাম, যে, অত্র বর্ষের বাকি কয়েকটা দিন পাইব কিনা। আজিকার প্রভাত রাগ তাহাকে উস্কাইয়া দিল। তাহাতে দোয়াত কলম নহে, কী-প্যাডে হাত রাখিলাম। যদিও তুমি হয়তো বুঝিয়া থাকিবে, গত তিনটি বর্ষে লিখিবার কালি ক্রমাগত শুকাইয়া গিয়াছে। মরা গাছ হইতে তো আর নয়া পত্র পল্লব কামনা করা যাইবে না। আমার একদার পৃথিবী, পৃথিবী ও জীবন তাহাদের লাগিয়া অত্যন্ত সংশয়ের, যাহারা জটিল ও সুক্ষ্ণ চিন্তাধারার মানুষ। এই যে, চারিধারের কামানা-পাকানা-খানা-পাখানা সদৃশ আটপৌড়ে গড়পড়তা মনুষ্য জীবন, তাহা যদিও জীবনের উত্থান পতনে তেমন করিয়া আলোড়িত হয় না। এত কিছু ভাবিলে তাহার চলে না। কিন্তু উহার মধ্যিখানেও কিছু কিছু মনুষ্য বিদ্যমান রহিয়াছে, যাহারা ঈশ্বরের ‘স্টক’ ভান্ডারের আদম হইবেন হয়তো। যাহাদের জীবন ও জগতের গন্ডীখানা সূক্ষ্ণতার ঘেরাটোপে বাঁধানো। তাহাতেই তাহাদের আনন্দ। আবার উহাই তাহাদের কন্টক অরি। প্রিয় জীবন, তুমি আমাকে কতটা ভালো বাসিয়াছিলে জানি না। তোমাকে ভালোবাসিতে আমি কিঞ্চিতমাত্র ত্রূটি করি নাই। হয়তো আপনার চাইতেও বেশি বাসিয়াছি। তাহার প্রতিদান অবশ্য ভালই পাইয়াছি। না, শুনিয়াছি প্রতিদান কামনা নাকি মহামানবদের সাজে না। তা, আমি তো মহামানব নহি। নিতান্তই খাটিয়া খাওয়া কেরানী। তায় আবার এই বঙ্গ ভূখন্ডের জল, কাদা, আলো হাওয়ায় বাড়িয়া ওঠা ভেতো বাঙালি। তাই কী দিলাম, আর কী হারাইলাম-উহার অপচিন্তা মন হইতে একেবারে ঝাড়িয়া ফেলিবার মতো অতিমানব আজিও হইয়া উঠিতে পারি নাই। জীবনে চাওয়া ও পাওয়ার হিসাবখানা যখন বাড়াবাড়ি রকমের বৈষম্যপূর্ন হইয়া ওঠে, তখন দেবতারও মন টলিতে বাধ্য। অপেক্ষাই যেখানে মানবের সয় না, উপেক্ষা তো সইবেই না তার অন্তরে। বিশেষত আপনার লোকের নিকট হইতে সে যখন দ্বারে দ্বারে প্রত্যাখ্যাত ও হতবুদ্ধি হইতে থাকে, তাহার অবাক হইবার ক্ষমতাও লোপ পাইবে। প্রিয় পৃথিবী, আশা করিতেছি, এই জগদ্দল পাথরের মতো জীবন আর বেশিদিন বহিয়া বেড়াইতে হইবে না। জগত ও প্রকৃতির নিজস্ব গতিধারা কাহাকেও এত কাল ধরিয়া এতখানি অবাঞ্চিত অবস্থায় বাঁচাইয়া মৃত্তিকার ওজন বাড়াইতে দেয়ও না। আর তাই, জীবনবাবুর অন্তিমযাত্রার শকটখানা অচীরেই গমনপথে দেখিতে পাইবে-এই ভরসা দিয়া রাখিলাম। বেশিকাল আর তাহার বিষাক্ত দীর্ঘশ্বাস এই পরিত্যক্ত জীবনের চার দেয়ালকে দূষিত করিতে পারিবে না। আমি তাহার আগমন ধ্বনি শুনিতে পাই দিবা নিশী। শুনি তাহাদের ফিসফিস। সময় বুঝি সত্যই ঘনাইয়া আসিল। নাড়ি ছিড়িয়া চারিটি দশক পূর্বে যেই মানব জনমের শুরু; স্নেহ, ভালোবাসা, সম্মান, আবেগের নাড়ি ছিড়িয়া আজ তাহার যে আঁধার বাস-এইবার তাহাকে অব্যাহতি দিতে ঈশ্বরের আজ্ঞা হইয়াছে। আমার প্রিয় জীবন ও পৃথিবী, আমি তোমাদের উভয়কে খুব করিয়া ভালোবাসিয়াছিলাম। তোমাদের সাথে রহিবার, চলিবার বাসনা আমার বরাবরই সুতীব্র রহিয়াছিল। কিন্তু সময় ও বাস্তবতা তাহাকে স্থায়ী হইতে দিল না। আফসোস নাহি। এক জীবনে বিধাতা সবকিছুতো দিবেন না। যাহা দিয়াছেন, তাহাতেই শুকরিয়া। যাহা পাইলাম না, তাহার জন্য আক্ষেপ নাহি। যাহা দিয়াছি, তাহার জন্যও। যাহা পাইয়াছি-তাহার জন্য অবশ্য একখানা প্রনাম রাখিয়া গেলাম। তোমাদের সাথে যেইদিন হইতে পরিচয়, সেই দিন হইতে আজি পর্যন্ত যাহা কিছু দু’হাত ভরিয়া দিয়াছ, বিশেষ করিয়া বিগত কিছু বৎসরের দান আমি ওপাড়েও ভুলিতে পারিব না। বিধাতার পরম দান মনে করিয়া তাহা মাথায় করিয়া রাখিব। কোনো অভিমান লইয়া যাইতেছি না। কোনো অনুযোগও নহে। অপ্রাপ্তি রহিয়াছে বেশুমার, কিন্তু তাহার লাগিয়া কোনো রোদন করিব না। ঈশ্বরের মনোবাসনা হয়তো ইহাই ছিল। তাহার বিরুদ্ধে নালিশ করিয়া পরের জনমকেও বিপদগ্রস্থ করিয়া কী লাভ? তাই না? শুনিয়াছি, মনুষ্য শব ব্যবচ্ছেদ করিয়া নাকি শল্যবিদগন তাহার মৃত্যুর হেতু উদঘাটন করিতে পারেন। জীবন থাকিতে তো তুমি ও তোমরা জানিতে চাহিলে না, কী এক নিদারুন অভিমানে একটি ক্ষুদ্র মানবের জীবন তুমি, তোমরা, তাহারা, বন্ধু, বান্ধব, স্বজন, দূর্জন-চারিদিকের কতজনের ওপরে বিষম হতাশা লইয়া একাকী বদ্ধ ঘরে লুকাইয়া ছিল এতকাল। অন্তিম শয়ানে শায়িত হইলে যদি সংবাদ পাও, তাহা হইলে শল্যবীদদের সহায়তা লইয়া ঘাঁটিয়া দেখিতে পারো, কী রহিয়াছিল তাহার বলার মতো। আমার ফুসফুসের জমানো বিষাক্ত বাতাস বিশ্লেষণ করিলেই চিকিৎসকগণ বুঝিতে পারিবেন, তাহাতে জমানো রহিয়াছিল কত কথার ফিসফিস। জীবনে তো পড়িতে চাহিলে না। মরনে চেষ্টা করিয়া দেখিতে পারো। জীবন সায়াহ্নে জীবনের কাছে আমার কালো কালির পত্রে কত কথাই লিখিতে চাহিয়াছিলাম। আজি তাহা সব মনে পড়িতেছে না। দুঃখ কেবলই এতটুকুই রহিবে, যে, যাইবার কালেও জীবনের এই পরিণতির কোনো কারন জানিয়া যাইতে পারিলাম না। আমার একদার পৃথিবীর আমার লাগিয়া জমানো এত অভিমান আর ক্ষেদের রহস্য উন্মোচিত হইল না। জানা হইল না জীবনের রঙ বদলানোর রহস্য। যাহা হউক, কিছু রহস্য থাকুক অবগুন্ঠনের আড়ালে। বিপুলা এই পৃথিবীর কতটুকু জানি? জীবন এইখানে, কেবলই মৃত্যুর হাতছানি। তবুও লইও আমার অন্তিম শুভ নববর্ষ খানি।

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-২০: #past #legacy #continuation #consistency

অতীতে অবগাহন, ধারাবাহিক অবনমন: যেমন করিয়াই কহি না কেন, ধারাবাহিকতা জীবনের একখানা খুবই গুরুত্ববহ বিষয়। যাহাই আপনি করিয়া থাকুন না কেন, তাহার ক্রমাগত চর্চা ও ধারন একান্তই জরুরী। চাই তাহা সু বা কূ-যেই প্রবৃত্তিই হউক। এইখানে প্রশ্নটা নৈতিকতার নহে, বিষয়টা কাবেলিয়াতের। এই যেমন ধরুন, আপনি যাহা ভাবিয়া থাকেন, যাহা বিশ্বাস করিয়া থাকেন, যাহা বলিয়া থাকেন, কিংবা যাহা আপনি করিয়া থাকেন, আমাদিগের ছোটলোকের ভাষায় যাহাকে বলা চলে, “ভদ্দরনোকের এক কথা”-তাহাদের ক্ষেত্রে কি আপনি করিয়া থাকেন? যদিও জানা নাই, ভদ্দরনোকগন এক কথা আদৌ কহিয়া থাকেন কিনা। আমার দুর্ভাগ্য হইল, এক কথার ভদ্দরনোক খুব কমই দেখিয়াছি। অবশ্য আমি নিজেও যে খুব একখানা এক কথার মানুষ, তাহা নিশ্চয় নহে। নিজেই নিজেকে দেয়া কথা রাখিতে পারি না। তায় আবার অন্যে। যেমন মনে করুন, নিজেকে বহুবার কহিয়াছি, ওহে অর্বাচীন, নিজেকে কখনো অন্যের চিন্তা, কথা আর কর্মের উপরে ছাড়িয়া দিও না। নিজের চিন্তার গতি আর জীবনবোধকে অন্যের কথা বা কাজ দ্বারা প্রভাবিত হইতে দিও না। কিন্তু তাহা ওই বলা পর্যন্তই। আসলেই কি আমরা পারিপার্শ্বিকতার প্রভাব হইতে উদাস অর্থাৎ ইংরেজিতে যাহাকে বলে ‘ইনডিফারেন্ট’, তাহা হইতে পারি? পারি না। চাহি বা না চাহি, মন, মানসিকতা আর চিন্তা প্রভাবিত হইবেই হইবে। তাই উহা লইয়া আর ভাবি না। তাহার চাইতে বরং অন্য কথা বলি। গতকল্য জনৈক সুহৃদের একখানা লেখা পড়িতেছিলাম। যখন পড়িয়াছি, তখন বিষয়টা ততখানি মনে প্রভাব না রাখিলেও কল্য হইতে বিষয়খানা মনের মধ্যে বিরাজ করিতেছে। ভদ্দরলোক আমাদের তথাকথিত ট্যাবু, সামাজিক প্রথা আর ধারাবাহিকভাবে ভুলের চর্চার একটি দিক লইয়া লিখিয়াছেন। আমি খুব আশ্চর্য হইয়া ভাবিতে বসিলাম, তাহাই তো! তিনি তো সত্যই কহিয়াছেন। আমাদিগকে শিশুকাল হইতেই শিখানো হইয়াছে, বাম হস্তকে ঘৃনা করিতে। উহাকে ব্রাত্য ভাবিতে। আর তাহাতেই বড় হইয়া আমরা যেকোনো কার্যে বাম হস্তের ব্যবহারকে আদাবের খেলাপ বলিয়া বিশ্বাস করিতে শিখিয়াছি। এমনকি যেকোনো কর্ম ভন্ডূল হইবার লাগিয়াও বাম হস্তকে দায়ী করিয়া বলা হয়, কর্মে বাম হস্ত প্রদান করিও না। যাহাই হউক, অদ্য বাম হস্ত আমার আলোচ্য বস্তু নহে। যাহা কহিতে চাহিতেছি, তাহা হইল, আমাদের চিন্তা, বিশ্বাস, জীবনবোধ, জ্ঞান, যুক্তি-এই সবই এক প্রকার বায়াজড ও সংস্কারের নামান্তর। কহিতে পারেন, কীভাবে? ভাবিয়া দেখুন, আপনার জন্ম, জন্মস্থান, শিক্ষালয়, শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষক, পরিবেশ, শৈশবকাল, পরিবার, পারিপার্শ্বিকতা, বন্ধু, বান্ধব, পিতামাতা, জীবনধারা-ইহাদিগের কথা, কাজ, শিক্ষা আর প্রভাব কি আপনাকে আজিকার আপনিতে পরিণত করে নাই? অতঃপর আপনার কাছে তো মনে হইতেই পারে, আপনি যাহা ভাবেন, তাহাই সত্য। তাহাই সঠিক, তাহাই হইবার ছিল। এই আপনি যদি বৃটিষ রাজের বিলাতে জন্মিতেন, তাহা হইলে আপনার কাছে লর্ড ক্লাইভকে বীর পুঙ্গব মনে হইত। যাহাকে আজিকে আপনার দুর্বৃত্ত মনে হয়। আমরিকায় জন্মিলে আপনার কাছে ট্রাম্প বাবাজির বালখিল্যতা মুগ্ধ করিলেও হয়তো করিতে পারিত। অথচ এই বঙ্গদেশে বসিয়া আপনার উহাকে ভাড় ছাড়া কিছুই মনে হইতেছে না। আসলে আমরা মানুষেরা বড়ই বায়াজড এক জাতি। আমরা পদে পদে বায়াজড হই। কখনো নিজের অজান্তে। কখনো নিজেদের স্বার্থে বা ইচ্ছায়ও। একইসাথে আমরা জাজমেন্টাল আর ক্ষণলুপ্ত স্মৃতির। খুব দ্রূতই আমরা অতীত ভুলিয়া যাই। ভুলিয়া যাই ক্ষণিক আগের কথাও। ভুলিয়া যাই নিজেকে, নিজের অতীতকে, নিজের অতীত অবস্থানকে। ওই একই-ধারাবাহিকতার অনুপস্থিতি। তবে তাহা লইয়া আর দুঃখ করি না। ধারাবাহিকতা নাই বলিয়াই আপনজনের মৃত্যুর শোক প্রথমদিন, দ্বিতীয়দিন যেমন থাকে, তাহা তৃতীয় দিনের দিন জিলাপী খাইয়া ধুইয়া ফেলিতে আমাদের আর কষ্ট পাইতে হয় না। সবই ঈশ্বরের খেলা। তাই বলি কি, কোনো কিছুর ধারাবাহিকতা না দেখিলে দুঃখ পাইবেন না। খুব বেশি ভারাক্রান্ত হইবেন না। অতীত বন্ধুকে আজ শত্রূ হইতে দেখিলেও না।  নিজের একদা শত্রূকে বন্ধু বলিয়া বুকে টানিয়া নিতে বাধ্য হইয়া থাকিলেও নিজের প্রতি নিজে বেশি আশ্চর্যান্বিত হইবেন না। নিজের পরিচীত অতীতের সহিত নিজেকে মিলাইতে না পারিলেও আহত হইবেন না। ধারাবাহিক হইতে হইবেই-ঈশ্বর এমন কোনো মাথার কিরা মানবের লাগিয়া আবশ্যক করেন নাই। নিজেকে নতুন নতুন রূপে তাই ইচ্ছামাফিক গড়ুন, ভাঙুন। নতুন নতুন রূপে নিজেকে আবিষ্কার করুন। নির্দ্বিধায়, নিঃসঙ্কোচে। তবে কিনা, কোন ভদ্দরনোক জানি কহিয়াছিল, সত্য কথা কহিবার সবচাইতে বড় সুবিধা হইল, আপনাকে মনে রাখিতে হয় না, অতীতে ওই বিষয়ে কী কহিয়াছিলেন। ধারাবাহিকতা চাহিলে সত্য বলুন। না চাহিলে মিথ্যা। আপনি স্বাধীন মানব সন্তান। কে আপনাকে আটকাইয়া রাখিবে? নিজে মিথ্যা কহিলেও না। অন্যের মিথ্যায় কান দিয়া প্রলয় বাঁধাইলেও না। কত মিথ্যাই তো আপনার আমার চারিপার্শ্বে বিরাজমান। কত মিথ্যার ভিতর দিয়াই তো আমি আপনি জগত সংসার পার করিতেছি। বিশ্বাস না হইলে নিজেকে শুধাইয়া দেখুন, সে কী বলে। জানিতে চাহুন নিজের কাছে-তুমি কি নিজে কোনো মিথ্যা বলো না? তৃমি যাহা অন্যের বিষয়ে বিশ্বাস করো, তাহা কি তুমি নিজেই আত্মস্থ করিয়া দিব্যি অভিনয় করিয়া যাইতেছ না? থামিও না। অভিনয় চালাইয়া যাও। অভিনয়ের নিমিত্তেই ঈশ্বর তোমায় সৃজিয়াছেন। লেখনি বড় হইয়া যাইতেছে। একটু অতীতের চর্বিত চর্বণ করিয়া শেষ করি। ইদানিং TRP কমিয়া যাইতেছে। পাঠক মুখ ফিরাইয়া লইতেছে। তাই এই চর্বিত চর্বনের আশ্রয় লওয়া। না পড়িয়া থাকিলে পড়িয়েন। কেহ ভাল থাকিবার অভিনয় করে। কেহ ভাল থাকিবার লাগিয়া অভিনয় করে। কেহ ভাল সাজিবার অভিনয় করে। কেহ ভাল সাজাইবার লাগিয়া অভিনয় করে। কেহ ভাল হইবার অভিনয় করে, কেহ ভাল করিবার অভিনয় করে। কেহ ভালোবাসার অভিনয় করে। কেহ ভালোবাসিয়া অভিনয় করে। কেহ ভাল হইয়া অভিনয় করে। কেহ ভালমানুষির অভিনয় করে। কেহ ভাল অভিনয় করে। কেহ ভাল’র অভিনয় করে। শীত কিন্তু চলিয়া যায় নাই। সে চলিয়া যাইবার অভিনয় করিতেছে। সাধু সাবধান। শুককুর বার ভাল কাটুক।

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-২১: #forgive #pardon #compromise

জীবনের গল্প। আছে বাকি অল্প। যা কিছু বলার নাও বলে নাও। যা কিছু দেখার নাও দেখে নাও।পাবে না সময় আর হয়তো।মৃত্যু ভয় কাউকে সবসময় তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ানোর কী যেন একটা পোষাকী নাম আছে। মনে করতে পারছি না। সেই আতঙ্ক মাথায় নিয়ে জীবনের কিছু কিছু কাজ গুছিয়ে করে ফেলার একটি ছোট্ট তালিকা মাথার মধ্যে আছে। তার ভিতরেই একটি করে ফেললাম আজ। নাটুকে মনে হলেও কাজটি করলাম। কাজটি অনেক দিন ধরে করব করব করে করা হয়নি। অথচ করাটা ভিষন দরকার ছিল। কাজটা করে ফেলে নিজেকে খুব হালকা লাগছে। খুব বড় কিছু না। মাকে ফোন করেছি। তার সাথে নানারকম কথা বলার পরে তাকে খুব ফরমালি তবে মন হতে বললাম, “মা, নিশ্চই তোমাকে অসংখ্যবার অনেকভাবে আঘাত করেছি, আহত করেছি। ক্ষমা করে দিও।” আমার আগের দিনের মা ফেসবুক বোঝেন না। এসব দিবস, ফরমাল কথা হয়তো বোঝেন না। কিন্তু, আমার মনের টানটুকু তো তিনি বোঝেন। সেই টানটাই তাকে টানবে। আমার আন্তরিক ক্ষমাপ্রার্থনার সুর তাকে নিশ্চই ছুঁয়ে দেবে। তালিকায় আরও কিছু কাজ বাকি। সেগুলোতে এবার মন দিতেই হবে। জীবনের পাখা মেলার প্রস্তুতি দীর্ঘ ৯ মাস ধরে চলে। অথচ তার অবসান ঘটে একদমই আচানক। বিদ্যুৎ গতিতে। মাঝে মাঝে ভাবি, মানুষ যদি প্রাকৃতিক নিয়মে মৃত্যুর ঠিক ২৪ ঘন্টা আগে কোনো সংকেত পেত মৃত্যুঘন্টা বাজবার বিষয়ে, তাহলে সে কী করত? আমাদের গ্রাম দেশে কারো মৃত্যু হলে জানাযার আগে দিয়ে একজন দায়ীত্বশীল ব্যক্তি উপস্থিত জনতাকে জিজ্ঞেস করে নেন, কারও কাছে মৃতের কোনো ঋন ছিল কিনা-যা শোধ করা হবে এবং কাউকে তিনি কখনো কষ্ট দিয়ে থাকলে তা মাফ করে দিতে। যদিও খুব বিরল খুব ঘটনা ব্যতিত মানুষ এমনিতেই তার দাবী নিয়ে কখনো হয়তো আসেনি। আবার হ্যা, পাওনার অঙ্কটা বিশাল হলে যে একেবারেই তা করেনি-তাও নয়। তো যা বলছিলাম। এই কাজকে বলে দাবী ছাড়ানো। কে কতটা মন হতে ছাড়েন আর ছাড়েন না-সেই তর্কে না গিয়ে একটা বিষয় বলি। নিজেই নিজের দাবী ছাড়িয়ে রাখুন। সত্যিকার অর্থেই। মৃত্যুদূত আসার আগেই। সেই দাবী যেই দাবীই হোক। ভালোবাসার দাবীও কিন্তু বড় দাবী। জানি না, সেই দাবীর দায় মেটাতে পেরেছি কিনা। চেষ্টা নিশ্চই করেছি। তাই বলছিলাম, দাবী সৃষ্টি হতেই না দিন। আর যা কিছু জানা অজানা দাবী, দেনা, পাওনা ও মানুষের মনোঃকষ্ট-সেটাও না হয় আজই মিটিয়ে নিন। স্যরি বলে নিন। মন হতে। বলা যায় না, কাল হয়তো আমি চাইব, কিন্তু সুযোগ হবে না।আজ হয়তো মন তরল, কাল নাও থাকতে পারে। আমরা মানুষেরা অনেক বিশাল বিশাল কাজও অবলীলায় করে ফেলি। কথায় কথায় এমনকি মানুষ খুন করে ফেলি। কিন্তু ‘ক্ষমা করে দাও’-এই সামান্য তিনটি শব্দ উচ্চারন করতে আমাদের জিহবা অসাড় হয়ে আসে, গায়ে ঘাম দিয়ে জ্বর হয়, ঠোট নড়ে না, মন ওঠে না। আমাদের অমোঘ জেদ, আত্মম্ভরিতা আর অদ্ভূৎ আত্মসম্মানবোধ আমাদের আটকে রাখে। সে কানে কানে ফিসফিস করে বলে, না, স্যরি বললে তুমি ছোট হয়ে যাবে। আর স্যরিটা যদি বলতে হয় কোনো জুনিয়রকে বা বন্ধুকে, তাহলে তো কথাই নেই। এই দেশে নাকি বড়রা ছোটদের স্যরি বলার নিয়ম নেই। তারা গুরুজন। অবশ্য এই দেশে বড়রা কোনো অন্যায় করেন-সেটাই স্বীকৃত নয়। হ্যা, বিপরীত দিকের লোকটিও যে আপনার আন্তরিক স্যরি’র মর্ম বোঝেন বা সেটাকে সহাস্যে মেনে নেন-তা অবশ্য নয়। অধিকাংশ সময়ই আমাদের জেদ ও ক্রোধ আমাদেরকে স্যরি বলা কিংবা স্যরিকে গ্রহন করা-দুটোতেই বাঁধ সাধে। ফলে দাবী আর মেটানো হয়ে ওঠে না। এমন করেই একদিন সময় ফুরিয়ে জীবনের শেষ ঘন্টা বাজে। মৃত্যুর ঠিক শেষ মুহূর্তটিতে একজন মুমুর্ষূ ব্যক্তি ঠিক এই না বলা কথাটি বলে যেতে, নাকি দুনিয়া হতে যেতে অসম্মতি জানিয়ে এতটা অাকুল হন, সেটা অবশ্য জানার উপায় নেই। যা কিছু বলার-বলে ফেলুন, যেখানে ক্ষমা চাইবার-চেয়ে নিন, যা কিছু ক্ষমা করে দেবার-করে দিন। যেটুকু দায় স্বীকার করে যাবার-আজই করে নিন। যাকে ভালোবাসেন-তাকে বলে ফেলুন। যতটা ভালো কাল বাসবেন, তা আজই বাসুন। মরে গেলে ভালোবাসা ও ঘুনা-দুটোই বেকার। আমি কি আপনাকে কখনো আঘাত করেছিলাম? হয়তো করেছি। আমার কাছ থেকে কি কখনো আহত হয়েছেন? হয়তো হয়েছেন। আমাকে ঘৃনা করেন? আমাকে অভিশাপ দেন?আপনার কাছে আমার আছে কি কোনো ঋন?কখনো কি ক্ষমা চেয়েছি আমি? চাই বা না চাই, আজ বলছি, ক্ষমা করে দিন। সবকিছু। এই শুককুরবারে একটাই কথা বলছি-Say sorry, whether or not, you worth it.

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-২২: #humanity #racism #communal #equality

”জগত জুড়িয়া এক জাতি আছে, সে জাতির নাম মানুষ জাতি।

একই পৃথিবীর স্তন্যে লালিত,একই রবি শশি মোদের সাথী।”

আমাকে কেউ যখনই জিজ্ঞেস করেন, “কেমন আছেন?” আমি একটা হেয়ালী সূচক উত্তর দিই, “জ্বি, আছি আগের মতোই।” যদিও এই আমি আপনি আমরা কখনোই আগের মতো থাকি না। আমি তো অন্তত মোটেই আগের মতো নেই। আগের মানসিকতা, আগের জীবনবোধ, আগের দৃষ্টিভঙ্গি-সব নতুন করে গড়ে নিতে হচ্ছে। কারনটা উহ্য থাক।কয়েকদিন আগে খুব জ্বর হল। যাকে বলে দরোজা দালান ভাঙা জ্বর। একাদিক্রমে ৫ দিন জ্বর তার রাম রাজত্ব চালিয়েছে আমার উপরে। কড়া ডোজের সব ঔষধ খেয়ে জ্বরটাকে আপাতত ঘায়েল করে দু’পায়ে দাড়াবার বন্দোবস্ত হয়েছে। জ্বরের হলাহলের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন অংশটা হল ডিলেরিয়াম বা প্রলাপ। ডিলেরিয়াম পর্যায়ে সম্ভবত মানুষের সেন্স ও নার্ভাস সিস্টেম অচল হয়ে যায়। এক হিলুসিনেশনের জগতে উড়তে থাকে ভাবনারা। জ্বরের হিলুসিনেশনে অনেক নতুন পুরোনো স্মৃতি আর মানুষের সাথে এক কাল্পনিক বোঝাপড়া করে নিয়েছি। ভালই হয়েছে। বাস্তবে যাদের সাথে হয়তো ওই বোঝাপড়াটা করতে চাই, কিন্তু পারি না। আসলে আমরা চাইলেও অনেক কিছু পারি না। মুখ ফুটে বলতে পারি না। জীবনে কত মানুষকে কত কথা বলতে চেয়েছি। কিন্তু বলতে গেলেই জিহবা দলা পাকিয়ে জড়িয়ে যায়। অনেকেই কিন্তু তা নন। দিব্যি ঠোটকাচার মতো, যা বলতে চান, টক টক করে বলে ফেলেন। আসলে নিজের কথাটা বলে ফেলতে পারাটা বেশ বাপকা বেটার কাজ। সবাই তা পারে না। তাই বাঙালির বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না। বাঙালি নাকি মুখচোরা। মনের কথাটা গুছিয়ে বলতে পারি না বিধায় লেখার অভ্যাসটা হয়েছে। তাই কথা বলায় আমি জড়ভরত। লেখায় রবীন্দ্রনাথ না হলেও অন্তত কাজ চালাবার মতো লিখতে পারি। যদিও সেই ছাইপাশ লেখার পাঠক কখনো দেড় ডজনের বেশি ওঠে না। সুতরাং লেখক হিসেবে আমার বাজার কাটতি ওই দেড় ডজন মানুষই। তারাই আমার পরম নমস্যঃ। যেমনটা নমস্যঃ সেই ভারতীয় মানুষেরা, যারা চলমান দাঙ্গার ভেতরেও নিজ নিজ ধর্মীয় জাতের পরিচয়ের উর্দ্ধে উঠে, নিজ সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে সংখ্যালঘু ও নির্যাতিতদের পক্ষে কিছু না কিছু করেছেন। আশ্রয়, নিরাপত্তা, সাহায্য দিয়েছেন। ধর্ম, জাত, পাত, সংখ্যাগুরুত্ব, সংখ্যালঘুত্ব এই উপমহাদেশের মানুষদের প্রিয় বিভাজন। আমরা মানুষকে মানুষ হিসেবে কম দেখি, অমুক ঈশ্বরের পূজক হিসেবে বেশি দেখি। ভারতের নমস্য মানুষদের মতো এই দেশেও অমন মহামানব অনেক আছেন, যাদের চোখে সব মানুষ ঈশ্বরের সমান সৃষ্টি। কখনো কখনো আমার মনে হয়, আমরা প্রচন্ড সাম্প্রদায়িক। আবার কখনো কখনো মনে হয়, না, আমাদের মধ্যে অসাম্প্রদায়িক বিশ্বাসের মানুষই বেশি। সত্যিটা যেমনই হোক, আমি কামনা করি, বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া, প্রাচ্য, পাশ্চাত্য-সবখানে মানুষ মানুষকে ‘মানুষ’ হিসেবে দেখতে শিখুক, মানুষ হিসেবে সবাইকে ভাবতে ভালোবাসুক।ঈশ্বরের কোনো জাত পাত নেই, তার নেই কোনো বিশেষ ধর্ম, বিশেষ পরিচয়। তিনি কোনো একক বিশ্বাসের ঈশ্বর নন। তিনি সবার। যার যেমন বিশ্বাস, সে তাকে সেইভাবে ডেকে, বন্দেগী করে খুশি হয়, তৃপ্ত হয়। জগতের সাতশো কোটি মানুষ কত পথ, কত মতে সেই একই ঈশ্বরকে ডাকে, তার ভঞ্জন করে। ঈশ্বরের তাতে কোনো সমস্যা নেই। অথচ সেই একক অভিন্ন ঈশ্বরের বান্দারা কেন নিজেদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের দাবীদার হয়ে রক্তের হোলিখেলায় মাতে-জানি না। মানুষ নিজের চোখের পেছনে কী হয়, তাই জানে না, অথচ সেই মানুষই অদেখা অজানা আধ্যাত্মিক জগতের ঈশ্বরের সত্যাসত্য বিচার করে ফেলে নিজের মতো-এ এক মহা আহাম্মকি। মন ভাল নেই। জগতের যেকোনো দেশেই হোক, দুনিয়ার যে প্রান্তেই হোক, ’মানুষ’ নামক ঈশ্বরের ভূমিপুত্ররা নিজেদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে হারলে বা জিতলে-উভয় ক্ষেত্রেই সেটা হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়। সবাই নিজেকে ঈশ্বরের একমাত্র বৈধ প্রতিনিধি ভেবে অবৈধদের নিপাতে নামলে পৃথিবী হবে রক্তের বাসর। নিশ্চই আমরা সেটা চাই না। আমার মতো ক্ষুদ্রের দোয়ায়, কামনায় জগতের হয়তো কিছু আসে যায় না। তবু কামনা করি, শুভ বুদ্ধির উদয় হোক। শান্তিপ্রিয় সাধারন মানুষগুলোকে নিজ নিজ ক্রূঢ় স্বার্থের ঘুঁটি বানাতে রাজনীতিবীদ ও রাজপুরোহিতরা যে রক্তের খেলায় মেতেছেন, আজ ভারতে, তো কাল পাকিস্তানে, হয়তো নেপালে, কখনো তা বাংলাদেশে-থামুক এই রক্তের হোলি। রক্তপিপাসু, ক্ষমতালিপ্সু রাজনীতিকদের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক। একই আদম হাওয়ার সন্তানদের ভিতরে কূট কৌশলে প্রোথিত বিভেদের ধারা নিঃশেষিত হোক। শুভ সপ্তাহান্ত। 

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-২৩: #obsolete #obscure  #lowercast #abandoned #defame #isolated #সমাজচ্যুত #একঘরে

ব্রাত্য দর্শন: বাল্যকালে বইয়ে, বিদ্যালয়ে, গুরুগৃহে আমাদিগকে বিদ্যাদান ও পাঠদান করা হইত। নিজেরা ভাবিতাম, বয়জেষ্ঠ ও মুরব্বীরা বিশ্বাস করিতেন, উহারা সুশিক্ষিত হইতেছে। আমাদিগকে বিদ্যালয়ে শিখানো হইত, ‘মানুষ সামাজিক জীব।’ এতবড় মিথ্যা বাল্যকালে ধরিতে না পারিলেও মধ্যবয়সে আসিয়া তাহা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করি। মানুষ আসলে কোনকালে সামাজিক আছিল? সমাজের নিষ্ঠূর ও একপেশে নিদান মানিতে অস্বীকৃত হইলেই যেই সমাজ কাহাকেও সামান্যতম রেয়াত না দিয়া উহাকে একঘরে করে, উহাকে উঠিতে বসিতে পীড়ন করিয়া ক্রমান্বয়ে মানব জনম সাঙ্গ করিবার সব বিলিব্যবস্থা সমাজ নিজ দায়ীত্বে সম্পন্ন করে, তাহাকে আমি সমাজ বলিব কোন মুখে? কোনকালে সে পরের বিপদে, পরের আপদে, পরের মঙ্গলে জীবন উৎসর্গ করিয়া অভ্যস্ত? কোন মনিষী যেন কহিয়াছিলেন, “অতি নিকটজন বা আপনজনের চরম বিপদ দেখিবার মতো সুখ বাঙালি আর কিছুতেই পায় না।” আপনাদের কি বিলাসী ও মৃত্যুঞ্জয়কে মনে পড়ে? সেই যে, শরত বাবুর শ্রীকান্ত উপন্যাসের দুই চরিত্র? মৃত্যুঞ্জয় মরিয়াছিল সাপের কামড়ে। আর তাহারই শোকে, বিরহে বিলাসী কিছুকাল পরেই বিষপানে আত্মাহুতি দিয়াছিল। সমাজ, কিংবা ’তথাকথিত সমাজকে’ ট্যাকশো প্রদান না করিবার অপরাধে এই করুণ পরিণতি হইয়াছিল বেচারাদের। এই যামানায়ও বিলাসী ও মৃত্যুঞ্জয়দের দেখা চাহিলেই মিলিবে। নগরের কোনো এক গৃহকোণে হয়তো তাহাদের বাস। বইয়ের পাতায় যেই মৃত্যুঞ্জয় বিলাসীকে পড়িয়া আমরা অভ্যস্ত, তাহাদের সাথে কোনো অংশেই ইহাদের অমিল নাহি। বরং সর্ব দিক দিয়াই সমাজ তাহাদেরকে উচিত পাওনাটুকুু প্রতিনিয়তই কড়ায় গন্ডায় বুঝাইয়া দিতেছে। তাহারাও তাহা মাথা পাতিয়া মানিয়া লইতেছে। সমাজের চোখ রাঙানী, নিষেধের ঘেরাটোপ, দায়ীত্বের দাবড়ানি-সবই তাহাদের মাথা পাতিয়া নিরবে সম্পন্ন করিতে হইলেও তাহাদের মুক্তি নাহি। দিন শেষে তাহারা ব্রাত্যই। তাহাদের মুখ দেখাও পাপ। আহ বিলাসী! আহ মৃত্যুঞ্জয়! থাকুক তাহারা ব্রাত্য। সমাজের অপাংক্তেয় জীব অথচ ঠ্যাকায় বেঠ্যাকায় তাহাদের দরকার হইয়া পড়ে। বিধাতার এ এক রহস্যময় ভেদ। আজিকে শুককুরবার। বিলাসী আর মৃত্যুঞ্জয়কে একবার দেখিতে যাইব। চলতি মড়কের ধাক্কায় তাহারা মরিল নাকি বাঁচিল, তাহা ঈশ্বরই জানেন। মরিলে সৎকারও তো তাহাদের ভাগ্যে জুটিবার কথা নহে। বহুকাল হইয়াছে, তাহাদের দর্শন করি নাই। তাহার লাগিয়া অপরাধবোধ না হইলেও কিঞ্চিত লজ্জাবোধতো রহিয়াছেই। শত হউক, কোনো এক কালে তাহাদের নিকট হইতে কিঞ্চিত উপকার লইতে হইয়াছিল। তাহা ভুলিতে চেষ্টা করিয়াও ভুলিতে পারি না। হয়তো শরীরের অভ্যন্তরে বহমান রক্তের বর্ণ লাল বলিয়াই। আপনিও আমার সঙ্গ লইতে পারেন। উহাদের দর্শনে যাইতে। এই মরার দেশের প্রথা ভাঙিয়া চলিতে চাওয়া, ন্যায্য আর তিক্ত সত্য কহিয়া ব্রাত্য হওয়া বিলাসী মৃত্যুঞ্জয়কে গোপনে না হয় দেখিয়াই আসিলেন একবারের তরে। যাইবেন কি? এই শুককুরবারে? season/autumn/নগরে বসবাস  করে ঋতুর বদল মালুম হবার কোনো সুযোগ যদিও থাকে না। তবু হঠাৎ হঠাৎ সময় ও জীবন একটু ফুরসত দিলে ঋতুর কথা মনে হয় বৈকি। ঋতুদের মধ্যে শরত বড় বিচিত্র ঋতু। এ ঋতুটা যেন মানব জীবনেরই আরেক প্রতিচ্ছবি। বর্ষায় শুধু বৃষ্টি, গ্রীষ্মে কাঠফাটা গরম, শীতে রুক্ষ প্রকৃতি। কিন্তু, শরতেই একমাত্র রোদ, বৃষ্টি, গরম, ঠান্ডা, মেঘের লুকোচুরি। জীবনের মতোই। কখনো তাতে দুর্ভাগ্যের কালো মেঘ, কখনো তাতে সুখের দোলা, কখনো রোদেলা দিন তো কখনো ভারাক্রান্ত আকাশের মতো দুর্বহ দুশ্চিন্তার কালো রেখা। শরত তাই ভাল লাগে। জীবনের প্রতিচ্ছবিকে দেখতে পেয়ে। শরত বোধহয় আসি আসি করছে। আগের মতো পঞ্জিকা মেনে আসতে তার একটু কষ্ট হয়। ধরিত্রীর বয়স হয়েছে যে। নগরের নিষ্ঠূর বাস্তব হয়তো তাকে আসতে বাঁধা দেয়। এত কাব্যিকতা নগরের পোষায় না। কিন্তু তারপরও শরত আসে। এবছরও সে আসছে। বছরের শুরুতে যখন একটা মহাদুর্যোগ চোখ রাঙানো শুরু করল, তখন সত্যিই ভাবিনি, আরেকটা শরত দেখে যেতে পারব। বেঁচে আছি-সেটাই একটা বড় সৌভাগ্য। হাত বাড়িয়ে শরতের মিঠে রোদ নিতে পারছি-সেটাই বা কম কীসে। আজ শরতের একটা ছুটির দিন। মহামারি বলছে, ঘরে সেঁধিয়ে থাক। মুখ দেখো না পৃথিবীর। মন বলে, বেরিয়ে পড়ো। দু’চোখ ভরে দেখে নাও,আকাশের পেঁজা মেঘের ভেলাকে,কাঁশের বনে হাওয়ার মেলাকে। রোদ বৃষ্টির লুকোচুরিতে, মন খোলো অবাক দৃষ্টিতে। মনের দরজা খুলে নেমে এসো এ ধরনীর বুকে,চাপা দুঃখ নয়, মুক্তির নতুন সুখে। শুভস্যঃ সপ্তাহান্ত।

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-২৪: #tiredness #fatigue #busyness #engagement #meaningoflife #exhaustinglife

গত দেড় দশক ধরে চাকরি করে পেটের ভাত জোগাড় করি। চাকরিহীন ছিলাম না একদিনও। সুখের বিষয়। কিন্তু, এর একটা বিপরীত চিত্রও আছে। মাঝে মধ্যেই সেই দিকটা পেয়ে বসে আমাকে। না, ভাববেন না, যে, দুঃখ বিলাস করছি। বিষয়টা সত্যিই ভেবে দেখবার মতো। বিষয়টা হল, জীবনের গত ৫৪৭৫ টি দিন একটানা দিনের ১২ ঘন্টা চাকরি করা আর তার আগে/পরের প্রস্তুতিতে ব্যয় হয়েছে। কোনো বিরতি নেই, ছেদ নেই, অবসর নেই, সাময়িক থামা নেই। জীবনের একটানা ৫৪৭৫টি দিন, একই ছন্দে, একই তালে, একই চাপে, একই গতিতে, একই সুরে। সেই ৫৪৭৫ টি দিনের (মাঝে সাঝের সপ্তাহান্ত আর টুকটাক ছুটি বাদ দিলে) সকাল ৭ টা হতে রাত ৭ টা নিজের নয়, পুরোটাই চাকরির। ভেবে দেখুন তো, কর্পোরেটকে এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যে, সপ্তাহের ৬ টি দিন আপনার নিজের জন্য কিচ্ছু করার সুযোগ নেই। কেবল বাসা আর অফিস ছাড়া (টুকটাক আড্ডা বা গভীর রাতের দাওয়াত মেজবান বাদে)। এভাবেই আপনার নিজস্ব জীবন হয়ে গেছে ঘড়ি ধরা, পঞ্জিকায় বাঁধা। আপনার জীবনের অর্ধেকেরও বেশি ব্যয় হবে শুধু টাকা কামানোর পেছনে। থামবার সুযোগ নেই। জীবনের চাহিদা থামতে দেয় না। গ্রীষ্মের দুপুরগুলোতে ঘুম পাবে, বর্ষার প্রথম কদম দেখে মন উচাটন হবে, নিজেদের বিবাহবার্ষিকীতে ক্যাম্পাসের সবুজ ঘাসে বসে থাকতে মন চাইবে-কিচ্ছু করার নেই। কাজ আছে। চাপ আছে। লোভ আছে। ভবিষ্যত আছে। এ কোন ভবিষ্যতের পেছনে ছুটছি? আজ পর্যন্ত কেউ কি পেয়েছেন সেই বহুল আকাঙ্খিত ’ভবিষ্যতের’ দেখা? দিন দিন সমাজে কর্পোরেট যন্ত্রের পেষণে ন্যুজ্ব, ক্লান্ত, বিদ্ধস্ত কর্মী মানুষের দল বড় হচ্ছে। নিরবে। নিভৃতে। মানুষগুলো হারিয়ে ফেলছে নিজের জীবন। থামা চলবেনা, কম আয় করলে হবে না-কত কিছুর দেনা মিটাবার আছে। কত জায়গায় স্টাটাস বজায় রেখে চলার আছে। কী করে থামব? মরে যাবার আগে থামাথামি নেই। ক্লান্ত হবার সুযোগ নেই। ছুটে চলো ছুটিয়ে চলো। আমার হঠাৎ করে মনে হল, আমি ক্লান্ত। এই একটানা কাজ করে যাওয়ায় আমি ক্লান্ত। হয়তো অনেকেই এমন ক্লান্ত। কিন্তু কিছু করার নেই বলে সেই ক্লান্তিকে পাত্তা দেয় না। মনে এলেও মুখে আসে না। প্রতিটি পরিবারে চাকরিজীবি স্বামী বা স্ত্রীর একই অভিজ্ঞতা। আমার বিশ্বাস, মানুষকে যন্ত্র হয়ে যাওয়া হতে বাঁচাতে, মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ দক্ষতা ও মূল্যসংযোজনকে নিশ্চিত করতে দুটো সাহসী পরিবর্তন নিয়ে ভাববার ও বলবার সময় হয়তো পেরিয়ে যাচ্ছে। সেটা হল-হ্রাসকৃত কর্মঘন্টা আর অধিকতর সপ্তাহান্ত। সেই সাথে প্রতি বছরে অন্তত ১৫ টি দিন একটানা কাজ হতে দূরে থাকার ব্যবস্থা এবং একজন তুখোড় কর্মীর প্রতি ৫ বছর পরে চাকরি হতে কিছুদিনের জন্য অবসর পাওয়া বা অবসর নেবার মতো সমর্থ সৃষ্টি করা। ’গরীব দেশ’ বিচারে এই চিন্তা অতিকল্পনা বা অবাস্তব মনে হতে পারে। আমি নিজেও কখনো কখনো বলেছি, দু’দিনের সপ্তাহান্ত আমাদের জন্য বিলাসিতা। কিন্তু সেটা সমষ্টিক অর্থনীতির বানিজ্যিক বাস্তবতা। আমার ব্যাস্টিক জীবনে তার জের অনেক গভীরে। শুনতে হয়তো খুব অদ্ভূৎ ও অবাস্তব শোনাবে। কেউ কেউ এর ভিতরে আবার বিপ্লব বিপ্লব গন্ধ পাবেন। কিন্তু সত্য হল, মানুষ যন্ত্র নয়। মানুষ হল মানুষ-মন ও হুশের সমষ্টি। এই মানব মন ও তার মনোঃবিদ্যা খুব জটিল ও দূরহ। তাকে ক্যালকুলেটর আর এক্সেলের কঠিন কঠিন মাপকাঠি দিয়ে মাপলেই হয় না। মানুষকে নিয়ে ভাবতে হয় খুব সূক্ষ্ণভাবে, গভীর হতে, নানা প্রেক্ষিত হতে। মানুষকে মাপতে হবে মানুষের নিক্তিতে। আমি কায়মনবাক্যে প্রার্থনা করি, আমাদের এই স্টাটাসের দৌড়, এই জীবনকে গিলে খাবার দৌড় হতে মুক্তি পাক মানুষ। নিজেকে খুঁজে নেবার জানালা উন্মুক্ত হোক। আমরা যদি পারতাম সেই মূল মন্ত্রটাতে ফিরে যেতে-ক্যারিয়ারের জন্য জীবন নয়, জীবনের জন্য ক্যারিয়ার। উস্কানীমূলক শুভ সপ্তাহান্ত।

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-২৫: #truthandlie #delicacy #relativity #birthday

18 Sep 2020: মানুষ শেষ কবে সত্যিই সত্যি কথা বলত, আর মানুষ মানুষের সত্যিকারের সত্যি কথা সত্যি বলে বিশ্বাস করত-তা জানা তো সম্ভব না। তবে সেরকম একটা সময় নিশ্চয়ই ছিল। সময়টা এখন এমন হয়েছে, আপনি এক বুক গঙ্গাজলে দাড়িয়ে কিংবা ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়ে শপথ করলেও তা কেউ বিশ্বাস করবে না। প্রকাশ্যে করলেও মনে দ্বিধা, সংশয় থাকবে। এমনই এক অদ্ভূৎ সময়ে বাস করি আমরা। সত্য-মিথ্যার এক ধোঁয়াশায় ডুবে থেকে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে দোদুল্যমান থাকি নিত্যদিন। সত্যিকেও মিথ্যে মনে হয়। মিথ্যেটাকেই সত্যি বলে কখনো কখনো আকড়ে ধরতে মনে চায়। ঠিক যেমন ভালোবাসা, স্নেহ, সম্মান, শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতাবোধ, মুগ্ধতা, বিশ্বাস, ঘৃনা-এরকম আপেক্ষিক প্রপঞ্জগুলো। যা নদী ভাঙার মতো রোজ রূপ বদলায়।এই উদ্বায়ী ধারনাগুলো মনের গভীরে টুপ করে বসে থাকে আপেক্ষিক সময়ের অপেক্ষায়। আজ যেটা ভালোবাসা, কাল সেটাই ছলনা। আজ যেটা ঘৃনা, কাল তাকেই আবেগে আকড়ে ধরা। তবুও এর মাঝে জীবন চলে। জীবনের নিয়মে। আসলে এত জটিল  করে ভাবলে জীবন চলত না। আমরা গড়পড়তা একটা আটপৌড়ে জীবনবোধ নিয়েই জীবনটা কাটিয়ে দিই। এত এত কিছু নিয়ে ভাবলে আমাদের চলে না। ভাবলেই ভাবনা বাড়ে। জ্বালা বাড়ে। ”মানুষেরা আয়নার ওপাড়ে থাকা অনিশ্চিত সত্যের চেয়ে এপাড়ে থাকা নিশ্চিত মিথ্যে জীবনকে বেশি ভালোবাসতে ভালোবাসি।”তবু তার মাঝে কেউ কেউ ভাবে। জীবন নিয়ে ভাবে। জগতের সুক্ষ্ণ বোধগুলো নিয়ে ভাবে। গভীরতার চোরা স্রোত তাদেরকে ভাবায়। তাদের জন্য জীবনটা খুব কঠিন, জটিল। তবে তারা সেই জটিল জীবনকে ভালোবেসেই যাপন করেন। জটিলতা, অন্তর্দ্বান্দ্বিক টানাপোড়েন তাদের এক রহস্যময় মায়ায় আচ্ছন্ন করে রাখে। এ এক নেশা। কাঁচপোকার আগুনে ঝাপ দেবার নেশার মতো। আফিমের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকার চেয়ে এ নেশা খুব কম নয়। ভাবনাগুলো খুব এলোমেলো আজ। ভাবনার সাগর আজ তরঙ্গ বিক্ষুদ্ধ। তার স্থিরতার অপেক্ষায় আছি। ততক্ষণ ভাল থাকুন। সপ্তাহান্ত থাক বা না থাক, আপনাকে শুভ সপ্তাহান্ত। [মানুষ বদলায় তো। আমিও বদলাই। প্রতিনিয়ত বদলাই। এবারের নাড়িকাটা দিবসে নিজেকে নিজে উপহার হিসেবে একটা পুরো দিন ছুটি আর এই পদ্মগুলো এক পথ শিশুর কাছে থেকে উপহার নিয়েছি। [তবে তাকে মাত্র পঞ্চাশটি টাকা দিয়েছি।] ভুলে যাওয়া কোনো এক বিরল বর্ষে নাড়িকাটা দিবসে মায়ের সাথে ছিলাম। তিনি আমাকে কী যেন একটা খাইয়ে দিয়েছিলেন। বিধাতার দেয়া ওই বিরল মুহূর্তটি বোধহয় আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরনীয় ও আবেগের অন্যতম একটি মুহূর্ত। আরেকবার আমার সহকর্মীরা চারটি লাইন উপহার দিয়েছিলেন। ফেসবুক স্মৃতি হতে সেটা হঠাৎ জাতিষ্মরের মতো সামনে আসায় আপনাকে/আপনাদের সপ্তাহান্তের বিরক্তি হিসেবে শেয়ার করার লোভ সামলোনো গেল না। আমার এক সময়ের খুব প্রিয় ও ইর্ষার সহকর্মী (এখন সহকর্মী নেই, প্রিয়’র তালিকায় ঠিকই আছে।) তানভীর প্রতিবারের মতো এবারও তার প্রিয় খোঁচাটা দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছে (আমি নাকি মুখে যা ই বলি, মনে মনে মিস পারুকে না চাইলেও মনে মনে জন্মদিনের উপচানো পাবলিক রেসপন্স নাকি আমি উপভোগ ঠিকই করি আর তার জন্য আগাম গণ-উত্তর লিখে রাখি একমাস আগে।) হা হা হা। হতে পারে তানভীর! আমার জন্মও তো সেই চিরাচরিত নিয়মেই। কোটি কোটি স্টেম সেলের সাথে লড়াই করেই না জন্ম আমার। সত্যিই, আমরা বদলাই তো।] 

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-২৬: #ordinarylife #habituate #accustomed

11 Sep 2020: ফেসবুক দাদা, আমি জানি, আপনি থাকেন না। তবুও বলছি-আপনি কি রোজ শুককুরবারে এই বাংলাদেশের এক অখ্যাত ও বিরক্তিকর চারন কবির একটি ততোধিক বিরক্তিকর মেসেঞ্জার বার্তার ‘টুং’ শব্দের জন্য অপেক্ষা করে থাকেন? না থাকলেও অসুবিধা নেই। কবি ও লেখকরা বহুকাল আগে হতেই হ্যাংলামোতে অভ্যস্ত। প্রত্যাখ্যান ও উপেক্ষা-কবিকে শানিত বই আহত করে না খুব। সেজন্যই তারা কবি হয়ে ওঠেন। একজন কবিকে যতই উপেক্ষা করুন, দোষের কিছু নেই, কিন্তু নিজের অজান্তে, অবচেতনে কিছু সত্যকে যে আমরা উপেক্ষা করে যাই, অনেক বাস্তবই নজর এড়িয়ে যায় আমাদের-তা কি জানেন? বিগত ৬ টি মাসের বিরক্তিকর ও একঘেঁয়ে গৃহবন্দীত্বে কিছু নতুন উপলব্ধি হয়েছে, যা আগে কখনো হয়নি। আমি দেখেছি, নিজের একান্ত প্রিয় মানুষটিকে আরও আরও বেশি সময় নিজের কাছে পেতে আমাদের ঘরের গৃহলক্ষীরা (যাদের একদিন আমরা এখন আমাদের ’ছেলের মা’ বলে জানি অথচ এককালে নিজেদের প্রেমিকা ও বন্ধু হিসেবে বিশ্বাস করতাম) কতটা ব্যাকুল হয়ে থাকেন। আমি নতুন করে উপলব্ধি করেছি, একজন সঙ্গী বা সঙ্গিনী, যার সাথে আপনি আটপৌড়ে জীবনে দশটা-পাঁচটার রুটীনের মতো অভ্যস্ত হয়ে যান, তার কত কি আবেগ আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়। অভ্যস্ততা আমাদেরকে কত কত চমৎকারিত্ব হতে বঞ্চিত করে। যেমন ধরুন, রোজ বাসায় যাবার পরেই যখন গোসল করে বের হই, কে যেন শুকনো খটখটে তোয়ালেটা দরোজার বাইরে রেখে দেয় আগেই। হয়তো এমন করেই চিরকাল রেখে দিত। চোখে পড়েনি। হয়তো, তখনো সে প্রতিদিন ঘামে ভিজে রোজ নতুন টাটকা রান্না করত। রাতে আয়োজন করে যখন খেতে বসা হত, মালুমই হত না, যে, ওই রান্নায় কতটা আবেগ আর কতটা পরিশ্রম জড়িয়ে থাকত। কখনো নিয়ম করে ‘থ্যাংকস’ বলাটাও হত না। ঘরের বউকে আবার এত আদিখ্যেতা দেখানো কেন! (প্রেমিকারা বউ হয়ে যায় খুব দ্রূত।) এখন সেসব চোখে পড়ছে। আবার গৃহলক্ষী হয়তো খেয়ালই করেননি, স্বামী বেচারা অফিস হতে এলে, তার হাত হতে ব্যাগটি হাত বাড়িয়ে নেবার সময়, রোজকার মতো “বাচ্চার ন্যাপি এনেছ” বলার ফাঁকে মনে করে একটু হাসি দিলে, হাত বাড়িয়ে আঁচল দিয়ে তার ঘামটা মুছিয়ে দিলে তিনি কতটা খুশি হয়ে ওঠেন, আবেগে কতটা ভিজে ওঠেন। আসলে অভ্যস্ততা আমাদের অনেকটা অন্ধ করে দেয়। মহামারীর প্রকোপ অনেক কিছুই চোখে পড়িয়ে দিল। আমরা বাংলাদেশের মানুষেরা নিয়ম করে ধন্যবাদ, ভালোবাসি, দুঃখিত, ভুল হয়ে গেছে, বাহ, চমৎকার-বলতে জিহবায় খুব জড়তা অনুভব করি। অথচ এই টুকরো টুকরো শব্দগুলো অনেক কঠিনকেই সহজ করে দেয়। মহামারী এই ছোট ছোট বিষয়গুলোকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। হয়তো আরও শিখাবে, অভ্যস্ত করবে। কিছু অনভ্যস্ততাকে মানিয়ে নিতে শিখাবে। অনভ্যস্ত আমরা অভ্যস্ত হই, আনাড়ি মানুষ চৌকষ হই। তবু যেন জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আবেগগুলোকে ওভারলুক (এর যথোপযুক্ত বাংলা জানি না) না করে যাই। ছোট ছোট ঘটনা, স্মৃৃতি, দুঃখ, বেদনা, ‍সুখ নিয়েই চলুক আমাদের ‘এইসব দিনরাত্রি’।

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-২৭: #patience #friendship #hypocrisy #fraud #masking #hideout #disguise

ছোটবেলা হতে বড় বেলা-আমার একটি খুব প্রিয় কাজ রোজনামচা (রুটিন) করা। এই জীবনে কতবার যে অমন রোজনামচা করেছি তার ইয়ত্তা নেই। পড়াশোনায় চিরকাল আমি অনিয়মিত। পরীক্ষার আগের রাতে পড়তে বসে দেখতাম, কিচ্ছুই প্রস্তুত না। তখন আল্লাহ’র কাছে শপথ করতাম, “হে খোদা, এবার কোনোমতে উতরে দাও, এই পরীক্ষাটার পরেই একদম রোজনামচা বানিয়ে নিয়মিত পড়াশোনা করব।” পরীক্ষা শেষ হয়ে যাবার পরেই যেই কে সেই। এই সেদিনও করোনা হতে বাঁচতে প্রতিদিন ঠিক কীভাবে নিয়মবদ্ধ জীবনযাপন করব-তার একটা তালিকা করে দরোজায় ঝুলিয়ে দিয়েছিলাম। একদিনের তরে সেই ছক মেনে চলেছি বলে মনে পড়ে না। রুটিন মানা হয়তো অনেক বড় মাপের মানুষের কাজ। আমার দ্বারা ওই কম্ম হয়তো হবার নয়। তবে রুটিন ভুলে যাবার মতো আরেকটা ভুলে পড়া আছে মনুষ্য জীবনে। ”আপনার এই উপকারের কথা জীবনেও ভুলব না”-এই কথাটা আমরা খুব দ্রূত ভুলে যাই। ভুলে যাই, অথবা, বলা যায়, ইচ্ছে করেই ভুলে যাই। কারন, এই স্মৃতি ভুলে না গেলে জীবন একটা দায়বদ্ধতার জালে আটকে পড়ে। আবদ্ধতা সবার জন্য নয়। অবশ্য, এটা ভুলে গেলেও আমরা আরেকটা জিনিস কখনো ভুলি না। সেটা হল-”আপনার ঋন আমি কখনো শোধ করতে পারব না।” আমরা ভুলেও কখনো এই কথা ভুলি না। আজীবন মনে রাখি আর ঋন শোধ করি না। অবশ্য এই সর্বভূক, সর্বাঙ্গ পঁচা দেশে যত বড় ঋন, তত বেশি উদারতা দেখানোই রীতি। দেশে যার আয় যত বেশি, সে ততই গরীব, কর দিতে পারে না। যার ব্যাংক ঋনের আকার যত বেশি, শুধবার চাপ তার তত কম। বিপরীতে, গরীব কৃষক বা মুদি দোকানি ৫০০০ টাকা ঋন করলে তা গলায় পাড়া দিয়ে সময় মতো আদায় করে নেয় দায়ীত্বশীল ব্যাংক কত্তিপক্ক। যার ঋন হাজার কোটি, সে দুই দিন পরে পরেই ঘোষনা দেয়, “আপনার এই ঋন আমি জীবনেও শোধ করতে পারব না।” যাহোক, সেসব বড় মানুষদের ভাবনার বিষয়। তাই বলি কি, কারো কাছে যদি ঋনী হন ই, তাহলে বড় কিছু নিয়ে হোন। যেন জীবনেও শোধ করতে না হয়। ফরগিভ, ডোন্ট ফরগেট। আপনি যদি আমাকে কোনো কারনে ‘কু…..র বাচ্চা’ বলে গালি দেন, আমি সেটা গায়ে মাখব কম। আর যদি এপোলজি চান, তাহলে সেটা দশ মিনিটের মাথায় ভুলে যাব। কিন্তু, আপনি যে আমাকে ‘কু….বাচ্চা’ বলে গালি দিতে সক্ষম ও সেটার প্রয়োগ করতেও পিছপা হন না’ সেটা আমি মনে রাখব আজীবন। এরপর, প্রতিবার যখন আপনার সাথে হেসে হেসে কথা হবে, খাতির হবে, গলাগলি হবে, ঢলাঢলি হবে, প্রতিবার, হ্যা, প্রতিবার এত কিছুর মধ্যেও আমি মনে রাখব, যে, আপনি আমাকে ‘কু…..র বাচ্চা’ বলে গালি দেবার মতো মানুষ। ফরগিভ, দ্যাট মেকস ইউ হ্যাপি অ্যান্ড রিলিভড। বাট, আই অ্যাম নট শিওর এবাউট ফরগেট। কারন, ছোটবেলায় আমাদের বেত দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে শেখানো হয়েছে, মনে রাখার চেষ্টা করো, ভুলে যেও না। আবার বড় হবার পর যদি শেখানোর চেষ্টা হয়, “ভুলে যাও, মনে রেখো না”-সেটা কাজে দেবার সম্ভাবনা কম। এ সপ্তাহের সপ্তাহান্ত বেশি বড় করব না। শুধু ক’টা আপ্ত বাক্য উচ্চারন করেই বিদায় নেব। আপ্ত-১: রবার্ট ব্রূসের ধৈর্য্যের গল্পে উজ্জিবিত হয়ে অনন্তকাল ধৈর্য্য ধরে থাকার নিয়ত যদি করে থাকেন, তবে একটা জিনিস খেয়াল করবেন, রবার্ট ব্রূসের গল্পের ওই মাকড়সাটা আপনার গল্পে জীবিত আছে, নাকি ডোডোর মতো মৃত-তা আগেই নিশ্চিত হয়ে নিন। তা না হলে, তার সফলতার আশায় বসে থেকে আপনার জীবন পার হয়ে যাবে। আপ্ত-২: জগতের সকল ভাল আপনার জন্য নয়। জগতের সকলে আপনার স্বজন, সৃহুদ ও বন্ধু হবার নয়। আপনি যতই চেষ্টা করুন, যত ত্যাগ স্বীকারই করুন, সবার সাথে আপনার বন্ধুত্ব হবে না। সবাই আপনাকে বন্ধুত্ব দেবে না। কোরামে নেবে না। তাই, বন্ধুত্ব’র জন্য হাত বাড়াবার আগেই দেখে নিন, আপনি আপনার ছোট্ট তরীর রশি টাইটানিকের রেলিঙে বাঁধবার চেষ্টা করছেন কিনা। করলে ক্ষ্যামা দিন।  আপ্ত-৩: বাজারে ফেসবুক নামে একটি খুব কার্যকর মুখোশ পাওয়া যায়। যেটি পরে নিজের যাবতীয় ভন্ডামি, পিছুটান, অসঙ্গতি, অন্ধকার ঢেকে রাখা যায় নিপূণভাবে। আপনি এই মুখোশের সুরক্ষায় থাকলে কখনোই ধরা পড়বেন না, আপনার লুক্কায়িত চরিত্র কখনোই উন্মোচিত হবে না। তাই ফেসবুক মুখোশের আড়ালে থাকুন। জগতে আদৃত থাকুন। ভন্ডামি করার হলে, ফেসবুক মুখোশ পরে করুন। পরকালেও আপনি নিষ্কুলুশ থাকতে পারবেন। কারন, আপনাকে ওয়াচ করতে নিযুক্ত দেবদূতদের সম্ভবত কোনো ফেসবুক একাউন্ট নেই। আপনাকে এলোমেলো ও ইঙ্গিতপূর্ন সপ্তাহান্ত শুভেচ্ছা। 

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-২৮: GDP খাইবেন? নাকি মাথায় দিবেন? #economy #growth #cosmeticdevelopment #statistics #bogus #misguide #GDPgimmick

বাংলাদেশের জিডিপি ভারতকে ছাড়াইয়া যাইতেছে কিংবা এই যে এই গেল বলিয়া-এই খবরে যাহারা আবেগে পাগল হইয়া লুঙ্গী মাথায় তুলিয়া রাস্তায় রাস্তায় দৌড়াইবার দশা, তাহারা লুঙ্গীখানা ভাইরালের ভীড়ে হারাইবার পূর্বেই যথাস্থানে গিঠ্যূ দিয়া হুশে আসুন, কারন, ওই ছাপাইয়া যাওয়া জিডিপি বাজারে লইয়া যাইয়া তাহা দিয়া কেজি খানেক স্বর্ণমন্ডিত আলু কিংবা ছটাকখানিক হিরকখচিত পেঁয়াজ কেনা যাইবেক তো না। এমনিতেই জিডিপির ক্রমোন্নতির ধাক্কায় ভাতের ফ্যান ফালাইয়া দিতেও ভাবিতে হইতেছে। আফটার অল, উহা বড্ড দামী চালের দামী ফ্যান।  ভারত মাতা’র গো-মূত্রখোরদের কর্মকান্ড দেখিয়া আমাদের বিপুল কেশাচ্ছাদিত বগল বাজানো তো নতুন নহে। যদিও তাহাদের উপচানো CEO দের বহর দেখিয়া আমরা বিন্দুমাত্র দমিত হইব না। আমাদিগকে বগল বাজাইতে দেখিয়া ভারত মাতা ও তার গো-সেবকরাও মজা পান। তাহাদের উদ্বেলিত অংশ আবার সময়ে অসময়ে আমাদিগের নামে যত্রতত্র ’খয়রাতি’ তোহমত দিয়া হৃষ্ট হন। তা, ভারত মাতার গো-সেবকরা মাঠে ঘাটে উন্মুক্ত স্থানে পশ্চাতদেশের লুঙ্গী বা ধূতীর খুট তুলিয়া টাট্টি করে-এই সংবাদে যাহারা আবার আবেগে সম্মোহিত হইয়া পড়েন, তাহারা মুখমন্ডলে কিঞ্চিত মনুষ্য মূত্র ছিটাইয়া হুশে আসিতে পারেন। কারন, ভারত মাতার পত্নি দেশ বঙ্গদেশ আবার রাস্তাঘাটে, ফুটপাতে, গাছের গোড়ায়, মাঠে, মেস হোস্টেলের জানালায় শরীরের সম্মুখদেশের লুঙ্গীর খুট বা জিপারের হুড উন্মোচিত করিয়া জলকামানটি দিনে রাতে জনসম্মুখে বাহির করিয়া সতেজে নিয়ন রঙ্গা মূত্র বিসর্জনের দিক দিয়া ভারত মাতাকে ছাড়াইয়া গিয়াছে। ভারত মাতার হনুমান শিষ্যবৃন্দ শরীরের পশ্চাতদেশ উন্মুক্ত করিয়া জনসম্মুখে বাহ্য ত্যাগ করে। বঙ্গদেশ শরীরের সম্মুখভাগের আবরু ভেদিয়া দাদাদের বাকি কাজ, অর্থাৎ জলত্যাগের কাজটা করিয়া দেয়। উহারা গো-মাতার মূত্রে দেশ হইতে করোনা বিদূরীত করিতেছেন। বঙ্গদেশ মনুষ্য মূত্রে ধুইয়া দেশ করোনা দূষনমুক্ত করিবার প্রয়াস পাইতেছেন। আর তাহাতে বঙ্গের মহান কবি জীবনানন্দের কাব্য পড়িয়া উদ্বেলিত হইয়া বঙ্গদেশের সড়কে, ‍ফুটপাতে “হাজার বছর আমি পথ হাটিতেছি” করিতে গিয়া মনুষ্য মূত্রে পবিত্র হইবার ভাগ্য হইতেছে। সাধু, সাধু। কী সুষম বন্টন, লও, বাচ্চালোগ, এইবার তালিয়া আর বগল-দুই ই বাজাও। নিজ নিজ পশ্চাতদেশে পুরিষের গন্ধ লইয়া অন্যের পশ্চাতে শুকিতে গেলে শরমিন্দাই হইতে হইবে বাচ্চালোগ। এমনিতেই তাহাদের বলপূর্বক প্রণয় তথা ধর্ষণের দুর্লভ রেকর্ডখানা আমরা প্রায় ছিনাইয়া লইবার উপক্রম করিয়াছি। জোরপূর্বক, পালাক্রমে, উপুর্যুপরি, রাতভর, শাদির লোভ প্রদর্শনে-ইত্যকার ইতর শব্দাবলি শুনিতে শুনিতে এমনিতেই চিত্ত কলূষিত হইতেছে নিত্য নিত্য।এই সুযোগে পাক-ভ্রাতার সাইয়েদী ঔরষের সন্তানরা আবার পাকসার, হরিবোল বলিয়া জাগরিত হইও না। তোমাদিগের আমিরুল মুমীনীন হযরত এমরান খান সাহেবের পীর বেগম নাকি খোয়াব মারফত তাহাদের মূলকের ভূত-ভবিষ্যত দেখিয়া তাহার চির প্লেবয় নওশাকে প্রদান করিতেছেন আর তাহাদের মূলকের উষ্ণবীর্য আর্মি নাকি সেই খোয়াবনামা তরজমা করিয়া করিয়াই চিরশত্রূ ভারত-মাতার বিরুদ্ধে জঙ্গের ট্যাকটিকস সাজাইতেছে। শুনিতেছি, পীরে বেগম নাকি তাহার খোয়াব মারফত নওশা খানকে পারমানবিক বোম্ব হইতেও শক্তিশালী কোনো ব্রহ্মাস্ত্র ধনুর্বান সংগ্রহ করিয়া দিবেন, যাহা দিয়া তিনি ভারত-মাতার কবল হইতে কাশ্মীরের জাতিভ্রাতাদের উদ্ধার করিবেন। উহা করিবার পূণ্যে তিনি ও তাহার মূলক একাত্তরে তদানীন্তন জাতিভ্রাতাদের সমানে হত্যা ও ধর্ষণ করিবার পাপ হইতে শুদ্ধ হইলেও হইতে পারেন। বলি কি, গ্যাদাকালে তো অংকে পাইতেন টানিয়া টুনিয়া তেততিরিশ। তাই, একালে জিডিপি নামক সংখ্যা তত্বের বল্গাহীন বায়েস্কোপে বেশি আহ্লাদিত না হইয়া, বরং আরেক গাল মুড়ি খাইয়া পেটের জমা গ্যাসগুলোকে কিঞ্চিত প্রশমিত করিতে মন দিন। জানেনই তো, যত্রতত্র গ্যাসের উদগীরন শরমিন্দা করিতে পারে। বঙ্গদেশের স্ফিত ও যৌবনবতি অর্থনীতির উদরেও গ্যাস জমিয়া ফুলিয়া ফাঁপিতেছে, ক্ষণে ক্ষণে তাই রাস্তাঘাট, বাসাবাড়ি, মাঠেঘাটে গ্যাসীয় উদগীরন দেখিতে পাইতেছি। সেই কোন এক কালে শুনিয়াছিলাম, বঙ্গদেশ তৈলের উপর ভাসিতেছে। পরে জানিতে পাই, উহা মৃত্তিকার উদরস্থ তেল নহে, উহা মনুষ্যকূলের জবান নিসৃত তৈলাক্ত বাণীতেল। ইদানীংকালে রাত্রিতে সুনিদ্রা হয় তো? না হইলে নিদ্রাকুসুম তৈল মাখিয়া দেখিতে পারেন। শুককুরবারের মধ্যাহ্ন দিবানিদ্রা দিবার লাগিয়ে উৎকৃষ্ট। তাই আপাতত সেই আয়োজন করিতে যান। আপনাদিগকে শুভ সপ্তাহান্ত। বৈকালে বাহির হইলে বদনখানি এক টুকরা ত্যানা দিয়া আচ্ছাদিত করিয়া বাহির হইয়েন।

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-২৯: #salam #greetings #communal #image #formality

ছোটবেলায় আমার এক ধর্মপ্রাণ চাচা ছিলেন। তিনি রাস্তা দিয়ে যাবার সময়ে একজন ন-মুসলিম নিয়মিত তাকে সালাম দিতেন। চাচাকে দেখতাম হাত উঁচিয়ে একটা ইশারার মতো করতেন আর মাথাটা নুইয়ে হ্যা বলার মতো ভঙ্গি করতেন। একবার এর কারন জিজ্ঞাসা করায় তিনি বললেন, মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলার ভঙ্গি করার কারন হল, আমি মনে মনে বলি, হ্যা, আপনি যা বলেছেন, যে, আমার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক, সেটা ঠিক হোক। আর আমার ইশারাতে তিনি বুঝে নেন, আমি তার সালামের উত্তর দিয়েছি, আসলে দিইনি। কারন উত্তর দেয়া নাকি নিষেধ। যাহোক, এই বিশ্বাসের আগপর নিয়ে আজ কথা বলব না।সালাম দেয়া আর তার উত্তর দেয়া নিয়ে এদেশে অনেক মীথ প্রচলিত আছে। আছে, নতুন বউ কিংবা জামাই প্রথম প্রথম শশুর বাড়ি গেলে মুরব্বীদের পা ছুঁয়ে কদমবুচি করার রেয়াজ। পীর নামক ভন্ডদের পা ছুঁয়ে চুমা খাওয়াকেও এদেশে একরকম শাহী সালাম হিসেবে দেখা হয়। আছে বিভিন্ন বাহিনীর সশস্ত্র সালাম। সাধারনত এদেশে মনে করা হয়, শুধুমাত্র বড়রাই বা জেষ্ঠ্যরাই সালাম পাবেন। তারা কখনো কনিষ্ঠ্যদের আগে সালাম দেবেন না। কনিষ্ঠ্যরাই বড়দের বা বড় স্যারদের দেখলে সালাম দেবেন। এমনকি, আমার চাচার মতো করে, সালাম দিলে বড়রা ঘাড় কাঁত করে একটু ইশারা করলেই হয়ে যাবে। সেটাই নাকি তাদের ভাবগাম্ভির্য ও মহিমা।এই মরার দেশে ভাব ও মূর্তি-দুটোই নিয়ে সেই ন্যাংটো কাল হতে দেখে আসছি, প্রচুর ঘাই কিচিং। এমনকি মনে হয়, জোরে একটা হাঁচি দিলেও বোধহয় ভাব ও মূর্তি-দুটোই চলে গেল কিনা। খোলা মনে কেউ একটা কথা বলল, কিংবা নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি হতে কোনো একটা বিষয়ে মতামত দিল, ব্যাস, গেল, দেশের ভাব ও মূর্তি দুটোই গেল গেল রব ওঠে। যদিও আজও জানি না, ভাবমূর্তি জিনিসটা কেমন? সেটা কি রাবণের দশ আনন বিশিষ্ট মূর্তির মতো কিছু একটা? এদেশে অবশ্য মর্দে মুমীনরা ভাস্কর্যকে মূর্তি বলে মনের সুখ মিটান, দেশে জেহাদ করেন। আমরা চাঁদে দেল্লাকে দেখি। মাংসের গায়ে খোদাকে দেখি। ব্যরিষ্টার সুমনের মধ্যে হারকিউলিস খুঁজি, পুলিশ র‌্যাব কাউকে ক্রসফায়ার করলে তাদের দেবদূত মানি, স্কুলের ছো্ট ছোট বাচ্চাদের রাস্তায় নামতে উস্কে অভ্যুত্থানের স্বপ্নদোষে ভুগি, সারাদেশ কোনো এক ৫ই মে ধ্বংস হয়ে যাবে, সেই আবালীত্বে বিশ্বাস করি। আর তস্কর ও ধান্দাবাজরা  সেটাকে ব্যবহার করে। আমরা ব্যবহৃত হই বলেই ধান্দাবাজরা আমাদের ব্যবহার করে। গুজব, প্রবাদ, কুসংস্কার, কুপ্রথা, তুকতাক, কালোযাদু, যাদুটোনা, তদবীর-আপনার কি মনে হয়, শুধু গ্রামের মানুষরাই তাতে আক্রান্ত? আমাদের শহুরে শিক্ষিত (তথাকথিত) মানুষরাও তাতে আকন্ঠ নিমজ্জিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে স্কুল বাচ্চার মা-কেউ বাদ নেই। দুরদর্শন চ্যানেলগুলোতে দেখি, সারাক্ষণ পীর সাহেব, তান্ত্রীক, যাদুকর আর জোতিষদের গরম গরম বিজ্ঞাপন-পরকীয়া থামানো হতে মন্ত্রী বানানো-সব কাজে তারা সুপারম্যান। তাদের কেউ কেউ নাকি আবার কোহে কাফে গিয়ে জ্বিন ধরে এনেছে। একটি দেশের দুরদর্শনে প্রকাশ্যে যাদুমন্ত্র আর পীর তান্ত্রীকতার বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। আমার কাজিনকে দেখেছিলাম, তার সন্তানদের কর্তিত নাড়ির খন্ডাংশ প্রথিতযশা ও নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটিতে পুঁতে আসতে, এই বিশ্বাসে, যে, একদিন তাতে বড় হয়ে বাচ্চাটি ওখানে ভর্তি হবে। বেচারা!যেটা বলছিলাম, দেশে অনেক রকম সালাম আছে। এলাকার বা হলের ’বড় ভাই’কে দেখলে উঠতি পাতি নেতারা ‘স্লামাইকুম ভাই’ করে একরকম সালাম দেয়। দেবার সময় একহাত নাকের কাছে, এক হাত পশ্চাতদেশের সংসর্গে। বিপ্লবী, তা সে ফেসবুক বিপ্লবী হোক, বা পল্টনের, তাদের সালাম সবসময় লাল সেলাম। পাড়ার মাস্তান বা চাঁদাবাজদের হঠাৎ সালাম পেলে খুশি হন-এমন কেউ নেই। আবার ইদের আগে আগে জামাইয়ের লম্বা সালাম মানেই আব্বাজান বুঝে যান, তেনার বড় কোনো আবদার আসছে। ঈদ কোরবাণীর আগে দিয়ে এলাকার নানা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি হতে শুরু করে রিক্সাওলা, পিওনদের ঘন ঘন সালাম দেবার চল বাড়ে। লক্ষ্য একটাই-নগদ। বলছিলাম, সালাম নিয়ে। কিন্তু আমার লক্ষ্য সেটা নয়। একটি উন্নত জাতি হিসেবে পরিচীত হতে হলে, আমাদের স্বভাবে, চরিত্রে, মগজে, বিশ্বাসে, ধ্যানে, ধারনায়, কাজে অনেক উন্নতি ও নতুনত্বই আনতে হবে। তার একটি দিক হল সালাম। সালাম মানে শুধু সালাম নয়। তাহলে কী? কয়েকটি ছোট্ট অভ্যাস আজ ছোট্ট করে বলি। ”আস সালামু আলাইকুম>ওয়া লাই কুমুস সালাম, গুড মর্নিং, ওয়াও, আই এম ফাইন, ইটস এ ওয়ান্ডারফুল ডে, স্যরি, এক্সকিউজ মি, রিপিট প্লিজ, আই কান্ট আন্ডারস্ট্যান্ড, পারডন মি, প্লিজ, থ্যাংক ইউ, ওয়েলকাম”-এরকম কিছু শব্দ, চর্চা, বিষয়, প্রথাকে আপন করে নিলে আমাদের জীবন অনেক সহজ ও হৃদ্যতাপূর্ন হত। ইংরেজিতেই হতে হবে এমন নয়। বাংলাতে, আরবীতে, সংস্কৃতে যেভাবেই হোক, যার যার রীতি মতো হোক। কিন্তু হোক। সম্ভাষণ, ধন্যবাদ জ্ঞাপন ও দুঃখপ্রকাশ বিষয়টির প্রচুর প্রচলন হওয়া দরকার। আমাদেরকে এই ছোট্ট আনুষ্ঠানিকতাগুলো শুরু ও চর্চা করা দরকার। বড়রা ছোটদের প্রতি বা ছোটরা বড়দের। দায়ীত্ববোধ হতে করতে হবে। চোখের দৃষ্টি দিয়ে, ঘাড় স্রাগ করে, মুচকী হেসে নানাভাবে হয়তো অভিব্যক্তি প্রকাশ করা যায়। কিন্তু মুখে আনুষ্ঠানিক ওসব শব্দ দিয়ে ভাব বিনিময়টা করলে আরো ভালো। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকতারও দরকার আছে। ঠিক যেমন, ১২ বছর প্রেম করার পরেও মানুষ আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করার পথেই হাঁটে।শেষ করার আগে আরেকটা শোনা গল্প। মন দিয়ে শুনুন। ১৯৭১ এর আগে আগে কোনো এক জনসভায় কিংবা একক বিবৃতিতে মওলানা জনাব ভাসানী পাকিস্তানী শাসকদের উদ্দেশ্য করে বললেন, “………………………তাইলে আপনেগো আসসালামালাইকুম।” [মানে আপনারা বিদায় হোন।] ক্ষণপতনা বাঙালি তাকে ধরে নিয়েছে, “ভাসানী পাকিস্তানীদের সাথে হাত মিলিয়েছেন ওই কথা দিয়ে।”। গল্পের মাজেজা যদি ধরতে না পারেন, তবে ওই টিভি বিজ্ঞাপনটা মনে করে দেখুন “দাঁত ভাইঙ্গা গেছে ভার্সেস বাঁধ ভাইঙ্গা গেছে। কিছুই তলিয়ে না দেখে, না ভেবে পাঁকে নেমে পড়া আমাদের চিরাচরিত অভ্যাস। যাই,বড় সাহেব নাকি আমাকে সালাম দিয়েছেন।

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-৩০: #myday #adayformyself #onlyme

আমার জন্য একটি দিন: একবার ফোন কিনবার দরকার পড়ল। নানা কারণেই স্বভাবতই আমি যৌক্তিক কম দামে কাজ চালাবার মতো একটি ফোন কিনবার মনস্থ ও সরেজমীন পছন্দ করলাম। বাঁধ সাধল নিটোল। তার নিজের জন্য ও আমার জন্য তার প্রায় দেড়গুন দামের ফোন পছন্দ করল। শেষ পর্যন্ত সেটাই দুটো কেনা হল। অতঃপর সে আমাকে বলল, “তুমি যাতে ওই ফোনটা নাও, তার জন্য আমি আমার জন্যও নিয়েছি। যাতে তুমি ওটা না নিতে চাইলে ’তুমি না নিলে আমিও নেব না-বলে তোমাকে নেয়ানো যায়।” আমি তাকে আমার চিন্তাটা বললাম। ব্যক্তিগতভাবে আমি একটি নীতি অনুসরন করি, “The Goal is ‘TO BE RICH’, not ‘TO LOOK’ rich.” গিন্নীর উত্তর, “কিন্তু কিনে দেবার পরে ফোনটা পেয়েতো ঠিকই খুশি হয়েছ। তুমি নিশ্চই আজীবন নিজেকে বঞ্চিত রাখবে না।”আমি আরেকবার ভাবতে বসলাম। তবে কি আমি আমার মনের খবর রাখি না? হবে হয়তো। নিজেকে নিজে কয়জনে চেনে? আচ্ছা, উপহার পেলে আপনি কি খুশি হন? নাকি আপনার কোনো অনুভূতিই হয় না?সত্যিই তো, নিজের জন্য কিছু পেলে সবরকম প্রতিরোধের পরও তো ভালই লাগে। মানুষ নিজের চেয়ে কাউকে বেশি ভালবাসে কি? আমার তো মনে হয় না। বাংলাদেশে আমরা মানুষেরা প্রচন্ড রকম একটি সামাজিক বা পারিবারিক দায়বোধের ভিতর দিয়ে বড় হই। ফলত, আমরা ছোটবেলা হতেই পরিবারকে দেখতে হবে-এমন একটি আবহের ভিতর দিয়ে বড় হই। অবচেতনেই পরিবারের সবাইকে ভাল রাখার তাড়নাটি হৃদয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখে আমরা আমাদের যাবতীয় কর্মকান্ড সাজাই। অবশ্যই এটি একটি ভাল দিক। কিন্তু মুশকীলটা হল, এটা করতে গিয়ে আমরা নিজেকেই ভুলে যাই। বা বলা যায়, ভুলতে বাধ্য হই। এই তো সেদিন, ব্যাংকার আপার কথাই ভাবুন। যিনি একাই একটি বটবৃক্ষের মতো একটি পরিবারকে প্রতিষ্ঠিত করে ঠিক উপভোগের সময়টাতে কর্মরত অবস্থায় চলে গেলেন। কে জানে, হয়তো তার বুকেও কত অপূর্ন স্বপ্নের হাহাকার ছিল। কত কিছু পাওয়ার সুপ্ত ইচ্ছা ছিল-একটা ঘর, সংসার, সন্তান, একটা নিজস্ব বারান্দা, কিছু চমৎকার সপ্তাহান্ত-হয়তো। পারলেন কই? কাজের মানুষ, কাজ করতে করতেই, অন্যকে সেবা দিতে দিতেই ফুরিয়ে গেলেন। আসলে হয়েছে কি, তীব্র প্রতিযোগীতার ও লড়াই করে টিকে থাকার জীবন সংগ্রামের এই সময়ে, আমরা সবার ভাগটা, সবার হাসিমুখটা, সবার খুশি, পাওনাটা নিয়ে এত এত নিমগ্ন থাকি, যে নিজের জন্য কিছু করা আর হয়ে ওঠেনা। আমার কথাই বলি। ছোটবেলায় স্বপ্ন দেখতাম, আমি পাইলট হব। আজ যে আমি পাইলট না হয়ে অন্য কিছু, তার সবচেয়ে বড় কারন অবশ্যই ওই দায়ীত্ববোধ। এই বাস্তবতার মাঝেই, হঠাৎ হঠাৎ কিছু মুহূর্ত এসে পড়ে, যখন অভাবিত বা অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটে যায়। চেনা বা অচেনা, কাছের বা দূরের মানুষের কাছ থেকে পাওয়া ছোট্ট একটি উপহার, ছোট্ট কিছু কথা অনেক বড় হয়ে দেখা দেয়। আমাদের মনের অবচেতনেই হয়তো সুপ্ত থাকে কিছু প্রশ্ন- ইশ! কেউ একটা উইশ করল না! কেউ তো কোনোদিন আমায় কিছু দিল না! অথবা, আমি কী পেলাম! এমন প্রশ্নগুলো। প্রশ্ন করুন তো নিজেকে। এমন কিছু কি সে বলে আপনাকে? যদি বলেই, তবে নিজেকে নিজে আজ একটা উপহার দিন। নিজেকে নিজে উইশ করুন। নিজেকে নিজের কিছু সময় আজই দিন। হ্যা, নিজেকে নিজে কিছু দিন। সবার জন্য কিছু করতে হলে আপনাকে আগে বেঁচে থাকতে হবে, আপনাকে আগে শক্ত হয়ে দাড়াতে হবে, আপনাকে আগে নিজেকে প্রেষিত রাখতে হবে। আমি প্রায়ই মানুষকে নিজেকে নিয়ে ভাবতে বলি, তার অবশ্যই কারন আছে। সে কারনগুলো না হয় আরেকদিন বলব। আর যদি বেশি জানতে ইচ্ছে করে, তবে গানটা শুুনুন। দেখুন, কিছু আঁচ করা যায় কিনা। https://youtu.be/iJaq-BYKK-4   নতুন সপ্তাহ কাল শুরু হচ্ছে। কর্মময় ও নিরাপদ হোক আগামী সপ্তাহটি। ইয়ে, ছবিগুলো পুরোনো, স্মৃতিটি নয়।

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-৩১:

তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি। টিউশনির পয়সায় জীবন চালাই। বিনোদন বলতে মল চত্বর, টিএসসির মুফতে বিনোদন। এমনি একদিন যাদুঘরের মিলনায়তনে লালন গায়িকা ফরিদা পারভীনের একক সঙ্গীত সন্ধ্যা। মুফতে। সময় ব্যবস্থা করে গান শুনতে গেলাম। ফরিদা পারভীন আপা তার সূরের যাদুর মায়াজাল বিস্তার করে একটার পর একটা লালনসহ অন্যান্য গান দিয়ে শ্রোতাকে মুগ্ধ করলেন। গানের ফাঁকে ফাঁকে কথা বলছিলেন তিনি। তার সঙ্গীত জীবন নিয়ে নানা কথা। তার স্বামীর তার গান ও সঙ্গীতজীবন নিয়ে আপত্তি, অমিলের কথা। লালন সঙ্গীত নিয়ে আমাদের এককালের নাক সিঁটকোনো আর হালের উন্মাদনার কথা। একফাঁকে তিনি তার সঙ্গীত জীবনের একটি স্মরনীয় গল্প বললেন। একবার তিনি সঙ্গীত ভ্রমনে ডেনমার্ক (কিংবা স্পেন) গেছেন। একটি বড়সড় আসরে গান গাইবেন। নির্দিষ্ট সময়ে গানের আসর শুরু হল। সেই আসরে গান শুনতে এসেছেন ডেনমার্কের (কিংবা স্পেনের) রাণী। অন্যান্য শ্রোতাদের সাথে তিনিও তন্ময় হয়ে লালন শুনছেন। গান শুনতে শুনতে কখন যেন তার দু’গাল বেয়ে পানির ধারা বয়ে যাচ্ছিল। গান শেষ হলে শ্রোতারা রাণীকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি তো বাংলা গানের কথা বুঝতে পারছেন না। তাহলে কাঁদছেন কেন?” রাণী উত্তর দিলেন, “পৃথিবীর সবদেশেই সঙ্গীতের সুরের নিজস্ব একটি ভাষা ও আবেদন আছে। কথা বা লিরিক না বুঝলেও সেই আবেদন হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করে। ওই সুরের ভাষাই শ্র্রোতাকে গানের মর্ম বুঝিয়ে দেয়।” গানের বিশ্বব্যাপী আবেদন নিয়ে এত সুন্দর ব্যাখ্যা আর হয় না। ইদানীং একটি নতুন আদিখ্যেতা হয়েছে। অফিস যেতে আসতে কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে গান আর আবৃত্তি শোনা। সেই গানের বড় অংশই #SiD ট্যাগে। ইংরেজি গানও শুনি, যদিও কথার বেশিরভাগই বুঝি না। শুধু সুর শুনি চোখ বুঁজে। জনতা ভাবতে পারে, “এহ, ব্যাটা ইংলিশ গান শোনে”। হ্যা, ওই যে বললাম, গানের নিজস্ব ভাষা আছে। যেটা মনে পৌছে যায়। আমার বন্ধু ইশতিয়াক আমাকে অনেকগুলো ’ইংলিশ’ গানের সূত্র দিয়ে বাধিত করেছিল। আজও শুনি।পছন্দের গান খুঁজে বের করতে করা আমার পাগলামো চেষ্টার কথা আগেও বলেছি। আজও একটি গান খুঁজছি। খোঁজে থাকলে জানাবেন। “দমাদম মাস্ত কালেন্দার” এই গানটির একটি ভার্সন ১৯৯৭-২০০০ সালের দিকে রেডিওতে খুব প্রচার হত। ভার্সনটি খুব ছন্দময়, গতিময় আর সুরেলা। যতটা মনে পড়ে, গানটির মিউজিক ভিডিওতে প্রিয়াংকা চোপড়া জড়িত ছিলেন। এই গানটির হাজার হাজার কপি ইউটিউবে আছে। আমি ওই নির্দিষ্ট অ্যালবামটি খুঁজছি। সাহায্য করতে পারেন। না করলেও ক্ষতি নেই। আমি জানি আমি পাব। এ সপ্তাহের সপ্তাহান্ত বার্তা এটাই-গান শুনুন। মনের মতো। সুখে বা অসুখে। মন সুখী হবে। ব্রায়ান এডামস: দিস সাইড অব প্যারাডাইজ। আমার এককভাবে সর্বাধিকবার শোনা অন্যতম গান। আপনার জন্য সপ্তাহান্ত উপহার:

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-৩২:

’বোরিং’ বলে একটা শব্দ আছে ইংরেজিতে। এর উপযুক্ত বাংলা কী তা জানি না। কিছু কিছু মানুষ নাকি বোরিং হয়। আমি মানুষটা সেক্ষেত্রে মাত্রাছাড়া বোরিং। আমাকে নতুন বছর, পুরোনো বছর, নির্বাচন, প্রমোশন, বিশেষ দিবস-কোনো কিছুর উত্তাপই স্পর্শ করে না। কোনোকিছুই আলোড়িত করে না চিন্তার জগতকে। তবুও, কখনো কখনো কুম্ভকর্ণেরও তো ঘুম ভাঙে, তাই না? আমারও। আর তখনই দেখি, কোনো একটা উপলক্ষ্যে চারপাশে উৎসব চলছে। তাড়াহুড়ো করে লাফ দিয়ে উঠি, তড়বড় করে কিছু একটা করে ওই উৎসবে শামিল হতে। এবারও হয়েছে তাই। ২০১৮ ছিল সবক্ষেত্রেই একটি দুঃস্বপ্নের বছর। ২০১৯ কেন্দ্রীক কোনো স্বপ্নও তাই নেই। শুধু শেষ দিকে এসে এক সুহৃদের চাপে একটা বই বের করার কোপে পড়তে হল। সেটা বের হবে বইমেলায়। সেটাই প্রাপ্তি। স্বপ্ন আছে, লক্ষ্য আছে জীবন ভিত্তিক, প্রয়োজন ভিত্তিক। জীবনটা আসলে তারিখ ভিত্তিক না, বড্ড বেশি বাস্তবভিত্তিক। বাস্তব সেই জীবনের জন্য ২০১৯ সবার জন্য ভাল বয়ে আনুক। শুভ ও সুন্দর বয়ে আনুক। আমার জন্য ২০১৯ বাস্তববাদী হবার আর ঘুরে দাড়াবার বছর। আপনার? শুভকামনা নিরন্তর।

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-৩৩:

আমাদের একজন লেখক বন্ধুর একটা কবিতার বই আছে, “কোথাও একটা লুকোনো বিষাদ আছে”। বিষাদ ও বিষন্নতা বোধহয় সবচেয়ে বেশি দৃষ্ট কোনো বাস্তবতা। সত্যিই, মানব জীবন প্রচুর বাস্তবতায় ঘেরা। জীবনে বিষন্ন হননি, এমন মানুষ কি খুঁজে পাওয়া যাবে? প্রতিদিন জীবনকে বিষিয়ে দেবার মতো, মনকে বিষন্ন করার মতো হাজারটা ঘটনা ঘটে জীবনে। হয়তো চাকরিটা মন মতো না। হয়তো বেতনটা বাড়ছে না। হয়তো প্রেমিকার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে।হয়তো পরিবারে ভেজাল। কারো আবার হয়তো, “কিচ্ছু ভাল্লাগে না।” তবে এত এত বিষন্নতার মাঝেও বিধাতা কিছু না কিছু আনন্দের উপলক্ষ্যও রেখেছেন পৃথিবীতে। প্রতিটা খারাপেরও আছে ভাল কিছু দিক। প্রতিটি অপ্রাপ্তি, প্রতিটি অসঙ্গতি, প্রতিটি দুঃখ, প্রতিটি ব্যর্থতা, প্রত্যেকটা আঘাত নতুন কিছু করার, নতুন কিছু ভাবার, নতুন করে ভাবার সুযোগ আর অনুপ্রেরনা নিয়ে আসে। প্রতিটি বেদনার আড়ালে হয়তো কোনো লুকোনো হাসিও আছে। আছে কোনো লুকোনো সম্ভাবনা। যাই ঘটুক আপনার সাথে, কোথাও না কোথাও তারপরও কিছুটা আনন্দ নিশ্চই আপনার জন্য বরাদ্দ আছে। শুধু তাকে খুঁজে নেবার অপেক্ষা।সেই অজানা, অচেনা, অদেখা সম্ভাবনাকে নিরন্তর, অতন্দ্র ও ক্রমাগত খুঁজে চলাতেই মানবের স্বার্থকতা। প্রতিটি নতুন দিনের শুরুতে নিজেকে তাই বলতে ইচ্ছে করে, “কোথাও একটা লুকোনো আনন্দ আছে।” শুভ ইতিবাচকতা। শুভ সপ্তাহান্ত।

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-৩৪:

হঠাৎ হঠাৎ অচেনা লোকেরা নক করেন, “ভাই, কেমন আছেন?” একটা সময় হয়তো খুব বিরক্ত হতেন। কাজের সময়ে একখানা হাফটিকিট ভেবে। আরেকটা কারনও থাকত। তখন বন্ধুর সংখ্যায় প্রাচুর্য ছিল। ফলে অপেক্ষাকৃত অচেনা কাউকে নিয়ে ভাববার সময় কম মনে হত। কিন্তু সময় বদলায়। জীবন রং পাল্টায়। ভর যৌবনে বন্ধু না বাড়ালে পড়ন্ত বয়সে যখন বন্ধু বাৎসল্য আবার বান ডাকে, তখন কাউকে আর কাছে মেলে না। মজার ব্যাপার কী জানেন? গত তিন দিনে বন্ধু আর বন্ধু না-এই নিয়ে অন্তত ৪/৫ টা বাহাসের মুখে পড়েছি। বন্ধু, হাফ বন্ধু, ফুল বন্ধু, বন্ধুর মতো বন্ধু-নানা দ্বন্দ্ব। কখনো কখনো ভাবি, “আমি কি কারো বন্ধু?” বেশিরভাগ সময়ই মন উত্তর দেয়, “না, তুমি নও।” বলছিলাম জীবন রং পাল্টায়। রুচী বদলায়। চাহিদা পরিবর্তন হয়ে যায়। ভর যৌবনে যাকে অসম্ভব মনে হত, পড়ন্ত যৌবনে তাকে ঘাড়ের পিছনে নিশ্বাস ফেলতে দেখবেন। যাকে মনে হত, ধুর, ওসব আবার হয় নাকি, সেটাই মনে হয় পরম আরাধ্য। জীবনকে খুব বিশ্বাস করবেন না। নিজের আত্মবিশ্বাসকেও আরেকটু যাঁচাই করে নিন। সবসময় দুটো রাস্তা হাতে রাখাই ভাল। তাতে অকালে নিজের সিদ্ধান্তের জন্য পস্তাতে হয় না। জীবনকে বহুভাবেই দেখা যায়। A positive person has a solution for every problem. A negative person has a problem for every solution. শুভ সপ্তাহান্ত।

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-৩৫:

আমি আপনি সবাই এটাই বিশ্বাস করি, যে, আমি আমাকে খুব ভাল করে চিনি। আসলে আমরা নিজেকে খুব কমই চিনি। আমি আপনি সবাই এটাই বিশ্বাস করি, যে, আমি মানুষ চিনতে ভুল করি না। আসলে আমরা মানুষকে খুব কমই চিনি। জীবনে যেটা চিরকাল ভেবে এসেছেন, জেনে এসেছেন, তার বাত্যয় ঘটবার সম্ভাবনা অনেক। যাকে ভাবতেন, প্রাণেশ্বরী, যাকে না পেলে বাঁচবেন না, যে আপনার জীবনের আলো-তার ভালবাসাও ফিঁকে হয়ে যেতে পারে। যার অনুপস্থিতি আপনার জন্য মনে হত নরক জ্বালা, একদিন আসতে পারে, তার উপস্থিতিই মনে হবে নরক যন্ত্রণার সমতূল্য। জীবন দিয়ে দেবে আপনার জন্য বা আপনি দেবেন তার জন্য-এমন প্রাণহরা মহব্বতও বাস্তবতার কষাঘাতে রূপান্তরিত হতে পারে অচেনা সময়ে। আমি তাই বলি কি, সম্পর্কে একটু আড় রাখুন। একটু লাগাম থাকুক আবেগে। একটু হলেও হৃদয়ের দরোজায় অর্গল রাখি বেঁধে। নিজেকে উজাড় করে দিতেই পারেন। তবে ফেরার রাস্তাটা যেন খোলা থাকে। খারাপ কোনো কিছুর জন্য তৈরী থাকলে ভালটা এমনিই ঘটে। হয়তো এত হিসেব নিকেষে সম্পর্কটা একটু পানসে মনে হতে পারে। হোক, প্রত্যাখ্যান বা বিশ্বাসঘাতকতার আঘাত তার চেয়েও বেশি দুর্বহ। আপনি এমনটা করলে কি বিশ্বাসহীনতা কিংবা বিশ্বাসঘাতকতা যাবে থেমে? নাহ! হ্যা, কিন্তু আঘাতটা কিছুটা হলেও সহনীয় হবে। কাল সময়টা নিজের হোক বা অফিসের, নিজেকে বদলানোর সময় সবসময়ই থাকে। শুভ সপ্তাহান্ত।

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-৩৬:

আচ্ছা, জানেন কি, ইদের বাজারের ভীড় কি শুরু হয়ে গেছে? কী জানি, হয়তো হয়েছে। প্রতি ইদে বাঙালি হিসেবে যেকোনো প্রকারেই হোক, একটা বড় বাজেট আমরা খরচ করি নতুন পোষাক কেনা এবং উৎসবের খানাপিনাসহ নানা আয়োজনে। সবচেয়ে দরিদ্র লোকটিও এই উৎসবে চেষ্টা করে প্রিয়জনকে যাহোক কিছু একটা দিতে। ঢাকাসহ বড় বড় শহরগুলোর মার্কেট ও শপিং মলগুলো এখন সরগরম। আপনিও নিশ্চই দিন গুনছেন। বাসায় হয়তো অসন্তোষ, আজও গেলেন না, আর কবে যাবেন। বাচ্চারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে, কবে বাবা কিংবা বাবা-মা তাদের নিয়ে শপিংয়ে যাবেন। যেভাবেই দেখি, এই ধর্মীয় পার্বণের সাথে আমাদের সামাজিক মিথস্ক্রিয়া জড়িয়ে গেছে যুগে যুগে। ভালই লাগে। নিজের মানুষদের কিছু না কিছু দিতে। হ্যা, পেতেও।এই দেয়া থোয়ার ভিতরেই, আরেকটু কাজ কি করবেন? এই ইদে আপনার কাছে যদি বাড়তি বাজেট থাকে, কিংবা যদি বাজেটটাকে সামান্য সমন্বয় করার সুযোগ থাকে? >ঢাকার অন্তত ১০ লক্ষ পরিবার শপিং করবে। প্রত্যেক পরিবার একটি পথশিশুর জন্য ১৫০ টাকায় ফুটপাত হতে একটি জামা বা ফ্রক কিনে দিলেও ১০ লক্ষ পথশিশু (অত শিশু নেইই) ইদের জামা পাবে। >অন্তত ৫ লক্ষ পরিবার ঢাকায় ঈদ করবে। ঢাকা ও আশপাশে অন্তত ৫০ টি বৃদ্ধাশ্রম আছে। এই ৫ লক্ষ পরিবার হতে মাত্র ১,০০০ পরিবার যদি ইদের দিন ২ জন করে বৃদ্ধ বৃদ্ধাকে সেমাই খাওয়াতে চায়, সমস্ত বৃদ্ধাশ্রমে ইদের সেমাই খাওয়ানো খুব সম্ভব। >আজ ১০ রোজা। আর আছে ১৯-২০ টি। এই ১৯-২০ দিন আমরা যতগুলো রিকশায় চড়ব, প্রত্যেকবার ১ টাকা করে বাড়তি ভাড়া দেব। প্রতিদিন ঢাকায় রিকশা ট্রিপ হয় অন্তত ২ লক্ষ রিকশাওলার ৫০ টি করে। প্রতিবার ১ টাকা বাড়তি পেলে দিনে পাবে ৫০ টাকা বাড়তি। তাতে ২০ দিনে ১,০০০ টাকা। তার পরিবারের ঈদ আনন্দ কেনার জন্য যথেষ্ট।>পিওন, ক্লিনার, ড্রাইভার, বাসার দারোয়ান যে সারাবছর আপনাকে সেবা দেয়, ১৩০ টাকার একটি বাজেট রাখা যাবে তাদের জন্য? এপারটমেন্টে ১০ টি পরিবার। ১৩০ টাকা করে দিলে ১,৩০০ টাকায় তার ঈদ দারুন হয়ে যাবে।>বহু বছর হয়তো রাগ করে, অভিমান করে মা-বাবার কাছে যান না। এই ইদে ভেঙে ফেলুন সেই অভিমান। হঠাৎ করে গিয়ে হাজির হোন ইদের দিন। >অামাদের জানার বাইরে আরেকটা জগত আছে। ইদের মতো দিনেও কিছু মানুষ আছেন যারা নিঃসঙ্গ দিন কাটান। একটু কান পাতলেই তাদের দীর্ঘশ্বাস শুনতে পাবেন। তাদের কাছে ডেকে নিতে পারেন। >আপনার কাছাকাছি কোনো কবরস্থান থাকবেই। এই জাতীয় খুশির দিনে তাদের খুশি করবেন না? চলুন, কবরস্থানে যাই, দোয়া করি তাদের জন্য। ঘরে বসেও করা যায়, কিন্তু সেখানে গেলে আপনার লাভ বেশি। সপ্তাহান্ত মেসেজটা এ হপ্তায় একটু ভারী হয়ে গেল। সামনের সপ্তাহে আমার নিজেকে দেয়া ছুটি। নো সপ্তাহান্ত মেসেজ। আপনিও বাঁচোয়া। কেউ থাকছে না বিরক্ত করার। সেই পর্যন্ত শুভ সপ্তাহান্ত। 

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-৩৭:

রাইটারস ব্লক নামে বড় বড় লেখকদের একটা দামী অলঙ্কার থাকে। তারা সেই অলঙ্কার সময়ে সময়ে বের করেন। নিজেদের দরকারে। পাতি লেখকদের কিংবা “হতে পারতাম লেখক’দের সেই বালাই নেই। তাদের যেহেতু পাঠক নেই, সমালোচকই তার পাঠক, তাদেরকে লেখার মান বা রুচী, মেজাজ নিয়ে ভাববার ঝামেলায় যেতে হয় না। ‘ট্র্যাস’ লেখকদেরও হয়তো কিছু সামাজিক দর থাকে। পাতি লেখকদের আবার তাও না। বড় লেখকরা তাদেরকে তাদের দামী প্রোফাইল হতে কখনো কখনো অরুচীর প্রেক্ষিতে মুখ তুলে তাকিয়ে পাতিদের কাজকারবার দেখেন। মুচকী হাসেন। তারপরই “হ্যা, তারপর কী যেন বলছিলে” ধরনের একটা বাউলি কেটে সরে যান অন্য কোনো ব্যস্ততায়। যাহোক, আজ লেখক বা পাতি লেখকদের নিয়ে পড়ব না। কী লাভ, যে এমনিতেই মরা, তাকে আরো খুঁচিয়ে? গৃহী মানুষের মতো ঘরে ফিরতে ফিরতে অকাল গ্রীষ্মের পড়ন্ত সূর্যদেবকে দেখে নিজের পড়ন্ত প্রাণের সাথে মিলাতে চেষ্টা করছিলাম। শেষ বিকেলটা আমার যুগপতভাবে আনন্দের আবার কষ্টের। আনন্দের, কারন এই সময়টাতে হঠাৎ একদিন পথে নামলে, জানালাতে চোখ পাতলে বিষন্নতা ভর করে। বিষন্নতা, আমার প্রিয় দুঃখবিলাস। অনেক অনেক দিন পরে আজ কেন যেন বিষন্ন হতে পারছি না। হাসলেন বুঝি? ইচ্ছে করে বুঝি আবার বিষন্ন হওয়া যায়? যায় যায়, একটা বিষন্ন অতীত সর্বক্ষণ বুকপকেটের মতো করে সাথে নিয়ে চললে চাইলেই সেখান হতে কিছুটা বিষন্নতা ধার নেয়াই যায়। ছোট্ট পকেট আয়নায় মুখ দেখার মতো করে সেই বুকপকেটের বিষন্নতা সারামুখে চোখে মাখিয়ে নেয়া যায়। ধনুকের মতো বাঁকা শরীরের ফ্লাইওভারের ওপরে দাড়িয়ে যখন দূর সামনে যানজটের মাথায় শেষ রিক্সাটায় একজন এলোচুলের সুকেশিনী বা সুবেশিনীকে ঘন ঘন ঘড়ি দেখতে দেখবেন, আপনি না চাইতেও আপনার অতীতের ঘরে চুপ করে পড়ে থাকা অকাল মৃত প্রেমের জন্য বিষন্ন হবেনই। যারা যারা এই পর্যন্ত পড়তে পড়তে ভাবছিলেন, এইবার বোধহয় টূপ করে আমি বিষ্যুদবারের সপ্তাহান্তটা বলেই ফেলব। নাহ, বলেছিলাম না, আগামী দুই সপ্তাহ আমার ছুটি। আজ সেই দুই সপ্তাহ’র শেষ। নিজেকে দেয়া দুই সপ্তাহ। কী বললেন? মন খারাপ করলেন, সপ্তাহান্ত না পেয়ে? প্রতি সপ্তাহান্তে খুব সুন্দর একটা বার্তাবাহি লেখা লেখে আমার স্বজাতি  Samiul Mashooq Antony এন্টোনি। কাজের জাতেই এক, পাতে সে বহু উপরে। তাকে দেখেই আমার সপ্তাহান্তের বিষয়টা মাথায় গেঁথে যায়। অনাহুত অনুকরন করি তারটা। আরো একটা মাথায় গেঁথেছিল। সেটা হল Shibli H. Ahmad শিবলী ভাইয়ের শুভ সকাল বার্তা। বড্ড লোভ হয়, ভাল কিছু দেখলেই নিজের করে নিতে। সময়াভাবে পারি না। ওদের মতো ধারাবাহিকতাও রাখতে পারি না। দুইদিন একটা কিছু করেই হাপিয়ে উঠি। কোনো কিছুতে নিজেকে বাঁধতে পারি না। কোথাও কখনো নোঙর করা হয়তো এজন্যই হল না। নাহ, ভুল বললাম। নোঙর তো করিয়েছিল একজন। বছর দশেক আগে। নিটোল নামে এক রহস্য নারী। তার পোতাশ্রয়ে নোঙর করিয়ে আমাকে থীতু করেছিল। যে কখনো থীতু হতে চায়ই নি। ঠিক আছে, আজকে সবাইকে আকাশের ঠিকানায়ই শুভ সপ্তাহান্ত রইল। ব্যস্ততা আর কিছুটা বিহবলতায় আজ ঘরে ঘরে পৌছাব না সপ্তাহান্ত বার্তা। বরং ঘরে ফিরতে ফিরতে স্বভাবসুলভভাবে জ্যামে বসে হঠাৎ লেখা এই এলেবেলেতেই বলে নিই খানিকটা। আমরা সবাই মনে করি, নিজেকে নিজে খুব চিনি। নিজেকে খুব ভাল করে জানি। মনে করি, আমি খুব অভিজ্ঞ, খুব পোড়খাওয়া হয়েছি। মনে মনে নিজেকে খুব আবেগমুক্ত, নিরেট কল্পনা করি। আসলে কি জানেন? আমাদের সারাজীবনটাই অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য পড়ে থাকে। অভিজ্ঞতা জীবনের শেষ দিন, শেষ ক্ষণটাতেও বদলায়। যেমনটা বদলেছিল জুলিয়াস সিজারের। যেজন্য সে বলেছিল, “এল ব্রূটে? ব্রূটাস, তুমিও!!” নিজেকে নিয়ে খুব বেশি আত্মবিশ্বাসী না হোন। নিজেকে আমরা খুব বেশি আসলে চিনি না। যতটা মনে করি, ততটাতো নয়ই। ভাল থাকবেন পরের সপ্তাহটা।

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-৩৮:

প্রিয় সুহৃদ,ছোটবেলায় খেয়েছেন কিনা জানি না। দুটো মুখরোচক খাবার-চাল ভাজা আর চানাচুর। বর্ষার দিন হলে তো কথাই নেই। কুকুর বিড়াল বৃষ্টিতে টীনের চালে ঝমঝম শব্দের মধ্যে ঘরে আটকে পড়ে পিঁয়াজ, রসুন, সর্ষের তেল দিয়ে মাখানো চাল ভাজা, ঝালমুড়ি, শীমের বীজ, মটর, ছোলা ভাজা খাবার স্বাদ আজও অনুভব করি। আসছে বর্ষাকাল। আস্বাদন করে দেখতে পারেন। টীনের চাল তো আজ আর নেই। ব্যস্ত নগরে কংক্রীটের ছাদের তলে এক চিলতে ঝুল বারান্দাই সই। প্রিয়জনদের নিয়ে আয়োজন করে, বা হঠাৎ বৃষ্টিতে জমিয়ে ফেলুন আড্ডা। আমাকেও দাওয়াত করতে পারেন। হা হা।চালভাজা আর চানাচুর খাবার একটি খুব সমস্যার দিক কী জানেন? খাবার দুটো যতক্ষণ খাবেন, ততক্ষণই মনে হবে, আরেকটু খাই। আরেক মুঠো মুখে দিই। তারপর আর দেব না। এটাই শেষ। কিন্তু পরক্ষণেই দেখবেন, আপনি আবার একমুঠো হাতে নিয়ে গালে দিয়ে চিবোচ্ছেন। একসময় খেয়াল হবে, আরে! অনেকটা বেশি হয়ে গেছে তো। ব্যাস! পেট ব্যথা বা গ্যাসের হামলা। ঠিক যেমন হল স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট। আরো আছে ফেসবুক, মেসেঞ্জার। যা ব্যবহার করে কখনোই আপনার মনে হবে না, যথেষ্ট হল, এবার থামি। বরং সারাক্ষণই মনে হবে, আরেকটু দেখি না। আরে, দেখি না, নতুন কী এলো। মোবাইলের স্ক্রীনে হাতের আঙুলে সোয়াইপ করতে করতে আঙুল ব্যথা হয়ে যাবে। মনে হবে, এবার থামতে হবে। কিন্তু ক্ষণিক পরেই দেখবেন, আঙুলটা মটকে আবার শুরু। এটাই আসক্তি। মোবাইল ও ফেসবুক আসক্তি। ধ্বংস করছে সময়, দাম্পত্য, পরিবার, সুযোগ, সম্ভাবনা ও স্বাস্থ্য। আসক্তি হতে বেরিয়ে আসতে হবে। হবেই। ছোট্ট করে একটি অনুরোধ করি। নিজের আসক্তি কমাতে ও সময়কে আরো মূল্যবান কাজে লাগাতে ফেসবুকে স্ক্রল করে করে কে কী করলেন-তা দেখাতে লাগাম টানছি। বন্ধ করছি না, নিয়ন্ত্রণ আনছি। তাই আপনার মূ্ল্যবান লেখা, তথ্য, পোস্ট, সংবাদ, সৃষ্টি, চমৎকার একটি অভিজ্ঞতা যাতে না হারাই, তাই আমাকে নিঃসঙ্কোচে আপনার অমন পোস্টে ট্যাগ করে দিতে অনুরোধ থাকল। আমাকে যদি আপনি চিনে থাকেন, তাহলে আপনিই জানেন, কোনটি ট্যাগ করার মতো, কোনটি নয়। এই সপ্তাহান্ত ও আগামী সকল সপ্তাহান্ত হোক সময়ের শ্রেষ্ঠ ব্যবহারের। সপ্তাহের অবসর হোক পরিবারময়, নিজের আরো কাজের অফুরন্ত সময়। স্মার্টফোন ও সামাজিক মাধ্যমের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের শুভকামনা জানিয়ে শুভ সপ্তাহান্ত।

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-৩৯:

কী দিয়েছে পৃথিবী আমাকে? কী পেয়েছি জীবন হতে?কখনো কি এই জিজ্ঞাসা আসে মনে? এসে থাকলে সেটা অস্বাভাবিক নয়। জীবনটাই একটা হিসেব নিকেষ। পাওয়া না পাওয়ার। চাওয়া পাওয়ার।কখনো হিসেব মেলে। কখনো মেলে না। যখন আর কলম চলে না, যখন দ্রূত চলা চিন্তার ঝড় স্তিমিত হয়ে আসে, যখন ক্লান্তি ভর করে অলস দুপুরে, তখুনি জীবনের হিসেব মেলাতে বসি। দেখি হিসেবের খাতা একদম নিষ্পাপ, শূন্য। কোনো কালির আঁচড় তাতে লাগেনি। মনে হয় শুধুই হারিয়েছি। শুধুই দিয়ে গিয়েছি। কী? স্বার্থপর মনে হচ্ছে? আজ একটু হই না স্বার্থপর? একটু আত্মকেন্দ্রীক? নিজেকে নিয়ে আজ একটু ভাবি না? পিছু ফিরে নিজেকে একটু দেখি। নিজের চেয়ে আমরা কাকে আর বেশি ভালোবাসি? নিজের চেয়ে কে বেশি আপন আমার? আসুন একটু স্বার্থপর হই। নিজের প্রাপ্তি নিয়ে একটু ভাবি। নিজের স্থান, নিজের সময়টুকুও কখনো কখনো বুঝে নিই। কাল হয়তো আপনার সপ্তাহান্ত। এটাই সবচেয়ে দারুন সময়, ভাববার। হিসেব মিলবার শুভ কামনা রইল। শুভ সপ্তাহান্তে।

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-৪০: #misery #wastage #showoffatitsbest #exhibitionism #TRPaholic #fameseeker #attentionseeker #projectionist #rebel #expensive #lifestyle #hilsha

বাংলাদেশের বাঙালরা এত জমিদার সন্তান হয়ে গেল কবে হতে?  কোলকাতার লোকেরা এক ইলিশ তিনজনে ভাগে কেনে, তারা এক ডিম দুজনে খায়-ছ্যাচড়া বাঙালদের দাঁত কেলানো এই উপহাসে ফেসবুক সয়লাব।

সুহৃদ মিঠুলের দেয়ালে জনাব রিপন দে’র লেখা এই লেখাটা পড়ছিলাম আর ভাবছিলাম: https://www.facebook.com/rayhanul.m.islam/posts/10157735767828176   

কেন দাদা? আরেকজনের পাতলা পায়খানা হলে আপনার কী? আরেকজন যদি ‘পাড়া’য় যায়, তাতে আপনার ক্ষতি কী? আপনি যদি সেখানে না যান, তাহলেই তো আপনার আর সিফিলিসটা হয় না। আরেকজন যদি কৃপণ হয়-তাতে আপনার অসুবিধা কোথায়?

আপনার বাপের জমিদারী ছিল, কিংবা আপনি আবজাল বা মালেকের মতো ভূঁইফোড় তাল্লুকদার হয়েছেন, আপনার মানিব্যাগ গর্ভবতীর মতো নোটে নোটে স্ফিত, আপনার দশটা ক্রেডিট কার্ড আছে-বলেই বাজারে গিয়ে হাঁক পেড়ে তিন হালি ইলিশ কিনতে পারেন। তাই বলে কি সবার সেটা আছে? আমার বাপ জমিদার না (সামান্য সরকারী কর্মচারী), আমার দাদাও কামলা কৃষক, আমিও গার্মেন্টসের কামলা। আমি কৃপণ নই, কিন্তু আড়ম্বরহীন ও বাহুল্যহীন। তাই বলে কি আমি সস্তার পাঙ্গাস বা তেলাপিয়া কিনতে পারব না? আমি কি ভাগা দরে পুরো মৌসুমে একবার হলেও ইলিশের কাঁটাকুটা কিনতে পারব না?

কেন আমি আপনার বা ‘পাশের বাসার ভাবী’র দাঁত কেলানোর ভয়ে বউয়ের নাকফুল বেঁচে গোটা ইলিশ কিনতে বাধ্য হব? কেন আমি অবশ্যই এক ডজন আপেল, এক ক্রেট কমলা, এক খাঁচি ডিম পুরোটা ধরে কিনতে বাধ্য? ভাগে সিগারেট খেতে পারলে কেন ভাগে মুরগী কেনা যাবে না? কেন আমি তিন পিস মিষ্টি কিনে আপনার বাসায় বেড়াতে যেতে পারব না? আপনি জীবনেও মিষ্টি খান নাই? আপনার কোনো ধারনা আছে, এই দেশের নিম্নবিত্ত একজন বাবা ঠিক কীভাবে তার সংসার চালান? আপনাদের এইসব নাক উঁচু দৃষ্টিভঙ্গীর জন্যই মানুষ আবজাল হয়, মালেক হয়। সামাজিক অপমান হতে বাঁচতে মানুষ অসৎ হয়। সামাজিক খোঁটা মানুষকে খুনি বানায়।

আমি কোনো সমাজ সংস্কারক নই। হবার ইচ্ছেও নেই। আমি বিপ্লবী নই, আবার বিপ্লবের সুবিধাভোগীও নই। ঘৃন্য রাজনৈতিক কীট কিংবা রাজনীতির হক-মওলাও নই। আমি খুব সামাজিক নই, তবে আমি সমাজ বিরোধীও নই। আবার আমি সমাজের সব রীতিনীতির সুবোধ অনুসারীও নই। তথাকথিত ট্যাবু, সামাজিক চোখরাঙানী আর সামাজিক অনুশাসনের তোয়াক্কা আমি খুব করি না। সমাজ আমাকে কী চোখে দেখে-তা নিয়ে আমি খুব ভাবিত নই। কারন একটাই। আমার নিজের বিয়ে হয়ে গেছে এক যুগ আগে আর আমাকে আমার মেয়ে বিয়ে দিতে হবে না-যে আমাকে সমাজকে খুব সমঝে চলতে হবে। আর যারা সমাজকে খুব সমঝে চলেন, ট্যাক্স দিয়ে চলেন, আপনাদের কে ভগবানের মাথার কিরা দিয়েছে, সমাজের এইসব নষ্টামীকে গুরুত্ব দিতে?

আপনার কি তিনটা মেয়ে আছে? মেয়েদের বিয়ে দিতে হলে সমাজকে হাতে রাখতে বাধ্য আপনি? মেয়েকে প্রেম করে ভেগে যাবার বুদ্ধি দিন, তাও ছ্যাচড়া সমাজকে পাত্তা দেবেন না, যেই ছ্যাচড়া সমাজ আপনি মরতে বসলে দুইটা টাকা চিকিৎসা সাহায্য করবে না, আবার মরলে বাড়ি বয়ে এসে কব্জি ডুবিয়ে গরুর মাংস খাবে। সমাজ নামের শুয়োরমুখো দৈত্যের চাপেই আমরা সামর্থ না থাকলেও ঋন করে ধুমধামে মেয়ে বিয়ে দিই।সামর্থ না থাকলেও নিজের হাপানির ওষুধ না কিনে, বাজারে গিয়ে দুটো ইলিশ কিনে আনি। সামর্থ না থাকলেও বন্ধুদের আড্ডায় কেটু সিগরেট না টেনে বেনসন ফুঁকি।সামর্থ না থাকলেও বাড়িভাড়া বাকি ফেলে অমুকের পোলা তমুকের বিয়েতে দামী উপহার কিনি। সামর্থ না থাকলেও, জীবনে কখনো ব্যবহার হবে না জেনেও দামী ডিনার সেট কিনে সাজিয়ে রাখি।সমাজের লজ্জাতেই, স্টাটাস বজায় রাখতে বাসা অপ্রয়োজনীয় সোফা, কেবিনেট, ঝাড়বাতি দিয়ে সাজাই।

নষ্টা সমাজের লজ্জাতেই আবার ওজু না থাকলেও অফিসে নামাজের কাতারে দাড়িয়ে যাই। নষ্টা সমাজের চাপে রজঃশলা হওয়া সত্বেও ‘শরীর খারাপ’ বলতে বাধ্য হই। আরেহ! রজঃশলা হওয়া কি শারীরিক অসুস্থতা?নষ্টা সমাজের ভয়েই শনির আখড়ার প্রেমিককে রমনায় পার্কে গিয়ে প্রেমিকার হাতটা ধরতে হয়। এই নষ্ট সমাজই সী-বীচে হাত ধরে হাঁটার সময় জামাই-বউয়ের কাছে কাবিনের প্রাপ্তি দাবী করে। এই নষ্ট সমাজের অপমানের নির্দয় আঘাতের ভয়েই চাকরি হারিয়েও কাউকে বলা যায় না।

এই নষ্ট সমাজই ফেসবুক, ‘পাশের বাসার ভাবী’, ‘আমার ননদ’, ‘অমুকের জামাই তো…..’এইরকম হাজারটা অঘোষিত চাপ দিয়ে দেহ বিক্রী করে, মন বিক্রী করে, আত্মাকে বিক্রী করে ফুটানী আর স্ট্যাটাস ধরে রাখতে নির্দয়ভাবে নিরুপায় মানুষকে বাধ্য করে।সমাজ লজ্জা আর লোক লজ্জার মুখে মুত্রত্যাগ করে মেরুদন্ড সোজা করুন। যতক্ষণ অন্যের ক্ষতি আর অন্যের কোর্টে ঢুকে না পড়ছেন, ততক্ষণ,যা সামর্থে কুলায় কিনুন। যা করতে মন চায়, করে ফেলুন। যা সাজতে মনে চায়, সাজুন। বুড়ো হয়েছেন, তবু লাল জামা পরবেন? পরুন।

নিজেকে যেমন দেখতে মনে চায়, তেমন দেখুন। ছেলে মানুষ বাবরি রাখবেন? রাখুন না। মেয়ে মানুষ, বয়কাট দেবেন? দিন না। মাথা ন্যাড়া করতে মনে চায়, করুন। পাড়ায় আত্মীয় স্বজন আছে, রাস্তায় দেখা হয়ে যায়, অথচ বর্ষার দিনে একটা বিড়ি ধরিয়ে রাস্তায় উদাস হয়ে হাঁটতে ইচ্ছে করছে-গোপাল বিড়ি ধরিয়ে নির্দ্বিধায় হাঁটুন। চাকরি করতে করতে ক্লান্ত, বিরতী চাচ্ছেন? আজই ছাড়ুন চাকরি। শশুর বাড়িতে দাম কমে যাবে? যাক না। এত দাম পেয়ে কোন হাতিঘোড়াটা করবেন?প্রকাশ্য রাজপথে দিবালোকে প্রেমিকাকে চুমু খেতে মনে চায়, খান।লম্পট জামাইকে ডিভোর্স দিতে মন চায়, দিন।বিয়ে না করে স্বাধীন থাকতে মন চায়, থাকুন।বিয়ে করেও বাচ্চা নিতে মন চায় না, না নিন।

পেটে জমা হাজারটা ক্ষোভের বায়ু আটকে রেখে বিস্ফোরনম্মুখ? পশ্চাদদেশ হতে তাকে সশব্দে বের করে দিন। পাবলিক হাসবে? হাসুক। লুঙ্গী পড়ে বিমানে চড়তে ইচ্ছে করে? ভদ্দরনোকরা হাসবে বলে করছেন না? হাসুক না। লাগলে ওনাদের আরও হাসানোর জন্য লুঙ্গীর ওপর একটা লাল জাঙিয়া পড়ে নিন।অন্যায্য সুবিধার টোপ দেয়া-নেয়া বসকে ঠাটিয়ে চড় দিতে ইচ্ছে করে? দিয়ে দিন। মানুষ আপনাকেই দুঃশ্চরিত্র ভাববে? ভাবুক না। চরিত্র কি ধুয়ে খাবেন? নাকি নোবেলের জন্য আবেদন করবেন?সামর্থে কুলোচ্ছে না-সন্তান তবু বাইক কিনে দেবার জন্য বায়না করছে? কী ভাবছেন? না দিলে সমাজে মান থাকবে না?

আরে, পশ্চাতদেশে লাত্থি দিয়ে ঘর হতে বের করে দিন।ছেলেটা ড্রাগ নেয়, মেয়েটা বাবা খায়? মানুষ কী বলবে ভেবে চেপে যাচ্ছেন? দুটোকে আজই রিহ্যাবে পাঠান। ওদের মা ভেউ ভেউ করে কাঁদবে? তাকেও পাঠিয়ে দিন। তারও রিহ্যাব দরকার। সমাজ নামের নিষ্ঠূর ও ভন্ড সত্বা যখন তার অসহায়, নিরুপায়, প্রতারিত, ভাগ্যাহত সদস্যকে রক্ষা করে না, সাহায্য করে না, আর তারপরও ‘সমাজ বলে একটা কথা আছে’ এই মহান খ্রীষ্ট বাণীর জাক্কুম আপনাকে গিলাতে আসে, তখন মুখ দিয়ে ‘ফোঁৎ’ করে একটা শব্দ করুন, ’সমাজ কী বলবে’কে পিচিক করে থুতুর মতো নিক্ষেপ করুন, আপনার হাতটি মুষ্টিবদ্ধ করুন, আর তারপর -মুষ্টিবদ্ধ হাতের মধ্য হতে আপনার ঘৃন্য মধ্যম আঙুলটিকে বের করে বাপের বেটার মতো সমাজকে বলুন,

‘ন ডরাই’।

আর তারপর আমার তরফ হতে শুভ সপ্তাহান্ত গ্রহন করুন।

শুককুরবারের পাঁচালী/শুভ সপ্তাহান্ত-৪১: অলস সপ্তাহান্তের বিকেলে: #Reflex #slowgoing #slownsteady #doingnothing

টিভিতে ক্যাটবেরির একটা বিজ্ঞাপন হয়। থীমটা হল, কখনো কখনো কিছু না করেই বরং অনেক কিছু করা হয়ে যায়। দেখেছেন নিশ্চয়ই? প্রশ্নটা করার কারন পুরোটা পড়লে বুঝবেন।

আমি নিজেকে যখন মূল্যায়ন করি, তখন যেসব সীমাবদ্ধতা উঠে আসে, তার একটা হল আমার দুর্বল রিফ্লেক্স। এই দুর্বল রিফ্লেক্সের জন্য আমি কথা বলায় পারদর্শী না। কিন্তু মন খুলে লিখতে পারি। আমি এ কারনেই ক্রিকেটে ভাল করতে পারিনি। রিফ্লেক্স কম থাকত বিধায় সবসময় পেস বোলিং খেলতে ভয় পেতাম।

আমার ধারনা, আমার ভাগ্যেরও রিফ্লেক্স অনেক অনেক কম। ওই ধরুন, ফ্লপি ডিস্কেটের সময়ের র‌্যামের মতো। ওই সময় র‌্যাম হত ৬৪ এমবির। ১২৮ থাকলে সেই কম্পিউটারের মালিককে আমরা বিষ্ময়ের চোখে দেখতাম। অবশ্য এটা সেই সময়ের কথা, যখন এমনকি এরিকসনের ভোম্বা সাইজ মোবাইল সেট হাতে থাকলে তাকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেয়েও ধনকূবের মনে করা হত। যাহোক। বলছিলাম, আমার ব্রেইন ও আমার ভাগ্যের দূর্বল র‌্যাম বা রিফ্লেক্সের কথা। আমার জীবনে সব কিছুই সেকারনে হয়েছে দেরিতে।

মুসলমান ঘরের পুরুষ সন্তানের খৎনা হয় গড়পড়তা ৪/৫ বছর বয়সে বোধহয়। আমার বয়স যখন ৬ না সাড়ে ৬, তখন সবার মনে পড়ল, আরে আরে, ব্যাটা তো এখনো ‘এন্দু’ রয়ে গেল। আধ-দামড়া বয়সে খৎনা হল। যেই বয়সে নিজস্ব রেচনাঙ্গ লুকিয়ে ছুপিয়ে রাখার লজ্জা এসে পড়ে, সেই বয়সে। বঙ্গ জাগ্রত সমাজ আবার খৎনা হলে বাড়ি বয়ে এসে সেই কাটা রেচনাঙ্গ নিয়ম করে দেখে যেতে অভ্যস্ত। বোঝেন আমার অবস্থা। বঙ্গদেশে আবার ওই কর্ম না সারলে নাকি সে মুসলমান হয় না। তার মানে মুসলমানও দেরিতে হলাম। স্কুলে সবাই ভর্তি হয় ৫ বছরে। আজকাল অবশ্য নাড়ি কাটার আগেই স্কুলের টিকিট কেটে রাখা হয়। আমি স্কুলে গেলাম ৭ বছরে। তাও বাপের পিটুনি খেয়ে আর ভাত বন্ধ হয়ে যাবার ভয়ে। বাঙালি পুরুষ সন্তানরা বিড়ি খাওয়া শেখে হাইস্কুলে উঠেই। আমি সেটা শিখলাম বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে। অবশ্য ক্লাস ফাইভে থাকতে একবার পাটখড়ি দিয়ে বিড়ি বানিয়ে খেতে গিয়ে বেদম মার খেয়েছিলাম। বাঙালি পুরুষ প্রেম করে কলেজে উঠেই। আমি প্রেমে পড়লাম বিয়ের বয়সে এসে। বেরসিক আপনি যদি এবার জানতে চান, সাবালকত্ব প্রাপ্তিও কি দেরীতে হয়েছিল? শরমের কথা। না, বাঙালি পুরুষ কালনাগের বাচ্চার মতোই, মায়ের পেট হতেই সাবালক (জিনিসটা সাবালক না, বালেগ) হয়ে জন্ম নেয়। জন্ম নিয়েই বাঙাল পুরুষ নবজাতক পুরুষত্ব’র পূর্ন সদ্ব্যবহার শুরু করে। অবশ্য তার স্বজনরাও পুরুষ জননাঙ্গ নিয়ে জন্ম নেয়ায় তাকে এমনিতেও রাজ নৈবেদ্য অর্পন করার ভিতর দিয়ে তার সাবালকত্বকে তরান্তিত করে। তাও যদি আপনার বিশ্বাস না হয়, তাহলে একটু তলিয়ে দেখতে পারেন, আধবুড়ো আপনি ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি বিষয়ে কিছু না জানলেও ১০ বছর বয়সী পিচ্চিরা ঠিকই জ্যানেট জ্যাকসনের ‘নিপলগেট’ স্ক্যান্ডাল নিয়ে সবই ভাজা ভাজা। যশোরের জেলখানায় কাল নাকি কাগজে কলমে কিশোর বয়সী পুরুষ বাঙালরা মারামারি করে তিনজনকে খুন করে ফেলেছে। এরা আইনে কিশোর, কাজে কামে পুরুষ। সবাই বিসিএস মুখস্ত করে সেকেন্ড ইয়ারে। আমি মাস্টার্স দেবার পরে খেয়াল হল, আরে আরে, বিসিএস এর জন্য তো কিছু কেনা হয়নি। পরীক্ষা শেষ করেই ১৪ পারা এমপিথ্রি কিনলাম। অবশ্য সেই বইয়ের ’সতিচ্ছেদা’ অক্ষুন্ন রেখেই ২ বছর পরে রদ্দি মামার কাছে বিক্রি করে দিয়েছিলাম। চাকরিতে বছর আষ্টেক হলেই বাঙালি পুরুষ ফ্ল্যাট বুক করে। আমি দেড় দশক পরেও এখনও ঢাকার ‘ছ্যাচড়া বাড়িওয়ালা’দের বিলিগোট। কেউ ফ্ল্যাট কেনার অফার করলে নিজেই ফ্ল্যাট হয়ে যাই।

তাই আমি সবসময়ই লেট লতিফ। আমার সব উপলব্ধিই জাগ্রহ হয় দেরীতে। আপনি আমাকে একটা থাপ্পর মারলে কেন সেটা মারলেন, সেটা বুঝব অনেক দেরীতে। প্রমান করতে গিয়ে আবার মেরে বসবেন না যেন। রিফ্লেক্স কম বলে ক্লাসের লেকচার ও পড়া বুঝতে আমার সমস্যা হত। রিফ্লেক্স কম বলেই আমি প্রায়ই আমাকে করা মানুষদের উদ্ভট ও অবান্তর প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যাই। এসব দেরীর মতো করে আবার সবকিছুই দেরী হবে-তা কিন্তু না। আসতে দেরী করেছি (বাপ-মায়ের তিন নং সন্তান), বড় হতে দেরী করেছি। তবে মরতে দেরী হবে না-সেটা নিশ্চিত। তো, সবকিছুতে দেরী হলেও আমি দেখেছি, সেই দেরী আমাকে অনেক অনেক উপকারও করেছে। সেটাই স্বাভাবিক। কলা কিনলে ছোকলাও যে পাওয়া যায়।

সবকিছুতেই পিছিয়ে পড়ে, দেরীতে পেয়ে আমার কেবল যে ক্ষতিই হয়েছে, তা কিন্তু নয়। স্লোয়ার ডেলিভারীতেও ‍কিন্তু উইকেট পাওয়া যায়। আমার দেরীতে জাগ্রত বোধ ও উপলব্ধি আমাকে অনাসক্ত, নির্লিপ্ত, আবেগহীন, নিস্পৃহ, প্রতিক্রিয়াহীন (প্রায়) হতে সাহায্য করেছে। যেটা আমাকে চলতে সাহায্য করে। ছোটবেলায় একটা কথা শুনতাম, “আগে গেলে বাঘে খায়, পিছে গেলে সোনা পায়।” ব্রেইন ও ভাগ্য-দুয়েরই ধীর গতির র‌্যাম আমাকে বিষ্ময়করভাবে অনেক কিছুতেই আশির্বান্বীত করার নজির আছে। তার বিস্তারিত গল্প আরেকদিন করব। প্রথম প্যারার শেষ বাক্যটার কথা মনে আছে? বলেছিলাম না, কখনো কখনো কিছু না করাটাই বরং হয়ে যায় অনেক কিছু করা। একবার এক ভদ্রলোককে চাকরির জন্য খুব অনুরোধ করেছিলাম (তিনি ওই চাকরিটি দেবার চূড়ান্ত অথরিটি)। স্বভাবের বাইরে গিয়ে খানিকটা তোষামোদও করেছিলাম। ভদ্রলোক তারপরও চাকরিটা আমাকে দিলেন না। খুব মন খারাপ হল তখন। অনেক দিন পরে জানতে পেরেছিলাম, ওই প্রতিষ্ঠানে ৬ মাস পরে একবার বেতন হয়। ভাগ্যিস, সেদিন তিনি কিছু করেননি।

তবে আপনার জন্য আমার এত কথার পরে সবক হল, দেরী দেখেই হতাশ হয়ে যাবেন না। ভাগ্যের ট্রেনের দেরী দেখেই টিকেটটা ছিঁড়ে ফেলবেন না। দেরীতে হলেও ট্রেনটা কিন্তু আসবে। দেরীতে হলেও সফলতা আসবে। দেরীতে হলেও আপনার জয় হবেই। দেরী দেখেই যেকোনো কিছুতে রণেভঙ্গ দেবেন না।

তবে হ্যা, সবকিছুতে আবার দেরী করবেন না। জীবনকে অর্থবহ ও স্বার্থক করে তোলার একটি পথনির্দেশ তৈরী আর সেই পথে যাত্রার শুরুটা দেরী করিয়ে দেবেন না। ব্ল্যাক মূভিতে অমিতাভের একটি ডায়লগ ছিল, যা আমার অত্যন্ত পছন্দের। আজ আবার বলি-

Life is an ice cream. Enjoy before it melts.

শুভ সপ্তাহান্ত। আজ বোধহয় ১ বছর পরে সপ্তাহান্ত লিখলাম। শান্তি লাগল লিখে। হয়তো নিয়মিত লিখব।

#weekendmessage #শুককুরবারেরপাঁচালী #শুভসপ্তাহান্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *