Skip to content

ভাসুরের নাম নিতে অনিহা: স্যার সম্বোধনের লোভ

  • by

বাঙালির কমপ্লেক্স: একাল সেকাল

ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় হলে থাকতে একটা মজার ব্যাপার ঘটত। যখনি নতুন কোনো স্টুডেন্টকে পুরানো কারো সাথে পরিচয় করানো হত তখন একটা ইন্টারেস্টিং ঘটনা ঘটত। পরিচয় পর্ব’র প্রশ্নোত্তর পর্বটি খুব খেয়াল করে দেখুন: পুরানো: ”আপনার” নাম?নতুন: জ্বি, কুদ্দুস।পুরানো: ”আপনার” ডিপার্টমেন্ট?নতুন: জ্বি, অসামাজিক বিজ্ঞান।পুরানো: “আপনার” ইয়ার?নতুন: ফার্ষ্ট ইয়ার।——————————-পুরানো: “তোমার” রুম নম্বর কত?সম্বোধনের এই চকিত পরিবর্তনটা খেয়াল করেছেন কি? যখনি জানা গেল যে বেটা জুনিয়র অমনি আর একটি মুহুর্তও স্পেয়ার না করে সম্বোধন ”আপনি” হতে তুমি”তে। আমরা মানুষেরা খুব ক্লাস সচেতন একটি প্রজাতি। কর্মক্ষেত্রে আমাদের সিনিয়র, জুনিয়র সবরকম সহকর্মীই থাকে। আমাদের জুনিয়রদের কি সম্বোধনে ডাকব? হে হে। এটা আবার একটা প্রশ্ন হল। আবেগের আতিশয্যে আমরা মাঝে মধ্যে আমাদের জুনিয়রদের ”তুই” করেও বলে ফেলি। যা মোটেই কর্পোরেট কালচারে পড়ে না।

এবার সিনিয়রদের পালা।

সিনিয়রদের কিভাবে সম্বোধন করব? স্যার হল সবচেয়ে পুরানো ট্রাডিশন। এছাড়া মিঃ, ……..বাবু, ………..সাহেব, ………ভাই, কিংবা কুদ্দুস আপনি-ইত্যাদি নানারকম সম্বোধন অফিসে প্রচলিত আছে। হালআমলে আবার “বস” নামক অদ্ভুৎ একটা চোস্ত সম্বোধন কর্পোরেট হাউসগুলোতে চালু হয়েছে। আমরা আমাদের সিনিয়রদের কিভাবে সম্বোধন করব এই নিয়ে আমরা একরকম কমপ্লেক্সে ভুগি। স্যার, ভাই, নাকি বস?

এমনও দেখা গেছে আমরা একজন সিনিয়রকে ডাকি স্যার আবার তার চেয়েও ২ র্যাংক সিনিয়রকে কিন্তু বলি ভাই। নিজের ডিপার্টমেন্ট হলে নিজের বস সে তার র্যাংক যাই হোক তিনি স্যার কিন্তু তার ৪ র্যাংক সিনিয়র কিন্তু অন্য ডিপার্টমেন্ট? ব্যাস তিনি ”ভাই”। এ এক অদ্ভুৎ কমপ্লেক্স।

কাকে কি ডাকব এব্যাপারে কোনো ইউনিভার্সাল রুল যদিও নেই, তবে আমাদের এ নিয়ে কমপ্লেক্সে ভোগার কারন অন্য। আমরা যতটা সম্ভব আমাদের চারপাশের লোকদের সাথে নিজেকে যতটা সম্ভব অ্যাট পার রাখার বা দেখবার ইচ্ছা পোষণ করি।

আমার জীবনে প্রথম যিনি বস ছিলেন তিনি আমাদের ওরিয়েনটেশনে বলেছিলেন অফিসে কোনো ”ভাই” নেই। সবাই হয় ”সাহেব” অথবা ”স্যার”। আমার কাছে এই মেথডকে সবচেয়ে ঝামেলামুক্ত মনে হয়। সবকিছুর মতো এব্যপারেও দ্বিমত থাকতে পারে এবং সেটা থাকাটাই স্বাভাবিক। কেউ বলতে পারেন পশ্চিমারাতো নাম ধরে ডাকে বা মিঃ বলে তাহলে আমরাওতো তা করতে পারি। হ্যা, ঠিক বলেছেন। তবে যেহেতু পশ্চিমাদের কথা বললেন তাই বলব, তারা আরো অনেক সুন্দর সুন্দর কর্পেোরেট কালচার প্রাকটিস করে। সেগুলো সব ফলো না করে শুধূ এটা নিয়ে টানাটানি করলে লাভ কী?

’স্যার’, ‘বস’, ‘ভাই’-কোন টার্মে একজন সিনিয়রকে অ্যাড্রেস করব-প্রায়ই নিশ্চই এই দ্বিধায় ভুগি আমরা। ’স্যার’ বলতে গেলে নিজেকে ইনফেরিয়র লাগে, ইগোতে লাগে। আবার ’বস’ তো তিনি না। ’ভাই’ বললে আবার তিনি কেমন চোখে দেখবেন-চিন্তায় পড়ি। তো, কী করি?

উত্তর সরাসরি না দিয়ে আমি বরং একটা কবিতা বলি-”কেরোসিন শিখা বলে মাটির প্রদীপে, ’ভাই’ বলে ডাকো যদি, দেব গলা টিপে। হেনকালে গগনেতে উঠিলেন চাঁদা, কেরোসিন শিখা বলে, এসো মোর দাদা।” এবার বুঝে নিন।

আপনি যেমন সম্মান, শ্রদ্ধা অন্যকে যেভাবে দেখাবেন, সেভাবেই পাবেন। কর্পোরেট অফিসে সিনিয়র-জুনিয়র সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। সিনিয়ররা সবরকম মমত্ববোধ ও ভ্রাতৃত্ববোধ হতে জুনিয়রদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ রিলেশন বজায় রাখলে সেটি যেমন প্রশংসিত হয়, তেমনি এটিও কাম্য, যে জুনিয়ররা, সিনিয়রদের সম্মান ও সমীহ’র ব্যাপারটি মাথায় রাখুক।

সিনিয়র প্রচন্ড বন্ধুসূলভ হলেও তিনি সিনিয়রই। তাকে তার যোগ্য শ্রদ্ধাবোধটুকু দেখাতেই হবে-কথায়, কাজে, ব্যবহারে। আর সিনিয়ররা জুনিয়রদের ভাই, বন্ধু বা অনুজ হিসেবে তাদের উপযুক্ত সম্মানটিও দেখাবেন-এটাও কাম্য। সম্মান দেখালে সম্মান পাওয়া যায়-ইউনিভার্সাল ট্রুথ।

কথাগুলি কাউকে হার্ট করলে স্যরি।

আমি ব্যক্তিগতভাবে একটা ট্রেন্ড ফলো করি। সবাই ব্যাচমেট, ইয়ারমেট, এক বয়সি হবার কথা-সবই সত্যি। তবু একদমই আলাপ নেই বা ছিল না-এমন কারো সাথে কনভারসেশন শুরু করতে আমি ’আপনি’ পছন্দ করি। কারন এটা সবচেয়ে নিরাপদ ও ইউনিভার্সাল। একবার চরম ধরা খেয়েছিলাম আপনি/তুমি/তুই দ্বন্দ্বে। তারপর হতে রিস্ক নেই না, কোনো কথা ছাড়া ’আপনি’। তবে পরিচয় হয়ে গেলে বা আগে থেকেই পরিচীত থাকলে অন্য কথা। ‘তুই’ টা নিজ মহল ব্যতিত আমার একদম আসে না। আরেকটা কথা বলি।

একজন নারীর সাথে কথা বলার সময় কোনো কথা ছাড়াই ‘আপনি’ দিয়ে শুরু করি।

কিছুটা সম্মান, কিছুটা সম্ভ্রম, কিছুটা জড়তা আর কিছুটা ফর্মালিটি বজায় রাখতে। সুপরিচীত হলে অন্য কথা। আমি মনে করি, চায়ে চিনি একটু কম হলে হয়তো একটু পানসে মনে হবে কিন্তু দীর্ঘকাল ওইটা উপভোগেরও সুযোগ থাকবে। আমি সাসটেইনেবিলিটিতে বিশ্বাস করি। আর ফেসবুক ফ্রেন্ড নিয়ে একদমই ভাবি না।

দুইয়ে ঝগড়া, তিনে লাভ:

জঙ্গলের মধ্যে একবার কিছু নরনারী রাতে কোনো কারনে একত্র হয়েছে। রাতে সেখানে তারা আগুন জ্বেলে আগুনের চারধার দিয়ে বসে গল্প করছে। কথাপ্রসঙ্গে তাদের মধ্যে কথা উঠল, কে সবচেয়ে বোকা সেটা নিয়ে গল্প হবে। ঠিক হল, তারা নিজেদের জীবনের সবথেকে বড় বোকামীর গল্পটি বলবে। সেই আসরে সবচেয়ে বড় বোকা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল যার গল্পটি সেটি হল:

”আমি আর আমার বউ খুব ঝগড়া করতাম। প্রতিদিনই কুৎসিত ঝগড়া। চুলোচুলি, খুনোখুনি। আমাদের ঝগড়ায় অতিষ্ট হয়ে একদিন গ্রামবাসী আমাদের দু’জনে বনবাসে পাঠিয়ে দিল। আমরা দু’জন জঙ্গলে ডেরা বেঁধে বাস করতে লাগলাম। আমাদের দুটো বাচ্চা হল। কিন্তু অনেক দিন পরে খেয়াল করলাম, আমাদের বাচ্চারা সব কথা শিখেছে, ঝগড়াও শিখেছে কিন্তু কখনো আমাদের দু’জনকে মা বা বাবা ডাকে না। ডাকবে কিভাবে? তারা তো ওই দুটি শব্দ কখনো কানে শোনেই নি। আমরা দু’জন ঠিক করলাম বাচ্চাদের ’বাবা’ ও ‘মা’ ডাক শেখানোর জন্য আমরা স্বামী ও স্ত্রী একে অপরকে মা ও বাবা বলে ডাকব। সেই মতে শুরুও করলাম। অনেকদিন পরে জঙ্গলে ঘুরতে ঘুরতে একবার এক ঋষী আমাদের গৃহে আগমন করলেন। রাতে তিনি আমাদের ঘরে থাকলেন। কিন্তু তাকে রাতের ডিনার সার্ভ করার সময় খেয়াল করলেন, আমি আমার স্ত্রীকে ডেকে বলছি, “ও মা, ভেতর হতে ডালটা দিয়ে যাও” কিংবা, “মা, কোথায় গেলে? হাত ধোবার পানি দাও” ইত্যাদি। আমার বউও সমানে চালিয়ে যাচ্ছিল ওভাবেই, “ও বাবা, পুরুত মশায়ের কি পানের অভ্যাস আছে কিনা জিজ্ঞেস করো” কিংবা “বাবা, ওনাকে শোবার ঘরটা দেখিয়ে দাও তো” ইত্যাদি। তিনি অত্যন্ত অবাক হয়ে এই অদ্ভূৎ সম্বোধনের কারন জানতে চাইলে আমরা তাকে মর্মার্থ বললাম। শুনে তিনি আধহাত জিহবা বের করে ফেললেন। “তোমরা করেছ কী? স্বামী-স্ত্রী পরষ্পরকে বাবা-মা বলে ডাকছো? তোমাদের তো বিয়ে ভেঙে গেছে। তোমাদের প্রায়শ্চিত্ত করে আবার বিয়ে করতে হবে।” তো কী আর করা? প্রায়শ্চিত্ত আর বিয়ের জন্য তো আবার লোকালয়ে যেতে হত। তাই আমরা আবার গ্রামে ফিরে গেলাম।

সবকথা শুনে গাঁয়ের লোক আর আমাদের জঙ্গলে ফিরতে দিল না। না জানি আবার কী করে বসি-সেই দুঃশ্চিন্তায়। ” গল্প শেষ। উপলব্ধি: ১.ঝগড়া করো না। ২.শর্টকাট সমাধান সবসময় ভাল বয়ে আনে না।

#complex #addressing #honor #respect #SIR #inferioritycomplex #quarrel #clash #stupidity

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *