Skip to content

যাকে সযত্নে করেছ ত্যাগ

  • by

এই লেখাটি একটি আজারিয়া প্যাঁচালে পূর্ণ মানববিদ্বেষী ইসটেটাস। মন দিয়ে পড়লে রসটা ধরতে পারবেন।

তো, এটা যখন প্রথম লিখেছি, তখন ঘড়িতে বাজে রাত ১২ টা ১ মিনিট, ওদিকে ক্যালেন্ডারে ২৬ মার্চ ২০২১ শুরু হল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ তম বার্ষিকী। তারই পাশাপাশি ২৬ মার্চই হল জগতের এই ৬৮ তম সুখী দেশের একজন নগন্য নাগরিক ও তার পার্টনারের ’স্বাধীনতা হরণের মধ্য দিয়ে যৌথবাসের লাইসেন্স প্রাপ্তি’র এক যুগ পূর্তি।

স্বাধীনতা ও পরাধীনতার এই বিপরীতমুখী মেলবন্ধনটি ঘটাবার চিন্তা অবশ্য আমরা দু’জন ১২ বছর আগে যখন করি, তখন চিন্তাটি ছিল, যতদিন বাংলাদেশ আছে, ততদিন এই দিনে অফিস ছুটি নেবার চাপ নেই। চির ছুটি।আরেহ দাদা, ’কনগ্রেগেশন’ দিতে নিচে দৌড়াবেন না। ওটা কালই শেষ হয়ে গেছে। তার চেয়ে লেখাটা পুরোটা পড়া শেষ করুন না। তার পরে না হয় বলবেন, “মিঠুন দা, নাচুন না”।

এর আগে ২৪ তারিখ রাতে যথারীতি আমি ও নিটোল (যিনি আমার পার্টনার আরকি) রাস্তা মাপতে বেরিয়েছি। আমি ওজন কমাতে আর তিনি তার ভাষায় “গ্যাস কমাতে”। তার বিশ্বাস, তার পেট ভর্তি শুধু গ্যাস, গ্যাস আর গ্যাস। দু’জনে ভাবছিলাম, কোভিড প্রোটোকল আবার যৌথবাসের এক যুগ পূর্তি-দুটোকেই হারমোনাইজড করে একটি ‘লিভ টুগেদার (মানে গেট টুগেদার আরকি) আড্ডা আয়োজন করা যায় কিনা এবং করা গেলে সেটা কীভাবে? বিবেচ্য বিষয়ের একটা অংশ হল-কাকে বিরক্ত করার অধিকার রাখি? (মাঝে মধ্যে সামাজিক চিরাচরিত অধিকারগুলো নিয়ে সত্যিই ভাবি-সহমত, মুগ্ধ ভাই, দারুন ভাইয়ের ভীড়েও। কারন, ওই অধিকারগুলো কিছু মানুষ সযতনে কুক্ষিগত করেছেন যে।)

বহুক্ষণ মাথা ঘামিয়ে সেই থোড় বড়ি খাড়া>খাড়া বড়ি থোড়। সবসময়ই যেটা হয়। সেদিন রাতে আমরা দু’জনে ভাবছিলাম, “চার দশক জীবন ও তৎসহ কয়েক দশক ঢাকাবাসের পরও একটি মধ্যবিত্ত দম্পতিকে যদি তাদের সহবাসের যুগ পূর্তির উৎযাপনে সঙ্গপ্রাপ্তির যোগ্যতা ও প্রাপ্যতা খুঁজতে মাথা ঘামাতে হয়, তাহলে তাদের ”কন্ঠে কলসী ঝুলাইয়া যমুনায় ঝম্প মারা উচিত।”  (বাঙাল মধ্যবিত্ত শহুরে অবশ্য সহবাস বলতে বিশেষ দাম্পত্য আচরনকে বুঝলেও আসলে বিষয়টা যৌথবাস।) আমার এই ইঙ্গিতপূর্ণ বোলচাল পড়েও যদি এখনও আপনার ’কনগ্রেগেশন’ জানাবার খাহেশাত উষ্ণ থেকে থাকে, তাহলে যান, পড়া পজ দিয়ে একখানা কনগ্রেগেশন ঠুকে আবার এসে পরের অংশ শেষ করুন। কনগ্রেগেশন। কনগ্রেগেশন।

‘বন্ধু’, হ্যা ‘বন্ধু’- এটা আমার জীবনের এক বিশেষ ফেনোমেনন। খেয়াল করলে দেখবেন, আমার এত এত দিস্তা দিস্তা হাবিজাবি লেখার ভিতরে ‘বন্ধু’ কথাটির উচ্চারন অত্যন্ত ক্ষীণ। বন্ধুত্ব নিয়ে আছে আমাদের দু’জনের নিজস্ব দর্শন। নিজস্ব অর্থ। আমি তাই বলি সুহৃদ। এটাই বরং বলতে আরাম-সুহৃদ। আমাদের ছোটকালে ‘বন্ধু’ জবানটা আমাদের মফস্বলের চ্যাংড়াদের ঠোঁটে আসত না।

তাই আমরা বলতাম, ‘ও হল আমার কেলাশমেট।” বড় হতে হতে মাথা ছাদ ছুবার পরেও অন্য কারনে ‘বন্ধু’ আর উচ্চারন করার ফুরসত ঘটল না। সহসা উচ্চারন করেছি বলে তাই মনেও পড়ে না।  বহু বহু আগে একবার লিখেছিলাম, “বন্ধু পাতাইতে কী লাগে?” অনেকগুলো প্রতিউত্তর জমা পড়েছিল সেই কাঁচা হাতের স্ট্যাটাসে। বন্ধু পাতাতে যাই লেগে থাকুক না কেন, সেটার যোগান আমাদের জীবনে যৌবনলুপ্ত পদ্মার মতো শুকিয়ে গিয়েছে বহুদিন আগেই। বিধায় বন্ধুতার যোগান বড্ড ক্ষীন। নিজস্ব তরিকার মতবাদের গোঁড়া বিশ্বাসী হওয়ায় আর আত্মসম্মানবোধ টনটনে হওয়ায়, সমাজেও খুব ব্রাত্য। তার ফলাফল অত্যন্ত উগ্রভাবে দৃশ্যমান হয় আমাদের প্রাত্যহিক প্রকাশে।

আমার হার্ড ড্রাইভে বিগত ১২ বছরে তোলা আমাদের যৌথ ছবিগুলোর প্রায় ৯৯%ই হল সেলফী টেক, যার ইঙ্গিতটা খুব অর্থবহ। দলে না চললে, দলফী কই পাব?২৬ তারিখ রাতে যখন আমি এই লেখা লিখেছি, তার একটু আগেই আমরা জামাই বিবি বসে প্রায় ঘন্টা তিনেক মাথা ঘামিয়েও বের করতে পারিনি, আমরা বিগত ১১টি বার্ষিকী স্রেফ রাস্তায় হেঁটে বাদাম খেয়ে কাটালেও, এই বারে, কিছুটা ছেলেমানুষী করব কিনা, আর করলে সেটা কীভাবে? বিবেচ্য সবচেয়ে বড় বিষয়টি হল কোভিড১৯ এর ভয়াবহ সাম্প্রতিক বিস্তার, এবং আমাদের দু’জনের ঔচিত্যবোধ। সামর্থহীনতার উল্লেখ করে আর একবার লোক হাসাব না। আগে পরে আটপৌড়ে গেলেও, এবার মনে হয়েছিল, একটা পাগলামো করে দেখাই যাক না, যাতে, আগামী ১০ বছর পরে গিয়ে জীবন দর্শন বদলে গিয়ে যদি আফসুস হয়, “ইশ, ১২ বছরের পূর্তিটাও কি অন্তত সেলেব্রেট করা যেত না? কী বোকাই না ছিলাম আমরা!”-তখন যেন একটা সান্তনা থাকে।ঠিক যেরকম করে, রাজকীয় কত্তাদের জেল্লা দেখে দেখে আজকাল বিচিএস কেন দিলাম না-সেই আফসুস হয়।

যাই হউক, যা বলছিলাম। এই ১২ বছর বা আগামী ২৪ বছরও আমাদের দু’জনের কাছে আসলে খুব দ্রস্টব্য নয়। (যদিও আমার শ্রদ্ধাভাজন তানভীর মনে মনে অথবা কমেন্টে কমেন্টে বলবে-”মুখে/ফেসবুকে যাই বলুন না কেন, আপনি তো সব গুছিয়ে এটা লিখে রেখেছেন ৯০ দিন আগেই, বিশেষ দিনের জন্য।” (না হে বৎস, এটা একটি টাটকা ও ইঙ্গিতপূর্ণ ইসটেটাস।) ”কী করে যে বারো বছর কেটে গেল!”-এমন ন্যাকামো করা গেল না, কারন, আমাদের ১২ বছরের হিসেবটি জ্বলজ্বল করছে চোখের সামনে। অবশ্য এই ’১২ বছর’ এর জন্ম দিতে গিয়ে ঘটানো ঘটনার পরিক্রমাও বেশ ঘটনাবহুল। অবিশ্বাস্য উথাল ও পাথালের টালমাটালে সাজানো ১২ টি বর্ষ।

জগতে যতগুলো দম্পতি আছে, (ধরি মোট ১০০ কোটি দম্পতি), তাদের প্রত্যেকেটির একটি একান্ত নিজস্ব ও ইউনিক মন্ত্র আছে। সেই মন্ত্র দিয়েই তারা জয় করে যৌথবাসের জীবনে নারী ও পুরুষের বিপরীতমুখী মানসের দূরত্ব।  মন্ত্র আমাদেরও আছে-দু’জনের প্রচুর বৈপরীত্যের মধ্যেও। কেউ সেই মন্ত্র দ্রূত শেখে ও প্রয়োগ করে। কেউ হয়তো একটু দেরীতে শেখে। অবশ্য আমার জীবনের সবই দেরীতে। তাই নতুন কোনো আফসোস হয় না। এই যেমন দেরীতে হলেও শিখেছি জীবনের কিছু অতি জরুরী বাস্তব শিক্ষা-একা বাঁচো, নিজেকে নিয়ে বাঁচো, নিজেকে ভালোবাসো। অনেক পুড়ে শেখা। তবু শিক্ষাই তো। সে যে অমূল্য।

হয়তো, আপনার খুব কৌতুহল হচ্ছে, তাহলে গতকাল সারাদিন আমাদের ‘কারিক্রোম’ কী কী ছিল? আমরা ঘন্টা তিনেক ব্যয় করেও বুদ্ধি বের করতে না পেরে, মশার ভয়ে মশারী টাঙিয়ে (যদিও মেয়র স্যার বলেছেন, আমাদের নাকি মশারি দরকার পড়ে না) ওই দিন ঘুমাতে গেলাম, এই ভেবে, যে, ঘুমের মধ্যে কোনো দ্যাবতা এসে যদি কিছু জ্ঞান দিয়ে যায়। যদিও আমি মিরাকল নামক জিনিসের সম্মুখীন অনেকবার হয়েছি, তবু মিরাকল বিশ্বাস করি না। ঠিক যেমন বিশ্বাস করি না ভূতে, কিন্তু তারপরও ভূতে ভয় তো ঠিকই পাই। দেখা যাক, রাত ঘুমে কোনো মিরাকল ঘটে কোনো বুদ্ধি পেয়ে যাই কিনা।

’মেরেকেল’ না ঘটলেও খুব ক্ষতি নেই। আমার এক সুহৃদের লেখার একটা লাইনের মতো করে (তোমার নিচের ঠোঁটের ইজারা নিয়েছি-জিতু)  রাজাবাহাদুর এই নগরের পথঘাট তো কাল ও পরশু ইজারাই নিয়েছেন শুনলাম সংবাদে। রাজপথে তো আর নামতে দেবে না।  কিন্তু তিনি গলিপথগুলো আর আর ইজারা নেন নাই। সেখানে তো প্রান্তজনের রাজত্ব।

২৭ মার্চ…………………….লিখছি উপসংহার………….[মিরাকল ঘটেনি], তাই, বিগত ১১ বছরে যেভাবে কাটিয়েছি, সেই একই কেরামতে, পথে পথে ধুলোয় নিটোলের অনভ্যস্ত শাড়ি লেপ্টে, আমার এক ফিতার স্যান্ডেলে ধুলোর মাখামাখি, গলিপথে চৈত্রের দাপটে ধুঁকতে থাকা কুকুরদের ঝুলে পড়া জিহবার কাতরতা দর্শন, পানের কষে ওষ্ঠ রাঙিয়ে, বহুমূল্য রজনীগন্ধার অনুপস্থিতিতে পথের পাশের ঘেঁটু ফুলে খোপা আগলিয়ে,দু’জন বয়স্ক জায়া ও পতি টিনএজ বাচ্চাদের মতো হাত ধরে নগরের গলিপথে চোরা লজ্জা নিয়ে হেঁটে হেঁটে রাষ্ট্রের ৫০ তম স্বাধীনতা দিবসে নিজেদের ১২তম পরাধীনতা দিবস বেশ ভালই উদযাপন করেছি।

মোটের ওপর খারাপ হয়নি। বিশেষত, গত ১১ বছরের অভিজ্ঞতা যেখানে। একা বাঁচতে শেখা দারুন (বা নিদারুন) অভিজ্ঞতা।২৬ তারিখ একটি দোলাচলের মধ্যে লেখা আমার এই আজজাব লেখাটি যদি আপনি আজ ফেসবুকে পড়ে থাকেন, তাহলে ধরে নেবেন, আমাদের দ্বাদশ বিবাহ দিবস সমস্ত আগাম পরিকল্পনা ও রঙিন কল্পনাকে বরাবরের মতো ব্যর্থ করে যথানুমিতভাবেই ব্রাত্য ও নির্বাসিত মোডেই অতিক্রান্ত হয়েছে।

যথানুমিত, মানব ও দানব সমাজের কোনো প্রতিনিধির সঙ্গপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা যায়নি বিধায়, নগরের গণ ও জনারণ্যে উড়িয়েছি কল্পনার ফানুষ। নিঃসঙ্গ উদযাপনের ডজনপূর্তির ষোলকলা পূর্ণ করে। নাউ, কনগ্রেগেশন টু আস।

#weddinganniversary #pretender #fraud #friends #cheat #scam

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *