গা বাঁচিয়ে চলবার সুবিধাবাদী চরিত্র নিয়ে ইন্টারনেটে চমৎকার ও শক্তিশালী একটি লেখা পড়েছিলাম একবার। লিখেছেন (সম্ভবত) মি. মার্টিন নিমোলার |
”প্রথমে ওরা এসেছিলো।
যখন প্রথমে ওরা কমিউনিস্টদের জন্যে এলো,
আমি কিছু বলি নি।
কারণ আমি কমিউনিস্ট নই।
তারপর যখন ওরা ট্রেড ইউনিয়নিস্টদের ধরে নিয়ে গেলো,
আমি চুপ করে ছিলাম।
কারণ আমি শ্রমিক নই।
তারপর যখন ওরা ফিরে এলো ইহুদিদের গ্যাস চেম্বারে ভরে মেরে ফেলতে,
তখনও আমি নীরব ছিলাম।
কারণ আমি ইহুদি নই।
শেষবার ওরা এলো আমাকে ধরে নিয়ে যেতে।
আমার পক্ষে তখন কেউ কথা বললো না,
কারণ কথা বলার মতো তখন আর কেউ বেঁচে ছিলো না।”
এই লেখার ভাষাটাকে সামান্য একটু অদলবদল করে নিলে আমাদের চলমান সমাজের একটি দারুন ছাপচিত্র মিলে যাবে।
প্রথমে ’ওরা’ ’এঁন্দুদের’ পোড়াবে। পুড়িয়ে কয়লা করে মারবে।
তারপর, ওরা ’নাস্তিক’ ’মুসলমান’দের ধরবে।
সেটা শেষ হলে ওরা ’মোরতাদ’ মুসলমানদের গলা কাটবে।
তাতেও ক্ষান্ত না হয়ে ওরা আরও সাহসী হবে।
এর পরে ওরা ’কাইদ্দানী’ আর ’শিয়া’দের শেষ করবে।
রক্তপিপাসু ওরা অতঃপর হাত বাড়াবে ’কম কম’ মুসলমানদের দিকে। তাদের খতম করবে।
প্রতিটা স্তরে আমরা কখনো সুখ, কখনো অস্বস্তি, কখনো তৃপ্তি, কখনো জিঘাংসা, কখনো সামান্য উদ্বেগ, কখনো মৃদু প্রতিবাদ-এসবের অনুভূতি ও মৃদু চেতনার ভিতর দিয়েই দায়ীত্ব শেষ করব। করেই ক্রীকেট নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ব। নতুন মাংসল ’দেশী’ ব্রয়লারের আগমন নিয়ে রতিসুখে মত্ত হব।
মহান ’ওরা’ কিন্তু থেমে যাবে না।
’ওরা’ এরপর কড়া মুসলমান, সাচ্চা মুসলমানের নিক্তি নিয়ে নামবে। যারা কড়া না-তাদের ধরবে। মাযহাব ধরে কাটবে। তরিকা বেছে মারবে। অতঃপর কে সহিহ, কে বাতিল, কে হবে জেনুইন ইমাম মাহদী-তার দাবী নিয়ে নিজেরা নিজেদের মধ্যে খুনাখুনি করবে।
খোদ আল্লহ যেখানে তার নাফারমানকে প্রতিনিয়ত ইনসট্যান্ট বজ্রপাতে নিপতিত করে অবমাননার তাৎক্ষণিক বিচার করেন না,
যেই আল্লহ মৃত্যুর আগমুহূর্ত তক তওবা করার সুযোগ সৃষ্টি করে রেখেছেন,
যেখানে নবী মুহাম্মদ (সাঃ) তার ঘাড়ে সেজদারত অবস্থায় উটের নাড়িভুড়ি চাপিয়ে অপমান ও কষ্ট দেবার কুশিলবদের বিরুদ্ধে অবমাননার শাস্তি দেন নাই,
মাথার রক্তে পায়ের জুতা ভিজে যাবার পরও তায়েফবাসীকে অভিশাপ দেন নাই,
আমরা মানুষ হয়ে, সংখ্যার জোরে, গতরের শক্তিতে সেই আল্লহ ও তার রাসূলের অবমাননার বিচারের দায়ীত্ব নিজের হাতে তুলে নিই।
কে দিয়েছে আমাকে বিচারের ম্যানডেট?
বে-ঈমানী জোসে যে শুয়োরগুলো সারাদেশে সংখ্যালঘু, হিন্দু, অমুসলমান, কম মুসলমানদের ওপর নারকীয় হামলা করেছে, করে গেছে যুগের পরে যুগ, করে যাবে যুগের পরে যুগ, এই শুয়োগুলো ওই রাতের এশার নামাজ, সকালের ফজরের নামাজটাও পড়ে নাই। নিশ্চিত থাকতে পারেন। অবশ্য ‘কাফের’ দমনের এই কল্পিত যুদ্ধে সবই বৈধ।
না, আমাদের এই ফেসবুকীয় সুশীল প্রতিবাদ, মৃদু আলোড়ন, দূর থেকে নিজের সবরকম সুবিধা ঠিক রেখে ঢাকা, সিডনী, নিউইয়র্ক, টরোন্টো, লন্ডনের নিরাপদ দূরত্ব হতে সোশ্যাল মিডিয়া তোলপাড় ওদের থামাবে না।
ওরা কুরআন অবমাননার বিচার করে, কিন্তু নিজেরা কুরআন পড়ে না। ক্বাবা শরিফের অপমানের বিচার সেরে ফেলে, কিন্তু, ক্বাবার দিকে ফিরে এক ওয়াক্ত নামাজও পড়ে না। সেখানে ওরা আমাদের এই ফেসবুক স্টাটাস পড়বে? পড়লেও শুধরাবে?
ওরা পড়ে বিদ্রোহী কবির বাছাই করা, কর্ণার করা কবিতা-
রাসূলের অপমানে না কাঁদে যদি তোর মন………………..
কিন্তু, ওরা নজরুলের আর কোনো কবিতা পড়বে না। সাম্য নিয়ে তার লেখা-
“হিন্দু না ওরা মুসলিম”– ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন?
কান্ডারী, বল, ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা’র
–ওরা পড়বে না।
ওরা পড়ে না। ওরা পড়বেও না। পড়লে ওদের জোস কমে যাবে। সত্যটা জেনে যাবে-তাই ওদের পড়তে দেয়াও হয় না।
’ওরা’ শুধু মারবে। শুধু কাটবে। শুধু পোড়াবে। ওদের শুধু চাই রক্ত। চাই প্রতিহিংসা। চাই গরম গরম জোস।
ওদেরকে ধর্মের সাম্যবাণী শুনিয়ে থামাতে পারবেন না। ওদেরকে রাসূলের জীবনি শুনিয়ে দমাতে পারবেন না।
শুনতে যেমনই লাগুক, আপনার ভাল লাগুক বা না লাগুক, আপনি মানুন বা না মানুন, বিশ্বাস হোক বা না হোক, জুপিটারের দেশ ’উগান্ডা’তে ‘স্ব-সংজ্ঞায়িত’ ধর্মবোধ ভারসাস ‘আত্ম-চিত্রিত’ মুক্তচিন্তা কেন্দ্রীক একটা বিভেদ রেখা খুব প্রচ্ছন্ন বা প্রস্ফূটরূপে ধীরে ধীরে প্রতীয়মান হচ্ছে ও তার নিজস্ব রূপ, আকার নিচ্ছে।
গোটা উগান্ডা সমাজ এই দল আর ওই দলে ভাগ হয়ে উগান্ডার জনপ্রিয় অঞ্চল পান্তাবাড়িয়ার মতো করে অন ও অফ লাইনে রক্তক্ষয়ী খুনোখুনির জন্য প্রায় উদ্যত। রাষ্ট্র যখন তিন কুড়ি বছরেও নিজের জাতীয় চরিত্রের স্বরূপ নির্ধারন ও পোক্ত করে উঠতে পারে না, তখন উগান্ডার অপগন্ডরা তো সব নিজে নিজেই রাষ্ট্রের স্বঘোষিত দন্ডমুন্ডের পান্ডা হয়ে উঠবেই।
মজার বিষয় হল, উগান্ডান অপগন্ড ও পান্ডারা নিজেদের অসাম্প্রদায়ীক হিসেবে পরিচয় দিতে খুব ভালোবাসে। অবস্থাদৃষ্টে সারাদিনের ফেসবুক কড়চা দেখে মনে হচ্ছে, ২০৪১ সাল নাগাদ উগান্ডা দেশে বাংলা নববর্ষ পালন করা যাবে কি যাবে না-তা নিয়ে গণভোট আয়োজন করতে হতে পারে। ২০৯১ সাল নাগাদ, নববর্ষ পালনের অধিকার পাবার জন্য আদালতে রীট করার দরকার দেখা দিতে পারে।
না, আমাকে বলতে আসবেন না, এক কালে আমরা খুব অসাম্প্রদায়ীক ছিলাম, সমাজে এঁন্দু-মোচলমান গলাগলি করে থাকতাম।
না, মিথ্যা কথা বলবেন না। ওইসব কল্পিত অসাম্প্রদায়ীক সৌহার্দ্য এই দ্যাশে কোনোকালেই ছিল না। সেই ল্যাংটো কাল হতেই দেখে এসেছি, ধর্মীয় বা বিশ্বাসগত সংখ্যালঘু কেউই এই দ্যাশে বুক ফুলিয়ে, স্বাধীন দ্যাশের অন্যতম স্বাধীন নাগরিকের মতো করে তার বিশ্বাসের অনুসরন, প্রতিপালন করতে পারে নাই।
সেই ল্যাংটো কালেও মন্ডপে পুলিশ রাখা লাগত।
তখন রাতের আঁধারে প্রতিমার হাত পা ভেঙে দিয়ে আসা হত। মজা করে, তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে। এখন শুধু সেটা দিনের আলোয় করা হয়। আশকারা পেয়ে পেয়ে এই অবস্থা। যারা মনে করেন, ঢাকা শহরটাই পুরো দেশ, তারা কখনো জানতেও পারবেন না, যে, গ্রামে, মফস্বলে প্রতিদিন কীভাবে একটু একটু করে ‘সোশ্যাল মিডিয়া’র কল্যাণে আমাদেরকে ‘ধর্মরক্ষক শীবসেনা’য় রূপান্তর করা হয়ে গেছে।
তখনও যারা রক্ষক ছিলেন, তারা নিরবে নিজেরাই চাইতেন, ওরা, মানে দুষ্টুগুলো যা করুক নিজেরাই করুক। নিজেদের মনের ইচ্ছা দুষ্টুদের পূরণ করতে দেখে নিরবে সমর্থনই দিত। এখনও রক্ষাকর্তারা, সান্ত্রীরা দাড়িয়ে দাড়িয়ে চা খেতে খেতে, বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে উপভোগ করে।
না, ভারতবর্ষে আমার সমধর্মীয় ভাই-বোনদের রায়ট নাম দিয়ে জেনোসাইডে হত্যা করা হলেও অন্যায় যেমন হয়, পাকিস্তান নামক বদমায়েশদের দেশে ভিন্নমতাবলম্বী যেকোনো সংখ্যালঘুকে দেশছাড়া করলে একই অন্যায় হয়। ঠিক যেমন অন্যায় হয়েছিল আফ্রিকার দাসদের সাথে, হয়েছিল সংখ্যালঘু অ্যাপাচি ইন্ডিয়ানদের সাথে। সেই অন্যায়ের প্রতিকার করতে আমার দ্যাশে একই কায়দায় সংখ্যালঘু যেকোনো বিশ্বাসীকে পুড়িয়ে দিলেও একই পাপ হয়।
না, আমি কোনো ব্যালেন্সে বিশ্বাস করি না। অসভ্য এই ডিজিটাল যামানায় দেশে দেশে সবখানেই সংখ্যালঘুকে এথনিক ক্লিনজিংয়ের এই দানবীয় সংখ্যাগুরু আক্রমণ-সে পাপ, সে অন্যায়, সে ঘৃন্য।
আল্লহ, তুমি নিশ্চয়ই সব দেখছ। তুমি নিশ্চয়ই এই অন্যায় সমর্থন করো না।
আমরা মানুষদের নিকট বিচার ও নিরাপত্তা চেয়ে চেয়ে ব্যর্থ। আমরা আশাহত। আমরা জানি, সামান্য উশখুশ করলেও, ফেসবুকে হালকা করে ব্যালেন্সীং পোস্ট দিলেও, আমরা মনে মনে সবাই সাম্প্রদায়ীক। মনে মনে সবাইই মেজরিটির পূজারী।
আমরা তাই শুধু তোমার কাছে বিচার দিচ্ছি।
হয় তুমি অন্যায়রত ওদের বজ্রাঘাতে হত করা।
নয় তুমি জমিন বিদীর্ণ করে অন্যায়ের শিকারদের সবাইকে একযোগে দাফন করো।
#religiousfanatism #extremeism #riot #relevance #selfconcern #selfdefence #divideandrule #চাচাআপনপ্রাণবাঁচা #আমারতাতেকী