১. আধবুড়োদের যন্ত্রণা:
আশির দশকের শেষভাগে জন্ম নেয়া, মানে, আজকের সময়ে যারা চল্লিশের ঘরে বয়স, তারা প্রত্যেকে এক ধরনের টানাপোড়েনের ভেতর দিয়ে পার করেন তাদের নিত্য জীবন। বাংলাদেশ, বিশেষত স্মার্টফোন, মোবাইলে ইন্টারনেট, ফেসবুক, ইনসটা আসার পরের বাংলাদেশ এই চালশে প্রজন্মের জন্য, মানে, আমিও যার অন্যতম জাতক, তাদের জন্য এক অন্যরকম বাস্তবতার বাংলাদেশ। বাংলাদেশকে আমি স্মার্টফোন, মোবাইলে ইন্টারনেট, ফেসবুক, ইনসটা আসার আগের ও পরের বাংলাদেশ-এই দুই অধ্যায়ে দেখি। এই পরের বাংলাদেশে আমার দাদা-বাবা-মা বসত করে যান নাই। গেলেও অভিযোজনের চাপটা অনুভব করার আগেই টুকুস।
আমাদের সন্তানেরাও এই টানাপোড়েনে পুড়বে না। কারন, তারা এসেছে এই বাংলাদেশে, বড় হয়েছে এই বাংলাদেশের সাথে মিল রেখে। টানাপোড়েনটা আমাদের। যারা আমাদের বাবা-দাদাদের আনস্মার্ট বাংলাদেশে জন্মেছি, বেড়ে উঠেছি, আর মধ্য বয়সে এসে, যখন জীবন আর এডাপ্ট করবে না-তখন পড়ে গিয়েছি স্মার্টফোন, মোবাইলে ইন্টারনেট, লাইকি, টিকটক, ফেসবুকময় পরের বাংলাদেশে। এই পরের বাংলাদেশ, এই স্মার্ট বাংলাদেশ আমাদের জন্য এক নিত্য পীড়নের গরাদখানা।
আমাদের শৈশব স্মৃতি, চেনা জগত, চেনা বিশ্বাস-চিন্তা-বোধ-অভিজ্ঞতা প্রতিনিয়ত এখানে ধাক্কা খাচ্ছে, মুখোমুখি হচ্ছে বদলে যাওয়া বোধ-বিশ্বাসের সাথে। না পারা যায় মানতে, না পারা যায় মানাতে। আর না পারা যায় এই বদলে যাওয়া জীবনবোধের মাঝে সুখী হতে। বদলে যাওয়া বাংলাদেশ, ফেসবুক-স্মার্টফোন-ইন্টারনেট-টিকটক-ইন্সটার বাংলাদেশ, যেখানে, ঘুষ-লুট-ডাকাতি-রাহাজানি করে বড়লোক হওয়া এখন ক্রেডিট, ক্লাস ফোর পড়ুয়া বাচ্চাদের প্রেমগাঁথা যেখানে চোখের সামনে দেদীপ্যমান, চেনা-জানা-আপনদের প্রতিদিন দূরে, আরো দূরে সরে গিয়ে ভার্চুয়াল স্বজনে পরিণত হওয়াই কেতা, প্রতিবেশীর ঘরের অক্ষত-শিশ্ন (খতনা হয়নি) শিশুকে পাশে দাড়িয়ে বিড়ি ফুঁকতে দেখা যখন ভবিতব্য ও আধুনিকতা, বাবা-মা কর্তৃক সমাজের অধঃপতনে গা ভাসিয়ে (বা বাধ্য হয়ে) নিজ কন্যাকে সন্ধ্যে হতে গভীর রাত অব্দি লাভ রোডে লাভ করতে দিতে বাধ্য বা প্ররোচিত করাই ‘রেগুলার’,সেই বাংলাদেশে, সেই বদলে যাওয়া স্মার্ট বাংলাদেশে আমাদের মতো ‘আড়াআড়ি’, মানে না ইধার কা, না উধার কা আধবুড়োদের জন্য প্রতিনিয়ত জীবন এক পরিহাস ও নরকের নামান্তরই। না পারা যায় সইতে, না পারা যায় মিশে যেতে। না যায় নিজেকে বদলাতে।————–+————–
২. স্মার্ট প্রজন্মের জঠর জ্বালা:
সস্তা মোবাইল ইন্টারনেট, সস্তা স্মার্টফোন আর অবাধ সোশ্যাল মিডিয়ার হত ধরে যেসব পঁচন ও মড়ক এই জাতটাকে শেষ করছে, তার একটা ভয়াবহ দিক হল, মানুষের ভয়, সংকোচ, লজ্জা, জড়তা, সমীহ, সহমর্মিতা বিষয়গুলো বেমালুম হারিয়ে গেছে।
গুড়ো, ছেলে বা বুড়ো-কারোরই আর কিছু করতে লজ্জা-শরম বলে কোনো বালাই নেই। কারন, তাদেরকে শেখানো হয়েছে, বয়স জাস্ট একটা নম্বর।
সবদিক হতে পুরুষের মতো হয়ে উঠে এবং সবকিছুতে পুুরুষকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে-এই মন্ত্রে দীক্ষিত করে তোলা নারী ভাবছে, বেটা মানুষ যা করে, তা সব করতে পারাই নারীমুক্তি। এটা হচ্ছে, কারন, বার্তাটা পৌছেছে এভাবে, যে, নারী নারী, সব করতে পারি।
বাবা-মা বা বয়োজেষ্ঠদের বয়স বিচারে অন্তত শ্রদ্ধা, সমীহ বা ভয় করার বালাই ঘুচে গেছে বহু আগে। কেনই বা থাকবে? আমেরিকান লাইফ মোবাইলের সূত্রে হাতের মুঠোয়। সেখানে বাবা-মা দৌড়ে থাকে। এখানেও কেন নয়?
শরীর, প্রণয়, যৌনতা নিয়ে আমাদের শরম, সংকোচ, দ্বিধা, সংশয়ের স্বতিচ্ছেদা ছিড়েছে জঘন্যভাবে। স্কুল বালক-বালিকারাও এখন তাই বোল্ড। একাধিক যৌনসঙ্গী, মাদক ও বিকৃত যৌনাচারই এখন স্মার্টনেস, কুলনেস। এটা হচ্ছে, কারন, শেখানো হয়েছে, এটাই প্রগতি। এটাই উন্নত দেশ হবার পথযাত্রা।
সমাজে অন্তত সোশ্যাল ক্লাস বা স্টাটাসজনিত নিয়ন্ত্রণ বা ভয় ছিল। সেটাও টুট গ্যায়ে। রাস্তার রিক্সাওয়ালা, আপনার গাড়িতে দিল ঘষা। তাকে সামান্য বকা দিয়ে দেখুন, জান নিয়ে ফিরতে পারবেন না। অসামান্য এই সামাজিক ক্ষমতায়ন। কারন, আমাদের দিনকে দিন প্রোগ্রাম করা হয়েছে এভাবে, যে, সবাই সমান।
একদিকে যেমন যাবতীয় আড় ভেঙে গেছে, অন্যদিকে বান ডেকেছে লোভ, স্বার্থপরতা, ধান্দাবাজি, প্রতারনার বাজারে। টাকা, ক্ষমতা ও ভোগ-এই তিনজন একজন বাংলার দাপুটে দেবতা। সরস্বতী কিংবা লক্ষী দেবীর ভাত নেই।
টাকা, ক্ষমতা আর ভোগই এখানে ঈশ্বর। এই বেশ ভাল আছি। এই দেশে ভাল আছি।
স্মার্টফোন, মোবাইল ইন্টারনেট, ফেসবুক, ডিশ চ্যানেল-বর্তমান বাংলাদেশের জেনারেশনের অধঃপতনের চরম সীমায় গমনের মূল কালপ্রিট। ইয়াং ও টিন জেনারেশনটা মোবাইলে কী কী করছে সেটা ভাষায় প্রকাশযোগ্য অবস্থাও পেরিয়ে গেছে। স্মার্টফোন এসেছিল আমাদের স্মার্ট করতে। উল্টো আমাদের ভেতরে যে লুচ্চামী ও নোংরামি জল বাতাসের অভাবে এতকাল ঘুমিয়ে ছিল সেটাকেও উদোম করে দিয়েছে। সুযোগের অভাবে বা নির্জনতার অনুপস্থিতিতে যেই তরুনেরা বা তরুনীরা এতকাল “গতিকের গোপাল” ছিল তারাও সব মুখোশ ঝেড়ে ফেলে লাইনে এসে পড়েছে। সামাজিক সুশীলতা বলে একটা ব্যপার বাংলাদেশে শত শত বছর ধরে ছিল। আমাদের তথাকথিত স্মার্ট ইয়োথ ও চোস্ত টিন প্রজন্ম একটানে সেই সামাজিক সংস্কৃতির লজ্জার চাদরটা টান দিয়ে খুলে উলঙ্গভাবে উগ্রভাবে ওয়েষ্টার্ন হবার নির্লজ্জ যাত্রায় শামিল হয়েছে হাসতে হাসতে।
এখন যারা ৬০-৭০ বছরের মুরব্বী তারাই হয়তো শেষ জেনারেশন যারা রাস্তায় কারো সাথে দেখা হলে সালাম দেয় ও নেয়। এখন যারা ৪০শের কাছাকাছি তারাই হয়তো শেষ প্রজন্ম যারা তাদের বাবা-মাকে কিছুটা হলেও ফিল করে আর তাদের সাথে জীবন শেয়ার করে। এরপরে যে স্মার্ট প্রজন্ম তৈরী হচ্ছে তারা আমেরিকানদের মতো ১৮ হলেই বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ড নিয়ে জীবন কাটাতে শুরু করতে আর বেশি দেরী নেই।হও জাতি আরো স্মার্ট হও।
(এই স্টাটাস পড়ে পাইকারী হারে গালি দিতে নেমে পড়বেন না যেন। যারা এখনো পঁচে যাননি তারা ইহার আওতায় নন। আর আমাকে কনজারভেটিভ গালি দেবেন না। নির্লজ্জ ও বিবেকহীন প্রজন্মতাকে আমি প্রগতি বলি না।) ফেসবুক, মোবাইল ইন্টারনেট আর স্মার্টফোন-এই তিনটি যে আমাদের দেশের বাচ্চা, তরুণ, মধ্যবয়স্ক, এমনকি বৃদ্ধদেরও সর্বনাশ ডেকে এনেছে-তা নিয়ে দ্বিধা আছে হয়তো খুব কম মানুষেরই। সেটিকে যদি একটু ন্যারো ডাউন করার চেষ্টা করি;
বলুনতো, এই তিন বস্তু সবচেয়ে বেশি অধঃপতন বা সর্বনাশ করেছে কোন শ্রেণীটার?
ক. শিশুদের?
খ. টিন এজারদের?
গ. ছেলেদের?
ঘ. মেয়েদের?
ঙ. বৃদ্ধদের?————–+—————-
৩. নেগেটিভ ও পজিটিভ: থার্ড ডাইমেনশন:
আজ একটা বায়াজড গল্প হোক। অত্যন্ত বায়াজড ও নেগেটিভ এই গল্প পজিটিভ মানুষেরা পড়বেন না।
আমাকে নেগেটিভ মানুষ মনে করবেন না। আমি নেগেটিভ না। বরং স্ট্রংলী পজিটিভ। তবে আমার এপ্রোচটি ভিন্ন। মানুষ পজিটিভ ঘটবে-এটা ধরে নিয়ে সন্তুষ্ট ও রিল্যাক্স থাকে। আমি যেকোনো কিছুর নেগেটিভ দিকটি আগে খুঁজি। সেটার প্রোটেকটিভ খুঁজি। আমার এপ্রোচ হল, পজিটিভ ইমপ্যাক্টের জন্য রেডি থাকা লাগেনা। পজিটিভ এমনিতেই ন্যাচারালি ঘটে। কিন্তু নেগেটিভ ইমপ্যাক্টের জন্য প্রস্তুতির বিষয় আছে। ওটার জন্য সতর্কতার দরকার আছে। যেমন ধরুন, আপনার একটি প্রোমোশন হল। আপনাকে সেজন্য বিশেষ কোনো প্রস্তুতি নেবার তেমন জরুরী নেই। কিন্তু আপনি যদি জানেন, কাল আপনার চাকরী যাবার সম্ভবনা আছে, তবে আজকে অবশ্যই আপনার বহু কিছু করার বিষয় আছে। আমার নেগেটিভ এপ্রোচটি ওই ডাইমেনশনে। তবে মজার ব্যাপার হল, মনুষ্য সমাজে নেগেটিভিটি কথাটা আপাত অর্থে বাঁকা বা খারাপ চোখে দেখা হলেও পৃথিবী চলে কিন্তু নেগেটিভিটিতে ভরসা করে।
ভেবে দেখেছেন, নেগেটিভ আয়ন না হলে পৃথিবীর মৌলিক স্বত্ত্বা পরমাণু অচল। কারন নেগেটিভ চার্জের টানেই ইলেকট্রন প্রবাহিত হয়। নেগেটিভ হতেই পজিটিভ ফটো প্রষ্ফূট হয়। নেগেটিভিটি না থাকলে বিদ্যুত প্রবাহ ঘটেনা। বিদ্যুত ছাড়া পৃথিবী কয়েক সেকেন্ডে শেষ হয়ে যাবে। সেই আঙ্গিকে একটা নেগেটিভ কথা বলি। বাংলাদেশে (আমাদের যতই খারাপ লাগুক), আগামী ২০ বছরে যত পজিটিভ বা নেগেটিভ চেঞ্জ আসতে পারে, তার মধ্যে একটা হল-অর্থনীতিতে ব্যাপক উন্নয়ন (যদিও সাসটেইনেবল হবার কথা না, হবে কসমেটিক উন্নয়ন।)। আর নেগেটিভগুলোর মধ্যে অন্যতম হবে, আমাদের মৌলিক জাতিস্বত্ত্বাবোধ, জাতীয়তাবোধ, জীবনবোধ, জাতীয় স্ট্যান্ড, জাতিগত উৎকর্ষ, নিজস্ব শিল্প, নিজস্ব সাহিত্য, সাহিত্য চর্চা, নিজস্ব গানের ধারা, সোস্যাল নর্মস ও ইতিহাসবোধ বিলুপ্ত হবে। হবেই। তার জায়গায় স্থান নেবে এক বোধহীন, কসমেটিক, ইমপোজড, পরাশ্রয়ী, মেকি, সুপার ফাস্ট অসহ্য জেনারেশন।
টাকা থাকবে, দান থাকবে না, দান থাকবে তো প্রাণ থাকবে না। গান থাকবে সুর থাকবে না, শিল্প থাকবে তো প্রাণস্পন্দন থাকবে না। কসমোপলিটন একটি বাংলাদেশে পরিণত হচ্ছি আমরা দিনকে দিন। নিজেদের অজান্তেই। যদি আশাবাদ দিয়ে এই মন্তব্যকে কাউন্টার করতে চান, তবে করুন। শুধু ’চেতনা’, ’দেশপ্রেমের ফাঁকাবুলি’, ’জিডিপির উর্দ্ধগতি’ আর ‘এমডিজি’ ওই পতনের ধারায় কোনো বাঁধাই হবে না। হচ্ছেও না। তারই ধারাবাহিকতায় সবগুলো ক্ষেত্রে আমরা দিনকে দিন নামছি আর নামছি। বিশ্বাস না হলে বা অতিরঞ্জিত মনে হলে, নিশ্চিন্তে নাকে তেল দিয়ে ঘুমান। বি পজিটিভ।
৪. পাকা, ইঁচড়ে পাকা ও অতি পাকনাদের প্রজন্ম এবং কিশোর গ্যাঙ:
সেক্স এডুকেশন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিক্যুলামে অন্তর্ভূক্ত করা উচিত কি উচিত নয়-তা নিয়ে খোদ শিক্ষাবীদ ও মনোঃবিদদের ভিতরেই মতভেদ আছে। ‘সাধারন’ কিংবা ‘অসাধারন’-যাই বলি, জনগণের ভিতরে তো আছে তীব্র মতবিরোধ। যদিও, পক্ষের ও বিপক্ষের অনেকের কাছেই পরিষ্কার নয়, সেক্স এডুকেশন আসলে কী। অবশ্য ‘সেক্স’ শব্দটি উচ্চারনই যেই দেশে একটি ট্যাবু, সেখানে এর চেয়ে বেশি কী কাম্য হতে পারে?
১২ থেকে ১৩ বছর বয়সে ‘স্বপ্নদোষ’ নামের অযাচিত ও আপাতঃ বিব্রতকর অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে ‘ছেলেমানুষ’ ’পুরুষ’ হবার যাত্রা শুরু করে। সেই অপত্য ১২ বছর বয়সেই পৌরুষ ও পুরুষের ’বিশেষ’ ক্ষমতা অর্জন করা সত্বেও তাকে বিয়ে ও সংসার নামক প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করতে আরও ৯ বছর (সরকারী বয়স ২১) কিংবা ১৮ বছর (প্রচলিত বয়স ৩০ ধরে) অপেক্ষা করতে হয়। কেন? বিয়ের বঙ্গদেশীয় মূল যোগ্যতা অর্জন তো সেই ১২ বছরেই অর্জিত হয়ে যায়। তাহলে আরও ৮ হতে ১৮ বছর কেন? না, আজকের কাহিনী সেক্স এডুকেশনকে হালালাইজ বা হারামাইজ করার জন্য না। আজকের কাহিনী সেই সত্যকে সামনে রেখে, যে, ওই ‘বিশেষ’ ‘কামের’ এডুকেশন দেন বা না ই দেন, আমাদের কিশোর নামের ধাড়ি বাচ্চারা ওই এডুকেশন গিলে খেয়ে বসে আছে আর তার বাস্তব প্রয়োগও আলু পটলের মতো শুরু করে দিয়েছে। নাবালক আর নাবালেগ-দুইটা দুই জিনিস নাকি এক জিনিস-তাই আমি কেবল ভাবি।
বাংলাদেশে কেন যেন চুল, দাড়ি পাঁকা লোকজনের প্রতি মানুষের একটা অন্ধ ভক্তি আছে। কারো চুল-দাড়ি পাঁকা থাকলে ধরে নেয়, লোকটা দক্ষ, ওজনদার, অভিজ্ঞ, বিজ্ঞ, প্রাজ্ঞ। মানে, লোকটার কথার একটা ওজন তথা দাম আছে। আর যাদের চুল দাড়ি পাকে নাই, মানে আমার মতো, তারা অর্বাচীন, বালখিল্য ও অপরিপক্ক। তাদের কথার ওজন কম, তাদের তত পাত্তা দেবার কিছু নেই। এই পারসেপশন জামজনতা হতে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় তক আছে। আমি আজীবন এই আক্ষেপে মরেছি। চুল দাড়ি সাদা না আমার। বিধায় কিছু বললে পাবলিক ভাবে, এই চ্যাংড়া ছেমড়ার কথার কী দাম আছে? তাদের ভাবের সারমর্ম হল, জুকারবার্গের ৩২ বছর বয়সে ১ ট্রিলিয়ন ডলার থাকতেই পারে, কিন্তু, তাতে কী, বেটার চুল-দাড়ি পাকে নাই, তার কথাকে এত গুরুত্ব দেবার কিছু নাই। ওহ, ভাল কথা, তার জি.এম হবার বয়স হয় নাই।
কাবেলিয়াত, বা, ম্যাচিওরিটি। সহজ কথায় হল, ফল ১২ তে ধরলেও তা পাকে ৩০শে। ম্যাচিওরিটি ম্যাটারস। চারপাশে অপক্ক, অকালপক্ক, ইমম্যাচিওরড, ওভারম্যাচিওরড মানুষে ঠাসা। বিয়ের বয়স হবার আগেই বালেগ হবার গরমে, আগুনে ঠাসা। বালেগাতের গরমে তাদের আশপাশে টেকা দায়।
বাবার সাথে সন্তানের, আমার আব্বা-মা, চাচা, খালা, মামাদের সাথে সবসময়ই একটি জেনারেশন গ্যাপ আমাদের ছিল। আমাদের বাবা-মা’দেরও তাদের বাবা-মায়ের সাথে ছিল। তবে সেই গ্যাপে একরকম সিংক্রোনাইজেশন, এলাইনমেন্ট, কোরডিনিশন ও রিদম থাকত। একটি নির্ধারিত সহনীয়তা, ছন্দ ও মাধুর্যের মধ্যে দিয়ে এক জেনারেশনের হাত হতে পরের জেনারেশন ব্যাটনটা নিত। দায়ীত্ব বুঝে নিত। হঠাৎ করে এই ছন্দে পতন ঘটেছে। সেই ১২ বছরের নিশীকালীন অপ্রত্যাশিত পতনের মতো। সেই রিদম, সুর, মাধুর্য, লয় ও সমন্বয় আর থাকছে না। থাকছে না পরের প্রজন্মের ধৈর্য।
আমার কেন যেন মনে হয়, আমরা, মানে, যারা লেইট সত্তর হতে আশির প্রজন্ম, তাদের হতে Y2K মিলেনিয়াল প্রজন্ম বা তার পরবর্তি ব্যাচগুলো যেন ব্যাটনটা মাথা ঝুঁকে নেয়ার চেয়ে কেড়ে নেয়াতেই বেশি আগ্রহী। কিংবা, হয়তো, ব্যাটনটা নেবার কোনো দায়ই নেই। পরিবর্তন নয়, যেন ভাঙা ও ধ্বংসেই বেশি আগ্রহী উত্তর প্রজন্ম। না, “দেশটা গোল্লায় গেল” কিংবা “জেনারেশনটা পঁচে গেছে” বলবার মতো প্রৌঢ় বা প্রবীণ হয়তো আমি হইনি। ‘আজকালকার পোলাপান নষ্ট হয়ে গেছে-এই আক্ষেপ হয়তো সবযুগেই সব সিনিয়ররা বলতেন। কিন্তু, বুকে হাত দিয়ে বলুন, আমাদের মিলেনিয়াল প্রজন্ম কি সেই স্বাভাবিক আক্ষেপের ধার দিয়েও যাচ্ছে? নাকি সেখানে একটি অগ্নুৎপাত ঘটে গেছে? প্রজন্ম হতে প্রজন্মান্তরের স্বাভাবিক উন্মেষ ও বিবর্তন নয়, এ যেন অধঃপতনের মৃত্যুকূপে ঝাঁপ দেবার প্রতিযোগীতা।
আজকের কাহিনী আমাদের চারপাশের তথাকথিত কিশোরদের নিয়ে (উভয় জেন্ডার বা সেক্সের অর্থে)। দেশের যুবসমাজ ও বুড়া সমাজ পঁচে গেছে কি যায় নি, তা নিয়ে কথা তো বিস্তর শুনি। সেই পঁচনের নিচে, খুব নিরবে পঁচে যাচ্ছে (বা ইতোমধ্যেই গেছে) আমাদের আপার শিশু ও লোয়ার কিশোর শ্রেনী। ভাবনাটা খুব ভয়াবহ, যে, একটি আস্ত প্রজন্ম পঁচন নিয়ে বড় হচ্ছে। যার প্রভাব পড়বে আগামী অন্তত ৫০ বছর।
কী সেই পঁচন?
স্বপ্নহীনতা
আইডলহীনতা
লক্ষ্যভ্রষ্টতা
লক্ষ্যহীনতা
সংস্কৃতিহীনতা
অনুকরণপ্রিয়তা
মানবিকতা ও বুদ্ধিমত্তাহীন শিক্ষা
শিক্ষাহীনতা
মাদকপ্রিয়তা
গ্যাজেট নেশায় বুঁদ থাকা
মানবীয় বৃত্তিহীনতা
বেশি বেশি বলছি বা জেনারেলাইজ করছি বলে যদি মনে হয়, তাহলে ‘কিশোর গ্যাঙ’ শব্দটি জপ করুন। আর আপনি সবশেষ ১০০০ দিনে একজন আদর্শভাবে বেড়ে ওঠা কিশোর ঠিক কতজন দেখেছেন-তার একটি ট্যালী করুন। একবার বলেছিলাম, আমি আজকাল টপ টেরর জোসেফের চেয়ে এলাকার কিশোর গ্যাঙকে বেশি ভয় পাই।
মাত্রই আজ ২২ নভেম্বর লিংকডইনে জনাব রেহান আসিফ সাহেবের একটি লেখা পড়ছিলাম। বেশ আগ্রহোদ্দীপক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর ফোকাস করেছেন উনি। দস্তুরমতো আমার মন্তব্যও সেখানে করেছি। বিষয়টি আমারও আগ্রহের বিধায় ওনার লেখার সবথেকে ফোকাসড অংশটুকু নিয়ে আমি এই আলোচনাটুকু করছি। পুরো লেখার প্রতিক্রিয়া নয় এটি।
আমার নজর ও চিন্তা হল এখনকার জেনারেশনকে নিয়ে। ধরুন, আমি এখন যারা ১৩ হতে ২৫ এর মানুষ, তাদের নিয়ে কথা বলছি। এঁদের টেইল এন্ডের ছোট একটি অংশ কর্পোরেটে এসে পড়েছেন। ফ্রন্টিয়াররা এখনো একাডেমিতে, অথবা, নানা ময়দানে।
রেহান সাহেবের ইঙ্গিত ছিল খুব পজেটিভ। তিনি মনে করেন, ইন জেনারেল (অল্প বিস্তর ব্যতিক্রম ব্যতিত) এই জেনারেশন (বিশেষত যারা প্রফেশনে ঢুকে পড়েছেন), তাদের প্যটার্ন হল এমন-
[people are leaving job because they don’t find meaning and purpose on their jobs . I know people who left their jobs because their guiding principles are not align with their organization’s practices .Millennials and Gen Z are looking for meaning and purpose in their jobs and they are not stuck in the jobs.]
ওনার এই স্টেটমেন্ট একদল অত্যন্ত উঁচুমানের চিন্তার মানুষের উপস্থিতির জানান দেয়।
এর বিপরীতে আমি দুটি ছবি যুক্ত করলাম। যা এই বিশ্বাসের একদমই ১৮০ ডিগ্রী বিপরীত। এর একটি স্রেফ ট্রল হলেও একদম বে-নজির নয়। আরেকটি হালসময়ের নিউজ।
এখন, আপনার কথা শুনি। আপনি কী ভাবেন, বা বিশ্বাস করেন?
এখনকার জেন-জেড (বা ওয়াই) অথবা ১৩-২৫ এর জেনারেশন আসলে কেমন? ইন জেনারেল বলেছি। অ্যাজ এ হোল।
১. তারা কি প্রচন্ড রকম মেধাবী, পরিশ্রমী, আন্তরিক, কমিটেড, ডেডিকেটেড, প্যশনেট, ফোকাসড, রেসপনসিবল, প্যট্রিয়ট ও সেনসিবল একটি জেনারেশন হয়ে বেড়ে উঠেছে বা উঠছে?
২. নাকি তার সম্পূর্ণ বিপরীত একটি উচ্ছনে যাওয়া প্রজন্ম হিসেবে এগোচ্ছে?
বাংলাদেশ যে সত্যি সত্যিই একটি উচ্চবিত্ত ধনী দেশ-সেটি বুঝতে ও বিশ্বাস করতে হলে মিরপুর পিরিত সড়কে চলে আসুন, বিকেল ৬ টার পরে।
এখানে আনুমানিক পঞ্চম শ্রেনী হতে ২৩/২৪ হয়ে ৩০/৩৫ বছর বয়সের ছেলে ও মেয়েরা জোড়ায় জোড়ায়, জড়াজড়ি করে, কোলাকুলি করে এমন বিন্দাস হয়ে বসে, দাড়িয়ে, কেলিয়ে, চেগিয়ে চাড্ডা (চা+আড্ডা) দিচ্ছে, রোমান্স বিনিময় করছে;
বাইকের ব্যাক-টেইলে যুবতীকে আসীন করে তার পায়ের কাছে বসে উঠতি প্রেমপ্রার্থী যুবক যেভাবে আফ্রোদিতির আসনে পুঁজো দিচ্ছে আর তাকে আফ্রোদিতির ফিল দিচ্ছে, স্কুল যাবার কিংবা কামাই রোজগারের জন্য জীবনকে প্রস্তুত করবার প্রাইম টাইমে যেভাবে রাজা-বাদশার মতো চিল করে সময় কাটাচ্ছে;
তাতে মনেই হয় না, জীবনে চাকরি-বাকরি, আয়-রোজগার করবার কোনো ব্যাপার আদৌ আছে।
যেন সব কানাডার নাগরিক। কীসের পড়াশোনা, কীসের রেজাল্ট, কী সব চাকরি-বাকরির চেষ্টা, কীসের যোগ্যতা হাসিলের জন্য কষ্ট করা।
যাস্ট চিল চিল!
এত বিন্দাস, চিন্তাহীন, অলস, বেভুল, মাস্তিময় থাকার মতো সাহস, শক্তি, সুযোগ এরা কীভাবে পাচ্ছে? টাকা কি সত্যিই আজকাল বারান্দার গাছে ধরছে?
আজকের মিলেনিয়ালরা ভাঙন, ধ্বংস, পঁচনকে পরিবর্তন ও বিপ্লব বলে ধরে নিয়েছে, যেখানে বেয়াদবি হল গাটস, অসভ্যতার নাম মডার্ন, দায়ীত্বহীনতার নাম ব্যক্তিসচেতনতা, খিস্তির নাম বাকস্বাধীনতা। আমার কথা যদি বিশ্বাস না হয়, সন্ধার পরে আমাদের ‘হাপিশ হোডেল’ এর সামনে আসুন। পঁচন ও ক্ষণপতন বয়সের আগে কীভাবে প্রজন্মকে খেয়ে ফেলেছে, চাক্ষুস করতে পারবেন। তবে সত্যিই যদি আসেন, গায়ে একটি বেয়াদবী প্রটেকটেড ছাল আর চোখে একটি নোংরামি প্রটেকটেড সানগ্লাস পরে আসবেন। অন্যথায় জেনারেশন গ্যাপের ট্রমায় বমন হলে আমি দায়ী না।
আমাদের কৃষ্ণকেশী ও পক্ককেশী প্রজন্মটাকে তো মাঝপথে পঁচিয়ে দেয়া শেষ।
শেষ আশা ছিল যারা, সেই শিশু, কিশোর আর উঠতি যুবক প্রজন্মটাকে অত্যন্ত সুচারুভাবে, পরিকল্পিতভাবে, হাসতে হাসতে Spoil করে দেবার Mission টি প্রায় সফল। চলতি পথে দেখা হওয়া শিশু, কিশোর ও সদ্য বালেগ যুবকদের সংস্পর্শে আসলে এখন রীতিমতো ভয় করে। আপনি যদি একটু গভীর দৃষ্টি দিয়ে তাকান, একটু কানটা পাতেন, অধঃপতনের মাত্রাটা খুব সহজেই অনুভব করতে পারবেন। সবাই বলবে, সরকার এজন্য দায়ী। আমি বলব, আমরাই সেই সরকার।
আমার সুহৃদ মি. অভি’র এক কাপ হাপিশের চা দীর্ঘকালের পাওনা। তবে ভাইজান, তোমাকে ওই পীঠস্থানে টঙ চা পান করাবার মতো উপযুক্ততা আর বেঁচে আছে কিনা-সন্দেহ।
তবু ভাল থাকুক বাংলাদেশ। ————–+—————
৫. #GenerationZ #GenZGenAlpha নিয়ে পিপল অফিসারদের ক্যারিকেচার:
ছোটবেলায় আমরা আমাদের ছোট, জরাজীর্ন ও সংকীর্ন কলোনীর বাসায় একেক মাসে ঘরের আসবাবপত্র ও সার্বিক বিন্যাস এদিক সেদিক করে ঘর নতুন ও আকর্ষক করবার মিথ্যা চেষ্টা করতাম। ঠিক সেভাবেই বাংলাদেশে পোষাক, মনোগ্রাম, লোগো অথবা নাম বদল করে মানুষ, দল বা প্রতিষ্ঠানের কালিমা, কলঙ্ক অথবা চরিত্র বদলের একটা চেষ্টা হয়। হোক। তথাস্তু।
HR ডিপার্টমেন্টও বিগত ৫০ বছরে তার নাম বদল করে জাতে ওঠার চেষ্টা করে গেছে। যদিও নাম যেটাই হোক, বাংলাদেশের কর্পোরেট এরেনাতে, এইচ.আর বিভাগকে খুব বেশি উঁচু তবকায় স্থান কেউ দিতে চান না। না চান, তথাস্তু। তো, নাম বদলের ধারায় সম্প্রতি দেখছি, অনেকেই HR বিভাগের নয়া নাম দিয়েছেন বা দিচ্ছেন People Dept অথবা People Experience dept.
নাম যা-ই হোক, আর অন্তরের চরিত্র যেটাই হোক, সেখানে যারা পিপল অফিসার, তাদের জন্য একটি অশনি সংকেতের কথা বলছি আজ।
এই মুহূর্তে যারা HR এ কাজ করছেন, এবং, আগামি বছর বিশেক প্রফেশনে থাকার কথা আছে যাদের, তারা মোটামুটি Millenial generation, Generation Z, Generation Alpha-এই তিন দলের কিছু কিছু সদস্যকে ডিল করবেন তাদের জীবদ্দশায়।
তো, Gen-Z দের নিয়ে নানারকম অভিজ্ঞতা, ঝক্কি-ঝামেলার কথা তো আমরা শুনেই থাকি। তারা এ-রকম, তারা ও-রকম। এরই মধ্যে নয়া একটা বাস্তবতা আজকের পিপল অফিসারদের জন্য।
সেটা হল, আপনারা মানসিক, তাত্বিক, জ্ঞানিক, প্রায়োগিক, কৌশলগতভাবে প্রস্তুত থাকুন, জেন-জেড ও জেন-আলফার সদস্যদের কর্পোরেটে ওয়েলকাম করতে এবং নিত্য নতুন বিচিত্র ও অভূতপূর্ব সব অভিজ্ঞতা সামাল দিতে।
নিজেদের নয়া নাম যারা নিজেরাই গায়ে চড়িয়েছেন, মানে পিপল অফিসার, তাদের পিপলরা আর কিছু বছরের মধ্যেই তাদের নামকে চ্যালেঞ্জে ফেলতে যাচ্ছেন।
Generation Z, Generation Alpha ব্যাপক হারে যখন কর্পোরেটে এন্ট্রি নেয়া শুরু করবেন, তখন পিপল অফিসারদের ঠিক কী কী নিয়ে নাকানিচুবানি খেতে হতে পারে-তার একটা ধারনা দিই।
স্যাম্পল-১: চিরকাল ফ্লোরে সবার ‘স্লামালিকুম’ শুনে আসা আপনি চোখে চোখ রেখে কথা বলবার, এবং, মুখের ওপর চাকরি ছেড়ে দেবার মানুষ হজম করতে রেডি হোন।
স্যাম্পল-২: ব্রেকআপের ছুটি, পিরিয়ডের ছুটি, জাস্ট ফ্রেন্ডের সাথে বেস্ট ফ্রেন্ডের বিরোধ মেটাবার দিনের ছুটি, নাইট আউটের ধকল কাটাতে অফিসে পাওয়ার ন্যাপের বায়নাক্কা, ভ্যালেন্টাইনের অফিশিয়াল ছুটি, বছর শেষ হতে না হতে ২৫% রেইজের চাপ-এসবের সাথে পরিচীত হতে যাচ্ছেন।
স্যাম্পল-৩: এই বিষয়টা এখন সহ্যের মধ্যে থাকলেও শিগগীরই সেটা তীব্র হবে। সেটা হল, কোয়ালিটি জিরো, চাহিদা আকাশ ছোঁয়া; আবার কোয়ালিটি সুপার, চাহিদাও সুপার-এই দুই চরম অবস্থার মোকাবেলা করতে হবে আপনাকেই। কারন, আপনি পিপল অফিসার।
স্যাম্পল-৪: অফিসে সামান্য ঢিলেঢালা, বা বোলচাল যেসব পিপল অফিসারদের একদম সহ্য হয় না, কথায় কথায় সমন জারি করেন, তারা রেডি হোন, আপনাকে নিয়ে টিকটক করবে-এমন কর্মীতে অফিস ভরে যেতে যাচ্ছে। ঠেকাতে পারবেন না। কারন, ঠক বাঁছতে গাঁ উজাড় হবে।
স্যাম্পল-৫: যেসব পিপল অফিসার অফিসের ফাঁকে ইন্টাররিলেশনশীপ টেরনিং বিক্রী করে দুটো পয়সা কামান, তারা এলার্ট হোন। কারন, অফিসের কর্মী Generation Z, Generation Alpha অংশের মধ্যে গন্ডায় গন্ডায় রিলেশন, ব্রেক আপ, শর্ট ব্রেক আপ, এক্সট্রা মেরিটাল, মন দখল নিয়ে দ্বন্দ্ব-এসব ‘এনটাররেলেশোন’ সামাল দিতে হবে আপনাকে।
স্যাম্পল-৬: যেসব পিপল অফিসার নামের আগে পরে ‘C’ লাগিয়ে প্রবল প্রতাপে রাজত্ব করছেন, তাদের জন্য আসিতেছে-টর্নড জিন্স পরে ড্রেস কোডকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো জেনারেশন, টুক টুক ঠুক ঠুক করে চিঠি লেখা বৃদ্ধদের সামনে আসছে AI আর ChatGPT দিয়ে দেড় মিনিটে চিঠি, মেইল, প্রেজেন্টেশন থ্রো করা জেনারেশন, আসছে গ্যাজেট ভেজে খাওয়া জেনারেশন, আসছে মিটিংয়ের মধ্যে টিকটক দেখা জেনারেশন। আসছে বফ ও গফ নিয়ে ওপেনলি বসের সাথে রগঢ় করা জুনিয়রস। ইমোশনাল ইনটেলিজেন্সে মাস্টার করা পিপল অফিসারদেরকে ঝালাপালা করে দেবার জন্য, ধৈর্য্য ও ইমোশনের এসিড টেস্ট নিতে মৌমাছির ঝাঁকের মতো জেনারেশন জেড ও আলফা বিপুল প্রবাহ নিয়ে আসছে।
স্যাম্পল হতে আপনি বাল্ক আন্দাজ করে নিন।
১৭ বছরের একাডেমিক লাইফ ও কারিক্যুলাম, সেই সাথে ১৭ বছরের ফ্যামেলি ও সোশ্যাল লাইফ-এই সবকিছুর সমন্বয়ে একজন সম্ভাব্য পেশাজীবি (বিশেষত চাকরিপ্রত্যাশী) যে ধরনের যোগ্যতা অর্জন করে মাঠে আসবেন বলে আশা করা হয়, কিংবা বলা চলে, আসতেই হবে বলে প্রত্যাশিত, তার তিনটি ধরন রয়েছে-ক. জ্ঞান খ. দক্ষতা ৩. বোধ বা মনুষ্যত্ব।
প্রথম দুটিতে যদি কিছু ঘাটতিও থাকে, কর্পোরেট নানা প্রক্রিয়ায় তা পূরণ করে দিতে পারে। কিন্তু তৃতীয়টিও যদি মিসিং থাকে, তাহলে তাকে কর্পোরেট মানুষ করবে কীভাবে?
তৃতীয় এলিমেন্টটির মধ্যে থাকে লাইফ লারনিং, সেটিতেও আজকাল বিপুল ঘাটতি। বিশ্ববিদ্যালয় গ্রাজুয়েট সামান্য স্ট্যাপল করা বা সামান্য এক কাপ চা বানাবার মতো সক্ষমতাও নিয়ে যদি বের না হতে পারে-হাত কামড়াতে হয় এমপ্লয়ার ও এমপ্লয়মেন্ট সিকার-উভয়কে।
বোধের অন্য আরেকটি দিক হল থট প্রসেস বা পয়েন্ট অব ভিউ। ভিশন ও পারসোনালিটি এর সঙ্গী। সেখানেও জিরো শর্ট হলে সেটা আত্মঘাতি ছাড়া কী বলা যায়।
সিরিয়াসনেস, সিনসিয়ারিটি, চিন্তার সততা, দায়ীত্বশীলতা, ওপেন মাইন্ডসেট টু লারনিং, কিউরিয়াসনেস, উদ্যম, ক্যরিয়ারিস্ট এপ্রোচ-এই অন্তত বোধের দিকগুলোও যদি একাডেমি, ফ্যামেলি ও সোসাইটি গ্রাজুয়েটদের ভেতরে প্রবিষ্ট ও প্রোথিত করে কর্পোরেটে না পাঠায়, সেগুলো কর্পোরেটে কোনো যাদুকরী ট্রেইনিং দিয়ে তৈরী করা যায় না। জীবনের ১৭ বছরের নিবিড় তিনটি ক্লাসরুমেই যদি এগুলো সৃষ্টি না হয়, কর্পোরেটের অতি ব্যস্ত ও ফাস্ট জীবনে এটা তৈরীর আর সুযোগ নেই। তাছাড়া কথায় বলে, কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ, পাঁকলে করে ঠাস ঠাস। শিখতে আগ্রহী মানুষ বোধহয় আর কিছুকাল পরে যাদুঘরে গিয়ে দেখতে হবে। ঠিক যেমনটা এখন শেখাতে আগ্রহী মানুষ যাদুঘরে গিয়ে দেখতে হচ্ছে।
বেতন বাড়ছে কিনা, কেন বাড়ছে না, না বাড়লে কবে, কীভাবে অন্য জবে যাব, আমার সোশ্যাল স্টাটাস বাড়ছে কিনা, আমার কমফোর্ট লাইফ আর এক্সেস পাওয়ার বাড়ছে কিনা-তা নিয়ে ব্যাপক চিন্তিত ও সচেতন জনগোষ্ঠী বিপুল। কিন্তু, শেখা ও শেখার পেছনে অন্তত আগ্রহ ধারন-বিরল। প্রজন্ম ঠিক কী চিন্তা নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে যাচ্ছে কে জানে। আমি অত্যন্ত হতাশ ও আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করেছি, যে, চারপাশের চেনা জগতে যে ইয়ং চাকরিজীবিদের সাথে চলাফেরা হয়, তাদের প্রায় কেউই (১-২% ব্যতিক্রম হতে পারে) ক্যারিয়ার নিয়ে সিরিয়াস না, কোনো কিছু শিখবার ক্ষুধা নেই। তাদের মূল ফোকাস চাকরি না। সেখানে উন্নতি না। লারনিং কার্ভের উন্নয়ন এদের পরিকল্পনাতেই নেই। যদিও বেতন বাড়ছে কিনা-সেই চিন্তায় অস্থির এদের প্রায় সবাই। এই বিষয়গুলো হল ক্যাটালিস্ট বা রেডিক্যালের মতো। অথবা, বলা চলে মেকআপের ফাউন্ডেশনের মতো। জ্ঞান ও দক্ষতার অভাব পূরণে যেসব এফোর্ট কর্পোরেট তাদের দেবে, সেগুলো ঠিকঠাক কাজ করতে হলে এই ফাউন্ডেশন চাইই চাই। সেটাতেও হতাশা।
কর্পোরেট বাজারে রেপিডলি একটি জমিদার প্রজন্ম গ্রো করছে।
না, এরা বয়সের প্রজন্ম না। এরা স্বভাব, খাসলতের জমিদার প্রজন্ম।
এই জমিদার প্রজন্মের সকাল ১১ টার আগে ঘুম ভাঙে না। অফিস গোয়িং হলে সকাল ১০ টায় অফিসে আসতে না আসতেই টায়ার্ড হবার সময় হয়ে যায়। সকালে ইন্টারভিউ আছে-তা মনে থাকে না। মনে থাকলেও আবার, সকাল ১২ টায় যদি মনে হয়, নাহ, গা টা ম্যাজো ম্যাজো করছে, তাহলে আর ইন্টারভিউতে আসবে না। যে সাবজেক্টে পি.এইচ.ডিতে বিবিএ করেছে, তার একটা ডেফিনিশন জিজ্ঞেস করলে নায়িকা শাবনুরের মতো ঠোঁট কামড়ায়।
মুড সুইং হবে দিনে সতেরোবার। দুই দু গুনে চার শিখতে গেলেই হাপিয়ে ওঠে। তিন দু গুনে ছয় শিখবার আগেই দুইয়েরটা ভুলে যায়। একটা কাগজ ফটোকপি করতে গেলেও হাই ওঠে। “এই কলমটি হয় আমার”-এটা ট্রান্সলেট করতে দিলেও ব্লাইন্ড লুকে তাকায়। কাউকে ফোনে একটা কমিউনিকেশন করতে দিলে আবার বেস্টির সাথে প্রযোজ্য ভাষায় মেরে দেয়। “এইরকম একটা হাস্যকর ভুল কীভাবে করলেন?”-প্রশ্ন করলেও তারা চাকরি করার স্পৃহা হারিয়ে ফেলে। বরইয়ের আচার ভাগ নিয়েও সহকর্মীর সাথে মারামারি হয়। কাজ ভাগ করে দিলে আবার উদারভাবে সবটা সহকর্মীর কাঁধে দিয়ে দেয়। বৃষ্টি হলেই মন টি.এস.সিতে চলে যায়। কড়া লিকারের চা না হলে অফিস প্যাকআপ করে দেয়।
এত কিছুর পরে আবার মাস শেষে অন্তত পঞ্চাশ হাজার টাকা না হলে হাত খরচই তো ওঠে না। সেটাও বিপদ।
আবারও বলছি, এটা তথাকথিত জেন-জেড বা বয়সের প্রজন্ম ইস্যু না। এটা খাসলতের প্রজন্ম। এই প্রজন্ম নিয়ে ব্যবসা, অফিস, কর্পোরেট কীভাবে অপারেট করবেন-ভাবতে থাকুন।
সব মিলিয়ে ভবিষ্যত ত্রিশঙ্কূ।
এই লেখাটির চিন্তা মাথায় আসে আমাকে আমার সুহৃদ মি. রিজভান আমাকে একটি ছোট ফোটোকার্ড পাঠাবার বেশ কিছুদিন পরে, যে সময় আমি ঘটনাক্রমে জেনারেশন জেডকে নিয়ে আরেকটা ভিডিও দেখি মোবাইল স্ক্রল করবার সময়ে। ভিডিওটি ছিল জেনারেশন জেডকে নিয়ে অফিসে কী বিপত্তি হয়, আর তাদের কমিউনিকেশন ও জেশচারের বৈচিত্র নিয়ে।
মি. রিজভানের ফোটোকার্ডটি ছবিতে দেখতেই পাচ্ছেন। না পেলে বলি, (কতটা সত্য বলা কঠিন) পশ্চিমের কোনো একটি প্রাইভেট এন্টারপ্রাইজ তার কর্মীদের জন্য দুপুরে ১ ঘন্টার ‘………স্টা……শন’ ব্রেকের প্রাকটিস চালু করেছে। উদ্দেশ্য, কর্মীদের চাঙ্গা রাখা, প্রোডাকটিভ রাখা। মি. রিজভানের সাথে বেশ কিছুক্ষণ ডিবেট হয় সেদিন, অফিসে এত সুপার অ্যাডভান্স লেভেলের ইনিশিয়েটিভ নেবার যৌক্তিকতা, কনটেক্সট বিচার আর ভায়াবিলিটি নিয়ে। আমি তাকে বলছিলাম, বিষয়টার মধ্যে আমি পজিটিভিটি দেখি এভাবে, যে, একটা বিজনেস অর্গানাইজেশন তার বিজনেসের জন্য কী না করতে প্রস্তুত, আর তাদের ইনোভেশন টিম এতটাই অ্যাডভান্স, যে, কতটা ফিউচারিস্টিক ও অ্যাহেড অব টাইম হতে পারে তাদের চিন্তার ধরন।
আপনি কি জানেন, পেছনে না দৌড়ানো সত্তেও, নিজ অবস্থানে স্থির থাকা সত্তেও আপনি পিছিয়ে যেতে পারেন? সবাই যদি দৌড়াতে থাকে, আর আমি স্থির থাকি, আমি তখন আমার কোনো এফার্ট ছাড়াই পিছিয়ে দিচ্ছি নিজেকে।
এই পৃথিবী চলমান। চারপাশের সব গতিশীল। সবাই সামনে এগোচ্ছে। আমরা চিন্তায়, চেতনায়, ভাবনায়, কাজে, প্ল্যানে, ফোকাসে, যোগ্যতায়, সক্ষমতায়, টেকনোলজিতে, ইনিশিয়েটিভে, গবেষনায়, ইনোভেশনে না এগোলে পিছাতে হবে। আর একসময় হারিয়ে যেতে হবে।
পৃথিবীর কোনো দেশের কোনো একটি একক মাইক্রো প্রতিষ্ঠান (এমনকি মাইক্রো ব্যক্তির পক্ষেও) এখন নিজেকে গ্লোবাল প্রতিযোগীতার বাইরে রাখা সম্ভব না। এখন গোটা পৃথিবী যখন প্রতিনিয়ত ও দ্রূত এগিয়ে যাচ্ছে, বদলে যাচ্ছে, তখন একটি প্রতিষ্ঠান ও তার HR যদি তার চিন্তায় ডায়নামিজম না আনতে পারে, যদি অ্যাডভান্সড না হয়, তাহলে সে নিজেকে ও প্রতিষ্ঠানকে ডোবাবেই। বিশেষ করে নতুন জেনারেশনকে চিনতে, পড়তে, বুঝতে ও ডিল করতে ভুল করলে, রিজিড ও স্ট্যাটিক ধ্যানধারনা দিয়ে তাদের ডিল করতে গেলে সর্বনাশ হবে।
বিজনেস ওয়ার্ল্ড একটা এভার চেঞ্জিং সাবজেক্ট।
অফিসগুলোতে হু হু করে জেনারেশন জেড ঢুকছেন। তাদের ভাষা, চিন্তা, ভাবনার ধরন, কথার স্টাইল, জীবনবোধ-এগুলোকে যদি আমরা স্ট্যাডি করতে ভুল করি, তাহলে বিজনেসের জন্য বিপদ আছে। আমরা সেই ভাষা বোঝার জন্য কতটা প্রস্তুত?
Generation Z, Generation Alpha নিয়ে যাদেরকে অচীরেই ঘর করতে হবে-সেসব পিপল অফিসারের জন্য আগাম সমবেদনা ও শুভকামনা।
ভাল কথা, পিপল অফিসারদের উদ্দেশ্য করে বললেও, কর্পোরেটে আরও অন্যান্য বিভাগে যেসব বড় বড় ছ্যাড়রা রয়েছেন, যারা অফিসে হোমড়াচোমড়া ও ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে থাকেন, তারাও প্রস্তুত হোন। পিপল অফিসারতো Generation Z, Generation Alpha’র সেকেন্ডারি শিকার। মূল টক্করতো হবে আপনারই সাথে। আপনার টিমেই তো তার অহর্নিশ বসবাস।
”আমি তোমারো বিরহে রহিব বিলীন,
তোমাতে করিব বাঁআআআআআশ।”
৬. আপনার সন্তান, আপনার ভবিষ্যত প্রজন্ম: #millennialgeneration
Simon Sinek এর এই সাক্ষাতকারটি আমাকে অনেক আগে পাঠান আমার বন্ধু Rayhanul Mithul Islam মিঠুল। বন্ধু আমার এই সাক্ষাতকারটি দেখে আবেগরুদ্ধ। আমাকে অনুরোধ করে এটিকে বাংলায় রুপান্তর করতে। আমার অনুরোধে আমার অনুজ Niloy Suresh নিলয় এই দূরহ কাজটি করেছিল। সীমাহীন ধৈর্য্যে সে ইংরেজি অডিও শুনে শুনে তার বাংলা হাতে লিখেছে। এই কাজ সে আগেও করেছে। ধন্য ছেলে তোমার অধ্যবসায়। আমি শুধু তার হাতের লেখাটাকে টাইপ করেছি। আর কিঞ্চিত পরিমার্জন। মূল সাক্ষাতকারটি বিশাল ও ব্যপক। এটাকে আপনি তার অনুলিখন বলতে পারেন। পড়ে দেখুন। ভাবনার অনেক খোরাক পাবেন।
পড়তে না চাইলে ভিডিওটি দেখুন: https://www.facebook.com/fearlessmotivationofficial/videos/732114443801770/
সম্ভবত ১৯৮৪ সালের শেষ সময়টাতে জন্ম নেয়া প্রজন্মটিকেই আমরা মিলেনিয়াল প্রজন্ম বলছি। যেই প্রজন্ম লক্ষ্যহীন, আত্মকেন্দ্রীক, অন্তর্মুখী এবং যাদেরকে আমরা অলস বলেও আখ্যায়িত করতে পারি। যদিও এই মিলেনিয়ালরা তাদের কাজের মাধ্যমে তাদের পদচিহ্ন রেখে যেতে চায়, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যকে সামনে রেখে এগোতে চায় এবং তাদের চাহিদাগুলো পূরন করতে চায়। কিন্তু তাদের চাহিদাগুলো পূরন হওয়া স্বত্বেও তারা সন্তুষ্ট হতে পারছে না। প্রধানত কিছু গুরুত্বপূর্ন সূচকের অনুপস্থিতির কারণেই এই সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব হচ্ছে না।
সেগুলো হল-অভিভাবকত্ব বা নেতৃত্ব, প্রযুক্তি, অস্থিরতা ও পারিপার্শ্বিকতা। এই মিলেনিয়াল প্রজন্মটিকে আমরা বিশেষায়িত প্রজন্ম হিসেবে আখ্যায়িত করছি। ইচ্ছের বিরুদ্ধে তাদেরকে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষার দিকে ঠেলে দিয়েছি। প্রতিযোগীতায় স্থান অর্জনকে পাশ কাটিয়ে শুধুমাত্র প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহন করার জন্য তাদের পুরস্কৃত করেছি এবং তাদের জীবনের সকল প্রত্যাশা ও চাহিদা পূরন হবে-এই বিশ্বাস তাদের ভিতরে প্রথিত আমরাই করেছি। অতঃপর শুধুমাত্র নেতৃত্ব ও অভিভাবকদের ভুল সিদ্ধান্তের জন্য কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সাথে সাথেই এই মিলেনিয়াল প্রজন্মটি অনুধাবন করে, “তারা বিশেষায়িত কেউ নয়।কেউ তাকে পদোন্নতি পেতে সাহায্য করছে না। এমনকি প্রতিযোগীতায় সবশেষ অবস্থান প্রাপ্তিতেও তারা পুরস্কৃত হচ্ছে না। তাদের মনের আসল প্রতিচ্ছবিটি ক্রমশ ধূসর বা ফ্যাকাসে হয়ে যায়। তারা উপলব্ধি করে, জীবনের সব প্রত্যাশা বা চাহিদা পূরন হবার নয়। ফলাফল, প্রজন্মের পর প্রজন্ম আত্মমর্যাদাহীন হয়ে বেড়ে উঠছে।
আমরা এখন একটি ডোপামিনিক যুগের মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত করছি। প্রযুক্তির আশির্বাদে আমরা এখন আধুুনিক মোবাইল ব্যবহার করছি, বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম যেমন-ফেসবুক , ইন্সটাগ্রাম ইত্যাদির সাথে নিজেকে যুক্ত করছি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্ধুদের সাথে নিজেদের সংযুক্ত রাখছি এবং বার্তা আদান প্রদান করছি। যা ক্রমান্বয়ে আমাদের ভাল লাগার কারন হয়ে উঠছে এবং একইসাথে তা নেশায় পরিণত হচ্ছে। অনেকটা ধূমপান বা মদ্যপানের মতো।
মূলত ডোপামিনের নিঃসরনের কারনে এই আসক্তি বা ভাল লাগা সৃস্টি হচ্ছে। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় অপ্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির জন্য মদ্যপান বা নেশাজাতীয় দ্রব্যের ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ব্যবহারে বয়সের কোনো সীমারেখা থাকছে না। যা প্রকৃত অর্থে একটি উমুক্ত ও স্বাধীন মদ্যপানশালার মতোই।
যখনই একজন মিলেনিয়াল চাপ বা দুঃশ্চিন্তার মুখোমুখি হচ্ছে, তখনই সে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ব্যবহার করছে, যা তাকে নেশাগ্রস্থ করে দিচ্ছে ক্রমাগত। এবং প্রযুক্তির এই ব্যবহার আমাদের ক্রমান্বয়ে পারিপার্শ্বিক জগত, বন্ধুমহল ও গভীরতা সম্পন্ন জ্ঞান অর্জনের সুযোগ থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছে।
আসক্তিগ্রস্থ করে দিচ্ছে আমাদের যুবসমাজকে। যা অনেকটা দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পেতে ব্যবহৃত ডোপামিনের মতোই কাজ করছে। মদ্যপান খারাপ নয়, কিন্তু অতিরিক্ত মদ্যপান ক্ষতিকর। জুয়া খেলা আনন্দদায়ক, কিন্তু অতিরিক্ত আসক্তি বিপজ্জনক। প্রযুক্তির এই আশীর্বাদ আমাদের জন্য ক্ষতিকর নয়, যদি তা ভারসাম্য বজায় রেখে ব্যবহার করা যেত। বিজ্ঞান প্রমান করেছে যে, অধিক ফেসবুক ব্যবহারকারী ব্যক্তি অধিক হতাশাগ্রস্থ থাকে। বাস্তবতা তাই বলছে। আজ আমরা স্বীকার করছি, সামাজিক মাধ্যমে তৈরী হওয়া বন্ধুত্বের বন্ধনগুলো ভাসা ভাসা বা আন্তরিকতাহীন। অধিকাংশ বন্ধনই স্বার্থপরতার চাদরে আবৃত।
এই প্রজন্মের অধিকাংশই জানে না গভীর ও আন্তরিক সম্পর্ক সৃষ্টির কৌশল। দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ ও হতাশা হতে মুক্তিলাভের জন্য তারা তাৎক্ষণিকভাবে আশ্রয় নিচ্ছে সামাজিক মাধ্যমের, যা তাদের ডোপামিনের মতো তাৎক্ষনিক মুক্তি দেয়। এই ধরনের আসক্তিগুলোই আজ আমাদের সম্পর্কগুলোকে দুর্বল করে দিচ্ছে। মূল্যবান সময় নষ্ট করছে, জীবনকে অভিশপ্ত করে তুলছে। এই মিলেনিয়াল প্রজন্মটি বেড়েই উঠছে ক্ষণিকের পরিতৃপ্তি নিয়ে এবং তাদের সকল প্রত্যাশাই তাৎক্ষনিক। মূলত প্রজন্মটি বেড়ে উঠছে একটি অস্থিরতার মধ্য দিয়ে। তারা অনুধাবন করছে না, তারা একটি পর্বতের পাদদেশে অবস্থান করছে। কর্মব্যস্ত একজন ব্যক্তিকে যদি প্রশ্ন করা হয়, “আপনার সময় কেমন যাচ্ছে, কীভাবে অতিবাহিত হচ্ছে?” প্রতিউত্তরে তার হতাশাপূর্ন একটিই উক্তি, “আমি কোনো পরিবর্তন বা প্রভাব বিস্তার করতে পারছি না।” প্রকৃত অর্থে বৃহৎ পর্বতটিকে লক্ষ্য না করে তারা শুধু লক্ষ্য করছে পর্বতের চূড়াটিকে। পর্বতটিতে কত দ্রূত আরোহন করছে, সেটি মূখ্য নয়, লক্ষ্যনীয় বিষয় হল, পর্বতটিতে আরোহন করতেই হবে।
এই প্রজন্মকে জানতে হবে পর্বত আরোহনের কলাকৌশল বা ধৈর্য্য। আয়ত্ব করতে হবে জীবনকে ভালবাসার কৌশল, আত্মবিশ্বাস অর্জনের কৌশল। অন্যথায় বিরূপ পরিবেশ পরিস্থিতির স্বীকার হবে সমাজ। মেধাবী ও বিষ্ময়কর এই প্রজন্মটি স্বল্প সময়ের লক্ষ্য অর্জনে সদা ব্যস্ত। জীবনের মুহূর্তগুলো তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ন নয়। বরং অতিবাহিত অতীত বছরগুলোই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ন। দীর্ঘ সময়ের পরিশ্রমে লব্ধ একটি অর্জনে যে আত্মতুষ্টি, সেটা তারা উপভোগ করতে পারছে না। আর এই প্রজন্মটিকেই আবার আমরা ঠেলে দিচ্ছি কর্পোরেট নামক ব্যস্ত পরিবেশে। ফলস্বরুপ, তারা ব্যর্থ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এবং এক পর্যায়ে ব্যর্থতার জন্য নিজেকেই দায়ী করছে।
প্রকৃত অর্থে এই অবস্থার দায়ভার দুর্বল নেতৃত্বের বা অভিভাবকত্বের এবং ব্যস্ত কর্মপরিবেশ বা কর্পোরেট এনভায়রনমেন্টের। প্রাতিষ্ঠানিক দিক হতে প্রতিষ্ঠানগুলোকেই উদ্যোগ নিতে হবে তাদের আত্মবিশ্বাসকে সৃদৃঢ় করার জন্য। সঠিক নেতৃত্ব ও অভিভাবকের মাধ্যমে সৃদৃঢ় করতে হবে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সামাজিক সম্পর্কগুলোকে। আত্মকেন্দ্রীকতা দূর করে উদ্ভাবনী চিন্তাধারার চর্চা করতে হবে। বিষ্ময়কর, চমকপ্রদ, আদর্শিক প্রজন্মটাকে প্রত্যয়ের সাথে গড়ে তোলাই এখন সঠিক নেতৃত্বের দায়ীত্ব। আরো সহজভাবে যদি বলি, ”এটাই সঠিক সময়। নিশ্চিত হয়ে নেবার। আমরা কাল্পনিক বা ভার্চুয়াল জগতে নয়, বাস্তবের জগতেই সুখী।
#GenerationZ #GenZ #millennialgeneration #generationgap #clashofgeneration #deviationofgeneration #deviationofnation #deviationofcountry #socialdeviation #grooming #socialmediadomination #socialmediamanipulation #socialmediadestruction #socialmediahype #socialmediaaholic #socialmediatrial #moralpolicing #gazzet #maturity #immatured #rotation #adolescence #sexeducation #childgang #অবক্ষয় #lifelearning #academiclearning