এটা প্রায় একটি ব্যক্তিগত প্রথা ও কুঅভ্যাসে দাড়িয়ে গেছে, যে, প্রতি ঈদে আমাকে এক অদ্ভুৎ দুঃখবিলাস গ্রাস করবে, আর, ঈদ আগমনির কৃত্রিম ফূর্তির সামাজিক আবহের মধ্যে, বাঙালি মুসলমানের ঈদ প্রস্তুতির উদ্যাম সময়ে আমি বসে বসে একখানা নেহাতই বিষন্ন ও সুদীর্ঘ অডেসি রচনায় ব্যস্ত থাকব। এবারও তার ব্যতিক্রম হল না।
ঈদ নামক স্ফূর্তি জীবন হতে কবে যেন নিরবে হারিয়ে গেছে। হয়তো যেদিন হতে বড় হয়ে গিয়েছি, অথবা, যেদিন হতে বড়দের মতো ভাবতে শিখেছি, সেদিন হতে আনন্দ কিংবা বেদনার উপলক্ষ্যগুলো যেন আর আলাদা দ্যোতনা জাগাতে পারে না নগরের জীবন সংগ্রামে আটকে পড়া এই মফস্বঃলীয় বালককে।
যাহোক, প্রতি ঈদে যিনি বা যারাই আমাকে ইনবক্সে শুভেচ্ছা পাঠান, তাদেরকে একটি ফিরতি শুভেচ্ছা পাঠাবার তাড়না কাজ করে। অথচ, এই ভদ্রতার ও সামাজিকতার তাড়না একখানা চোস্ত ঈদ শুভেচ্ছার বদলে ঘুরে ফিরে রূপ নেয় একখানা দীর্ঘ দুঃখবিলাস মহাকাব্যে। হয়তো আমি মানুষটাই এমন। উৎসব বোধহয় সবাইকে ছোঁয় না। কখনো কখনো ভাবি, যে, হয়তো লিখিয়েদের এমনই হতে হয়, তাই।
আজ সারাদিন কত কী যে মাথায় ঘুরেছে। ইদানিংকালে যা কিছু ঘটনার মুখোমুখি হয়েছি, সেগুলো মাথায় কিলবিল করেছে সারাদিন। গোটা দিনটা কোনো রাজকার্যে ব্যস্ত না থাকলেও জীবনের কিছু বাধ্যতামূলক কর্মপ্রবাহ তো থাকেই। তাইতে, এই চত্তিরের রাতে, কীপ্যাডে ঘ্যাসঘ্যাস লিখছি।
আজ ভাবনাগুলো খুব বিচ্ছিন্ন। বিচ্ছিন্ন ভাবনাগুলোকেই না হয় আজ কয়েক লাইনে ধরে ফেলি। আসুন, শুরু করি।
এক: সামাজিকতার মেকি ও মৌসুমী প্রকাশ:
সামাজিকতা কী? সে কি এক দিনের, বা, আরও স্পষ্ট করে বললে কয়েক ঘন্টার এক সাময়িক উচ্ছাস? সে কি ভৈরবী জোয়ারের মতো? যার জন্ম ও প্রকাশ কেবলই ঈদের চান্দে? ঈদের চান্দে, ছুটকো কোনো একটা উৎসবে হঠাৎ স্মৃতি হাতড়ে, ইনবক্স ঘেঁটে ঘেঁটে পুরোনো ও ভুলে যাওয়া সম্পর্ককে স্মরন করে একখানা কপিক্যাট চিত্র অথবা চটকদার বাক্যচয়নে শুভেচ্ছা বার্তা? আমরা কেন এই সামাজিকতার চাপ অনুভব করি? বহুবার চেষ্টা করেছি সেই রহস্যভেদের। পারিনি। আপনারা পারলে জানিয়ে যাবেন। ঈদ চলে গেলে এই প্রাণের টানটা কোথায় মুখ লুকোয় আমাদের?
দুই: পুরুষের জন্য উথলে ওঠা ভন্ড গণমাধ্যম:
এবারের ঈদে একটা বেশ অন্যরকম বিষয় নজর কেড়েছে। ফেসবুক পোস্টে, রিলসে, টিকটকে ঈদে ঘরে ঘরে অথবা মলে মলে (মল কথাটাকে আক্ষরিকভাবে নেবেন না।) নারীর শপিং উদ্যামের বাজেটের বিপরীতে পুরুষের উপেক্ষা, অথবা, স্বেচ্ছা নির্বাসন, কিংবা, চিরায়ত স্যাকরিফাইস নিয়ে বেশ সরব ছিল ফেসবুক ও টিকটক। প্রকৃত অর্থে দরিদ্র অথচ প্রকাশ্যে ধনী এই দেশে নাকি ৪ কোটি মানুষ খাদ্য সংস্থান করতে ঋন করে হিমশিম খাচ্ছেন। সেই পরিসংখ্যান কতটা সত্যি মিথ্যা জানি না (পরিসংখ্যান কবে সত্য হয়েছে-সেটাও এক প্রশ্ন।)। তবে ঈদ বাজারে ধনীর মল হতে গরীবের ভ্যান হুসেন গ্যালারি-কোথাও ভীড় ও উদ্যামের ঘাটতি ছিল না বরাবরের মতোই। তারই ডামাডোলে নারীদের দু’লাখ, চার লাখের ঈদ বাজেটের ঝাকমারির বিপরীতে গৃহের পুরুষ সদস্যকূলের অতি সামান্য, অথবা উচ্ছিষ্ট, অথবা, নেহাতই শুন্য বাজেট নিয়ে গণমাধ্যমকে বেশ একটা গরমাগরম সহানুভূতির স্রোতে ভাসতে দেখলাম এবার। একটু ভালই লেগেছে দেখে। অবশ্য এই উপলব্ধির মধ্যে সততা ও সত্য কতটা-সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। তবে, যেমনটাই বলি, এই কথাটা খুবই সত্যি, যে, পুরুষকূল কোনোকালেই ঈদে চান্দে নতুন জামা, জুতা নিয়ে মাতে না। হ্যা, গৃহের নারীদের একটু সুখ, একটু স্বাচ্ছন্দ্য, একটু মুখের হাসির জন্য পুরুষরা আজীবনই নিজেদের উজাড় করতে প্রস্তুত ছিলেন। আজীবনই দেখেছি, বাবারা এক পাঞ্জাবি দিয়ে বছরের পর বছর ঈদের নামাজ দিব্যি পড়তে পারতেন। তাদের পাঞ্জাবি কখনো পুরনো হত না। কিছু বেটা মানুষ চিরকালই থাকতেন। তাদের হিসেব আলাদা।
তিন: নগরে দরিদ্রের পাল:
ঈদের আগের দিন পনেরো এবার প্রচন্ড দৌড়োদৌড়িতে কেটেছে। ঈদ আসলেই এই রাজধানী নগরে ভিক্ষুকের স্রোত নামে। গ্রাম হতে অতি দরিদ্র, দরিদ্র ও অপেক্ষাকৃত ভাল অবস্থার মানুষেরা ম্যাজিক শহর ঢাকায় চলে আসেন। বাড়তি আয়ের আশায়। শহরে পাপের প্রবাহ বেশি। তাতে আবার সিয়ামের মাসে শতগুন পূণ্যের হাতছানি। তাতে ভিক্ষাদানের হাত একটু বেশি উদার থাকে শহুরে মানুষদের। ঈদের চান্দে জাতীয় বানিজ্যের বাজার কয়েক হাজার কোটি, নাকি কয়েক লাখ কোটি-সেটার পরিসংখ্যান মনে নেই। তবে, ঈদের মাসে ভিক্ষার বাজারটাও যে হাজার কোটির-তা নিয়ে আমার ব্যক্তিগত সন্দেহ নেই। খুব দুঃখজনক হল, এই ঈদের ভিক্ষা বাজারও বিকিকিনি হয়। ভিক্ষা ব্যবসা নিয়ে একটা প্রতিবেদন পড়লাম। ভিক্ষুকরা ভাড়ায় খাটেন এই সময়ে। রোজ ঠিকা হাজার, দু’হাজার বখরার বিনিময়ে গ্রাম হতে আসা মৌসুমি ভিক্ষুকরা বিক্রী হন। এলাকার ইজারা বিক্রী হয়। ইজারা লেনেওয়ালারা ভিক্ষুক ডেপ্লয় করেন। ভিক্ষালব্ধ বিপুল টাকা হতে তারা তাদের মার্জিন বুঝে নেন। এক মৌসুমে আয় লাখ লাখ। পূর্ণার্থীরাও যে এসব জানেন না-তা নয়। এমনিতে প্রতারককে অর্থ দিতে তাদের অনীহা। কিন্তু, জেনেবুঝেও এই ভিক্ষা ব্যবসায় অর্থপ্রবাহ সচল রাখতে পূর্ণ্যার্থীরা পয়সা ঢালেন-সেটা আমাকে বেশ অবাক করে। তবে, গতকাল রাতে বাসার অতি দরকারী ম্যাচ আর ওষুধ কিনে যখন ফিরছিলাম, মহল্লার গলির মুখে যে আপাদমস্তক বোরকায় ঢাকা মহিলা ভীড় হতে দূরে দাড়িয়ে এক পাশে চুপচাপ দাড়িয়ে আমার দিকে হাতটা সসংকোচে বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তিনি ঠিক কোন দলে ছিলেন-প্রতারক, নাকি অসহায়, জানি না।
চার: মাংসের দোকানে তাল তাল লোভ:
গরুর গোস ৮০০ টাকা কেজিতে বিকোচ্ছে আমাদের মহল্লায়। এমনিতে গরুর গোস নিয়ে দেশে রায়ট লাগার দশা। অন্তত ফেসবুকে তো রীতিমতো গণবিপ্লব ঘটে যাচ্ছে। বয়কট বিপ্লব, উৎকট বিপ্লব। ইহুদীদের তৈরী ফেসবুকে ইহুদীদের বানানো লাল পানির বিরুদ্ধে বিপ্লব। কোকাকোলা বয়কটের বিপ্লব, কীবোর্ড বিপ্লব, গরুর গোস বয়কটের বিপ্লব। কেউ কেউ আবার গরুর গোস খাবার বিপ্লবে নামেন। দাদাদের শিক্ষা দিতে। এরই মাঝে কেউ হিরো বনে যাচ্ছেন সস্তায় গোস বেচার স্ট্যান্ট খেলে। বয়কটের বিপ্লব খুব বিকোয় এদেশে। কিন্তু বিপ্লবীরা গোসের দাম বৃদ্ধির জন্য মূল দায়ীদের বিরুদ্ধে বিপ্লবে নামে না। রাস্তায় নামে না। ফেসবুক বিপ্লবে কোকের দাম আটআনা কমলেই বিপ্লবীরা তৃপ্ত। এরই মধ্যে মহল্লার গোসের দোকানে অতি বিপ্লবীদের গরুর দোকানে হুজ্জম। ৮০০ টাকা কেজির গোসের এক তাল বুঝে নেবার জন্য বুভুক্ষুদের সুদীর্ঘ লাইন। গত বছর ঈদের সময় আমাদের গোস বিক্রেতার গরুর সংখ্যা ছিল ৫ টা। এবার গরু মারা পড়েছে গোটা তিরিশেক। তাও ভীড় সামাল দেয়া যাচ্ছে না। মাংসের দোকানের সামনে বুভুক্ষুর মতো ছেলে, বুড়ো, মেয়েছেলের দুরুদুরু বুকে সটান দাড়িয়ে থাকা। একটু মোলাম গোসের প্রসাদ ঈদে পাতে না পড়লে সিয়ামের পূণ্য পূর্ণতা পাবে না যে। পাড়ার নেড়ি কুকুরগুলো সারা রমজানে শুকিয়ে কাঠ হয়েছে। তারাও ঈদের মাংসের আশায় কসাইয়ের দোকানের সামনে জিভ ঝুলিয়ে অপেক্ষায়। বুঝি না, গরুর গোস না বয়কট হল? নাহ, নেড়ি কুত্তাদের বয়কটের আওকত কই?
পাঁচ: পঞ্চতন্ত্রের মন্ত্রপূত সালামী:
‘বেরাক’ বয়কট করলেও ‘বেরাক’ এর মুঠোফোন সেবা ‘বিখ্যাশ’ এ সালামী নিতে বিপ্লবীদের কোনো আপত্তি অবশ্য দেখিনি। বিগত বছরগুলোতে টাকা, যে, কিনা বনে গেছে এই উন্নত দেশের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা, ছেলে, বুড়ো, গুড়ো, মেয়ে, মর্দ-সবার সবচেয়ে আরাধ্য দেবতায়, সেই টাকার গন্ধ নিতে মরিয়া এই উন্নত দেশের সবাই। মানুষ আর কিছুকে না চিনলেও, আর কিছুকে ‘বেইল’ না দিলেও বাঙালি টাকাকে সমীহ করতে শিখেছে। এই দেশে সবাই এখন টাকার মুরীদ। পীর সাহেবও টাকার মুরীদ, সাগরেদও। ফুটপাতের ‘হিরুইঞ্চি’ও টাকার কদর জানে। আর তাইতে সালামীর এই দেশে জয়জয়কার। বিগত কয়েকটা বছর ধরে দেখছি, সালামী জিনিসটাকে রীতিমতো ইন্সটিটিউশনালাইজড করে ফেলা হয়েছে। সালামী, যেটা কিনা আমাদের শৈশবে ছিল পাঁচটাকার একটা কড়কড়ে নতুন নোটের ফ্যান্টাসী, সেটা আজ পরিবারের গন্ডী পেরিয়ে ঢুকে পড়েছে কর্পোরেটে। বস ও জুনিয়রদের মধ্যে সালামী নিয়ে বেশ হুল্লোড় চলছে। ইনিয়ে বিনিয়ে সালামী (মানে টাকা) নেবার একটা কায়দা বেশ করে জাঁকিয়ে বসেছে সবখানে। এর মধ্যে পুরোনো আমলের আমরা পড়ে গিয়েছি বেশ বিপদে। সালাম নেই, সালামী বেশ কষে আছে। ছোটরা এখন বড়দের সালাম দেয় না, বড়রা ছোটদের দোয়া দেন না। বিনিময় কেবল সালামী নামের টাকার।
ছয়: চল্লিশের একাকীত্ব:
কে যেন বলেছিলেন, আপনি যত সূক্ষ্ণ চিন্তার মানুষ হবেন, যতটা পড়ুয়া হবেন, ততই একাকীত্বে ভুগবেন। ততই আপনার সঙ্গীর সংখ্যা কমে যাবে। ততই একঘরে হয়ে পড়বেন। তার সাথে যোগ হবে বয়স। আপনার যত বয়স হবে, ততই আপনি আপনার সঙ্গ হারাবেন। ততই ধীরে ধীরে আপনার চারপাশ হতে সাথে চলা মানুষদের সংখ্যা কমতে দেখবেন। আপনার আশপাশে যারা বয়স্ক আছেন, তারা এই উৎসবগুলোতে ঠিক কীভাবে সংশ্লিষ্ট হন, কীভাবে তারা উৎসবগুলোতে লীন হন, কতটুকু আত্মস্থ হন এই উৎসবের রঙের ফোয়ারায়, কখনো ভেবে দেখেছেন? উৎসবগুলোর উৎকট উদযাপনের মচ্ছবে আমরা কি কখনো আমাদের চারপাশের বয়োজেষ্ঠ্যদের মানসিকতা ও মানসিক একাকীত্বকে আমলে নিই? হ্যা, আমরা হয়তো তাদেরকে উৎসবে শামিল করার চেষ্টা করি, কিন্তু, তাদেরকে কখনো তাদের চাওয়ার মতো করে শামিল হবার ব্যবস্থা করার কথাটা ভেবে দেখি? বয়স্কদের কথার ফাঁকে আধাবয়স্কদের কথাটাও পাড়ি এক্ষনে। আমাদেরই চৌহদ্দিতে আমাদের একটু আধটু কাছের বা দূরের মানুষদের আমরা মনে করি কি উৎসবে? আমাদের ভুলে যাওয়া বন্ধু, ভুলে পড়া সুহৃদ, ভীড় এড়িয়ে চলা পরিচীতদের কথাটা কি উৎসবে মনে পড়ে?
সাত: চাঁদ মামার লুকোচুরি:
ছোটবেলায় চাঁদ দেখা নিয়ে একটা প্রচন্ড উত্তেজনা কাজ করত। চাঁদ দেখার জন্য ২৯ রোজার সন্ধ্যায় আমরা রীতিমতো যুদ্ধ করতাম। গাছপালায় ভরা মফস্বলে এমনিতেও গাছের ফাঁক দিয়ে চাঁদ দেখা দুস্কর ছিল। তারপরও দেখার চেষ্টাটা চলত। ফেসবুক আসার পরে সৌদির সাথে মিল রেখে একই দিনে কেন ঈদ পালন করা যাচ্ছে না-তাই নিয়ে হাহাকারটা বেশ নজর কেড়েছে। সৌদির সাথে একই দিনে ঈদ হলে এই পোড়ার দেশের ঠিক কী উপকারটা হত-সেটা পরিষ্কার নয়। সৌদির সাথে একই দিনে রোজা শুরু করবার তাড়া বা তাগাদা অবশ্য ফেসবুকে অনুপস্থিত। অবশ্য ঈদ ও উৎসব যখন হয়ে পড়ে নেহাতই বানিজ্য, নেহাতই চিল করবার মচ্ছব, যখন ধর্মীয় কিংবা সামাজিক উৎসবের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় কুল-ডুড জেন জেড প্রজন্মের হাতে, তখন ঈদের চাঁদ টেনে তোলার দিকেই বাতাস বইবে-সেটাই তো স্বাভাবিক। এবার বেশ একটা বৈজ্ঞানিক গবেষনাই পড়া হল আমাদের পশ্চিমের সৌদ দেশ আর পূবের মালয়েশিয়ায় চাঁদ দেখার পরও কেন বাংলাদেশে চাঁদ দেখা নাও যেতে পারে, তা নিয়ে। পড়ে খুব হাসলাম। চাঁদ দেখা কমিটিকে তুলোধুনো করবারও বেশ চল হয়েছে। তবে, আমার কাছে কিন্তু চাঁদ দেখা নিয়ে এই অনিশ্চয়তাটাই উৎসব উৎসব লাগে। বাইনোকুলার দিয়ে, টেলিস্কোপ দিয়ে, ক্যালেন্ডার ধরে যদি চাঁদ উঠিয়ে ফেলা হত, তাহলে ঈদের উত্তেজনাটা বোধহয় গোটাটাই পানসে হয়ে যেত। আমার বরং মনে হয়, থাক না এটুকু অনিশ্চয়তা। থাকনা একটু দোটানা। সবকিছু যান্ত্রিক না হয় না’ই হল।
আট: ওরা পাঁচজন অনন্তের পথে:
ঈদের সন্ধ্যায় স্বপ্নের টানে বাড়ি ফিরবার সময়ে সদরঘাটে কতিপয় অসভ্যের উৎকট অন্যায়ের জেরে পাঁচজন মানুষ, জলজ্যান্ত মানুষ পরপারে চলে গেলেন। ঈদের দিনগুলোতে দুর্ঘটনায় বিড়াল কুকুরের মতো বাঙালের মরা যেন ললাট লিখন। ওঁরা, ওঁরা ওই পাঁচজন যেন বিশ্ব হতভাগা। হয়তো অফিসের ব্যস্ততায়, হয়তো টিকিটের অভাবে, হয়তো সময়মতো অফিসে বেতন না পাওয়ায় আগে যেতে পারেনি। বাড়িতে স্বজনরা পথ চেয়ে বসেছিল। ঈদের পরদিন বাড়িতে পৌছোলেও কিছুটা সান্তনা পেত। আর পাওয়া হল না তাদের। স্বজনের হাতে ঈদের জামার বদলে খোদ স্বজনই সাদা কাফনে মুড়ে বাড়িতে চালান হবে আজ রাতে। শুনেছি সরকার বাহাদুর প্রত্যেকের পরিবারকে লাশ পিছু পঁচিশ হাজার করে দিচ্ছে। তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে-মরার কারন অনুসন্ধানে। কারন খুঁজে পেলে ওরা প্রাণ ফিরে পাবে কিনা-তা সরকার জানান নাই। একটু আগেই বলেছিলাম, মানুষ, বাঙাল মানুষ বিড়াল কুকুরের মতো মরাই ভাগ্য। রোজার এক মাসে আমাদের চারপাশের রাস্তার কুকুর বিড়ালগুলোর একটা বড় অংশই ক্ষুধায় মরে। হয়তো আক্ষরিকভাবেও মরে। খাদ্যের প্রবাহ কমে আসে বলে। ওদের সাথে আমাদের তফাৎ খুব কম।
নয়: বাঙাল বনাম মোচলমানের উৎসব:
গত বছর রোজার মধ্যে পহেলা বৈশাখ পড়ে যাওয়ায় দেশের আদ্দেক মানুষ দুঃখিত হয়েছিল (আন্দাজ)। আবার আদ্দেক মানুষ আশায়, খুশিতে বুক বেঁধেছিল, যে, যাক, এইবার অন্তত পহেলা বৈশাখ নামের শেরেকি, বিজাতীয় উৎসব দেখতে হবে না। বেশ হয়েছে। কিন্তু, শেষোক্ত দলের বুকে শেল বেঁধে, যখন দেখা যায়, যে, প্রথম দলটা ওসব বিবেচনায় না গিয়ে পহেলা বৈশাখে, বাংলা নববর্ষে প্রথামাফিক বরাবরের মতোই নববর্ষ উদযাপন করেছে। এবার আবার সেই ঝামেলা নেই। আর দু’দিন বাদেই পহেলা বৈশাখ। বাঙালি জাতির নিজস্ব ও সম্ভবত একান্ত একমাত্র উৎসব। এই উৎসবের উৎস কী-তা নিয়ে আমি খুব ভাবিত না। এই উৎসবের রেওয়াজ কত হাজার বা শত বছরের, তা নিয়েও আমি উচ্চকিত নই। আমি শুধু জানি, এই উৎসবটাকে বাঙালরা (মানে বাঙালদের বড় একটি অংশ) আপনার করে নিয়েছে। এই উৎসবকে নিজেদের উৎসব বলে পালন করে আসছে। কিন্তু, দুঃখজনক হলেও এটা এখন বাস্তব, যে, আমাদেরকে সন্দেহাতীতভাবেই মেনে নিতে হচ্ছে, যে, এই বাঙাল মূলকে একটা প্রচন্ড সংগ্রাম বা সংঘাত আসন্ন ও অবশ্যম্ভাবি। তা হল, এই দেশ আফগানি সংস্কৃতির ধারক হবে, নাকি বাঙাল সংস্কৃতির-এই দুইয়ের মধ্যে প্রকাশ্য যুদ্ধ। ঈদ তো মাত্রই আজ গেল। এই কাল সকাল হতেই ফেসবুকে বিপ্লব শুরু হবে। পহেলা বৈশাখ নববর্ষের অনুষ্ঠান যে কতটা বিজাতীয় (আসলে বলতে চাওয়া হয় বিশেষ জাতীয়), কতটা চাপিয়ে দেয়া, কতটা শেরেকী, কতটা পাপের, কতটা অমার্জনীয়, কতটা বর্জনীয়-তা নিয়ে প্রবল আলোড়ন চলবে পহেলা বৈশাখের আগে পরের সাতদিন। বিশেষ করে ’মঙ্গল শোভাযাত্রা’ (ওরফে আনন্দ শোভাযাত্রা’ নিয়ে তীব্র বিষোদগার, চুলচেরা বিশ্লেষণ, বিশেষজ্ঞ আল্লামা ফতোয়ায় ছেয়ে যাবে বাংলার আকাশ, বাতাস। ফতোয়ার তুবড়িতে হয়তো জাতির শত্রু জিরো মলম, মামুন-লায়লা জুটি অথবা সাবরিনা আপাও পহেলা বৈশাখ বর্জনের গণআহবান জানিয়ে জাতির রাহাবার বনে যাবেন। আমার আপনার চেনা পরিচীত মানুষেরাই এমন এশটাটাশ প্রসব করবেন। প্রগতিশীল হিসেবে চেনেন, এমন কেউ কেউও। সারাবছর সম্ভব অসম্ভব সবরকম আকাম কুকামে মত্ত-এমন ছোকরারাও এই সাতদিন ধরে হয়ে পড়বে আল্লামা চাঁদজ্বি। এদের একটা মোক্ষম যুক্তি অবশ্য আছে-আমি আমল করতে না পারি, এই বারো আউলিয়ার দেশে, এই তীতুমীরের দেশে এহেন পাপাচার না আটকালে নরকে যাব যে।
এই দেশ, এই বাঙাল দেশ, এই ধূতি-লুঙ্গি-একতারা-লাঙল-পান্তার দেশে একটা মৌলিক প্রশ্নের উত্তর সমাধা না হয়েই মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে একটা অনিচ্ছুক জাতিকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে লক্ষ বীরাঙ্গনার ইজ্জত ও মুক্তিযোদ্ধার রক্তে স্বাধীনতা উপহার দেয়ায় একটা বড়সড় গন্ডগোল জিইয়ে রয়ে গেছে। সেটা হল, এই দেশ, এই জনপদ, এই গণপ্রজাতন্ত্র বাঙাল চেতনায় পরিচালিত হবে, এই দেশ বাঙালদের হবে, এই জনপদ বাউলে, লালনের, একতারার, পান্তার, চৈত্রসংক্রান্তির হবে? আমরা বাঙাল হিসেবে পরিচীত হব? নাকি আমরা বাঙালি মুসলমান হিসেবে পরিচীত হতে চাইব? কোনটা আমাদের কাঙ্খিত ডিসকোর্স-সেটি জাতীয়ভাবে, জাতীর মনমগজে ভালভাবে প্রোথিত হয়ে যাবার আগেই স্বাধীনতা উপহার পাওয়াটা কবে যেন একটা মহাভুল পরিগনিত হতে শুরু করে। কেবল ভয় হয়। (আমিার ধারনা, আপনি যদি এই অপদার্থ গল্প এতক্ষণ কষ্ট করে পড়েও থাকেন, তাহলে এই প্যারাটা পড়বার পরে আপনার আফসোস আরও তীব্র হবে। এতক্ষণ আমার লেখা বেশ মিঠে লাগলেও এক্ষণে তা বিষের মতো লাগতে শুরু করতে পারে। মনে মনে ভাবতে পারেন, বিদ্যুৎ ভাইকে তো বেশ ভাল মানুষ ভাবতাম। সে যে তলে তলে এমন ছুপা রুস্তম, সে যে এমন ছদ্মবেশি পোরগতিশীল, বোলগার-তা কে জানত।)
ঈদের দিনে বা ঈদের মৌসুমে এত ভারী মহাকাব্য বোধহয় খুব অন্যায্য ও অপাংক্তেয় হয়ে গেল। কী করি বলুন? আমার স্বভাবটাই এমন যে। আর, আমি আর কিছু করতে পারিনে যে। মাথার মধ্যে যত্তসব আজেবাজে চিন্তা ঘুরপাঁক খায় যে। তাকে দূরে সরাতে পারিনে যে।
যাহোক, এত্তবড় জঞ্জাল পড়বার পড়ে আপনাকে একটা শুভেচ্ছা না জানিয়ে কী করে শেষ করি?
আপনাকে ঈদের শুভেচ্ছা। আপনাকে (ইলিশ বর্জিত) পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ’র আগাম শুভেচ্ছা।
#Eidcelebration #Eidfestival #Bangaliculture #traditionalculture #heritage #masculinism #cosmeticdevelopment #developmentgimmick #GDPgimmick #socialization #mandatoryrituals #lonlinessofforties