Skip to content

এই অস্থির সময়ের শেষ কোথায়

  • by

হটকেক-১: শিল্প বোদ্ধা জাতি ও শিল্পকর্মের বঙ্গানুবাদ:

বাংলাদেশ প্রচন্ড বিষ্ফোরক সব মেধাবীতে ভর্তি-এটা দেখলে বুকটা ভরে যায়। এতটাই মেধাবী মানুষ সমাজে সৃষ্টি হয়েছে, যারা এমনকি-মাইকেল এঞ্জেলো, পিকাসো, মেতিস, ভ্যান গগ, দ্য ভিঞ্চির আঁকা ছবিতেও পারলে এরা ভুল ধরে। হয়তো মন্তব্য করে, “মোনালিসা ছবিতে মোনালিসার মাথায় চুল আরো বেশি দেয়া দরকার ছিল।”

কিংবা তারা প্রশ্ন করে, “দ্য লাস্ট সাপার” ছবিটা দিয়ে শিল্পী কী বোঝাতে চেয়েছেন? আচ্ছা, আঁকার ২০০-৩০০ বছর পরে আপনি তাদের ছবি দেখে অর্থ ও ব্যাকগ্রাউন্ড বুঝতে চাইবেন-এটা কি ওই শিল্পীরা জানতেন? জানলে নিশ্চই ছবির পেছনে ওই ছবির অর্থ ও থীম লিখে রেখে যেতেন। আর্ট, ফাইন আর্ট, বিশেষত ছবি আঁকার মতো দূরহ কাজ যারা করেন, তারা সবসময়ই তাদের দর্শকদের কাছে অবমূল্যায়িত। ছবি আঁকা যে প্রবন্ধ রচনা নয়, সেটা দর্শক বোঝে না। তারা চায়, প্রবন্ধের মতো করে তারা যেন ছবিটাকে বোঝে-শিল্পী এমন ছবি আকুক। সমস্যাটা এখানে।

নারী শরীর নিয়েই কেন পুরুষ আঁকিয়েরা বেশি ছবি আকেন-এই প্রশ্ন হাজার বার আমি দেখেছি। আমার উল্টো প্রশ্ন তাদের কাছে-ছবির অবজেস্ট নারী না পুরুষ, সেটা দেখতে যান কেন? আর নিতম্ব ও স্তনের হালকা আভাস থাকা মানেই সেটা নারী শরীর-এই তত্ত্ব বাঙালি কোথায় পেল? মনে পড়ে, মোহাম্মদপুরে রোবট ওয়েটারকে ওড়না পড়াতে হয়েছে? ওই যে, নারী শরীর নিয়ে ট্যাবুর জন্য।

সাম্প্রতিক কিছু শিল্প সাহিত্য পেজে শিল্পীর আঁকা কিছু ছবির ওপরে বোদ্ধা দর্শকদের “উনি এই ছবি দিয়ে কী বোঝাতে চাইলেন?” এমন প্রশ্ন দেখে ভিরমী খাচ্ছি। কবে শুনেছেন, “ছবি আঁকাআঁকির কাজটা ব্যকরন মেনে, অর্থ ঠিক রেখে, থীম তৈরী করে তারপর আঁকা হয়? যারা চিত্রকর্মে শিল্পী কী বোঝাতে চেয়েছেন-এই দাবীতে ওই শিল্প পেজটাতে ব্যপক দাবী করেছেন, তাদের প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে, আপনি বরং আগে বলুন, পাবলো পিকাসোর অদ্ভূতুরে ছবিগুলোতে কী বোঝাতে চেয়েছেন? কিংবা এমনও দেখি, একজন কবি একটি কবিতা লিখেছেন। পাঠক (আসলে দর্শক, কারন দেখা যাবে সে পড়েই নি) প্রশ্ন করেন, “আপনি এই কবিতা দ্বারা কী বোঝাতে চাইছেন?” আরে?

কবির আর কাজকাম নেই? পাঠকের জন্য তিনি কবিতার সহজবোধ্য বাংলা অর্থও লিখবেন? যদি বলেন, হ্যা, লিখবেনই তো, অর্থ না থাকলে সেটা কীসের লেখা? তো ভাইজান/বুবুজান, নজরুল যখন লিখেছেন, “আমি বিধাতার মতো নির্ভয়” কিংবা “খোদার আসন আরশ ছেদিয়া”, ওটা দ্বারা তিনি কী বোঝাতে চেয়েছেন? কেউ বলতে পারবে? নজরুল নিজে কী পারতেন আপনাকে বোঝাতে? রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন, “ভেঙে মোর ঘরের চাবি, নিয়ে যাবি কে আমারে?” তখন কে বলতে পারে, ঘরের তালার বদলে চাবি ভেঙে উদ্ধার করার কথা রবীঠাকুর কী করে লিখলেন, কার সাধ্যি তার উত্তর দেয়?

গত বেশ কিছু বছর হল, সেটা বড় জোর বছর আস্টেক বা বছর দশেক হবে-একটা ট্রেন্ড চালু হয়েছে। প্রথিতযশা ও সর্বজনস্বীকৃত ব্যক্তিত্ব ও যুগস্রষ্টাদের প্যান্ট খুলে নেয়ার ট্রেন্ড। শিল্প সমালোচনার নামে, বাকস্বাধীনতার নামে পূবের সূর্যকে পশ্চিমে উঠিয়ে ল্যাং মারার ট্রেন্ড। যাকে যেভাবে মনে চায়, নাঙ্গা তলোয়ার দিয়ে রক্তাক্ত করে সেটাকেই শিল্প সমালোচনার নাম দেবার ট্রেন্ড। প্রথা ভাঙার নাম দিয়ে ন্যায্য-অন্যায্য নির্বিচারে সমাজের সবরকম প্রথা ও ঐতিহ্যকে বুড়ো আঙুল দেখাবার ট্রেন্ড।

এই ট্রেন্ড শুরুতে বেশ ঘামাচি চুলকোনোর মতো আরামদায়ক লাগে। বেশ একটা বিপ্লব বিপ্লব গন্ধ। কিন্তু, একটা সময়ে বিপ্লব বেশি গেজে যায়। আর যাই হোক, গাঁজায় দম দিয়ে, বাপের পয়সায় দেশোদ্ধারের স্বপ্নদোষে ভুগে আর সারারাত মিয়া জুলেখার রসে মেতে থেকে সকালে কীবোর্ডে ঝড় তুলে বিপ্লব হয় না। যেটা হয়, তার নাম অরাজকতা। সস্তা ও সহজলভ্য মোবাইল ইন্টারনেট, মুড়িমুড়কির মতো স্মার্ট ফোন আর ফেসবুক/লাইকী/টিকটিকির হাত ধরে ঘণতন্ত্র, ব্যক্তিস্বাধীনতা, বাঘ-স্বাধীনতা আর সামাজিক বিপ্লবের মহান দৈববাণী সম্বলিত পশ্চিমা সংস্কৃতি আসার পরে এগুলোর কম্বিনেশনে আজকাল একটা চ্যাং(ড়া) ফেসবুকীয় প্রজন্ম (যাদেরকে আদর করে মিলেনিয়াল প্রজন্ম বলে) তথা অতি আইনেশটাইন জেনারেশন দৃষ্ট হয় চারপাশে, হরহামেশা।

এই জেনারেশনে গন্ডায় গন্ডায় আইনেশটাইন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, এলন মাস্ক, আল্লামা রুমী, পদে পদে ড. শহীদুল্লাহ, লেনিন, মাও জে দং, লিংকন, জর্জ ওয়াশিংটন, মোজার্ট, জয়নুল আবেদীন পয়দা হয়ে বসে আছে।  সত্যি বলতে কি, এই জেনারেশন, মানে যাদের আমি বলি, ফেসবুকীয় তৌহিদি জাগ্রত জনতা ওরফে চ্যাং(ড়া) প্রজন্ম, তারা কখনো কখনো আইনেশটাইনের থেকেও বড় বিজ্ঞানী অথবা রবীন্দ্রনাথ/শেকসপিয়ারের থেকেও বড় সাহিত্যিক বনে যায়। শেরেবাংলা বা সোহরাওয়ার্দী তাদের দেশ প্রেমের কাছে নেহাতই শিশু। আর এরা বঙ্গবন্ধুর চেয়েও যেন বড় নেতা, বড় রাষ্ট্রচিন্তাবীদ। ডারউইন তো এদের কাছে ঘেঁটুপূত্রতুল্য।

এই জেনারেশেন রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি নিয়ে রিভিউ লেখে। পারলে নিজেরাও রবীন্দ্রসংগীত লিখত। গীতাঞ্জলি যে ডাহা নকল আর ফালতু-তা নিয়ে জ্ঞানগর্ভ পর্যালোচনা দেয়, যদিও তারা ওই কাব্যের এক লাইনও পড়েনি। এরা বিজ্ঞ মতামত দেয়, গীতাঞ্জলি নয়, নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার নোবেল পাওয়া উচিত ছিল। রবীন্দ্রনাথের লম্বা দাড়ি আর জোব্বা নিয়ে রসিকতা করা ছাড়াও, তিনি যে আজীবন সব হাবিজাবি গান লিখে ও সুর করে গেছেন-এটাই এদের পর্যবেক্ষণ।

রবীন্দ্রনাথ ঠিক কী ছিলেন-সেটা বোধকরি তার সময়ের প্রজন্মও ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। সেই যুগেও, এই যুগেও, বাঙালির কাছে তিনি নেহাতই একজন ’হিন্দু কবি’। এদের বিচারে নজরুল মুসলিম কবি। বঙ্কিম এদের বিচারে নেহাতই ধর্মত্যাগী মাতাল।

(এই লেখাটা পড়ে দেখুন: রবি ঠাকুর না জন্মালে https://sumanchattopadhyay.com/blog/how_would_this_memorable_moment_be_created_without_rabindranath_tagore/?fbclid=IwAR1hn2RoHvpDvCaL0RzCqRLtRVbqwRciTohV18S6erf-sQwW4E5Zkic7CXM) 

একদিন এক জায়গায় দেখলাম, এদেরই স্যাঙ্গাত এক বিজ্ঞ শিল্পবোদ্ধা প্রয়াত আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়েও দশপাতা সমালোচনা দিয়েছেন। না, তার গান, গিটার বাদন বা অন্য কোনো গুন নিয়ে না। তিনি নেহাতই ফালতু মানুষ, তিনি স্বার্থপর, তিনি একচোখা, ভাবিস্ট, তিনি নিজের ছেলেকে ছাড়া আর কাউকে গিটার শিখিয়ে যান নাই-ব্লা ব্লা ব্লা। তার গানের তুলনামূলক বিশ্লেষণ, সেগুলোর শিল্পগুন নিয়ে এক লাইন ও না। কারন, ওগুলো নিয়ে কথা বলতে হলে ঘটে জ্ঞান থাকা লাগে। সেটা নেই আর সেটা রপ্ত করার ইচ্ছাও নেই।

তাহসান আর মিথিলার বিয়ে ভাঙা ঠিক হয়েছে কিনা, মিথিলা তাহসানের জন্য ঠিক ছিল কিনা-তা নিয়ে বিশাল সুশীল জনমত দেয় এই জেনারেটর, থুরি, জেনারেশন। কিন্তু, তাহসান যে চমৎকার গান করেন, তিনি যে একজন চমৎকার চিন্তাবীদও বটেন, তা নিয়ে আগ্রহ কম বিজ্ঞ টিউবলাইটদের। একদল আবার ড. জাফর ইকবাল যে আগাগোড়া একজন ভীরু, কাপুরুষ, সুবিধাবাদী, আম্লীগের দালাল, সুযোগ সন্ধানী, তেলবাজ-তা নিয়ে ব্যপক সরব। যদিও এই TRUE REBELদের দৌড় মাকে ভয় দেখিয়ে বাপের পকেট কাটার মধ্যেই সীমিত।

এই প্রচারনাটা খুব বেশি দিনের না। তো, এই গ্রুপটা এর সাথে জুড়ে দেয়, আরেহ, ওনার সব সায়েন্স ফিকশন তো হুবহু অমুক বই, তমুক বইয়ের নকল। যদিও তারা ওনার বই আর ওই কথিত বইয়ের একটাও পড়েনি। যেন ড. ইকবাল লেখক নন, তিনি চে গেভার এর ভায়রা।

যেন ড. ইকবাল বিজ্ঞানের শিক্ষক নন, তিনি একজন ফেসবুক বিপ্লবী হতে বাধ্য। এদের দাবী অনুযায়ী ড. জাফরকে শুধু শিক্ষক ও লেখক হলেই হবে না। তাকে বিপ্লবীও হতে হবে। তাদের সাথে গলা মিলিয়ে “SORKERER PUSSY চাই” বলতে হবে। তা না হলে তিনি চটি লেখক। আবার তাদের মনমতো করলেই তিনি টলস্তয়। পাড়ার সেলুনের নাপিতও তাই ফেসবুকে তার সায়েন্স ফিকশন রচনার রিভিউ দেয়, তিনি কেন মুক্তিযুদ্ধে এশটেনগান হাতে যুদ্ধ করেন নাই-সেই গণজিজ্ঞাসা ছুড়ে দেয় ফেসবুকীয় জাগ্রত বিবেক। 

আপনি যদি টাইটান গ্রহের মহান রাষ্ট্র উগান্দেশের একজন হারকিউলিস হয়ে থাকেন, আর, উগান্দেশান জনগনের জন্য গোটা একটা সূর্যকেও তার কক্ষপথ হতে কাঁধে করে তুলে এনে উগান্দেশের পল্টূ ময়দানে প্রতিস্থাপন করে থাকেন;

আপনি যদি উগান্দেশের একজন দধিচীও হয়ে থাকেন, আর, যদি উগান্দেশের জনতার জন্য স্বেচ্ছায় দেহত্যাগ করে নিজের হাড়গোড় দিয়ে অসূর বিনাশী তীর ধনুক বানিয়ে দেবার ব্যবস্থাও করে গিয়ে থাকেন;

আপনি যদি তিন হাজার কিলোমিটার ম্যারাথন দৌড়ে অলিম্পাসের চুড়া হতে উগান্দেশের জন্য বিশ্বজয়ের মুকুট ছিনিয়েও এনে থাকেন;

আপনি যদি উগান্দেশের হ্যামেলিয়নিস বাঁশিওয়ালাও হয়ে থাকেন, আর, আপনার ‘বাঁশ’ নির্মীত বংশির বাদন দিয়ে উগান্দেশের সব আবর্জনা পিপলকে ছুড়িগঙ্গায় নিপতিত ও নিকেশ করে উগান্দেশকে পরম পাক-পবিত্র করেও ফেলে থাকেন;

তাতেও কিছু আসে যায় না। তাতে আপনার নির্বাণ আসবে না।

উগান্দেশের ফেবুকিয়ান বিপ্লবী জনতা আপনাকে লেজেন্ড কিংবা কুইনবদন্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেবে না, যতক্ষণ না, আপনি Galim Amlig Sorkarer Pussy Chai-মর্মে একটিও ফেকবুক পোস্ট না দেবেন।

আমজনতার মনপসনদ বিপ্লবী না হওয়া তক আপনি নেহাতই ভেতো বাঙাল। আপনি জাতির শত্রু। আপনি আমজনতার চক্ষুশুল। আপনি নেহাতই CB Abdullah

তাছাড়া, আপনাকে মনে রাখতে হবে, এই মহান উগান্ডান জাতির বিপ্লবী জনতার স্বীকৃতি পেতে হলে আপনাকে একের ভিতর দশ হতেই হবে।

আপনাকে কেবলমাত্র ক্ষুদিরামের মতো বিপ্লবী হলেই হবে না। ক্ষুদিরামের চেহারা নায়কোচিত নয়, আপনাকে তাই বিপ্লবী আন্দালিবের মতো হ্যানসামও হতে হবে। আপনাকে শুধু মহান ভাসানীর মতো আত্মত্যাগী বিপ্লবী হলেও হবে না, আপনাকে অবশ্যই ট্রাম্পের মতো হ্যাডোমওয়ালাও হতে হবে। আবার, আপনাকে কেবলমাত্র পিওরলি সূরের ঈশ্বর রবীশঙ্কর হলেই হবে না, আপনাকে টেলর সুইফটের মতো আবেদনময়ীও হতে হবে।  বই ও ইতিহাস না পড়া, বাপের হোটেলে খাওয়া আর বফ.গফের পয়সায় মাস্তি করা এই গ্রুপটা সেই গ্রুপ, যারা মনে করে, দুনিয়ার আদি হতে আজ তক যত মনিষী ও মহান মানুষ এসে গেছেন, যা কিছু মহান আবিষ্কার পৃথিবীতে হয়েছে, পৃথিবীর গর্ব করার মতো যত যত বিপ্লব ও বিবর্তন-এগুলো সব রাবিশ। এঁরা থাকলে এর চেয়েও বেশি কিছু হত।

এরা ফরাসী বিপ্লবের সমালোচনা করে, কনফুসিয়াস বা মাও জে দং কে এরা খুল্লামকুচি করে ফেলে। এদের বৈপ্লবিক সমাজতন্ত্রের নয়া মতবাদের কাছে তীব্র মার খান লেনিন। পাবলো পিকাসো আর দ্য ভিঞ্চি এদের ভয়ে ফেসবুকে ব্রাত্য। মোনালিসার চোখ যে ট্যারা-সেটাও আবিষ্কার করতে পেরেছে এই চ্যাংড়া বোদ্ধা জেনারেশন।

এই গ্রুপটাই কবি, আঁকিয়ে, নাট্যকার, সুরকার, সাহিত্যিক, নির্মাতা ও দার্শনিক রবীন্দ্রনাথকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধী জানিয়ে তাকে বাংলাদেশের জাতশত্রু বানায়। যদিও এটা একটা প্রপাগান্ডা, তবুও বলতে হয়, কবি তো কবিই। তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের পান্ডা হবার দায় কখন পড়ল? তিনি বঙ্গভঙ্গ চান নাই-সেই দার্শনিক বিদগ্ধ প্রবন্ধ ফেসবুকে ঘোরে। তা বিশ্বকবি ও সংগীতগুরু রবীর কেন দেশপ্রেমিক ও স্বজাত্যবোধে ভরপুর থাকার দায় পড়ল বুঝি না।

কবির কাজ কবিতা লেখা। সঙ্গীতজ্ঞের কাজ গান ও সুরকে নিয়ে। সেটা দিয়েই তাকে বিচার করতে হবে। তিনি তো কোনোদিন স্বদেশী আন্দোলনের নেতা হিসেবে নিজেকে দাবী করেন নাই। কেউ কেউ বের করেছে, তিনি অত্যাচারী জমিদার ছিলেন। আরেকদল ত্যানাকাঁথা খুঁজে, ঘেঁটে বের করে, তিনি লম্পট ছিলেন। (যদিও চ্যাংড়ার দল তার একটা বই কখনো ঘাঁটবে না। চ্যাংড়া প্রজন্মের একমাত্র স্বীকৃত বাইবেল, এনসাইক্লোপিডিয়া ও অ্যালম্যানাক হল ফেসবুক নীতিগদ্য আর জৈনক অভিজ্ঞ কালেকটর। ও হ্যা, নিজের বাপের নাম জানতে চাইলেও এরা গুগলু করে বের করে দেয়।) তো? রবী যদি লম্পটই হন, তার কবিসত্বার কী ব্যঘাতটা হল? এর জন্য কি তার সোনার বাংলা জাতীয় সঙ্গীত হতে বাঁধা আছে? লম্পট হাসন রাজার গান কি আমরা শুনি না?

লম্বট তথা বেশ্যা তথা বাঈজী চন্দ্রমূখীর (মাধুরী) ফর্সা ও মেদহীন কোমরের নাচ কি আমাদের প্রলুব্ধ করে না? কীটস মদ খেতেন কিনা-সেটা কি তার চিরসবুজ কবিতার বিচারের আলোচনায় আসে?  জাতীয় সঙ্গীত বদল করা উচিত-এই লাইনে যেসব ধান্দাবাজ ও রাজাকাররা কথা বলে, তারা আবার যুক্তি দেয়, সোনার বাংলা গানটির মূল সূর তো রবীদার না। তো? তাতে এই গানটির জাতীয় সঙ্গীত হতে বাঁধাটা কোথায় তৈরী হল?   এই সবজান্তা জেনারেশনের কাছে রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বড় সঙ্গীতজ্ঞ হল রোদ্দুর রয়। শ্রাবনী সেন বা কনিকা বন্দোপাধ্যায়ের চেয়ে দিকপাল রবীন্দ্র সঙ্গীত গাতক হলেন জৈনক ’গামছা গেলাশ’।

লালন শাহ এর চেয়ে অনেক বড় মাপের লালন বোদ্ধা হলেন এই চ্যাং(ড়া) ফেসবুক বোদ্ধা জেনারেশন। পন্ডিত শিবকুমার শর্মার সান্তুর বাদনের মধ্যে এরা স্বরলিপি বিভ্রাট খুঁজে পায়, হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়ার বাঁশি বাদনের মধ্যে এরা চাইলেই খূঁত খুঁজে পায়, ডেভিট কপারফিল্ড যে পাড়ার ঝালমুড়ি বিক্রেতার চেয়েও রদ্দি অথবা জোবেরা রহমান লীনু ফালতু একজন অ্যাথলেট-এমন বিজ্ঞ মতামত আমরা এই চ্যাং(রা) জেনারেশন হতে অহরহ শ্রুত হই। চানক্য’র দর্শন পড়বার চেয়ে এদের কাছে চেপু দা’র ফিলোসফি বেশি আমোদের। এঁদের স্টাটাস পড়ে আমরা চক্ষু কর্ণের সুখ নিই।  

এই চ্যাংড়ারা এসব ইতরামোর আবার একটা লজিকও ট্যাগ করে দেয়। “দেখেন না, পশ্চিমে এখন হাজার বছর পরে পুরোনো ইতিহাস নতুন করে লিখছে, লর্ড ক্লাইভের মূর্তি ভেঙে দিচ্ছে, ইতিহাস ওলটপালট হচ্ছে, পুরোনো নাইটদের চরিত্র উন্মোচন হচ্ছে, ইতিহাসের নায়করা ভিলেন বনে যাচ্ছে, বাবরি মসজিদের নিচে রাম মন্দীর আবিষ্কার হচ্ছে।” 

সেদিন একটি গ্রুপে পড়ছিলাম জীবনানন্দ’র দাম্পত্যের ব্যবচ্ছেদ নিয়ে। তার সংসার ও দাম্পত্য নিয়ে লেখক ও পাঠকের ব্যপক রগঢ় শেষে তিনি যে একজন যা তা কবি-সেই ইকুয়েশন।  জীবনানন্দ একজন কবি। যুগশ্রেষ্ঠ কবি। তার কবিতা পড়ি আর তব্দা খাই। কীটস তার চেয়ে বেশি দুঃখবোধের কবি ছিলেন কিনা, হোমার তার তুলনায় কতটা এগোনো-সেটা নিয়ে যখন ভাববার কথা, তখন, তিনি অন্য কাউকে ভালোবাসতেন কিনা, সংসারে সুখী ছিলেন কিনা, বউকে তৃপ্ত রাখতে পেরেছিলেন কিনা, বাচ্চাদের জন্য ফ্ল্যাট কিনে রেখে যেতে পেরেছেন কিনা, এলাকার মসজিদ কমিটির সভাপতি হলেন কিনা, তার বউ তাকে ঠ্যাঙাতো কিনা-সেই খবরে আমাদের কাজটা কী?  তার ’আবার আসিব ফিরে’ আর ’বনলতা সেন’র’ মর্মোদ্ধার করতে করতেই তো সময় পাবার কথা না। তাহলে তার পুরুষ ও পিতা হিসেবে সফলতা ও ব্যর্থতার ব্যবচ্ছেদ করায় পাঠকের এত ব্যগ্রতা কেন? তার পরিচয় আমাদের কাছে একজন কবি। তাহলে তার ’পুরুষ’ পরিচয়ের হালহকিকত কেন পাঠকের আগ্রহের বস্তু হবে? নাকি, ছোটবেলায় আমাাদের বাংলা বইয়ে কবিতা ও প্রবন্ধের শুরুতে একটা ছোট লেখক পরিচীতি থাকত। ফেসবুকেও আজকাল সেই লেখক পরিচীতির নামে তাদের বেডরুমের আবহ বর্ণনার যুগ এলো? নতুন রূপে?  

এই অতি ইঁচড়ে পাকা জেনারেশনের কাছে রাগ সঙ্গীত হল ঘ্যান ঘ্যান; রবীন্দ্র সঙ্গীত হল ঘুম পাড়ানি গান; প্রমথ চৌধুরীকে তারা চিনবারও দরকার মনে করে না; হুমায়ুন আহমেদকে তারা গোণায়ই ধরে না; তাদের কাছে বৈধ সঙ্গীত হল রোদ্দুর রয় কিংবা জিরো মলমের ম্যাৎকার। এই চ্যাং(ড়া)দের কাছে স্বীকৃত একমাত্র বিনোদন হল টিকটক ও ইনস্টা; বিশুদ্ধতম সেতার বাদক তানসেনকেও পারলে কবর হতে তুলে তার রিভিউ দেয়; মোজার্টকে এরা চেনে না বলে রক্ষা। না হলে তিনিও গেছিলেন। রবিশংকর বা আনুশকা যে কী সব যা তা সেতার বাজান-আমরা এই চ্যাং(ড়া) জেনারেশন না এলে জানতেই পারতাম না। ভ্যান গগ যে আদতে রংই চিনতেন না-এই পরম সত্যটা এই চ্যাং(ড়া) সবজান্তা জেনারেশন না থাকলে আর জুকার মামা ফেসবুক প্রসব না করলে জানাই হত না।  

মজার বিষয় হল, এই চ্যাং(ড়া) জেনারেশন নিজ নিজ অঙ্গনে জিরো শর্ট হলেও, ধাড়ি ছেলে-মেয়ে হয়ে বাপ-মা’র পয়সায় নিজের জাইঙ্গা কেনার মানুষ হয়ে আবার তাদের সামান্যতম শাসনকেও নিজেদের ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিপন্থী হিসেবে মনে করলেও, ফেসবুকে আবার এরা যাকে তাকে জ্ঞান দেয়, যার-তার পোস্ট দেবার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন করে, কার কী লেখা উচিত ও উচিত না-সেই সবক অবলিলায় দেয়।   দেখেশুনে ইজ্জত খোয়ানোর ভয়ে পারলে রবীন্দ্রনাথ তার সাধের দাড়িটা কামিয়ে ফেলেন; আর ওদিকে রবীদার ভক্তরা জাগ্রত জনতার হামলা হতে বাঁচতে তার সাথে সংশ্রব অস্বীকার করার জন্য সিনেমা বানান,  মাইরি বলছি, ”রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি।”   

ভাস্কর্য’র ক্লাসিক গুন, বৈশিষ্ট ও করণীয় নিয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। কারন আমি ওই বিষয়ের বোদ্ধা নই।অন্য সবার মতো, জনাব মৃনাল হকের মূর্তি বা ভাস্কর্যগুলো দেখে প্রথমে আমিও হেসে উঠেছি ঠিকই। কিন্তু পরক্ষণে আবার ভাবতে বসলাম, যতই হাসি, আসলেই কি হাসির উপাদান ঘটেছে? ভাস্কর্য, সেটা যদি কোনো ব্যক্তির উপর হয় কিংবা থীমের ওপর, সেটা কি ওই চরিত্রের হুবহু হতেই হয়? হাতে আঁকা ছবি কিংবা কারো মূর্তি/ভাস্কর্য কি হুবহু মূল চরিত্রের অনুরুপ হতেই হয়? মূর্তিগুলোর চেহারা ও আকারের অমিল আছে সত্যি, কিন্তু একটি থিমেটিক যাদুঘর (মাদার তুসোর মতো), যেটা বানানো হয়েছে, মানুষকে ওই চরিত্রগুলোর একটা সংগ্রহ ও ধারনা দিতে, সেখানে প্রতিটা মূর্তি/ভাস্কর্যকে কি অবশ্যই মূল চরিত্রের কার্বন কপি কিংবা ৮০-৯০% মিল থাকতেই হয়?

রাশিয়া, ইতালি, স্পেন, গ্রীসে যেসব মূর্তি রাস্তাঘাটে আছে, সেগুলো নিয়ে কি কেউ প্রশ্ন তোলে, ওগুলো মূল চরিত্রের হুবহু কিনা? বলা যায়, হ্যা, ওগুলো প্রাচীন দেবদেবীর। তাদের চেহারা কেউ চেনে না। আসুন, গেঙ্গিস খান, কিংবা হো চি মীন কিংবা মাও এর স্কাল্পচার নিয়ে। একজন মাও এর ভাস্কর্য কি তার চেহারার সাথে অবিকল হতেই হবে? না হলে সেটা বিকৃত ভাস্কর্য? এটাই আমার প্রশ্ন। যারা ট্রল নিয়ে মেতেছে, তারা জনাব মৃনাল হকের আর কোনো সৃষ্টির নাম বলতে পারবে সবাই? ভাল কথা, একটা গ্রাম্য প্রবাদ আছে, যত গুড় তত মিঠা। তো বাংলাদেশে একজন সামান্য আয়ের শিল্পী এতবড় একটা যাদুঘরের মতো বানাতে কত টাকা বাজেট পেয়েছেন সেটা কেউ খোঁজ নেবার চেষ্টা করেছেন?

জানেনই তো, দুই পয়সার নসগোল্লায় নস হয় না? আর তাছাড়া, আমার জানতে ইচ্ছে করে, যে কটা ফেসবুক পোস্ট এটা নিয়ে পড়েছে, তারা সবাই কি গুলশানের ওই যাদুঘরটাতে নিজে গিয়ে পোস্টটা লিখেছেন? নাকি অন্যের মুখে তামুক খাচ্ছেন? যারা গলা ফাটাচ্ছেন, “আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এটা ওটা সেটা খারাপ করেছেন”, তারা কি বলবেন, তারা নিজেরা বিশুদ্ধ দুধে ধোয়া তুলসী পাতা কিনা? আর যারা যারা গলা ভাঙছে, “আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এটা ওটা সেটা নিয়ে কেন কোনো কথা বলেন নাই” তারা নিজেরা স্টাটাস পয়দা করে ফেসবুক ক্রুসেড করা ব্যতিত কবে কী কী আন্দোলনে কপাল ফাটিয়েছেন?

আমরা একদল বেয়াদব বেত্তমিজ। চাঁদ সদাগর রাজাকার দেলুর নাম নিতে “আল্লামা” বলি, আর একজন সত্যিকারের অধ্যাপকের নাম ধরে বলি। সব আমরা ডক্টরেট তো, তাই। প্রতি ১৫ দিন পর পর দেশের একেকজন গুনি মানুষের চরিত্র হননের মিশনে নামার নতুন একটা চক্রান্ত শুরু হয়েছে। গত টার্মে ভিকটিম ছিলেন জনাব শাইখ সিরাজ। তারপর মাশরাফি। তারপর স্যার আবেদ। তারপর জনাব আবু সায়ীদ। তারপর কে?

তাই বলে কি শিল্পের সমালোচনা করা যাবে না? কেন যাবে না? অবশ্যই যাবে। সেটা শুধু শিল্পের পর্যালোচনাতে সীমাবদ্ধ থাকলে বলার কিছু থাকত না। দুনিয়ার সবদেশেই শিল্পের পর্যালোচনা হয়। কিছু কিছু স্থানে পর্যালোচনা রীতিমতো একটি শিল্প। কিন্তু বাংলাদেশে সংশ্লিষ্ট শিল্প ও সাহিত্য বিষয়ে একেবারেই অর্বাচীন ও ছুঁচোর মতো অন্ধ মানুষেরাও শিল্পীর সৃষ্টিসহ শিল্পীকে একদম মাটির সাথে নুইয়ে ফেলাকে নিজেদের অধিকার মনে করে। শিল্পের কদর তো হয়ই না, উপরন্তু শিল্পীকে আতুড়েই আত্মহত্যা করার জন্য এই সমাজ কৃপাণ হাতে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে নামে। শিল্পীর সৃষ্টিগুলো আপনার কেমন লেগেছে, কোনটা ভাল, কোনটা খারাপ লেগেছে সেটা যুক্তি দিয়ে, তথ্য দিয়ে, ভদ্রভাবে শিল্পের সমালোচনা হতেই পারে। কিন্তু যেটা হচ্ছে, সেটাকে পর্যালোচনা বলা যাবে? নাকি গীবত ও নোংরা ট্রল বলা উচিৎ?

একটা গল্প দিয়ে এই চ্যাপ্টার বন্ধ করি:

আর্ট গ্যালারী। পেইন্টিং প্রদর্শনী চলছে। তো এক দর্শক চাচা গ্রাম হতে এসেছেন। তিনি দেখতে দেখতে একটা ছবির সামনে কিছুক্ষণ দাড়ালেন। কি যেন ভাবলেন। হাত দিয়ে ছুঁয়ে ছবিটাকে দেখলেন। তারপরই চিৎকার করে উঠলেন, “ঠকবাজ, ঢপবাজ, প্রতারক, চিটার সব………………….. “ ইত্যাদি ইত্যাদি। তো লোকজন তাকে কোনোমতে সামলে জিজ্ঞেস করল,

“কী হইছে চাচা, চিৎকার করেন ক্যান?”

”টিকিট কাটার সোময় কইছে, তৈলচিত্তর পেরদরশোনি। এহন দেহি ছবিতে একটুও তৈল নাই। কই, তৈল কই?”

দর্শকরা তো পেরেশান। কোনোমতে চাচাকে সামাল দিলেন।

এবার আসেন, গ্রাম্য চাষাভূষা বাদ দিয়ে শহরে ফিরি।

কিছুক্ষণ বাদে আরেক গ্যালারীতে আরেক শহুরে দর্শক। তার কপালে রোদচশমা, গলায় স্কার্ফ জড়ানো। আরেকটা ছবির সামনে দাড়িয়ে কী যেন বিড়বিড় করছেন।তাকে একজন জিজ্ঞেস করলেন,

“আপনি কি কিছু বলতে চান, বা জানতে চান?”

লোকটা বলল, “না, আসলে আমি ভাবছিলাম, শিল্পী এই বিমূর্ত চিত্রটি দ্বারা কী বোঝাতে চাইলেন? তিনি কি কোনো অপ্সরীর অবয়ব চিত্রায়িত করলেন? নাকি গ্রাম বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য ফ্রেমবন্দী করতে চেয়েছেন? নাকি এটি বুর্জোয়া সমাজের ভঙ্গুর কোনো অবক্ষয়?”

”জ্বি, মানে, ভাইয়া, এটাতো পেইন্টিং না। আর্টিস্টের পেইন্ট করার সময় রং তুলি মোছার তোয়ালে। ছবিটা বিক্রি হয়ে গেছে তো। শুধু তোয়ালেটা ফ্রেম মুছতে রেখে গেছে।”

হটকেক-২: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর ওয়ার্ল্ড র‌্যাংকিং ও ১০ টাকার মাহত্ম্য নিয়ে যারা যারপরনাই চিন্তিত, তাদের আমার একটা প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে, ”এই ওয়ার্ল্ড র‌্যাংকিং জিনিসটা কী?” বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বজনীন কোনো র‌্যাংকিং হয় আদৌ? কে করে? কোন পদ্ধতিতে?

অক্সফোর্ড, কেমব্রীজ, এমআইটি, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট নোবেল সংখ্যার সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ টাকার ট্রলকে তুলনা করে মজা নেয়া হচ্ছে। আপনি কি নিশ্চিত, ওই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওই নোবেলগুলো সব ফেয়ার উপায়ে প্রাপ্ত বা প্রদত্ত? আপনি কি জানেন, ওই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বার্ষিক বাজেট কত টাকা? আপনি কি জানেন, ওই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গ্রাজুয়েশন করতে একজন শিক্ষার্থীর খরচ কত হয়?

আপনি কি নিজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন বা এর ওপর বিস্তারিত স্ট্যাডি করেছেন? নাকি ট্রল দেখেই ঝাপাচ্ছেন?

আপনি কি জানেন, ১০ টাকার বেশি দামের নাস্তা এফোর্ড করার সক্ষমতা আমার মতো নিম্নবিত্ত ছেলেদের ছিল না? ওই সস্তা পানি ডাল, গণরূম, ব্লেডে কাটা মাছ এর বদলে অক্সফোর্ডের মতো খরচ হলে বাংলাদেশের কতজন শিক্ষার্থী ওখানে পড়তে পারত? আমি তো পারতাম না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ আছে কি অক্সফোর্ডে বা কেমব্রীজে? আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ছা্ত্র সংসদ কেন লাগে?

এতটা যদি কষ্ট করে পড়েই থাকেন আর মোক্ষম কিছু গালি বা ত্যানা প্যাঁচানো প্রশ্ন এখুনি আপনার মনে এসে থাকে, সেগুলো উগড়ে দেবার আগে লিংকে দেয়া লেখা তিনটি আরেকবার একটু পড়ে আসুন আর সেখানে আমার মন্তব্যগুলোও। তারপর না হয়…………..? মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সবার আছে। কিন্তু সেটা করার আগে মনে রাখতে হবে, সেটা করতে গিয়ে অন্যের একই অধিকার লঙ্ঘন করা যাবে না। আর মেজরিটির সাথে চলা মানেই সত্য না। সত্য সেটাই যেটা আসলে ‘সত্য’।

সদ্যপ্রয়াত অভিভাবক ও শ্রদ্ধাস্পদ আনিসুজ্জামান স্যারকে নিয়ে আমাদের আরেকজন স্যার একটি নাতিদীর্ঘ মন্তব্য করেছেন-এমন একটা লেখা আমার এক বড়ভাই ড. আনিস স্যারকে নিয়ে লেখা আমার এক পোস্টে মন্তব্যে দিয়েছেন। ওই বড়ভাইকে উত্তরে আমি আরেকটা নাতিদীর্ঘ প্রতিউত্তর দিয়েছি। মনে চাইলে পড়তে পারেন।

তবে হ্যা, যিনি বা যারা মানুষ মরলে প্রথমেই তার ধর্মীয় বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গি ও চর্চা জানতে গুগল করে আগেই ভেবে নেন, “ইন্নালিল্লাহ” পড়বেন, নাকি “ফি নারে জাহান্নামা……” পড়বেন-তারা এসব লেখা পড়ে সময় নষ্ট করবেন না। বড় ভাইয়ের বরাতে আসিফ নজরুল স্যারের মন্তব্য:

[জাতির অভিভাবক ! হঠাৎ কাউকে জাতির অভিভাবক, বিবেক বা বাতিঘর বানিয়ে দেয়ার বাতিক আছে আমাদের। বিশেষ করে কারো মৃত্যুর পর। আমি ভাবি, এ জাতির এতো এতো অভিভাবক, তাহলে এমন দুর্গতি কেন আমাদের? কেন তাদের চোখের সামনে আমরা একটা স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হলাম, দেশের সম্পদ লুটে কোষাগার আর ব্যাংক খালি করে দিলাম, বিনা বিচারে গুমের স্বর্গ্ রাজ্যে পরিণত হলাম, প্রশ্নপত্র ফাঁস করে কয়েকটা জেনারেশন শেষ করে দিলাম, দিনের ভোট আগের রাতে সেরে নিলাম, সীমান্তে অকাতরে প্রান দিলাম, দেশের সংস্কৃতিকে গ্রাস করতে দিলাম। আরো কতো কিছু!

প্রশ্ন আসে, আমাদের আসলে কোন অভিভাবক ছিলেন কি নিরবচ্ছিন্ন? কেউ কেউ অবশ্যই অনেক বড় মানুষ ছিলেন, ব্যক্তি বা কোন বিশেষ মূল্যবোধের অভিভাবক ছিলেন। কিন্তু তারা জাতির অভিভাবক ছিলেন কি? যদি তাই হন তাহলে বলতে হবে, আমরা আসলে কিছু শিখিনি তাদের কাছ থেকে। আমি যেসব দেশে ছিলাম অনেকটা সময় (বৃটেন, আমেরিকা, জার্মানী) সেখানে সবসময় পত্রিকা পড়তাম, নিউজ দেখতাম। কিন্তু সেখানে জাতির কোন অভিভাবক দেখিনি। দেখেছি অনেক গুণী মানুষ আর অসংখ্য সুনাগরিক। সেটা বোধহয় বেশী প্রয়োজন আমাদের।

সদ্য সাবেক অভিভাবক কে ইংগিত করে ভবিষ্যতের অভিভাবক (Asif Nazrul) এর লেখা।]

এরপর বড় ভাইকে আমার উত্তর:

আসিফ সাহেবকে ভাল লাগে। তিনি বেশ যৌক্তিক কথা বলেন। উচিত বিষয় নিয়ে কথা বলেন। কিন্তু মুশকীলটা হয় তখন, মানুষ যখন জেনারেলাইজ করে। তাছাড়া একটা দীর্ঘ সময় মাস্টারি করতে করতে মানুষ সবাইকে তার ছাত্র বা বৃহদাঙ্গিকে সবকিছুকেই তার একসেসিবল অবজেকট মনে করে সবাইকেই তার মতো করে দেখবার অধিকারী মনে করতে শুরু করে। ঠিক যেমন বাঙালিরা মেতিসের আঁকা ছবির খূঁত ধরে। আসিফ সাহেবরাও তার ব্যতিক্রম না।

ওনার বক্তব্য ধরতে হলে, রবীন্দ্রনাথকে শুধু ভাল সাহিত্যিক হলে যথেস্ট না, তাকে বিপ্লবী, তাকে জনদরদী, তাকে প্রজাবৎসল হতে হবে। নজরুল আবার বিপ্লবী, জনদরদী হলে যথেষ্ট না, তাকে আবার ধর্মপ্রাণ হতে হবে। মার্ক্সকে হতে হবে আল্লাহ ভক্ত, আইনস্টাইনকে হতে হত রাষ্ট্রবিরোধী, হিটলারকে হতে হত নামাজি ইত্যাদি। ভাই, সবাই সবকিছু হবে? মৌলিক প্রশ্ন।

আওকাত ও কাবেলিয়াত এর সীমা ও যথার্থতা নিয়ে। সেটা হল, একজন ঘুঁটে কুড়ুনীর কি মেতিস বা পিকাসোর চিত্রকর্মের পর্যালোচনা করা সাজে? কিংবা, রাস্তার পান দোকানীর কি অমর্ত্য সেনের দর্শনের সমালোচনা করবার আওকাত থাকে? একটি খুব মৌলিক ও বুনিয়াদী বিতর্ক হল, গণতন্ত্র বনাম এখতিয়ারের প্রশ্ন। সেটা হল, একজন মানুষ, তিনি যেমনই হোন ও যে-ই হোন, তার ইচ্ছানুযায়ী, বিশ্বাস অনুযায়ী যেকোনো বিষয়, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তার নিজস্ব মহামত বা বিশ্লেষণ প্রকাশের গণতান্ত্রীক ও অ্যাবসলুট অধিকার কি তার রয়েছে? নাকি, তিনি যেই বিষয়ের আওকাতধারী নন, সেই বিষয়ে নিয়ে কথা বলা তার অনধিকার চর্চা?

যেমন মনে করুন, আমাদের অফিসের রোমেসা বুয়া কি রবীন্দ্রনাথের কাব্য প্রতিভা নিয়ে কথা বলা উচিত? আমি বলব, তুমি সবকিছু নিয়ে ভাববার অধিকার রাখো, সবকিছু নিয়ে ইচ্ছেমতো বলবার (অবশ্যই কথা বা লেখার সার্বজনীন নর্মস মেইনটেইন করে) অধিকারও অ্যাবসলুটলি রাখো, তবে তারপরও বলব, ডোন্ট ডু দিস। যেটা তোমার আওকতের মধ্যে নেই, সেটা নিয়ে বরং চুপ থাকো। একজনকে কি সবকিছুই হতে হবে? আসিফ সাহেবের মতো করে বুক চিতিয়ে সরকারের সমালোচনা যে করতে পারবে না, সেই হয়ে যাবে গাদ্দার? সেই হয়ে যাবে পা চাটা? সেই হয়ে যাবে মোসাহেব? তার জ্ঞান, বিদ্যা, অবদান, ধীশক্তি, প্রজ্ঞা, দেশসেবা এসব কিছুই ইনভ্যালিড হয়ে যাবে? তাও স্রেফ, আসিফ সাহেবের দৃষ্টিভঙ্গি ফলো করে সেই লোকটা বিপ্লবী ভূমিকা না পালন করার কারনে?

খাম অন ম্যান? মারভেল কমিক দেখে দেখে এই জাতি আজকাল প্যান্টের ওপর জাঙ্গিয়া না পড়লে কাউকে সুপারম্যানতো দূরে, ম্যানই মনে করে না।আসলে একটা গোপন ও অনুচ্চারিত কথা হল, দেশে যাবতীয় বোদ্ধা বা বুদ্ধিজীবি ও বিখ্যাত লোকদের দুটো ঘরানা হয়ে গেছে। কায়কোবাদ, সদ্যপ্রয়াত আল মাহমুদ, ফররুখ সাহেব-এনাদের একটা কমোন যোগ আছে-ইসলামী ভাবধারার কবি। যদিও তারা নিজেরা ইসলামের বিন্দুমাত্র মানতেন বলে প্রমান নেই।

তবু যাহোক ধরে নিলাম, তারা ইসলামী ভাবধারার কবি। এনাদের মতো করে তাজিয়া, দুলদুল, শাহি, শাহ, পাঞ্জেরী ইত্যকার তথাকথিত আরবী শব্দাবলি সহ পারস্য বা আরবের মতো করে কবতে, সাহিত্য না চর্চা করলে তারা হয়ে যায় অপাংক্তেয়। যে কারনে আহমদ ছফাকে আসিফ সাহেবরা গলির ক্রিকেটার বানিয়ে দেবেন, যদি তিনি সারা জীবনে একবারও সরকারকে গালি না দিয়ে থাকেন। কেন রে ভাই, জাতির অভিভাবক হতে গেলে তাকে অবশ্যই ফরজ নামাজের মতো করে সকাল সন্ধ্যা টকশোতে সরকারী দলের গুষ্টি উদ্ধার করতেই হবে? একটা দেশের সবাইকে বাধ্যতামূলক বিপ্লবী হতেই হবে?

আর যদি বিপ্লবই হয় জাতির অভিভাবক হবার সবচেয়ে বড় নিয়ামক, তবে তো মনে হয়, সেফুদা বাংলাদেশের বাঙালিদের আর রোদ্দুর রয় কলকাতার বাঙালিদের জাতির অভিভাবক হবার জন্য সবচেয়ে বেশি কাবেল। দু’জনে তো এই দুই পাড়ের বাঙালদের মনের মতো করে সরকারকে কষে গালাগাল করেন।

#IdiotsAsCritics #DestructiveCriticism #Review #Art #Critics #Blame #Defame #RankingofUniversity #Education #Creativity #Revolution #GenerationZ  #GenZ #MillennialGeneration #GenerationGap #ClashOfGeneration #DeviationOfGeneration #DeviationOfNation #DeviationOfCountry #NationalDestruction #SocialDestruction #SocialDeviation #DestructiveNation #ForceRebel #MultipleTalent #BangladeshSociety #SocialMediaCulture #PseudoIntellectuals #RabindranathTagore #KaziNazrulIslam #JibananandaDas #ZafarIqbal #UniversityofDhaka #EducationRanking #CancelCulture #BangladeshiYouth #CulturalDebate #BangladeshArt #FreedomOfSpeech #ToxicCriticism #DigitalBangladesh #IntellectualDishonesty #CriticalThinking #MultipleRole #AllInOne #আপনিতখনকইছিলেন #একেরভিতরসব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *