কিছুদিন আগেই, আমার একজন সুহৃদ তার প্রতিষ্ঠিত একটি চাকরিস্থল হতে নতুন একটি চাকরিতে যোগ দেন। বলাই বাহুল্য, নতুন প্রতিষ্ঠানটি সবদিক হতেই তার কাছে প্রচন্ড আকর্ষনীয় মনে হয়েছিল। বা বলা চলে, ওনারা তাদের প্রতিষ্ঠান ও চাকরিকে তার কাছে অতি আকর্ষনীয়, লোভনীয় ও আরাধ্য হিসেবে উপস্থাপনে, প্রতিপন্ন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। যেই হাতছানি একজন উদীয়মান প্রফেশনালের পক্ষে উপেক্ষা করা প্রায় অসম্ভব।
অসম্ভব, কারন, আমাদের নানামুখী বাস্তবতা থাকে। থাকে নানা লক্ষ্য পূরণ ও স্বপ্নপূরণের চাপ। থাকে স্ব-আরোপিত বা জোর করে চাপিয়ে দেয়া প্রতিযোগিতা। যার কারনে খুব দ্রূত একটি উঁচু পজিশন (ও অবশ্যই মোটা টাকার বেতন) অর্জনের অমানুষিক চাপ থাকে আমাদের ওপর।
তার ওপরে, আজকাল সব ইয়ং মানুষেরই একজন ‘বিশেষ’ মানুষ থাকবেই। সেই বিশেষ মানুষটি বিশেষভাবে যদি হন একজন তরুণী, তাহলে তার বাড়ি হতে বিয়ে হয়ে যাবার চাপ থাকে, কারন, জব মার্কেটে নামার মতো যোগ্যতা অর্জন করতে গড়পড়তা বয়স ২৩-২৪ হয়ে পড়ে। কন্যার জন্য বিয়ের বয়স অলরেডি পার হয়ে যাবার যোগাড়। বাবা-মা তো ব্যস্ত হবেনই। হয়তো মেয়েটিও সামান্য দোলাচলে পড়ে। বহু বছরের প্রেমিকের প্রতিষ্ঠার জন্য অপেক্ষা করবেন? নাকি বাবা-মা’র কথায় নিশ্চিতের পথ ধরবেন? ফলে, ছেলেটির ওপর চাপ আসে-বিয়ে করো। বিয়ে করে নিলে, আবার, দ্রূত সংসারের আর্থিক ও সামাজিক দায়ীত্ব পালনের সক্ষমতাকে বেশ হৃষ্টপুষ্ট করো।
বান্ধবী, প্রেয়সী না থাকলেও আরও কত কত মানুষের মুখের চাহনি থাকে। বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মা, তারা আর কতদিন ছেলেকে দেখবেন? বোনটার বিয়ে হওয়া দরকার। কারো ঘরে ১০ জন খাবার মুখ। সবাই চেয়ে থাকে ওই একজনই বিশ্ববিদ্যালয় পাশ সোনামনিটার একটা ভাল চাকরি আর প্রতিষ্ঠার পানে।
আমাদের ওপর তখন অদৃশ্য একটা চাপ তৈরী হয়, ভাল চাকরি, বড় চাকরি, দামী চাকরি, মোদ্দা কথা মোটা টাকার চাকরি পাবার। দ্রূত বড় হবার।
এই পরিবার, সমাজ, দেশ আমাদেরকে এক অসম, অসময় ও অন্যায্য প্রতিযোগিতায় নামতে বাধ্য করে।
ফলে, প্রতিটি তরুণ বা তরুণী, যে, আজই ক্যারিয়ার শুরু করল, তারা ভয়ানক একটা চাপ ও লক্ষ্য নিয়ে শুরু করে। ফলে, তাদের মধ্যে দ্রূতই ক্যারিয়ারের ওপরে যাবার চাপ মারাত্মক থাকে। তখন, তাদের কাছে নৈতিকতা, সাবধানতা, পেশাদারিত্ব কোনো অর্থ বহন করে না।
ভদ্রলোক খুব সিনিয়র নন। তবে খুবই সম্ভাবনাময় ও যোগ্য। কিন্তু, গোলটা প্রথম বাধে, যখন ওই অতি হাইপড, ওভার রেটেড ও তথাকথিত আরাধ্য প্রতিষ্ঠানটি তাকে মাত্র ১০ দিনের নোটিশে আগের কর্মস্থল ছেড়ে তাদের ওখানে যোগ দেবার শর্তারোপ করে। নতুন চাকরির বাধ্যবাধকতা ও ক্যারিয়ার বা জাগতিক স্বার্থের হাতছানিতে বাধ্য হয়ে তিনি সেখানে চলে যান। মূল গোলটা বাধে তার পরে।
ভদ্রলোক দুই দিনের মধ্যেই আবিষ্কার করেন, যে, তিনি আসলে স্বর্গের দুরাশায় ও মিথ্যা প্রলোভনে নরকে এসে পড়েছেন। সেই নরকের বিস্তারিত আজ নয়। কারন, আজকের কনটেক্সট ভিন্ন।
তবে এতটুকু বলি, কাজের পরিবেশ, বস, কালচার, গ্রো করবার সুযোগ, শেখার সম্ভাবনা, ব্র্যান্ডিং-সবখানেই তার মনে হতে থাকে, যে, ভুল যায়গায় পড়া হয়েছে।
যাহোক, খুব দ্রুতই ও সৌভাগ্যবশত তিনি তার ডিসকোর্স বদলে নিতে সক্ষম হন। সে গল্প আজ বলছি না।
আজকের কনটেক্সট হল, উদীয়মান ও সদ্যপ্রসূত-বিভিন্ন তথাকথিত আরাধ্য প্রতিষ্ঠানে চাকরির অফার পেয়ে সেখানে অগ্রপশ্চাৎ না ভেবে যোগ দেবার একটি বিশেষ বিপদ নিয়ে। একটি ভুল প্রতিষ্ঠানে ল্যান্ড করবার যত রকম বিপদ হতে পারে, যেমন: –
টক্সিক এনভায়রনমেন্ট, অফিস পলিটিকস, মধ্যযুগীয় কালচার, কুপমন্ডূক কিংবা যমদূত বস, অসময়ে বেতন প্রাপ্তি, চাকরির প্রদর্শিত শর্ত বদল, বিনা অনুমতিতে কর্মস্থল বদল-ইত্যকার অসংখ্য বিচিত্র বিপদের কথা আমি বিগত দিনে অনেকের কাছে জেনেছি।
কিন্তু, আজ, একটা বিশেষ বিপদ নিয়ে বলতে বসেছি।
সেটা হল, বিশেষ ধরনের উদীয়মান কিংবা সদ্য গজানো (এনাদের প্রকৃত টার্ম ব্যবহার করে কারো রোশানলে পড়তে চাই না।) প্রতিষ্ঠান, যারা হাইপ, ব্র্যান্ডিং কিংবা রেটিংয়ে খুবই গরম, তাদের ওখানে চাকরি করতে যাবার কিছু স্ট্র্যাটেজিক অ্যাডভানটেজ যেমন আছে, তেমনি আছে ভয়ানক ট্রেড অফ, মানে একটা অত্যন্ত মারাত্মক নেগেটিভ দিকও।
সেটা হল, জিরো বা নেগেটিভ গ্রোথ। গ্রোথ অব আর্নিংয়ের ছলনাময় হাতছানির ট্রেড অফ হিসেবে, অপরচুনিটি কসট হিসেবে জিরো বা নেগেটিভ গ্রোথ অব লারনিং।
আমি বলছি শেষটা নিয়ে।
এরকম উদীয়মান কিংবা সদ্য গজানোদের সত্যি বলতে শুধু ঠাঁট ও বাঁট যতটা থাকে, শো অফ যতটা থাকে, জিকির যতটা থাকে, প্রচারনায় যেমনটা থাকে, বাস্তবে, তাদের কালচার, এনভায়রনমেন্ট ও বিশেষত HR Structure থাকে খুবই নাজুক, বা প্রায় থাকে না। বিজনেসের শুরুর দিককার চ্যালেঞ্জ, বিজনেস দাড়ানো ও টিকানোর সংগ্রামই যার এখনো ফুরোয়নি, ফুরোলেও যার এখনো নেট প্রফিটের মুখ দেখা হয়নি, সেটা হলেও যার এখনো হাত-পা শক্ত হয়নি, তার ফুরসতই বা কখন হল ওইসব স্ট্রাকচার সৃষ্টির? শ্রদ্ধেয় জাকারিয়া স্বপন সাহেবের এক আর্টিকেলের বরাতে পড়েছিলাম, যে, উদীয়মান/সদ্যপ্রসূত (সঠিক টার্ম আবারও গায়েব রাখলাম) ভেঞ্চারের নেট প্রফিটের মুখ দেখবার আন্তর্জাতিক মানদন্ডে সময়কাল **১২/১০ বছর।
এই প্রতিষ্ঠানগুলো সেটা জানে। কিন্তু, মাথা তুলতে ও রাইজ করতে তাদেরকে যে বাজার হতে সেরা মাথাদের কিনতে হবে-সেটা তারা জানেন।
কিন্তু, বাজারের সেরা মাথারা তো তাদের ওরকম প্রতিষ্ঠানে সহজে ও সহসা আসতে চাইবেন না। কী দেখে আসবেন?
তখন তারা কী করেন, বাজারের ভাল, প্রতিষ্ঠিত অর্গানাইজেশনের, অর্থাৎ, ট্যালেন্ট মার্কেটের রেডি মেধাদেরকে তাদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান হতে তুলে আনার চেষ্টা করেন (কার্যত ভাগিয়ে আনেন।)
সেটা করবার জন্য তারা তাদের সার্বিক এভাটারকে অতিশয় চমক, গমক ও মধু মাখিয়ে তুলে ধরেন। তাতে মাছিও আটকায়।
অন্য প্রতিষ্ঠানের একজন প্রতিভাবান, প্রতিশ্রুতিশীল, যোগ্য ও সম্ভাবনাময় ইয়ং ট্যালেন্টেড জুনিয়র অফিসারকে তারা রাতারাতি ম্যানেজার, ডিরেক্টর, হেড অব ডিপার্টমেন্ট (বিশেষত HoHR) করে নিয়ে আসেন। মধু গাঢ় করা হয় নানা চটকদার JD, KRA ও জারগন সহযোগে। তাকে বেতন দেয়া হয় বাজারের প্রচলিত রেটের তিনগুন। অন্যসব এক্সপোজার তো আছেই। প্রবীণ বা পাকনা প্রফেশনালরা অনেক ভেবে চিন্তে এগোনোর স্বভাবের কারনে ততটা না আটকালেও, তরুণ মাছি জালে আটকায়। আগুনে ঝাঁপ দেয়া পতঙ্গের মতো।
কিন্তু, ২ বছরের অফিসার যখন একটা প্রতিষ্ঠানের HoHR হয়ে বসেন, যেখানে তিনিই সর্বেসর্বা, তার আর বস নেই, সুপারভাইজার নেই, ম্যানেজার নেই।
এই লোক না পারেন তার স্বল্প অভিজ্ঞতা ভাঙিয়ে তাদেরকে সত্যিকারের কিছু দিতে। আর, বস না থাকায়, সুপেরিয়র না থাকায়, মেনটরের অভাবে তার লারনিং গ্রোথও হয় অতি অতি সামান্য, বা নেগেটিভ। কখনো কখনো তিনিও হয়তো বুঝতে পারেন। ক্ষতিটা আন্দাজ করতে পারেন। কিন্তু, মোটা বেতন, এক্সপোজারের লোভ, ওদিকে পরিবার ও বর্ধিত সমাজের প্রত্যাশার চাপ তাকে ঘর বদল করতেও ভয় দেখায়। এমনকি, ওরকম প্রতিষ্ঠানগুলো নাচবার কথা বলে বাঈজি হায়ার করে, তারপর একে একে তাকে গান করবার, রান্না করবার, বাগান করবার, বাচ্চা দেখাশোনা করবার যাবতীয় দায়ীত্ব চাপিয়ে দেবার ধান্দা করেন। মানে, একের ভেতর দশ। নাম দেয়া হয় কসট অপটিমাইজেশন ও স্কিল ডাইভারসিফিকেশন।
HR বিভাগের প্রফেশনাল হলে তার বিপদ সবচেয়ে বেশি হয়। নিজেই যে এখনো শিখবার স্টেজে, সে যখন শিক্ষকের, বিচারকের পজিশনে পড়ে যায়, তার অবস্থা দেখার মতো হয়। বিশেষ করে হাজারো বৈচিত্রে ঠাসা ‘মানুষ’কে নিয়ে ডিল করা বাচ্চা ওঁঝার কাজ না। ওদিকে সেরের ওপর সোয়া সের, তাকে দুই মাস পরে অ্যাডমিনও দেখতে দেয়া হয়। (যদিও শুরু হতে তিনি যা HR হিসেবে পান, সেটা অ্যাডমিনই ছিল।) তার সামনে অপারেশনস শেখার ও দেখার মূলা ঝোলানো হয়। তিনিও ভবিষ্যতে CEO হবার মঞ্জিলটা দেখতে শুরু করেন। কিন্তু লবডঙ্কা। এই ’এইছাড়েডমিন’কে ভবিষ্যতে CEO/COO বানাবে-এমন বোদ্ধা কতজন আছেন বাজারে?
সে আটকে যায়। ঝুলে যায়।
ফলাফল, আমি বেশ কিছু নামকরা অমন প্রতিষ্ঠানের এমন মানুষদের পেশাগত সংস্পর্শে আসার কারনে জানতে পেরেছি। ভদ্রলোকেরা লার্নিংয়ের দিক দিয়ে নেগেটিভলি গ্রো করছেন। ম্যানেজার হয়ে বসেছেন। মাথা হয়েছেন, অথচ, হাত-পা এখনো অফিসারের। খাবি খাচ্ছেন রোজ। আবার বেরও হতে পারছেন না।
কয়েকজনের ইন্টারভিউ করেছিলাম। বিশাল পোস্ট, বিশাল বেতন পান। অথচ, নিজেই স্বীকার করেছেন, ভাইয়া, স্যরি, শেখা হয়নি ওগুলোর কিছুই (আমি মৌলিক ও বুনিয়াদি পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতার কথা বলছি।) আবার, ওসব প্রতিষ্ঠানের অস্বাভাবিক ও অসময়ের মোটা টাকা ও ব্র্যান্ডিং এরই মধ্যে তার লেভেলটা, প্রত্যাশাটা, সামাজিক অবস্থান আকাশে তুলে দিয়েছে। তিনি যে শেখার জন্য আবার নতুন করে কোথাও কম বেতনে যাবেন, সেটা সম্ভব না। আবার, অন্যরা তার মতো নবীণকে অত বেতন দেবেন না।
ফলত, তাদের ক্যারিয়ার ঝুলে যায়। তারা না পারেন ওখানে শাইন করতে। কারন, তারা নিজেরাও জানেন, তার বয়সই হয় নাই ওই পজিশনের মূল্য চুকাবার। আবার, ভাগতেও পারছেন না, মাথাটা ভারী হয়ে যাওয়ায়। তাই তারা একটা লেজেগোবরে অবস্থায় পড়েন।
তাই বলি, স্বর্গের হাতছানিতে মজে পা বাড়াবার আগে একটু হলিস্টিক ভিউ নিয়ে চিন্তা করুন। নগদে লাভ ও ক্ষতির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে কী পাবেন ও হারাবেন, কী ঘটতে পারে-তা একটু বিশ্লেষণ করুন। লাগলে বড়দের একটু গাইডলাইন নিন। একটু কনসাল্ট করে নিন সিনিয়রদের সাথে। লাসভেগাসের চাকচিক্যময় ক্যাসিনোতে কোটি ডলার জিতবার নিশ্চিত হাতছানিতে কেবল ঢুকে পড়লেই হবে, কেবল ডলার জিতলেই হবে? সেই ডলার নিয়ে প্রাণ হাতে ধরে বেরোবার রাস্তা আদৌ খোলা থাকল কিনা-তা ভাবতে হবে না?
আমরা সবাই অবশ্যই অভিজ্ঞ কর্মী ও টিমমেট পছন্দ করি। এর একটি বড় কারন হল, আমরা ধরে নিই, বছর বছর অভিজ্ঞতা অর্জন কর্মীকে আরও শানিত ও বিজ্ঞ করে। যদিও, অধিকাংশ সময় তা হলেও, সব সময় তা হয় না। অভিজ্ঞতা কখনো কখনো বিট্রেও করে। অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা সবসময় সমার্থক হয় না ।অভিজ্ঞতা হতে সত্যি সত্যি আমরা কী পেতে চাই-সেটি আবার একটি বড় সংখ্যক মানুষের কাছে অস্পষ্ট। যাহোক।
তবে, একটি বিষয় নিশ্চিত। অভিজ্ঞতা সবসময় কর্মীর ভেতরে নেতৃত্ব দেবার পরিপক্কতা তৈরী করে না। অভিজ্ঞতা সাধারনভাবে পেশাগত ও কৌশলগত দক্ষতা বাড়াতে পারে। তবে নেতৃত্ব এক ভিন্ন ও বিশেষ যোগ্যতা। অভিজ্ঞ মানেই যে টিমের নেতৃত্ব দেবার পূর্ণ যোগ্যতা তার মধ্যে তৈরী হয়ে গেছেই-এই ধারনার বশবর্তি হয়ে কাউকে টিমের নেতৃত্ব দেবার, ম্যানেজারিয়াল অথরিটি ও লোড দেবার, লিডারশিপ রোলে উঠিয়ে দেবার কাজটি করবার আগে তাই ভাবতে হবে।
টিমের নেতৃত্ব, লিডারশিপ, ম্যানেজারিয়াল এক্সপোজার একটি বিশেষ যোগ্যতা। এর জন্য ব্যক্তিকে বিশেষ ও নিবিড় চেষ্টা, প্রশিক্ষণ, নারচার করে যেতে হয়। সেটি না দিয়ে থাকলে, কেবলমাত্র বয়স ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পজিশন আপ করা আত্মঘাতি। আর বয়সে সিনিয়র মানেই ভাল লিডার-এটাতো ডাহা মিথ্যা। লিডারশিপ মানুষের সহজাত ক্ষমতা-সেটি সত্যি। আবার, এটি একটি নির্মানযোগ্য ক্ষমতাও।
যাহোক, আজ লিডারশিপের বয়ান নয়, আজ ফোকাস হল চাকরির বয়স, অভিজ্ঞতার দাম আর গ্রোথের মরিচিকা।
১,০০০ তম দিন পার হবার পরের দিনই নতুন চাকরিতে ঢোকা ফরজ-ওয়াজিব-এমন একটি বদ্ধমূল বিশ্বাস আমাদের মন মগজে নানা কারনেই প্রোথিত হয়ে গেছে। এই ফর্মুলার সপক্ষে আমি নিজেও যথেষ্ট লিখেছি। এখনো আমি এর বিরোধী নই। অনেকের প্রশ্নের জবাবে আমি এ-ও বলেছি, যে, আপনি যদি চাকরির জান্নাতেও থাকেন, তাহলেও ৩ বছর পরে আপনার জান্নাতের স্তর বদল করার চেষ্টা করা শ্রেয়। তবে হ্যা, জগতে কোনো কিছুই এক্সট্রিম নয়। কোনো সত্যই অ্যাবসলুট নয়। বিশেষ করে, তত্বের প্রয়োগ অনেক অনেক সাবধানে, বিবেচনার সাথে এবং অগ্রপশ্চাত ভেবে করা উচিত।
আমার কাছে মনে হয়, ক্যারিয়ার গ্রোথ ও ক্যারিয়ারিজম নিয়ে আমাদের অতি কথন এবং অযোগ্যদের প্রচুর ভুল কথন বাজারে একটি ভুল বার্তা দিয়েছে এবং একটি ভুল চর্চাকে প্ররোচিত করেছে। বিশেষত ফেসবুক ও লিংকডইনের মতো উন্মুক্ত মাধ্যমে যখন সবাইই দিগগজ বনে যান, সবাইই কনসালট্যান্ট ও বিশেষজ্ঞ বনে যান, দুই দিন প্রফেশনে আসা মানুষটাও যখন জ্ঞানগর্ভ আর্টিকেল প্রসব করতে শুরু করেন আর ফেসবুকই যখন হয়ে যায় এনসাইক্লোপিডিয়া, তখন ভুল বার্তা যাওয়া খুবই স্বাভাবিক। যদিও আমাদের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিও চাকরির বাজারে আমাদের অনুসৃত ভুল প্রবণতার জন্য বহুলাংশে দায়ী।
ভুল চর্চা বা প্রবণতাটি হল, নবীন, অথবা, বিগিনার অথবা ফ্রেশারদের ভেতরে প্রথম কিছু বছরে ধুমধাম ৩/৪ টা চাকরি বদল করে অতি দ্রূত ৬ ডিজিটের বেতন, ডেডিকেটেড অফিস কার ও ম্যানেজার পদে আসীন হবার প্রবণতা। CHAIR
আমাদের সবার পরম আরাধ্য, পরম পূজ্য, ধ্যান জ্ঞান।
আমরা সবাই চেয়ার চাই। না, দামী চামড়ায় মোড়া, রিভলভিং চেয়ারের কথা বলছি না।
আমরা সবাই একটা বড় পদ চাই। বস হতে চাই। ম্যানেজার হতে চাই। টিমলিড হতে চাই।
সময় হোক না হোক, বয়স হোক না হোক, এক্সপোজারে মানাক না মানাক-চেয়ার আমার চাই। চেয়ারের মানুষটাকে ল্যাং মেরে ফেলে দিয়ে হলেও চাই।
বাট, ফান ইজ, ওই চেয়ারখানাতে বসবার জন্য যেসব প্রি-রিকুইজিট দরকার, যেটা না থাকলে চেয়ার পাবার পর পদে পদে শরম পেতে হবে-সেটা আয়ত্ব করতে চাই না। ধুর, ওসব দিয়ে কী হবে?
পদবী পাবার পরে নিজ বিভাগ বা টিমের ম্যানপাওয়ার প্ল্যানিং করতে পারি না, পারফরম্যান্স ডিফাইন ও ডিজাইন করতে পারি না, কে.পি.আইটা নির্ধারন ও ট্র্যাক করবার তরিকা বলতে পারি না, টিমের লোক হায়ার করবার জন্য কমপিটেন্সি বেঞ্চমার্কিং করতে, অ্যাসেসমেন্ট মেথড ও ট্যালেন্ট অ্যাকুইজিশন নিয়ে এইচ.আরকে সামান্যতম ইনসাইট দিতে পারি না, পিপল ডায়নামিকস বুঝি না, পাবলিক পারসেপশন, ইমোশনাল ইনটেলিজেন্স সম্পর্কে কোনো ধারনা রাখি না, টিমের গ্রুমিং প্ল্যান ও কারিক্যুলাম বানাতে পারি না; এমনকি টিমের মানুষজন কী চায়-সেটুকুও বোঝার কাবেলিয়াত রাখি না।
চেয়ারখানা তবু চাই।
তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার রিভলবিং চেয়ার চাই।
ম্যানেজার হবার কাবেলিয়াত অর্জন বহুদূর, কিন্তু, ম্যানেজার হতে হবে। অথচ, অভিজ্ঞতা বলে, আমাদের বিপুল সংখ্যক ম্যানেজারের ভেতরে ম্যানেজারিয়াল ও লিডারশীপ ক্যাপাবিলিটি একদমই নেই। আমি বিগত অন্তত ১ বছর ধরে সচেতনভাবে অবজারভ করে দেখেছি, যে, একটি বড় সংখ্যক বিগিনার লেভেল কর্মী প্রথম চাকরিতে ঢুকেই ৪/৫ মাস যেতেই পরের চাকরির জন্য রাস্তায় নেমে পড়ছেন।
পরের চাকরিটাতে ঢুকেই বছর খানিক যেতে না যেতেই আরেকটা চাকরির চেষ্টা। সেটাতে থাকতে থাকতেই পাশাপাশি ইন্টারভিউ দিতে থাকা। ব্যাটে বলে হলে উড়াল। এভাবে প্রথম ৫ বছরের মধ্যেই ৩টা চাকরি, ১৫০% স্যালারি রেইজ আর ‘অ্যাইশটেন ম্যানেচার’ পজিশন বাগানোর একটা ট্রেন্ড খুব প্রচলন হয়েছে।
কারন হিসেবে বলা হচ্ছে, বাজারের প্রচলিত খাসলত, এমপ্লয়ারদের দোষ, জীবনযাপনের খরচের আগুন শিখা, বাড়তি দায়ীত্বের চাপ, পরিবারের দায়ীত্ব নেবার সীমাহীন চাপ, এবং খুব হাস্যকরভাবে ”নতুন নতুন অভিজ্ঞতা ও শেখার সুযোগ” নেবার জন্য তাদের এই দৌড়ঝাঁপ।
৬ মাস চাকরি হয়েছে। যখন জানতে চাইছি, কেন চাকরি বদল করতে চান, “স্যার, নতুন অভিজ্ঞতা নিতে আর নতুন চ্যালেঞ্জ শিখতে।” বাপরে বাপ, ৬ মাসেই তার একটি বিজনেসের অভিজ্ঞতা নেয়া শেষ। মনোটোনাস ও স্টেরিওটাইপ হয়ে পড়েছেন মাত্র ৬ মাসেই। আন্ডারটেকারের বড় ভাই চ্যালেঞ্জটেকার।
নতুন জবে ঢুকছেন। ঢুকেই গা হতে কোটটা খুলে চেয়ারে আসীন হবার আগেই আবার নতুন জবের সার্চ চলছে। ৯ মাস ঘুরতেই মেইলে রেজিগনেশন লেটার, সুর আগেরটাই-নতুন অভিজ্ঞতা দরকার। কেউ কেউ রেজিগনেশন দেবার দায়ও নেন না। বেতনটা নিয়ে সোজা পরপারে। একটু ভাল যারা, তারা সারাদিন কাজকাম করে বিকেলে যাবার আগে একটা গণমেইল ছেড়ে দিয়ে পরের দিন হতে গায়েব। ১ মাস সময় দিয়ে যাবারও সময় নেই। অভিজ্ঞতা দরকার যে।
আমি একটুও বলছি না, যে, চাকরি খোঁজার কাজটি ভুল, বা, অন্যায়। চাকরি বদল অন্যায় হতে পারে না। দ্রুত বদলেরও নানা বাস্তবতা থাকে। বিদ্যমান জবে কখনোই উচ্চমাত্রার উল্লম্ফন হয় না। অভিজ্ঞতা ও বৈচিত্র অর্জনের জন্যও চাকরি বদল জরুরী।
কিন্তু, প্রবণতা? প্রবণতা ভিন্ন জিনিস। আর ওই যে, ট্রেড অফ বলে একটা কথা আছে না। এই বাস্তবতারও ট্রেড অফ আছে।
এই প্রবণতা এমপ্লয়মেন্ট মার্কেটকে অস্থির করছে, ভারসাম্যহীন করে দিচ্ছে, রক্ষণশীল করে দিচ্ছে। একই সাথে, এই সুইচাররা পারটিকুলারলি কোথাও হতেই কিছু নিতে পারছেন না। ‘কিছু’ বলতে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, পরিপক্কতা, ব্র্যান্ড ভ্যালু ইত্যাদি। তারা যেহেতু সারাক্ষণই অন্যত্র জব খোঁজা ও পাবার পেছনে মন লাগিয়ে রাখছেন, তাতে নিজ বিদ্যমান চাকরি, চাকরিস্থল হতে কিছু ইনটেক হবার পথ স্বাভাবিকভাবেই সংকুচিত থাকবে।
ফলাফল, ৫ বছরের ক্যারিয়ারে ব্যক্তি ম্যানেজার হয়ে বসে যান। ৭ বছরে জি.এম। ১০ বছরে সি.ই.ও। জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার পাল্লা শূন্য। পরিপক্কতার প্রশ্নই নেই। আর, তাকে তো আরও বছর বিশেক চাকরি করতে হবে। এর মধ্যে বাজারের সবক’টা উপযুক্ত ও কাঙ্খিত প্রতিষ্ঠানে তার চাকরি করার সাইকেল তো শেষ। এখন কোথায় চাকরি করবেন? তাকে কোন প্রতিষ্ঠান কী পজিশন দেবে-তাই নিয়ে বিপদে পড়ে। তিনিও সি.ই.ও হয়ে তারপর ১২ তম বছরে আবার সিনিয়র ম্যানেজার হয়ে আবার জীবন শুরু করেন।
কেউ কেউ আবার কোথাও কিছু হবার নয়-সেটা নিশ্চিত হলে কনসালট্যান্ট বনে যান। আমি বলছি না, কনসালট্যান্সি খারাপ বিষয়। অবশ্যই কনসালট্যান্সি দরকার, আর কনসালট্যান্ট হবার জন্য দাড়ি পাঁকার বয়স হওয়া জরুরী না। কিন্তু, কনসালট্যান্ট হতে হবে প্ল্যান করে। সব উপায় ব্যর্থ হবার পরে শেষ প্রেসক্রিপশন হিসেবে কনসালট্যান্সি তো নিজেই রুগ্ন ব্যবস্থাপনা।
তার মধ্যেও একটা বড় সংখ্যক প্রতিষ্ঠান বা তাদের HR এর ভেতরে উচ্চ মাত্রার রিজিডিটি ও প্রিজুডিস রয়েছে, যারা মনে করেন, Frequent flyer বা জব হপারদের রি-হায়ার করা রং হায়ার হবে। এমন চাকরি প্রত্যাশীদের তারা প্রেফার করেন না। রেজ্যুমে দেখেই রিজেক্ট করে দেন। হ্যা, বাজারে এখনো বহু প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা এমন কর্মীকেই হায়ার করতে উদগ্রীব। কোনো কোনো এইচ.আর স্রেফ কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন, অথবা, আগে কয়টা স্টার প্রতিষ্ঠানে ছিলেন-সেটাকেই চুড়ান্ত কমপিট্যান্সি মনে করেন।
“আপনি ……মিয়া অ্যান্ড কোংয়ে ছিলেন, আসুন স্যার, ঢুকে পড়ুন, ঢুকে আমাদের ধন্য করুন। আমরা আপনাকেই খুঁজছিলাম।”
এরই মধ্যে আরও একটা ভুল ন্যারেটিভ তৈরী হচ্ছে প্রফেশন ও ক্যারিয়ারের চৌহদ্দিতে।
সেটা হল ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স।
ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স মানে কর্মঘন্টা আর ব্যক্তিগত জীবনের ব্যালেন্স নিয়ে কর্মীদের আজকাল বেশ সচকিত দেখা যায় যা পজিটিভ। এর পাশাপাশি আরেকটি দিকও বিবেচনা করা উচিৎ। তা হল-ওয়ার্ক লোড ব্যালেন্স আর ওয়ার্কার ব্যালেন্স। অনেক সময়ই দেখা যায়, একটি বিভাগে একাধিক অফিসার আছে যাদের কেউ কেউ তেমন কোনো কঠিন কাজের লোডে নেই। আবার তার পাশে কেউ হয়তো কাজের চাপে দিশেহারা। অনেক সময় আবার এও দেখা যায়, একজন হয়তো ফাঁকিবাজ। সময়মতো কাজ করে না। বস দেখেন, তাকে কাজ দিলে বিপদ, ডিপার্টমেন্টের বদনাম। তিনি কি করেন, ডিপার্টমেন্টের সবথেকে পরিশ্রমী ব্যক্তিকে তখন আরো বেশি কাজ চাপান।নিজের কাজতো সে করেই, পাশাপাশি অন্যদের ফেলে রাখা কাজও তাকে করতে হয়। ফাঁকিবাজদের বিচার হয়না, উল্টো তাদের অপরাধের বোঝা বয়ে যান সবথেকে প্রমিজিং কর্মীটি। যারা টীম চালান, তাদের কর্তব্য হল, কাজের লোড সমানভাবে বন্টন করা। আর সবাইকে সমান দায়িত্ব দেয়া।
এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে জাপানে overwork এর কারণে কর্মজীবীদের প্রায় ২০ শতাংশের মৃত্য হয়। অতিপরিশ্রম শুধু প্রডাকটিভিটিই কমিয়ে দেয়না, কর্মক্ষেত্রে stress, hypertension ইত্যাদির কারণ, এবং এর ফলে স্ট্রোক, হার্ট এটাক, ডায়াবেটিস ইত্যাদি অসুখ এবং এসব স্বাস্থ্য জটিলতাজনিত মৃত্য বেড়েই চলেছে। কম ঘুম, মানসিক চাপ, অতি পরিশ্রম ইত্যাদির সাথে যোগ হয় শারীরিক ব্যায়াম, খেলাধূলা, বিনোদোন ইত্যাদির সময় সুযোগ না থাকা। কাজ হয়ে যায় punishing. চাপাইনবাবগঞ্জের ডিসি মিটিং এ এসে হাটা অবস্থায় স্ট্রোক করে মারা গেলেন অল্পবয়সে। ছুটি নাই, অবসর নাই, রিলাক্সেশন নাই। মিটিং, কাজ, জার্নি এসব করতে করতে শরীর মন হঠাৎ বিদ্রোহ এবং বিট্রে করে বসে। কর্মক্ষেত্রে ক্রিয়েটিভিটির জন্য ব্রেনেরও একটু রিল্যাক্স দরকার। খালি জোর করে চাপিয়ে দিয়ে বা নকল করে কি ইনোভেশন হয়?
শরীর মনের প্রাকৃতিক সিস্টেমকে নানা বিধিনিষেধ দিয়ে সংকুচিত করে আমরা এখন পাই হাজারে হাজারে আধা উম্মাদ, সাইকো, বদমেজাজি, অসুস্থ, অচল কর্মজীবি।কবে আমরা বুঝব, “বিশ্রাম কাজের অংগ, এক সাথে গাথা…”? (Colleted from Markas Orelius)
অংক আমাদের জন্য আশির্বাদ। অংক একটি মৌলিকতম সায়েন্স। কিন্তু, কখনো কখনো অংক ও অঙ্ক আমাদেরকে ভুল ডিরেকশন দেয়।
কীভাবে?
ব্যয় সাশ্রয়ের জন্য এবং কর্মীদের রিফ্রেশ/রি-এনার্জাইস রাখতে সরকারী অফিসে ২ দিন সাপ্তাহিক ছুটি দেয়া শুরু হয়। অংক।
ফাঁকি হল, ২ দিন বন্ধ রাখলে যদি ব্যয় সাশ্রয় হয়, তাহলে গোটা ৭ দিনই বন্ধ রাখলে তো পুরোটাই সাশ্রয়। কোনো খরচই নেই। তাহলে সরকারী অফিসগুলো খোলে কেন-সেটাই তো বুঝি না।
আর রিএনার্জাইসিং? ২ দিন ছুটি কাটানোতে এঁরা আরো ঘুমকাতুরে হয়ে অফিসে আসে। গরীব একটি দেশ, যেখানে একটি বিপুল অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও আর্থ-সামাজিক ক্রাইসিস চলছে, সেখানে ২ দিনের সাপ্তাহিক ছুটির বিলাসিতাটা সরকারী অফিসে কিছু মাস কি অন্তত স্থগিত করে দ্বিগুন গতিতে কাজ এগোনোর চেষ্টা করা যেত না? এমনিতে, ৮ ঘন্টার অফিসে সরকারী কর্মীরা সলিড কত ঘন্টা কাজ করেন-কোনো জরিপ বা গবেষনা আছে? কামনা করি থাকুক, কিন্তু ধারনা করি নেই।
#ContextAspectPerspective এই যে আপনি গ্লোবাল সব প্লাটফরম; অনলাইন ও ইন্টারনেটের যুগের গ্লোবাল সব রিসোর্স পড়ে পড়ে তারপর লোকাল বা ডোমেস্টিক কনটেক্সটের বিভিন্ন বিষয়ের মানদন্ড নিয়ে দিব্যি অ্যাডভোকেসি করেন, সেটা যে দা’য়ের চেয়ে আছার বড় হচ্ছে-তা জানেন?
জেন-জি বা জেন-জেডদের নিয়ে AIHR/SHRM?HBR এর বড় বড় আর্টিকেল পড়ে, তারপর জেন-জি’দের কীভাবে সর্বোচ্চ রেসিলিয়েন্স, এমপ্যথি নিয়ে ডিল করতে হবে, তাদের কীভাবে তুলার মধ্যে রেখে গ্রুম করতে হবে-সেই সদুপদেশ দিচ্ছেন, অথবা, এমপ্লয়ার অথবা এইচ.আর তাদের কীভাবে মিসহ্যান্ডেল করছে-তা বাৎলাচ্ছেন। কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছেন, AIHR/SHRM এর বিজ্ঞ লেখকরা যে জেন-জি’দের ভিত্তি করে এসব লিখছেন, আপনার দেশের জেন-জি কি সেরকম? দুটোর কনটেক্সট কি সেম?
কনটেক্সট বিচার না করে, দুটো প্রয়োগ ক্ষেত্রের মিল/অমিল বিবেচনায় না নিয়ে, স্রেফ বিদেশী আর্টিকেল পড়ে, তাদের বয়ান শুনে সেটা ভুরুঙ্গামারীর স্কুলে প্রয়োগ করলে হবে?
সুইজারল্যান্ড, জাপান, বৃটেন, অস্ট্রেলিয়ার জেন-জেড আর ভূগান্ডেদেশের জেন-জেড এক জিনিস? জগতের আর কোনো দেশ নিয়ে রিপোর্ট হয়েছে, যে, ভূগান্ডেশের এইচ.এস.সির মান আসলে ক্লাস সেভেনের সমান?
একটা কথা কি, বড় বড় বিদেশী ব্যক্তিত্ব ও সংস্থা হতে প্রাপ্ত HR বিদ্যা তো অবশ্যই দামী। উপকারী। কিন্তু প্রয়োগের সময় মনে রাখবেন, যে, ওই বিদ্যার জন্ম ও বিকাশ হয়েছে এমন মানুষদেরকে এক্সপিরিমেন্ট ও কনটেক্সটে নিয়ে, যারা ভিন্ন কালচারের ও কনটেক্সটের। তাদের পরীক্ষা নিরীক্ষা হতে প্রাপ্ত বিদ্যা সরাসরি এই দেশে প্রয়োগ করলে বিপদে পড়বেন। ঠিক যেমন গরুর টিকা মানুষকে প্রয়োগ করা যায় না। বিদ্যা নিন, কিন্তু প্রয়োগের সময়ে কনটেক্সট এনালিসিস করুন, তারপর ট্রান্সফরম করে প্রয়োগ করুন।
প্রেসক্রিপশন ধরে ওষুধ কেনা ও তা খাবার আগে একটু দেখে নেবেন যে, প্রেসক্রিপশনটা কি আপনার মাথা ব্যথার রোগের, নাকি ওটা আপনার কাজের বেটির ডায়রিয়া রোগের জন্য দেয়া।
হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ, AiHR আর SHRM কিংবা Armin Trost অথবা Dave Ulrich এর বড় বড় HR তত্বকথা ও ফর্মূলা উপস্থাপন ও তার প্রয়োগ করার আগে একটু বুঝে নিন, যে, ওইসব মহান ফর্মূলা আবিষ্কার ও বয়ানের সময় তাদের সামনে আশেকানে হাজেরিন, বা বিলিগোট অথবা বানি অথবা peer sample ছিল সব হারভার্ড, অক্সফোর্ড, স্ট্যানফোর্ড, ইয়েল, NYU, কেমব্রিজ, ট্রিনিটি, টরোন্টো অথবা MIT’র ছাত্ররা, অথবা samsung, amazon, microsoft, alphabet, meta অথবা অ্যাপলের কর্মীরা।
ওনাদেরকে স্যাম্পল ধরে বানানো তত্ব ও ফর্মূলা কাস্টমাইজ না করে, পারসোনালাইজ না করে, ট্রান্সফরম না করে, কনটেক্সট কমপেয়ার না করে তৃতীয় বিশ্বের একদা উন্নত ইদানিং গরীব বাংলাদেশের জনতার ওপর কোরামিনের মতো সরাসরি প্রয়োগ করলে, মানে, ব্রাহামার জন্য বানানো ইনজেকশন কুড়িগ্রামের দুধেল গাইকে দিলে সে এক্সেলেন্স প্রোডিউস না করে উল্টো অতিরিক্ত মল ত্যাগ করতে করতে মরতে পারে।
ওইসব উচ্চমার্গীয় গীত যারা রচনা করেছেন, তাদের সামনে স্যাম্পল ছিল এমন মানুষ, যারা বাই ডিফল্ট প্রায় ৯৮%ই প্রকৃত শিক্ষিত, কর্মঠ, স্বপ্নবাজ, সিনিসিয়ার, ডিসিপ্লিনড ও ট্যালেন্টেড। বিধায় সেটা মাথায় রেখেই স্ট্রাটেজি সাজানো যায়। এইচ.আর যাদেরকে হায়ার বা ডেপ্লয় করার জন্য পান, ফাইনালি যে বা যারা আসেন, তারা ডিফল্ট একটা লেভেল মেইনটেইন করা-গ্যারান্টেড। আর আপনি যাদের পান, এদের মধ্যে ফাঁকিবাজ, জিপিএ-৫ বেশি। তাই ওইসব সুশীল উচ্চমার্গীয় বিদ্যাকে বেঞ্চমার্ক ধরে এখানে সরাসরি এপ্লাই করলে বিপদ বাড়াবেন।
ওনারা যাদের দেখে আপেল গাছের তলায় বসে তত্ব আবিষ্কার করতেন, সেই আপেল গাছও বাংলাদেশে নেই। আর সেই জনতাও এই জনতা নয়। কারন, ডেভ দাদু অথবা আরমিন চাচ্চু জীবনেও দেখেননি, যে, তিন দিন ধরে ফলোআপের পরে ক্যানডিডেট ইন্টারভিউতে আসেন না, গণহারে কোম্পানীগুলো সময়মতো বেতন দেয় না, তারা দেখেন নাই, জানেনতো না-ই, যে, একটি দেশ আছে, যেখানে কোম্পানীগুলো আনপেইড ইনটার্নকে জয়েন করার সময় নমিনীর ছবি ও NID নিয়ে আসতে বলে। ওনাদের ধারনাও নেই, যে, এদেশে MBBS চাইলে MBA হোল্ডাররা সেখানে আবেদন করে।
সুতরাং কনটেক্সট ও ব্যাকগ্রাউন্ড ম্যাচ করে তবেই তত্ব প্রয়োগ করতে হবে।
বিদেশী ওষুধ ভাল, তবে ওষুধ প্রয়োগের আগে ওষুধ প্রয়োগ করা হবে যে রোগীর ওপর, তিনি বিদেশী কিনা, সেটা বুঝে নিন। তাই ট্রান্সলেশন ও ট্রান্সফরমেশনে হাত পাকান।
আরমিন ট্রস্ট, হারভার্ড রিভিউ ও ডেভ আলরিচের স্বপ্নাদর্শের এইচ.আর নিয়ে আমার দ্বিমত নেই। কিন্তু, কনটেক্সট ও উপযুক্ত সময় এবং সেই সাথে বিশেষ সিচুয়েশন বলে একটা বিষয় তো আছে, তাই না? ইউরোপের শ্রম আইন এবং যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমঘন্টা সংস্কৃতি প্রয়োগের আগে আমাদের প্রয়োগ ক্ষেত্রটা সবদিক হতে ইউরোপের জমিনের মতো রেডি কিনা-সেটা ভাবতে হবে না? সপ্তাহে ৪ দিনের কর্মদিবসের কালচার আমাদের শিল্প সেক্টরে প্রয়োগ করার মতো কাবেল কি আমরা হয়েছি? ভাবুন তো, আমাদের শিল্পকর্মীরা ৩ দিন ছুটিতে থাকলে দেশের বৃহস্পতি তুঙ্গে উঠবে, নাকি ষোলকলা পূর্ণ? আমাদের সরকারী অফিস কি ৪ দিনের অফিস করবার মতো কাবেল? যে ৫ দিন তারা করে, সেই ৫ দিনে সলিড কত ঘন্টা সেবা তারা দেন? ওজু আর চা খেতে কত ঘন্টা কাটান?
তরুণ, নবীন, ফ্রেশাররা জবে ঢুকবার আগেই হিসেব নিকেষের খাতা খুলে বসছেন, যে, যে চাকরিটা পাওয়া যাচ্ছে, সেটাতে কী পরিমান বিশ্রাম, ছুটি, ছুটি এনজয় করবার মতো সুপ্রচুর টাকা, রিল্যাক্স, লো-চ্যালেঞ্জ রেট ইত্যাদি মিলবে। চাকরিটা অফিসে হবে কিনা, কর্পোরেটে হবে কিনা, ফিল্ড জব যাতে না হয়, সেলসে জব যাতে না হয়, রিমোট এলাকায় অফিস যাতে না হয়।
আবার, কেউ কেউ যাস্ট একটা ব্রেক থ্রু পাবার জন্য ফিল্ড বা ফ্যাক্টরিতে জয়েন করলেও সারাক্ষণ মাথার ভেতরে চিন্তা, কবে কর্পোরেটে যাবেন। কারখানায় যিনি জবে ঢুকছেন, তার মাথায় তাড়া, কবে বায়িংয়ে যাবেন। ফিল্ড সেলসে যিনি ঢুকছেন, ভালও করছেন, তার মাথায়ও চিন্তা, কবে হাবে যাবেন। হাবে যিনি আছেন, তিনি অস্থির, কবে সেন্ট্রাল অফিসে পোস্টিং হবে। কবে অফিস বেজড জব হবে। গরীব একটি দেশে অফিস জবের জন্য সার্বজনীন হাহাকার আমাদের শিক্ষাক্রম ও পেশাগত বাস্তবতার হ-য-ব-র-ল মেলবন্ধনকে উগ্রভাবে প্রকাশ করে। গরীব দেশে মানুষ কাজ করবে মাঠে, ঘাটে, রাস্তায়, পাহাড়ে, বাগানে, কারখানায়, জঙ্গলে, বাজারে। এখানে সবাই যদি এসি দেয়া ঠান্ডা রুমের জবের জন্য পাগল থাকে, তাহলে বিজনেস ও ইন্ডাস্ট্রি চালাবে কারা? কৃষি কারা দেখবে? ম্যানুফ্যাকচার কে করবে? মাইনিং দেখবে কে?
গরীব দেশে হোয়াইট কলার জব একটা সাদা হাতি মাত্র। তিক্ত সত্যি হল, আগামি ২০ বছরে আমরা যেমন দেশই হই না কেন, এই ২০ বছর আমাদের ডমিনেটিং ক্যারিয়ার ও জব হবে ম্যানুফ্যাকচারিং, ফিল্ড, সেলস কিংবা টেকনিক্যাল বা টেকনোলজিক্যাল। অফিস বেজড ক্লারিক্যাল বা মাউস ঘোরানোর জব এই বিশ বছরে ডোমিনেটিং হবে না। দুঃসংবাদ বা সুসংবাদ।
আগের কথায় ফেরত আসি। এই দেশে এটা কেউ ভাবতে প্রস্তুত নয়, যে, মাত্রই ১৭-১৮ বছরের একটি ঢিলেঢালা একাডেমিক জার্নি শেষ হল, যেখানে প্রচুর বিশ্রাম ও রিল্যাক্সের সাথেই চলা গেছে। এখন জীবনের একটি প্রাইম টাইম টু সারভাইভ, রাইজ অ্যান্ড সেটল। এই সময়ে কাজ, পেশা, ক্যারিয়ার ও গ্রোথকে টপ প্রায়োরিটি না দিয়ে বিশ্রাম, রিল্যাক্স ও এন্টারটেইনমেন্ট ইন লাইফকেই যদি লাইফ হিসেবে ধরে নিয়ে ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্সকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য ও ব্রত বানিয়ে চাকরি/ব্যবসায় আসার প্রবণতা তৈরী হয়, তাহলে তারা কীভাবে বড় হবেন?
এমনিতেই ক্যারিয়ারিজম ও হায়ার ট্যালেন্ট অ্যান্ড ইনোভেশন ইনডেক্স নিয়ে আমাদের অবস্থান নড়বড়ে। তার ওপরে বিগত বছরগুলোতে আমাদের সামাজিক উৎকর্ষের ব্যাপক অবনমন হয়েছে বলেই মনে করা হয়। সেখানে লাইফ ব্যালেন্স নিয়ে এত দৌড়ঝাঁপ বেমানান।
আমাদের সমাজে, এমনকি, ব্যালেন্সের নামে কখনো কখনো ওই এনজয়মেন্ট পার্টে বেশি জোর দেয়া হচ্ছে। কাজ, পেশা ও চাকরির উৎকর্ষ ও ভ্যালূ অ্যাডিশনের চেয়ে এনজয়মেন্ট কতটা পাচ্ছি-সেটাই হয়ে উঠছে বেশি আলোচ্য। সেই বিবেচনায় জবে ফ্রাস্ট্রেশন আসছে, জব ছাড়ার ঘটনা বেশি ঘটছে। আমরা আমাদের প্রায়োরিটি সেটিংয়ে গন্ডগোল করে ফেলছি।
বাংলাদেশ যে সত্যি সত্যিই একটি উচ্চবিত্ত ধনী দেশ-সেটি বুঝতে ও বিশ্বাস করতে হলে মিরপুর পিরিত সড়কে চলে আসুন, বিকেল ৬ টার পরে।
এখানে আনুমানিক পঞ্চম শ্রেনী হতে ২৩/২৪ হয়ে ৩০/৩৫ বছর বয়সের ছেলে ও মেয়েরা জোড়ায় জোড়ায়, জড়াজড়ি করে, কোলাকুলি করে এমন বিন্দাস হয়ে বসে, দাড়িয়ে, কেলিয়ে, চেগিয়ে চাড্ডা (চা+আড্ডা) দিচ্ছে, রোমান্স বিনিময় করছে;
বাইকের ব্যাক-টেইলে যুবতীকে আসীন করে তার পায়ের কাছে বসে উঠতি প্রেমপ্রার্থী যুবক যেভাবে আফ্রোদিতির আসনে পুঁজো দিচ্ছে আর তাকে আফ্রোদিতির ফিল দিচ্ছে, স্কুল যাবার কিংবা কামাই রোজগারের জন্য জীবনকে প্রস্তুত করবার প্রাইম টাইমে যেভাবে রাজা-বাদশার মতো চিল করে সময় কাটাচ্ছে;
তাতে মনেই হয় না, জীবনে চাকরি-বাকরি, আয়-রোজগার করবার কোনো ব্যাপার আদৌ আছে।
যেন সব কানাডার নাগরিক। কীসের পড়াশোনা, কীসের রেজাল্ট, কী সব চাকরি-বাকরির চেষ্টা, কীসের যোগ্যতা হাসিলের জন্য কষ্ট করা।
যাস্ট চিল চিল!
এত বিন্দাস, চিন্তাহীন, অলস, বেভুল, মাস্তিময় থাকার মতো সাহস, শক্তি, সুযোগ এরা কীভাবে পাচ্ছে? টাকা কি সত্যিই আজকাল বারান্দার গাছে ধরছে?
এত কিছু ’এনজয়’ করে কোনোমতে হেঁচড়ে পেঁচড়ে যারা একাডেমি শেষ করছেন, তাদের আবার থলেতে থাকা পাথেয় খুবই নগন্য। তারও পরে যদি তারা কানাডা, সিঙ্গাপুরের তরুণদের মতো চমৎকার চমৎকার ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স নামের ততোধিক রিল্যাক্স আবারও চান, তাহলে সিরিয়াস ও ইন্ডাস্ট্রিয়াস তারা কবে হবেন?
ভুল ভাববেন না। আমি ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্সের বিপক্ষে নই। একজন উৎকর্ষপূর্ণ ও সৃষ্টিশীল কর্মী পেতে তার ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স নিশ্চিত করা জরুরী। কারন, দিন শেষে মানুষ জীবন ও পরিবারের জন্য জব করে থাকে। তবে, আমি যেটাকে নিয়ে বিরক্ত, সেটা হল, লাইফ ব্যালেন্স নিয়ে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি। কার্যত লাইফের চেয়ে কোয়ালিটি অব লাইফ অথবা স্ট্যান্ডার্ড অব লাইফ, এমনকি স্ট্যাটাস অব লাইফকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লাইফ ব্যালেন্সের নামে চালানো হচ্ছে। অর্থবহ জীবনের চেয়ে এখন ঝকমকি জীবন, স্ট্যাটাস সিম্বলময় জীবন, এনজয়মেন্ট ভরা জীবনকে ব্যালেন্সড লাইফের প্রতিভূ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা হচ্ছে-মূলত সেটা নিয়েই আমার আপত্তি। কাজে সময় দিলাম কিনা, কাজটাকে ভালোবাসলাম কিনা, ক্যারিয়ার গ্রোথে সার্বিকভাবে মনোযোগ, সময়, চেষ্টা দিলাম কিনা-তার খবর না রেখে কেবল জীবনকে এনজয় করতে পারছি কিনা-সেটাই একমাত্র মূখ্য হয়ে উঠলে সেটা অধঃপতনই ডাকবে। তখন ওয়ার্কও থাকবে না, লাইফও না। কারন, জীবন সাজাতে টাকা লাগবে।
ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স নিয়ে অতি উচ্চকিত জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ আবার দেখি কাঁটায় কাঁটায় ঠিক বিকেল ৫ টায় অফিস হতে বের হয়ে তারপর রাত ১০ টা তক ক্লাব, বার, ক্যাফে, লাউঞ্জ, লবি, অ্যামিউজমেন্ট কোর্ট, টং দোকান কিংবা লিটনের ফ্ল্যাট বা অফিসে ‘কোয়ালিটি’ সময় কাটিয়ে চিল করে। তারপর হেলতে দুলতে রাত ১১ টায় ঘরে ফেরে।
দারুন ওয়ার্ক-ওয়াইফ ব্যালেন্স।
আমি আরেকটু আগ বাড়িয়ে একটা কু-কথা বলি।
আপনাকে আসলে ব্যালেন্স না, যে কোনো একটাকে বেছে নিতে হবে। লাইফ অথবা ক্যারিয়ার। ব্যালেন্সড লাইফ ও ক্যারিয়ার আসলে কখনো কখনো আমার মনে হয় একটা মিথ মাত্র। ক্যারিয়ার চাইলে লাইফে স্যাকরিফাইস করতেই হবে। ক্যারিয়ারকে সময় দিতে হবে। ক্যারিয়ারের জন্য সময়, এফোর্ট, টাকা ও কনসেনট্রেশন ইনভেস্ট করতেই হবে। সেটা করতে হলে যখন যেটা করতে হবে-সেটা দিতে গেলে লাইফের অংশে টান ধরবেই।
আমি যখনই কোনো জবের ভাইবা নিই, ক্যানডিডেটদের একটা প্রশ্ন করি। সেটা হল, আপনাকে যদি কখনো এমন একটা পরিস্থিতিতে পড়তে হয়, যখন আপনাকে পরিবার ও ক্যারিয়ার হতে যে কোনো একটা বেছে নিতে হবেই, তখন কোনটা নেবেন। প্রায় সিংহভাগই বলেন পরিবার। হা হা হা।
আমি কখনো কখনো মানুষকে বলি, ৪০ বছর বয়স হবার আগে বিয়ে-শাদি করে পরিবার না বানাতে। ততদিন ক্যারিয়ার সাজাতে বলি। কারন, আসলেই ২৫ এ ক্যারিয়ার শুরু করে পরের বছর দশেক ক্যারিয়ারের পেছনে ইনটেনসিভলি কাজ করতে হয়। এই দশ বছর ক্যারিয়ার সেটল, গ্রোথ ও সাসটেইনেবল করতে লারনিং, এক্সপিরিয়েন্স, নেটওয়ার্কিং, স্কীল, এক্সপোজার-অর্জন করতে হয় প্রচুর। প্রচুর সময়, টাকা, এফোর্ট, কনসেনট্রেশন খরচ করতে হয়। নিবিড়ভাবে ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে হয়। সবরকম চাপ ও বাঁধন হতে মুক্ত থেকে সেটা করতে পারলে বেস্ট। পরিবার থাকলে আপনি সেটা কখনোই ১০০ ভাগ দিতে পারবেন না। কমপ্রোমাইজ হবেই।
মানে, বলতে চাইছি, ক্যারিয়ার গ্রোথের গ্রামার ডিজার্ভ করে যে এই আরলি বছরগুলো আপনি এবসলুটলি ক্যারিয়ারকে নিয়েই থাকুন, এই সময়টা আর কিছুতে ফোকাস না করুন। ক্যারিয়ারকে পুরোটা দিলে ক্যারিয়ার সেভাবেই গ্রো করে। সেখান হতে যতটা আপনি লাইফের জন্য শেয়ার করবেন, স্যাকরিফাইস করবেন, যতটা কম করবেন-গুনে গুনে ক্যারিয়ার ঠিক ততটাই ইমপ্যাক্ট হবে। ট্রেড অফ। মনে রাখবেন, আমি আপনাকে বিয়ে-শাদি করতে, পরিবার গড়তে না করছি না। আমি আপনাকে অংকটা দেখাচ্ছি। চয়েজ আপনার। অ্যাবসলুটলি ক্যারিয়ার গড়বেন, নাকি ব্যালেন্স করবেন, করলে কতটা ব্যালেন্স করবেন-তা আপনার বিষয়। তবে মনে রাখবেন, আমি বলেছি, এই বয়সটা ক্যারিয়ার গড়বার। ক্যারিয়ার চাইলে সেটাকে প্রায়োরিটি দিন। আর যদি আপনি ব্যালেন্স করতে চান, তাহলে সেটার মধ্য দিয়ে যা আসে-সেটা মেনে নিতে হবে। সেই প্ল্যানটা একদম আলাদা আলাপ। অন্যত্র করেছি। পড়ে নেবেন।
আমি বলছি না, যে, জীবন হতে বিশ্রাম, এনজয়মেন্ট, ফান, কোয়ালিটি টাইম, ফ্যামেলি টাইম একদম ভুলে গিয়ে অষ্ট্রপ্রহর কাজ কাজ কাজ করে মরে যেতে। আমি বলছি না, পরিবারকে ত্যাগ করতে। আমি বলছি, প্রায়োরিটি সেটিং নিয়ে।
২৫ বছর বয়সেই একজন তরতাজা তরুণ, যিনি মাত্রই ক্যারিয়ার শুরু করলেন, তিনি যদি জীবনের ১৭ টি বছর রিল্যাক্স করে কর্পোরেটে, ক্যারিয়ারে ঢুকেই তখনই চরম আয়েশ ও রিল্যাক্স নিয়ে অতি ব্যস্ত হতে চান, তাহলে তিনি পরের জীবনের জন্য প্রস্তুত হবেন কী করে, নিজের গ্রোথের জন্য সময়, টাকা ও এফোর্ট দেবেন কী করে? নিজের আপস্কিলিং ও রিস্কিলিং করবেন কী করে? ক্যারিয়ারের ভিত্তি যখন নির্মীত হয়, তখনইতো তাকে সবচেয়ে বেশি সময় দিতে হবে ক্যারিয়ারের পেছনে।
ক্যারিয়ারকে সময় দেয়া বলতে বদমাশ বসরা আবার যেন ধরে না নেন, আমি রাত ১০ টা তক অফিস করাকে হালাল করতে বলছি। আমি টোটাল ক্যারিয়ার প্ল্যান ও সেটাতে গ্রোথের জন্য সময়, টাকা, মনোযোগ ও এফোর্ট দেয়াকে ইঙ্গিত করছি।
শুধু চিল ও কুল করে তো জীবনের ১৭ বছর গেলই। আজকাল একাডেমির জীবনটা হতে তো খুব সামান্যই পাথেয় সংগ্রহ করা যাচ্ছে। যারা চাকরির বাজারে আসছেন, তাদের তো আমরা দেখছি। বিপুল গ্যাপ চাওয়া ও পাওয়ায়। তাহলে, এখনও যদি সেই চিল করে চাকরি করে যাবার চিন্তা থাকে, তাহলে “বড় তো হচ্ছেন, কিন্তু, বেড়ে উঠবেন কবে?”
ক্যারিয়ার, ক্যারিয়ার গ্রোথ, রাইজ, শাইন-এই আলোচনার একটা গ্রামার বা স্বরলিপি আপনাদের শেয়ার করি। যথারীতি এই গ্রামার বা তত্ত্ব হারভার্ড অথবা অক্সফোর্ড হতে রেটিফায়েড নয়। আমার কাছে আপনি কোনো বিশুদ্ধ জ্ঞান পাবেন না। সবই চোরা মার্কেটের মালের মতো। পড়লে ও পড়ে মরলে নিজ দায়ীত্বে মরবেন।
গ্রামারটা একটা মোটামুটি ছক মেনে তৈরী ও বিন্যাসকৃত।
সেটা হল, আপনি ক্যারিয়ারে কেমন করবেন, কতটা আগে বাড়বেন, ক্যারিয়ারের কতটা উঁচুতে পৌছাবেন, সেটা আবার কেমন করে, কীসের বদৌলতে, কী থাকলে, কী ঘটলে, কী করলে, কী না করলে, কোন তরিকায় ক্যারিয়ারের বিভিন্ন অ্যাচিভমেন্ট সম্ভব, কতটা সম্ভব, তার একটা স্বরলিপি বলব এখন।
স্বরগ্রাম বা স্কেল-১:
এই তবকায় স্টিভ জবস, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, মেসি, জীবনানন্দ প্রমূখরা বিরাজ করেন। মানে, আপনি যদি ভেতরে ভেতরে তাদের মতো হন, মানে যাদের ভেতরে ’গড গিফটেড’ প্রতিভা বা মেধা থাকে, তারা যেকোনো গ্রামার বা ব্যাকরনের সীমা বা ছন্দ্যের উর্দ্ধে। কোনো রকম গ্রামার, নিয়ম, রীতি, পদ্ধতি, ছককে কাঁচকলা দেখিয়ে তারা জীবনে, মানে ক্যারিয়ারে সর্বোচ্চ চুড়ায় আরোহন করেন বা করবেন। এই গ্রুপটা বাউন্ডুলে হোক, স্কুল পলাতক হোক, প্রথাবিরোধী হোক, গাঞ্জুটি হোক, মদ্যপ হোক, বহুগামী হোক, জুয়ারি হোক-এরা যার যার ট্রেডে ফাটিয়ে দেবেন। এঁরা সাধারনত ক্ষেপাটে, উদাসীন, ঝোঁকগ্রস্থ, বোহিমিয়ান টাইপ হন। সবরকম নিয়ম, হিসেব, অভিজ্ঞতাকে কাঁচকলা দেখিয়ে এরা শাইন করবেন। আপনি যদি ভেতরে ভেতরে এদের মতো কেউ হন-তাহলে আপনার হবে বস।
স্বরগ্রাম বা স্কেল-২: এই দলে দুটো সাব-গ্রুপ: –
২.১.
এঁরা মেডিওকার বা, তার আরেকটু বেশি। তবে প্রথম তবকার মতো নন। এঁদের সক্ষমতা, দক্ষতা, ক্ষমতা, বুদ্ধি চলনসই। চেষ্টা থাকে, তদবির থাকে, চাপ থাকে। এরা এফার্ট দেন ওপরে উঠতে। খোদা প্রদত্ত যতটা প্রতিভা আছে, সেটাকে আরেকটু শানিয়ে তারা ক্যারিয়ারে ওপরে যেতে পারেন। তবে এরা বর্তমান বাজারের তেজি আরবী ঘোড়া নন। এনাদের ক্যারিয়ার শনৈ শনৈ করে আগে বাড়বে, এরা নিশ্চিতভাবে সব সেগমেন্টে আগে বাড়বেন, আজীবন রাজ করবেন-সেটা গ্যারান্টেড না। এনাদের একই গতি বজায় রেখে ক্যারিয়ার শেষ করবার গ্যারান্টি কম। ভাগ্য খুব সহায় হলে একটি সম্মানজনক পজিশন এঁরা অর্জন করেন। সেখানেই শেষ করেন। আবার, এনাদের একটি বড় অংশ মাঝপথে বা শেষ দিকে এসে বারংবার হোঁচট খেতে থাকেন।
২.২.
এঁরা প্রতিভাবান, তবে সেটা গতানুগতিক একটা ট্রেইটে বা স্কিলে বা অ্যাবিলিটিতে না। এদের যাবতীয় কেরেদ্দারী চাপা, শো-অফ, সার্কুলেশন, মার্কেটিং, ব্র্যান্ডিং, জ্যাক, কানেকশন-এসবকে বানাতে, বাড়াতে ও কাজে লাগানোতে। চাপাতে এদের প্রচন্ড দখল। নিজে যা নন-নিজেকে সেটা দেখানোতে এরা পারঙ্গম। পটকা মাছ যেমন নিজেকে ফুলিয়ে দশগুন আকার দেখায়, এদের ধরনটা তেমন। চাপা, জ্যাক ও ব্র্যান্ডিং কাজে লাগিয়ে উদ্দেশ্য হাসিলে এরা সুপার। যে কারনে, ক্যারিয়ারে শাইন ও রাইজ করবার চান্স এদের প্রচন্ড। এদের ঝুঁকি ও ফলও কম। বাজারে অ্যাকসেস প্রচন্ড।
স্বরগ্রাম বা স্কেল-৩:
এই দলে আছেন বিলো এভারেজ অথবা নন-মিডিওকাররা। তবে এঁরা একেবারে অযোগ্য নন। একটা দুটো ট্রেইটে এরা ভাল, বুদ্ধিমত্তায় আন্ডারেটেড, বেশ কিছুটা ইন্ট্রোভার্ট, জীবনে উচ্চাশা কম। এঁরা এদের জীবন ও প্রত্যাশাকে একটা নির্দিষ্ট গন্ডিতে বেঁধে ফেলে। ফলে, এরা মারাত্মক রাইজ করেন না (বা করতেও চান না), আবার, এরা বাজারের সবথেকে নিরাপদ গোষ্ঠী, কারন, এদের বাজার খুব বড়, আর, এই লেভেলের হায়ারিংয়ে কোনো এমপ্লয়ারই খুব বেশি মারাত্মক সিলেকটিভ থাকেন না। এরা খুব বড় হন না, আবার, খুব বেশি বিপদেও পড়েন না। জবলেস হবার হার কম, আবার, হলেও থাকার মেয়াদ কম।
এই লেভেলগুলোর মধ্যে আবার, আপনি যদি স্কেল-১ এবং স্কেল ২.২ এর কম্বিনেশনে একজন হাইব্রিড হন, এবং বাজারের একটা ব্র্যান্ড হন, তাহলে আপনি জব মার্কেটের সবচেয়ে পাওয়ারফুল জাতক। আপনি বাজারে রাজ করবেন-কোনো সন্দেহ নেই। আজীবন আপনি ড্রাইভিং সিটে থাকবেন এবং আপারহ্যান্ড থাকতে পারবেন। বেছে বেছে চাকরি করবার ভাগ্য এদের বেশি। বাজারে আগুন লাগুক, এদের গায়ে তার আঁচ কম লাগে।
আর আপনি যদি ২.১ হন, তাহলে ৫০/৫০ চান্স। আপনি বেশ ভাল করতে পারেন। আবার, একটা বড় সংখ্যক ক্ষেত্রেই আপনি মাঝপথে, অথবা চুড়ায় পৌছানোর অল্প কিছুদিন পরেই পড়ে যেতে পারেন। আপনি জব মার্কেটের দুলদুল বা আরবী ঘোড়াটি নন।
তবে, সেফ বা ট্রেন্ড যদি বলি, তাহলে বর্তমান কর্পোরেট বাজারে ২.২ এর মানুষেরা সবথেকে গেইনার ও সেফার গ্রুপ। এঁরা বেশ সহজেই, অনায়াশেই এবং নিজেদের পছন্দমতোই এ ডালে, ও ডালে উড়ে বেড়িয়ে বেশ অনেকটা হেসেখেলেই রাইজ করছেন এবং জীবন উপভোগও করছেন। এই গ্রুপটার মূল শক্তি নলেজ, স্কিল, অ্যাবিলিটি ও অ্যাট্রিবিউটসের কম্বো নয়। চাপা, জ্যাক, বায, কানেকশন, চানক্য বুদ্ধি, সপ্রতিভ স্বভাব ও ভাগ্য হল এদের মূল পাওয়ার।
একই সাথে আপনাদেরকে ট্যালেন্ট অ্যাকুইজিশানের আরেকটি দিক নিয়েও আজকে বলি।
আপনার প্রতিষ্ঠানের হেড হান্টিংয়ের দায়িত্ব হয়তো আপনি থার্ড পার্টির ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। আমি থার্ড পার্টি হেড হান্টিংয়ের বিরোধী নই। এবং, আমি স্বীকার করি, যে, এই পদ্ধতির অনেক অ্যাডভানটেজও রয়েছে। সেই সাথে, প্রতিষ্ঠানগুলোর এই সেবা এভেইল করবার অনেক বাস্তব কারনও রয়েছে।
কিন্তু, স্ট্র্যাটেজিক্যালী এই পন্থার কিছু অসুবিধা বা সমস্যাও রয়েছে। আজ সেটি দেখিয়ে দিতে চাই।
প্রাইভেট সেক্টর জবের একটা ট্রেন্ড দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। রেফারাল সিস্টেমের হাত ধরে আসা থার্ড পার্টি এজেন্সি কর্তৃক এমপ্লয়ারকে কর্মী সরবরাহ। এই প্রথাটির সুবিধা অবশ্যই আছে তবে তার বেশিরভাগটাই এমপ্লয়ারদের ফেভারে। চাকরিপ্রার্থীদের জন্য এর নেগেটিভ এফেক্টই বেশি।
সবচেয়ে বড় এফেক্টটি হল অর্গানাইজেশনগুলো যোগ্যতম প্রার্থীকে হারাচ্ছে। থার্ড পার্টি এজেন্সিগুলো তাদের নিজেদের মতো করে প্রার্থী এনলিষ্টমেন্ট করে তাদেরই রেফার করে প্রতিষ্ঠানের কাছে। থার্ড পার্টির কাছ থেকে নেয়ায় এমপ্লয়ার কখনোই মার্কেটে থাকা সব প্রার্থীর মধ্যে সেরাটা নেবার সুযোগ প্রথমেই হারায়। সে পায় থার্ড পার্টির দেয়াদের মধ্যে হতে যোগ্যতরকে, মার্কেটের যোগ্যতম বা সেরাকে না।
থার্ড পার্টি এজেন্সি বেশিরভাগ সিভির কারিশমা দেখেই প্রার্থীর রেটিং করে। তাতে করে যার সিভি যত চোস্ত, সে তত কোয়ালিফাইড। কচিৎ কখনো তারা প্রার্থীকে ইন্টারভিউ করলেও তাদের ইন্টারভিউ মূল এমপ্লয়ারের প্রতিষ্ঠানের কালচার, পারসপেকটিভ ও স্ট্যান্ডার্ডে তো নিশ্চই হবে না।
আমি বলছি না, থার্ড পার্টি সিস্টেমে যোগ্য লোক দেয়া হয়না। বলছি, ওই সিস্টেমে বাজারের টপারদের ডাক প্রাপ্তি বা যোগ্যতার পরীক্ষা দেবার সুযোগ নিশ্চিৎ না। ফলে থার্ড পার্টির রেফারড ক্যান্ডিডেট নিলে প্রতিষ্ঠান ও কর্মীর মধ্যে সরাসরি যোগসূত্রের সুবিধাটা আর কেউই পায়না।
তদুপরি প্রফেশনাল অন্যান্য কোয়ালিটিতে সুপার হলেও থার্ড পার্টি বা রেফারেল কাজে লাগিয়ে সুযোগ করে নেবার জন্য যে এক্সট্রা কোয়ালিটি (লিয়াজোঁ, লিংকিং, নেটওয়ার্কিং) দরকার তা সবার মধ্যে অবশ্যম্ভাবিভাবে গ্রো করবেই-এমনটা ন্যাচারালি হয় না। তাছাড়া প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে জিনিয়াস ও ট্যালেন্টেড লোকেরা লিংক রাখতে চানও না।
জিনিয়াস মানুষ অভিমানী হন, জাত্যাভিমান তাদের বেশি থাকে। #Network #নেটওয়ার্ক মেইনটেইন করাকে (যেটা একসময় কার্যত নিন্দীত ছিল ‘লেজুড়বৃত্তি’ নামে) বেশিরভাগ জিনিয়াস মানুষ উপভোগ করেন না, অস্বস্তিতো আছেই। ফলে সবরকম অন্য যোগ্যতা থাকা স্বত্ত্বেও তারা সুযোগ পান না নিজের যোগ্যতার অন্তত পরীক্ষাটি দিতে। তিনি নিজেও ক্ষতিগ্রস্থ, প্রতিষ্ঠানও যোগ্যতম’র সার্ভিস না পেয়ে বঞ্চিত।
ঠান্ডা মাথায় ভেবে বলুন তো, বিকল্প কখনো মূল বস্তুর সমান সমান হয় কিনা? বায়োনিক হাত, বায়োনিক হার্ট, পাথরের চোখ, পাশের বাসার ভাবী, সৎ মা, মামাতো বোন, সিলিকন ডল-কেউ ই কি আপনার আপন কারো মতো সত্যিই কখনো হওয়া সম্ভব? আপনার দরকারী ম্যানপাওয়ার বা হিউম্যান রিসোর্স সংস্থান করবার যাবতীয় দায়ীত্ব সামলাতে আপনিতো বিকে নিযুক্ত করেছেনই। তাহলে সেই কাজটি আরেকটি বাইরের প্রতিষ্ঠানকে করতে দেয়াটা ঠিক কেমন হয়ে যায়? তাহলে তারা কি সক্ষম নন?
তাছাড়া, ভাবুন তো, আপনার একটা অঙ্গের গুরুত্ব আপনার চেয়ে আপনার মাসীর কাছে কি বেশি হওয়া সম্ভব? আপনার দৃষ্টিভঙ্গি, স্ট্র্যাটেজি, পলিসি ও ভিশনের সাথে হুবহু লীন হয়ে, কপিড/এলাইনড হয়ে আপনার থার্ড পার্টি কর্তৃক আপনার হেড সোর্সিং হওয়া কি তাত্বিকভাবে সম্ভব? ভিশন কি কখনো কপি হয়? আপনার প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বৈচিত্রপূর্ণ, জটিলতাপূর্ণ ক্যাপিটাল অ্যাসেট বা রিসোর্স, তথা ম্যানপাওয়ার হায়ার/পারচেজ করবার দায়ীত্ব যদি আপনি সম্পূর্ণরূপে তৃতীয় একটি পক্ষকে এসাইন/ডেলিগেট করে দেন, তাহলে তারা আপনার প্রতিষ্ঠানের ভিশন, মিশন, স্ট্র্যাটেজি, পলিসি, কালচার, গোল ও কমপিট্যান্সি বেঞ্চমার্ক পারফেক্টলি মিট করে/এনশিওর করে আপনার জন্য হেড সোর্স করতে কতটুকু সত্যি সত্যিই সক্ষম-তা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে যাচাই করে নিন। স্টার, হাইপড, ভাইরাল, ওভাররেটেড রিভিউ বা বিজ্ঞাপনে মজবেন না।
আপনাকে একটা শয়তানি টিপস বলি। আপনার প্রতিষ্ঠান ২০ টি বিভাগ। বিশটার জন্য ২০ জন হেড আছেন। তারা কম-বেশি যার যার সাবজেক্টে দক্ষ, জ্ঞানী, অভিজ্ঞ।
কিন্তু, একটি থার্ড পার্টির কি ২০টি আলাদা বিভাগ থাকবে? থাকলেও আপনার ওই ২০টিই কি তাদের থাকবে? (সেটা কি তাত্বিকভাবে সম্ভব?) আর আপনার ২০টিই যদি তার থাকে, তাহলে ভিন্ন সেক্টরের, বিজনেসের, ইন্ডাস্ট্রির অন্যদের সব বিভাগও কি তাদের থাকে? না থাকলে তারা কীভাবে তাদের যোগ্যতা অ্যাসেস করেন-একটু ভাববেন। (#সবাই১ না) আমাকে ভুল ভাববেন না। এখানে আরও আলোচনা রয়েছে। কীভাবে তারা কাজটি করে থাকেন, কীভাবে ম্যানেজ করেন-তার বিস্তারিত না শুনে, না জেনে একতরফা তাদের খাটো ভাবলে আবার ভুল করবেন।
এমনকি, আপনি যদি দীর্ঘদিন ধরে এমন সার্ভিস এক বা একাধিক প্রতিষ্ঠান হতে নিতে অভ্যস্তও হয়ে থাকেন, এবং সন্তুষ্টও থাকেন, তার পরও মাঝে মধ্যেই র্যান্ডম চেক করুন। ঠিক যেমন করে আপনি সাপ্লাই চেইনের জন্য সাপ্লায়ার এনলিস্ট করবার জন্য সূক্ষ্ণতম যাচাই পদ্ধতি অবলম্বন করেন, সেভাবেই ফার্ম চুজ করুন। চুজ ও প্রভেন হয়ে থাকলে মাঝে মাঝেই ক্যালিব্রেশন চেক করুন।
এতক্ষণ বলেছি, থার্ড পার্টির একান্ত নিজস্ব অ্যাসেসমেন্ট, এবং তারই মধ্য দিয়ে ফাইনাল ক্যানডিডেট/প্রডাক্ট অনবোর্ড করে দেয়া, মানে রিক্রূটমেন্টের পুরোটা আউটসোর্স করে দেবার দিকটি নিয়ে।
এর বাইরে, কেবলমাত্র প্রোফাইল সোর্সিং বা শর্টলিস্টিং করে দেবার সেবাও যদি নিয়ে থাকেন (এই সেবাটিই মেজরিটি), যেখানে তাদের দেয়া শর্ট রিসোর্স হতে আপনারা চুজ করে ডাকেন ও নিজেরা ইভ্যালুয়েট করেন, সেখানেও সতর্ক হোন। কারন, তারা আপনাকে ১০ টি দিচ্ছে, আপনি ৩টি ডাকছেন, ১ টিকে নিচ্ছেন। এতে আপনার সময়, এফোর্ট, এনার্জি তথা ফাইনালি টাকা সেভ হলেও, গতি বাড়লেও, ঝামেলা কমলেও এতে করে আপনার বাজারটা,তথা হরাইজনটা ছোট হয়ে যাচ্ছে। থার্ড পার্টির আই আপনার আই হয়ে যাচ্ছে। তারা যে ১০ টা দিচ্ছেন, তারাই যে বাজারের সেরা-সেটা আর হবার চান্স থাকছে না।
আপনি উন্মুক্ত বাজার হতে উন্মুক্ত বিজ্ঞাপন দিয়ে নিজে যাচাই করে নিলে পুরো ট্যালেন্ট মার্কেটের নজরে তা আসবে (১০০% না হলেও সংখ্যায় অন্তত বড়।) ৫০০ জন আগ্রহ দেখাবেন, আপনি ১০০ কে ফিল্টার করবেন, ১০০ জন হতে ১ টা ফাইনাল প্রোডাক্ট পাবেন। অনেক পিওরিফাইড। আর থার্ড পার্টিকে দিলে আপনার দিগন্তটা ১০ জনে সীমিত হয়ে যাচ্ছে। আপনি হয়তো দারুন একটা লোক পাচ্ছেন। কিন্তু, একই সাথে, আপনি বাজারের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক ও সেরাটাকে না পাবার ঝুঁঁকিতেও পড়ছেন। আপনাকে যে ট্রেন্ডে তারা ডিরেক্ট করবে, আপনার ম্যানপাওয়ার সেভাবে শেপ নেবে। তারা যদি সবসময় বগুড়ার আলু বিক্রেতাদের হতে ১০ রকম আলু সোর্স করে আপনাকে দেখায় আর আপনি সেখান হতে সেরাটা নেন, তাতে বলা যায়, আপনি ভাল আলু পেলেন, বগুড়ার ভাল আলু পেলেন, বগুড়ার সেরা আলুও হয়তো পেলেন, কিন্তু, দেশের সেরা আলু পেলেন না।
আমার একটি ব্যক্তিগত HR ফিলোসফি বলি। সেটা হল, আমি রিভার্স অসমোসিস ব্যবহার করলে পানির যাবতীয় দূষিত বস্তু হয়তো ফিলটার হয়ে যায়, নিশ্চিতভাবেই আমি জীবাণুমুক্ত পানি পাব, কিন্তু, একই সাথে আমি পানির দরকারী মিনারেলকেও হারাবো। ময়লা ছাঁকবার অতি সিলেকটিভ মেথড ও ঝোঁক বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আমি দরকারী জিনিসও হারাবো। আমি বিশ্বাস করি এই কবিতায়-
দ্বার রুদ্ধ করে দিয়ে ভ্রমটারে রুখি,
সত্য বলে আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি?
Engender consequence কে মেনে নিয়েই চলতে হবে। আমি এইচআরে কাজের জন্য ভাল ও খারাপ-উভয়কেই চেখে দেখার পক্ষপাতি। আমি কেবল গোলাপ বাগানে ঘুরব না, আমি ডাস্টবিনেও ঢুঁ মারব। আমি শুধুমাত্র হারভার্ড বা অক্সফোর্ডের ছাত্রদেরই সবসময় জবের জন্য ইন্টারভিউ করব না, বরং হরগঙ্গা কলেজ বা ভুরুঙ্গামারী কলেজেরও কাউকে আমি ট্রাই করব। সবরকম এক্সপোজার HR এর জন্য জরুরী। আমার হয়তো সময় বেশি যাবে, হয়তো পরিশ্রম বেশি হবে। হয়তো Yield ratio গ্যাপ বাড়বে। হয়তো আমি প্রচলিত ট্রেন্ডের ও বিজনেস এপ্রোচের বিপরীত স্রোতে হাঁটছি, তবু ঝুঁকিটা আমি নেব। কারন, রেফারেলের হাত ধরে বায়াস, কোরাম, ফোরাম এর খপ্পরে পড়বার ঝুঁকিও কম মারাত্মক না।
তাই বলে কি আপনি তাদের সেবা নেয়াকে হারাম ভাববেন? না, এই সেবা একটি বহুল প্রচলিত সেবা, এবং এর সুবিধা অনেক প্রতিষ্ঠানই নেন। তবে আপনি যেটা বেস্ট হিসেবে আরও চালু করতে পারেন তা হল আপনি মিশ্র চর্চা করতে পারেন। যেখানে আপনার নিজস্ব ওপেন সোর্সিংও থাকল, থার্ড পার্টিও থাকল, তারপর মার্জ/কমপেয়ার হল, তারপর কমবাইন্ড। ওখান হতে আপনারা নিজেরা ইভ্যালুয়েট করে নেবেন। এতে করে আপনার ট্যালেন্ট অনবোর্ডিং বায়াসনেসের শিকার কম হবে। ভ্যারাইটি ও ডাইভারসিটি বাড়বে। আপনার সিলেকশনের এক্সেলেন্স বাড়বে। কোরাম ও ফোরামের অপছায়া আপনার প্রতিষ্ঠানে কমে যাবে। আপনি রেফারেলের সুবিধাও এনজয় করলেন, আবার মুক্ত আকাশ হতে সোর্সিং চালু রেখে প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছতার ক্যাপিটালাইজেশনও করলেন।
আবারও বলি। আমি থার্ড পার্টি হেড হান্টিং সার্ভিস, বা রেফারেল এর একদমই বিরোধী নই। আগেই বলেছি, ওই পন্থার অবশ্যই বাস্তবতা ও অ্যাডভানটেজ রয়েছে। লাভ না থাকলে কেন একটি প্রতিষ্ঠান বাড়তি পয়সা খরচ করে তার HR এর কাজ বাইরের কাউকে দিয়ে করাবে? লাভ অবশ্যই হয়।
কিন্তু, আমি বলছি সেই লাভের ট্রেড অফের কথা। বলছি, সেই ট্রেড অফ জানা এবং জেনে এই বিকল্প পছন্দটিকে আরও কার্যকর, নৈতিক, সুদক্ষভাবে কাজে লাগাবার সুযোগ ও পন্থা নিয়ে।
আপনার হেড সোর্সিংকে আপনি অ্যাবসলুটলি রেফারেল বা থার্ড পার্টি বেজড করে না ফেলে আপনি এটিকে মিশ্র রাখুন। তাতে আপনার লাভ বেশি বলে আমি মনে করি। কর্মসংস্থান সবসময় উন্মুক্ত থাকার সমর্থক আমি। ক্লোজ ডোর হেড হান্টিং বা হায়ারিং অনেক অনেক আঁধার নিয়ে আসে। তাকে ঘরে ঢুকতে দিলে আপনারই লস।
দ্বার উন্মুক্ত রাখুন।
#talentacquisition #talenthunt #opensource #openemployment #biasfreeemployment #quorumfreeemployment #thirdpartyheadhunting #outsourcingofjob #outsourcingofrecruitment #diversityinrecruitment #careergrowth #riseincareer #pressureofgrowth #ambition #careerism #familypressure #pressureofexpectation #massiverise #rapidrise #startupbusiness #excessbranding #overhyped #promotion #maturity #managerialrole #leadership #teammanagement #jobswitching #jobhopper #jobaholic #frequentjumping #worklifebalance #careergrowth #load #boss #overwork #relax #toil #leave #rest #teamworkbalance #contextualbackground #prescription #harvardoxfordculture #imposingculture #sourcing #referral #reference #jack #lobbying