মনুষ্য সমাজের মতো প্রাণীকূলেও বোধহয় ফেস-বুক, জেনারেশন-গ্যাপ এসব দেখা দিয়েছে। সঙ্গদোষে লোহাও ভাসে শুনেছি। চলমান হাইপে বঙ্গদেশের জনপদ ভেসে যাবার আহাজারিও শুনে থাকি। কিন্তু, সেই স্রোতে অবলা প্রাণীকুলের গা ভাসানোর জলজ্যান্ত উদাহরন দেখে থমকে গেলাম।
সকালে ঘুম ভাঙল হকারের ডাকে। “অঁই, লাগব নি কক মুরগী?” কক, মুরগী!!!!
কী বলে!!
মনুষ্য সমাজে ’মেয়েছেলে’ নামে এক আজব প্রাণী আছে। পুরুষরা নারীদের খাটো করার জন্য এই টার্ম আবিষ্কার করেছে। ভাবলাম, তার মতোই কিছু একটা হবে এটা।
নিচে ঠাহর করে দেখেও ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না, মুরগী সম্প্রদায়ের ট্রান্সজেন্ডার ইদানীং বেরিয়ে গেছে কিনা।
ঠিক যেমন বুঝে উঠতে পারি না, এই দেশে যেকোনো ফসল, খাদ্য, পণ্য সামান্য বড়সড় দেখলেই ক্রেতারা তাদেরকে ‘দেশী’ ও ’বিদেশী’ দুই কাতারে ভাগ করে ফেলে কেন। এমনকি, পাবদা মাছ, যা দামের কারনে বাঙালি একসময়ে কিনতে পারত না, সেটা চাষযোগ্য হওয়ায় বরং বাঙালি আজকাল পাবদা খেতে পায়, তারা সেটাতেও নাক সিঁটকোয়-এহ, চাষের মাছ। চাষের পাবদা, বিদেশী পাবদা বলে। চাষ না থাকলে পাতে পাবদা পড়ত না-সে চিন্তা নেই। আগে টেস্ট, আগে রসনা, আগে রস।
অবশ্য বাঙালদের থেকে এটা নতুন কিছু না। এঁরা কাজের চেয়ে হাঁকডাঁককে বেশি ভালোবাসে, ভালোবাসার চেয়ে প্রেমকে বেশি মর্যাদা দেয়, খাদ্যগুণের চেয়ে রান্নার টেক্সচারকে বেশি গুরুত্ব দেয়া জাত আমরা।
ছোটবেলার জীবনে সবচেয়ে দুখী প্রাণী ছিল মুরগী। দরিদ্র মফস্বলে মেহমান-অতিথীর কোনো ঔচিত্যবোধ বা শরমবোধ ছিল না। অসময়ে বেড়াতে চলে আসত।
সারাদিনের পাড়া বেড়ানো মোরগ-মুরগী যখন রাত নামার পর ঘরে ফিরে সারাদিনে কে কার সাথে ডেট করেছে, তা নিয়ে সুখ দুঃখের পানের বাটা খুলে বসবে বসবে করছে, কয়টা দানা বেশি খেয়েছে, কোন বাড়িতে আজ ভোজ ছিল, টুক টুক করে কথা বলার ফাঁকে যখন মুরগা বাবাজি তার নিজস্ব অধিকারের মুরগীকে হালকা রোমান্টিক এপ্রোচ করবে বলে ভাবছে, তখুনি গেরস্ত বউ খপ করে দরজা খুলে মোরগটাকে ক্যাঁক করে ধরে বটির তলে দিয়ে দেয়।
তখনকার দিনে মোরগকে বড়জোর মুরগা বা মোরগা বলা হত। আজকালকার মতো কক ডাকা তখনো শুরু হয়নি। মেহমানের সম্মান রক্ষায় মোরগের রোমান্সের হঠাৎ ইতি। তখনকার দিনে বাজারে সারাদিন গরুর গোশ বিক্রি হত না। বাজারে মাছও সারাদিন বিক্রী হত না। অসময়ে আসা সম্মানী মেহমানকে কী দিয়ে আপ্যায়িত করবে? তাই ঘরের মুরগাই ভরসা।
বাঙালির ঔচিত্যবোধ কোনোকালেই খুব তীব্র ছিল না। সন্ধ্যার পরে একটি মফস্বলের বাসায় বেড়াতে এলেও তাদের মুরগা দিয়ে প্রথম সন্ধ্যা ভাত না খাওয়ালে বউ তালাক হয়ে যাবে।
হোস্টেলে আমাদের ক্রাইসিস ফুড ছিল ডিম। দুর্মূখেরা ছড়া কাটে-গরীবে দিন আনে দিন খায়। ব্যাচেলররা ডিম আনে ডিম খায়।
জগতে একমাত্র মুরগীরাই বোধহয় সেই প্রাণী, যারা বেঁচে থাকতে নাম পায় না, উল্টো মরলে তারপর নামকরণ হয়। যেমন, মুরগী মরে গেলে তার নাম হয়- চিকেন ফ্রাই, চিকেন সাসলিক, চিকেন বারবিকিউ, চিকেন নাগেট, মুসাল্লাম, কাবাব। বেঁচে থাকতে কেবলি মুরগা।
মানুষের মতোই। বেঁচে থাকতে দাম নেই। মরলে শহীদ, লিজেন্ড। মুরগীর জন্মটাই বিতর্কিত।
ডিম আগে না মুরগী আগে-তা নিয়ে তর্ক আছে বেশুমার। বঙ্গদেশে মনে হয় মুরগী আজকাল সিভিটের মতো খাওয়া হয়। মুখরুচির মতো। মুখরুচির মতো। থকথকে থলথলে ব্রয়লার চিকেন দোকানে দোকানে, ফুটপাতে, ঘরে, রেস্টরেন্টে, ফ্রীজে, বাজারে, বারে, চায়ে, ভাতে, পাতে, লাথে, সর্বত্র মুরগী মুরগী।
বাচ্চারা মুরগীর মাংস ছাড়া কিছুই খায় বলে শুনিনি। তাল তাল ব্রয়লার মুরগী খেয়ে খেয়ে একেকটা মুরগীর মতোই থলথলে স্থুল ও অচল মালে পরিণত হয়। দুই পা হাটতে পারে না, বৃষ্টির পানি লাগলে কম্বলের মধ্যে জড়িয়ে রাখতে হয়, রোদে গেলে মাথা ঘুরান্টি দিয়ে মরে।
মা বাবাগুলি তবু থামে না। বাবুকে আরো মুরগী খাওয়ায়। আরো। আরো। বাবুও চিকিন ছাড়া কিছু মুখে তুলবে না।
পুরাকালে গ্রাম দেশে সনাতন সমাজে নাকি একটা কথা প্রচলিত ছিল। শহরে গেলে নাকি অল্পবয়সি পুরুষ মানুষ হোটেলে যাইয়া ‘মুরগী’ খাইয়া অপবিত্র হইয়া আসিত। বুঝুন ঠ্যালা। হোটেলে মুরগী খাওয়াও তখন পাপ ছিল। জাত চলিয়া যাইত।
কোনো এক অদ্ভূত কারনে, বঙ্গদেশে রেস্টোর্যান্টকে হোটেল বলা হয়। বাঙালির সবকিছুতেই বিদেশী প্রীতি। এমনকি, বংশবৃদ্ধির কর্মকান্ডেও তার বিদেশী ইকুইপমেন্ট চাই।
বংশবৃদ্ধি রোধকল্পে পরিধেয় রাবার টুকরোও বিদেশী। তার গন্ধও বিদেশী (স্ট্রবেরীর গন্ধ হতে হবে, গাঁবের গন্ধ নয়।) পরনের অন্তর্বাসটিও তার বিদেশী সুঠাম নায়ক-নায়িকার পরনেরটার মতো বিদেশী হতে হবে। টাট্টিখানার টিস্যু পেপার বিদেশী। শুধু মুরগী খাবার সময় দেশী।
শুনতে পাচ্ছি, দেশে নাকি প্লাস্টিকের ডিম এসে গেছে। তা বটে। এই নিয়ে ফেসবুক ক্রূসেডাররা বিস্তর কনটেন্ট লিখে চলেছেন। প্লাস্টিকের ডিমে তাদের আপত্তি। প্লাস্টিকের হৃদয়ে অবশ্য কোনো দোষ নেই। খাও বাঙালি, মুরগী খাও।
শুনতে পাচ্ছি, এই মুরগীও বাজার হতে উঠে যাবে। আসছে জেনেটিক মুরগী। সেটা আবার কী?
না, ল্যাবে মুরগী বানানো হবে। মানে, কেবল মুরগীর মাংস। কৃত্রিমভাবে মাংসই শুধু গ্রো করা হবে। ফলাফল, আজকে যারা মুরগার গিলা-কলিজি দিয়ে রেস্তোরাঁয় সকালের জম্পেস নাস্তা খেয়ে অভ্যস্ত, তাদের কপাল পুড়তে চলেছে।
মুরগীর মাথাটা কুচুর করে চিবিয়ে খেতে খেতে যেসব রমনী নিজ স্বামীর মাথাটা চিবিয়ে খাবার মশকো করতেন, তাদের কপালও পুড়তে চলেছে।
কারন, মুরগা বলে আর কিছু থাকছে না। থাকলে কেবল মুরগার গোশতো। ল্যাবে পয়দানো কৃত্রিম গোশতো। ছাল নাই কুত্তার বাঘা নাম শুনেছি।
এবার আসছে, ছাল, চামড়া, গিলা, গুর্দা, কলিজা, পাখনা, পা, মাথা-নাই মুরগার চিকিন নাম।
#chickenpolicy #genderdestruction #/hencock #meat #thuglife #foreign