Skip to content

দারিদ্র রেখা

  • by

এই সুবিশাল লেখাটি সম্ভবত এই বছরে আমার শেষ প্রবন্ধ। কে জানে, হয়তো জীবনেরও!

বিশেষ একটি ঘটনাক্রমে লেখাটির জন্ম। আমাকে বা আমার লেখাকে যারা চেনেন, শুধু তারা পড়লে আফসোসে ভুগবেন না। তবে প্রথমেই বলে রাখি, প্রদত্ত ছবিটির সাথে গল্পের মিল নাও পেতে পারেন। অনেক দিন ধরেই লিখতে বসবার ফুরসত পাচ্ছি না। ব্যক্তিগত ও পেশাগত ব্যস্ততার কিছুটা আকস্মিক উল্লম্ফন হঠাৎ করেই কী-বোর্ড সন্যাস নিতে আমাকে বাধ্য করছে।

মুশকীল হয়ে গেছে কী, লেখালেখিটা আমার এক নেশা। সারাক্ষণই লেখা মাথায় কিলবিল করে। তাদেরকে জোর করে থামিয়ে রাখি। তবু নেশা কি বাঁধ মানে?

এই যেমন এটাই লিখতে বসলাম পরপর দুটো সাম্প্রতিক ঘটনার যুগপত ঔরষ জ্বালায়। লেখার প্রেক্ষাপটটি অনেকের কাছে উপদ্রবের মতোও লাগতে পারে। হাজার হোক, নিজের অন্ধকার অতীত কে ঘাঁটতে চায়? আবার অনেকের জন্য অতীত রোমন্থন অহেতুকও মনে হয়। শ্রদ্ধেয় তারাপদ রায় মহাশয়ের দারিদ্র রেখা কবিতাটির প্রয়াত জনাব কামরুল হাসানের দরাজ কন্ঠে আবৃত্তি প্রায়ই শুনি। সম্প্রতি শুনছিলাম ক্লান্ত দিন শেষে ঘরে ফিরতে ফিরতে। বিকেলের বিষন্ন আলোয় একাকি আমার মনে সেই কবিতা নতুন করে কী যেন নাড়া দিল।

যতবারই শুনি, মনে হয়, এ তো আমাকে নিয়ে লেখা। এ তো আমারই কাব্যকথা। এরকম একটি সেনসেটিভ বিষয় নিয়ে লেখার চিন্তাটা মাথার পোকা নাড়া দিল কয়েকদিন আগে, যখন আমি জনৈক ব্যাংকার সুহৃদের সাথে শহরের এক প্রান্তে একটি ’সরাইখানা’ তথা খাদ্যালয়ে এক বিকেলে দু’কাপ চা খেতে বসলাম। এই লেখার জন্মের বড় যোগসূত্র তিনিও বটেন। ফাইনালি লিখতে পেরে তাকেও ধন্যবাদ দিতে হচ্ছে। ডিজিটাল যুগে সবকিছুতেই রংঢং লাগানোর মতো করে, এই উচ্চ-মধ্যম মানের সরাই কাম চা-শালায় খাবার আগে খাবারের কড়ি শোধ করতে হয়।

কড়ি গুনতে গিয়ে শুনলাম, এক কাপ দুগ্ধ-মিশ্রিত চা আর এক মগ কালো তিতকূটে কফির দাম তিনখানা একশো টাকার নোট। অবাক হলেও আহত হলাম না। এই শহরে বাবুদের এই এক নতুন ’নোটঙ্কি’। তেলাকূচাকে ফাইভস্টারে ফ্রাই করলেই সেটার নাম ’কূচা-স্পেশাল’ হয়ে দাম তিন হাজার টাকা, বারগেইনিং করলে জাত যায়। কারণ, সেই একই তেলাকূচার ফ্রাই দামী বাসনে, হাজারটা নাটকের মধ্য দিয়ে, নিভু নিভু আলোর মধ্যে সাজিয়ে পরিবেশন করা হবে, যার সেলফী মূল্য সুপ্রচুর। আমরা আজকাল আর খাবার খাই না, পণ্য কিনি না, কিনি আসলে ’ব্র্যান্ডভ্যালু’।

আমি দেখলাম, কড়ির গচ্চার দুঃখ প্রকাশেরও সময় বা সুযোগ নেই। তাতে আবার মধ্যবিত্তের ‘আত্মসম্মান’ আহত হবে। কফির স্বাদ সেদিন একটু বেশিই তিতকূঁটে লাগল। বন্ধুবর তার দুগ্ধ-চা কতটা উপভোগ করেছেন জানি না। তিনি প্রথমে আমাকে ফুটপাতের টঙেই বসতে বলেছিলেন। আমিই জাতে উঠতে সরাইখানায় ঢুকি। গুনাগারি দু’জনেই দিলাম। আমি পয়সার। তিনিও তার আত্মজিজ্ঞাসার। কারন, তার ভাষ্যমতে, “আমিও কোনো জমিদার সন্তান নই।” দেখলাম, দু’জনের চিন্তার ধারাটা একই। সেটা হল, আমাদের সিংহভাগ ঢাকাবাসীর একটি কমোন শৈশব বিন্যাস রয়েছে আর ভাল করে খুঁজলে দেখা যায়, প্রায় সবারই শৈশবে ছিল একই সামাজিক স্তরে বিচরন।

আবার বড় হয়েও, সেই নিম্ন-মধ্যবিত্ত বাবা-মায়ের সন্তান এই আমাদের রাজধানীর বুকে হেঁচড়ে পেঁচড়ে কোনোমতে একটু সম্মানজনক স্থান করে নেয়া সত্বেও, আমাদের গায়ে এখনো সেই হাঁটুরে গন্ধই রয়ে গেছে। আসলে, মফস্বল বা গ্রাম হতে এই যাদুর শহরে ভাতের সন্ধানে এসে আটকে যাওয়া আমরা।

আমাদের সবারই একটি কমোন গল্প আছে। আমাদের সবারই শৈশবের দারিদ্রপূর্ণ ও সংগ্রামী জীবন এবং এই নগরে বসবাসের আটপৌড়ে জীবনেও একটি মিল আছে। বাইরে আমরা নাগরিক ভদ্রলোকের খোলসধারী হলেও ভেতরে ভেতরে আমরা প্রত্যেকেই একজন নিম্ন-মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি। সেই চাপা পড়া সত্যিটার আলাপ আমাদের তিতকূঁটে কফি পানের ফাঁকে উঠে পড়ায়, খোলা একটা চত্বরে বসেও সেদিন মনে হচ্ছিল, চারপাশে বাতাস বড্ড ভারী হয়ে উঠল। আমাদের আলাপে উঠে আসতে লাগল এই শহরের নিম্ন-মধ্যবিত্ত আমাদের প্রাত্যহিক পারিবারিক চৌহদ্দির নানা কমোন গল্পকথা।এই সেদিনই, আমি আমার একজন সিনিয়রের সাথে ক্যাজুয়াল মোডে কথা বলছিলাম।

কথা প্রসঙ্গে আমরা পরিচিত একজন মানুষের বিচিত্র একটি আচরন সম্পর্কে বলতে শুরু করলাম, যিনি খুব আশ্চর্যজনকভাবে, স্রোতের বিপরীতে, প্রায়শই অনেকগুলো ৫ টাকা, ৫০ টাকা, ১০০ টাকার খুচরা নোট দিয়ে একত্রে একটি বড় নোট বদলে নিয়ে যান। সম্ভবত তিনি বিভিন্ন উপায়ে প্রাপ্ত ছোটোখাটো আয়গুলোকে বড় নোটে একত্র করে জমানোর অভ্যাস করেছেন। ঠিক যেমন, আমরা সচারাচর বড় নোট ভাঙাতে চাই না, ভাঙলেই খরচ হয়ে যাবে-এই ভয়ে। যাহোক, বড় নোট খুচরা করে তো আমরা সবাইই নিই। কিন্তু ছোট ছোট নোট একত্রে বড় নোটে বদলে নেবার ঘটনা

শুনে আমরা দু’জনেই প্রথমে একটু হাস্য-পরিহাসই করলাম। তবে, আগের ঘটনাটা যেহেতু তখনও মনে তাজা, পরক্ষণেই আমি তাকে কথাপ্র রসঙ্গে এই ভদ্রলোকের এমন বিপরীতমুখী অস্বস্তিকর আচরনের সাথে আমাদের শৈশবের নিদারুন দারিদ্রপূর্ণ স্টাটাসের একটি যোগসূত্র নিয়ে আলাপ দীর্ঘ করলাম। প্রথমে হাস্য করলেও, ঠিক কী পরিস্থিতিতে একজন পুরুষ মানুষ দিনে দিনে এমন কেঁচোর মতো জীবন বেঁছে নিতে বাধ্য হন, একজন কন্যাদায়গ্রস্থ পিতার মতো কীভাবে দিনকে দিন নিজেকে একজন কম্প্রোমাইজড মানুষে ইচ্ছে করেই পরিণত করেন-সেই দিকটা নিয়ে আমরা কথা বললাম। দারিদ্র ও দায়ীত্ব কীভাবে আমাদেরকে অন্যের চোখে হেয় হবার ঝুঁকি নিতে অবলীলায় সক্ষম করে তোলে, তারই বাস্তব কিছু অভিজ্ঞতা বলছিলাম তাকে। আপনাদেরও বলি।

আমার ছেলেবেলায় একজন বয়স্ক ভদ্রলোককে চিনতাম। ভদ্রলোক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত না হলেও একটি অখ্যাত ও গরীব এলাকার জামে মসজিদে ইমামতি করতেন। তখনকার দিনে ওরকম জৌলুসহীন একটি মসজিদের ইমামের বেতন খুব বেশি হলে ছিল ২০০ টাকা। তারও একটা বড় অংশ তাকে নিজেকেই বাড়ি বাড়ি ঘুরে ‘কালেকশন’ করতে হত। ওই যৎসামান্য টাকার জন্য বৃদ্ধ তীব্র শীতের দিনেও ফজরের ওয়াক্তে একখানা সাইকেল চেপে ৪ কিলোমিটার দূর হতে আসতেন। একজনও মুসল্লী থাকবে না জেনেও। অর্থ ও তাকে অর্জনের চাপ মানুষকে সব করাতে পারে। একদিন ঘটনাক্রমে তার বাসায় যাবার উপলক্ষ্য দেখা দিল।

কীসের জন্য? না, আমাদের খামারে একটি মুরগী চুরির ঘটনা ঘটল। তার জন্য চোর ধরার বাটি চালানের তদবীরে।

তদবীর করে টাকা নেয়া আমাদের সমাজে আজও প্রচলিত, সবাই তা এপ্লাইও করেন, আবার পরক্ষণেই বলা হয়, “হুজুররা এত টাকা দিয়ে কী করে?”। আর ওই সময়ের সমাজে বাটি চালান হতে তাবিজ-কবজ ছিল জাতীয় প্রথা।

তো, তার পারিবারিক ও অন্দরের দৈন্য দেখার উপক্রম হল। একখানা দোচালা ঘর। তাতে সামান্য অংশই ঢেউটিনের। বাকিটা যেখানে যেমন পারা গেছে, সেরকম করে খড়, শন, টিন যোগ করে তার প্রসারমান ১১ সদস্যের পরিবারের থাকা ও বাঁচার ব্যবস্থা। দোচালার নিচে ছোট্ট এক্সটেনশন। তাতে ৮ ফুট বাই ৮ ফুট ঘরে তিনি তার একেক সন্তানকে পরিবার নিয়ে থাকার বন্দোবস্ত করেছেন। সেখানেই দাম্পত্য, শরীর বিনিময়, সন্তান জন্মদান, দাম্পত্য কলহ, খুনসুটি, বৃদ্ধ-বৃদ্ধার নিজস্ব জীবন, তালাকপ্রাপ্ত মেয়ের প্রাইভেসী, নারীর মাসিকের ব্যবস্থাপনা, পর্দা-পুশিদার টানাপোড়েন-আহ, আহ আহ, কত যে ভয়ানক-তা আমি লিখে বোঝাতে পারব না।

পরিবারে সবাইই কিছু না কিছু করেন। কেউ আম সিপারা পড়িয়ে আয় করেন-মাসে ১৫০ টাকা, কেউ ঘড়ির মেকানিক-মাসে পরিবারে যোগ করেন ৮শ টাকা। কেউ একজন হয়তো গোপনে বখে গেছে, পাড়ায় মাস্তানি-ঠকবাজিতে নেমে গেছে। সবাই সবার নিজস্ব সীমাবদ্ধতা ও স্বার্থেই একত্রে আছেন। একা থাকার মুরোদ নেই বলে।

বাড়িখানার চৌকাঠ অব্দি বন্যার পানি আসে। পূর্নিমার দিনে জোয়ারে ঘর ভাসে, উঠোন নামে যেটা আছে, সেটা কাদা, পানি, নোংরা, আবর্জনায় ভরা। ঘরগুলোর মধ্যে চত্তির মাসেও আলো যায় না। অপুষ্টি, ক্ষুধা, কান্না, শোক, বিচ্ছেদ, অনিশ্চয়তার হুহুঙ্কার সর্বত্র। আমার কুবের মাঝির কথা মনে পড়ে না। তখনও মানিক বন্দোপাধ্যায় পড়া হয়ে ওঠেনি। আমার মনে দাগ কাটে, তদবীর করে টাকা নেবার জন্য আমরা ওনাকে যে অপবাদ দিতাম-তার পেছনের গল্পের প্রকট রূপটা।

আমরা দু’জন বিকেলের কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে যেন কিছুটা এবার ধরতে পারি সেই ভদ্রলোকের সাইকোলজিটা,, যিনি খুচরা টাকা বড় নোটে বদলে নেন। কফির কাপ ঠান্ডা হতে থাকে। আমরা দু’জন দু’দিকে তাকিয়ে দেয়ালের ক্যালেন্ডারে মিছেই দিন গুনতে থাকি।

আমার ছেলেবেলা কেটেছে বাগেরহাট নামক হালের এক মৃত শহরে। আমি আমার শহরকে মৃত শহরই বলি। যদিও আমি এখানকার নেটিভ না। আমি কথা বলছি আজ হতে প্রায় চার দশক আগের বাগেরহাট নামক মফস্বলের একটি সরকারী কলোনীর জীবন নিয়ে। তখন আমরা বড়জোর ক্লাস থ্রি বা ফোরে পড়ছি। আমাদের কলোনীতে স্থায়ীভাবে বুয়া হিসেবে কাজ করতেন তিনজন ভাগ্যতাড়িত ও বয়স্ক ভদ্রমহিলা-যাদের ওই সময়েই বয়স পঞ্চাশ হবে। চার দশক আগের বাংলাদেশে বুয়াদের নিজস্ব কোনো নাম থাকত না। তাদেরও নাম ছিল-ফতুর মা (ফাতিমার মা), শরিফার মা, সোরাপের মা (সোহরাবের মা)। এই তিন নারীই ছিলেন কর্মজীবি নারী। দু’জন আবার বিধবা। একজনের স্বামী থেকেও নেই। একজনের আবার ৮ সন্তানের মধ্যে দুটি মানসিক রোগী। ফলাফল-নিজের পেট নিজে চালাও।

এদেরই একজন ছিলেন, যার সন্তানের সংখ্যা ছিল অন্তত ৭ জন। আমাদের দেখা শৈশবে সেই সন্তানেরাও ছিলেন প্রাপ্তবয়স্ক। কর্মক্ষম। তার পরেও তাদের বয়স্ক মা’কে মানুষের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করতে হত। না, প্রিজুডিসড ও জাজমেন্টাল হবেন না। সেই ৮ সন্তানেরও প্রত্যেকেই নিদারুন দারিদ্রের মধ্যে বসবাস করতেন। এরা বাস করতেন কলোনীর দেয়ালের বাইরে একচালা টানা বস্তিতে। কলোনীর দেয়াল তাদের ঘরের একমাত্র পাঁকা দেয়াল। মাগনা পাওয়া খড়, শন দিয়ে ছাওয়া একচালা টানা ঘরে তারা থাকত। একসাথে। আবার আলাদা পাতে।

মহিলার সন্তানরাও সচ্ছল নন। দিন আনি দিন খাই নিজেরাই। মা’কে কে দেখবে, কীভাবেই বা দেখবে? আগেই বলেছি, আমাদের শহর দক্ষিণের এক অতি রুগ্ন ও দরিদ্র শহর। সেই সময় হতেই। শিল্প নেই, সরকারী অফিস আদালত কম, ব্যাবসা বানিজ্য নেই। চোরাকারবারির রমরমাও নেই। দরিদ্র এক মফস্বলে, আজ হতে ৪০ বছর আগে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের প্যাটার্ন টিক কীরকম ছিল-তা আপনারা আন্দাজ করে নিন। 

সব মিলিয়ে নিদারুন মরা ও দরিদ্র এক শহর। বস্তির সেই ঘরে তারা একটাই টানা ঘরের মধ্যিখানে আসলে কোনোমতে কার্টন, কার্ডবোর্ড বা কাপড়ের সেপারেটর লাগিয়ে বসবাস করত-সন্তান, স্ত্রীসহ। কাপড়ের ভেদের এপাড়ে বৃদ্ধা মা তার বয়স্ক পাগল সন্তান নিয়ে ঘুমাতেন। ওপাড়ে তার আরেক সন্তান স্বামী বা স্ত্রীকে নিয়ে ঘুমাতেন। দরিদ্রের ঘরেও যৌনতা হত। যৌন অসন্তোষের হিংস্র বহিঃপ্রকাশও একসাথে চলত। বিদ্যুতবিহীন ঘুমটি ঘরগুলোর অধিবাসীরা সবই শুনতেন, বুঝতেন, শুধু কেউ কাউকে জানান দিতেন না। পাশের চালায় আবার কারো বাচ্চা বিয়োনো চলত। ওপাড়ে রুগ্ন নারীর ক্লান্ত শরীরের অনাগ্রহী শিৎকার, এপাড়ে সূতিকায় ভোগা আরেক নারীর বাচ্চা বিয়োনোর নিরানন্দ চিৎকার-সবই চলত পর্দা দেয়া একচালাগুলোর এপাড়ে ওপাড়ে। পাশেই পরিবারের আরো সদস্যদের নানামুখী নিত্য জীবনের খোলাখুলি উপস্থিতি-এ যেন দারিদ্রের ভয়ানক এক মুখব্যদান।

জীবন এখানে ভয়ানক রকম নগ্ন, উন্মুক্ত আর প্রকট। কোনো রাখঢাক নেই, কোনো অবগুন্ঠন নেই। নেই কোনো ‘সংকোচ’ নামক মিছে স্বতিচ্ছেদা।এই পরিবারটিতে সারাবছরই বিয়ে লেগে থাকত। বিয়ে মানে হল, চাঁদা তুলে মাইকে ‘লিলাবালী আর মালকা বাণু বাজাও, মহল্লার পাঞ্জেগানা হুজুরকে ডাকো, কবুল বলো, আর কলাপাতায় করে এক হাতা গুড়ের সিন্নি খাইয়ে মেহমান বিদায় করো। নিকাহ হয়ে যেত। একেকটি সন্তান-সে ছেলে বা মেয়ে, কতবার যে বিয়ের পিড়িতে বসেছে তার ইয়ত্তা নেই। কোনো বিয়েই ছমাস, বছর ঘুরত না। তাদের ঘরেরই এক মেয়েকে আমি আমার শৈশবে অন্তত ৪ বার নিকাহ করতে দেখে এসেছি। পালিয়ে যেতে দেখেছি বহুবার। প্রতিবার অভিসার হতে ফিরলে সেই বয়স্থা মেয়েকে তার ভাইয়েরা নিয়ম করে ঠেঙাতো। বয়স্থা বোনও অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করত, খোদার কাছে নালিশ দিত। তারপরে সবাইই ব্যাপারটা মেনে নিয়ে ঘরে নিয়ে যেত। বস্তুত, স্থায়ী দাম্পত্য করার কমিটমেন্টও ওই নিকাহগুলোতে থাকত না। ব্যাস, শরিরী বা অর্থনৈতিক সহযোগীতার ধান্দা ঘোঁচাতে নিকাহ বসো, কিছুদিন একসাথে থেকে এনজয় বা সহ্য করো, তার পরেই আবার কোনো খদ্দের জুটিয়ে উড়াল দাও। দারিদ্রের নিদারুন কষাঘাতে অমানুষে পরিণত হওয়া পরিবারটির সদস্যরা পুরো এলাকায় নানামুখী অপকর্ম আর ’অসামাজিক’ কাজে লিপ্ত থাকত।

এদেরই এক পুত্রবধূ স্থানীয় এক ব্যাচেলর সচ্ছল পুরুষের গৃহে বুয়ার কাজ করতেন। বুয়ার কাজে সেকালে মাহিনা ছিল ৫০ টাকা আর একপেট ভাত। তাতে তো পোষাতো না। বলাই বাহুল্য, ক্ষমতাবান ব্যাচেলর পুরুষের ’বিশেষ চাহিদা’র সঙ্গী হয়ে তাকে আরও কিছু বাড়তি কড়ি কামাতে হত। ভালই চলে যেত। নগদ নারায়ন, রঙিন ইন্ডিয়ান শাড়ি জুটত। স্বামী জানতেন-ভাগও পেতেন, শাশুরি জানতেন-দরকারে তিনিই গর্ভপাত করাতেন। মাঝে মধ্যেই রাত বিরাতে তার ডাক পড়ত। তিনি বিছানায় স্বামীর পাশ হতে উঠে চলে যেতেন। কাকডাকা ভোরে ফিরতেন। পাশের ঘরে দেবর, ননদ, শাশুরী, জা-সবাই বুঝতেন আবার বুঝতেন না। বড়জোর একটা অস্ফুট ‘খানকী মাগি’তেই তখনকার মতো উষ্মা ঝেড়ে পাশ ফিরে শুত। দারিদ্রের হা করা মুখ জীবন হতে লজ্জা, সংকোচ, মর্যাদাবোধ-ধুয়ে মুছে দিয়েছিল।

আমাদের কলোনীর বিভিন্ন বাসায় ছোট্ট করে পোলট্রি খামার ছিল। সেই খামারে মুরগী মারা গেলে ওনারা নিয়ে নিতেন। সেই দিন তাদের একচালা ঢালা গৃহে ঈদ নামত। আহা ঈশ্বর, আহ জীবন! আমরা অপেক্ষাকৃত বাবুসাবরা (যারা আসলে নিজেরাও নিম্নবিত্ত, তবে বুদ্ধি করে পরিচিতি বানিয়েছি-মধ্যবিত্ত) ওদের এইসব নিত্যকাজ দেখে পরিহাস করে বলতাম, “ব্যাটারা সব ছোটজাতের দল।”

না, আমি এতক্ষণ কোনো কল্পকাহিনী বলছিলাম না। আমার নিজের চোখে দেখা শৈশব। বাংলাদেশ তখন ভয়ানক দরিদ্র একটি দেশ। (এখনও যে কানাডা বা সিঙ্গাপুর হয়ে যায়নি, সেটাও জানি।) সেই সময়টা এমন এক ঊষর কাল, যখন আমাদের নিজস্ব উৎপাদন নেই, শিল্প নেই, রপ্তানীযোগ্য তেমন কিছু নেই, বিনিয়োগ বা উন্নয়নশীল জিডিপির মূলা নেই, অনলাইনে ধান্দা নেই, চাকরি নেই, ব্যবসা নেই। সব মিলিয়ে আমাদের সেই শৈশবের চার দশক আগের বাংলাদেশের ওভারঅল চিত্রটা এর থেকে খুব বেশি অন্যরকম ছিল না। আর তার সবচেয়ে ওঁচা অংশে, মফস্বলের আমার, আপনার, তার বাবারা কোনো জোতদার-তালুকদারও ছিলেন না।

আমার নিজেরই শৈশব ও বর্ধিত কৈশোরে যে অত্যন্ত হিসেবী (কার্যত দারিদ্রপূর্ণ) জীবন আমিই দেখেছি, সেই গল্পটা বললে অনেকের সাথেই মিলে যাবে। এসব পেটের কথা বলে দিলে সমাজচ্যুত হতে পারি-সেই ভয়ে আর মুখ বাড়ালাম না। শুধু মনে পড়ে যায়, আমাদের মা কখনো আমাদের সাথে ভাত খেতে বসতেন না। বাবা কেন যেন মুরগীর রান পছন্দ করতেন না। আধসের গরুর মাংসে বিশ্রিভাবে কয়েক কেজি আলু চাকচাক করে কেটে দেয়া হত। বড় ভাইয়ের প্যান্ট, শার্ট দিয়েই সিরিয়াল ধরে আমরা ছোটরা বহু বছর ফ্যাশন করতাম। ভাল পাইনঅ্যাপেল বিস্কুট চোখে দেখা হত কেবল মেহমান এলে।

হ্যা, দুনিয়ার সব দেশেই, এমনকি নরকের মধ্যেও এসি ম্যানেজ করে ফেলতে পারার মতো কাবেল কিছু মানুষ থাকেন। তারা ওই সময়েও ধনী ছিলেন, আজও আছেন। আমরা যারা আজকে এই যাদুর ঢাকা শহরে রুটি রুজীর সন্ধানে এসে এর মায়ায়ই হোক কিংবা, পেটের টানেই, আটকে গিয়েছি, আজ যারা হাতে একটা দামী ফোন, নিয়োগকর্তার বদান্যতায় প্রাপ্ত একটি বহুলব্যবহৃত সেডান, মাসকাবারী একতাড়া ছাপানো নোটের অধিকারপ্রাপ্ত হয়ে মাসে ছ’মাসে হিল্লী দিল্লী সেলফী ও চেকিন করি, মোটামুটি নিজেদের গায়ের গেঁয়ো মফস্বলী দারিদ্রের গন্ধ প্রায় ধুয়ে-মুছে ফেলে জাতে ওঠার চেষ্টায় রত, তাদেরও কোনো কোনো অন্যরকম দিনে, অন্যরকম সত্যের মুখোমুখি হয়ে নিজ নিজ দরিদ্র শৈশব ও তার নানান গল্প মনে পড়ে যাওয়া খুবই নিত্য ঘটনা। খুব অল্প কিছু ব্যতিক্রম বাদে, এই যাদুর শহরের আমরা কেউই আদি বাসিন্দা নই।

এখানে আমাদের শেকড় গজায়নি, গজাবে-সেই আশাও নেই। কার্যত রোহিঙ্গাদের সাথে আমদের খুব বেশি তফাত নেই। খোলস পাল্টে আমরা মাঝে মাঝে এই কসমেটিক নগরের ‘নেটিভ’ হবার পুচ্ছ ধারনের চেষ্টা করলেও, চলনে, বলনে, কথায়, আচরণে, লাইফস্টাইলের ফাঁক দিয়ে ঠিকই বেরিয়ে পড়ে আমাদের আসল পরিচয়। এই নিদারুন রুক্ষ, শুষ্ক, নির্দয় শহরে আমরা কেবলই আঁটকে পড়া কিছু প্রাণী। আমাদের বাইরের চাকচিক্য যেমনই হোক, ভেতরে ভেতরে আমরা সেই দরিদ্র সমাজের লিগ্যাসী নিয়েই বেঁচে থাকি। ক্ষণে ক্ষণে সেই লুকিয়ে রাখা কমোন দারিদ্রপূর্ণ বাস্তবতা সামনে উঠে আসে, প্রকাশিত হয়ে পড়ে নগ্নভাবে।

মনে পড়ে যায়, বাইরের খোলসটা নাগরিক বাবুসাব হয়ে গেলেও, হৃদয়ে, বিশ্বাসে, চিন্তায় আর বোধে এখনও সেই গরীব মফস্বল বাবার হিসেবী সন্তানই রয়ে গিয়েছি আমি। কে জানে, হয়তো ’আমরা’ সবাইই।আমারও হয়েছে তাই। শৈশবে কঠোর কৃচ্ছতায় বড় হওয়া এই আমি যখন আজ চার দশক পরে অনেক ’বড়’ হয়ে গিয়েছি, তখনও একদিন তাই হঠাৎ করে, নগরের এক সরাইখানায় তিনশো টাকায় দু’কাপ চা-কফি খেতে গিয়ে দেখলাম, আজও মনটা খচখচ করে। আজও ওই তিনশো টাকার চা পান মনটাকে দমিয়ে দেয়। একরকম অপরাধবোধ কাজ করে মনে।

বড়লোকি দেখালেও মন আজও সেই ‘ফকিন্নী’র খাঁচাতেই বন্দী। বড় বেলায় ‘বাবু’দের মতো করে বড়লোকি দেখাতে সক্ষম হলেও নিদারুন দারিদ্রে গড়া শৈশবের লিগ্যাসীর কারনে মনটা ঠিকই কেমন যেন খঁচ খঁচ করে। সে যেন বলে,

“ইশ, তিনশো টাকা! সেতো ৬ কেজি মোটা চালের দাম।”

#classstatus #classconflict #classdiscrimination #poverty #middleclasslife #nakedlife

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *